রবিবার, আগস্ট ১৮

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৮

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১৮

অষ্টমঙ্গলায় বাপেরবাড়ি যাওয়া হয়নি পরমার। ওসব করার মতো কে আছে সেখানে। তার দিন পনেরো বাদেই চাষের কাজও শুরু হয়ে গেল। জমিতে কাদামাটি করা, মই দেওয়া, গজাধান ফেলা। সব হতে থাকবে পরপর।

সকালবেলা বিছানা ছেড়েই বেরিয়ে যেত দেবাশিস। পরমা নতুন বলে ছাড় দেওয়া হয়েছে। মাঠে যেতে বলেনি কেউ। নয়তো ছোটবেলাতেও ধানচারা রুইতে যেতে হত তাকে। ওইসময় ঘরের কারও বসে থাকার জো নেই।

চাষের সময় খাওয়াও মাঠেই সারে গ্র‌ামের মানুষ। দেবাশিসের খাবার শাশুড়ি নিয়ে যায়। গামছায় বাঁধা বড় বাটিতে গরম ভাত, আলুসেদ্ধ। নয়তো পান্তার সঙ্গে পেঁয়াজ-লঙ্কা। পরমাই ভাতের ওপর সাজিয়ে দিত সব। তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়ত রান্নায়। মনে একটাই আনন্দ। কত কল্পনা। দুপুরে ঘরে ফিরবে সেই মানুষটা। সে স্নানের গামছা এগিয়ে দেবে, সুন্দর করে বসিয়ে খাওয়াবে, দরকার হলে পাখার বাতাসও করতে পারে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

ছোটবেলায় বাবার কাছে শোনা এসব। মা যেরকম করত বাবাকে। শুনে শুনে সেই ছবিটাই বসে গিয়েছিল পরমার মনে।

বারোটা বাজলে খাটুনে লোকেরা সব ফিরতে শুরু করে। পরমারও ঘর-বাইর করতে থাকে। এই বুঝি এল সে। কিন্তু কোথায়? একে একে সব লোক চলে এল। একটা বাজল। তারপর দুপুর গড়িয়ে দুটো, তিনটে। বিশ্রাম নিয়ে মাঠের লোকরা আবার বেরোচ্ছে। তখনও দেবাশিসের দেখা নেই। শাশুড়ি বলত, ‘আর বসে থেকো না বউমা। খেয়ে নাও। আমার দেবুটা ওইরকম। কাজ শেষ করে সন্ধেবেলাই ফিরবে একেবারে।’

পরে বাড়ি ফিরলেও ঘরে থাকত না দেবাশিস। পরমার সঙ্গে একটা-দুটো কথা। বেরিয়ে যেত আবার। হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে। এমনই ভেবে নিতে হয়েছিল পরমাকে। তারপরেও মনে হত, একটু ঘরে থাকলে কী হয়!

রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে, রান্নাঘরের গোছগাছ সামলে পরমা যখন বিছানায় যেত দেবাশিস তখন ঘুমোচ্ছে। সেও চুপচাপ শুয়ে পড়ত। বিরক্ত করত না। সারাদিন খাটাখাটুনি গিয়েছে মানুষটার। শুধু আলতো করে কখনও তার গায়ে হাত রাখত সে। যেন তাপ নেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু গা তো শীতল। তখন কিছু কথা তো মনে হতই। পরমার বিয়ের পর খবর পেয়ে তার বন্ধুরা ফোন করেছিল। তারা রসিয়ে রসিয়ে বলেছে নতুন বিয়ের পর বর কীরকম সুযোগ খোঁজে বউয়ের কাছে যাওয়ার। দুটো কথা বলার। তাহলে দেবাশিসের কী হয়েছে? দেড় মাস কেটে গেল, এখনও অবধি সে পরমাকে ছুঁয়েও দেখেনি একবার।

এরমধ্যে অনিন্দ্যদা আর সুতপাবউদি দু’বার ফোনে খোঁজ নিয়েছে। মেজজামাইবাবুকে সঙ্গে নিয়ে মেজদি দেখতে এসেছিল পরমার সংসারপাট। তার উদ্যোগেই তো এই বিয়ে। জানতে চেয়েছিল, ‘তুই ভাল আছিস তো?’ হেসে সবাইকেই ‘হ্যাঁ’ বলেছিল পরমা।

