শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২৬

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ২৬

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৫

কল্পনা, সঙ্গীতা আর মিতালির ওষুধ শেষের মুখে। তাদের ব্লাড টেস্টেরও সময় এসে গিয়েছে। কথাটা জানানো দরকার বলে অফিসে শুক্লাদির কাছে গিয়েছিল পরমা। তিনি তাকে অন্য কাজ ধরিয়ে দিলেন। পরের সপ্তাহে কোনদিন কী রান্না হবে তার লিস্ট তৈরি করা দরকার। কাগজ-কলম নিয়ে বসতে হল।

এরমধ্যে অর্পিতা অফিসে খবর নিয়ে এল— পুলিশ এসেছে কথা বলতে। তাদের সে গেটেই দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছে। সর্বাণী ঈশিতাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ঈশিতা থানা-পুলিশ সামলান, উকিল-আদালত দেখেন।

পুজোর ছুটি শেষ বলে স্কুলের মেয়েদের বেরোতে হচ্ছে। দু’বাড়িতে রোজকার মতো তালা পড়ছে। তবে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর থেকে একটা থমথমে ভাব চেপে বসেছে হোমে।

দশমীর ভাসান কোনওরকমে হয়েছিল। মেয়েদের তালাবন্ধ রেখে। ড্রাইভার, দু’বাড়ির মনিটর, হোম-মাদার আর সিকিউরিটি গার্ডরা মিলে শাঁখ আর কাঁসর বাজিয়ে হোমের ভেতরের পুকুরেই ডুবিয়ে দিল দুর্গাপ্র‌তিমা। সেই ভাসান দেখে পরমার মনে হয়েছিল, ঠাকুরও যেন বোঝা হয়ে গিয়েছে। সে বোঝা হালকা করতে তাকে টেনে নিয়ে পুকুরের জলে চোবানো হচ্ছে। মা কিংবা মেয়ে, যাই হোক, মাটির তৈরি তো। জলে মিশে গেলেও কিছু বলতে পারবে না। হোম থেকে তার ছুটি।

এই নিয়ে এখানে দ্বিতীয়বার পুলিশ এল। আগে এসেছিল দশমীর সকালে। হোমের চারপাশ ঘুরে দেখছিল, স্টাফদের সঙ্গেও কথা বলেছিল। তারপর আলাদা ঘরে নাজিমা আর হেনার কাছে জানতে চেয়েছিল— তারা কোথায় যাবে ভেবে পালাচ্ছিল? যারা গিয়েছে তারা কোথায় যেতে পারে? যাওয়ার আগে কী কী কথা হয়েছে নিজেদের মধ্যে?

হাজার প্রশ্নেও ওরা মুখ খোলেনি। বরং তাদের ঘরের অন্য মেয়েদের কাছে শোনা গিয়েছিল— নাজিমা আর হেনা বলেছে, ‘যারা গেছে তারা বেঁচে গেছে। এবার পারিনি কিন্তু কোনওদিন আমাদের সুযোগ হলে আমরাও পালাব। এখানে থাকব কেন? কী আছে আমাদের এখানে?’

থানায় লিখিয়ে আসার পরেও পুলিশ আবার পালিয়ে যাওয়া মেয়েদের নাম লিখে নিয়ে গিয়েছিল। এবার অবশ্য সঙ্গে ছবিও। অর্পিতার কাছ থেকে পরমা জেনেছে, সর্বাণী মিত্র নাকি চেষ্টা করেছিলেন খবরটা যাতে বাইরে না যায়। ঈশিতাকে বলেছিলেন থানাকে বুঝিয়ে বলতে। নবনীতা দত্তও ওপরমহলে কথা বলেছিলেন। কিন্তু চেপে রাখা যায়নি। শেষ অবধি কাগজে বেরিয়েই গিয়েছিল— ‘‘হোমের পাঁচিল টপকে পালাল তিন মেয়ে।’’ তখন আবার নবনীতা দত্তর ঘন ঘন ফোন। সর্বাণীদির মুখ সারাদিন গম্ভীর। অফিসের স্টাফদের মধ্যে কথা চালাচালি প্রায় বন্ধ। এমনকী লালবাজার থেকে এসে হোম-মাদারদের ছবি আর ভোটার কার্ডের কপি জমা নিয়ে গিয়েছে। হোম থেকে রাতের দু’জন গার্ডকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছিল। বদলে এসেছে অন্য দু’জন। রাজীবের  চাকরিটা অবশ্য বেঁচে গিয়েছে। পরে আরও কী হবে, আন্দাজ নেই পরমার। অনিন্দ্যদার ফোন এসেছিল। তাদের কাগজেও খবরটা বেরিয়েছে। বলেছিল, ‘তোমাদের হোম নিয়ে আরও কথা উঠছে। সাবধানে থাকবে।’

সর্বাণী মিত্র ফিরে এসে বসলেন নিজের টেবিলে। মৈনাক জিজ্ঞেস করলেন, ‘মেয়েদের কোনও খোঁজ পাওয়া গেছে?’

