পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২১

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ২১

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২০

 

ঈদ বলে অফিস ছুটি। তবে সর্বাণীদি আর শুক্লাদি এসেছিলেন। জুলেখার কথাটা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল পরমা। সেইসঙ্গে খুশিও ঝলমল করে উঠল মনে। তার মানে বাংলাদেশের পুলিশ জুলেখার বাড়ি অবধি পৌঁছতে পেরেছে শেষপর্যন্ত। এখানকার পুলিশ যোগাযোগ রাখছিল তাদের সঙ্গে। কত মেয়ে তো তাদের ঠিকানার হদিশই দিতে পারে না। জুলেখা যে একসময় কিছুটা বলতে পেরেছিল তা তার কাছ থেকেই জেনেছিল পরমা। বলেছিল তাদের জায়গাটার নাম শেরপুর।

সে বলল, ‘এ তো খুব ভালো খবর। তাহলে কাঁদছিস কেন? কী কথা হল মায়ের সঙ্গে? আর কারও সঙ্গে হয়নি? বাবা, ভাই-বোন? এবার দেখিস, তুই বাড়ি ফিরতে পারবি।’

জুলেখার মুখে হাসি ফুটল না। ‘আমি তো কতবার রোজা রেখেছি আন্টি। আল্লার কাছে দোয়া করেছি। এবারও রমজান গেল কিন্তু আল্লা আমার দোয়া কবুল করেনি। আম্মি ফোনে কাঁদতেছিল। আর আব্বুজান কথাই বলেনি আমার সাথে।’

পরমা বলল, ‘এত বছর পর তোর গলা শুনল, মায়ের তো কান্না পাওয়ারই কথা। কিন্তু তোর বাবা কথা বলল না কেন? মেয়েকে পেয়েও কথা বলার ইচ্ছে হল না!’

‘আমার বর সেখানে খারাপ কথা রটায়েছে। বলেছে, আমি কোন ছেলের সাথে পলায়েছি। সেখানকার লোকে তাই জানে। আব্বুজান বোধহয় ভয় পেতেছে।’

‘সে কী, নিজের মেয়েকে বিশ্বাস না করে বাইরের লোকের কথায় কান দিচ্ছে তোর বাবা! মা কী বলল?’

‘আম্মি বলল, তোর আব্বুর সঙ্গে কথা বলে পরে ফোন করব।’

পরমার রাগ হচ্ছিল। মেয়ের খোঁজ পেয়ে বাবা-মা কোথায় খুশি হবে, তা নয়, তাকে ফেলে সমাজের ভয় পাচ্ছে!

আবার ঝেঁপে এল জুলেখার কান্না। ‘আন্টি, ওরা যদি আমারে ফেরত নিতে না চায়! কী করব আমি? বরও তো ঘরে নেবে না। কোথায় যাব?’

এমন একটা দিনও যায়নি যেদিন বাবা-মা, ভাই-বোনের কথা ভেবে চোখের জল ফেলেনি জুলেখা। আজ তারাই চাইছে না তাকে। যদিও বা বাড়ির খোঁজ পেয়েছে মেয়েটা কিন্তু ফিরে যাওয়ার রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। এখন কী হবে জুলেখার? মুম্বইয়ের কামাথিপুরার কোনও বন্ধ ঘরে আজ একজন তো পরের দিন অন্যজনের হাতের পুতুল হতে হয়েছিল মেয়েটাকে। টাকা দিয়ে খানিকক্ষণের জন্য কেনা পুতুল। তারা খেলা করেছে তাকে নিয়ে। কে বাধ্য করেছিল জুলেখাকে? কারা? কোথায় ছিল সমাজ নামের এই বিচিত্র বস্তুটি? ভাবতে গিয়ে বিরক্তি লাগছিল পরমার।

এর আগে যখন এরকম কথা উঠেছে তখন তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল পরমা। আজ বলার মতো কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর চেয়ে তো বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়াই ভাল ছিল জুলেখার। ভাবত বাবা-মাকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। না, তা হয় না। এখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার কথা কি ভাবা যায় কখনও! আপনজনের কাছে যেতে কার না মন চায়? সে বলল, ‘ভাবিস না, তোর বাড়ির লোকের সঙ্গে আবার কথা হবে। ঠিক একদিন ফিরতে পারবি তাদের কাছে। আজকের দিনে মনখারাপ করে বসে থাকিস না। দেখবি, সব ভালো হবে। আচ্ছা, আমার জন্যে সিমুই নিয়ে এসেছিলি না? দে, তুই-ই খাইয়ে দে।’ বলে মুখ হাঁ করল পরমা।

