পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মৃত্তিকা মাইতি

    মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ২২

    ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

    উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২১

    নবনীতা দত্ত খবর দিয়েছেন— কয়েকজন গেস্ট আনছেন হোমে। তাদের আপ্যায়নে যেন কোনও ত্রুটি না থাকে। এসে হতাশ না হতে হয়।

    এইরকম খবরে কার কী কাজ তা অফিসের সকলে জানে। তাদের আজ চেয়ারে গা এলিয়ে দেওয়ার জো নেই। সকলেই তটস্থ। এই বুঝি একজিকিউটিভ ডিরেক্টরের গাড়ি ঢুকল। শম্ভুনাথ গিয়ে গার্ডদের বুঝিয়ে এসেছেন, গেট খুলতে এক মিনিটও যেন দেরি না হয়। স্কুলবাসের ড্রাইভার হরিপদকে দিয়ে কতগুলো ডাবও পাড়িয়ে রেখেছেন তিনি। অনু আর রিনি অফিসটাকে সুন্দর করে গুছিয়েছে। সর্বাণী শংকরকে হোটেলে পাঠিয়ে দিয়েছেন ভাল খাবার আনতে।

    মাসের শেষ শনিবার যেমন হোম সাফাইয়ের কাজ হয় তেমনই হয়েছিল গতমাসেও। তবু এখন আবার ছোটবাড়ির মেয়েদের দিয়ে ঘরের নোংরা পরিষ্কার করিয়েছে উর্মিলা। জানলায় গোঁজা, বাঙ্কে ঝোলানো যত ন্যাকড়া চোকড়া সব টেনে বের করেছে। ওদিকে বড়বাড়িতে অর্পিতাও তাই। মেয়েদের দিয়ে পুরো ঘর ধুইয়েছে। বাথরুমগুলো অ্যাসিড ঢেলে ঢেলে ফর্সা করে ফেলেছে।

    আনন্দে আছে রিমা। নবনীতা দত্ত স্পেশাল ড্রেস পাঠিয়েছেন তাকে। গোলাপি রঙের আঁটো একটা টপ। হাঁটুর ওপর অবধি চাপা মাখন রঙের স্কার্ট। সেসব পরে শ্যাম্পু করা চুল উড়িয়ে নখে লাগানো নেলপলিশে ফুঁ দিতে দিতে অপেক্ষায় রয়েছে সে।

    হোম-মাদাররাও একেবারে পরিপাটি। একমাত্র পরমারই কিছু বোধগম্য হচ্ছে না। এতদিন শুধু গল্পই শুনেছে। আজ চাক্ষুস করবে। না জানি কী হয়! সে আসার পর এই প্র‌থম ফরেনাররা আসছে হোমে। ওই শব্দটাই তো বারবার কানে এসেছে তার।

    গেট দিয়ে ঢুকল নবনীতা দত্তর সেই দামি গাড়ি। পিছনে আরও একটা। এগিয়ে গেলেন সর্বাণী, শম্ভুনাথ আর মৈনাক। হ্যান্ডশেক, নমস্কার, মাপা হাসি।

    দূরে দাঁড়িয়েও হোম-মাদাররা দেখতে পাচ্ছিল সব। অফিসের বাইরে কয়েকটা চেয়ার পাতা। শংকর ডাব নিয়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষ্ণা, ঈশিতা, মঞ্জরীও রয়েছেন সেখানে। প্র‌ীতি উর্মিলার গায়ে কনুই দিয়ে ঠেলা দিল। ‘ওই দ্যাখো, ডাব খাচ্ছে। চলো না, একটু ভাব জমাই। তাতে যদি আমাদের কপালেও এক-আধবার বিদেশ থাকে।’

    অমনি উর্মিলা চিমটি কাটল। ‘কোন ভাষায় কথা বলবি? ইংরেজি তো বলতে পারিস না। না কি বাংলায় বলবি— আপনাদের আমার খুব পছন্দ। আপনাদের দেশটা একবার দেখতে চাই। নিয়ে চলুন না!’

