রবিবার, নভেম্বর ১৭

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৯

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১৯

সেকেন্ড অফিসার বললেন, ‘আপনারা একটা ডাইরি করে রাখতে চাইছেন, এই তো? ঠিক আছে, তবে আমি বলব তার আগে একবার ওসির সঙ্গে কথা বলে নিন। তারপর যদি—’

পরমাকে নিয়েই সবুজ পর্দা ঘেরা ঘরে ঢুকেছিল ওরা। চেয়ারগুলো সব ফাঁকাই ছিল। তবু ওদের বসতে বলা হয়নি। অনিন্দ্যর কাছ থেকে সবটা শোনার পর ওসি দেওয়ালের দিকে চোখ রেখে রাশভারী গলায় বললেন, ‘গ্র‌ামের পলিটিক্স আলাদা। ও আপনারা বুঝবেন না। তাছাড়া কার কোথায় কতদূর পর্যন্ত হাত আছে তা আমরাও জানি না। ওদিক থেকে কোন নেতাকে গিয়ে ধরবে, তিনি আবার ফোন তুলে ধমকি দেবেন। যা খুশি হতে পারে। আপনারা ভদ্রলোক, কেন এইসব ছোটলোকদের ব্যাপারে জড়াচ্ছেন নিজেদের! কাজের মেয়েকে নিয়ে এত মাথাব্যথা করবেন না। মেয়ে ছেড়ে দিন। ওরা নিয়ে ফিরে যাক। ঘরের শান্তি বজায় রাখুন।’

অনিন্দ্য যে খবরের কাগজে কাজ করে তা একবারও জানায়নি সে। শুধু ওই ঘরে দাঁড়িয়েই ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ‘সব বুঝতে পেরেছি। তবে ডাইরিটা আমরা করবই। যদি না নিতে চান তাহলে বলুন, তারপর আমাদেরও ভাবতে হবে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

পুলিশ ডাইরি নিয়েছিল। কিন্তু পরমা বাড়ি ফিরে সুতপাকে বলল, ‘আমি এখানে আর থাকতে চাই না বউদি। ওরা আবার আসতে পারে। অশান্তি করতে পারে। নয়তো দেখবে ফোন করে বাজে বাজে কথা বলবে, গালাগালি দেবে। আমার জন্যে তোমরা কেন সহ্য করবে এসব? আমি চলে যাব এখান থেকে।’

সুতপা তার মাথায় হাত রাখল। ‘তুই আমাদের জন্যে ভয় পাচ্ছিস! বোকা মেয়ে। কিচ্ছু হবে না।’

বিছানায় ঝুঁকে পড়ে কাঁদতে শুরু করেছিল পরমা। তখন অনিন্দ্যও এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। ‘কেঁদো না। মনে জোর রাখো। ঠিক আছে, তুমি এখানে থাকতে চাও না তো। আমি দেখছি কী করা যায়।’

এর কিছুদিন পর মঞ্জরীর হাত ধরে হোমের চাকরিতে ঢুকেছিল পরমা। সেই থেকেই আশ্রয় হোমের আশ্রয়ে সে।

‘কী রে, তুই এখানে কী করছিস? রং মাখার ভয়ে লুকিয়ে আছিস না কি!’

কথাটা কানে আসার পরও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পরমা। সামনে প্র‌ীতি এসে দাঁড়িয়েছে লুকোচুরি খেলায় টুকি দেওয়ার ভাব নিয়ে। দু’হাতের মুঠোয় গোলাপি আবির। তাই তো, কিছু সময়ের মধ্যে কত সময় যে পেরিয়ে এল পরমার মন। তবে ঘুরে ঘুরে ফিরে এসেছে এই হোমেই। পরমা কোথাও যায়নি। দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই গাছটার নীচে।

ছটফট করে উঠল প্র‌ীতি। ‘তাকিয়ে আছিস কেন হাঁ করে? কী ভাবছিস বল তো? বড্ড বেশি ভাবিস তুই। চল চল, মেয়েরা সেই কখন থেকে তোকে খুঁজছে। আমি বাবা তোকে এখানে রং দিচ্ছি না, তখন আবার ওরা চেঁচাবে। আয় না, যাই ওদের কাছে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

