রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২৫

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ২৫

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৪ 

হোমে দুর্গাপুজো। প্র‌তিবছরই হয়। এ বছরও শুরু হয়েছিল। পঞ্চমীর বিকেলে শংকরের সঙ্গে সোনালি, কবিতা, জুলেখা আর পারভিন গিয়ে পছন্দ করে প্র‌তিমা এনেছিল। অষ্টমী অবধি সব ঠিকই ছিল। বিপদ এল নবমীতে।

পরমা তখন পুজোর জায়গাতেই। শামিয়ানা টাঙিয়ে মণ্ডপ। বড় আলো লাগানো হয়েছে খুঁটিতে। বাঁধানো বেদির ওপর দুর্গামূর্তি। আরতি শুরু হবে। পুরোহিতের পাশে বসে একটা মেয়ে ধুনুচির ওপর ছোবড়া সাজাচ্ছিল। আর একজন সামলাচ্ছে পঞ্চপ্র‌দীপ। নাকতা নাকুড় করে ঢাক বাজচ্ছে। সঙ্গে কাঁসর। তার মধ্যেই পিছন দিক থেকে দৌড়ে এল জুলেখাবিবি।

‘আন্টি, ও আন্টি, তাড়াতাড়ি আসো।’

‘কেন? কী হয়েছে রে জুলেখা?’

সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘কয়েকটা মেয়ে পলায়ে গেছে।’

চমকে উঠল পরমা। ‘সে কী! কী করে?’

‘পিছন দিকের পাঁচিল ডিঙায়ে। লাভলি আর শাকিলা খাবার জল ভরতে গেছিল, আওয়াজ পেয়ে দেখে দুইজন পাঁচিল বাওয়ার চেষ্টা করতেছে। তারা চিৎকার দিয়ে ওঠে। সেই শুনে শংকরদা আর বউদি গিয়ে মেয়েদুটোরে ধরে ফেলেছে। কিন্তু পলায়েছে মনে হয় আরও তিনজন।’

একটু এগিয়ে যেতেই আরও কয়েকটা মেয়ের অস্থির গলা শুনতে পেল পরমা। দেখতে পাচ্ছিল সর্বাণী মিত্র অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছেন। শংকর গিয়ে তার সামনে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, ‘ওদের দুজনকে অফিসরুমে নিয়ে যাও। শুক্লাকে বলো শম্ভুনাথ আর মৈনাককে ফোন করতে, তাড়াতাড়ি যেন চলে আসে।’

শংকর চলে যেতেই সর্বাণী নিজেই গেটের কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে সিকিউরিটির রাজীবকে ডাকলেন। ‘তোমরা পাঁচিলের বাইরে আশপাশটা খুঁজে দ্যাখো, এক্ষুনি। বেশিদূর যেতে পারেনি বোধহয়। বাইরে তো অন্ধকার। কোথায় যাবে! না পেলে এসে জানাও আমাকে। শংকরকে গাড়ি নিয়ে বেরোতে হবে তাহলে। ধরতে হবে ওদের।’

পুজোর সময় বলে রাতের দুজন গার্ডের সঙ্গে রাজীবকেও থাকতে বলা হয়েছিল। সে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ল।

ফিরে আসার মুখে পরমাকে সামনে পেয়ে তার ওপরেই চোটপাট শুরু করলেন সর্বাণী। ‘হোম-মাদারদের দেখতে পাচ্ছি না কেন? কোথায় ছিলে তোমরা? মেয়েরা পাঁচিল টপকে পালাচ্ছে, তোমরা তাহলে হোমে আছ কী করতে? বাকিদের বিল্ডিংয়ে ভরে, রেজিস্টার খাতায় নাম এন্ট্রি করে দ্যাখো কে কে মিসিং। তুমি বড় বিল্ডিংয়ে যাও, ছোটটাতে সঞ্চিতাকে পাঠাও।’ বলেই হনহন করে চলে গেলেন তিনি।