    সঞ্চিতা, পরমা আর অর্পিতা চুপ থাকতে পারল না। হেসে উঠল খিলখিল করে।

    তবু দমবে না প্র‌ীতি। বলল, ‘কেন? হাত-পা নেড়ে বুঝিয়ে দেব। নয়তো ভালবেসে ফেলব। কোথায় যেন শুনেছিলাম, সাহেবরা নাকি ইন্ডিয়ায় এসে কালো মেয়ে বিয়ে করে নিয়ে যায়।’

    অর্পিতা আজ ইয়ার্কিতে যোগ দিল। ‘তাহলে তো সঞ্চিতা আর পরমার চান্স আছে।’

     

    উর্মিলারও বেশ মুখ খুলেছে। বলল, ‘পরমার কথা ছাড়ো। সঞ্চিতা চেষ্টা করতে পারে। কাউকে রাজি করাতে পারলে প্র‌ীতিকেও সঙ্গে নিতে পারবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, ও আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।’

    প্র‌ীতি অমনি অর্পিতার পাশ থেকে সরে এসে সঞ্চিতার হাত ধরে ঝুলে পড়ল। ‘প্লিজ সঞ্চিতা, যা বলবি তাই করে দেব। পটি করার পর ধুইয়েও দিতে পারি। চারজন তো এসেছে, প্লিজ, তুই ওদের একটাকে অন্তত পটা।’

    প্র‌ীতি কথা বলতে শুরু করলে অনেক সময় মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তার এই কথাটায় বাকি সবার চোখ-মুখ কুঁচকে গেল।

    অর্পিতা বলল, ‘সে গুড়ে বালি। সঞ্চিতার মন তো অন্যের কাছে। এক মন ক’জনকে দেবে?’

    প্র‌ীতি সঙ্গে সঙ্গে অর্পিতাকে ধরল, ‘তুমি তাহলে একটাকে পটাও। আমাদের সকলের ঘোরা হয়ে যায়।’

    ‘বেশ তো, খুঁজে দে একটা বিদেশি বুড়ো।’

    মাথা দোলাল প্র‌ীতি। চোখ মটকে তাকাল। ‘হুঁ, রস জেগেছে মনে। আমার সঙ্গে থেকে উন্নতি হচ্ছে!’

    পরমা বলল, ‘ওটাকে সঙ্গে থাকা নয়, সঙ্গদোষ বলে।’

    সবাই হেসে উঠল আবার।

    পরমা তারপর বলল, ‘অনেকক্ষণ হয়ে গেছে আমরা এখানে। কেউ দেখলে রক্ষে থাকবে না।’

    অর্পিতা তাকাল তার দিকে। ‘তুই কী ভেবেছিস, দ্যাখেনি? এ নিয়ে কেউ কথা বলবে না। সবাই আজ নবনীতাদির কাছে টাইট হয়ে গেছে। শম্ভুনাথকে দ্যাখ না, কেমন পিছু পিছু ঘুরছে। ওসব না করলে নবনীতাদি ওর চাকরি খেয়ে নেবেন। উনি না থাকলে শের। ওর সামনে ভিগি বিল্লি।’

    ‘ওরা সাহেবদের কতখানি খুশি করতে পারছে সেটাই দেখবেন নবনীতাদি।’ বলল সঞ্চিতা।

    প্র‌ীতি বলল, ‘কত ভালো কাজ করছে তাই তো ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে ওদের। যাওয়ার আগে কিছু দিয়ে যাবে। ওদের অবশ্য তা হাতের ময়লা কিন্তু এদের কাছে তাই ঢের।’

    পরমা দেখল, নবনীতা দত্তর সঙ্গে বাকিরা ছাড়া রিমাও ঘুরছে। হোমে আর সব মেয়েরা তালা বন্ধ। শুধু রিমাকে সঙ্গে নিয়েছেন তিনি। মাঝে মাঝেই সাহেবদের কী বলছেন নবনীতা আর তারা মাথা দোলাচ্ছেন। কারও খেয়াল নেই, সকলের শেষে একটু দূরে একটা ছড়ি হাতে মাথা দোলাতে দোলাতে চলেছে মণিও। ওকে এখন ডাকতে গেলেও মুশকিল। চেঁচামেচি জুড়ে দিতে পারে। তাহলে আবার মানসম্মান নিয়ে টানাটানি।

    হোমের সামনে পিছনে ঘোরা হল। স্কুলঘর, বুটিকঘর, ডাক্তারখানা, কলপাড় সবই ওদের নিয়ে দেখালেন নবনীতা দত্ত। বাইরেটা দেখা হলে শেষ হলে বড়বাড়িতে ঢুকল সবাই।

    প্র‌ীতি বলল, ‘এবার একটা রগড় হবে।’

    ‘সেটা আবার কী?’ জিজ্ঞেস করল পরমা।

    ‘মেয়েরা এবার নাচ দেখাবে ওদের। সঙ্গে হিন্দি, বাংলা, যা খুশি গান।’

    ‘ওরা বুঝবে না কি?’

