রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২৪

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ২৪

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৩ 

রোজকার নিয়মে সারাদিনের কাজ চলছিল। অফিসের বাকি স্টাফরা এসে পড়েছে। তারাও নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছে এতক্ষণে। পরমা টের পাচ্ছিল, শুধু হোম-মাদাররাই নয়, মেয়েরাও অপেক্ষায় রয়েছে বাকি ঘটনার।

দেড়টা নাগাদ খুলে গেল বড় গেট। স্কুলবাস ঢুকছে। প্র‌তিদিনের মতো রান্নাঘরের পিছনের জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াল বাস। দু’বাড়ির তালা খুলে দিল হোম-মাদাররা। মেয়েরা ব্যাগ কাঁধে যার যার ঘরে ঢুকে গেল।

শংকর গিয়ে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। হরিপদ নামতেই সে বলল, ‘তোমায় অফিস ঘরে ডাকছে, চলো।’

হোম-মাদাররা সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। অফিসের সকলেই রয়েছে। গোটা ভিড়টার দিকে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল হরিপদ।

শম্ভুনাথ বললেন, ‘তোমায় বিশ্বাস করে মেয়েদের তোমার সঙ্গে স্কুলে পাঠানো হয়। এতদিন ধরে আসছ এখানে। তুমি কী করে এটা করতে পারলে হরিপদ!’

সে বলল, ‘কী করেছি স্যার। খারাপ কিছু তো করিনি।’

কথাটা শুনেই সর্বাণী প্রীতিকে বললেন, ‘পিঙ্কিকে ডেকে নিয়ে এসো।’

সবাই চুপ করে ছিল। রাগে পরমার কপালের মাঝখানের শিরাটা দপদপ করছে। এখনও স্বীকার করতে চাইছে না লোকটা!

পিঙ্কি এসে বলার পরেও তার মুখের ওপর হরিপদ বলল, ‘ও মিথ্যে বলছে। এই ধরনের খারাপ মেয়েরা মিথ্যে কথাই বলে। দেখুন অন্য কার সঙ্গে—’

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ শংকর এগিয়ে এসে ঝট করে হরিপদর বুকের কাছে জামাটা চেপে ধরল। তারপরেই প্র‌চণ্ড এক থাপ্পড় তার গালে। ‘এই ধরনের মেয়ে! ধরন দেখাচ্ছিস তুই! ওরা খারাপ আর তুই ধোয়া তুলসীপাতা না! একটাও বাজে কথা বলবি না আর। ও মিথ্যে বলছে? তুই তাহলে সত্যিটা বল শুনি।’

মৈনাক উঠে পড়েছেন চেয়ার ছেড়ে। গিয়ে শংকরকে থামালেন। এতক্ষণে হরিপদ নামিয়ে নিয়েছে মুখ।

সর্বাণী মিত্র পিঙ্কিকে ওপরে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর হোম-মাদারদের বললেন, ‘যা কাজ আছে করো তোমরা। এখানে এখন তোমাদের দরকার নেই।’

প্রত্যেকের ভেতরেই রাগ কচকচ করছে। তবু ওরা অফিস ছেড়ে বেরিয়ে এল। প্রীতি বলল, ‘ওকে আরও কয়েক ঘা কষিয়ে দিলে আমি খুশি হতাম। দেখতে চাই ওর কী শাস্তি হয়।’

উর্মিলা সায় দিল। ‘সর্বাণীদি এতক্ষণে থানায় ফোন করে দিয়েছেন। পুলিশ এসে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে যাক ওকে, বেশ হবে।’

অর্পিতা বলল, ‘ওর না হয় শাস্তি হল। কিন্তু পিঙ্কির কী হবে? আমার চিন্তা তাই নিয়ে।’

পরমা অস্থির হয়ে হাতের আঙুল মটকাচ্ছিল। সর্বাণী মিত্র যে কেন তাদের বের করে দিলেন তা বুঝতে পারছিল না সে। বলেই ফেলল, ‘ওই লোকটার সঙ্গে এত কী কথা হচ্ছে বলো তো?’

অর্পিতা দেখল তার দিকে। ‘শান্ত হ। মাথা গরম করে কিছু করতে পারবি? যা করার ওরাই করবে।’

তারা বড়বাড়ির একদিকের কোনায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। এই সময় দেখতে পেল, হরিপদ অফিস থেকে বেরিয়ে আসছে মাথা ঝুঁকিয়ে। তারপর তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে মেন গেটের দিকে চলে যাচ্ছিল সে।

চমকে উঠল পরমা। ‘কী হল ব্যাপারটা? চলে যাচ্ছে কেন? ছাড়া পেল কী করে!’

