শুক্রবার, নভেম্বর ২২
TheWall
TheWall

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২৮

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ শেষ পর্ব – ২৮

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৭  

রোজ যেমন আসেন আজও তেমনই সকাল দশটাতেই চলে এসেছিলেন সর্বাণী মিত্র। তবে হোম-মাদারদের ডাকেননি।

উর্মিলা বলল, ‘কী হল বল তো? কাল রাতে বললেন আমাদের সঙ্গে কথা আছে, অথচ ডাকছেন না কেন?’

পরমা বলল, ‘সকালের ব্যাপার নিয়ে নিশ্চয়ই নবনীতাদির কাছে সর্বাণীদির ফোন গিয়েছিল। তারপর কিছু ঘটেছে মনে হয়। বলবেন ঠিকই, সময় নিচ্ছেন।’

বেলা বারোটায় অফিসঘরে ডাক পড়ল হোম-মাদারদের। বাকি সবাই রয়েছে সেখানে। এমনকী মঞ্জরীকেও দেখতে পেল পরমা। গোটা ঘরেই কেমন দমচাপা ভাব।

‘ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তুমি কথা বলতে গেলে কেন?’ পরমাকে ধরেই শুরু করলেন সর্বাণী মিত্র।

পরমা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল আজ আবার বিঁধবে অনেক কথা। বিঁধুক, জবাব দিতে হলে দেবে সে। বলল, ‘উনি যখন এসেছিলেন তখন সামনে আমিই ছিলাম। উর্মিলাদি বাকিদের ডাকতে বড়বাড়িতে গেছিল। একটু পরে সবাই আসে।’

‘মেয়েরা ভালো করে খেতে পায় না, জামাকাপড় পায় না— এসব বলেছ তুমি?’

‘না। উনিই বলেছিলেন। উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাইনি।’

এই সময় শম্ভুনাথ শব্দ করে উঠলেন। ‘হুঃ! তার মানে সুযোগ পেলে ও তাই বলত।’

পরমা সোজা তাকাল শম্ভুনাথের দিকে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। সর্বাণী মিত্র বললেন, ‘হোমে গার্ড কম, নিরাপত্তার অভাব। এসব কেন বলেছ?’

এবার পরমা পালটা প্রশ্ন করে বসল। ‘এটা আমাকে বলছেন কেন? উনিই জানতে চেয়েছিলেন সকালে আর রাতে ক’জন গার্ড থাকে, চারপাশে এত অন্ধকার কেন, কুকুর ছাড়া থাকে কিনা, শংকরদা কে— এইসব।’

‘এত কথার উত্তর দিতে গেলে কেন তুমি? অন্য মাদাররাও তো ছিল। কই তারা তো কিছু বলেনি।’

‘উনি জিজ্ঞেস করছেন, আমি কি চুপ করে থাকতাম? অন্য কারও কাছে জানতে চাইলে তাকেও তো একই কথা বলতে হত।’ কথাটা বলতে বলতে পরমা দেখতে পেল বাকি চারজন হোম-মাদার মুখ নামিয়ে বসে।

‘তুমি কী এমন বললে যে তাতে একেবারে পুলিশ ফোর্স ডেকে আনতে হল!’

গলা শুনে বোঝা গেল রেগে উঠেছেন সর্বাণী। একটা একটা করে তির আসছে পরমার দিকে। অকারণে। পরোয়া করল না সে। বলল, ‘এটা আমার জানার কথা নয়। থানায় ফোনটা উনিই করেছিলেন।’

মুখচোখ লাল হয়ে গেল হোম-ইনচার্জের। কথাই বলতে পারছিলেন না। পরমা খেয়াল করল, অনু আর রিনি তাদের দুটো কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিন্তু কি-বোর্ডের ওপর হাত চলছে না। কোথাও কোনও আওয়াজ নেই।

শব্দটা হল সর্বাণী টেবিলের ওপরে হাত রাখায়। ‘মেয়েদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে উনি কী বলছিলেন?’