    ‘বুঝুক না বুঝুক, মজা পায়। তাছাড়া সাহেবরা কিছু ইংলিশ মিউজিকও চালিয়ে দেয়। মেয়েরা তার তালেও নাচে আর ওরা ভিডিও করে নেয়।’

    হেসে ফেলল পরমা। ‘দেখতে গেলে হত।’

    ‘উঁহু। যতক্ষণ ওরা থাকবে, ধারেকাছেও যাওয়া বারণ আমাদের। নবনীতাদির পছন্দ নয় আমরা গিয়ে ঘুরঘুর করি। একবার খুব বকা খেয়েছিল প্র‌ীতি।’ বলল অর্পিতা।

     

    এই সময় বড়বাড়ির ভেতর থেকে গান ভেসে এল। কিন্তু যা এল তা শুনে পরমা হতভম্ব। পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে—  দয়ালবাবা কলা খাবা/ গাছ লাগাইয়া খাও/ পরের কলার দিকে কেন মিটমিটাইয়া চাও/ বাবা গো, পরের কলার দিকে কেন মিটমিটাইয়া…

    বাইরে ওদের হাসি আর থামে না। এতক্ষণ তারা রান্নাঘরটার পিছনে বাগানে দাঁড়িয়ে ছিল। হাসির চোটে বসেই পড়ল সবাই।

    ‘এইসব গান শুনছে ওরা!’ শংকরদার মোবাইলে যা থাকে মেয়েরা তাতেই নাচে। তা বলে এই গান!

    সঞ্চিতা বলল, ‘ওদের সঙ্গে গানের কথাগুলো বেশ যাচ্ছে কিন্তু। নবনীতাদি তো ওদের দয়ালবাবাই ভাবেন।’

    একটু পরেই গান বদলে গেল। এবার লুঙ্গি ড্যান্স লুঙ্গি ড্যান্স…। গানের মাঝে সাহেবরা যা বলছেন তা মিশে যাচ্ছে তার সঙ্গেই। তবে দুটো গানের ফাঁকে হাততালি শোনা গেল আর ‘ভেরি নাইস, ভেরি নাইস।’

    প্র‌ীতি থাকতে পারল না। ‘সত্যিই, ওরা কী বুঝছে বল তো যে ভেরি নাইস, ভেরি নাইস করছে!’

    উর্মিলা প্র‌ীতিকে খোঁচা মেরে বলল, ‘তুই চুলবুল করছিস কেন? দেখতে না পেয়ে রাগ হচ্ছে?’

    প্র‌ীতি মুখ বেঁকাল। ‘ওই তো নাচ, দেখার আছেটা কী!’

    ভেতরে নাচগানের আসর শেষ হলে বাইরে এলেন শুক্লা হালদার। হোম-মাদারদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গেস্টদের জন্যে যে প্লেটগুলো বের করা হয়েছে সেগুলো কেউ এনে দাও রান্নাঘর থেকে।’

    কয়েকটা নতুন কাপ-প্লেট আর কিছু বড় বড় ডিশ অফিসের আলমারিতে তোলা থাকে। বিশেষ অতিথি এলে বেরোয়। কাজ হয়ে গেলে আবার আলমারিতে উঠে যায়। সেগুলোই ধুয়ে রাখার জন্য দেওয়া হয়েছিল সবিতামাসির হেল্পারদের।

    সঞ্চিতা এনে দিল প্লেটগুলো। শুক্লা বললেন, ‘মেয়েদের খাবার দিয়ে তোমরা নিজেরাও খেয়ে নাও। এদিকে কখন মিটবে কে জানে।’

    দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর অতিথিরা আরও কিছুক্ষণ বড়বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে কাটিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলেন।

    পরমা অর্পিতাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা ছোটবাড়িতে গেলেন না?’

