আড়ালে আততায়ী: পর্ব ২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

প্রায় এক ঘণ্টা হতে চলল। পেশেন্ট দেখতে বড্ড সময় নিচ্ছেন ডাক্তারবাবু। এতই যদি সময় লাগবে, কেন আসতে  বললেন দশটায়? ভেবেছিলেন হয়তো বাঙালির স্বভাবদোষ অনুযায়ী দীপকাকুও লেট করবেন পৌঁছোতে। এদিকে অসুস্থতার ভান করে বসে থাকতে গিয়ে ঝিনুক এবার সত্যিকারের না অসুস্থ হয়ে পড়ে। যদিও অপেক্ষা শেষ হতে চলল। পাঁচনম্বর পেশেন্ট গেছে ভিতরে।… ভাবনা শেষ হতেই কম্পাউন্ডারবাবু হাঁক দিলেন, ইলোরা গুপ্ত!

দীপকাকুর সঙ্গে ঝিনুকও উঠে দাঁড়াল বেঞ্চ ছেড়ে। ছদ্মনামটা খারাপ দেননি দীপকাকু। শুনতে বেশ ভালই লাগল। ঝিনুকের ভাল নাম আঁখি সেন, তার চেয়েও কি নামটা সুন্দর?

সুইংডোর ঠেলে চেম্বারে ঢুকল ঝিনুকরা। ডাক্তারবাবুর বয়স পঁয়ষট্টির একটু কম বেশি। বেশ সম্ভ্রান্ত চেহারা। হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন দীপকাকুকে। যদিও কপালটা একটু কুঁচকে আছে, সেটা নির্ঘাত দীপকাকুর নিরীহ চেহারার কারণে। গোয়েন্দা হিসেবে মানতে কষ্ট হচ্ছে। প্রথমবার দেখায় এটা সকলেরই হয়। ডাক্তারবাবু বলে ওঠেন, ভেরি সরি, অনেকক্ষন বসে থাকতে হল আপনাদের। আমি ডেকে নিতেই পারতাম, তাতে সন্দেহ হত তাপসের।

কম্পাউন্ডারের নামটা জানা হল। টেবিলের এপারের চেয়ার  টেনে দীপকাকু বসলেন। ঝিনুকের দিকে হাত নির্দেশ করে ডাক্তারবাবুকে বললেন, এ হল আমার সেই অ্যাসিস্ট্যান্ট। নাম আঁখি সেন।

ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে ডা. অলকেশ রায় বললেন, সে তো বুঝতেই পারছি, বিশ্বাস করতে একটু অসুবিধে হচ্ছে। এত অল্পবয়সি অ্যাসিস্ট্যন্ট! পেশেন্ট হিসেবে মহিলার নাম লিখতে বলেছিলেন বটে, কিন্তু এ যে দেখছি স্কুল ছাত্রী।

– স্কুল না, কলেজ। ফার্স্টইয়ার। বলল ঝিনুক।

অলকেশবাবু বললেন, তাও তো সেই স্টুডেন্ট। যাই হোক বসো মা।

দীপকাকুর পাশে ফাঁকা চেয়ারটায় বসল ঝিনুক। এখন তার একটাই স্বস্তি, অসুস্থতার ভান করতে হবে না।

ডাক্তারবাবুর উদ্দেশে দীপকাকু বললেন, এবার আপনার  সমস্যাটা বলুন।

কথা শুরু করতে যাবেন ডা. অলকেশ রায়, দীপকাকু ঝিনুকের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, দরজাটা একটু ঠেলে দেখে নাও তাপসবাবু আড়ি পেতেছেন কিনা?

মুহূর্তে চেয়ার থেকে উঠে ঝিনুক চলে যায় সুইংডোরের কাছে। পাল্লা সামান্য ঠেলে দেখে, না, কেউ নেই। মাথা নেড়ে সেটা বুঝিয়ে দেয় দীপকাকুকে। ফিরে আসতে থাকে চেয়ারে। ডাক্তারবাবু অবাক গলায় দীপকাকুর কাছে জানতে চান, ব্যাপারটা কী হল? তাপস আড়ি পাতবে কেন?