এক একদিন রাতে দেবাশিস মাঝে মাঝেই পাশ থেকে উঠে কোথায় চলে যেত। ফিরে আসত বেশ খানিকক্ষণ পর। গ্র‌ামে দশটা পেরিয়ে যাওয়া মানে বেশ রাত। নেহাত দরকার না পড়লে কেউ বেরোয় না। একদিন পরমা জানতে চেয়েছিল। দেবাশিস বলল, ‘আমার পেটের গোলমাল আছে একটা। সকালে ঠিক করে না হলে রাতে যেতে হয়।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

শুধু এই? ছলছুতো কথাটার মধ্যে ছল আছে, ছুতোও। প্র‌থমটা তখনই ধরে নিতে চাইছিল না পরমা। কিন্তু পরেরটা যে আছে তা টের পাচ্ছিল সে। তবে বুঝতে পারছিল না এরকম কেন করছে দেবাশিস।

সেদিন দুপুরেও দেবাশিস বাড়ি এল না। শাশুড়িও ভাত নিয়ে যায়নি। দেবাশিস নাকি মানা করেছে। পরমা মাঠে চলে গেল তাকে ডাকতে। কিন্তু সেখানে তো কেউ নেই! শুধু দেখতে পেল তাদের জমিতে কাদামাটি হয়ে গিয়েছে। গজাধান ফেলা হবে। আশেপাশের জমিগুলোর কোথাও গজাধান পড়েছে। কিছু কিছু জমিতে আবার ছোট ছোট ব্যানচারাও বেরিয়ে গিয়েছে।

ফিরে আসছিল। পাড়াতুতো এক জা পুকুরপাড় থেকে হাঁক দিল, ‘ও নতুন বউ, কোথায় গিয়েছিলে এই ভরদুপুরে?’

সে ঘোমটাটা একটু ছোট করল। গ্র‌ামে সব বউকেই ঘোমটা দিয়ে থাকতে হয়। তাই নিয়ম। সেই জায়ের হাতে একগাদা বাসনপত্র। খাওয়ার পর মাজতে বেরিয়েছে। পরমা বলল, ‘তোমার দেওরকে ডাকতে।’

‘পেলে?’

‘না।’

‘দ্যাখো, সে ঠিক তার জায়গায় খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়েছে।’

পরমা তার মুখের দিকে চেয়ে রইল।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

সেই মহিলা উঠে এল কাছাকাছি। এদিক ওদিক তাকিয়ে খাটো গলায় বলল, ‘দ্যাখো ভাই, একটা সত্যি কথা বলছি, তবে আমার নাম করে কাউকে বলতে পারবে না কিন্তু। রত্নাবউ আছে না? সেই যে তোমার বিয়েতে পটর পটর করছিল খুব। তার ঘরে যাও। তোমার বরকে সেখানেই পাবে।’

বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল পরমার। তবু বলল, ‘কোথায় তার ঘর?’

‘ওই মণ্ডলপাড়ায়, বরের নাম শেখর মণ্ডল।’ কথাটা বলেই সে গুটগুট করে ঘাটে নেমে গিয়ে ছাই দিয়ে বাসন মাজা শুরু করে দিল।

বাড়িটা খুঁজে পেয়ে গেল পরমা। মাটির দোতলা। খড় দিয়ে ছাওয়া। উঠোনের ডান পাশে তুলসীমঞ্চ। তার পাশে একটা অপরাজিতা গাছ। কয়েকটা ফুল ফুটে রয়েছে। নীচে সামনের দাওয়াটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘেরা। সেখানে ঢোকার বেড়ার দরজাটা বন্ধ। কোথাও কেউ নেই। রত্নাবউদির নাম ধরে ডাকবে? চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর দরজার আগল খুলে ঢুকে পড়ল। ভেতরে অন্ধকার মতো আরও একটা দাওয়া। সেখানেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ডানহাতে দোতলায় ওঠার মাটির সিঁড়ি। কী মনে করে উঠতে শুরু করেছিল পরমা। পাঁচ-ছ ধাপ ওঠার পরেই পা আটকে গেল।