    ‘না। একবার কয়েকজনকে নিয়ে ঢুকেছিলেন নবনীতাদি। কিন্তু মেয়েরা তাদের হাত ধরে টানাটানি শুরু করেছিল। ওদের অসভ্যতায় উনি নাকি অপমানিত হয়েছিলেন। তারপর থেকে কোনও গেস্টকেই আর ওখানে নিয়ে যান না।’

    নবনীতা দত্তর গাড়ির হর্ন বাজছিল বারবার। বড়বাড়ি থেকে একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে হন্তহন্ত হয়ে বেরিয়ে রিমা গাড়িতে গিয়ে বসল। বেরিয়ে গেল পরপর দুটো গাড়ি। শম্ভুনাথ, সর্বাণীরা ফিরে গেলেন অফিসে।

    উর্মিলা বলল, ‘বাঁচা গেল। আজকের কাজ হয়ে গেছে। এবার অফিসের সবাই বেরিয়ে যাবে।’

    ঘড়ি দেখল পরমা। বিকেল চারটে। দুটো বাড়িরই তালা খোলা। মেয়েরা বেরোতে পারবে এবার। তবে তার মাথায় ঘুরছে রিমার ব্যাপারটা। অর্পিতাদি বলেছিল নবনীতাদির গাড়ি এসে রিমাকে নিয়ে যায়। আজ তো সে ওদের সঙ্গেই গেল। কোথায় গেল? কেন গেল?

    ওরা সবাই রান্নাঘরে গিয়ে বসল। সবিতামাসির চা হয়ে গিয়েছে। আন্টিদের দেখে চা ঢেলে দিল সে। চায়ের কাপ হাতে পরমা দেখতে পেল শম্ভুনাথ আর মৈনাক রওনা দিয়েছেন গেটের দিকে। বাকিরাও যাচ্ছে পিছনে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে।

    একটু পরে সর্বাণী আর শুক্লা একসঙ্গে এলেন হোম-মাদারদের কাছেই। ‘আজ আর মেয়েদের ছাড়ার দরকার নেই।’ অর্পিতার হাতে চাবির গোছা ধরিয়ে দিলেন সর্বাণী। ‘দু’বাড়ির গেটে আর অফিসে তালা দিয়ে দিয়ো। আর হ্যাঁ, রিমা আজ ফিরবে না।’

    ওরা বেরিয়ে যেতেই অর্পিতাকেও উঠতে হল। তখনই পরমা বলে ফেলল, ‘রিমা ফিরবে না কেন?’

    ‘সাহেবদের কাছে নাচগানের এখনও বাকি আছে। সেই জন্যে নিয়ে গেলেন নবনীতাদি।’ বলল উর্মিলা।

    তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল প্র‌ীতি। ‘শুধু ওদের কথা কেন? নবনীতাদির ছেলের কথাটাও বলো। বয়স হয়ে গেছে, বিয়ে হয়নি। যায় না রিমা? কে কী বলবে!’

    কথা শুনে আঁতকে উঠল পরমা। ‘এ কী বলছ প্র‌ীতিদি! তাও আবার হয় না কি? এ তো সাংঘাতিক!’

    ‘হয় হয়। তুই তো আগে দেখিসনি, তাই অবাক হচ্ছিস।’

    বিশ্বাস হচ্ছিল না প্র‌ীতির কথা। তাই উর্মিলার দিকে তাকাল পরমা।

    উর্মিলা চোখের পাতা ফেলে সায় দিল। ‘সেইরকমই তো রটনা আছে হোমে। সবাই জানে। মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস নেই কারও। আমাদেরও নেই।’

    সঞ্চিতা বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও তো শুনেছি। দেখেওছি।’

    পরমা তবু মানতে পারছিল না। ‘রটনা মানেই সেটা যে সত্যি তা তো নাও হতে পারে।’

    প্র‌ীতি বলল, ‘তাহলে তুই বল রিমা কোথায় গেল। আচ্ছা, অর্পিতাদি আসুক, দ্যাখ কী বলে।’

    পরমার একটা কথা মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকার পর সেটা না বলে পারল না সে। ‘রিমা সহ্য করছে কেন?’

    গলা ভারী হয়ে গেল উর্মিলার। ‘যাদের আশ্রয়ে আছে তারা যা বলবে তাই তো করতে হবে।’

    প্র‌ীতি যদিও তারমধ্যেই আবার ফোড়ন কাটল। ‘আমার মনে হয় না পুরোটাই ও বাধ্য হয়ে করে। এক তো ওদের অভ্যেস আছে। তাছাড়া নবনীতাদিকে খুশি রাখলে সবরকম সুযোগ সুবিধে পাওয়া যায়। অন্য মেয়েদের দেখিস, সাড়া করতে পায়? আর রিমাকে দ্যাখ। আমাদেরকেই ওকে মেনে চলতে হয়। বাজে লাইনের মেয়ে একটা, তাকে মান্য করতে হবে? বল তো!’

