আড়ালে আততায়ী: পর্ব ৭

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

    জিআরপি থানায় ঢুকে ইন্সপেক্টর জহর সাহা কোথায় বসেন জেনে নিলেন দীপকাকু। তারপর ওঁর টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ঝিনুকরা। জহর সাহার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে দীপকাকুর, সাক্ষাৎ হচ্ছে প্রথমবার। নমস্কারের ভঙ্গি করে দীপকাকু তাই বললেন, আমিই দীপঙ্কর বাগচী। সরি একটু লেট হয়ে গেল।

    মি. সাহার বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। ভারী চেহারা। সপ্রতিভতার সঙ্গে বলে ওঠেন, আরেঃ, আপনার পথ চেয়েই তো বসে আছি। এই তো, যার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলেন, তিনি এসে গেছেন অনেকক্ষণ।

    জহর সাহার টেবিলের এ পারে তিনটে চেয়ারের একটাতে বসে আছেন এক ভদ্রলোক। সাহাবাবু তাঁর দিকেই হাত নির্দেশ করেছেন। বাকি দুটো চেয়ারে ঝিনুকরা বসল। দীপকাকুর সঙ্গে মোটরম্যান শীতল সাঁধুখা’র আলাপ করালেন জহর সাহা। দু’জনের মধ্যে নমস্কার বিনিময় হল। দীপকাকু ঝিনুকের পরিচয় দিলেন নিজের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। অনেকের মতো জহরবাবু, শীতলবাবুর মুখেও অবাক ভাব ফুটে উঠল। কারণ, ঝিনুক মেয়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সহকারী। দীপকাকুর পরিচয় দেওয়ার সময় মি. সাহা বললেন, এঁকে লালবাজার থেকে পাঠানো হয়েছে।–– বোঝাই গেল শীতল সাঁধুখা যাতে দীপকাকুকে বিশেষ গুরুত্ব দেন, সেই জন্যই বলছেন। প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললে হয়তো শীতলবাবু ততটা পাত্তা দিতেন না। আলাপ পর্বে আরও একটা নতুন জিনিস জানা হল, শীতলবাবুর অফিসিয়াল ডেজিগনেশন, এলপিপি। ভেঙে বললে, লোকোমোটিভ পাইলট প্যাসেঞ্জার। এমনিতে মোটরম্যান কথাটাই চালু। রেলের বাইরের লোক এঁদের ড্রাইভার বলেই সম্বোধন করে থাকে।

    শীতল সাঁধুখার বয়স চল্লিশের সামান্য উপরেই মনে হয়। গালে শৌখিন দাড়ি। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে দীপকাকু ওঁকে বললেন, কোন দুর্ঘটনা নিয়ে আমি আপনার কথা শুনতে এসেছি, মি. সাহার থেকে নিশ্চয়ই জেনেছেন। এবার আমায় অ্যাক্সিডেন্ট ঘটার আগের মুহূর্তর একটু বিস্তারিত বর্ণনা দিন। মানে আপনি রিপোর্টে যা লিখেছেন, তার চেয়ে বেশি কিছু।

    মন দিয়ে দীপকাকুর বক্তব্য শুনলেন শীতল সাঁধুখা। তারপর শান্ত ভাবে বললেন, নকডাউন রেজিস্টারে আমাদের ডিটেলেই সব কিছু লিখতে হয়। আপনি কি সেই রিপোর্ট পড়ে দেখেছেন?

    –না, দেখিনি, মি. সাহা আমাকে মোটামুটি জানিয়েছেন। আমি আসলে রিপোর্টে যা না লিখলেও চলে, সেই ব্যাপারগুলো জানতে চাইছি। যেমন ধরুন, ডা. অলকেশ রায় কাউকে ধাওয়া করতে গিয়ে কি ট্রেনের সামনে এসে পড়েছিলেন? নাকি খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পার হচ্ছিলেন রেল ট্র্যাক? লাইন পার হওয়ার সময় হঠাৎ কি পিছনে ফিরে তাকিয়েছিলেন? কেউ ডাকলে মানুষ যে ভাবে ফিরে তাকায়। এরকম আরও কোনও ইন্সিডেন্স কি মনে পড়ছে আপনার? জিজ্ঞেস করার পর দীপকাকু উত্তরের জন্য উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলেন শীতল সাঁধুখার দিকে।