‘কেন পালিয়েছে জানতে চাইছিলেন।’

অর্পিতা মুখ তুলে নিচু গলায় বলল, ‘আমরা কিছু বলিনি দিদি।’

সর্বাণী ঝট করে তাকলেন তার দিকে। ‘তোমার কাছে যখন কিছু জানতে চাইব তখন তুমি উত্তর দেবে অর্পিতা। এখন নয়।’

মুখ নামিয়ে নিল অর্পিতা। শম্ভুনাথ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘তুমি বলেছ ভাউচারে যা মাইনে লেখা থাকে সে টাকা তোমরা পাও না?’

‘উনি প্র‌শ্ন করেছিলেন। আমি তার উত্তর দিয়েছি।’

‘তুমি তো এও বলেছ, রাতে আমি থাকি না।’ শুক্লা হালদারের মুখেও আজ অভিযোগের তেতো ভাব। টের পেল পরমা।

‘উনি মাদার-ইনচার্জের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন শুক্লাদি। আপনি তো থাকেন না। আমি যদি হ্যাঁ বলতাম আর উনি আপনাকে ডাকতে বলতেন তখন আমার কথা মিথ্যে বলে প্র‌মাণ হত না? সেটাই কি করা উচিত ছিল আমার?’

কৃষ্ণা বললেন, ‘দিদি যে এখানে থাকে না সেটা তুমি না বললেই পারতে পরমা। যাহোক তাহোক কিছু একটা বলে দিতে। বলতে শরীরটা খারাপ তাই আজ একটু বাড়ি গেছেন উনি।’

শুক্লা হালদারের চোখে অস্বস্তি। চশমা ঢিলে হয়ে নেমে এসেছে। তুলতে ভুলে গিয়েছেন তিনি।

এবার মৈনাক মুখ খুললেন। ‘যে মেয়ে কাজে ঢুকেই অন্য মাদারদের নামে আপনার কাছে বলতে এসেছিল তাকে আমাদের আগেই বুঝে নেওয়া উচিত ছিল দিদি।’

টেবিল চাপড়ে রাগে ফেটে পড়লেন শম্ভুনাথ। ‘প্র‌থম থেকেই আমি বলছি, এ মেয়ে সুবিধের নয়। যেখানে যা বলার নয় তাই বলে দেয়, যখন যা করার নয় তাই করে।’ কথার ফাঁকে ফাঁকে থুতু ছিটকে বেরিয়ে আসছিল শম্ভুনাথের মুখ থেকে। ‘একে সামলানো মুশকিল আছে দিদি। দেখুন কী করবেন। এর বেশি আর কিছু বলতে চাই না।’ ডান হাতটা ওপরে তুলে নাড়ালেন একবার।

এই সময় ঈশিতা বললেন, ‘দেখুন কতগুলো ব্যাপার যে সিরিয়াস তা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু শুধু একজনকে নিয়ে কথা বললেই কি তার সমাধান হয়ে যাবে? তাছাড়া মেয়েদের কাজে তো কখনও অবহেলা করতে দেখিনি ওকে। সেদিকটা কি দেখার দরকার নেই?’

আর কিছু বলতে চাই না বলেও থামতে পারছেন না শম্ভুনাথ। কথাটাকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘সে তো বাকি হোম-মাদাররাও করে। তাদের নিয়ে আজ অবধি মিটিং বসাতে হয়েছে কি? এরপর কিন্তু পলিটিক্স শুরু হবে। অন্যরাও মুখের ওপর কথা বলার সাহস পাবে। একজনের জন্যে বদনাম হয়ে যাবে আমাদের হোমের।’

সর্বাণী তাকালেন মঞ্জরীর দিকে। ‘ও তোমার লোক, কিছু বলতে চাও তুমি?’

