শনিবার, জানুয়ারি ২৫
TheWall
TheWall

আড়ালে আততায়ী: পর্ব ৬

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

 

মাঝে একটা দিন কেটে গেছে। বৃথা কাটে‍‌নি। দীপকাকু ডা. রায়ের তদন্তের কাজ চালিয়ে গেছেন গতকাল। ঝিনুককে সঙ্গে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। আজ সঙ্গে নিয়েছেন। মোটরবাইকে দীপকাকুর পিছনে বসে ঝিনুক চলেছে। শিয়ালদা স্টেশনে, রেল পুলিশের থানায়। ডা. রায় যেহেতু ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছেন, কেসটার তদারকির দায়িত্ব রেল পুলিশের। ছোট করে বললে জি আর পি’র। রাজ্য পুলিশেরই একটা অংশ জি আর পি, এরা রেলের আওতাভুক্ত অঞ্চলের আইন, শৃঙ্খলা দেখাশোনা করে। দীপকাকুর লালবাজারের বন্ধু রঞ্জনকাকুর চেনা জানা আছে রেল পুলিশের লোকজনের সঙ্গে। রঞ্জনকাকুর সাহায্য নিয়ে দীপকাকু চলেছেন ইন্সপেক্টর জহর সাহার সঙ্গে দেখা করতে। জহর সাহা হচ্ছেন ডা. রায়ের নকডাউন কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার। অর্থাৎ ডা. রায় কী ভাবে ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেলেন, সেটার তদন্ত করছেন। ট্রেনের নীচে পড়ে মারা যাওয়ার সমস্ত ঘটনারই তদন্ত হয় রেল পুলিশের পক্ষ থেকে। এমনটাই রুটিন। এ সব কেসে বেশির ভাগই প্রমাণ হয়, ব্যক্তিটি আত্মহত্যা করেছে অথবা তার অসাবধানতায় অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটেছে। ডা. রায়ের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে জানতে চান দীপকাকু। ডা. রায়ের আত্মহত্যার কোনও কারণ দীপকাকু খুঁজে পাচ্ছেন না। যে মানুষটা নিজের ছেলের সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন, দেখা না করেই তিনি হঠাৎ আত্মহনের পথ বেছে নেবেন কেন? এরপর পড়ে রইল আর একটা সম্ভাবনা, অসাবধানতা। এত অসাবধান হলেন কেন ডা. রায়? কী চিন্তা চলছিল মাথায়? গোটা ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার জন্যই ওঁকে রেল পুলিশের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

জি আর পি’র সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য গতকাল গিয়েছিলেন লালবাজারে রঞ্জনকাকুর কাছে। রঞ্জনকাকু ফোনে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার জহর সাহার সঙ্গে দীপকাকুর কথা বলিয়ে দেন। মি. সাহা দীপকাকুকে বলেছেন, এই ধরনের নকডাউন কেসের ক্ষেত্রে মোটরম্যান, মানে ট্রেনের চালকের বয়ান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তিনি একেবারে সরাসরি দেখতে পাচ্ছেন কোন পরিস্থিতিতে মানুষটা ট্রেনের নীচে এসে পড়ছে। কোর্টও মোটরম্যানের সাক্ষ্যর উপর ভরসা করে বেশি।… এই কথা বলার পর মি. সাহা জানিয়েছেন, যে লোকাল ট্রেনের নীচে পড়ে মৃত্যু হয়েছে ডা. রায়ের, সেটার মোটরম্যান অ্যাক্সিডেন্টের পরই ওয়াকিটকিতে প্রথমে সেই ট্রেনের গার্ডকে রিপোর্ট করেন। তারপরই আগামী স্টেশনের, মানে বালিগঞ্জের স্টেশন মাস্টারকে ঘটনার কথা জানান। এমনটাই নিয়ম। এ ছাড়াও আর একটা অবশ্য কর্তব্য থাকে তাঁর, ডিউটি শেষ হওয়ার পর অফিসে এসে নকডাউনের রেজিস্টারে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা লিখতে হয়। মোটরম্যান লিখেওছেন সেটা। মি. সাহা সব ক’টা রিপোর্ট খতিয়ে দেখেছেন। দেখার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ডা. রায়ের অসাবধানতায় অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে। কোর্টে এই মতামতটাই পেশ করবেন তিনি… সমস্তটা শুনে দীপকাকু মি. সাহাকে বলেছেন যাঁর মৃত্যু হয়েছে ওই অ্যাক্সিডেন্টে, তাঁকে তিনি চেনেন। ওঁর দেওয়া একটা কেসের তদন্ত করছেন দীপকাকু। কেন জানি দীপকাকুর মনে হচ্ছে ওই কেসের সঙ্গে অ্যাক্সিডেন্টের কোথাও একটা যোগ আছে। সেটা বোঝার জন্য তিনি একবার সেই মোটরম্যানের সঙ্গে কথা বলতে চান, যাঁর গাড়ির নীচে পড়ে মারা গেছেন ডা. রায়।