বাঁদিকের ঘরের দরজায় শাড়ি কেটে বানানো পাতলা পর্দার মতো কিছু একটা ঝুলছে। মাটি অবধি পৌঁছয়নি সেটা। তার তলা দিয়েই দেখা যাচ্ছিল ভেতরের নীচের জায়গাটুকু। সেখানে মাদুরে রত্নাবউদি শুয়ে। পাশে আধশোয়া দেবাশিস হাতের বেড়ে জড়িয়ে রেখেছে তার কোমর। দেবাশিসের মুখ নেমে আসছিল রত্নাবউদির মুখের ওপর।

চোখ জ্বলে গেল পরমার। ঘুরে দাঁড়িয়ে ধরে নিল পাশের দেওয়াল। ওরা যদি তার বুকের ঢিবঢিব শুনতে পায়! যেন সেই ভয়েই আস্তে আস্তে পা ফেলে নামতে শুরু করল।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

বাইরে এসে জোরে শ্বাস নিতে চাইছিল পরমা। পারল না। উঠোন ছেড়ে বেরিয়ে এল। ঘোমটাটা আরও টেনে নিয়ে প্র‌ায় ছুটতে লাগল সে। কোথায় যাবে? ঘরে? কোন ঘরে? কার ঘরে? সামনে একটা বাঁশজঙ্গল। সেখানেই ঢুকে পড়ল। দরদরিয়ে ঘামছে। দু-তিনটে বাঁশের গোছে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। বাঁশপাতার সরু ছায়া আর টুকরো রোদ্দুরে শরীর মিশিয়ে যেন লুকিয়ে থাকতে চাইছিল।

পারেনি যদিও। তারপর ফিরতেই হল। তবে সে অপেক্ষায় রইল দেবাশিসের ফেরার।

শাশুড়ির কাছে রা কাড়েনি পরমা। সন্ধেবেলা দেবাশিস আসার পরে তাকেও কিছু বলল না। রোজকার মতো সব কাজ সেরে রাতে গিয়ে ঢুকল ঘরে। কল্পনা করার মতো আর কিছু নেই তার কাছে। সোজাসুজি কথা বলতে হবে দেবাশিসের সঙ্গে।

আলো না নিভিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল পরমা। একটু পরেই দেবাশিস বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আলো বন্ধ করো, চোখে লাগছে আমার।’

পরমা বলল, ‘জানি, কিন্তু আমার কিছু কথা আছে তোমার সঙ্গে।’

‘কী কথা?’

‘আজ তুমি কোথায় গেছিলে?’

‘রোজ যেখানে যাই।’

‘সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি। রোজ তুমি কোথায় যাও?’

পরমার কথা বলার ধরন দেখেই বোধহয় দেবাশিস নিচু গলায় বলল, ‘মাঠে যাই, কাজে।’

‘তারপর বাড়িতে না এসে সেখান থেকে কোথায় যাও?’

এবার দেবাশিস গলায় ঝাঁঝ নিয়ে এসে বলল, ‘কী বলতে চাও তুমি? কোথায় যাই আমি?’

‘কিছু বলতে চাই না। নিজের চোখে দেখে এসেছি আজ। দুপুরে রত্নাবউদির বাড়ি গেছিলাম আমি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল দেবাশিস কিন্তু কোনও কথা বেরোল না। ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে তার মুখ।

পরমা বলল, ‘তুমি আমায় বিয়ে করতে গেলে কেন বলো তো? কেন ঠকালে আমায়? এরপর এখানে আর থাকতে পারব আমি! মাকে আমি কিছু বলিনি কিন্তু কাল তোমার দিদিদের ফোন করে ডাকব। তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

কথাগুলো শুনতে শুনতে দেবাশিসের মুখ ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছিল। তবে পরমার যা বলার ছিল বলা হয়ে গেছে। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে পড়ল সে।