– পেশেন্টদের লিস্টে আপনি নিজের হাতে ইলোরা গুপ্ত নামটা লিখেছেন দেখে তাপসবাবুর খটকা লেগেছে। জিজ্ঞেস করছিলেন আপনার সঙ্গে আমার কেমন পরিচয়? কৌতূহল মেটাতে উনি এখন আমাদের কথায় কান পাততে পারেন, তাই বললাম একবার দেখে নিতে।

দীপকাকুর বলা শেষ হতেই ডা. অলকেশ রায় বললেন, আমার মূল সমস্যা এটাই। সবচেয়ে কাছের লোকেদের কাছে নজরবন্দি হয়ে আছি। ঠিক কারা কারা নজর রাখছে ঠাহর করতে পারছি না।

– বিশদে বলুন। বললেন দীপকাকু।

ডা. অলকেশ শুরু করলেন বলতে, আমরা তিনভাই এক বোন। তিনভাই পরিবার নিয়ে এই বাড়িতেই থাকি। বোন তার শ্বশুর বাড়িতে। আমার নিজস্ব পরিবার বলতে আমি এখন একাই। স্ত্রী মারা গেছেন বছর দুয়েক হল। আমার একটিই মাত্র পুত্রসন্তান, সে পাঁচবছর হল নিরুদ্দেশ।

– কেন?  জানতে চাইলেন দীপকাকু।

– বলব। ওর কারণেই আপনাকে ডেকেছি। বলে নিয়ে ডাক্তারবাবু একটু চুপ থেকে বোধহয় কথা গুছিয়ে নিলেন, ফের শুরু করলেন, আমাদের পরিবারে বিরাট এক বিপর্যয় ঘটে গেছে আমার ছেলের কারণে। তার মোটরবাইকের ধাক্কায় মারা গেছে আমার পরের ভাইয়ের বড়ছেলে। সেই অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটানোর পর থেকে আমার ছেলে পলাতক।

– ছেলের তখন বয়স কত? জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু, ডাক্তারবাবু বললেন, পঁচিশ।

– কোথায় ঘটেছিল অ্যাক্সিডেন্ট?

– বাড়ির যে গেট দিয়ে আপনারা ঢুকলেন, সেখানেই। আমার ছেলে মোটরবাইক চেপে ঢুকছিল বাড়িতে, বেশ স্পিডেই ঢুকছিল। তখন গেট দিয়ে বেরোচ্ছে আমার ভাইপো, সাইকেলে ছিল সে। আমার ছেলের বাইকের ধাক্কায় ভাইপো ছিটকে গিয়ে পড়ে লোহার গেটে। বিচ্ছিরি ভাবে মাথায় আঘাত লাগে। ইন্টারনাল হেমারেজ হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয় তার।

– আপনাদের বাড়ির সামনের ফুটপাতে যে দোকান দুটো ঢোকার সময় দেখলাম, সেটা কি অ্যাক্সিডেন্টটার আগে থেকে আছে?

দীপকাকু হঠাৎ এই অপ্রাসিঙ্গক প্রশ্নটা কেন করলেন বুঝল না ঝিনুক। ডা. রায় কিন্তু উৎসাহিত হলেন। বলে উঠলেন, আমি তার মানে উপযুক্ত লোকের সঙ্গেই কথা বলছি। যে আপনার নাম রেফার করেছিল, কিছু ভুল করেনি। একটু থেমে ডাক্তারবাবু ফের বলতে থাকেন, আপনি ঠিকই ধরছেন, ফুটপাতের দোকান দুটোর কারণে আমাদের বাড়ির গেট আড়ালে থাকে। আমার ছেলে বাইকে চেপে আসছিল ওই দিক থেকেই। ওর দোষ একটাই, স্পিডে ঢুকছিল বাড়িতে। খুড়তুতো ভাই যে সাইকেলে চেপে গেট দিয়ে বেরোচ্ছে দেখার সুযোগ পায়নি, ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে। মানে পুরোটাই অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু আমার মেজভাই বাবলার নামে ইচ্ছাকৃত খুনের কেস করল।