মি. সাহা বলেছেন, ঠিক আছে। আমি দেখছি কী ভাবে মোটরম্যানের সঙ্গে কথা বলানো যায়।… খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি দীপকাকুকে। আজ দুপুর এগারোটা নাগাদা মি. সাহার ফোন আসে। বলেন, বিকেল চারটেয় চলে আসুন আমাদের থানায়। মোটরম্যান শীতল সাঁধুখাকে ডেকে পাঠিয়েছি। আপনার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব।

মি. সাহা দীপকাকুর জন্য যা কিছু করছেন, সবই রঞ্জনকাকুর অনুরোধে। রঞ্জনকাকুর পোস্টিং পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে। মি. সাহার ফোন পাওয়ার পরই দীপকাকু ঝিনুককে কল করেন। বলেন, তিনটে নাগাদ রেডি থেকো। তোমাকে নিয়ে একটা জায়গায় যাব।

কোথায় যাবেন, কেন যাবে্‌ন, সমস্তটা বললেন ঝিনুকদের বাড়ি এসে। উইক ডেজ হলেও, বাবা আজ বাড়ি ছিলেন। নিজের সিকিউরিটি এজেন্সির অফিসে যাননি। একটু জ্বর মতোন হয়েছে। দীপকাকুর থেকে সব কিছু শুনে বাবা বলেছিলেন, আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না। ডা. রায় তোমায় তদন্ত করতে দিয়েছিলেন। মারা গেলেন তিনি। তাও কেন কাজটা চালিয়ে যাচ্ছ? তোমার পারিশ্রমিক কে দেবে?

এর উত্তরে দীপকাকু বলেছেন, দেখুন রজতদা, গোয়েন্দাগিরি আমার পেশা অবশ্যই, তার সঙ্গে নেশাও তো বটে। ইচ্ছে করলে আমি কি আর একটা দশটা, ছ’টার চাকরি জোটাতে পারতাম না? সেই এলেম এবং কোয়ালিফিকেশন দুটোই আমার ছিল। রহস্য ভেদের নেশাই আমাকে এই পেশায় এনে ফেলেছে। ডা. রায়ের মৃত্যুর ঘটনায় আমি গভীর এক রহস্যের আভাস পাচ্ছি।

–কী কারণে ব্যাপারটাকে তোমার এত রহস্যজনক মনে হচ্ছে? জিজ্ঞেস করেছিলেন বাবা।

দীপকাকু বললেন, কারণ বেশ কিছু আছে। সে সব এখনই বলার মতো জোরাল নয়। তবে একটা পয়েন্টকে অগ্রাহ্য করা যায় না।

–কী সেটা? এটা জানতে চেয়েছিল ঝিনুক।

দীপকাকু তখন বলেন, ডা. রায়ের গাড়ির ড্রাইভারের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার সাক্ষ্য আমার কাছে ভীষণ জরুরি। ডাক্তারবাবুর মৃত্যুর আগে নিকটজন বলতে সে একমাত্র স্পটের কাছাকাছি ছিল। সেই সময় ডাক্তারবাবু ঠিক কী রকম মুডে ছিলেন, ড্রাইভার নন্দ গড়াই বলতে পারবে। সে হঠাৎ উধাও হল কেন?