ঘুম আসছিল না। সকালে চোখ জ্বালা করছিল আর এখন গোটা শরীর যেন জ্বলছে। কিছুদিন আগেও যে মানুষটাকে কাছের মনে হচ্ছিল, পাশে শুয়েও আসলে সে অনেক দূরের। পরমার কেউ নয়।

খানিক পরেই পরমা বুঝতে পারল দেবাশিস কাছে আসার চেষ্টা করছে। শক্ত কাঠ হয়ে পড়ে রইল সে। বিয়ের পর থেকে রোজ ভেবেছিল এই বুঝি বর টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। কিন্তু দেবাশিস ভাল করে কথা অবধি বলেনি। আজ জেনেছে তার কারণ। আর ধরা দেবে না সে।

দেবাশিস যেন মরিয়া হয়ে উঠল কিছুক্ষণের মধ্যে। বড় বড় শ্বাস পড়ছে তার। গা-জোয়ারি শুরু করল। কেন এরকম করছে? তাকে ভোলানোর চেষ্টা? না কি দখলের? পরমা তো কোনও চাষের জমি নয়। দেবাশিস উঠে আসতে চাইছিল তার শরীরের ওপর। ধাক্কা দিয়ে সরাতে গিয়ে ডান হাতের পলাটা ভেঙে টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ল কোথায়। চুল খুলে গিয়েছে পরমার। সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল সে। ‘তুমি যদি এরকম কর, আমি সারারাত বাইরে বসে থাকব তাহলে।’

দেবাশিসের দুই দিদি আর বোন এল পরেরদিন। চাষের সময় বলে সবাই ব্যস্ত। দিদিরা এসেই তাই পরমার ওপর চোটপাট শুরু করেছিল। ‘কী তোমার এমন কথা বলো তো যে হুকুম করে ডেকে পাঠালে!’

সব শোনার পর কিছু সময় গুম হয়ে বসে ছিল তারা। তারপর দেবাশিসের বড়দি বলল, ‘ঠিক আছে, বুঝেছি। তা মীমাংসা কিছু একটা হবে। এত তাড়া কীসের? চাষের পরে ধীরেসুস্থে বসা যেত। কী হয়েছে, কার দোষ— সেসব বোঝা যেত।’

অবাক হয়ে গেল পরমা। চাষের কাজটাই বড় হল! তার সংসারের কী হবে সেটা কিছু নয়? ধান থেকে চাল হয়, চাল থেকে ভাত। সেই ভাত এখানে মুখে তুলতে পারবে পরমা? সে শক্ত গলায় বলল, ‘অত সময় নেই আমার কাছে।’

দেবাশির ছোট বোন অর্চনা এরপর তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল বাড়ির পিছন দিকে। বলল, ‘বউদি, জানি তোমার কেমন লাগছে। আসলে আমরা সবাই আগে থেকেই জানতাম ব্যাপারটা। গ্র‌ামেও কথা চালাচালি হয় এ নিয়ে। দাদা তো বিয়ে করবে না বলে বেঁকে বসে ছিল। মা কান্নাকাটি করে রাজি করাল।’

অর্চনার কাছ থেকেই আরও অনেক কথা জানতে পারল পরমা। সেদিন যখন সে রত্নাবউদির বাড়ি গিয়েছিল তখন কাউকে দেখতে পায়নি। তার ছেলে আর মেয়ে ছিল স্কুলে। একজন থ্রি, অন্যজন ফাইভে পড়ে। বউদির বর আগে এখানেই থাকত। পরে রাজমিস্ত্রির কাজে চলে গিয়েছে কেরলে। এখন সারাবছর বাইরেই পড়ে থাকে রোজগারের জন্য। বছরে এক-দু’বার আসে, দিন সাতেক থেকেই চলে যায়। ও বাড়িতে পাড়ার আরও কেউ কেউ যায়। বিকেলে তাসের আসর বসে। অন্য কারও সঙ্গে কিছু হয়নি। শুধু দেবাশিসই নাকি ফেঁসে গিয়েছে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১২

এতসব বলার পরে করুণ মুখে তাকাল অর্চনা। ‘তুমি কি দাদাকে সামলে নিতে পার না একটু?’