প্রীতি বলল, ‘আমিও তাই ভাবছি। অদ্ভুত তো!’

তাদের কথা ফুরোনোর আগেই শংকর এসে পড়ল। ‘তোমাদের সবাইকে অফিসে ডাকছে।’

‘ও কোথায় যাচ্ছে শংকরদা?’ জিজ্ঞেস করল পরমা।

‘ওকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছে।’

‘শুধু চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিল? ব্যাস! আর কিছু নয়? ছেড়ে দিল লোকটাকে!’

উর্মিলা বলল, ‘ওই দ্যাখ, বেরিয়েই গেল রে একেবারে।’

রাগে থমথম করছে শংকরের মুখ। ‘এখানের ব্যাপারস্যাপার কিছু বলতে পারব না। গিয়ে শোনো তোমরা।’

অফিস ঘরে ঢুকতেই সর্বাণী মিত্রর হম্বিতম্বির সামনে পড়ল ওরা। ‘কী কর তোমরা সবাই? কোনও দিকে লক্ষ রাখতে পার না! তোমাদের তাহলে মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে কেন?’

বাকিদের মুখ বন্ধ থাকলেও পরমা নিজেকে সামলাতে পারল না। বলল, ‘লক্ষ আমরা ঠিকই রাখি।’

সর্বাণী আরও রেগে বললেন, ‘তাই নাকি! তাহলে হোমের ভেতরে এরকম একটা ঘটনা ঘটল কী করে?’

পরমা থামবে না। আবার বলল, ‘আমি যা দেখেছি সে কথা তো আপনাকে আগেই জানিয়েছিলাম। আপনিই কানে তোলেননি। কোনও ব্যবস্থাও নেননি।’

অন্য সবাই অবাক হয়ে গিয়েছে। যে সাহস কেউ কখনও করেনি সেটাই পরমা করছে! সর্বাণী মিত্রর মুখে মুখে কথা বলছে!

থতমত হয়ে গিয়েছেন সর্বাণীও। তারপর অস্বস্তি কাটাতে বললেন, ‘তখন শুনে বোঝা যায়নি ব্যাপারটা এত সিরিয়াস।’ এটুকু বলার পরেই বোধহয় তিনি নিজের জায়গায় ফিরতে চাইছিলেন। ‘যাই হোক, এখন তোমাদের একটি কথাই বলার। মাথায় গেঁথে নাও ভাল করে। এই ঘটনার একটুখানিও যেন কোনওভাবেই বাইরে না যায়।’

এইসময় শুক্লা বলে ফেললেন, ‘কিন্তু পিঙ্কির কী হবে?’

গলায় গম্ভীর ভাব এনে সর্বাণী বললেন, ‘ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এইভাবে তো রেখে দেওয়া যাবে না। ওয়াশ করিয়ে আনতে হবে ওকে।’ তারপর হোম-মাদারদের দিকে ভাল করে না তাকিয়েই ছুড়ে দিলেন কথা। ‘এখন তোমরা যে যার কাজে যাও।’

বাইরে এসেও রাগ সামলাতে পারছিল না পরমা। বলল, ‘এই সেদিন নিতু তার বাচ্চা রেখে দিয়ে চলে গেল হোম ছেড়ে। উর্মিলাদি, তুমিই বলেছিলে না, নিতুর মা যখন সর্বাণীদির পায়ে পড়ে কেঁদেছিল তখন উনি থানা-পুলিশ করতে চেয়েছিলেন। আর আজ হোমের ভেতরে হোমেরই একটা মেয়ের সঙ্গে এরকম করে একটা লোক বেমালুম উধাও হয়ে গেল, উনি কিছুই করলেন না। উলটে ব্যাপারটাকে চাপা দিতে চাইছেন!’

অর্পিতা হাত চেপে ধরল পরমার। ‘তুই সর্বাণীদিকে বলতে পেরেছিস। আমরা পারিনি। তবু তোকে একটা কথা বলছি, এরকম হলে কিন্তু তুই বিপদে পড়তে পারিস।’

পরমা সোজা তাকাল তার চোখের দিকে। ‘জানি। বিপদ হোক কি আপদ, কিছুই আমার পিছু ছাড়ে না অর্পিতাদি। তারা আমায় বড্ড ভালবাসে।’

এরমধ্যেই উর্মিলা বলল, ‘এমন সব কেন হচ্ছে এখানে? ভয় করছে আমার!’