সামনে প্র‌ীতি। পরমা তার পিছনে চুপ করে বড়বাড়ির দিকে হাঁটছিল। এই হোমেই কি কেটে যাবে তার বাকি জীবন? না কি অন্য কোথাও? অন্য কোনওভাবে? সে তো ভাবেনি এসব। শুধু মনে হয়, এটাও যেন তার জীবনের আরও অনেক একটা টুকরোর মতো একটা টুকরো। কোনটা যে জুড়বে আর কোনটা যে ফেলবে তা জানে না পরমা। তবে এই মেয়েগুলোকে ফেলে দেওয়া বড় কঠিন।

 

 

বাচ্চাকে রেখে দিয়ে চলে গেল নিতু। তার মা এসে নিয়ে গিয়েছে তাকে।

দশটায় অফিস বসে। সর্বাণী মিত্র তখনই আসার কথা বলেছিলেন নিতুর মা বাসন্তীকে।

আগের দিন থেকেই গোছগাছ সেরে রেখেছিল নিতু। বাসন্তী এসে কাগজপত্রে টিপছাপ দিয়ে নিয়ে গেল মেয়েকে। তখন বাচ্চাটাকে একবার দেখতেও যায়নি। অফিসের পাশের ঘেরাটোপটাতেই তো রয়েছে অঞ্জলি।

হোমের মেয়েরাই নিতুর মেয়ের নাম রেখেছে। অঞ্জলি নামটাই কেন রাখল সে কথা তাদের কেউ জিজ্ঞেস করেনি।

জলখাবার দেওয়া হয়ে যাওয়ার পর রান্নাঘরেই ছিল পরমা। নিতু গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। ‘আমি যাচ্ছি আন্টি, ইঁহাসে বাহার।’

তার মা দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে। পরমা বেরিয়ে এল। তাকে দেখিয়ে নিতু বলল, ‘এই আন্টি খুব ভাল মা। মেরি বহুত খয়াল রখতি থি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

বাসন্তীকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল এখানকার কারও সঙ্গেই কথা বলার ইচ্ছে তার নেই। চোখ-মুখ ঘিরে রেখেছে লজ্জা। শুধু বলল, ‘হামি আধা বেলার ছুটি করেছি কাজের বাড়িতে। নিতুকে ঘরে রেখে ফিন কাজে যাব। চলতি হুঁ।’

পরমা দাঁড়িয়েই রইল। সকালবেলার ব্যস্ততার মধ্যেই চলে যাচ্ছে নিতু। কেউ তাকে খেয়াল করে এগিয়ে দিতে বেরোয়নি। কেনই বা দেবে। এরকমই তো কথা ছিল। তবু মা আর মেয়ে হাঁটছিল যেন এক্ষুনি পায়ে পায়ে জড়িয়ে পড়ে যাবে। যেন দৌড়ে গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়তে পারলে বাঁচে।

যাওয়ার আগে মেয়ের কথা একবারও মুখে আনেনি নিতু। তিন মাসের বাচ্চা। বোতলের দুধ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে আগেই। মা চলে গেলে তার যাতে অসুবিধে না হয়। হোমের খাতায় নিতুর নাম ওঠেনি। একজন বাড়তি হিসেবেই ছিল। সেভাবেই এতদিন তার খাবারের হিসেব ধরা হয়েছে। কিন্তু অঞ্জলির নাম উঠে গিয়েছে খাতায়। সে এখন এই আশ্রয় হোমেরই মেয়ে। এই তার পরিচয়।

অর্পিতাকে আর গেটে থাকতে হয় না রাজীবের সঙ্গে। সকালের আরও একজন গার্ড ডিউটিতে বহাল হয়েছে কিছুদিন আগেই। সে ওদের দেখে ছোট গেটটা খুলে দিল। নিতুর মা মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়েও যাচ্ছিল। তখনই পরমা দেখতে পেল, নিতু থমকে দাঁড়িয়েছে। একবার পিছন ফিরে তাকাল সে বড়বাড়িটার দিকে। তারপর চোখ সরিয়ে পরমাকে দেখতে পেয়েই মুখ নামিয়ে নিল। খুব ধীরে ধীরে নিজেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল নিতু।

