আড়ালে আততায়ী: পর্ব ৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

    দীপকাকুর ভাবনার গভীরতায় হামেশাই বিস্মিত হয় ঝিনুক। এক এক সময় প্রশ্ন জাগে মনে, আমি কি সবটা বুঝলাম?

    যাইহোক, আজ রোববার। সকালে দীপকাকু এসেছেন ঝিনুকদের বাড়ি। খুব ব্যস্ত না থাকলে দীপকাকুর এটাই মোটামুটি রুটিন। বাঁশদ্রোণীর পিরপুকুর থেকে এই কুঁদঘাট অবধি উজিয়ে আসেন বাবার সঙ্গে আড্ডা দিতে। এর সঙ্গে অবশ্য মায়ের হাতের জলখাবারের আকর্ষণটাও যোগ হবে। বাবা দীপকাকুর থেকে বয়সে অনেকটা বড় হলেও দু’জনের মধ্যে জমে খুব। এর প্রধান কারণ দুঃসাহিকতাকে পছন্দ করা। বাবা এক্স আর্মিম্যান, অ্যাডভেঞ্চারাস লাইফ কাটিয়েছেন। আর দীপকাকুর পেশায় পদে পদে ঝুঁকি। দুঃসাহসিকতার সঙ্গে বুদ্ধির মিশেল না থাকলে সাফল্য আসে না। দু’জনের আলোচনায় তাই বুদ্ধিচর্চাই চলে বেশি। বুদ্ধিতে দীপকাকু বেশ খানিকটা এগিয়ে। বাবার সঙ্গে দাবা খেলায় উনিই বেশির ভাগ সময় জেতেন। এই মুহূর্তে বাবা আর দীপকাকু দাবার বোর্ডে নিমগ্ন।

    জলখাবার সারা হয়েছে আধঘণ্টা হল। তার আগে দীপকাকু ডা. রায়ের কেসের একটা তথ্য পরিবেশন করলেন। তথ্যটি নিয়ে এসেছেন পেনড্রাইভে, একটা ভিডিও ফুটেজে। ‘রিলাইফ’ হাসপাতালের রিশেপশনে কথা বলছেন ডা. রায়ের ছেলে সায়ন। ছেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ডাক্তারবাবু, পিঠে হাত রাখলেন সায়নের।  চমকে উঠে বাবাকে একবার দেখে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে পালিয়ে যাচ্ছেন সায়ন। ফুটেজটায় ডাক্তারবাবুর বন্ধু কমলবাবুকেও দেখা গেল। গত পাঁচদিন ধরে ডা. রায়ের দেওয়া কেসের এই হল ফলাফল।

    ‘রিলাইফ’ থেকে ফুটেজটা সংগ্রহ করতে দীপকাকুকে পুলিশের সাহায্য নিতে হয়েছে। পুলিশ না বললে কোনও প্রাইভেট ডিটেকটিভকে তথ্য দিতে বাধ্য নয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পুলিশের হেল্প লাগলে দীপকাকু সব সময় বন্ধু রঞ্জনকাকুর দ্বারস্থ হন। যিনি লালবাজার কন্ট্রোলরুমের ইন্সপেক্টর। এবারও তার অন্যথা হয়নি। রঞ্জনকাকুই ‘রিলাইফ’-এ ফোন করে দীপকাকুকে সহযোগিতা করতে বলেন। এদিকে দীপকাকু পুলিশকে সাহায্য করতে পারছেন না। বলতে পারছেন না তিনি একজন ফেরার আসামির সাম্প্রতিকতম ভিডিও ফুটেজ পেতে চলেছেন। না বলতে পারার কারণ, ডা. রায়ের সঙ্গে কথা হয়ে আছে ওঁকে ছেলের সঙ্গে একবার নিভৃতে দেখা করাতে হবে। তারপর পুলিশ সায়নকে অ্যারেস্ট করুক, তাতে ডাক্তারবাবুর কোনও আপত্তি নেই। এছাড়াও সায়নের ব্যাপারে পুলিশকে ইনফর্ম করতে গেলে আর একটু নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে, ভিডিও-র ব্যক্তিটি সায়নই তো? না কি ওর মতো দেখতে অন্য কেউ?… দীপকাকু যখন পয়েন্টটা বললেন, বাবা বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এই বলে, এটা হতে পারে না! বাবা নিজের সন্তানকে চিনতে ভুল করবে? ধরে নিলাম ভুলই করেছেন, তা হলে ছেলেটি কেন ডাক্তারবাবুকে দেখে পালাল?

