পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২০

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ২০

কয়েকদিন ধরে মাঝেমধ্যেই তেড়ে বৃষ্টি হচ্ছিল। তার সময়ের ঠিক নেই। ভিজে ভিজে গোটা হোমটাই কেমন স্যাঁতসেতে। বিকেলে মেয়েদের বাইরে যাওয়ায় বেড়া বসিয়ে ছিল বৃষ্টি। আজ অবশ্য মেঘলা থাকলেও তারা বেরোতে পেরেছিল।

পরমা বেদির ওপর বসে। আশেপাশে অনেক ফড়িং উড়ছে। তার মানে আবার বৃষ্টি আসতে পারে। সে দেখতে পাচ্ছিল, একটু দূরে একটা মেয়ে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছে কয়েকজন। ওকে চেনে পরমা। সেই মেয়েটা তাকাচ্ছে না ওদের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়াল তারই সামনে।

‘তোমার এখানে একটু বসব নতুন আন্টি?’

এই কথাটায় পরমার মনে হল, এখনও নতুন আছে সে? হতে পারে। এখানে সবাইকে তো সে জানে না এখনও। সকলেই যে তার সঙ্গে কথা বলে এমনও নয়। যেমন এই মেয়েটা। তবে আগেও পরমা খেয়াল করেছে একে। কী যেন নাম? হ্যাঁ, শান্তা। কত বয়স হবে? ষোলো-সতেরো। দু’হাতে শাঁখা-পলার সঙ্গে অনেকগুলো চুড়ি, গলায় হার। সবই সোনার নকল। সিঁথিতে ডগডগে সিঁদুর, কপালে বড় টিপ। সাধারণ শাড়ি কুঁচি দিয়ে পরে। চুল মেলে রেখে ঘোরে সবসময়। এসবের কোনও কিছু নড়ে সরে গেলেই সামলাতে ব্যস্তও হয়ে পড়ে।

সে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, বসো না।’

বসে পড়ল রোগা মেয়েটা। কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘তোমার বর কোথায় আন্টি?’

অবাক হয়ে গেল পরমা। এখানে এখনও অবধি কোনও মেয়ে এরকম প্রশ্ন করেনি তাকে। এর আলাভোলা চোখ দেখে কোথায় যেন গোলমাল লাগছে। তবু হাসি ধরে রেখেই বলল, ‘সে আছে তার মতো।’

‘কত দিন বিয়ে হয়েছে তোমার?’

সতর্ক উত্তর দিল পরমা। ‘বেশিদিন নয়।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ২

যেন খুব খুশি হয়েছে এমন গলায় শান্তা বলতে লাগল, ‘আমার তো এক বছরও হয়নি, জান। আমাদের তো মালদায় বাড়ি। সেখানেই দীপুর সঙ্গে দেখা। আগে আমাদের গ্র‌ামেই থাকত। তারপর চাকরি পেয়ে রাজস্থান না হরিয়ানা কোথায় চলে গেল। ফিরে এসে আমার সঙ্গে ভালবাসা হল। খুব ভালবাসত আমায়। কিন্তু আমার তো আঠারো বছর হয়নি। তাই ও বলল, কাউকে কিছু বলতে হবে না, চলো পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিই, পরে বাড়ির লোক ঠিক মেনে নেবে। ব্যাস, আমায় নিয়ে ট্রেনে চেপে বসল। কালীঘাটে গিয়ে আমাদের বিয়েও হয়ে গেল, জান।’

পরমা বুঝতে পারছিল মেয়েটার গলা ফিকে হয়ে আসছে। তবু সে বলে যাচ্ছিল, ‘তারপর কী যে হল। ও বলল, আমাদের তো ক’দিন থাকতে হবে, চলো হোটেলে যাই। ট্যাক্সি করে নিয়ে গেল একটা জায়গায়। সেটা হোটেল নয়, জান আন্টি। সেখানে একটা ঘরের মধ্যে আমায় ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে ও যে কোথায় চলে গেল! তারপর একটা মোটামতো মাসি এসে বলল, দীপু নাকি আমায় তার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আমায় আটকে রেখেছিল। চেঁচামেচি করতাম বলে সেই মাসিটা কী মার মেরেছে আমায়। ঘরে বাজে লোক ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা—’

এরপর আর কিছু বলতে পারল না শান্তা। মাথা নামিয়ে বসে ছিল। চুপ করে ছিল পরমাও। এসময় কিছু বলতে নেই।