এতক্ষণ ঘাড় ঝুঁকিয়ে বসে ছিলেন মঞ্জরী। তাকে দেখে পরমার মনে হচ্ছিল মিটিংটা যেন তার অপরাধের বিচার করতেই বসেছে। তবে এবার তিনি নড়েচড়ে উঠলেন। ‘আমি কী বলব দিদি? এখানে আমার লোকের কোনও ব্যাপার নেই। প্র‌থম দিনই সে কথা জানিয়ে দিয়েছিলাম ওকে। এখন অথরিটি যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই।’

এরপরেও কথা হয়ে চলেছিল কিন্তু শোনায় আর মন ছিল না পরমার। অন্য একটা কিছু তার চোখ টানছিল। খোলা জানলা দিয়ে একটা ফড়িং ঢুকল। উড়ছে ঘুরে ঘুরে। বড় টেবিলের এক কোনায় বসল। আবার উড়ে গেল আলমারির মাথায়। সেখান থেকে দেওয়ালে। সেখানে হোমরাচোমরা একটা টিকটিকি। এগোচ্ছে। ফড়িংটা শান্তভাবে বসে। থিরথির করে কাঁপছে স্বচ্ছ ডানাদুটো। অন্য দিক থেকে আর একটা টিকটিকি আসতেই আগেরটা ঘুরে গেল অন্য মুখে। একটা টিকটিকি এগিয়ে গেলেই অন্যটা তাকে ধাওয়া করছে। কে খাবে ফড়িংটাকে। হল না। তাদের লড়াইয়ের মাঝখান থেকে ফড়িংটা উড়ে বেরিয়ে গেল সেই জানলা দিয়ে।

‘ভুল যে তোমার হয়েছে সেটা স্বীকার করবে কি?’ সর্বাণীদির কথায় আবার মনটাকে টেনে আনল পরমা। নানা ভঙ্গিমার কতগুলো চোখ তার ওপর স্থির হয়ে রয়েছে।

‘ভুল! এখানে আমার কোনও ভুল আমি দেখছি না সর্বাণীদি। তাই স্বীকার করতে পারছি না।’ পরমার কথায় সবাই বোধহয় জমে যেতে শুরু করেছে। নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাদের।

তার মধ্যে শম্ভুনাথ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলেন। ‘দেখলেন তো? এ শোধরাবার নয়। একে রাখা মানে হোমের ডিসিপ্লিন নষ্ট করা।’

সর্বাণী হাত তুলেছেন। চুপ করে গেলেন শম্ভুনাথ। চোয়াল শক্ত করে হোম-ইনচার্জ বললেন, ‘শোনো পরমা। এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর নবনীতা দত্ত আমায় বলেছিলেন কোনও কথা না শুনে তোমায় ইমিডিয়েটলি স্যাক করতে। আমি তোমায় তবু সুযোগ দিয়েছিলাম। তাতে যে কিছু হল না সে তো দেখতেই পেলাম। আমরা তোমাকে আর রাখতে পারব না। আজকের পর থেকে এখানে তোমার চাকরি আর থাকছে না। আর কালই তোমায় হোম ছেড়ে চলে যেতে হবে।’

ঘরের সবাই কিছুক্ষণ চুপ। তারপর সর্বাণী হোম-মাদারদের দিকে তাকালেন। ‘তোমরা কাজে যাও। পরমা, তুমিও যাও এখন।’

অফিস থেকে বেরিয়ে এল তারা। যদিও কেউই কোনও বাড়ির কাজে গেল না। অর্পিতা এসে পরমার পাশে দাঁড়াল। হাতদুটো সেই পিছনে। পরমার দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বলল, ‘আমি ঠিক বুঝতেই পারলাম না তোর দোষটা কোথায়!’