চোখে এখনও জল। তবে এবার জুলেখার মুখে হাসি। সে চামচে করে পরমার মুখে সিমুই তুলে দিচ্ছিল।

পরমা সেই চামচেই আবার খাইয়ে দিল জুলেখাকে। তারপর হেসে বলল, ‘ঈদ মুবারক।’

 

 

সকাল থেকেই শরীরটা কেমন ভার ভার ছিল পরমার। সারাদিনের কাজ কোনওরকমে সেরেছে। শরীরে যে তাপ সে চেপে রেখেছিল এখন সেটা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। রাতের খাবারও ঠিক করে খেতে পারেনি।

বিছানায় উঠে জুলেখাকে আলো নেভাতে বলে শুয়ে পড়ল পরমা। শীত শীত করছে। পাশে রাখা চাদরটা মাথা অবধি চাপিয়ে নিল। শুনতে পেল জুলেখা বাকি মেয়েদের ধমকাচ্ছে। ‘আর গল্প নয়। আন্টি শুতে এসেছে, বিরক্ত করিস না তোরা।’

আলো নিভিয়ে পরমার বিছানার কাছে গেল জুলেখা। আন্টিকে চাদর মুড়ি দিতে দেখে তার মনটা কেমন করছে। এরকম তো আন্টি করে না কখনও। শোওয়ার আগে মেয়েদের খোঁজ নেয়, তারা বাঙ্কে উঠে গেলে আলো নেভায়। সে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল বিছানার পাশে। ‘শরীর খারাপ লাগতেছে আন্টি?’

পরমার কোনও কথা নেই দেখে আস্তে আস্তে চাদর সরিয়ে তার কপালে হাত রাখল জুলেখা। ‘এ কী, তোমার তো খুব জ্বর!’

পরমা কিছু বলতে পারছিল না। শরীর কাঁপছে।

‘তোমার কি শীত লাগে আন্টি?’

কথাটা বলার পর আর উত্তরের অপেক্ষা না করে অন্ধকার ঠেলে নিজের বাঙ্কে গেল জুলেখা। শীতকালে গায়ে দেওয়ার জন্যে কম্বল দেওয়াই থাকে মেয়েদের। অন্য সময় সেটা তারা বিছানায় পেতে রাখে পাতলা তোশকের তলায়। সেখান থেকে কম্বলটা টেনে বের করল। সঙ্গে নিল বিছানার চাদরটাও। তারপর পরমার কাছে ফিরে গিয়ে সেসব তার গায়ে চাপা দিয়ে দিল। বিড়বিড় করে বলছিল, ‘এবার আরাম হবে দেখো।’

আরও খানিকক্ষণ মেঝেতেই বসে রইল জুলেখা। দেখল তখনও তার আন্টি থরথর করে কাঁপছে। উঠে বিছানার একপাশে বসে পড়ল সে। তারপর উপুড় হয়ে দু’হাতে জড়িয়ে জাপটে নিল পরমাকে। যেন শরীরের সব তাপ শুষে নিতে চায়। এখন কোথাও যাবে না জুলেখা। দরকার হলে এভাবেই সারারাত কাটিয়ে দিতে পারে সে।

কিছু সময় কেটে যাওয়ার পর পরমার কাঁপুনি কমল। জুলেখা তার কপালে, গলায় হাত দিয়ে বুঝল ঘাম দিচ্ছে। জ্বরটা নামবে তাহলে। তবু পাশ থেকে নড়ল না জুলেখা।

চোখ খুলতে পরমা দেখল— রোদ ঢুকেছে ঘরে। জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে একেবারে। বাইরে একটা কাক ডাকছে নাগাড়ে।  কী খরখরে গলা তার। এত বিষণ্ণ কেন চারপাশ! এদিক ওদিক তাকাল পরমা। মেয়েরা কেউ বাঙ্কে নেই। বিছানাপত্র পাট করে রাখা। কোন দূর থেকে যেন কথা আর হাসি আসছে তাদের। ক’টা বাজে এখন? কাল রাতে কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল?