‘এখন কোন ঋতু চলছে?’ —

আজ ফোর্থ স্যাটারডে। এ মাসে হোম-মাদারদের কেউ ছুটি নেয়নি। পিঙ্কির ঘটনার পর কেউ বলতে পারেনি ছুটির জন্য। আজ খাওয়ার সময় সবাই একসঙ্গে বসেছে। প্র‌ীতির কথাটায় বাকিরা বোবা হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। সে তখন আবার বলল, ‘না, মানে, আমি বলতে চাইছিলাম, আমরা কি অসুস্থ হয়ে পড়েছি? খাবার সময়টুকুও কথা বলছি না।’

সঞ্চিতা বলল, ‘এই তো বর্ষা গেল। সামনে শরৎ।’

এই সময় অর্পিতা প্র‌ীতিকে বলল, ‘কোন ঋতু চাই? তোর যেমন সারা বছরই প্র‌জাপ্র‌তি ঋতু চলছে মনে মনে।’

কথাটা শুনে হেসে ফেলল প্র‌ীতি। অন্যদের মুখেও একচিলতে করে হাসি। যেন প্র‌ীতি আর অর্পিতার কথা সবাইকে হাসানোর জন্যই। পিঙ্কির ঘটনার পর থেকে হোম এমন হয়ে রয়েছে যে হোম-মাদাররা নিজেদের মধ্যেও ভালো করে কথা বলতে পারছে না।

মেয়েরা খেয়ে চলে যাওয়ার পর এক এক করে স্নান সেরেছিল ওরা। তারপর খেতে এসেছে। এখন সকলেরই ভেজা চুল চেয়ারের পিছনে এলানো। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে কপালে, নাকে আর ঠোঁটের ওপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম। খাওয়ার জায়গার পিছনের দেওয়ালের জানলাটা খোলা, সামনের দরজাটাও। হাওয়া নেই যদিও। মাথার ওপরে দুটো ফ্যান ঘুরলেও তাতেও তেমন কাজ হচ্ছে না।

তবে আজকের এই সময়টাই যেন দরকার ছিল ওদের। নিজেদের মধ্যে কথা বলে কোনও সমস্যারই সুরাহা হবে না। কত ধাঁধাই যে চোখ বেঁধে রাখে। তবু কোথাও যদি পৌঁছনো যায়।

এরমধ্যে শুক্লা হালদার একদিন সকালে পিঙ্কিকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিকেলে সে আবার ফেরত চলে আসে। দু-তিন দিন নড়াচড়া বারণ ছিল তার। শুধু পরমা নয়, অন্যরাও বুঝে গিয়েছিল কী ঘটেছে।

হরিপদর জায়গায় এখন স্কুলবাসের অন্য একজন ড্রাইভার রাখা হয়েছে। তবে ওই পর্যন্তই। প্র‌থম কয়েক দিন বাসে একজন হোম-মাদার যাচ্ছিল মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিতে। তারপর আবার যে কে সেই। পরমার মনে হয়েছিল, স্কুলের মেয়েদের সঙ্গে তো কিছু ঘটেনি। তাই বোধহয় সর্বাণীদি ভেবেছেন তাদের পাহারা দিয়ে আর কী হবে! তাও সেই কাজে পরমাকে পাঠানো হয়নি এক দিনও। সর্বাণী মিত্রর মুখের ওপর কথা বলা যে তার একটা বড় কারণ তা জানে পরমা।

পিঙ্কি এখন সবসময় গুম হয়ে বসে থাকে তার বাঙ্কে। বড়বাড়ির দোতলায় গিয়ে তাকে তেমনই পেয়েছে পরমা। কারও সঙ্গে কথা বলে না মেয়েটা। অন্য মেয়েরাও তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে রেখেছিল। পরমা কয়েকজনকে ডেকে বুঝিয়ে বলেছে। বলেছে অর্পিতাও। যদিও অবস্থা যে খুব বদলেছে তা নয়। ভয় হয়, যদি হঠাৎ কিছু করে বসে!

বিকেলে মেয়েরা যখন বাইরে যায় তখনও পিঙ্কি বেরোত না বেশ কয়েক দিন। শুয়ে শুয়ে কাঁদত। অন্য মেয়েরা বলেছিল সে কথা। তারপর পরমা দেখেছে, ঈশিতাদি গিয়ে নিয়ে এসেছেন তাকে। এখন মাঝে মাঝেই পিঙ্কিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি হেঁটে বেড়ান এখানে সেখানে। কথা বলেন। পিঙ্কি চুপ করে হাঁটে পাশে পাশে। কী বোঝান পিঙ্কিকে ঈশিতাদি? জীবনের কোন দিশার কথা বলেন? মেয়েটাকে সান্ত্বনা দেওয়ার আপনজন কই এখানে?