হাসল পরমা। অনেক কিছুতেই দোষ থাকে না তার। তবু লড়াই জারি থাকে। সেই ছোটবেলা থেকে চলছে।

জুলেখা চলে যাওয়ার পর আয়েষার সঙ্গে এখন নন্দিনী নামের মেয়েটা ছোটবাড়ির মনিটর। তারা দু’জন আর বড়বাড়ির তিন মনিটর কবিতা, সোনালি ও দোলা খানিক দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। এখন এগিয়ে এল। ‘কী হয়েছে নতুন আন্টি? মিটিংয়ে সবাই তোমাকে বকছিল কেন?’

পরমার হঠাৎ মনে হল, এই নতুন আন্টি নামটা রয়েই গেল তার। পুরনো হওয়ার আগেই এখান থেকে চলে যেতে পারবে সে। বলল, ‘তোরা কোত্থেকে শুনলি?’

কবিতা বলল, ‘ভেতরে যখন চেঁচামেচি হচ্ছিল, আমরা দরজার বাইরে ছিলাম। সবটা শুনতে পাইনি কিন্তু অনেকটা শুনেছি। সেদিন রাতে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আমাদের কথা বলতে দিলে না কেন? আমরাই সব সত্যি বলে দিতাম, তাহলে তোমার আর দোষ হত না। সর্বাণী আন্টি আমাদের তো কিছু বলতে পারত না।’

‘লুকিয়ে কারও কথা শুনতে নেই, জানিস না তোরা?’ পরমার এই কথায় মেয়েগুলোর মুখ যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

বসে যাওয়া গলায় আয়েষা বলল, ‘লুকিয়ে শুনিনি আন্টি। জোরে ঝগড়া হচ্ছিল তাই দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম।’

‘অফিসের ব্যাপারে তোদের থাকতে হবে না। ঘরে যা সব।’

পরমার কাছে বকা খেয়ে গুটিগুটি পায়ে ফিরে যাচ্ছিল চারজন। উর্মিলা বলল, ‘ওরা তোকে ভালোবাসে। তাই তোর হয়ে বলতে এসেছিল। না বকলেই পারতিস।’

‘মেয়েদের এসবে না থাকাই ভালো উর্মিলাদি। ওদের ওপরে দোষ পড়লে কে বলবে তখন?’

প্রীতি একদম গুম হয়ে ছিল। বলল, ‘আমরাও তো ওখানে কিছু বলতে পারিনি তোর হয়ে।’

সঞ্চিতাও এতক্ষণ পরে বলল, ‘কীরকম ভিতুর মতো বসে ছিলাম।’

পরমা আরও একবার হাসল ওদের দিকে তাকিয়ে। ‘এরকম ভেবো না কিন্তু তোমরা। খারাপ লাগবে আমার।’

সব কথা যেন ফুরিয়ে গিয়েছে এভাবে ওরা চলে যাচ্ছিল। পরমাকে কোনও কাজে আর ডাকা যাবে না এরপর।

পরমা নিজেও ভাবছিল কোন দিকে যাবে। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য একা থাকতে হবে তাকে। হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরের পিছন দিকটায় চলে যেতে চাইছিল সে। গাছের নীচে গিয়ে বসবে একটু। তবে সেখানে পৌঁছনোর আগেই তার কাছে পৌঁছে গেল দু’জন। তাদের দেখে অবাক হয়ে গেল পরমা। অনু আর রিনি এখানে? এই মেয়েদুটো এমনিতেই খুব কম কথা বলে। কাজের প্রয়োজনে এর আগে পরমার সঙ্গে কথা হয়েছে। কিন্তু আজ তো সেরকম কিছু থাকার কথা নয়।

অনু পরমার চোখ দেখে বুঝতে পারল বোধহয়। বলল, ‘তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা তো জানি না। তাই কয়েকটা কথা বলতে চলে এলাম। আমরা এখানকার খাই-পরি, এদের বিরুদ্ধে কিছু বলার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে যা বোঝার আমরা ঠিকই বুঝেছি।’