–উধাও মানে কি ফেরার? নির্দিষ্ট ভাবে জানতে চেয়েছিলেন বাবা।

দীপকাকু বললেন, ফেরার ঠিক নয়। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকার চেষ্টা করছে। কম্পাউন্ডার তাপস কুণ্ডুর থেকে ড্রাইভারের ফোন নাম্বার নিয়েছিলাম। বেশ কয়েকবার করলাম কল, প্রতিবার শুনছি সুইচড অফ। ফের তাপস কুণ্ডুকে ফোন করে নন্দ গড়াইয়ের বাড়ির ঠিকানা নিলাম। ডা. রায়ের বাড়ির কাছেই ওয়াটগঞ্জে থাকে। আজ সকালে গিয়েছিলাম সেখানে। বস্তি মতো এলাকা। ওদের টিনের চালের বাড়িটা রাস্তার উপরেই। কড়া নাড়তে বেরিয়ে এলেন বয়স্ক একটি লোক। নন্দ গড়াইয়ের খোঁজ করতে, বললেন, বাড়ি নেই। ডিউটিতে গেছে। ওঁর পরিচয় জানতে চাইতে, জানালেন উনি নন্দর বাবা। ইতিমধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন দুই মহিলা, একজনের কোলে বাচ্চা। আন্দাজ করা যায় সে নন্দর স্ত্রী। অন্যজন নন্দর মা। বাড়ির লোকেদের যখন বললাম, নন্দর সঙ্গে খুব দরকার, ওকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। নন্দ বাড়ি ফিরবে কখন? নন্দর স্ত্রী বলল, কবে বাড়ি ফিরবে ঠিক মতো বলা যাচ্ছে না। লরিতে মাল নিয়ে পাটনা গেছে। সেখান থেকে অন্য কোথাও চলে যেতে পারে। আমি বললাম, বাইরে থাকতেই পারে, কিন্তু ওকে ফোনে পাচ্ছি না কেন? আপনারা কীভাবে যোগাযোগ রাখছেন? ফের নন্দর বউই উত্তর দিল, ও যখন গাড়ি চালায় ফোন অফ রাখে। যখন চালায় না, নিজেই আমাদের ফোন করে।… এতদূর বলে চুপ করে গিয়েছিলেন দীপকাকু। বাবা বলেছিলেন, সব তো ঠিকই আছে। এর মধ্যে তুমি উধাও হওয়ার কী দেখলে? গাড়ি চালানোর সময় ফোন ধরতে না চাওয়া তো ভাল স্বভাব। ফোন সেট বন্ধ অবস্থায় কেউ কল করলে তার নাম্বার সেট অন করার সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয় ফোন কোম্পানি। নন্দ এতক্ষণে এক দু’বার ফোন অন করেছে। তোমার নাম্বার তার কাছে আননোন। তাই আর কলব্যাক করেনি।

খানিক নীরব থেকে দীপকাকু বলেছিলেন, আমি ব্যাপারটা ওই লাইনে ভাবছি না। আমার যেটা অস্বাভাবিক লাগছে, নন্দ গড়াই চালাত লাইট গাড়ি। এই ডিউটিতে খাটুনি বেশি নেই। সে হঠাৎ লরির মতো হেভি গাড়ি বেছে নিল কেন? পরিশ্রম প্রচুর। দিন-রাত জুড়ে গাড়ি চালাতে হবে।

–বেশি রোজগার হবে বলে কাজটা ধরেছে। পরিশ্রম যখন অনেক, টাকাও নিশ্চয়ই বেশি। এটা বলেছিল ঝিনুক।