কোন কাজটা আগে করবে ভেবে না পেয়ে পরমা দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। একটু দূরেই পুজোমণ্ডপ। সেখানে এখনও অনেক মেয়ে। ওই অবধি কথাটা এখনও পৌঁছয়নি নিশ্চয়ই। না কি সব শুনেও ওদের কোনও হেলদোল নেই? মণ্ডপের ভেতরে গিয়ে গলা তুলতে হল পরমাকে। ‘ঠাকুরমশাই ওদের আর এখানে রাখা যাবে না। আপনি একাই যা পারেন করুন।’ তারপর মেয়েদের বলল, ‘তোমরা এক্ষুনি যে যার জায়গায় চলে যাও, সর্বাণীদির অর্ডার।’ তার কথা শুনে মেয়েরা এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল। ফিসফিস গুজগুজও শুরু হয়ে গেছে। তবে মুখ ব্যাজার হয়ে গেলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারা চলেই যাচ্ছিল।

‘এদের জন্যেই কোনদিন আমাদের প্রাণ না যায়।’ পরমা কিছুটা চমকে পিছন ফিরে দেখল উর্মিলা উদ্‌ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে রয়েছে। সে আবার বলল, ‘এবার কী তোলপাড়টা হয় দ্যাখ। আমাদের কাউকে দেখতে না পেয়ে সর্বণীদি চটে যাননি?’

‘তা তো গেছেনই। তুমি কোথায় ছিলে এতক্ষণ?’

উর্মিলা বলল, ‘শরীরটা এত ক্লান্ত, ঘরে গেছি আর চোখটা লেগে গেছে। তখনই একজন গিয়ে চিৎকার শুরু করল, আন্টি কয়েকটা মেয়ে পালিয়েছে। ওই কথা শুনে কেউ শুয়ে থাকতে পারে!’ উর্মিলার মাথার চুল খোলা, শাড়ি এলোমেলো, পায়ে চটিটা অবধি নেই। যে অবস্থায় ছিল সেভাবেই বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছে।

এতক্ষণে সঞ্চিতা এসে তাদের কাছে দাঁড়াল। উর্মিলা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কোথায় ছিলি?’

সে আমতা আমতা করে বলল, ‘আমি তো ওই গেটের দিকে—’

পরমা সঞ্চিতাকে বলল, ‘তুমি ছোটবাড়ির মেয়েদের রোলকল করো। আমি বড়বাড়িরটা করে নিচ্ছি। উর্মিলাদি, তুমি অফিসে চলে যাও না, যে মেয়েদুটো ধরা পড়েছে তাদের ওখানেই নিয়ে গেছে।’

বড়বাড়ির দিকে যেতে যেতে পরমা ভাবছিল, প্রীতিদি তো বেরিয়েছে। এখনও আসছে না কেন? তারও তো খোঁজ পড়বে এবার।

একটু আগে যেখানে মেয়েরা ঝলমল করছিল সেই পুজোমণ্ডপ এখন খাঁ খাঁ। খুব কানে লাগছে ঢাক আর কাঁসরের আওয়াজ। দশভূজা দশ অস্ত্র নিয়ে অসুরের বুকে পা তুলে বড় বড় চোখে তাকিয়ে। সামনে দাঁড়িয়ে পুরুতমশাই ডান হাতে প্র‌দীপ ঘোরাচ্ছেন। বাঁ হাতের ঘণ্টা আওয়াজ তুলছে। তিনি একাই নবমীর পুজো এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। নীচে পড়ে আছে ফুল, বেলপাতা। ধুনুচি আর ধুপের ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়। প্র‌দীপের পুড়ে যাওয়া সলতে পুজো শেষের গন্ধ ছড়িয়েছে বাতাসে।