    বাবাকে সমর্থন করে ঝিনুক বলেছিল, শুধু পালানো নয়, রীতিমতো ভয় পেয়ে পালিয়েছে। ফুটেজটায় তো তাই দেখলাম।

    উত্তরে দীপকাকু বলেছেন, তোমাদের লজিকে কোনও গোলমাল নেই। একটা কথা কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, আমরা সায়নকে চিনি না। ডাক্তারবাবু বলছেন ওটা সায়ন, ওঁর সন্তান। আমরা সেটাই ধরে নিচ্ছি। অর্থাৎ এটা অনুমান। আমি পুলিশকে অনুমান সাপ্লাই করতে চাই না। ফেরার আসামি সায়ন রায়কে যতক্ষণ না আমি নিজে আইডেন্টিফাই করতে পারছি, তার আগে পর্যন্ত ওর ব্যাপারে পুলিশকে ইনফর্ম করব না।

    দীপকাকু এত জটিল ভাবে ভাবতে পারেন বলেই বোধহয় দাবাটা ভালো খেলেন। ওঁর বক্তব্য শোনার পর বাবা জানতে চেয়েছিলেন, ভিডিও ফুটেজ তো জোগাড় হল। এরপর কী স্টেপ নিতে যাচ্ছ?

    কী যেন চিন্তা করতে করতে দীপকাকু বলেছিলেন, শুধু ফুটেজ জোগাড় তো নয়, হাসপাতালের অফিস চেম্বারে বসে আমি সেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেছি। সঙ্গে হাসপাতালের ম্যানেজারও ছিলেন। ওঁর টেবিলের ডেক্সটপে ফুটেজটা দেখিয়ে রিসেপশনিস্টকে মনে করতে বললাম লোকটির সঙ্গে কী কথা হচ্ছিল? ওর কী কোনও পেশেন্ট ভর্তি আছে হাসপাতালে?

    মেয়েটি কিছুই মনে করতে পারল না। এমনকি সায়নের  সঙ্গে যে তার কথপোকথন হয়েছে ভিডিও ফুটেজটা থেকেই প্রমাণ পেল। এর সঙ্গে রিসেপশনিস্ট আর একটা কথাও যোগ করল, লোকটি নির্ঘাত খুব বেশিবার আসেনি, যেমন আসে হাসপাতালে বেশ কিছুদিনের জন্য ভর্তি থাকা পেশেন্টের নিকটজন। সেরকম যদি হত, মেয়েটির মনে থাকত লোকটিকে।… এই কথা থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তিকে আমরা সায়ন ভাবছি, সে হয়তো মাত্র দু’দিন বিশেষ কোনও দরকার ‘রিলাইফ’-এ গিয়েছিল। প্রথমদিন ওকে দেখেছিলেন ডা. রায়ের বন্ধু কমল। দ্বিতীয় দিন ডা. রায় দেখেন, সঙ্গে কমলবাবুও ছিলেন।

    –তার মানে তুমি বলতে চাইছ ডা. রায় যাকে সায়ন বলছেন, সে অন্য কোনও কাজে গিয়েছিল? প্রশ্ন রেখেছিলেন বাবা।

    দীপকাকু বললেন, পেশেন্টকে দেখতে যেতেই পারে। অন্য কারণও থাকতে পারে যাওয়ার। ডা. রায় এবং কমলবাবু ওকে দেখে ফেলাতে, ব্যক্তিটি হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করেছে।

