বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

আড়ালে আততায়ী: পর্ব ১

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

সকাল প্রায় দশটা। অ্যাপক্যাবে চেপে ঝিনুক দীপকাকুর সঙ্গে চলেছে একবালপুরে। নতুন কেস এসেছে দীপকাকুর। ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছেন। এটাই প্রথম সাক্ষাৎ। ক্লায়েন্ট একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। নাম অলকেশ রায়। উনিই দীপকাকুকে বলেছেন ভাড়াগাড়িতে আসতে। নিজের গাড়িতে নয়। দীপকাকুর নিজের গাড়ি বলতে মোটরবাইক। তদন্তের প্রয়োজনে কখনও ঝিনুকদের গাড়িটা ব্যবহার করেন। আজ দুটো গাড়িই কাজে লাগল না।

গতরাতে ডিনার সেরে ঝিনুক যখন শুতে যাবে, দীপকাকুর ফোন এল ওর মোবাইলে। জিজ্ঞেস করেছিলেন, কাল সকালে ফ্রি আছ?

কেসে অ্যাসিস্ট করার গন্ধ পেয়েছিল ঝিনুক। বলেছিল, হ্যাঁ, একদম ফ্রি। এখন তো পুজোর ছুটি চলছে কলেজে। খুলবে সেই ভাইফোঁটার পর।

–ওকে। তা হলে বউদিকে বলে দাও ব্রেকফাস্ট তোমাদের বাড়িতে সারব। তারপর তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব ক্লায়েন্টের বাড়ি। দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে যেতে হবে সেখানে। ছাড়ছি। গুড নাইট।

দীপকাকু ফোন কাটতেই ঝিনুক শূন্যে ডান হাতটা এমন ভাবে ঝাঁকিয়ে ছিল, যেন স্কোর করল কোনও খেলায়। সব কেসে তো দীপকাকু তাকে অ্যাসিস্ট করার জন্য ডাকেন না। মাকে গিয়ে দীপকাকুর আসার খবরটা জানিয়েছিল ঝিনুক। ব্রেকফাস্টে কী বানানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে বসে গেলেন মা। দীপকাকু মায়ের রান্নার মস্ত বড় ফ্যান। তার উপর পুজোর পর দীপকাকু প্রথম আসছেন। এটা বিজয়ার খাওয়া।

বাইক চালিয়ে সকাল আটটা নাগাদ দীপকাকু এলেন। বিজয়ার প্রণাম, কোলাকুলি সারা হল। দাবার বোর্ড সাজিয়ে রেখেছিলেন বাবা। দীপকাকু খেলায় বসতে আগ্রহ দেখালেন না। এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হিসেবে বলেছিলেন, একমাত্র রোববার দাবায় আমার মাথা ভালো কাজ করে। আজ খেলতে বসলে হেরে ভূত হয়ে যাব।

সাধারণত রবিববারই দীপকাকু বাবার সঙ্গে আড্ডা মারতে আসেন। দাবা খেলেন। আজ না খেলার কারণ, হাতে সময় কম। অ্যাপয়ন্টমেন্ট আছে ক্লায়েন্টের সঙ্গে। এদিকে মায়ের হাতের জলখাবারটাও তারিয়ে তারিয়ে সারতে চান। মা পিৎজা খাওয়ালেন গরম গরম। আর কাস্টার্ড বানিয়ে রেখেছিলেন কাল রাতেই। খাওয়া চলাকালীন বাবা দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করলেন, এবারের কেসটা কী নিয়ে?

খাবার মুখে থাকা অবস্থায় দীপকাকু বলেছিলেন, এখনও জানি না। ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা করে জানতে পারব।… এরপর ক্লায়েন্টের পরিচয় এবং ঠিকানা বললেন। বাবা একটু অবাক হয়ে বলেন, তোমার এজেন্সির অফিসে না এসে, কেসের ব্যাপারে কিছু না জানিয়ে, ভদ্রলোক তোমাকে ডেকে পাঠালেন, আর তুমি রাজি হয়ে গেলে দেখা করতে! এত অ্যাভেলেবল হওয়া তোমার পক্ষে উচিত নয়। তুমি এখন একজন প্রতিষ্ঠিত গোয়েন্দা। দীপঙ্কর বাগচী নামটা যথেষ্টই পরিচিত। অনেকেই জানে।

–ভদ্রলোকের ডেকে পাঠানোর ধরনটাতে রাজি হয়েছি। বলেছিলেন দীপকাকু।

ঝিনুক জানতে চেয়েছিল, ধরনটা কীরকম ছিল?