রিনি বলল, ‘সর্বাণীদি আসার সময় থেকেই আমরা অফিসঘরে ছিলাম। তারপর এক এক করে সবাই এল। সব শুনেছি। আসলে ওরা খুব চাপে পড়ে গিয়েছে। অনেকদিন আগে একবার একজন অবজার্ভার এসেছিলেন। ওরা ভেবেছিল সেটা ম্যানেজ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কাল রাতের ওই সারপ্রাইজ ইন্সপেকশনের পর আজ সকালে গভর্মেন্ট লেভেল থেকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে নবনীতাদিকে। ডিস্ট্রিক্ট সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অফিসার ফোন করেছিলেন সর্বাণীদিকেও। অনিয়ম-বেনিয়ম সব উঠেছে। তাই নিয়েই রাগ। অন্য কোথায় আর সেই রাগ দেখাবেন! কোপ এসে পড়েছে তোমার ওপর। তবে যতই যাই করুন, হোম চালাতে গেলে এখন অনেক খারাপ কিছুই বদলাতে হবে ওদের।’

পরমা বলল, ‘আমার কথা আমি ভাবি না। এখানে খারাপ যেমন দেখলাম তেমন ভালটাও দেখেছি। ভাল আরও বেশি হলে ভাল।’

‘তুমি থাকলেও তো ভাল হত।’

‘না, আমি তো আর থাকতে পারব না রিনি।’

ওরা চলে যাওয়ার পর বড় একটা শ্বাস বেরিয়ে এল পরমার বুক থেকে। কাল এখান থেকে বেরিয়ে সে যাবে কোথায়? কিছু তো নেই সামনে। তারপর মনে হল, অনিন্দ্যদাকে ফোন করবে কি? সুতপা বউদিকে কি জানাবে এসব? শুনলেই তো ছটফট করে উঠবে দু’জনে। তার নিজের জন্যে আর কত চিন্তা চাপাবে ওদের ওপর!

চারপাশে অনেকখানি জায়গা জুড়ে রোদের আঁচ। সে দাঁড়িয়ে রয়েছে গাছের ছায়ায়। রোদ তো বেশিই হয়। ছায়া সবসময়েই অল্প।

জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ছোটবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল পরমা। যেমন এসেছিল তেমন ছোট একটা ব্যাগেই সব ধরে গিয়েছে। তবে আসলে সে যা নিয়ে যাচ্ছে তা কেউ দেখতে পাচ্ছে না। সেসব রয়েছে তার বুকের ভেতরে।

কাল রাতে মেয়েরা তাকে ঘিরে ধরেছিল। ‘যেয়ো না আন্টি, আমাদের ছেড়ে যেয়ো না।’

তাদের বোঝানোর মতো করে পরমা বলেছিল, ‘তা আর হয় না রে। আমাকে যেতে বলে দেওয়া হয়েছে।’

নতুন মনিটর নন্দিনী চেপে ধরল পরমার হাত। ‘আমরা যদি গিয়ে বলি সর্বাণী আন্টিকে?’

‘ওরা শুনবে না। আর তোরাও এর মধ্যে থাকিস না।’

আয়েষা বলে উঠল। ‘তুমি তো আমাদের জন্যেই আছ। আমরা তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে চাই বলেই বলব। শুনবে না কেন?’

শান্ত একটুখানি হাসি ধরে রেখেছে পরমা। ‘ওই যে বললি ভালবাসি, ওতেই তো সব হয়ে গেল।’

ওদের কথা থেমে গিয়েছিল। বাকিটুকু চোখের জলের ভাষা।

দশটা বেজেও অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অফিস চলছে তার নিয়মেই। ওষুধপত্রের স্টক শুক্লা হালদারকে বুঝিয়ে এসেছে পরমা। সঙ্গে অন্য কাজের কথাও বলেছে যতটুকু বলার। তখনই বড়বাড়ির মেয়েদের সঙ্গেও দেখা করতে গিয়েছিল।

তিনতলায় উঠতেই মিতালি বলল, ‘তুমি না থাকলে কে আমাদের ওষুধ দেবে আন্টি?’