– ‘বাবলা’ আপনার ছেলের ডাকনাম। ভাল নামটা কি? জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

– সায়ন রায়। আমার ভাইপোর নাম ছিল অয়ন। বড়দাদার সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখা হয়েছিল। অয়নের ডাকনাম ছিল অপু। দু’ভাইয়ের মধ্যে ভাবও ছিল খুব। কিন্তু আমার মেজভাই এবং তার স্ত্রী পুত্রশোকে বিচার বুদ্ধি হারিয়ে বসল। বলতে লাগল অপু যেহেতু লেখাপড়ায় ভালো, বাবলা হিংসে করত তাকে। সেই হিংসে থেকেই এই ইচ্ছাকৃত অ্যাক্সিডেন্ট, মানে খুন।

– অ্যাক্সিডেন্ট যখন রাস্তায় বা ফুটপাতে ঘটেছে, পুলিশ সুয়োমোটো কেস করতে পারত। সে সুযোগ বোধহয় তারা পায়নি। বললেন দীপকাকু।

উত্তরে ডা. রায় বলতে থাকলেন, এগজ্যাক্টলি। পুলিশ অকুস্থলে এসে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে বাবলার নামে কেস করতেই পারত। তাতে মামলাটা হত অনিচ্ছাকৃত খুনের। দোষী সাব্যস্ত হলে বাবলার তিন-চার বছরের বেশি জেল হত না। কিন্তু আমার মেজভাই থানায় কমপ্লেন করল ইচ্ছাকৃত খুনের। কোর্টে মামলা রুজু হল সেই অভিযোগে। এদিকে কেস লড়ার কোনও পরিস্থিতি নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তি ফেরার। পুলিশের ভাষায় অ্যাবস্কন্ডেড। হুলিয়া জা্রি হল বাবলার নামে। পুলিশ আজও ওকে খুঁজছে।

এখনও বোঝা যাচ্ছে না ডাক্তারবাবুর গোয়েন্দার প্রয়োজন পড়ল কেন? দীপকাকু জানতে চাইলেন, আপনার ছেলে, মানে সায়ন কখন নিরুদ্দেশ হল? পুলিশের কাছে ওর নামে কমপ্লেন হওয়ার পর?

– না, তার আগেই। রক্তাক্ত অপুকে আমার গাড়িতে তুলে হসপিটাল নিয়ে যাচ্ছি, সঙ্গে ছিল মেজভাই সমরেশ, মানে অপুর বাবা আর আমার ছেলে বাবলা। সমরেশ নিজের ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে দিশেহারা। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছিল বাবলার উপর। নানান কথা শোনাচ্ছিল বাবলাকে। তার মধ্যে ছিল ওই দু’টো অভিযোগ, তুই অপুকে হিংসে করতিস। এত হিংসে, যে খুন করতে গেলি! এটাকে অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালাতে দেব না। অপুর যদি কিছু হয়ে যায়। আজীবন জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ব তোকে… অপুর মাথা ছিল আমার কোলে, গাড়িতে বসেই টের পেলাম সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। হসপিটালে পৌঁছে হঠাৎ টের পাই বাবলা আশপাশে নেই। সেই যে গেল, আর ফিরল না বাড়ি।

– তারপর আর ওর কোনও খবর পাননি? জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু?

ডাক্তারবাবু বললেন, পেয়েছি। সেই কারণেই ডেকেছি আপনাকে। তার আগে কয়েকটা কথা বলে নিই। বাবলা কিন্তু জেল খাটার ভয়ে আত্মগোপন করে নেই। ও নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে তীব্র অনুতাপের কারণে। বাড়ির কাউকে নিজের মুখ দেখাতে চায় না। খুন না করুক, ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য সে-ই তো দায়ী। স্বাভাবিক ভাবে ছেলের ওই কৃতকর্মের কারণে আমি, আমার স্ত্রী ভীষণ এক অপরাধবোধ সঙ্গী করে এই পরিবারে থাকছিলাম। আমি আজও থাকি। ছেলেকে ঠিক মতো মানুষ করতে পারিনি। লেখাপড়ায় মন নেই। ইচ্ছে নেই কেরিয়ার গড়ার। মোটরবাইক নিয়ে সারাদিন টো টো কোম্পানি। গাড়িটা চালাতও অত্যন্ত জোরে, মানে হিরোগিরি। ওর মা পলাতক ছেলের চিন্তায় ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ল। কথাবার্তা কমে গিয়েছিল একেবারে। হার্টের রোগে মারা গেল।