এসব ভাবতে ভাবতেই পরমা অর্পিতার দিকে তাকাল। বলেই ফেলল, ‘আমরা তো যথেষ্ট দোষ দিয়েছি পিঙ্কিকে। কিন্তু কেন এরকম হল বলো তো?’

অর্পিতা বলল, ‘অনেকদিন ধরে তো দেখছি মেয়েদের। বুঝি জানিস, দিনের পর দিন বন্ধ থাকতে থাকতে ডিপ্রে‌শন কাজ করে ওদের মধ্যে। একটা-দুটো আমোদ দিয়ে ভুলিয়ে রাখা যায় না। এখানে তো এদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই।’

মাথা নাড়াল প্র‌ীতি। ‘সে তুমি যাই বল অর্পিতাদি, তা বলে এরকম একটা কাজ করার ইচ্ছে কি ওদের মনে তৈরি হয়? যা সব সহ্য করে এসেছে ওরা! তারপর তো ওর আটকে যাওয়ার কথা ছিল। কেউ কিছু মনে কোরো না, আমি একটা কথা বলছি— শরীরের সুখ, মানে যাকে সেক্স বলে, সেটা কি ওদের থাকে আর? সহজ স্বাভাবিকভাবে পায়নি তো কোনও দিন। তাহলে?’

প্র‌ীতির কথায় অবাক হচ্ছিল পরমা। এত কথা ভেবেছে সে? না কি আগে ভাবত না, এখন ভাবছে? এই প্র‌ীতির মুখ থেকেই তো মেয়েদের নামে কত টিটকিরি শুনেছে একসময় পরমা। তবে এখন তার এইসব প্র‌শ্নের পিছনে আরও জটিল কত প্র‌শ্ন যে পড়ে আছে!

অর্পিতা বলল, ‘তোরা তো সবার কথা জানিস না। ছোটবেলা থেকেই পিঙ্কির মা নেই। বাপটা ছিল হদ্দ মাতাল। ওর যখন চোদ্দো বছর বয়েস তখন ওর বাবা একটা আধবুড়ো লোকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। পরে সেই বর ওকে ছেড়ে চলে যায়। ততদিনে সুখ ভোগ করা হয়ে গেছে না! তারপর পিঙ্কির বাবা ওকে আর একজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। দশ হাজার টাকায়। কে বল তো সেই লোক? ওরই বাবার বন্ধু। সে আবার কিছুদিন নিজের কাছে রেখে মেয়েটাকে ইউ পি-তে চালান করে দেয়। কাদের বাড়িতে কাজ করার জন্য। দিনের পর দিন মার খেয়েছে সেখানে। কোন মেয়ে কোথায় পড়ে পড়ে পচছে তার খবর কে রাখে! তবু তো ওখানকার পুলিশ উদ্ধার করেছিল ওকে। তারপর এখানকার পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। ও এসে অন্য একটা হোমে ছিল। তারপর এই হোমে পৌঁছয়। তাতে কি ওর জীবন বদলেছে? বদলাবে কোনও দিন? কতখানি পচা ঘা মেয়েটার মনে রয়েছে বল তো!’

বলতে বলতে থেমে গিয়ে শ্বাস ফেলল অর্পিতা। ‘আমার মনে হয় এসব কথা পিঙ্কি কিছুটা বা হয়তো অনেকটা বলে ফেলেছিল হরিপদকে। ওই যে গল্প করত। এদের কথা শোনার তো কেউ নেই রে! কোথাও থেকে যদি একটুও সহানুভূতি পায় তাহলে তার কাছে এরা নরম হয়ে যায়। তখনই বোধহয়—’