সেই হাসিটাই এখানেও ফিরিয়ে আনল পরমা আবার। ‘নতুন আসবে কেউ। সে দেবে। সময়মতো খেয়ে নিস কিন্তু।’

কল্পনা নেমে এল বাঙ্ক থেকে। ‘আমার গান পুরা শুনলে না আন্টি! সব মনে এসে গেছে। ওই রেশম ফিরিরি—। শুনবে না তুমি?’

এই কথাটার কোনও উত্তর দিতে পারল না পরমা। শোনার মতো কত গান যে বাকি থেকে যায়! তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল সে।

দোতলায় যেতেই সবাই বাঙ্ক থেকে নেমে এসে দাঁড়াল। মুনিয়া, লাভলি, নাজমা, পিঙ্কি, হেনা, সোফিয়া, গোলাপ— কত কত মুখ সব।

শাকিলা বলল, ‘চলে যাচ্ছ আন্টি? আমাদের জন্যে কষ্ট হবে না তোমার?’

কী উত্তর দিত পরমা? কষ্ট তো এখনই জড়িয়ে ধরছে তাকে।

জুহি বলল, ‘হামসবকো ইয়াদ রহেগি না আন্টি?’

তার গালে-মাথায় হাত বুলিয়ে পরমা বলেছিল, ‘হ্যাঁ রে, মনে থাকবে, সারাজীবন।’

অনেকের চোখই ভিজে উঠেছে। কেউ কেউ এসে জড়িয়ে ধরেছিল পরমাকে।

রান্নাঘরে একবার গেল পরমা। তাকে দেখেই দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সবিতামাসি। পরমা বলল, ‘ভালো থেকো মাসি। মেয়েদের ভালো ভালো রান্না করে দিয়ো।’

মাসি দরজা ছেড়ে এগিয়ে এল। আজ সে বলল, ‘তুমিও ভালো থেকো মা। সুখে থেকো।’

পরমা আর দাঁড়াতে পারছিল না। চলে এল ছোটবাড়িতে। সেখান থেকে ব্যাগ নিয়ে বাইরে। এবার বেরোতে হবে। দেখতে পেল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্য হোম-মাদাররা। তাদের মুখ শুকনো, অগোছালো।

সঞ্চিতা বলল, ‘ভেবেছিলাম এখান থেকে আমি আগে বেরোব। কিন্তু—।’

‘তুমি যেদিন বেরোবে সেদিন তোমার অনেক আনন্দ থাকবে সঞ্চিতা।’

‘আমাদের বিয়েতে ডাকলে আসবে তো?’

‘কোথায় থাকব জানি না তো। যদি পারি, আসব।’

প্র‌ীতি বলল, ‘আমাদের ভাব করিয়ে দেওয়ার লোক চলে যাচ্ছে। কী হবে এরপর? তুই যখন এসেছিলি, আমরা সব কেমন যেন ছিলাম। আর এখন কত কিছু বদলে গেছে।’

হাসল পরমা। ‘আর ঝগড়া কোরো না। তাহলে ভাব করানোর লোকই লাগবে না।’

উর্মিলার গলায় প্র‌শ্ন। ‘এখান থেকে বেরিয়ে কী করবি?’