ধড়মড়িয়ে উঠতে গিয়ে বাধা পেল পরমা। শরীর দুর্বল। গায়ে এত কিছু চাপানো যে এক ঝটকায় সরানো গেল না। কোনওমতে বসে অবাক হয়ে গেল সে। পায়ের দিকে কম্বলের কোনায় কুণ্ডলী পাকিয়ে হেলে রয়েছে জুলেখা। পরমার নড়াচড়ায় এবার উঠে পড়ল সেও।

‘তুমি উঠতেছ কেন আন্টি?’ চোখদুটো বড় বড়, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে জুলেখার। বলতে বলতেই তার হাত উঠে গেল পরমার কপালে। তারপর মুখে যেন একটু হাসি ফুটল। ‘জ্বরটা ছেড়েছে।’

‘তুই সারারাত এখানেই জেগে বসেছিলি?’

‘কী করব। তুমি যা কাঁপুনি দিতেছিলে। মনে হল সে আর কমবেই না। কত ছটফটানোর পর তুমি ঘুমালে।’

একটু আগের জ্বালা ধরানো রোদ যেন নরম হয়ে আসছিল পরমার চোখে। বাবার কথা মনে পড়ে গেল। পরমার কিছু হলে দিশেহারা হয়ে পড়ত বাবা। কী করলে মেয়ের কষ্ট কম হবে সে জন্যে পাগলের মতো করত। কাল সারাদিন পরমার সেসবই মনে পড়েছে বারবার। জ্বরের ঘোরেও মনের ভেতরে হাতড়ে খুঁজেছে বাবাকে। কিন্তু জুলেখা তার কে? কীসের সম্পর্ক তাদের?

পরমা মুখে কিছু বলতে পারল না। কিছুক্ষণ শুধু জুলেখার গায়ে হাত রেখে বসে রইল।

তারপর চৌকি থেকে নামার চেষ্টা করতেই বাধা দিল জুলেখা। ‘কোথায় যেতেছ তুমি? আমি নিয়ে যাব।’

জ্বরের চোটে পরমার মুখ-চোখ ফুলে রয়েছে এখনও। তার মধ্যেও হাসতে চাইল কিছুটা। ‘এখন তোর আন্টি অনেকটা ভাল আছে রে। তুই তো তাকে ঠিক করে দিলি। ভয় পাস না। বাথরুমে যাব। কত বেলা হয়ে গেল। আমার খোঁজ পড়েছে কিনা তাও তো জানি না।’

‘সে আয়েষা উর্মিলা আন্টিরে বলে এসেছে তোমার শরীর খারাপ। তুমি কাজে যাবে না।’

‘এই খ্যাপা মেয়েকে নিয়ে তো পারলাম না আমি। তাহলে তুই চল আমার সঙ্গে।’

উঠে দাঁড়িয়ে পরমা বিছানার দিকে তাকিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে জুলেখা বলল, ‘দেখার কিছু নাই। আমি সব গুছায়ে দেব পরে।’

হন্তদন্ত হয়ে উর্মিলা তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল। পরমাকে দেখেই বলল, ‘তুই এখন উঠলি? আয়েষা বলল তোর শরীর খারাপ। কী হয়েছে?’

উত্তর দিল জুলেখা। ‘আন্টির কাল রাতে খুব জ্বর উঠেছিল। সে কী কাঁপুনি—’

‘ডাকিসনি কেন আমাকে?’

‘ডাকার মতো অবস্থা আমার ছিল না উর্মিলাদি।’ জুলেখাকে দেখিয়ে পরমা বলল, ‘ও না থাকলে কী যে হত!’

‘ওষুধ খেয়েছিস?’