উত্তরে দীপকাকু বললেন, ওর যদি বেশি রোজগারের প্রয়োজন থাকত, প্রাইভেটকার না চালিয়ে ট্যাক্সি, অ্যাপ ক্যাব কিংবা লরি চালাতে পারত আগেই। ডাক্তারবাবুর গাড়ি চালিয়ে প্রয়োজন মিটে যাচ্ছিল নন্দ গড়াইয়ের। মালিক মারা যেতেই অন্য কোনও লাইট গাড়ির চাকরি না খুঁজে, সরাসরি হেভি গাড়ি চালাতে যাওয়াটা বেশ বেমানান।

–অর্থাৎ তোমার অনুমান ডা. রায়ের ড্রাইভার পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কেন? প্রশ্ন রেখেছিলেন বাবা।

দীপকাকু বললেন, আমার ধারণা ডা. রায়ের অ্যাক্সিডেন্টের আগে পরে এমন কোনও ঘটনা নন্দ গড়াই জানে, যেটা ও কাউকে বলতে চাইছে না। বললে বিপদে পড়তে পারে নন্দ গড়াই। ডা. রায়ের বাড়িতে যতটুকু ইনফর্মেশন না দিলে নয়, সেটুকু বলে সে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর কোনও প্রশ্নের মুখে পড়তে চাইছে না।

এই পয়েন্টটা আসতে ঝিনুক বলেছিল, ওকে আর কে জেরা করবে? সব তো মিটে গেছে। ডাক্তারবাবুর পোস্ট মর্টেম হয়েছে। বাড়ির লোক বডি নিয়ে দাহ করে ফেলেছে।  পারলৌকিক কাজ হয়ে গেল কাল। কেস তো এক প্রকার শেষ। নন্দ গড়াই তো আর জানে না কোনও এক গোয়েন্দা তদন্তটা চালিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। তা হলে সে কেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে?

–পালিয়েছে তদন্ত হতে পারে বুঝে। এমন কিছু ঘটেছিল ডা. রায়ের মৃত্যুর সময়, নন্দর মনে হয়েছে এটা নিয়ে পরে  লোকজনের টনক নড়তে পারে। তখন ওকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। ঘটনাটা বললে ওর নিজের ফেঁসে যাওয়ার চান্স আছে। প্রশ্নটা পুলিশও ওকে করতে পারে, যদি ডা. রায়ের বাড়ির লোক পুলিশের শরণাপন্ন হয়। বলেছিলেন দীপকাকু।

এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে বাবা জানতে চান, কোন ব্যাপারে বাড়ির লোকেরা পুলিশের শরণাপন্ন হতে পারে বলে তোমার অনুমান? একটা ব্যাপার খেয়াল রেখো, জি আর পি ডা. রায়ের বডি বাড়ির লোকের জিম্মায় দেওয়ার সময় ওঁর সঙ্গে যা যা ছিল, তার একটা লিস্টও দিয়েছে। জিনিসগুলো এখনও দেয়নি। অফিসিয়াল কিছু কাজ সারা হয়ে গেলেই দিয়ে দেবে। অর্থাৎ সমস্তটাই বুঝে নিয়েছে ডা. রায়ের ভাইয়েরা। এরপর আর কোন ব্যাপার পড়ে থাকতে পারে সন্দেহ করার মতোন?

–সেটা আমি কী করে জানব! নন্দ গড়াইয়ের হঠাৎ করে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়া থেকে আন্দাজ করছি, কিছু তথ্য গোপন করতে চাইছে সে। আমার অনুমান ভুলও হতে পারে। বলার পর দীপকাকু ঝিনুককে তাড়া দিয়েছিলেন বেরিয়ে পড়ার জন্য। কেন না ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে তিনটে পার করেছে। ঝিনুকদের কুঁদঘাটা থেকে শিয়ালদা স্টেশন অনেকটাই পথ।

মৌলালি মোড় ক্রস করল দীপকাকুর বাইক। পিছনে বসা ঝিনুক আড়চোখে নিজের রিস্টওয়াচটা দেখে, চারটে বেজে গেছে। তার মানে লেট হয়ে গেল। আর একটু পরেই শিয়ালদা স্টেশন।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

রহস্য উপন্যাসের আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

আড়ালে আততায়ী

 

Share.

Comments are closed.