‘নাঃ।’ মাথা দোলালেন সর্বাণী। যে জায়গা থেকে ওরা এসেছিল সেসব জায়গায় খোঁজ করেছে। যায়নি সেখানে। পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।’ তারপর একটা শ্বাস ফেলে বললেন, ‘মিডিয়ায় খবরটা বেরিয়ে গেল, হোমের রেপুটেশন খারাপ হবে। চাপ বাড়বে আরও। গভর্মেন্টের নজরদারি তো আছে। সামলানো মুশকিল হবে। মেয়েগুলো এরকম বিপদে ফেলল!’

শম্ভুনাথ বললেন, ‘এই যে মেয়েগুলো পালিয়ে গেল, কোথায় গেল? বাড়ি ফিরবে ভাবছেন? ঠিক কোথাও না কোথাও আবার নিজেদের ব্যবসা চালু করে দেবে। ওরা ও জিনিস ছাড়া থাকতে পারে না।’

পরমা বুঝতে পারছিল খবরের কাগজে এতদিন যেভাবে হোমের ভালো ভালো কথা থাকত এবার সেটা গোলমাল হয়ে গিয়েছে। তবে শম্ভুনাথের কথা সহ্যের বাইরে। সে উঠে পড়তে চাইছিল। তবে তার আগে শুক্লাদিকে আরও একবার ওষুধের কথাটা মনে করিয়ে দিল। তিনি খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘ওসব পরে হবে। কে যাবে এখন ওদের নিয়ে হাসপাতালে! তুমি যাও, মেয়েরা কী করছে দ্যাখো।’

বেরিয়ে এসে কলপাড়ে গিয়ে দাঁড়াল পরমা। একটু জল দেবে চোখে-মুখে। এই সময় দেখতে পেল ঈশিতাদি আসছেন গেটের দিক থেকে। হয়তো পুলিশের সঙ্গে কথা বলছিলেন এতক্ষণ। সে এগিয়ে গেল।

‘আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।’

‘হ্যাঁ, বলো।’

‘যে তিনজন মেয়ের এইচ আই ভি পজেটিভ তাদের ওষুধ শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। কিন্তু ওই ওষুধ তো এক দিনের জন্যেও বন্ধ রাখা যায় না। তিন মাস অন্তর ওদের যে ব্লাড টেস্ট করাতে হয় তার ডেটও এসে গেছে। আমি দেখেছি গ্রিন বুকে। ওদের তো নিয়ে যাওয়া দরকার।’

মাথা নাড়লেন ঈশিতা। ‘ঠিকই বলেছ। ওই মেয়েদের নামে নামে ওষুধ আসে, ঠিক সময়ে নিতে না পারলে ফেরত চলে যাবে। সেরো পজেটিভদের সি ডি ফোর কাউন্ট বলে একটা ব্যাপার আছে। রক্তে ওই সেল খুব কমে গেলেই বিপদ। এইচ আই ভি মানে তো এইডস নয়। কিন্তু ওই কাউন্ট কমে গেলে পেশেন্টদের রিস্ক বাড়তে থাকে। ডাক্তার তো সেটা ফলো করেন।’

‘আমি তো এত কিছু জানি না দিদি।’

‘জানার কথা নয় তোমার। আমি আগে কয়েকবার ওদের নিয়ে গেছিলাম, তাই জানি। শুধু ওষুধ নিয়ে এলেই হবে না। ওদের বিলিরুবিন টেস্ট করাতে হয়, হিমোগ্লোবিনের পার্সেন্টেজ দেখা হয়, লিভার ফাংশন টেস্ট হয়, ওজন কমেছে কিনা দেখতে হয়। অপারচুনিটি ইনফেকশনও খেয়াল করতে হয়। মানে জ্বর বা পেটখারাপ হচ্ছে কিনা, চামড়ায় খসখসে ভাব আসছে কিনা। ঠিকমতো ওষুধ নিলে পেশেন্টরা অনেকদিন ভালো থাকতে পারে। কিন্তু ওদের তো হাসপাতালের এ আর টি সেন্টারে নিয়ে যান শুক্লাদি। তাকে বলেছ কথাটা?’