    দৃষ্টি মেঝেতে নামিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেছেন শীতলবাবু। সেদিনের সেই অঘটনের মুহূর্তটা মনে করার চেষ্টা করছেন। যেটা ভুলে যেতেই চেয়েছিলেন নিশ্চয়ই। দীপকাকুর অনুরোধে মনে করতে হচ্ছে। মুখ তুললেন শীতল সাঁধুখা। চাহনি এমন সুদূরপ্রসারী যেন সেইদিনের অ্যাক্সিডেন্টের সময়টা দেখতে পাচ্ছেন। বলতে শুরু করলেন, ডাউন লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল চালাচ্ছিলাম। ঢাকুরিয়া স্টেশন ছেড়ে বালিগঞ্জের দিকে যাচ্ছি। গাড়ির স্পিড ছিল নিয়ম মেনেই। কাঁকুলিয়া লেভেল ক্রসিং-এর আগে হুইশেল দিই। ট্র্যাক তখন পুরো ফাঁকা। স্পিড কমানোর প্রশ্ন নেই। হঠাৎ দেখি বাঁ দিক থেকে আমার ব্রেকিং ডিসট্যান্সের ভিতরে চলে এসেছেন এক ভদ্রলোক। মানে ওঁর থেকে ইঞ্জিনের দূরত্ব এতই কম, সাডেন ব্রেক মারলে আমার গাড়ির বেশ কিছু বগি উল্টে যাবে। হেভেলি ইনজিওরড হবে প্যাসেঞ্জাররা, মারাও যাবে অনেকে। প্রচুর ক্যাজুয়ালটি এড়াতেই গাড়ি রান করিয়ে যেতে হয়েছিল। ভদ্রলোকের বডি কাটেনি, ইঞ্জিনের ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে লাইনের পাশে পড়লেন। ওই ধাক্কায় কেউ বাঁচে না।

    দীপকাকু যা জানতে চাইছেন। এই বয়ানে সেটা পরিষ্কার হল না। ফলে দীপকাকুকে ফের নির্দিষ্ট ভাবে জিজ্ঞেস করতে হল, ধাক্কা লাগার আগের মোমেন্টে ডা. রায় কি ইঞ্জিনের দিকে তাকিয়েছিলেন?

    –না, শার্টের পকেট থেকে কী যেন বার করতে যাচ্ছিলেন।

    –আই গট ইট। ব্যস, আর কিছু বলতে হবে না। বললেন দীপকাকু। চেহারায় তাঁর স্বস্তির ছোঁয়া। ঝিনুক সহ বাকি দু’জনের মুখে অবাক ভাব। দীপকাকুর স্বস্তির কারণ খুঁজে পাচ্ছে না ঝিনুক। ডা. রায় যে শার্টের পকেট থেকে কিছু বার করতে গিয়েছিলেন, এই হিসেবটা সম্ভবত আগেই করেছিলেন দীপকাকু। অঙ্কটা মিলে যেতে ভরসা পেয়েছেন। তার মানে ওঁর ভাবনা চলছিল ঠিক পথেই। ঝিনুকের মনের কথাই বলে উঠলেন ইন্সপেক্টর জহর সাহা, কী মশাই, মনে হচ্ছে কোনও একটা দিশা পেলেন?

    –পেয়েছি। তবে সেটা খুবই প্রাথমিক স্তর। দেখি এই ক্লুটা ধরে কতটুকু এগোতে পারি। বলার পর দীপকাকু মোটরম্যানকে বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ মি. সাঁধুখা। আমাকে সময় দিলেন এতক্ষন। ভবিষ্যতে যদি দরকার পড়ে আশা করি আপনার থেকে একই রকম সাহায্য পাব।

    সৌজন্যের হাসি হেসে ঘাড় কাত করলেন শীতল সাঁধুখা। বললেন, আমি তা হলে এখন চলি?