‘তখন ওষুধ পাব কোথায়। সেসব তো বড়বাড়ির আলমারিতে।’

‘বাঃ। নিজেই সারাদিন ওষুধ ঘাঁটাঘাটি করিস আর কাছে রাখিসনি? আয় আমার ঘরে, দিচ্ছি। জ্বর, সর্দি-কাশি পেটখারাপের কয়েকটা করে ট্যাবলেট নিজের কাছে রেখে দিই। রাতবিরেতে কখন কোনটা কাজে লেগে যায়।’

‘তাই? ভাল কর। আমাকেও রাখতে হবে।’

পরমাকে উর্মিলার সঙ্গে যেতে দেখে নিয়ে জুলেখা বাথরুমে চলে গেল।

ঘরে গিয়ে ওষুধ বের করতে করতে উর্মিলা বলল, ‘আমাকে আবার এখুনি ছুটতে হবে। ওই বাড়ির দু’জন মনিটরকে চা দিতে লাগিয়ে এসেছি।’

‘কেন? অর্পিতাদি আর প্র‌ীতিদি কোথায়?’

‘তাদের কথা আর বলিস না। দু’জনে ঝগড়া বাঁধিয়ে বসে আছে।’

‘কী নিয়ে?’

‘ওই চা দেওয়া নিয়েই। সঞ্চিতা থাকলে হত না। সে তো ছুটিতে। আর এই দুই ঢ্যাপসকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল।’ কথাটা বলে নিজেই হেসে উঠল উর্মিলা। ‘কেউই বড়বাড়িতে চা দিতে চায় না। তোকেও পাইনি। তাই কবিতা আর দোলাকে লাগিয়ে দিয়েছি।’

‘চলো, তাহলে আমিও যাচ্ছি তোমার সঙ্গে।’

‘উঁহু, একদম না।’ মাথা নাড়ল উর্মিলা। মুখ ধো, কিছু খেয়ে আগে ওষুধ খাবি। ওদিকে আমি দেখছি।’

দিন কয়েক ধরে মনে হচ্ছিল ঠান্ডা বসছে বুকে। তার থেকেই বোধহয় জ্বর। মুখটা তেতো লাগছিল। ভাল করে দাঁত মাজল পরমা। একটু পরে বাথরুম থেকে বেরিয়েই জুলেখাকে পেয়ে গেল সে। দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে। পরমা তার পাশে পাশেই ঘরে এল। তখন দেখতে পেল মেয়েদের কয়েকজন একে অন্যের হাতে রাখি পরাচ্ছে। হাসাহাসি চলছে খুব।

ও, আজ তো রাখি! জ্বরের ঘোরে সব ভুলে গিয়েছিল। মনিটর আয়েষার কাছে সে জানতে চাইল, ‘তোরা রাখি কোথায় পেলি রে?’

‘শংকরদা এনে দিয়েছে। সব বছর সেই তো এনে দেয় আমাদের। যারা রাখি বাঁধতে চায়, মনিটরদের জানায়। আমরা তখন সর্বাণী আন্টিকে বলি।’

ব্যাপারটা এবার বুঝল পরমা। সর্বাণী মিত্র শংকরদাকে দিয়ে রাখি আনিয়েছেন। কাল কিছুই খেয়াল করেনি সে। আয়েষাকে বলল, ‘তুই বেঁধেছিস কাউকে?’

‘না আন্টি। আমার বন্ধু তো ওই বাড়িতে। পরে যখন যাব, বাঁধব।’

‘থাকিস ছোটবাড়িতে আর বন্ধু বানিয়েছিস বড়বাড়ির?’

হেসে ফেলল আয়েষা। পরমা জানে দুই বাড়িতেই কিছু মেয়ে আছে যাদের নিজের ঘরের কোনও কোনও মেয়ের সঙ্গে মিল হয় না। ঝগড়া বেঁধে যায়। তাদের দেখে মনে মনে হেসেছে পরমা। তারাও ছোটবেলায় এরকমই করত। এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বন্ধ তো পাশের বাড়ির অন্য মেয়ে তখন বন্ধু। এদেরও সেই অবস্থা।

অনেকেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে রাখি দেখিয়ে যাচ্ছিল পরমাকে। দেখতে দেখতে নন্দিনীর হাতটা চেপে ধরল। ‘তোর রাখিটা তো খুব সুন্দর রে।’

নন্দিনী বলল, ‘এটা কেনা নয় আন্টি। যে দিদিগুলো কাঁথা সেলাই করে, ওরা বানিয়েছে।’

‘ওদের কাছে গেলে পাওয়া যাবে?’

