শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

আড়ালে আততায়ী: পর্ব ৩

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

দরজার একটা পাল্লা ঠেলে মুখ বাড়ালেন কম্পাউন্ডার তাপস। বললেন, আজ পেশেন্টের চাপ আছে। দেখানোর জন্য ছটফট করছে তারা।

-তুমি তো জানো আমি সময় নিয়ে পেশেন্ট দেখি। এই কেসটা বেশ ক্রিটিকাল। আরও খানিকটা টাইম লাগবে। বাইরেটা সামলানোর দায়িত্ব তোমার।

ডাক্তারবাবুর কথা শুনে নিয়ে মাথা বাইরে করে নিলেন তাপস। ফের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ডাক্তারবাবু দীপকাকুকে বললেন, আপনার অনুমান সঠিক। তাপসের সন্দেহ হয়েছে আপনারা আদৌ পেশেন্টপার্টি কিনা। নয়তো রুগি দেখাকালীন ও আমাকে এভাবে তাড়া দেয় না।

-ঠিক আছে। সায়নের ব্যাপারে বলুন। প্রসঙ্গে ফেরালেন দীপকাকু।

ডা. রায় বলতে থাকলেন, ছেলের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে দিন পাঁচেক আগে। বিজয়া দশমীর পরের দিন। আমার বন্ধু কমল পুজোর ক’টা দিন হাসপাতাল যাতায়াত করছিল ওর এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে। সেখানেই একদিন ভিজিটিং আওয়ার্সে দেখতে পায় বাবলাকে। বুদ্ধি করে সেদিন ওর সঙ্গে কথা বলতে যায়নি কমল। বাবলা সেই যে পালাত আর হসপিটালটায় যেত না। ও-ও নিশ্চয়ই কোনও পেশেন্টকে দেখতে এসেছিল ভিজিটিং আওয়ার্সে। কমল আমাকে এসে বলল, কাল চল হসপিটালে। ছেলের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার চান্স আছে।

কথা কেটে ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, কোন হসপিটাল?

-রিলাইফ। চেনো নিশ্চয়ই? বাইপাসের ধারে। বললেন ডা. রায়।

ঝিনুক বলল, ‘রিলাইফ’ কে না চেনে! বিরাট নামী হসপিটাল।

ফের শুরু করলেন ডাক্তারবাবু, তো যা বলছিলাম। কমলের সঙ্গে গেলাম হসপিটালে। সেদিন দেখা হল না। পরের দিন ভিজিটিং আওয়ার্সে আবার গেলাম। এবার দেখতে পেলাম। রিসেপশনের একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিল। আমি কাছে গিয়ে পিঠে টোকা মারলাম। ঘুরে তাকিয়েই হন্তদন্ত হয়ে পালাল। আমি, কমল দু’জনেই ছুটলাম ওর পিছনে। নাম ধরে ডাকলাম। ঘুরেও তাকাল না। রাস্তায় নেমে কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে গেল!

চুপ করে গেলেন ডা. রায়। একটু পরে ফের বলে উঠলেন, জানি ও আর আসবে না হসপিটালটায়, তবু পরের দিন গিয়েছিলাম। যদি আসে। আসেনি।

কথার শেষের দিকে গলাটা একটু ভেঙে গেল ডা.  রায়ের। দীপকাকু বললেন, ওর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যখন ব্যর্থ হলেন, ফিরে এসে রিসেপশনের মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেননি তার সঙ্গে কী কথা বলছিল সায়ন?

-সে দিন জিজ্ঞাসা করার কথা মাথায় আসেনি। পরের দিন মেয়েটিকে বাবলার চেহারার বর্ণনা দিয়ে এবং টাইমটা বলে জানতে চেয়েছিলাম কী কথা হয়েছে? মেয়েটি কিছুই মনে করতে পারল না। পারা সম্ভবও নয়। কত লোকের সঙ্গে ওদের কথা বলতে হয়! আলাদা করে কাউকে মনে রাখা মুশকিল।

ডা. রায় থামতেই দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, এবার বলুন আমাকে কী করতে হবে?