    দীপকাকু সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। চেয়ার থেকে উঠে মি. সাঁধুখা জহর সাহাকে বললেন, চলি, স্যার।

    মি. সাহা হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক সারলেন সাঁধুখার সঙ্গে। সাঁধুখা এগিয়ে গেলেন দরজা লক্ষ্য করে। জহর সাহা একটু ঝুঁকে এসে দীপকাকুকে বললেন, আপনার ক্লায়েন্ট শার্টের পকেট থেকে কী বার করতে গিয়েছিল বলে মনে করছেন?

    –ফোনসেট। উনি যখন রেলের ট্রাকের উপরে, কেউ ওঁকে ফোন করেছিল। হয় ট্রেন আসছে জেনে করেছিল অথবা না জেনে। আমার যেটা এখন সব চেয়ে আগে দরকার, ওই সময় যে কলটা এসেছিল তার নাম অথবা নাম্বারটা। সেটা আপনি আমায় দিতে পারবেন। বললেন দীপকাকু।

    অফিসার সাহা ঘাড় নেড়ে বলেন, তা পারব। মৃতের সঙ্গে থাকা সমস্ত জিনিসপত্র এখনও আমাদের কাস্টডিতে আছে। যার মধ্যে আছে ওঁর অ্যান্ড্রয়েড ফোন। যদিও কেসস্টাডি  কমপ্লিট করে ফেলেছি। রিপোর্ট কোর্টে প্রোডিউস করব। কোর্ট থেকে অর্ডার পেলেই জিনিসপত্র ফেরত দেব মৃতের প্রথম ওয়ারিশনকে।

    –প্লিজ, এটা এখনই আপনি করবেন না। রিপোর্ট দিতে একটু সময় নিন। যদি দেখা যায় সত্যিই অ্যাক্সিডেন্টের একটু আগে ওঁকে কেউ ফোন করেছিল, তখন আপনার থেকে সেই নাম্বারটা নিয়ে কলারের সঙ্গে দেখা করতে হবে আমাকে। এছাড়াও আমার ক্লায়েন্টের বসবাসের জায়গাটা একবার সার্চ করা দরকার। সেটা করার অধিকার আমার নেই। আপনার আছে। আপনি যেহেতু নকডডাউন কেসটার তদন্ত অফিসার। বললেন দীপকাকু, গলায় অনুরোধের সুর।

    একটু ভেবে নিয়ে অফিসার সাহা বলতে থাকেন, সবই তো বুঝলাম। কিন্তু আমি যে তদন্তটা চালিয়ে যেতে চাই, তার কারণটা তো উপরওলাকে জানাতে হবে। মানে, আমার হায়ার অথারিটিকে। পরে কোর্টকেও জবাব দিতে হবে কোন গ্রাউন্ডে কেসটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে একটা ফোন এসেছিল, এই বেসিসে কেস টানা যাবে না। খুবই দুর্বল পয়েন্ট। ফোন যে কোনও সময় কারুর কাছে আসতেই পারে। আর যদি দেখা যায়, ফোন আসেনি, আপনার ক্লায়েন্ট অন্য কিছু বার করতে যাচ্ছিলেন পকেট থেকে– তখন তো কেস চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই থাকবে না।

    –তা হলে উপায়? দীপকাকুর গলায় স্পষ্ট হতাশা।

    আবার একটু চিন্তা করে নিয়ে জহর সাহা বললেন, একটা উপায় ছিল। যদি মৃতের রক্ত সম্পর্কিত কোনও আত্মীয় জিআরপি–তে এফআইআর করত এই বয়ানে যে, অ্যাক্সিডেন্টটার পিছনে কোনও ষড়যন্ত্র আছে আমার ধারণা। এটা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। আমার আত্মীয় একেবারেই অসাবধানী নন। কেউ হয়তো তাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের সামনে ফেলে দিয়েছে।…  জিআরপি যদি কমপ্লেন গ্রাহ্য না করে, আত্মীয়টি কোর্টেও যেতে পারে। কোর্ট তখন রেলকে অর্ডার করবে তদন্ত করতে।