‘জানি না আর আছে কিনা। জিজ্ঞেস করতে হবে আন্টি।’

‘আচ্ছা, আমি পরে যাব।’

বাইরে বেরিয়ে ধীর পায়ে রান্নাঘরে পৌঁছল পরমা। সেখানে দুটো চেয়ারে বসে প্র‌ীতি আর অর্পিতা। তবে একটা আর একটার উলটোদিকে ঘোরানো। কারও মুখে কোনও কথা নেই। তাকে দেখে অর্পিতা জানতে চাইল, ‘এখন শরীর কেমন আছে তোর?’

মাথা কাত করে পরমা জানাল, ভালো।

সবিতামাসি সকালের ঘুগনি বানিয়ে রেখে দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত ছিল। সেও বলল, ‘নতুন আন্টি ভালো আছ তো? বসো, চা-টা একটু গরম করে দিই। এতখনে ঠান্ডা মেরে গেছে। আমি আরও ভাবছি নতুন আন্টি কোথায়? এত দেরি তো হয় না তার।’ কড়াইতে খুন্তি ঝেড়ে নিতে নিতে সে আরও বলে যাচ্ছিল, ‘ওষুধপাতি খেয়ে নিয়ো। বিদেশের ঠাঁয়ে পড়ে আছ। শরীলকে সবসময় ঠিক রাখতে হবে।’

পরমা বুঝল তার যে জ্বর তা হোমের মোটামুটি সকলকেই জানিয়ে দিয়েছে উর্মিলাদি। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল সে। ‘তোমরা দুটিতে ঝগড়ুটের মতো বসে আছ কেন প্র‌ীতিদি? সামান্য ব্যাপার নিয়ে কেউ ঝগড়া করে? আজ রাখি। মেয়েরা কত আনন্দ করছে। চলো, তোমরাও ভাব করে নাও।’

প্র‌ীতি নাইটিটা একবার ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল। যেন কথাটা শুনতেই পায়নি এভাবে বলল, ‘সিনিয়ার বলে কেউ ছাড় পেয়ে যাবে আর খেটে মরবে অন্য কেউ! রোজ কেন বড়বাড়িতে চা দিতে হবে আমাকে? যার যার কাজ সে সে করবে। আমি কোনও চাপ নিতে পারব না। পরিষ্কার কথা। যাই, মেয়েদের টিফিন দিয়ে চান সেরে রেডি হয়ে নিই গিয়ে। এরপর আবার অফিসের সময় হয়ে যাবে।

সে হাঁটা লাগাল বড়বাড়ির দিকে। অর্পিতা খানিকক্ষণ ধরে প্র‌ীতির চলে যাওয়া দেখল। তারপর পরমাকে বলল, ‘আমারও তো বয়েস হচ্ছে নাকি বল তো! ডান হাঁটুটায় মাঝে মাঝে এমন ব্যথা হয় যে চলতে ফিরতে পারি না। বাত ধরে গেল কিনা কে জানে। তাও তো কাজ করতে হয়। এখানে আমার জন্যে আলাদা করে কে ভাববে! বড়বাড়িতে অতগুলো মেয়ে। সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে উঠতে কষ্ট হয় একেকদিন। প্রীতিকে বলেছিলাম, তুই আজ চা-টা দিয়ে দে। বদলে আমায় মুখঝামটা দিচ্ছিল। আমিও ক’টা কথা শুনিয়েছি তাই। আর ভালো লাগে না এসব। কিন্তু জানি, এখানেই পড়ে থাকতে হবে আমায়।’

দু’জনের কারও কথাতেই কিছু বলল না পরমা। চুপ করে ভাবছিল সে।

ধারাবাহিকটি প্রথম থেকে পড়তে নীচের লাইনে ক্লিক করুন

উপন্যাস পাখিঘর পর্ব ১ থেকে পর্ব ২০

অফিস বসে গেছে। হোমের কাজও চলছে নিয়মমতোই। তবে মেয়েরা আবার একটা দিন পেয়ে গেছে আনন্দ করার। দুই বাড়ির সব পাখিই যেন আজ অনর্গল কিচিরমিচির করছে। তাদের এই আড়মোড়া ভাঙা ভাবটা বড় ভালো লাগে পরমার।