-সায়নকে খুঁজে দিতে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে আমার সঙ্গে সাক্ষাতের। ওকে যখন কলকাতায় দেখা গেছে, আছে নাগালের মধ্যেই। ভিন রাজ্যে পাড়ি দেয়নি।

ডাক্তারবাবুর এই কথায় দীপকাকু কোনও মন্তব্য করলেন না। টেবিলে হাত রেখে ক্রমপর্যায়ে চার আঙুলের টোকা দিচ্ছেন। ঝিনুক ডাক্তারবাবুর উদ্দেশে বলে, আপনি কী করে শিওর হচ্ছেন নাগালের মধ্যেই আছেন সায়ন? আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় চলে গেছে। কেটে  গেছে পাঁচটা দিন।

-বাবলা যখন নিরুদ্দেশ হল, ধরেই নিয়েছিলাম ভিন রাজ্যে চলে গেছে। বাংলাদেশ কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও যাওয়া অসম্ভব নয়। এমনিতে ও খুব চালু ছেলে। হয়তো গিয়েওছিল চলে। মাঝে এত ক’টা বছর কেটে গেছে, জানে ওকে খোঁজায় আলগা দিয়েছে পুলিশ। এখন সাহসে ভর করে ফিরে এসেছে কলকাতায় বা তার আশপাশে। সাহস পাচ্ছে বলেই প্রকাশ্যে দিনের আলোয় হসপিটালে কাউকে দেখতে যাচ্ছে। সেই পেশেন্ট নির্ঘাত বাবলার খুব কাছের লোক। ফেরার থাকা জীবনে সম্ভবত তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ধরে নেওয়া যেতে পারে পেশেন্টের বাড়ি কলকাতা থেকে খুব দূরে নয়।

ডা. রায়ের কথার মাঝে দীপকাকু বলে উঠলেন, পেশেন্টের বাড়ি অন্য রাজ্যেও হতে পারে। ‘রিলাইফ’ নামী হসপিটাল। বহুদূর, এমনকি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান থেকেও লোকে চিকিৎসার জন্য আসে। এখানে শুধু একটাই আশার ইঙ্গিত আছে, সায়ন যদি পেশেন্টকে চিকিৎসা করতে নিয়ে এসে থাকে, তা হলে কলকাতার কোনও হোটেল বা গেস্ট হাউসে উঠেছিল। ওই সূত্র ধরে ওর হদিশ পাওয়ার একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। আপনি সায়নের একটা ছবি দিন। নিরুদ্দেশ হওয়ার ঠিক আগের কোনও ফোটো।

-নিশ্চয়ই দেব। বলে টেবিলের ড্রয়ার টেনে ছবি বার করছেন ডা. রায়। তার মাঝেই দীপকাকু প্রশ্ন করলেন, লাস্ট যেদিন দেখলেন, চেহারায় তেমন কোনও বদল লক্ষ করলেন কি? দাড়ি রেখেছে অথবা মোটা-রোগা ধরনের কোনও পরিবর্তন?

-নাঃ, চেহারা একই রকম আছে। এই ফটোটার মতোই। বলে ছেলের ছবি দীপকাকুকে দিলেন ডাক্তারবাবু। দীপকাকু চোখ বুলিয়ে পাঁচ বাই সাত ইঞ্চির ফটোটা ঝিনুকের জিম্মায় রাখলেন। ঝিনুক দেখল, মোটরবাইকে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সায়ন। যথেষ্ট সুদর্শন সে, যেন কোনও সিনেমার হিরো!

দীপকাকু বলে ওঠেন, আর একটা জিনিস আমায় বলুন তো, সায়নের কোনও মুদ্রাদোষ বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বিশেষ কোনও বৈশিষ্ট্য আছে কি?

ভাবতে একটু সময় নিলেন ডাক্তারবাবু। তারপর বললেন, না, সে রকম কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। এটুকু শুধু বলতে পারি, ও খুব ফিটফাট থাকা পছন্দ করে।

-ঠিক আছে। দেখি কতটা কী করতে পারি। বলে সেকেন্ড খানেক বিরতি নিলেন দীপকাকু। ফের বলে উঠলেন, আমি এরপর থেকে আপনার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখব। পাঁচ বছর আগে সায়নের যে ক’জন ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল, তাদের নাম-ঠিকানা জোগাড় করে রাখবেন। আমার দরকার পড়তে পারে। হয়তো এখনও কোনও এক-দু’জন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে সে।

-অবশ্যই রাখব জোগাড় করে। বলে ফের ড্রয়ার টানলেন ডাক্তারবাবু। এবার বার করলেন চেকবই। দীপকাকুকে বললেন, আপনাকে কিছু অ্যাডভান্স দিয়ে রাখি?