পরমা বড়বাড়ির দোতলার মনিটর কবিতাকে বলল একতলার হলে সব মেয়েকে জড়ো করতে। কবিতাই অফিস থেকে রেজিস্টার খাতা এনে পরমার হাতে দিল। সে চেয়ার নিয়ে হলের একপাশে বসে পড়েছিল। তবে পেন হাতে নেওয়ার পর বুঝতে পারল আঙুলগুলো কাঁপছে। বুকের ভেতরটা শিরশির করতে শুরু করেছে। খানিকটা সামলে নেওয়ার চেষ্টায় একের পর এক মেয়েদের নাম ধরে ডাকতে শুরু করল। তারা হাত তুলে জানাচ্ছে, কে কে উপস্থিত। নাজিমা আর হেনা বলে এ বাড়ির যে মেয়েদুটো ধরা পড়েছে তাদেরও হিসেবে রাখতে হবে। তারপরেও ডাকা শেষ হলে পরমা দেখল তিনজন নেই। পারভিন খাতুন তো গিয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল— রিমা নেই। সেদিন তাহলে পালানোর কথাটা সত্যিই বলেছিল সে? রিমাই দল পাকিয়েছিল? না কি পরে দলে যোগ দিয়েছিল সে?

পরমা কবিতাকে জিজ্ঞেস করল, ‘মণি কোথায় রে?’

‘তার কথা ছাড়ো আন্টি, বিছানায় বসে বিড়বিড় করছে। আমি দেখে এসেছি।’

বিনা কারণেই খাতার দিকে একবার দেখল পরমা। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, তোরা রুমে চলে যা। খাওয়ার ঘণ্টা পড়লে নীচে চলে আসিস সব।’

সোফিয়া আর গোলাপ বলল, ‘আন্টি ওরা পালিয়েছে, তাই বলে তুমি আমাদের সকলকে কেন শাস্তি দিচ্ছ? আমরা কি আর পুজো দেখতে বেরোব না?’

‘আমি তোদের বন্ধ করিনি। সর্বাণীদি বলেছেন।’

সবাই মুখ শুকনো করে পরমার দিকে তাকিয়ে। রাখি চলে যাওয়ার পর এখানে আছে নুসরত। সে এবার এসে পরমার হাঁটু জড়িয়ে ধরল। ‘নিয়ে চলো না আন্টি ওখানে, ঠাকুরপুজো দেখব।’

এই মেয়েটা কী বোঝে! পরমা নুসরতের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘এখন না সোনা। পরে যদি হয় আমি তোমায় নিয়ে যাব, কেমন।’ তারপর উঠে পড়ল সে। খাতা হাতে নিয়ে পা চালাল অফিসঘরের দিকে।

কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল। পুজোয় মেয়েরা চার দিন ছাড় পেয়েছিল। ষষ্ঠী থেকে ছোট-বড় দু’বাড়িরই তালা খোলা। সকাল ছ’টা থেকে রাত্রি দশটা। নবনীতা দত্ত সেইরকমই নোটিশ দিয়েছিলেন। বেশ কাটছিল মেয়েদের সময়।

পুজোর কয়েকদিন আগে হোম-মাদারদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন সর্বাণী। অনেক কাজ। ভাগ না করে দিলে চলবে না। তারা যাওয়ার পর বললেন, ‘বসো, আলোচনা আছে।’ সকলে চেয়ার টেনে টেবিল ঘিরে বসে পড়েছিল।

‘পুজোয় কে কী দায়িত্ব নিতে পারবে বলো তোমরা।’

অর্পিতাই প্র‌থম মুখ খুলল। ‘দিদি, আমি তো হোমের বাজার-হাট নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তারপরেও যদি কোনও দায়িত্ব দাও— নেব। গেল বছরও তো সবসময় প্যান্ডেলে ছিলাম। বলো কী করতে হবে?’

সর্বাণী অপির্তার থেকে চোখ সরিয়ে উর্মিলার দিকে রাখলেন। ‘তুমি কী করবে উর্মিলা?’