‘একটু আগেই বলেছিলাম। উনি বললেন, এখন ওসব হবে না। কে নিয়ে যাবে!’

ঈশিতা ঠোঁট কামড়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর মুখ তুললেন। ‘এরকম তো বলার কথা নয়। আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি কথা বলছি শুক্লাদির সঙ্গে।’

পরমা চলে আসছিল। সে ঈশিতাদিকে বলেছে বলে শুক্লাদি কি রাগ করবেন? বলেছে তো ওই মেয়েগুলোর কথা মনে করে। এই সময় কী মনে হতে একবার পিছন ফিরে দেখল সে। ঈশিতা এখনও দাঁড়িয়ে। তাকিয়ে রয়েছেন তার দিকে। পরমা মুখ ঘুরিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল।

 

জুলেখা আজ চলে যাবে। বাংলাদেশে, তার নিজের বাড়িতে।

ক’দিন ধরেই তার মনখারাপ ছিল। আজ সে কাঁদছে।

পরমা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল। ‘বোকা মেয়ে। এরকম করে কেউ? তোর তো খুশি হওয়ার কথা। বাড়ি যাচ্ছিস!’

‘আমার খুব ভয় করতেছে আন্টি। এতদিন ওখানে নেই, যেয়ে গ্রামের মানুষদের কাছে মুখ দেখাব কেমন করে? কী বলব তাদের? কোথায় ছিলাম আমি?’

‘দোষ তো তোর নয়। তাহলে তুই কেন ভয় পাচ্ছিস? লজ্জাই বা পেতে যাবি কেন, যেখানে তোর আপনজনেরা সেসব কাটিয়ে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে।’

‘আমার বর সারাজীবনেও নেবে না আন্টি।’

‘আগে তো নিজের বাড়িতে যা। থাকতে থাকতে দেখবি, হয়তো বরেরও মন ঘুরে গেছে।’

‘না আন্টি, তা আর হবে না। আম্মি বলতেছিল, সে ফের নিকা করে নিয়েছে। বাচ্চাও হয়েছে তাদের।’

এই কথাটা শুনে চুপ করে যেতে হল পরমাকে। জুলেখা জামাকাপড় গোছাচ্ছিল। সেও হাতে হাতে এগিয়ে দিতে থাকল কিছু জিনিস। যে মেয়েরা এখান থেকে পালিয়ে গিয়েছে তারা ধরা পড়ে গেলে ফিরতে হবে এই হোমেই। অথবা অন্য কোথাও। কিন্তু যদি না পড়ে? কোথায় যাবে? পাবে অন্য কোনও আশ্রয়? না কি আবার সেই আগের জীবনেই? উদ্ধার পাওয়ার পর যারা বাড়িতে ফিরে যায় তারা কেমন থাকে তা জানে না পরমা। নিশ্চয়ই চারপাশে অনেক কথা লুকোতে হয় তাদের। তারপরেও ভাল করে বাঁচতে পারে? তাহলে আর লাভ কী? না, তা কেন হবে? মানুষ তো চেষ্টা করে। কঠিন আঘাতও সয়ে নিতে চায়।

জুলেখা তার আম্মির সঙ্গে প্র‌থমবার ফোনে কথা বলার পরেও ভাবা যাচ্ছিল না সে ফিরে যেতে পারবে। তারপর যদিও আম্মি আবার ফোন করেছিল। আব্বুজানও কথা বলেছে। মেয়েকে ফেরত পেতে চায় তারা।

যাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতে মাসখানেক কেটে গিয়েছে। দায়িত্ব ছিল ঈশিতার ওপরে। তার কাছ থেকেই জেনেছিল পরমা অনেকটা। এসব ব্যাপারে পুলিশের মারফত যোগাযোগ রাখতে হয় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে। জুলেখা বাড়ির কথা যতটুকু বলতে পেরেছিল তাতে খুঁজে পেতে সময় লেগেছে অনেক। তবে পাওয়া গিয়েছে শেষপর্যন্ত। তারপর ভেরিফিকেশন হয়েছে। কনফার্মেশন এসেছে। কিন্তু জুলেখার পাসপোর্ট নেই। দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন তাই তার জন্য একটা ট্র্যাভেল পারমিট পাঠিয়ে দিয়েছিল। মেয়াদ তিন মাস। ওই সময়ের মধ্যে সেটা নিয়েই তার দেশে ঢুকতে পারবে জুলেখা।