পরমা বলল, ‘না, পারি না। একজন নিজেকে সামলাতে পারছে না আর তোমরা আমার ওপর আশা করে এখানে নিয়ে এসে ফেললে!’

অর্চনা বলল, ‘তাহলে তোমায় আর একটা কথা বলি। তোমার মেজদিও কিন্তু সব জানত। আমার মা তাকে গিয়ে ধরেছিল। আমরা ভেবেছিলাম বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। সেও তেমনই ভেবেছিল তাহলে।’

এবার পরমা বলল, ‘সেইজন্যেই আরও পারব না। তোমরা সবাই মিলে জেনেশুনে আমাকে ঠকিয়েছ!’

বাপের বাড়িতে গিয়েছিল পরমা। দাদা মুখ ফিরিয়ে রইল। পরমার জন্যে কোনওদিনই কিছু করেনি সে। লোকের বাড়িতে কাজ করত বলে বোন বাইরে বাইরে ছিল। বিয়েটাও বাইরের লোক এসে দিয়ে গিয়েছে। এখন বিয়ে ভেঙে যদি তার সংসারে এসে জোটে তাহলে তো সারাজীবনের ভার। পরমার বাবাও জানতে পারল সব কিন্তু কিছু বলার পথ নেই। ঘাড় ঝুঁকিয়ে, পা মুড়ে বসে রইল দাওয়ায়।

কয়েকদিন পর দেবাশিস এসেছিল। পরমা ফেরেনি তার সঙ্গে। বউদি দেবাশিসকে বলল, ‘তোমার জিনিস তুমি নিয়ে যাও বাবা। বউকে কেমন করে ধরে রাখতে হয় জান না! বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যাক একবার, দেখবে মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।’

দেবাশিস তার অন্যায় স্বীকার করেনি। উলটে বলেছিল, ‘ও মিথ্যে কথা বলছে। বদনাম করছে আমার। আমি আবার আসব। ওকে নিয়ে তবে যাব।’

পরমা বুঝতে পেরেছিল, এখানেও আর থাকা যাবে না। সে সুতপাবউদিকে ফোন করল। সব শোনার পর বউদি রাগী গলায় বলল, ‘এতদিন পরে জানাচ্ছিস এসব! ওখানে পড়ে থেকে মার খাস না। চলে আয়। তারপর কী হয় দেখা যাবে।’

তখনই মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠল দাদা। ‘বিয়ের পর স্বামীর ঘর না করলে গ্র‌ামে আমাদের বদনাম হবে। তোকে ফিরে যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি।’

পরমার দুই দিদি এল তাকে বোঝাতে। তাদেরও এক কথা। ‘আমাদের মুখে চুনকালি দিস না।’

মেজদিকে আলাদা করে কিছুই বলল না পরমা। বুঝতে পারছিল না, সে কীভাবে চুনকালিটা দিচ্ছে। আসলে যাকে বলা উচিত সেই দেবাশিসকে কিছু না বলে তার ওপর চাপ দিচ্ছে কেন এরা?

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৪

পরমা সুযোগ খুঁজছিল যাওয়ার। একদিন কাকভোরে ঘরে পরার শাড়ি গায়ে, যতটুকু টাকাপয়সা ছিল হাতব্যাগে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল সে। এখন আর একা কলকাতায় পৌঁছনো কঠিন কিছু নয় তার কাছে।

যাওয়ার পর সুতপাবউদি তার হাত ধরে বলল, ‘তুই এখানেই থাকবি। কিন্তু একটা কথা আছে। আগের মতো এ বাড়ির কোনও কাজ করতে পারবি না। তোর সেই পরিচয়টা আমাদের কাছে আর নেই। যেমন আমরা আছি, তেমনই থাকতে হবে।’

ঘরের বউ পালিয়েছে! তাও আবার গ্র‌ামের! সেই দোষ পিছু ছাড়েনি। চলে এসেও রেহাই ছিল না পরমার।