    থামলেন মি. সাহা। একটু বিরতি নিয়ে ফের বলে উঠলেন, আপনার ক্লায়েন্টের বাড়ির লোকেরা কোনও কমপ্লেন করবেন বলে তো মনে হয় না। কেনইবা করবেন? অ্যাপারেন্টলি এটাকে সাধারণ একটা অ্যাক্সিডেন্ট বলেই মনে হবে। আপনি শুধু মনে করছেন এর মধ্যে কোনও রহস্য আছে। আপনার এই ধারণাটা কি ক্লায়েন্টের কোনও ভাইকে বোঝাতে পারবেন? তারপর তিনি যদি কমপ্লেন করেন, আমি তদন্ত চালিয়ে যেত পারব।

    –নাঃ, ভাইদের বোঝাতে পারব না। দু’ভাইয়ের সঙ্গে তেমন সদ্ভাব ছিল না ডাক্তারবাবুর। বলার পর দীপকাকু কী যেন ভাবতে লাগলেন। ভাবনা শেষ করে বললেন, দেখি, এফআইআর–টা কী ভাবে করানো যায়।

    দীপকাকু কাকে দিয়ে করাবেন কমপ্লেন, আন্দাজ করতে পারছে না ঝিনুক। ডাক্তারবাবুর রক্ত সম্পর্কিত সব চেয়ে কাছের লোক তো নিরুদ্দেশ। সায়ন রায়, ডাক্তারবাবুর একমাত্র সন্তান। যার খোঁজে তদন্তে নেমেছিলেন দীপকাকু। এখন তো মনে হচ্ছে ঘুরে গেছে তদন্তের অভিমুখ। অফিসার জহর সাহা বলে উঠলেন, আচ্ছা, আপনি যে বলছেন ওই ডাক্তারবাবুর বাসস্থান সার্চ করতে, তা সেখানে গিয়ে আমি কী খুঁজব? আপনার কেসের তো কিছুই জানি না।

    –একটা বিশেষ বাধ্যবাধকতার কারণে আমার কেসের বিষয়টা আপনাকে বলতে পারছি না। সময় মতো নিশ্চয়ই বলব। আপনি শুধু ডাক্তারবাবু্র বাড়ি গিয়ে সার্চ করার ভান করবেন। আমাকে রাখবেন সঙ্গে। যা দেখার আমি দেখে নেব। এছাড়াও ডাক্তারবাবুর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে আমার কথা বলানোর ব্যবস্থা করে দেবেন কাইন্ডলি।

    –সে সব হয়ে যাবে। আগে তো কমপ্লেন করানোর ব্যবস্থা করুন। আর হ্যাঁ, এত কিছু করার পর যদি দেখা যায় নকডডাউনটা নিছকই একটা অ্যাক্সিডেন্ট, এর পিছনে কোনও রহস্য নেই, তা হলে কিন্তু ডিপার্টমেন্টে আমার পজিশন একটু খাটো হয়ে যাবে। সেটা কিন্তু মাথায় রাখবেন। নেহাত লালবাজার থেকে সুপারিশ এসেছে, তাই আপনার অনুরোধ এড়াতে পারছি না।

    অফিসার সাহার কথাগুলো শুনে একটু যেন থম মেরে গেলেন দীপকাকু। প্রেস্টিজে লেগেছে বোধহয়। শান্ত গলায় বলে উঠলেন, আপনার সঙ্গে এটা আমার প্রথম সাক্ষাৎ। তাই এত সংশয়ে ভুগছেন। আলাপ গড়ালে, মানে এক সঙ্গে কাজ করতে থাকলে, আশা রাখি আপনার দুশ্চিন্তা কমাতে পারব।

    –তেমনটা হলেই ভাল। বললেন অফিসার সাহা।

    দীপকাকু চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। ঝিনুকও উঠে পড়ল। মি. সাহার সঙ্গে হ্যান্ডশেক সেরে নিয়ে দীপকাকু বললেন, যত তাড়াতাড়ি পারি আপনাদের ডিপার্টমেন্টে কমপ্লেন লেখানোর ব্যবস্থা করছি। ওটা না হলে তো কাজ শুরুই করা যাবে না। চলি।

    সায় সূচক ঘাড় হেলালেন অফিসার। দীপকাকু ঘুরে গিয়ে পা চালালেন। সঙ্গে চলল ঝিনুক।

    চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

    রহস্য উপন্যাসের আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

    আড়ালে আততায়ী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More