    –তা হলে কী দাঁড়াল? ফুটেজটা কোনও কাজেই আ্সবে না। খানিক হতাশ হয়ে বলে উঠেছিলেন বাবা। কথাবার্তার এই পর্যায়ে জলখাবার নিয়ে এসেছিলেন মা। তিন জনের হাতে প্লেট ধরিয়ে দিলেন। আজ বানিয়েছেন ছোলে বাটোরা আর গাজরের হালুয়া। সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া মনোনিবেশ করলেন দীপকাকু। ঝিনুকের আশঙ্কা হচ্ছিল, উনি বুঝি ভুলেই যাবেন, কী নিয়ে কথা চলছিল। কিন্তু না, একটু বাদে খেতে খেতেই দীপকাকু প্রসঙ্গে ফিরলেন। বলতে থাকলেন, ফুটেজটা কাজে আসবে ভবিষ্যতে। তদন্ত যত এগোবে ফুটেজটার অনেক না জানা অংশ স্পষ্ট হবে। এই যেমন, আপনারা খেয়াল করছেন কি না জানি না। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে সায়ন যখন কথা বলছে রিসেপশনে, বুঝতে সুবিধে হবে বলে আপাতত ব্যক্তিটিকে ওই নাম ধরেই ডাকছি। তখন খানিক দূরে সায়নের বয়সি, মানে তিরিশ ছুঁই ছুঁই দুটি লোক দাঁড়িয়ে। দু’জনেই সায়নের দিকে তাকিয়ে ছিল। ডা. রায় এসে সায়নের পিঠে হাত রাখতেই লোক দুটির মধ্যে চঞ্চলতা দেখা দিল। সায়ন পালাচ্ছে, ধাওয়া করছেন ডা. রায়। সেই সময় ওই দুটো লোক তড়িঘড়ি পায়ে সরে পড়ল। কারা ওই দুইজন? সায়নের বন্ধু, নাকি ওকে ফলো করা হচ্ছিল বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যে? যদি বন্ধু  হয়, নতুন না পুরনো? পুরনো বন্ধু হলে ফুটেজটা দেখে শনাক্ত করতে পারবেন ডা. রায়। সেদিন তিনি ছেলে ছাড়া অন্য কারুর দিকে সে ভাবে লক্ষ করেননি।

    বাবা বললেন, ডাক্তারবাবুকে ফুটেজটা দেখাও তাড়াতাড়ি। ওয়েট করে তো আর লাভ নেই।

    –হ্যাঁ, দেখাব। ক্লিপিংসটা কাল সন্ধেবেলা হাতে এল। একবার দেখে নিয়ে ফোন করলাম ডা. রায়কে, পেলাম না। বলছে সুইচড অফ। সকালে আপনাদের বাড়ি আসার আগে করলাম। বলতাম, ঘণ্টা দুয়েক বাদে কোথায় দেখা করা যায় বলুন? ওঁর আশঙ্কা বাড়ির লোক ওঁকে ফলো করতে পারে। নিজের ড্রাইভারকেও বিশ্বাস করেন না। ডা. রায়ের সুবিধে মতো জায়গায় দেখা করতাম। কিন্তু আজ সকালেও ফোন বলছে, সুইচড অফ। খানিকটা বিরক্তির স্বরে কথা শেষ করেছিলেন দীপকাকু।

    ঝিনুক বলে উঠেছিল, খাওয়া শেষ হওয়ার পর একবার করে দেখুন না!

    বাবা বললেন, ফোনে যদি পাও, দেখা করার এমন একটা জায়গা ঠিক করো, উনি গোয়েন্দার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছেন, সেটা যেন বোঝা না যায়। তদন্তের প্রয়োজনে দেখা তো তোমায় করতেই হবে বারবার। এখন যেমন দেখাতে হবে সিসি টিভি ফুটেজটা। সঙ্গে ল্যাপটপ নিয়েছ তো? বড় স্ক্রিন ছাড়া সব কিছু ভাল বোঝা যাবে না।