অনিন্দ্যদার বাড়িতেই একদিন এসে হাজির হল দেবাশিস। সঙ্গে পরমার দাদা বাবলা। রাজমিস্ত্রির কাজে লেবার নিয়ে ঠিকাদার হিসেবে কয়েকবার কলকাতায় এসেছে বাবলা। চেনা লোক আছে কয়েকজন। সেইরকম দু’জনও এসেছিল। তাদের একটাই কথা, ‘আমাদের মেয়েকে ছেড়ে দিন। স্বামীর ঘর ওকে করতেই হবে।’

অনিন্দ্য বলেছিল, ‘আমরা ওকে জোর করে আটকে রাখিনি। আপনারাও জোর খাটাতে পারেন না। পরমা আর দেবাশিস যদি নিজেদের মধ্যে কথা বলে কিছু ঠিক করতে পারে তাহলে আমাদেরও কিছু বলার নেই।’

পরমা বলল, ‘ও তো মানতেই চাইছে না কিছু। ওখানে গিয়ে আমি থাকব কী করে? কার সঙ্গে?’

তারপরেও ফুঁসে উঠেছিল দেবাশিস। ‘আমি কেন মানব? ওর থাকার ইচ্ছে নেই বলে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলছে সব। আমার সঙ্গে কারও খারাপ কিচ্ছু নেই।’

ওদের সঙ্গে যারা এসেছিল তাদের মধ্যে একজন ফস করে বলে উঠল, ‘পুরুষমানুষের ওরকম একটু বাই থাকতেই পারে। বউ যদি আদরযত্ন দিয়ে ভোলাতে না পারল তাহলে সে আর কীসের বউ! আপনারা মেয়েটাকে ছাড়ুন তো, একবার গ্র‌ামে ফিরুক তারপর দেখছি কোথায় পালায়। আর যদি না ছাড়েন তাহলে আপনাদেরও আমরা ছাড়ব না।’

কথাগুলো শুনতে শুনতে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল অনিন্দ্য। ‘দাঁড়ান দাঁড়ান, আপনার মুখ থেকে গন্ধ বেরোচ্ছে কীসের? আপনি কি মদ খেয়ে এসেছেন এখানে?’

সুতপা ঝট করে উঠে দাঁড়াল। ‘আপনার সাহস তো কম নয়! মদ খেয়ে এসে আমাদের হুমকি দিচ্ছেন!’ দেবাশিসের দিকে চোখ রাখল সে। ‘লজ্জা করে না তোমার? নিজে অন্যায় করেছ আর সেই দোষ চাপাচ্ছ এই মেয়েটার ওপর! ও তো সংসার করতেই গেছিল। তোমার জন্যেই পারেনি। এখন লোকজন জুটিয়ে এসেছ নিয়ে যেতে। কেন? ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারলে লোকের কাছে বলা যাবে ও যা বলেছে সব মিথ্যে, তাই তো! তোমার গায়ে যে দাগ লেগেছে তা ওকে দিয়ে মোছাতে চাও। আর ও সব জেনেও তোমার সঙ্গে কীভাবে থাকবে সেটা ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই? সবচেয়ে বড় কথা, তুমি সত্যিটা মানছ না, তার মানে এতকিছুর পরেও তোমার কোনও বদল ঘটেনি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৬

এরপর সুতপা অনিন্দ্যকে বলল, ‘এদের সঙ্গে আর একটাও কথা নয়। এক্ষুনি থানায় যাব আমরা। পরমাকে নিয়েই যাব। এদের পুলিশের হাতে দেওয়া দরকার।’

তখন ওদের আর একজন উঠে দাঁড়াল। ‘না না, আমরা চলে যাচ্ছি। ওদের ব্যাপার যদি ওরা মেটাতে পারে, মেটাক। আমরা এর মধ্যে নেই।’

আর কোনও কথা না বলে ওরা সকলেই বেরিয়ে গিয়েছিল তারপর। তবে সুতপা ক্ষান্ত হয়নি। সেই রাতেই থানায় গিয়েছিল তিনজন। যদিও সেখানে যা ঘটল তাও কেউ ভাবতে পারেনি।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৭

Comments are closed.