‘দেখি। কিছু না কিছু তো করতেই হবে। ঠিক জানি না উর্মিলাদি।’

অর্পিতা এসে পরমার হাত ধরল। ‘আমার তো এই আশ্রয় ছেড়ে বেরোনোর উপায় নেই। এখানে কোনও না কোনও বদল ঘটবে— এই আশায় থাকব। কিছু তো ঘটবেই। তবে তোকে যে চলে যেতে হল তাও ভুলতে পারব না। এরা তোকে বুঝতে পারল না।’

‘মেয়েদের যদি ভালো হয় সে তো ভালো কথা অর্পিতাদি। তাহলে আমার চলে যাওয়াটাও কাজে লাগবে। মনে কোনও দুঃখ থাকবে না।’ কথাগুলো শুনতে শুনতে অর্পিতার চোখে জল চলে আসছিল। পরমার হাত ছেড়ে দিয়ে সরে গেল সে। প্রীতি ঘুরিয়ে রেখেছে মুখ। সঞ্চিতা মাথা ঝুঁকিয়ে নখে কী এত দেখছে কে জানে। ঊর্মিলা ওড়না চেপে রয়েছে ঠোঁটের ওপর।

ছোট স্কুল বসেছে আজও। বুটিক ঘরে নিশ্চয়ই রয়েছেন মঞ্জরীদি। পুকুরের হাঁসদুটো জলে খেলছে। দূরে ওই যে বেদিটা। কখনও অনেকের হইচই, কখনও কারও একা বসে থাকা যার গায়ে লেগে রয়েছে। জাম গাছের নীচে কে দাঁড়িয়ে? মণি না? হ্যাঁ, ছড়ি নামিয়ে রেখে মণি পাগলি সোজা তাকিয়ে রয়েছে পরমার দিকেই। চোখ সরিয়ে নিল সে। আর নয়। এবার চলে যেতে হবে।

ব্যাগ নিয়ে গেটের দিকে এগোল পরমা। প্র‌থম যেদিন এসেছিল, সব নতুন ছিল তার কাছে। আজ যাওয়ার দিনও যেন নতুনই লাগছে সব। ছোটবাড়ির মেয়েরা গ্রিলের বাইরে হাত বের করে নাড়িয়ে চলেছে। কেউ কেউ মুছে নিচ্ছে চোখের জল। কে যেন চেঁচিয়ে উঠল— ‘আমাদের ভুলে যেয়ো না আন্টি।’

আবারও কারা যেন ডাকছে। ‘এদিকে— এদিকে একবার তাকাও আন্টি।’

সে দেখল বড়বাড়ির দোতলা আর তিনতলার জানলায় মেয়েরা দাঁড়িয়ে। তারাও হাত নাড়তে নাড়তে চিৎকার করছে। পরমার মনে হল কারও কোনও কথা বুঝতে পারছে না সে। তার বদলে শুধু শুনতে পাচ্ছে অজস্র‌ পাখির ডাক। কিচিরমিচির। তাদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ।

মাটির দিকে তাকাল সে। রাস্তায় পড়ে থাকা কত ছোট ছোট জিনিস আজ চোখে পড়ছে তার। জং পড়ে বেঁকে যাওয়া সেফটিপিন, কানের দুল, ভাঙা চুড়ি, চুলের ক্লিপ। কেউ জানে না, এইসব আসলে পাখিদের ডানা থেকে খসে পড়া পালক।

চোখ তুলে তখনই আরও একজনকে দেখতে পেয়ে গেল পরমা। অফিসঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন সর্বাণী মিত্র। কেন এসেছেন? পাখিসব করে রব। তিনিও কি শুনতে পেয়েছেন?

‘গেট খুলুন রাজীবদা।’

‘সই করবে না খাতায়?’

ঢোকার দিনও নাম লিখে ভেতরে যেতে হয়েছিল। খোলা খাতার ওপর একটা পেন রাখাই থাকে। সে লিখতে লিখতে রাজীব বলল, ‘তোমায় একটা কথা জানানোর আছে। বাড়িতে সঞ্চিতার কথা খুলে বলেছি সব। বলেছি, জাতপাত মানব না আমি। মা-বাবা শুনেছে। আপত্তি নেই ওদের।’

রাজীবের দিকে তাকিয়ে হাসল পরমা। তারপর খাতায় তারিখ বসাল। সময়ের জায়গায় লিখল সকাল ১১.২৫। ঠিক এটাই ছিল না আসার দিন? সময় কি তার হাত ধরে রয়েছে?