পরমা দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সে ভাবার চেষ্টা করছিল গেটের ওপারে কীভাবে নিতু চলে যাচ্ছে। কীভাবে মুছে যাচ্ছে মেয়েটার জীবনের অনেকগুলো দিন। অবাঞ্ছিত স্মৃতিকে কেউ রাখতে চায় না। আর এ স্মৃতি তো চোখের জলের চেয়েও নোনতা।

কাজ থেমে থাকেনি। কিন্তু পরমার মন যেন সারাদিন কোথায় থেমে রয়েছে। যখনই অঞ্জলির কান্না এসেছে কানে, চাপা একটা কষ্ট ঘিরে ধরেছে তাকে। ছোটবেলায় মা না থাকার কষ্ট। কাছে ডেকে কোলে বসিয়ে কেউ মিষ্টি করে দুটো কথা বলবে না। ছোটবেলায় দেখেছে, তার বন্ধুরা মায়ের কাছে কত আদর পাচ্ছে। তার ভাগ্যে ছিল না ওসব। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই তো দেখছে মা নেই।

নিতু আছে। পাঁচিলের ওপাশের পৃথিবীতে থেকেও যাবে কোথাও না কোথাও। তবুও অঞ্জলির কাছে মা বলে কেউ নেই। কাঁদলে মুখে দুধের বোতল গুঁজে দিচ্ছে আয়া।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

অঞ্জলির জন্যে কষ্ট হচ্ছে পরমার। আবার নিতুর জন্যেও হচ্ছে। মেয়েটার তো কিছু করার ছিল না। এই ঘটনার যে একচুলও এদিক ওদিক হওয়ার উপায় ছিল না তাও তো জানা। ঘটনা কখনও কখনও আসে ধীর পায়ে। আবার কখনও সে ওঁত পেতে থাকে জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে।

বিকেলে মেয়েরা বাইরে ঘুরছিল। হিন্দি গান বেজে উঠল। বেদির ওপর নাচ শুরু করেছে কয়েকজন। রিমা নামে সেই মেয়েটা সবার সামনে। বাকিরা পিছনে তাকে নকল করছে। গানের সে কী কথা! জুলফোসে বাঁধলি বাদল/সিনেপে সে উড়নে লগা আঁচল/মুঝসে নয়না মিলাকে/ মওসম হোনে লগা পাগল/তো নাচু ম্যায় ছম ছম ছম…। রিমা যেমন খুশি নাচছে। তাকে কেউ কিছু বলতেও যাবে না। হোমে গেস্ট আসবে। তাদের সামনে নাকি নাচবে মেয়েরা। তবে পরমার বড্ড হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। শংকরদার মোবাইল থেকে গিয়ে ছোট একটা বক্সে বাজছে গান।

বড়বাড়ির সামনে সঞ্চিতার সঙ্গে কথা বলছিল পরমা। এই সময় দেখল রাজীব যাচ্ছে অফিসের দিকে। সকালের একজন সিকিউরিটি চলে যাওয়ায় অর্পিতা যখন রাজীবের সঙ্গে গেটে থাকত তখন বাইরের কোনও খবরাখবর এলে অর্পিতাই তা পৌঁছে দিত অফিসে। এখন রাজীব ছাড়াও অন্য গার্ড রয়েছে। তবে সে নতুন বলে তাকে ভেতরে আসতে দেওয়া হয় না। রাজীব পুরনো। কোনও দরকার পড়লে সে-ই অফিসে যায়। সঞ্চিতা হাতের ইশারায় জানতে চাইল, কী ব্যাপার?