একটু পরে শান্তা মুখ তুলল। ‘আমার চিৎকার শুনে একদিন কয়েকটা দিদি ওখান থেকে আমায় বের করে নিয়ে এসেছিল। তারপর তারা ওখানে পাঠিয়ে দিল। ওই দিদিদের, পুলিশদের আমি গ্র‌ামের নাম, বাবার নাম সব মিথ্যে বলেছি, জান। ওখানে তো আর ফিরতে পারব না আমি, তাই। দীপুও ওখানে যাবে না, গেলে মারবে সবাই। ওই মোটা মাসিটার কথা আমি এখনও বিশ্বাস করি না আন্টি। দীপু তো খুব ভালবাসত আমায়। বিয়েও করেছে। বউকে কেউ কখনও বিক্রি করতে পারে! একদিন ঠিক আসবে আমায় নিয়ে যেতে। কিন্তু ও কি এই জায়গাটা খুঁজে বার করতে পারবে আন্টি? ওই মাসিটা বলেছিল, যাচ্ছিস তো, যা, হোমে গিয়ে পচে মর। এখানে কি সবাই পচে মরে আন্টি?’

‘শান্তার মাথায় হাত রাখল পরমা। ‘না, তা কেন হবে? এরকম ভাবতে নেই।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

আকাশ আবার কালো হয়ে উঠছে। হাওয়ায় ভাসছে গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি। উঠে পড়ল মেয়েটা। শাড়ির কুঁচি ঠিক করল, চুল সরাল কপাল থেকে, চুড়িগুলো গোছ করে নিল একবার। তারপর যেন আপন খেয়ালে হাঁটতে শুরু করল সে।

অর্পিতা এসে দাঁড়িয়েছে। পরমাকে বলল, ‘এদের আর রাখতে হবে না। চল, ডেকে নিই এবার। শেষে ভিজে কে কী অসুখ বাঁধাবে!’

শান্তা দূরে। পরমা তখনও দেখছিল তাকে। মনে হচ্ছিল, মেয়েটা সব জানে। বুঝতে পারছে ঠকে গিয়েছে। তবু অপমানটা না নিতে পেরে বাকি সকলের চোখের সামনে এখনও নতুন বউয়ের মতো সেজেগুজে বেড়ায়। তার সেই রকমসকম দেখেই অন্যদের হাসাহাসি। কত দিন থাকতে পারবে সে এইভাবে?

উঠে পড়ল পরমা। থালা বাজিয়ে বড়বাড়ির মেয়েদের ডেকে নিল ঘরে। গেটে তালা ঝোলাতে যাচ্ছিল। মুনিয়া নামের একটা মেয়ে বলল, ‘আমাদের তো বন্ধ করছ কিন্তু পিঙ্কি যে ওখানে রয়েছে, ওকে ডাকলে না?’

পরমা অবাক হল। ‘কই, দেখলাম না তো রে!’

নাজিমা বলল, ‘দেখবে কী করে, সে তো ইস্কুল বাসের ভেতর।’

তালা লাগিয়ে পরমা তাড়াতাড়ি বড়বাড়ির পিছনে চলে গেল। হ্যাঁ, পিঙ্কি তো এখানেই। সেই ড্রাইভার হরিপদর সঙ্গে গল্প করছে। রাগ হয়ে গেল তার। ছাড়া পেলে এই আধবুড়ো লোকটার সঙ্গে কীসের এত কথা মেয়েটার?

‘কী রে, বাজনা শুনতে পাসনি?’

চুপ করে ছিল পিঙ্কি। পরমা কিছুটা ধমকেই উঠল। ‘যাসনি কেন? ওঠ, আর বাইরে থাকা যাবে না।’

পিঙ্কি নেমে যেতেই সে হরিপদকে বলল, ‘দেখুন আপনাকে আগেও একদিন বলেছি, এভাবে এখানকার কোনও মেয়ের সঙ্গে কথা বলবেন না। আপনি তো পুরনো লোক। এটা জানেন না! আমায় তো দেখছি সর্বাণীদিকে জানাতে হবে ব্যাপারটা।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

হরিপদ কঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘কাউকে জানাতে হবে না দিদিভাই। আমি আর এরম করব না। এক্ষুনি চলে যাচ্ছি।’

পিঙ্কিকে বড়বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পরেও পরমার মনটা খচখচ করছিল। কতক্ষণ ধরে পিঙ্কি ছিল ওখানে? সে যে মাঠে নেই তা খেয়াল করা উচিত ছিল পরমার। অন্য কোনও হোম-মাদারও দেখতে পায়নি? যদিও তেমন কোনও কারণ না ঘটলে এতগুলো মেয়ের মধ্যে একজনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা কঠিন।

একটু পরেই অফিস ছুটি হয়ে যাবে। পরমা সর্বাণী মিত্রর কাছে গেল ঘটনাটা জানাতে। তিনি বললেন, ‘খারাপ কিছু কি দেখতে পেয়েছ তুমি?’