শরীর খারাপ বলে পরমাকেও আজ ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্নান সেরে সেলাই ঘরে গিয়েছিল সে। সেখানকার মেয়েদের থেকে চারটে রাখি নিয়ে এসেছে। নানা রঙের সুতো দিয়ে কাপড়ের ওপর কী সুন্দর নকশা করেছে মেয়েগুলো।

বেলা অনেক হয়েছে। খাবার দেওয়ার জায়গায় সকলকে পাওয়া যাবে ভেবে বড়বাড়িতে গেল পরমা। তবে অর্পিতা নেই সেখানে। পিছনের জায়গাটায় গিয়ে দেখল চুপ করে বসে রয়েছে সে। ফিরে গিয়ে পরমা ডেকে নিয়ে এল উর্মিলা আর প্র‌ীতিকে। তারপর প্র‌ীতি আর অর্পিতার হাতে একটা করে রাখি দিয়ে বলল, ‘নাও, ভাব করে নাও। আর মুখ ভার করে থাকা যাবে না। আজ খুশির দিন, খুশি থাকতে হবে।’

প্র‌ীতি আর অর্পিতা দু’জনেই মুখ বেঁকিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। চেঁচিয়ে উঠল উর্মিলা। ‘অনেক ন্যাকামো হয়েছে। মেয়েটা অসুস্থ, তাও এসেছে তোদের জন্যে। বাঁধ বলছি।’

উর্মিলার বকা খেয়ে এবার মুখোমুখি হল দু’জনে। রাখি বাঁধল। অভিমান ভুলে হাসির ঢেউ উঠল তখন। উর্মিলা বলল, ‘ইস, সঞ্চিতা থাকলে আরও ভাল হত। প্রীতি, তোর ফোনটা দে তো, একটা ছবি তুলে রাখি। পরে দেখাব ওকে।’

ছবি ওঠার পর উর্মিলার কাছে এগিয়ে গেল পরমা। সে যখন তাকেও রাখি বাঁধছিল তখন অর্পিতা বলল, ‘সবাইকেই তুই দিলি। তোকে যে আমরা কেউ বাঁধলাম না!’

পরমা তাকাল তার দিকে। ‘আমি এমনিই তোমাদের বন্ধু। যাক, ভাব হয়ে গেল, এবার আমি ছোটবাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসছি।’

প্র‌ীতি বলল, ‘এখন ওখানে কেন? একটু বসে যা না। এক্ষুনি তো দুপুরের খাবার ঘণ্টা বাজাতে হবে, তখন আর গল্প করা যাবে না।’

‘না গো। আমার একটা দরকারি কাজ আছে ওখানে। যেতেই হবে।’ ওদের রেখে চলে এল পরমা।

ছোটবাড়িতে পৌঁছে দেখে তখনও মেয়েদের মুখে রাখির গল্প ঘুরছে। কারটা কত সুন্দর, কোনটা বড়, কোনটাই বা ছোট। হাত মেলে ধরে এইসবই হচ্ছে। একটা কিছু পেলেই মেয়েগুলো মাতোয়ারা হয়ে থাকতে চায়।

পরমা জুলেখাকে চাইছিল। তার বাঙ্কের কাছে যেতেই অভিমানের সুরে সে বলল, ‘তোমার না শরীর খারাপ। সেই যে গেছ, এই আসার সময় হল!’

হাসল পরমা। ‘অনেক রাগ করেছিস আমার ওপর। এবার হাতটা দে তো দেখি।’

‘হাত দিয়ে কী হবে?’

‘দে না। জাদু দেখাব।’

জুলেখা হাত সামনে ধরেছে। শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে রাখা শেষ রাখিটা বের করে তার হাতে বেঁধে দিল পরমা।

জুলেখা পরমার হাত ছাড়ল না। ঝুঁকে পড়ে বালিশের নীচে থেকে একটা রাখি বের করে আনল সেও। ‘তুমি ভাবতেছ আমার কাছে নাই। তোমার জন্যে আমি কাল থেকেই নিয়া রেখেছি।’

পরমা আর কিছুই বলতে পারছিল না। জুলেখাও নয়। হয়তো মনে মনে অনেক কথা হয়ে যাচ্ছিল তাদের।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More