সে এসে দাঁড়াল তাদের কাছে। ‘দু’জন এসেছেন, হাজব্যান্ড-ওয়াইফ, আগেও এসেছিলেন একবার। সর্বাণী ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে চান।’

‘ও, যাও তাহলে।’

কিছুক্ষণ পরেই রাজীব তাদের পৌঁছে দিল অফিসে। পরমা খেয়াল করল সর্বাণীদির সঙ্গে অফিস থেকে বেরিয়ে বড়বাড়ির দিকে যাচ্ছেন সেই দু’জন। মহিলার গায়ে দামি শাড়ি তবে সাধারণভাবে পরা। লোকটির পরনে শার্ট-প্যান্ট। দুজনেই ফর্সা। সুন্দর দেখতে। বয়স চল্লিশের এদিক ওদিক হবে। মহিলার হাতে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট।

আরও খানিকক্ষণ পর গান, মেয়েদের কথা আর হাসি ছাপিয়েও কান্নার শব্দ ভেসে এল পরমার কানে। বড়বাড়ি থেকে আসছে। তারপরেই সেখান থেকে হাঁক পেড়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বেরিয়ে এল রাখি। তার গায়ে কুচি দেওয়া মেরুন রঙের নতুন একটা ফ্রক। কিন্তু কাঁদছে কেন? কেউ বকেছে? না কি মারল? না, মারধোর তো করার কথা নয়। তবে মেয়েটা যা অভিমানী! বকলেই ঠোঁট ফোলায়। কাছে যাবে বলে ভাবছিল পরমা কিন্তু থামতে হল। রাখির পিছনে পিছনে ছুটে বেরিয়ে এসেছিল নুসরত। সেও থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে একটু দূরে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

সর্বাণী মিত্র এসে রাখির হাত চেপে ধরেছেন। কী যেন বোঝানোর চেষ্টা করছেন তাকে। পিছনে সেই দুজন। তিনি তাদের দিকেই এগিয়ে দিলেন রাখিকে। ওরা তাকে কাছে টানার চেষ্টা করছেন। রাখি সমানে হাত-পা ছুড়ছে আর কেঁদে চলেছে। দূরে পরমাকে দেখে সে এবার কান্না মেশানো গলাতেই চেঁচিয়ে উঠল। ‘আন্টি, আমায় নিয়ে যাও। ওদের বকো। নিয়ে যাও আমায়।’

শুক্লা বেরিয়ে এসেছেন অফিস থেকে। সঙ্গে কৃষ্ণা, ঈশিতা। কয়েকটা মেয়েও ওদের ঘিরে ভিড় করেছে। বেদির ওপর গান আর নাচ থেমে গিয়েছে। পরমার সঙ্গে সঞ্চিতাও এগিয়ে গেল ভিড়টার কাছে। বড়বাড়ির মনিটর কবিতা আর সোনালির চোখে জল। কিছু একটা ঘটেছে।

পরমা শুক্লার কাছে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে দিদি? রাখি এরকম করছে কেন? ওরা কারা?’

তিনি যা বললেন তাতে পরমার কথা ফুরিয়ে গেল।

এই স্বামী-স্ত্রী রাখিকে দত্তক নিয়েছেন। আগে একদিন এসে দেখে গিয়েছিলেন। তারপর হেড অফিসে গিয়ে ফর্মালিটি সেরে ফেলেছেন। আজ এসেছেন রাখিকে নিয়ে যেতে। বাইরে তাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে।

কবে এসে ওরা দেখে গিয়েছিল রাখিকে? সেদিন কোথায় ছিল পরমা? দেখতে পায়নি তো। অবশ্য দেখলেই বা কী হত? আবার একটা কষ্ট ঠেলে উঠে আসছে পরমার বুকে। এতদিন মেয়েটা আগুপিছু ঘুরত, কোথাও কিছু ঘটলে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলত। কবে যে জায়গা করে নিয়েছিল মনে। যাকে সে ভালবাসে তাকেই আজ নিয়ে যাবে এরা? রাখির আকুল কান্না থেঁতলে দিচ্ছে ভেতরটা। চলে যাবে মেয়েটা? এমন হঠাৎ করে একদিন? বিশ্বাসই করতে পারছিল না সে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১২

আর এক মনিটর দোলা একটা ব্যাগ এনে রাখির নতুন মায়ের হাতে ধরিয়ে দিল। তাতে তার জামাকাপড় আছে। তিনি যদিও চাপা গলায় বললেন, ‘না না, এসব লাগবে না।’