‘না, তা পাইনি। তবে আমি তো গেছি পরে।’

‘তুমি জানিয়েছ, ঠিক আছে। এটা এমন কিছু ব্যাপার নয়। পরে দেখা যাবে।’

সর্বাণীদির কাছ থেকে ফিরেও শান্তি পেল না পরমা। সঞ্চিতাকে জানাতেই সে বলল, ‘আমিও তো দেখেছি একদিন। গাড়ি ধোয়াধুয়ি করছিল লোকটা, পিঙ্কি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর বাসের ভেতরে উঠে গেছে কিনা তা অবশ্য দেখিনি। তুমি অর্পিতাদিকেও জানিয়ে রাখো।’

অর্পিতা গিয়েছিল চাবি নিতে। অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চাবি অর্পিতার কাছেই দিয়ে যাওয়া হয়। যদি কখনও কোনও দরকার পড়ে। সে সবচেয়ে পুরনো বলে এটা তারই দায়িত্বে।

স্টাফরা সবাই বেরিয়ে গিয়েছে। অফিস ঘরের সামনে দাঁড়িয়েই পরমা তাকেও বলল সবটা। অর্পিতা বলল, ‘সর্বাণীদিকে জানিয়ে ভালো করেছিস। মেয়েটার দিকে লক্ষ রাখিস। আমিও রাখব।’

কোথায় যেন ফোন বাজছে। কথার মধ্যে তাদের খেয়াল পড়ল অফিসের বন্ধ দরজার ওপাশে নাগাড়ে বেজে চলেছে ফোন। অর্পিতা মাথা ঝাঁকাল। ‘ব্যাস, এদিকে ছুটি হয়ে গেল, ওদিকে কে ফোন লাগিয়ে বসেছে!’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

পরমা বলল, ‘কোনও দরকারে করেছে হয়তো কেউ।’

তার হাতেই চাবিটা ধরিয়ে দিল অর্পিতা। ‘দ্যাখ তো।’

ভেতরটা অন্ধকার। আলো জ্বালিয়ে পরমা ফোনের টেবিলের সামনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই আওয়াজ থেমে গেল। ফিরে আসছিল। আবার কুঁক কুঁক করে জানান দিল ফোন। এবার গিয়ে ধরতে পারল সে।

‘হ্যালো, কে বলছেন?’

‘হাসপাতাল থেকে বলছি। এটা আশ্রয় হোম তো?’

‘হ্যাঁ, বলুন। কোন হাসপাতাল?’

উলটোদিকের গলা প্রশ্নের জবাব দিল না। তার বদলে খুব বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘এই নম্বরটাই তো দেওয়া রয়েছে আমাদের কাছে। ফোন করলে ধরেন না কেন? আপনাদের একজন পেশেন্ট এখানে ভর্তি ছিল। সে মারা গেছে। কী ব্যবস্থা করবেন দেখুন। যা করার তাড়াতাড়ি করবেন। বডি বেশিক্ষণ রাখা যাবে না।’

গলা কেঁপে গেল পরমার। ‘কে মারা গেছে?’

‘জুলিয়েন গোমেজ। আপনাদের হোমেরই তো?’

ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এল। খোলা দরজা দিয়ে ছাঁট আসছে। মেঘের গুরগুর আওয়াজ। পরমা কোনওমতে বলল, ‘হ্যাঁ… আমাদেরই… আচ্ছা… আমি জানাচ্ছি।’

ফোন নামিয়ে রেখে চেয়ারে বসে পড়ল সে। জুলিয়েন, সেই জুলিয়েন! একেবারে চলেই গেল! ভালোই হয়েছে বলতে হবে। আর চোখ খুলতে হল না মেয়েটাকে। খাঁচার দরজা তো খোলাই ছিল। অপেক্ষা ছিল শুধু উড়ে যাওয়ার। সেই অপেক্ষা শেষ।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

‘কী রে? কী হয়েছে? কার ফোন?’ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ঢুকে এসেছে অর্পিতা। তাকে খবরটা দিতেই তার মুখও ম্লান হয়ে গেল। তারপর বলল, ‘সর্বাণীদিকে তো জানাতে হবে। তুই করতে পারবি?’