-না, এখনই দরকার নেই। আপনি আমাকে প্রায় খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার কাজ দিয়েছেন। কতটা এগোতে পারব, একটু বুঝে নিই। তারপর অ্যাডভান্সের কথা। বলা শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন দীপকাকু। দেখাদেখি ঝিনুকও উঠল।

কথা এখনও শেষ হয়নি দীপকাকুর, যে চেয়ারে বসেছিলেন তার ব্যাক পোর্সানের উপর বাঁ হাত রেখে বলতে  থাকলেন, আপনাকে কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে রাখি। শুনে আপনি ডিসিশন নিন, কেসটা আমায় দেবেন কি না।

-কী কথা বলুন? জানতে চাইলেন ডা. রায়।

দীপকাকু বললেন, যদি আমি সায়নের খোঁজ পাই, আপনাকেও যেমন জানাব। পুলিশকে ইনফর্ম করব। সায়ন আইনের চোখে ফেরার আসামি। এটা জানা সত্ত্বেও ওর খোঁজ পাওয়ার পর পুলিশকে আমার না জানানোটা দেশের নাগরিক  হিসেবে অন্যায় করা হবে।

-না না, এতে আমার কোনও আপত্তি নেই। পুলিশকে আপনি অবশ্যই জানাবেন। কিন্তু তার আগে বাবলার সঙ্গে আমার কথা বলার ব্যবস্থাটা করে দিন। ওতেই আমার কাজ হয়ে যাবে। বললেন ডা. রায়।

দীপকাকু হাত বাড়িয়ে ওঁর সঙ্গে হ্যান্ডশেক সারলেন। তারপর ঘুরে গিয়ে এগোলেন দরজার দিকে। ঝিনুক অনুসরণ করল।

মাঝে পাঁচটা দিন কেটে গেল। ডা. অলকেশ রায়ের কেসটাতে খুব একটা এগোতে পারেননি দীপকাকু। এগোনো যে সমস্যার, এ কথা তিনি ডাক্তারবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়েই বলেছিলেন ঝিনুককে। বক্তব্য ছিল এরকম, তোমার কপাল খারাপ। এই কেসটা নিয়ে বিশেষ কিছু করতে পারব বলে মনে হয় না। ছেড়ে দিতে হবে অ্যাসাইনমেন্টটা, তোমার অ্যাসিস্ট করা হবে না। পরে আবার কবে তোমার অ্যাসিস্টযোগ্য কেস পাই দেখি!

কথাটা শুনে বেশ দমে গিয়েছিল ঝিনুক। বলেছিল, ইনভেস্টিগেশনটাকে এতটা দুরূহ মনে হচ্ছে কেন আপনার? এর চেয়েও অনেক কঠিন কেস আপনি সলভ করেছেন।

-এই কেসটা ঠিক কঠিন নয়। কাজে নামার মতো রসদ পেলাম না হাতে। এই বিপুল জনসংখ্যার শহরে সায়ন কোথায় সেধিঁয়ে আছে, কোন সূত্র ধরে খুঁজব? আর যদি শহরের বাইরে চলে গিয়ে থাকে, তা হলে তো হয়েই গেল। বলে থেমেছিলেন দীপকাকু। ঝিনুক খানিক অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, কেসটা যদি এতটাই নাগালের বাইরে মনে হয়ে থাকে আপনার, কাজটা হাতে নিলেন কেন? এখনই ডা. রায়কে ‘না’ করে দিতে পারতেন।

ফুটপাতে দাঁড়িয়ে মোবাইলে অ্যাপক্যাব বুক করতে থাকা দীপকাকু বলেছিলেন, একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার আমাকে সামান্য হলেও আশা জোগাচ্ছে।

-কী সেটা? জানতে চেয়েছিল ঝিনুক।

তক্ষুনি উত্তর দেননি দীপকাকু। ক্যাব বুক করে বলেছিলেন,

গাড়ি পেতে মিনিট দশেক। তারপর ঝিনুকের প্রশ্নের প্রসঙ্গে বলতে থাকেন, দ্যাখো, সায়ন যে যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছেলে, পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পাঁচ বছর আত্মগোপন করে থাকা থেকেই সেটা বোঝা যায়। সেই ছেলেকে দিনের আলোয় ওরকম একটা অতি পরিচিত হাসপাতালে দেখা গেল কেন? যেখানে নানান ধরনের লোকের যাতায়াত। সায়নের চেনা কোনও লোক ওকে দেখে নিতেই পারে। ঝুঁকিটা সায়ন নিল কেন? কী এমন বাধ্যবাধকতা ছিল? ওর আত্মগোপন পর্বে এটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। অর্থাৎ নিরাপত্তা বলয়ে ফাটল ধরেছে সায়নের। ওই ফাঁকটা খুঁজে পেলেই ওর কাছে পৌঁছনো যাবে সহজে। যে কোনও রহস্য সমাধানের ক্ষেত্রে কিছু আনন্যাচারল ঘটনার খুব দরকার।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

রহস্য উপন্যাসের আগের পর্ব পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

আড়ালে আততায়ী

Comments are closed.