খেতে খেতে উত্তর দিলেন দীপকাকু। বলেছিলেন, ফোন করে ভদ্রলোক প্রথমে নিজের নাম, পেশা জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি গোয়েন্দার শরণাপন্ন হচ্ছেন, এটা কাউকে জানতে দিতে চান না! ওঁর গাড়িতে আমার অফিসে এলে ড্রাইভার সাক্ষী থেকে যাবে। বাসে বা ট্যাক্সিতেও আসতে ভরসা পাচ্ছেন না। পাছে কেউ ফলো করে জেনে নেয় কোথায় যাচ্ছেন। এমনকি আমাকেও বারণ করলেন নিজের গাড়িতে ওঁর বাড়ি যেতে। কারণ, গাড়ির নাম্বারের সূত্র ধরে আমার পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাবে। ওঁকে এত সাবধানতা নিতে দেখেই আমার আগ্রহ বাড়ল। মনে হল কেসটায় মেটেরিয়াল থাকবে। ভাবলাম, যাই, দেখা করি। তা ছাড়া অসুস্থ অশক্ত ক্লায়েন্ট হলেও আমি দেখা করতে যাই। নিজের পজিশন, পরিচিতি নিয়ে ভাবি না।

এরপর বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমরা কী পরিচয় নিয়ে ওঁর বাড়িতে যাবে?

–উনি যেহেতু ডাক্তার, রুগির পরিচয় নিয়ে যেতে বলেছেন। চেম্বারটা ওঁর বাড়ির একতলায়। বলার পর একটু থেমে দীপকাকু ফের বলে উঠেছিলেন, আমি বলে নিয়েছি আমার সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকবে। সে হবে পেশেন্ট, আমি তার গার্ডিয়ান।

ব্যবস্থাটা পছন্দ হয়নি ঝিনুকের। মুখে সেটা প্রকাশ করার ঝুঁকি নেয়নি। অ্যাসিস্ট করার সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। ঝিনুক বাধ্য ছাত্রীর মতো জানতে চেয়েছিল, পেশেন্ট সাজার জন্য বিশেষ কোনও ড্রেস পরতে হবে কি?

–না না, আলাদা কোনও ড্রেস লাগবে না। চেহারায় একটা ঝিমানো ভাব যেন থাকে। বলেছিলেন দীপকাকু। বাবা তখন বললেন, পেশেন্ট তুমিই সাজতে পারতে। ওই ভাবটা তোমার চেহারায় অটোমেটিক্যালি থাকে যখন ভাবনাচিন্তার জগতে থাকো। ফিজিকাল মুভমেন্টের সময় তোমার অবশ্য উল্টো রূপ! ঝিনুক কতটা অসুস্থতার অ্যাক্টিং করতে পারবে, তা নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে। যা ছটফটে মেয়ে!

দীপকাকু বলেছিলেন এখন আর কিছু করার নেই। করতেই হবে অ্যাক্টিং। অ্যাসিস্ট্যান্ট পেশেন্ট হবে বলা হয়ে গিয়েছে ওঁকে।

অ্যাপক্যাবের পিছনের সিটে দীপকাকুর পাশে বসে ঝিনুক শরীরে ঝিমানো ভাবটা আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে ভাবে আসছে কই! গাড়িতে এসি চললেও, জানলার কাচের ওপারে শরতের উজ্জ্বল রোদ। পুজোর প্যান্ডেলগুলো এখনও  সব খোলা হয়নি। রয়ে গেছে বাঁশের খাঁচা, বিজ্ঞাপনের বড় বড় হোর্ডিং আশপাশে দিব্যি উৎসবের আমেজ। এসবের মাঝে শরীর খারাপের কথা ভাবতে কারুর ভালো লাগে!

কিছুক্ষণ হল দীপকাকু বাঁ দিকের জানলার বাইরে তাকিয়ে আছেন। এখন ড্রাইভারের উদ্দেশে বলে উঠলেন, এবার একটু স্লো চালান তো ভাই। ফুটপাত ঘেঁষে চালাবেন।

গাড়ির স্পিড কমল। ঝিনুকরা তার মানে পৌঁছে গেছে মনে হচ্ছে। একটু পরেই দীপকাকু বললেন, ব্যস, দাঁড় করান গাড়ি।

ড্রাইভার নির্দেশ পালন করল। গাড়িতে বসেই ভাড়া মেটালেন দীপকাকু। নেমে এসে বাঁ দিকে তাকিয়ে বললেন, এই বাড়িটাই মনে হচ্ছে।

ঝিনুক কোনও বাড়ি দেখতে পাচ্ছে না। ফুটপাতের উপর দু’টো দোকানের প্লাস্টিক ঢাকা ব্যাক পোর্সান। এর পিছনেই নিশ্চয়ই বাড়ি। দীপকাকু প্রথমবার এখানে এলেন, ডাক্তারবাবুর দেওয়া পথনির্দেশ অনুযায়ী ঠিক আন্দাজ করে  নিলেন বাড়িটা!