‘আমি বড়বাড়ির কয়েকজন মেয়ে নিয়ে পুজোর জোগাড়ে থাকতে পারি। আমাকে রোজ ও বাড়ির মেয়েদের সকালের টিফিন, রাতের খাবার দিতে হয়। আমি পুজোয় থাকলে কিন্তু ওই কাজ অন্য কাউকে করতে হবে।

এবার প্রীতির মুখে তাকালেন সর্বাণী। ‘উর্মিলা যখন পুজোর ভার নিয়েছে তখন আমি নিশ্চিন্ত। বাকিরা তাহলে ওই দিনগুলোয় রান্নাবান্না, খাওয়ার দিকটা দেখো আর মেয়েদেরকে চোখে চোখে রেখো। ক’দিন ছাড়া পেয়ে যেন কোনও কাণ্ড না ঘটায়।’

প্রীতি হঠাৎ কিছুটা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ‘দিদি, আপনি কোনও চিন্তা করবেন না। পরমা রান্নার দিকটা দ্যাখে, মেডিসিনও ওর ডিউটিতে, আমি মেয়েদের দেখব।’

সর্বাণী সঞ্চিতাকে বললেন, ‘তাহলে পুজোর সময় বাইরে থেকে আমাদের যে গেস্টরা আসবেন তাদের তুমি অ্যাটেন্ড করবে।’

পরমাকে আলাদা করে কোনও দায়িত্ব দিলেন না সর্বাণী। পিঙ্কির ঘটনার পর থেকে তার ওপর তিনি বিরক্ত। বুঝতে পারছিল পরমা।

কথা শেষ হয়ে গেল। অফিস স্টাফরা আসতে শুরু করেছে। ষষ্ঠীর দিন কিছু সময়ের জন্য হলেও অফিস হয়ে বন্ধ থাকবে। তবে পুজোর ক’দিন অ্যাটেনডেন্স খাতায় সই করতে হবে সকলকেই। হোমের পুজোয় যে তারা ছিল তার প্রমাণ।

পুজো ঘিরে খুব খুশিই ছিল মেয়েরা। দিনরাত কলকল চলছে। জামাকাপড় কাচাকাচি, ঘর পরিষ্কার, কে কী পরবে, কাকে কীরকম দেখতে লাগবে— মেয়েরা সেই নিয়েই আছে। তারা ফুল দিয়ে সুন্দর করে মণ্ডপ সাজিয়েছে, আলপনা দিয়েছে। মেয়েদের নানা বায়না মেটাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে তাদের শংকরদা। বড়বাড়ির রূপা বলছে, ‘আমাদের এখানে আগে আলো লাগাও।’ চুমকি বলছে, ‘না, আমাদের ছোটবাড়িতে আগে টুনি বাল্‌ব ঝোলাও।’

হোমে আসার পর পরমার কাছে এটাই প্র‌থম পুজো। সে ভেবে পায় না, কী করে মেয়েরা তাদের দুঃখ-কষ্ট ভুলে পুজো নিয়ে এত আনন্দ করে। বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝাই যাবে না।

আশ্রয় হোমের বাইরের গোবিন্দপুর থেকে কিছু লোকজন ক’দিন এসেছে ঠাকুর দেখতে। এই সময়টায় দিনেরবেলায় অন্যদেরও ঢুকতে দেওয়া হয়। হোমের বিশেষ গেস্টরা এলে তাদের অফিসঘরে নিয়ে গিয়ে আলাদা আপ্যায়ন হয়েছে। ষষ্ঠীর দিন নবনীতা দত্ত এসেছিলেন। বেশিক্ষণ থাকেননি। মণ্ডপে গিয়ে একবার দাঁড়ালেন। অফিসে গেলেন। তারপর গাড়ি বেরিয়ে গেল। অষ্টমীর দিন দুপুরে এসেছিল অনিন্দ্যদা আর সুতপাবউদি। সঙ্গে মেয়ে সঞ্চারী। পরমাকে বউদিই ফোন করে বলেছিল, ‘তোদের ওখানে পুজোয় যাচ্ছি আমরা। কেমন হয় দেখব। অন্য সময় তো অনিন্দ্যকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। তোর সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে। তুই সঞ্চারীকে দেখতে চাইছিলি তো? সেও তোকে অনেকদিন দেখতে না পেয়ে বড্ড জ্বালাচ্ছে।’

সুতপাবউদি পরমাকে নতুন শাড়ি আর শায়া-ব্লাউজ দিয়ে গিয়েছে মাসখানেক আগে একবার এসে। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে তখনই পরমা বলেছিল, ‘বাইরের অনেকে নাকি পুজোর সময় এখানে আসে। তোমরা একদিন আসবে বউদি?  সঞ্চারীকে দেখতে পেতাম তাহলে একটু।’