কবিতা নুসরতের হাত শক্ত করে চেপে ধরে চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে। সোনালি আর কবিতাই রাখি আর নুসরতের খেয়াল রাখত। তাদের চান করানো, খাইয়ে দেওয়া, সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তৈরি করা। রাখির চলে যাওয়ার কষ্ট তাদেরও বিঁধছে নিশ্চয়। মেয়েটাকে তারাও ধরে রাখতে পারবে না। কী করে রাখবে। নিজেরাই আছে এক আশ্রয়ে।

সর্বাণী মিত্র আর রাখির নতুন বাবা-মা একরকম জোর করেই তাকে গাড়িতে নিয়ে তুললেন। জানলার কাচ তোলা। রাখি তার ওপর হাত চাপড়াচ্ছে আর কাঁদছে কিন্তু কাচ পেরিয়ে সে কান্না বাইরে আসতে পারছে না। সেখানে আর একজনও কেঁদে চলেছে। সে নুসরত। তার কান্নাতেও একটুও শব্দ নেই। শুধু অঝোরে জল গড়িয়ে নেমে আসছে গাল বেয়ে। এসব যদিও কিছুক্ষণের জন্যেই। রাখিকে নিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে ছোট্ট বাঁকটা ঘুরতেই মিলিয়ে গেল গাড়িটা।

মেয়েরা সবাই যে যার জায়গায় ফিরে যাচ্ছিল। বিকেলে কখন দুটো বাড়ির তালা খোলা হবে, ছটফট করে তারা। কিন্তু আজ বাইরে থাকার সময়টুকুও ছেড়ে দিয়েছে। আগেই ঘরে ঢুকে গিয়েছে সবাই। অফিস ছুটি হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে দু’বাড়ির রোল কল সেরে নিয়েছে সাথী আর উর্মিলা।

বন্ধ গেটটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পরমা। কোথাও যাওয়ার জোর পাচ্ছে না সে। বড়বাড়িতে ঢুকলে আর কেউ দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে না গায়ে। ছোট্ট পাখির সুরে কেউ বলবে না— ‘আন্টি, ও আমার পুতুল লুকিয়ে রেখেছিল, তুমি বকে দাও।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৪

সংসারে থাকলে রাখির মতো একটা মেয়ে পরমারও থাকত হয়তো। কত সময় তার নামও ভেবেছে মনে মনে। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের নায়িকাদের নাম। মৃন্ময়ী, মৃণালিনী, রজনী, ভ্রমর, চঞ্চলকুমারী, শান্তি। পুরনো নাম সব। তার মধ্যেই একটা রাখত না হয়। কিন্তু সেরকম কেউ তো নেই তার। কত কষ্টই যে ফিসফিস করে কথা বলে মাথার ভেতরে।

‘কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস!’

পরমা পিছনে ফিরে দেখল অর্পিতা। সে কিছু না বলে চলে যেতে চাইছিল। অর্পিতা এগিয়ে এসে তার পিঠে হাত রাখল। ‘মনখারাপ করিস না। যে গেল, সে বেঁচে গেল। এখানে থাকলে কী জীবন হত ওর? নাম একটা আছে কিন্তু কোনও পরিচয় নেই। ওই যে আমাদের অফিসে কাজ করে অনু আর রিনি—  হোমের মেয়ে, কেউ কোত্থাও নেই ওদের। নিতু যে মেয়েকে রেখে চলে গেল, তার কী হবে তুই জানিস? কেউ জানে না।’

পরমা বলল, ‘ওরা কবে রাখিকে দেখতে এসেছিল অর্পিতাদি?’