    দীপকাকু ঘাড় কাত করতে ভুলে গেলেন। খেতে খেতে ভাবছিলেন অন্য কিছু। ঝিনুক শিওর, ল্যাপটপ সঙ্গে রেখেছেন দীপকাকু। তদন্তের প্রয়োজনে ওঁর প্রস্তুতিতে কখনও কোনও খামতি থাকে না। খাওয়া শেষ করে বেসিনে হাত ধুতে যাচ্ছিলেন দীপকাকু, ঝিনুকের মাথায় একটা আইডিয়া এসে গিয়েছিল। বলেছিল, কমলবাবুর বাড়িতে কিন্তু আমাদের মিটিং প্লেস হতে পারে। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আমরা ওখানে দেখা করব। কেউ যদি ফলো করে ওঁকে, দেখবে বন্ধুর বাড়িতে গেলেন। কমলবাবুকে তো লুকনোর কিছু নেই, উনি চান ছেলের সঙ্গে দেখা হোক বন্ধুর। সায়নের খবর তো উনিই এনে দিয়েছিলেন ডাক্তারবাবুকে।

    বেসিন থেকে মুখ ধুয়ে ফেরার পথে দীপকাকু বলেছিলেন, ভালো বলেছ তো। দাঁড়াও ফোন করে কমলবাবুর বাড়িতেই মিট করার কথাটা বলি।

    দীপকাকু তার আইডিয়া নিলে মনে বেশ জোর পায় ঝিনুক। প্রকৃত সাহায্যকারী লাগে নিজেকে। পকেট থেকে মোবাইল বার করে দীপকাকু ফোন করলেন ডা. রায়কে। ঠোঁট উলটে ফোনসেট নামালেন কান থেকে। বললেন, এখনও বলছে সুইচড অফ। কী ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে না।

    বাবা বলেছিলেন, ফোন বোধহয় সব সময় খোলা রাখেন না। তোমরা তো বললে খুব বিজি ডাক্তার। চেম্বারে বেশ ভিড় হয়। ফোনেও হয়তো জ্বালাতন করে পেশেন্ট পার্টি। সেই কারণেই হয়তো ফোন অফ রাখেন।

    বাবার কথা মনে ধরেছিল দীপকাকুর। তাই বলেছিলেন, ঠিক আছে, চলুন কয়েক দান দাবা খেলে নেওয়া যাক। পরে আবার ফোন করা যাবে।

    সেই যে দু’জনে দাবা খেলতে বসেছেন, এখনও চলছে। ইতিমধ্যে বাবা এক সেট হেরেছেন। সেকেন্ড বোর্ডও শেষ হতে চলল, এবারও হারবেন বাবা। বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দিব্যি টের পাচ্ছে ঝিনুক। এমন সময় তদন্তের একটা পয়েন্ট তার মাথায় এসে যায়। দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, আপনি যে বলেছিলেন সায়ন কলকাতার কোনও হোটেল বা গেস্ট হাউসে উঠেছিল কি না খোঁজ নেবেন, তার কি কোনও খবর পেলেন?

    –না, পাইনি। সময় লাগবে। পুলিশের সাহায্য নিতে পারছি না। নাম আর ডা. রায়ের দেওয়া ছবি পুলিশের হাতে দিলে, কেসটার তদন্ত ওরাই শুরু করে দেবে। আমি অন্য সোর্স মারফত খোঁজ নিচ্ছি। বলা শেষ করে বাবাকে মোক্ষম চাল দিলেন দীপকাকু। বললেন, চেক।

    আবারও হেরে গেলেন বাবা। বোর্ড থেকে চোখ তুলে দীপকাকু বললেন, নাঃ, এবার ফোন করি ডাক্তারবাবুকে। বার বার সুইচড অফটা আমার ঠিক সুবিধের ঠেকছে না।

    ডা. রায়ের নামে কল করে ফোন কানে নিলেন দীপকাকু। মুখ থমথমে হল ক্রমশ। ফোন সেট নামিয়ে দিয়ে বললেন, একই কথা বলছে! এখনও ফোন খোলেননি হতে পারে না। সাড়ে দশটা বাজতে চলল। সকাল তো শেষ। কিছু একটা গড়বড় হয়েছে মনে হচ্ছে। ঝিনুক তৈরি হয়ে নাও। ডাক্তারবাবুর বাড়ি যাব।

    চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

    রহস্য উপন্যাসের আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

    আড়ালে আততায়ী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More