ফুট দশেক হাঁটতেই দেখা গেল বাড়ির বিশাল গেট। লোহার, জাফরি ডিজাইন। এবার পুরো বাড়িটা চোখের সামনে। বয়স দু’শো তো হবেই। বাড়ির আর্কিটেকচার অন্তত  তেমনটাই বলছে। গেট আধখোলা, ঢুকে পড়লেন দীপকাকু। সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ঝিনুককে বললেন, এখানে তোমার নাম ইলোরা গুপ্ত। পেশেন্ট দেখার লিস্টে এই নামটাই দেওয়া আছে। আমি তোমার নিজের কাকা। এই পরিচয়ে আমরা আসছি বলা আছে ডাক্তারবাবুকে। আমি তোমার বাবার বন্ধু, সেই পরিচয় এখানে চলবে না।

বুঝে নিয়ে ঘাড় কাত করে ঝিনুক। দীপকাকু বাবার বন্ধু হতে পারেন, বয়সে বাবার থেকে অনেকটাই ছোট। ঝিনুককে একবার জরিপ করে নিয়ে দীপকাকু ফের বলেন, তোমাকে দেখে মোটেই অসুস্থ মনে হচ্ছে না। চোখে  ক্লান্তি ভাব আনো আর বডি মুভমেন্ট স্লো করে দাও। ওতেই কাজ হয়ে যাবে। অসুস্থতার অভিনয় এত সোজা আগে বোঝেনি ঝিনুক। চোখ ঢুলু ঢুলু করে নিয়ে ধীর পদক্ষেপে অনুসরণ করল দীপকাকুকে। সদর দরজার পাশের দেওয়ালে ডাক্তারবাবুর নেমপ্লেট। কাঠের বোর্ডে বড় বড় করে লেখা, ডাঃ অলকেশ রায়, ডি.এম.এস(ক্যাল)।

ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে যায় ঝিনুক, এত ভিড়! দেওয়াল ঘেঁষা বেঞ্চে পর পর লোক বসে। নারী-পুরুষ-বাচ্চা… চেহারা দেখে আন্দাজ করা যায় নানান বিত্তের মানুষ এরা। বড়লোক, গরিব, মধ্যবিত্ত মিলিয়ে মিশিয়ে। ঝিনুকদের মুখোমুখি একটা বন্ধ দরজা, ওটাই সম্ভবত ডাক্তারবাবুর বসার জায়গা। দরজার পাশে চেয়ার-টেবিলে বছর পঁয়ত্রিশ, মানে দীপকাকুর কাছাকাছি বয়সি একটা লোক বসে। দীপকাকুর উদ্দেশে উনি বললেন, নাম লেখা আছে। নাকি লেখাবেন?

–লেখা আছে। ইলোরা গুপ্ত। বললেন দীপকাকু।

ডাক্তারবাবুর সহকারী খাতা দেখে বললেন, হ্যাঁ, ছ’নম্বরে নাম। বসুন। তিন নম্বর সবে গেছে।

কম্পাউন্ডারবাবুর টেবিল লাগোয়া বেঞ্চের কিছুটা ফাঁকা ছিল। ঝিনুকরা সেখানে গিয়ে বসল। ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা করার মতো বোরিং ব্যাপার খুব কমই আছে। দীপকাকুর মতো উঁচুদরের ডিটেকটিভকেও বসে থাকতে হচ্ছে এরকম নিষ্ক্রিয় ভাবে! কেসের স্বার্থেই বসে আছেন, অথচ জানেন না কী বিষয়ে তদন্ত করতে হবে। কেস হাতে না নিয়েই নেমে পড়েছেন কাজে। এমন হতেই পারে, কেসটা পছন্দ হল না দীপকাকুর। তিনি তদন্তে নামলেন না। তখন এই অপেক্ষাটা জলে যাবে।

তিন নম্বরের পেশেন্টপার্টি বেরিয়ে এল চেম্বার থেকে। চার নম্বরের নাম ডেকে কম্পাউন্ডারবাবু দীপকাকুর দিকে ঘাড়  ঘোরালেন। বললেন, আপনার পেশেন্টের নাম ডাক্তারবাবু তো নিজে খাতায় লিখেছেন। ফোন করেছিলেন? ডাক্তারবাবুর সঙ্গে পরিচয় আছে আপনার?

–না আমার সঙ্গে নেই। আমার এক রিলেটিভ ডাক্তারবাবুর খুব চেনা। সে ফোন করে নামটা লিখিয়েছে। অবলীলায় মিথ্যে বলে গেলেন দীপকাকু। অবিশ্বাস করার কিছু নেই। কম্পাউন্ডার মুখ ফিরিয়ে নিলেন। ভদ্রলোকের এই বাড়তি কৌতূহলটা ঝিনুকের তেমন সুবিধের ঠেকল না। ডাক্তারবাবুর গতিবিধির উপর খানিকটা নজরদারি করা হল যেন। তা হলে কি ডাক্তারবাবু এই ধরনের লোকগুলোকে নিয়েই সতর্ক রয়েছেন, যারা তাঁর আশপাশে থাকে। লক্ষ রাখছে ডাক্তারবাবু কোনও গোয়েন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কি না? যে কারণে ডাক্তারবাবু নিজে দীপকাকুর অফিসে যেতে পারেননি। ঝিনুকদের এখানে আসতে হয়েছে অ্যাপক্যাব ভাড়া করে। এখন যেটা জানার, ডাক্তারবাবুর গোয়েন্দার দরকার পড়ছে কেন? এবং দরকারটা আশপাশের লোকের কাছে কেন গোপন রাখতে চাইছেন?

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                       পরের পর্ব আগামী শুক্রবার

Comments are closed.