‘তুই তখনও আসিসনি। দত্তক নিতে হলে অনেক কাগজপত্রের ব্যাপার থাকে, সময় লাগে। আজ এসে নিয়ে ওরা যেতে পারল মেয়েটাকে। ভালোর জন্যেই তো এসেছিল। আমাকে দ্যাখ না, ছোটবেলায় কে ফেলে রেখে গেছিল হোমে। কেউ তো নিয়ে যাওয়ার জন্যে আসেনি। সেখানেই বড় হয়েছি। পড়াশোনা যেটুকু শেখা, সেই হোমেই। তারপর শুধু হাতবদল হয়ে এখানে। ওখানকার মাদার-ইনচার্জ ছিলেন ইলাদি। উনিই যা আমায় আগলে আগলে রাখতেন একটু। তার কাছে হাত দেখা শিখেছিলাম। ইলাদি মারা যাওয়ার পর আর ওখানে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। চলে এলাম। তারপর দশ বছর হয়ে গেল এখানে। কতই তো দেখলাম। কত কিছু সহ্য করে যে আছি। তবু বলতে পারি না কোনও কথা। তাড়িয়ে দেয় যদি আমাকে! কোথায় যাব? কে নেবে আমায়? আমি হাত দেখি কেন জানিস, সত্যি হোক বা মিথ্যে, অন্যের ভাগ্য দেখি। এখানে মেয়েদের হাত যখন দেখি তখন ভালো বলে দিই। সব ভালো। আর কী বলব তাছাড়া? নিজেরটা তো জানি। আপনজন বলে কেউ নেই। ভবিষ্যৎ বলেও কিছু নেই। কেমন জলের মতো বয়ে চলেছে জীবনটা। শুধু ঢেউ নেই কোনও।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৬

অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। দুটো বাড়ি শান্ত, নিঝুম। তাদের ঘিরে কিছু বড় বড় গাছ চুপচাপ দাঁড়িয়ে। একটা পাতা নাড়িয়েও শব্দ করছে না তারা। অর্পিতার কথাগুলো যেন এই বিরাট চৌহদ্দির কোথাও রয়ে যাচ্ছিল।

‘রাখিকে কোথায় ফেলে দিয়ে গেছিল জানিস তো? ডাস্টবিনে— নোংরা ফেলার জায়গায়। ইনফেকশন হয়ে মরে যেতে পারত, বেড়াল-কুকুরে কামড়ে ছিঁড়ে দিত হয়তো। সেখান থেকে তুলে আনা মেয়েটা আজ একটা ঘর পেল। যারা নিয়ে গেল তাদের টাকা-পয়সা, গাড়ি, বাড়ি সবই আছে। যা ছিল না তা পেতেই তো এখানে আসা।’

পরমা বলল, ‘রাখিকে নিজের করে নিতে পারবে তো ওরা?’

‘পারবে পারবে। মনে মনে ভাব, রাখির জীবনে এবার থেকে যেন সব ভাল ঘটে। দেখিস, ও ভাল থাকবে।’

কথাটা বলতে বলতেও ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বড় একটা শ্বাস লুকোতে পারল না অর্পিতা। ‘সকালে একজনকে রেখে গেল, বিকেলে অন্যজনকে নিয়ে গেল। আমাদের হোমের মেয়েদের হিসেবে কিন্তু কোনও গোলমাল হয়নি, তাই না!’

পরমা কিছু বলতে পারছিল না। অর্পিতা একটু চুপ করে থেকে যেন ঠোঁট দুটো নাড়াল শুধু। ‘আমায় কেউ নিয়ে গেলে হয়তো আমার জীবনও—’

এইটুকুই। বাকি কথা যেন ভেতরেই রেখে দিল অর্পিতা। পিছমোড়া দুটো হাত, সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়া মাথা। সেই চেনা ধরনে হাঁটতে হাঁটতে সে চলে যাচ্ছিল বড়বাড়ির পিছন দিকটায়।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৭

সে বাড়ির ভেতর থেকে তখন ভেসে এল কল্পনা থাপার গান। আবার গাইছে মেয়েটা।

রেশম ফিরিরি… রেশম ফিরিরি…

উড়ি না যাউ কি ডাঁড়া মা বাঞ্জাং রেশম ফিরিরি…

আজ আবার গানের মানেটা মনে পড়ে গেল পরমার। মন আমার রেশমি রুমাল… উড়ব, উড়েই যাব শুধু, না কি চলে যাব ওই উঁচু পাহাড়ের ওপরে!

পরমা নড়ল না। যাক অর্পিতা। আজ হয়তো তারও একা থাকার নির্জন কোনও জায়গা দরকার।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৮

 

 

Comments are closed.