এই ক’দিন তারা পুজো সামলেছে, বাইরের অতিথিদের দেখভাল করেছে। তাছাড়া দেড়শোজন মেয়ের তিনবার খাওয়াদাওয়া, অনেককে ওষুধ দেওয়া, কিছুজনের বায়না মেটানো— এসব তো হোম-মাদারদের রোজের কাজ। তারপরেও মাঝে মধ্যেই সর্বাণী মিত্র আর শম্ভুনাথ ঘোষের ধমক— ‘এই কাজটা ঠিক করে হল না কেন?’, ‘ওই কাজটা কার দায়িত্বে ছিল?’ ‘ছোটবাড়ির মেয়েরা এত চিৎকার করছে কেন?’

এই করে করে অষ্টমীও পেরিয়ে গেল।

নবমীতে মেয়েরা আশ মিটিয়ে ঘুরে নিচ্ছিল। আজ তাদের বাইরে থাকার শেষ দিন। হোম-মাদাররা সবাই ক্লান্ত, বিশ্রাম চাই। সকাল থেকে বাকিরা গা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু পরমার তেমন করলে চলবে না। রান্নার মাসি এসে বসে আছে। সকালের টিফিন, দুপুরের রান্না সেরে সে বাড়ি যাবে। আবার আসবে সেই বিকেলে। সন্ধেবেলায় চলে যাবে।

রান্নাঘরের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসেছিল পরমা। ‘মাসি, আগে এক কাপ চা খাওয়াও, তারপর টিফিন কী হবে বলছি।’

‘কতক্ষণ হল বসে আছি। এতজনের টিফিন করে রান্না সারতে হবে। পুজো-আচ্চার দিন একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব, কোথায় তোমরা একটু বুঝবে, তা নয়।’ সবিতামাসি গরম গলায় কথা শেষ করল। তারপর নরম গলায় বলল, ‘বোসো আন্টি, কী রান্না হবে চা খেয়ে বোলো।’

পরমা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘টিফিনে লুচি আলুর তরকারি কোরো। দুপুরে পোলাও আর পনির হবে। শংকরদা পনির এনে ওই বড় গামলায় ঢাকা দিয়ে রেখেছে দ্যাখো।’

‘কী রে, কী করছিস?’

গলা শুনে পিছনে না ফিরেও পরমা বুঝল প্রীতি এসে তার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছে।

‘এই তো মাসিকে রান্না বোঝাচ্ছিলাম। কেন, কিছু বলবে?’

‘শোন না, একদিনও ঠাকুর দেখতে বাইরে বেরোইনি। সন্ধেবেলা দু-তিন ঘণ্টার জন্যে বেরোবো। তুই সেই সময়টা একটু ম্যানেজ করে নিস প্লিজ।’

পরমা অবাক হল। ‘তুমি শুক্লাদিকে বলে আধবেলার ছুটি নিয়ে নাও না।’

‘পাগল হয়েছিস তুই! পুজোর সময় কেউ ছুটি পায় না। কিন্তু আমি আজ বেরোবোই।’ বলেই প্রীতি কোমর দুলিয়ে চলে যাচ্ছিল।

পরমা চেঁচিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু তোমার ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।’

প্রীতি দূর থেকেই হাত নাড়িয়ে বড়বাড়িতে ঢুকে গেল। রান্নার মাসিকে এরপর রাতের রান্নাও বুঝিয়ে দিয়ে পরমা চলে গিয়েছিল।

এই কয়েকদিনের কথা পরপর মনে পড়ে গেল তার। তখন কে জানত শেষে এমন একটা ঘটনা অপেক্ষা করে আছে। আর এখন সে কারণেই অফিসঘরে তলব হয়েছে।