– কিন্তু বাড়ির লোকেরা কি এখনও মনে করে সায়ন খুন করার উদ্দেশ্য নিয়ে অয়নকে বাইকের ধাক্কা মেরেছিল? অনেকদিন তো কেটে গেছে। থিতিয়েছে শোকতাপ। ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই যে কেউ বুঝতে পারবে ওটা খুন ছিল না। নেহাতই দুর্ভাগ্যজনক একটা অ্যাক্সিডেন্ট।

– মনে মনে বাড়ির লোক সেটা বুঝলেও, মুখে কখনও স্বীকার করে না। মামলাও তোলেনি। তাই পুলিশের কাছে আজও বাবলা ফেরার আসামি।

দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, কেন মুখে স্বীকার করে না?

– এর পিছনে সম্পত্তির ব্যাপার রয়েছে যে। বলে থামলেন ডা. রায়। ফের বললেন, এরা চায় বাবলা কোনও দিনই না ফিরুক। তা হলে আমার মৃত্যুর পর পুরো বাড়িটা দু’ভাইয়ের দখলে চলে যাবে। বাইরে থেকে দেখে আপনি বুঝতে পারেননি বাড়িটা কত বড়। আর এই অঞ্চলে এতটা জায়গা নিয়ে এই বাড়ির বাজারদর কী হতে পারে, তা নিশ্চয়ই আপনার আন্দাজ আছে?

– তা আছে। তবে এই সম্পত্তি তো আপনাদের তিনজনের নয় চারজনের। বোন আছে আপনার। খেয়াল করালেন দীপকাকু।

ডাক্তারবাবু বললেন, বাড়ি বিক্রি হলে তখন ভাগ দিতে হবে বোনকে। তা না হলে ভোগ দখল করে যাবে আমার দুই ভাই।

– আর আপনার টাকাকড়ি, স্ত্রীর গয়না এসবের কী ব্যবস্থা করছেন?

দীপকাকুর প্রশ্নের উত্তরে ডাক্তারবাবু বলেন, ব্যাঙ্কের লকারে আছে গয়না, টাকা অ্যাকাউন্টে। সব জায়গায় নমিনি আমার ছেলে। কিন্তু সে এ সব পাবে কী ভাবে? আমার মৃত্যুর পর এগুলো নিতে এলে, অ্যারেস্ট হবে প্রথমে। ওর হয়ে মামলাই বা লড়বে কে? আমি তো তখন নেই। আর সত্যি বলতে কী, আমি বোধহয় সত্যিই বেশিদিন নেই। দিন কুড়ি আগে হঠাৎই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। হার্ট অ্যাটাক। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। আমি চাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাবলার সঙ্গে দেখা করে ওর জীবনটা চলার মতো রসদ দিয়ে যেতে। বেচারা লঘু পাপে গুরুদণ্ড পাচ্ছে। ওর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থাটা আপনাকে করে দিতে হবে।

– বুঝলাম। এবার বলুন সায়নের সম্বন্ধে আপনার কাছে কী খবর আছে?

দীপকাকুর প্রশ্ন শেষ হতেই পিছনের দরজায় ‘ঠক ঠক’। ডা. রায় গলা তুলে বললেন, এসো!

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

রহস্য উপন্যাসের আগের পর্ব পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

আড়ালে আততায়ী

 

পড়ুন ‘দ্য ওয়াল’ পুজো ম্যাগাজিন ২০১৯–এ প্রকাশিত গল্প

প্রতিফলন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More