খুলে গিয়েছে ছোট গেট। বেরিয়ে এল পরমা। ঘড় ঘড় শব্দ তুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল সেটা। পরমা ছটফট করে উঠল। মনের ভেতরে কিছু খুলল, না বন্ধ হল? বুঝতে পারছে না সে।

সামনে দাঁড়িয়ে সুতপাবউদি আর অনিন্দ্যদা। তাদেরই সব জানিয়েছিল পরমা শেষপর্যন্ত।

এগিয়ে এসে পরমার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিল অনিন্দ্য। ‘চলো।’

পরমা খুব নিচু গলায় বলল, ‘আমার জন্যে তোমাদের সঙ্গে মঞ্জরীদির সম্পর্কটা—’

অনিন্দ্য বলল, ‘ওসব নিয়ে ভেবো না এখন। সম্পর্ক কার সঙ্গে ভাঙে আর কার সঙ্গে গড়ে তার ব্যাখ্যা অত সহজ নয়।’

সুতপা বলল, ‘আমাদের ওখানেই যাবি তুই। নতুন কিছু করতে হবে তোকে। আমাদেরও। আয়।’

আগে আগে হাঁটছে দু’জন। পিছনে পরমা। ওরা বোধহয় কিছু ভেবে এসেছে। বা ভাবছে। এখনই পরমার সঙ্গে কথা বলে তাকে বিরক্ত করতে চাইছে না। সময় দিচ্ছে। হয়তো উড়ে যাওয়ার গল্প শোনাতে চায় কোনও। ওরা জানে, ডানা তো আছে পরমারও। শুধু নিজের একটা আকাশ চাই।

পিছন ফিরে হোমের লাল রঙের পাঁচিলটা একবার দেখল পরমা। সে হাঁটছে আর আস্তে আস্তে যা দূরে সরে যাচ্ছে তার নাম আশ্রয়। অর্পিতার কাছে এটাই একমাত্র ছাদ। সঞ্চিতার ভালোবাসার জানলা। প্রীতির ভাঙা স্বপ্ন জুড়ে যাওয়ার আঠা। ঊর্মিলার সংসারের গরম ভাত। কোথাও তো ঠিক করে থাকা হয়ে ওঠে না পরমার। তার সব আশ্রয় বরাবরই নড়বড়ে। কিন্তু মেয়েদের এই আশ্রয়টা যেন নড়ে না যায়। তাহলে তারা থাকবে কোথায়? এখান থেকেই তো নিজের জায়গা খুঁজে পাবে অনেকে। কেউ জুলেখার মতো ফিরতে পারবে ঘরে। কোনও এক বাবা-মায়ের মেয়ে হয়ে উঠবে রাখি। মণির মতো মেয়েদের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হবে না। কোথাও যেন ভূমিকম্প না হয় আর। কল্পনা থাপারা তাহলে এখান থেকে বাড়ি ফিরে যেতে পারবে কোনওদিন। শান্তাকে যেন পচে মরতে না হয়। আরও অনেক পল্লবী হাসিমুখে চলে যাক নতুন জীবনে। জুলিয়েনরা যেন বেঁচে থাকে। সর্বাণী মিত্রকেও চাই এখানে। না হলে এত কিছু করবে কে? শুক্লা হালদার, কৃষ্ণাদি, ঈশিতা, মঞ্জরী, শংকরদা— সবাইকে খুব দরকার। পরমা নাই বা থাকল।

দু’পাশের গাছ, পুকুর ছাড়িয়ে চলেছে সে। ছায়া আর রোদ্দুরের মাঝে পা ফেলে ফেলে। এখনও কানে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক।

বাঁক ঘুরল পরমা। একটা পাখিঘর গোপনে রয়ে গেল দূরে।

সমাপ্ত

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৭   

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

 

Comments are closed.