পরমা চুপ করে ভাবছিল। হতে পারে অর্পিতার কথা ঠিক। হয়তো সামান্য কিছু সময়ের জন্য নিজেকে ছেড়ে দিয়েছিল পিঙ্কি। লোকটাও তার সুযোগ নিয়েছে। বাইরের পৃথিবীতে অনেক মানুষ তাদের অবসাদ, মনখারাপ সামলাতে পারে না। কত উপায় খোঁজে। কেউ কেউ হেরেও যায় জীবনের কাছে। আর এদের সামনে তো কোনও উপায়ই নেই। পায়েল বলে মেয়েটা গলায় ফাঁস নেওয়ার আগে ব্লেড দিয়ে হাত কেটে ফেলার চেষ্টা করেছিল। সে তো একা নয়। এরকম এখানে আরও আছে যারা হাতে ব্লেড চালিয়ে দিয়েছিল। পরমা জেনেছে তাদের কথা। এখন হয়তো তারা শান্ত কিন্তু পরে যে কেউ এরকম করবে না তার কোনও ঠিক নেই। ভালবাসা, সুখ, আদর— এর কোনওটাই পিঙ্কি পায়নি ওই লোকটার কাছ থেকে। কিছুক্ষণের জন্য হয়তো নকলকে আসল ভেবেছিল। তারপর সব হাতের বাইরে চলে যায়। মানুষের মন সরল হতে পারে, জটিলও। আবার অসাড়ও তো হয়ে যেতে পারে কখনও।

সঞ্চিতার কথায় ভাবনা ভেঙে গেল পরমার। সে বলছিল, ‘সর্বাণীদির কিন্তু ওই লোকটাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত হয়নি। শাস্তি পাওয়ার দরকার ছিল না ওর!’

অর্পিতা বলল, ‘ওকে শাস্তি দিতে গেলে যে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যেত রে। পিঙ্কিকে নিয়েও টানাটানি পড়ত। বলা হত, তারও নিশ্চয়ই সম্মতি ছিল, নইলে এরকম একটা ঘটনা ঘটে কী করে। সবচেয়ে বড় কথা, হোমের বদনাম।’

এইবার পরমা বলল, ‘এখন সে কথা উঠছে অর্পিতাদি কিন্তু একটু সাবধান থাকলে ঘটনাটাই ঘটত না। সেটাই ছিল আমার রাগের কারণ। সর্বাণীদি পরের ব্যাপারটা ভাবলেন, আগেরটা ভাবলেন না। তবে দোষ আমারও আছে। তখন ওরকম দেখে পিঙ্কির সঙ্গে যদি একটু কথা বলতাম— যদি জানার চেষ্টা করতাম কেন ও যায় লোকটার কাছে—।’

সঞ্চিতা বলল, ‘তুমি নিজেকে দোষ দিয়ো না। কত মেয়ের কাছ থেকে কত কথা জানবে তুমি? তাছাড়া সবাই কি নিজের কথা বলে? এমনিতেই বরাবরই আমি দেখেছি পিঙ্কি খুব চুপচাপ। আসলে ওরা যখন যেটুকু বলে সেটাই অনেক।  ওদের কথা তো চাপা পড়েই থাকে।’

উর্মিলার খাওয়া হয়ে গিয়েছে। সে সামনে থালা নামিয়ে বসে ছিল চুপ করে। এবার বলল, ‘এরপরেও দেখবি হোমের সব আবার আগের মতোই চলছে। সামনে পুজো আসছে। মেয়েগুলো তাতে হুটোপাটি শুরু করে দেবে। চলে গেলেই ঝিমিয়ে পড়বে আবার।’

হোমে যে দুর্গাপুজো হয় তা তো পরমা জেনেছে আগেই। থালা হাতে উঠে দাঁড়াল সে। প্র‌ীতিরও হয়ে গেছে। সে বলল, ‘পুজোর মাসে তো সর্বাণীদি ছুটি দেবেন না কাউকে। বাড়িও যাওয়া হবে না। মেয়েটাকে বড় দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। মাঝে মাঝে কেমন যেন ভয় করে।’

হাত ধুয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল পরমা। বাকিরা এখনও ভেতরেই। রোদের ঝাঁঝ হঠাৎ কিছুটা পড়ে গিয়েছে। এই সময়টায় কোনও কোনওদিন কিছু বুঝতে না দিয়েই আচমকা বৃষ্টি নামে। মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ আসে। তারপর কাচভাঙা রোদ্দুর ওঠে। গাছের পাতা চকচক করে তাতে।

সে মাথা তুলে ওপর দিকে তাকাল। এখন অবশ্য পরিষ্কার নীল আকাশ। সেখানে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ। কেউ জমে আছে।  কেউ বা ভেসে চলেছে। যেন শরতের চিঠি। ঋতু আসে নিজের নিয়মে। চলে যায়। আবার ফিরে আসে। সে মানুষের খোঁজ রাখে না। মানুষ বড় এলোমেলো।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২৩  

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

Comments are closed.