খাতা হাত অফিসে ঢোকার মুখে পরমা দেখতে পেল নাজিমা আর হেনার হাত চেপে ধরে তাদের নিয়ে চলে যাচ্ছে অর্পিতা। বড়বাড়িতেই ফেরত রেখে আসতে যাচ্ছে। দরজা ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখল শম্ভুনাথ আর মৈনাক এসে গিয়েছেন। শুক্লাও রয়েছেন। তাদের নিয়ে সর্বাণী গভীর আলোচনায়। একটু দূরের টেবিলটার সামনে রাখা চেয়ারে সঞ্চিতা আর উর্মিলা বসে।

পরমা এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘সর্বাণীদি, বড়বাড়ির একশো বারোজন মেয়ের মধ্যে, একশো দশজন আছে। পারভিন খাতুন আর রিমা দাস মিসিং।’

রিমার নামটা শুনে চমকে উঠলেন সর্বাণী। ওই টেবিলের বাকি সকলেরও মুখ ফ্যাকাশে। হোম-ইনচার্জ বোধহয় বেখেয়াল হয়ে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন। তারপর বসে পড়ে বললেন, ‘খাতাটা রাখো। কিছুক্ষণ ওয়েট করো। তোমাদের সঙ্গে কথা আছে।’

বাইরে ঢাকের আওয়াজ থেমে গিয়েছে এখন। ঢাকি আর কাঁসর বাজানোর ছেলেটা চলে গেল নাকি কে জানে। পরমা পাশের টেবিলে গিয়ে বাকিদের সঙ্গে যোগ দিল।

সঞ্চিতা ফিসফিস করে বলল, ‘এবার নবনীতা দত্ত কী করবেন? মেয়েরা তো গেছেই, রিমা পালিয়েছে মানে মারাত্মক ব্যাপার। তাছাড়া ছোটবাড়ি থেকেও একজন মিসিং। পায়েল বলে সেই মেয়েটা।’

পায়েল! পরমার মনে পড়ে গেল। প্র‌থমে ব্লেড দিয়ে হাত কেটে ফেলা, তারপর গলায় দড়ি দেওয়ার চেষ্টা, আর এখন সেই মেয়েটাও পালিয়েই গেল!

পরমা নিচু গলায় বলল, ‘প্রীতিদি ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। এখনও ফেরেনি। সর্বাণীদি যদি জানতে চান ওর কথা?’

সঞ্চিতাও গলা গোপন করেই বলল, ‘ফিরেছে। বয়ফ্রেন্ডের বাইকে চেপে বেড়িয়ে এসে চুপটি করে গিয়ে ঢুকেছে ছোটবাড়িতে। একটু পরেই আসবে।’

এবার পরমা উর্মিলার কাছে জানতে চাইল, ‘নাজিমা মুখ খুলেছে?’

‘হ্যাঁ, নাজিমাকে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, মেয়েরা যেদিন ঠাকুর কিনতে যায় সেদিন তো পারভিনও গিয়েছিল। ফিরে এসে বেদিতে ঠাকুর বসানো নিয়ে যখন হইচই হচ্ছিল, সেই ফাঁকে পারভিন বেরিয়ে গিয়ে হোমের পাঁচিলের পিছন দিকটা দেখে আসে।’

‘আমরা আজ অবধি হোমের পিছনে কোন দিকে কী আছে দেখে উঠতে পারলাম না আর ওরা কখনও সখনও বেরোতে পায়, সেই ফাঁকে ওইসব কাজ সেরে আসে।’ কথার মধ্যেই সঞ্চিতা বিরক্তি প্র‌কাশ করল।

উর্মিলা বলল, ‘তুই থাম। আমাকে ঘটনাটা বলতে দে। আগে থেকেই ওরা সুযোগ খুঁজছিল। পেছনে জেনারেটার চলে যে ঘরে, সেখানে একটা ভাঙা টুল আছে। সেটাকে নিয়ে গিয়ে তার ওপরেই ইট সাজিয়ে রেখে এসেছিল। আজ যখন সকলে পুজো, আরতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল ওরা তখন ওদের কাজ সারছিল। তিনজন টপকে গেছে— সেই সময় লাভলি আর শাকিলা খাওয়ার জল ভরতে গিয়ে ধুপধাপ আওয়াজ পেয়ে ভেবেছিল আমাদের নারকেল গাছটা থেকে নারকেল পড়ছে বুঝি। গিয়ে দেখে নাজিমা আর হেনা পাঁচিল টপকাবার চেষ্টা করছে। না পেরে পড়ে গেছিল নীচে। তখন শাকিলারা চিৎকার শুরু করে। শংকরদা আর কাকলিদি গিয়ে ওদের ধরে ফেলে।’