    উর্মিলা প্র‌ীতিকে থামাল। সব বন্ধ করে অর্পিতা ফিরে আসছে। সে বলল, ‘এসব কথা বলিস না এখন।’

    তবু প্র‌ীতি থামল না। বিড়বিড় করে বলল, ‘অর্পিতাদি এতদিন আছে এখানে, জানে না নাকি!’

    এবার পরমা বলে উঠল, ‘তুমি থামো প্র‌ীতিদি। ভাল লাগছে না এসব শুনতে।’

     

    সবাই চুপ করে গেল। বেরিয়ে এল পরমা। অর্পিতা এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। পরমা কিছু বলেনি। তবু সে বলল, ‘রিমার কথা ভাবছিস, না? গরীব ঘরের সুন্দরী মেয়ে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা ওকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। মাসি-মেসোর কাছে মানুষ। সেই মেসোই ওকে বিক্রি করে দিয়েছিল। ছোটবেলায় যা কিছু পায়নি তার সব বোধহয় এখন উশুল করে নিতে চায় মেয়েটা। ও যে সুন্দরী তা জেনেবুঝেই ফায়দা তুলতে চায় হয়তো। ভালভাবে বেঁচে থাকতে চায়। যেখানেই হোক।’

    মনখারাপ হয়ে যাচ্ছে পরমার। কত অলিগলি থেকে উদ্ধার করে আনা মেয়েরা এখানে এসে বেঁচে থাকে। সত্যিই কি তাদের মধ্যে রিমার মতো কেউ এরকম করে? করতে বাধ্য হয়? ভাবা যাচ্ছে না। যা কিছু এখানে ঘটে চলেছে তা কি ভালো না মন্দ? এই যে পরমা রয়েছে, এখান থেকে কোনটা নেবে সে? মন্দ তো কেউ নিতে চায় না। ভালোর দিকেই হাত বাড়ায়। এই আশ্রয় তাকে কী দিচ্ছে? সে-ই বা কী দিতে পারছে তাকে? ভাবতে গিয়ে কেমন যেন রাগ ছড়িয়ে পড়তে থাকল মাথায়। একটা মেয়েকে বের করে নিয়ে চলে যাচ্ছে, যাদের বলার তারা কোনও কথা বলতে পারল না অথচ অন্য মেয়েদের আটক রাখার হুকুম জারি করে গেল! এখানে এরকম হবে কেন?  কেন কেউ কিছু বলবে না?

    আচমকা ঘুরে সে রান্নাঘরে ফিরে গেল। বাকিরা তখনও সেখানেই বসে। পরমা বলল, ‘তুমি কি আমায় চাবি দেবে অর্পিতাদি? আমি গিয়ে দু’বাড়ির তালা খুলে দিচ্ছি। কেন আজ বেরোবে না মেয়েরা?’

    অবাক হয়ে অর্পিতা তাকাল তার দিকে। ‘সর্বাণীদি তো সেইরকমই বলে গেলেন। ওরা কেউ নেই যে!’

    ‘আমি শুনব না সে কথা। শুধু আমাদের ভরসায় বেরোতে পারে না? আমরা তাহলে আছি কী করতে? সারাদিনে এই একবারই তো বাইরের মুখ দ্যাখে মেয়েরা। ওদের কি শাস্তি দেওয়া হচ্ছে? আর যাই হোক, এটা নিয়ম নয় নিশ্চয়ই।’

    মাথা নাড়াল অর্পিতা। ‘না, তা তো নয়ই।’

    ওদের কথার মাঝখানে উর্মিলা বলে উঠল, ‘পরমা ঠিকই বলেছে। তালা খুলে দেওয়াই দরকার।’

    প্র‌ীতি পরমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা কি তোর প্র‌তিবাদ? তারপর যদি কেউ খবরটা লাগায় ওদের কানে!’

    সঞ্চিতা বলল ‘কে লাগাবে?’

    ‘মেয়েরাই তো বলে দিতে পারে।’

    মাথা ঝুঁকিয়ে বসে ছিল অর্পিতা। পিঠ সোজা করে পরমাকে বলল, ‘তুই হঠাৎ খেপে গেলি কেন রে আজ? এখানে এরকম কোনওদিন হয়নি।’

    পরমা এগিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। ‘তুমি চাও না এরকম হোক?’

    অর্পিতা চোখ নামিয়ে নিল। ‘চাইলেই তো হবে না।’ তারপর চাবির গোছাটা মুঠোর ভেতরে শক্ত করে ধরে বলল, ‘আমি পারব না রে।’

    পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

    এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

    অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

    মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More