পরমার মনে হচ্ছিল, মেয়ে পাচারের সময় পাসপোর্ট, ভিসা কিছুরই দরকার পড়ে না দালালদের। টাকার লেনাদেনায় সব কত সহজ হয়ে যায়। যেখান থেকেই পাচার হোক না কেন— মেয়ে তো নয়, তাল তাল মাংস যেন সব। জুলেখা যা হোক বলতে পেরেছে তাই দেরিতে হলেও তার বাড়ি অবধি পৌঁছতে পেরেছে ও দেশের পুলিশ। বাংলাদেশেরই আরও মেয়ে আছে এই হোমে যারা সেটুকুও বলতে পারেনি। বছরের পর বছর এখানেই কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন।

বড়বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে গেল জুলেখা। পরমাও গিয়েছিল তার সঙ্গে। জুলেখার বন্ধুরা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। ‘চলে যাচ্ছিস, না রে? যা, কপাল ভালো তোর। আমরা যে কবে—’ কারও মুখেই এর বেশি কথা এল না।

ঠিক বারোটায় এসে পড়ল পুলিশের গাড়ি। কিছু দরকারি কাগজপত্র এক অফিসারের হাতে দিয়ে দিলেন ঈশিতা। এতদিন যে জুলেখা হোমে ছিল তার প্র‌মাণ।

ছোটবাড়ি থেকে বেরোনোর আগে পরমাকে জড়িয়ে ধরল জুলেখা। ‘আন্টি, আমি তোমারে কোনওদিন ভুলব না। তুমি আমারে মনে রাখবা তো?’

নিজের চৌকিটার কাছে এসে ঝুঁকে পড়ে নীচ থেকে ব্যাগটা টেনে বের করল পরমা। সেখান থেকে তুলে আনল যত্ন করে রাখা লালপেড়ে শাড়িটা। তারপর ধরিয়ে দিল জুলেখার হাতে।

‘না না, এ কী করতেছ আন্টি!’ জুলেখা ঝপ করে রেখে দিল সেটা। পরমা বলল, ‘এই শাড়িটা দেখে তোর ভালো লেগেছিল না! মনে আছে? এটা যদি তুই পরিস তাহলে আমি তোর সঙ্গে সঙ্গে থাকব। একদম গায়ে গায়ে। পরবি না?’

জুলেখা কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। পরমা বলল, ‘মার খাবি এবার। চোখ মোছ। নে, ধর এটা।’

এরপর গলা বুজে এল পরমারও। আর কোনওদিন দেখা হবে না জুলেখার সঙ্গে। কথা হবে না কোনও। তার পিঠে শুধু একবার হাত রাখল পরমা।

বাইরে থেকে ঈশিতার গলা পাওয়া গেল। ‘তাড়াতাড়ি বেরোও জুলেখা। পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে।’

সর্বাণী আর ঈশিতা ছাড়া কেউ বাইরে নেই। হোম-মাদাররা যে যার কাজে। আর মেয়েদের তো তালা দেওয়া। তাও ছোটবাড়ির কয়েকজন বারান্দার লোহার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। জুলেখার চলে যাওয়া দেখছে তারা। চোখ দেখে মনে হয় তাদেরও খানিকটা যেন চলে যেতে চাইছে জুলেখার সঙ্গেই।

গাড়িতে গিয়ে বসল জুলেখা। বেরিয়ে গেল পুলিশ ভ্যান। ঘড় ঘড় আওয়াজে বন্ধ হয়ে গেল গেট।

এখানকার পুলিশ জুলেখাকে নিয়ে যাবে গেদে বর্ডারে। বাংলাদেশের পুলিশ থাকবে ওপারে। তাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দেবে তারা।

কাজ শেষ। ঈশিতা আর সর্বাণী ফিরে যাচ্ছিলেন অফিসে।

হোমে আসার পর ছোটবাড়িতেই থাকতে দেওয়া হয়েছিল পরমাকে। নতুন মেয়েদের রকমসকম দেখে খুব ভয় হত তার। জুলেখাই তখন আপন হয়ে উঠেছিল পরমার। সাহস জোগাত। মেয়েদেরও কত সময় ধমক দিয়ে থামিয়েছে। সেই জুলেখা যে চলে গেল সেটা সত্যি। কিন্তু সেই সত্যির খানিকটা আন্দাজ করতে পারছে পরমা। বাকিটা কোনওদিনও জানতে পারবে না সে। শুধু মনে মনে একটু শান্তি চাইতে পারে মেয়েটার জন্য।