অর্পিতার কাছ থেকে সর্বাণী মিত্রর মোবাইল নম্বর নিয়ে অফিসের ফোন থেকেই করল পরমা। খবরটা শুনে তিনিও যে বেশ হকচকিয়ে গিয়েছেন তা গলা শুনে বুঝতে পারল সে। বিড়বিড় করে বললেন, ‘খুব মুশকিল হয়ে গেল দেখছি। তাহলে আবার আমায় ওখানে যেতে হয়। দেখি, মৈনাককে পাওয়া যায় কিনা। আসতে বলি ওকে। অনেক কিছু তো করতে হবে এরপর।’

ফোন নামিয়ে রাখার পরও পরমা বসেই ছিল। চোখ চলে গেল ব্ল্যাকবোর্ডটার দিকে। পাশের টেবিল থেকে ডাস্টারটা নিয়ে বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। মেয়েদের সংখ্যার পাশে সেই প্লাস ওয়ান— জুলিয়েন। আর দরকার নেই। ঘষে ঘষে নামটা মুছে দিতে থাকল পরমা।

 

 

রোজা রেখেছিল ওরা। দু’বাড়ি মিলিয়ে সাতাশজন মেয়ে। রমজান মাস শেষ হয়েছে। আজ ঈদ-উল-ফিতর। খুশির ঈদ।

ওদের জন্যে সর্বাণী মিত্র কিছু আলাদা ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সারাদিন খেতে নেই। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর সন্ধেবেলা এক প্যাকেট খেজুর। তারই একটা করে খেয়ে রোজা ভেঙেছে তারা। তারপর দু-এক রকমের ফল। সঙ্গে ছোলার তরকারি আর মুড়ি। তাই দিয়েই ইফতার। তারপর আবার মগরিবের নামাজ। পরে রাতের খাবার খেয়ে, থালা ধুয়ে, সেই থালায় মেয়েরা আরও একবারের ভাত-তরকারি তুলে রেখেছে। ভোর চারটে নাগাদ খেয়ে নেবে। তাদের জন্যে কিছুটা বেশি করেই রান্না করতে হয়েছে সবিতামাসিকে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১২

দুপুরে জোহর আর রাতে এসারের নামাজ ওরা যার যার ঘরে বসেই পড়ে নিত। তবে ইফতারের আগে বিকেলে আসরের নামাজ একসঙ্গেই করেছে সবাই, বাঁধানো বেদির ওপর। নবনীতা দত্তকে বলে সর্বাণী মিত্র অনুমতি করিয়ে নিয়েছিলেন। তাই ইফতারের সময়টুকু বাইরে থাকতে পেরেছে ওরা। সঙ্গে পাহারায় একজন হোম-মাদার।

নামাজের এত কিছু পরমা জানতই না। থাকতে থাকতে জুলেখার কাছ থেকে জেনে গিয়েছে। এই ক’দিন জুলেখার জন্য মোবাইলে ঠিক ভোর চারটেয় অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হয়েছিল তাকে। ফজরের নামাজের আগে উঠে তুলে রাখা ভাত-তরকারি খেয়ে নেবে। তাতেও অবশ্য কিছু হয়নি। এক একদিন ঘুম থেকে মাঝে মাঝেই ধড়মড় করে উঠে বসেছে জুলেখা। তারপর ধাক্কা দিয়ে তুলে দিয়েছে পরমাকেও।

‘আন্টি, দ্যাখো না ক’টা বাজে।’

ঘুমজড়ানো চোখে মোবাইল দেখে পরমা বলেছে, ‘তুই শুতে যা। এখন সাড়ে বারোটা বাজে মাত্র। অনেক দেরি আছে।’

বলেও হয়নি কিছু। তারপরেও কোনওদিন রাত দুটো, কোনওদিন তিনটেয় জুলেখা ঠেলে জাগিয়েছে তাকে। ‘আন্টি, দেখবে একবার? সময় পেরিয়ে যায় নাই তো!’

রাগ হয়ে যেত পরমার। বলেই ফেলত, ‘তুই কিন্তু জ্বালিয়ে মারছিস জুলেখা! নিজেও ঘুমোচ্ছিস না, কাউকে ঘুমোতেও দিচ্ছিস না! এখানে আরও তো মেয়ে রয়েছে নাকি!’