একদমে কথা শেষ করে উর্মিলা শ্বাস ছাড়ল। তারপর আবার বলল, ‘কী সাংঘাতিক মেয়ের দল ভাব! এবার কত ভোগান্তি হবে কে জানে!’

পরমা জিজ্ঞেস করল, ‘যারা টপকে গিয়েছিল তাদের ধরতে পারা গেল না?’

‘নাঃ। পারলে তো খবর পাওয়া যেত। গার্ডরা খুঁজতে গিয়েছিল, পুকুরের ওদিকে অত আলো নেই। এরা টর্চ নিয়ে গিয়েছিল, মেয়েরা ততক্ষণে কোথায় অন্ধকারে মিশে গেছে, খুঁজে পায়নি। শংকরদা তো তারপর দু’জন গার্ডকে সঙ্গে করে গাড়ি নিয়েও ছুটেছিল। তাও পায়নি। এরই মধ্যে কোথায় যে গেল!’

পরমা বলল, ‘কোথায় যাবে! কী করবে! রাতে ভয় করে না ওদের?’

উর্মিলা বলল, ‘কুকুরদুটো ছাড়া থাকলেও হত।’

সঞ্চিতার অবাক ভাব এখনও যায়নি। ‘কুকুর ছাড়লেও সে তো সেই রাতে। তখন তো সবাই তালাবন্ধ। আমি ভাবছি দু’মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল, ওপরে কাঁটাতারের বেড়া, তাছাড়াও ভাঙা কাচের টুকরো গাঁথা— তাও কী করে পালাল বলো তো!’

‘তোমরা এদিকে এসো।’

সর্বাণীদির ডাক শুনে তিনজনেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। তখন অর্পিতা আর প্রীতিও এসে পড়ল। সর্বাণী মুখ ঘুরিয়ে মৈনাককে বললেন, ‘মিসিং মেয়েগুলোর ডিটেল্‌স নিয়ে নাও। থানায় দিতে হবে।’ তারপর তাকলেন হোম-মাদারদের দিকে। ‘এবার বলো তো, তোমরা কে কোথায় ছিলে তখন?’

অন্য কেউ কিছু বলার আগেই প্রীতি বলে উঠল, ‘আমি ছোটবাড়িতে ছিলাম দিদি।’

উর্মিলা বলল, ‘আমিও ওখানেই।’

‘পুজো চলছে, সেখানে না থেকে দু’জনে একসঙ্গে ওখানে কী করছিলে?’

প্রীতি চোখ নামিয়ে নিল। সে যে বাইরে গিয়েছিল তা বলতে না পেরে হজম করে নিতে হল উর্মিলাকে।

অর্পিতা বলল, ‘আমি বড়বাড়িতেই ছিলাম।’

সঞ্চিতা তাড়াতাড়ি বলল, ‘আমি বাথরুমে গিয়েছিলাম দিদি।’

পরমা বুঝতে পারল, সঞ্চিতা যে খানিক ফাঁক পেয়ে গেটে গিয়ে রাজীবের সঙ্গে কথা বলছিল তা জানানোর মতো নয়। বড়বাড়িতে ছিল— এরকম কথাও আর বলা যাবে না ভেবে মনে যা এসেছে বলে দিল।

‘তুমি কোথায় ছিলে?’

সর্বাণীদি চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। পরমা বলল, ‘পুজোর জায়গায়।’

‘একেবারে প্যান্ডেলেই?’