সবিতামাসির রান্না এখনও চলছে। একটা চেয়ার নিয়ে সেখানেই বসে পড়ল পরমা। এখন ছোটবাড়িতে যেতে ভাল লাগছে না। মনে পড়ে গিয়েছে, খাওয়ার আগেই চলে যাবে বলে আজ দুপুরের খাবারের হিসেবে ধরাই হয়নি জুলেখাকে।

দুপুরে বড়বাড়ির মেয়েদের খাবার দিয়ে রান্নাঘরে ফিরে এসেছিল পরমা আর অর্পিতা। ছোটবাড়িরটা উর্মিলা আর প্রীতি সেরে এসেছে। যদিও অফিস ছুটির পর ছোটবাড়িতে যেতেই হল পরমাকে। সেখানকার মেয়েদের সন্ধের টিফিন দিতে হবে। উর্মিলা গোছগাছ করায় ব্যস্ত। কাল বাড়ি যাবে সে।

ঘরে ঢুকে পরমা দেখল, বাকি মেয়েরা বিছানায় শুয়ে-বসে গল্প করছে। শুধু জুলেখার বাঙ্কটাই ফাঁকা। একটা কাপড়ের টুকরোও নেই সেখানে। ধক করে উঠল বুকটা। এতক্ষণে কোথায় পৌঁছে গিয়েছে জুলেখা! এই কারণেই সারাদিন এদিক মাড়ায়নি সে। উর্মিলাকে এখানে দিয়ে বড়বাড়ির কাজ করছিল। মনের কতখানি জায়গা আর কেড়ে নেবে এখানকার এই মেয়েগুলো?

টিফিন দেওয়া শেষ করে বাটিতে মুড়ি আর চানাচুর নিয়ে অন্য ঘরে উর্মিলার কাছে গেল পরমা। জামাকাপড় গোছানো হয়ে গিয়েছে তার। টাকা গুনে ভরে রাখছিল হাতব্যাগে। পরমাকে দেখে বলল, ‘তুই নিয়ে এলি!’

‘হ্যাঁ, খাবে না?’

‘খাব তো। আয়, বোস না এখানে।’

খাওয়া শুরু করার খানিক পরেই উর্মিলা বলল, ‘মনে হচ্ছে এই খাঁচায় যেন আমরাই বন্দি। আমি তো বাবা বাড়ি থেকে একটু শ্বাস নিয়ে আসব। ছুটি মঞ্জুর হয়েছে, তাই বাঁচোয়া।’

পরমা বলল, ‘হ্যাঁ, ঘুরে এসো।’

‘জুলেখা চলে গিয়ে তোর খুব মনখারাপ, না রে?’

পরমা কিছু বলল না। উর্মিলাও চুপ রইল কিছুক্ষণ। তারপর পরমার দিকে না তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে আর প্রীতিকে তোর খারাপ মনে হয়, না?’

পরমা দেখল তার দিকে। ‘কেন বলছ এরকম কথা?’

‘তুই বোধহয় ভাবিস এখানকার মেয়েগুলোকে আমরা ভালবাসি না। তা নয় রে। আসলে দেখতে দেখতে কেমন যেন শক্ত হয়ে গেছি। মায়া পড়ে গেলে তো তোর মতন কষ্ট পাব। কষ্ট আর ভাল লাগে না।’

উঠে দাঁড়াল পরমা। ‘আমি বুঝি উর্মিলাদি। তবে মায়া তো থাকেই, তাই না?’

ঘরে ফিরে বিছানায় গিয়ে বসল পরমা। ভার হয়ে রয়েছে মনটা। জুলেখা কি তার বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে এখন? নিজের লোকদের সঙ্গে দেখা হয়েছে? একজনের কথা মনে পড়লেই আরও কতজন যে সামনে এসে দাঁড়ায়! মা-বাবাকে পেয়ে রাখি কেমন আছে তা সে জানে না। আর পল্লবী? নিতু? সবাই যেন ভালো থাকে। মায়ায় থাকে।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৫

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

Comments are closed.