জুলেখা তখন চুপ করে চলে যেত। শেষে চারটের অ্যালার্ম বাজলে শান্তি। সে উঠে ছোটবাড়ির আরও কয়েকজনকে ডেকে দিত। খাওয়া সেরে তারপর তারা শুতে যেত আবার। ঘুমোত না নিশ্চয়ই। ঘণ্টাখানেক পরে উঠেই তো নামাজে বসবে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৪

পরমারও আর ঘুম হত না। খানিক পরেই জানলা দিয়ে দেখা যেত বাইরের ফিকে আলো। পাখিরা জেগে গিয়ে কিচিরমিচির ছড়িয়ে দিচ্ছে। আরও পরে দূর থেকে ভেসে আসত আজানের সুর। ঘরে বেশিরভাগ মেয়েই ঘুমোচ্ছে। শুধু কয়েকজন ওড়নায় মাথা ঢেকে কানের পাশ দিয়ে নামিয়ে রেখে নামাজ পড়তে বসেছে। মাটিতে কাপড় পাতা। সেই জায়নামাজের একদিকের কোনা একটু মুড়ে রাখা। জানে পরমা। সে আবছা দেখতে পেত ওরা কর গুনছে হাতে। কত রাকা পড়া হল তাই গুনছে। কী জানি কেন, ভালো লাগত ওদের দেখে। কোনও এক নীরবতার ভেতরে যেন ডুবে রয়েছে মেয়েগুলো।

আজ ইদের নামাজের সময় পরমাকে ডেকেছিল জুলেখা। কিন্তু যেতে পারেনি সে। কোমর টাটাচ্ছে বলে শুয়ে ছিল। এবারের পিরিয়ডের ব্যথাটা কষ্ট দিচ্ছে বেশি। তাই নিয়েই আগের কয়েকদিন বেদির কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাকেই। তবে এখন বড়বাড়ির কাজ আর বাইরে মেয়েদের সামলাচ্ছে বাকি হোম-মাদাররা।

‘আন্টি ওঠো, সিমুই এনেছি, খাও দেখি।’

পরমা চোখ খুলে দেখল ছোট একটা স্টিলের বাটি হাতে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে জুলেখা। ঈদ বলে সিমুই হয়েছে। বেশি করেই হয়েছে কারণ হোমের সবাই তা পাবে।

শুয়ে শুয়েই সে বলল, ‘না রে, ভাল লাগছে না। নিয়ে যা।’

‘খাও না।’

‘না বললাম তো।’

‘আমি শুনব না, খেতেই হবে তোমায়।’

‘বলছি ভাল লাগছে না, বিরক্ত করিস না।’ ঝাঁঝালো কথাগুলো বলেই পাশ ফিরে গেল পরমা।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৬

সেভাবেই বেশ খানিকক্ষণ শুয়ে ছিল চোখ বুজে। তারপর কোনও সাড়াশব্দ নেই দেখে ঘুরে তাকাল। ঘরের এক কোণে পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে জুলেখা। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। পাশে বাটিটা রাখা।

ঝপ করে উঠে পড়ল পরমা। শাড়ি সামলে তাড়াতাড়ি গিয়ে বসল জুলেখার সামনে। ‘আরে, আমি এমন কী বললাম! কাঁদছিস কেন আজকের দিনে তুই!’ বলতে বলতে আঁচল দিয়ে তার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছিল সে।

‘আমি জানি তুমি কেন খাবে না বলতেছ।’

‘কী জানিস বল তো?’

‘আমি মুসলমান, তাই আমার হাতে তুমি খাবে না। ঘেন্না পেতেছ।’

হেসেই ফেলল পরমা। তারপর বলল, ‘দুর বোকা। আমাকে তোর তাই মনে হয়? এটা যে ঠিক নয় তা তো তুই আমার চেয়েও বেশি জানিস। কোনওদিন দেখেছিস এমন? সত্যিই শরীরটা ভাল নেই রে। তুই বুঝতে চাইছিলি না বলে রাগ হয়ে গেছিল।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৭

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৮

জুলেখা বলল, ‘সেই বিকাল থেকে একটা কথা বলব বলে খুঁজতেছি তোমারে, পাচ্ছি না। তোমার লেগে কেউ যে বসে থাকে তা বোধহয় জান না!’

‘কী কথা রে? বল না। ওই দ্যাখো, আবার কাঁদছিস কেন?’

হাত বাড়িয়ে পরমাকে জড়িয়ে ধরল জুলেখা। কান্না যেন তার গলা আটকে রেখেছে। তার মধ্যে বলল, ‘আজ আম্মির সঙ্গে কথা হয়েছে। সর্বাণী আন্টি অফিসে ডেকেছিল। কথা বলিয়ে দিয়েছে।’

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More