‘হ্যাঁ।’

একটু থমকে রইলেন সর্বাণী। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, এখন যাও তোমরা। মেয়েদের রাতের খাবার দিয়ে দাও। আমরা থানায় যাচ্ছি। রিপোর্ট লিখিয়ে তারপর বাড়ি যাব। এদিকে সব দেখেশুনে তালা দেবে।’

শুক্লা বললেন, ‘কাল তো আবার ঠাকুর বির্সজন আছে।’

গলায় বিরক্তি উঠে এল সর্বাণীর।  ‘সে দেখা যাবে।’

ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর অর্পিতা বলল, ‘চল যাই এখন। এরপরে কী হবে জানি না।’

পরমা বলল, ‘একটু দাঁড়াও।’

টেবিল থেকে চক আর ডাস্টার তুলে নিয়ে সে চলে গেল দেওয়ালে টাঙানো ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে। বড়বাড়ির একশো বারো থেকে দু’জনকে বাদ দিয়ে দিল। ছোটবাড়ির ছত্রিশ থেকে বাদ এক। এখন মোট একশো পঁয়তাল্লিশ। হিসেবই লিখছে সে কিন্তু কোথায় যেন হিসেব গোলমালও হয়ে চলেছে।

‘হল তোর?’ উর্মিলার কথায় ফিরল পরমা। আলো আর পাখা বন্ধ হল। অফিসঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে এল সবাই।

 

মেয়েরা খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখানে রাত এগারোটার মধ্যে আলো নিভিয়ে দেওয়াই নিয়ম। আজকের ঘটনায় সেই সময় আরও এগিয়ে এসেছে। হোম এখন নিঝুম পুরী। অন্য দিন কুকুরগুলোর গম্ভীর ঘেউ ঘেউ কানে ধাক্কা দেয়। আজ তাদেরও সাড়াশব্দ নেই। অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে হয়তো নিজেদের মতো। দূর থেকে ভেসে আসছে ঢাকের হালকা আওয়াজ। মাইকও বাজছে কোথায়। অন্য জায়গায় তো আর পুজো বন্ধ হয়নি। শুধু এখানে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিপোকার ডাক।

খাওয়ার বাজনা শুনে মেয়েরা এসে দাঁড়িয়েছিল। তবে সবাই নয়। বড়বাড়ির দোতলা-তিনতলা মিলিয়ে অনেকে আসেনি। যারা এসেছে তাদের হাতে থালা। মুখে কোনও কথা নেই। এমনিতে রাতে খাওয়ার সময় মেয়েদের কোনও ঝামেলা থাকে না। ঘুমে ভরা চোখে ঢুলতে ঢুলতে এসে খাওয়া সেরে ফিরে যায়। তবে আজ হলুদ আলোর নীচে ছোট-বড় মুখগুলো ম্লান দেখাচ্ছিল। যেন তাড়াতাড়ি খেয়ে নিজেদের জায়গায় ফিরতে পারলে বাঁচে। গামলা-ডেকচির গায়ে হাতার ঠোকাঠুকিতে যে ঠুংঠাং শব্দ, সেই শব্দেও যেন ভয় লেগে আছে।

বালিশে মাথা রেখে পরমা ভাবছিল— কত আনন্দই না করছিল মেয়েরা এখানকার পুজোকে ঘিরে। আগে থেকেই লিস্ট বানিয়ে রেখেছিল কার কী চাই। ছোট্ট ছোট্ট চিরকুটে লিখে সর্বাণীদির কাছে জমা দিয়েছিল। কেউ লিখেছিল পিঙ্ক নেলপলিশ, মাথার ক্লিপ। কেউ লিখেছিল লাল টিপের পাতা, কেউ খুশি কাচের টিপে। কেউ লিখেছে কানের দুল, হাতের চুড়ি। কারও বা সিঁদুরের কৌটো, আলতার শিশি। নীচে আবার নামও লিখে দিয়েছিল। সঙ্গে তারা পেয়েছে নতুন জামাকাপড়। তাই নিয়েই তারা কত খুশি ছিল এই খাঁচায়।

ভাবতে ভাবতে পরমার মনে হল— এই জায়গাটাকে কি ওরা খাঁচাই মনে করে? সেই খাঁচা থেকেই কি আজ উড়ে গেল তিনটে পাখি?

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৪ 

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

Comments are closed.