শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৭

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১৭

‘আমার কাছে একটা ফোন এসেছিল।’

কথাটা শুনে কীরকম যেন লাগল পরমার। এতক্ষণ সাদামাঠা কথাই বলছিল অনিন্দ্যদা। ‘তুমি ঠিক আছ তো’, ‘কাজ কেমন চলছে’, ‘বই পড়ছ তো’ — এইসব। তারপর গলা যে বদলে গেল তা বুঝতে পেরেছে সে। জানতে চাইল, ‘কার ফোন?’

‘দেবাশিসের এক বন্ধু। নাম বলল কুমার। এরকম কাউকে তুমি চেন?’

আজ দোল। অফিস ছুটি বলে সেখানে কেউ আসবে না। মেয়েরা যে বাইরে বেরিয়ে ছুটোছুটি করবে তারও উপায় নেই। হোম-মাদারদের ভরসায় ছাড়া যাবে না তাদের। নানা রঙের আবির কাল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে দু’বাড়িতে। রং খেলতে হল ভেতরেই। তবু ভাল লাগছিল পরমার। সকাল থেকেই একটা মিঠে হাওয়া বইছে। গাছের পাতারা দুলছে সেই হাওয়ায়। ঝকঝকে যে রোদ্দুর চারদিকে ছড়িয়ে, মনে হচ্ছিল তার সঙ্গে আলাপ করে আসি।

এরমধ্যে দেবাশিসের নামটা শুনেই শক্ত হয়ে যাচ্ছিল পরমা। সব কিছুতে যেন তেতো মাখিয়ে দিচ্ছে কেউ। মেয়েদের সকালের জলখাবার দেওয়া হয়ে গিয়েছে। রান্নাঘর থেকে চলে গিয়েছে উর্মিলা। সবিতামাসি আর দুই হেল্পারও চলে যাবে এবার। আবার আসবে বিকেলে। পরমাও ছোটবাড়িতে ঢুকে যেত একটু পরেই। অনিন্দ্যদার ফোন আটকে দিয়েছে তাকে। শুরুতে রান্নাঘরের কাছেই দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। এখন হেঁটে এসে দাঁড়িয়েছে পিছন দিকে আম গাছটার নীচে।

সে বলল, ‘না, চিনি না। কিন্তু তোমায় ফোন করেছিল কেন? নম্বর পেল কোথা থেকে?’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

‘নম্বর তো নিশ্চয়ই দেবাশিসের কাছ থেকেই পেয়েছে।’

‘তুমি কথা বললে কেন?’

‘বলব না কেন? আমার ভয়টা কীসের?’

‘কী বলেছে তোমায়?’

‘যা বলেছে তা শুনলে তোমার ভালো লাগবে না। আমি শুধু ঘটনাটা জানাতে ফোন করেছিলাম।’

‘না লাগলেও শুনতেই হবে আমায়। বলো।’

এবার অনিন্দ্য খানিকক্ষণের জন্য চুপ করে রইল ওপাশে। তারপর ফিরে এল কথায়। ‘আচ্ছা বলছি। আমায় বলল, আপনার মতলবটা কী বলুন তো? মেয়েটাকে এখানে নিয়ে এসে বিয়ে দিলেন, তারপর সে দেড় মাসের মধ্যে আবার আপনার কাছেই ফেরত চলে গেল! আমাদের তো মনে হচ্ছে এসব ফন্দি এঁটেই করেছেন। আপনার কি একটা মেয়েছেলেতে সুখ হচ্ছে না? দুটোকে একসাথে চাই? একই বাড়িতে দুজনকে নিয়ে রইবেন না কি? আপনার বউই বা কেমন যে কিছু বলে না। ওটাকে ছাড়ুন তাহলে। যেটা আপনার কাছে গেছে তাকে নিয়ে ফুর্তি মারুন। না হলে দেবুর বউকে বলুন শ্বশুববাড়িতে ফিরে আসতে। যা হওয়ার এখানেই হবে। ও আমার বন্ধুর নামে বদনাম দিয়ে গেছে। ওকেই এসে তুলে নিতে হবে। এখানে পঞ্চায়েতের মিটিংয়ে ফয়সালা হবে সব।’

পরমা আর থাকতে পারল না। রাগ তার শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সেইসঙ্গে গলার কাছে চলে আসা কান্নাটা সামলে নিয়ে বলল, ‘তুমি থামো অনিন্দ্যদা, থেমে যাও এবার। আর শুনতে চাই না। আমার জন্য তোমাদের যে আরও কত অপমান সহ্য করতে হবে!’

ফোনের ওদিকে হেসে উঠে কথাটা যেন উড়িয়ে দিতে চাইল অনিন্দ্য। ‘শোনো পরমা, আমার চল্লিশ বছর বয়েস হয়ে গেল। খবরের কাগজে চাকরি করি, তার আগে অন্য কাজও করেছি। অনেক ঘাটের লোক দেখেছি। অনেক কথাও হজম করেছি। আমাকে অপমান করা অত সোজা নয়। আর সুতপাকেও আমি জানি। নরম মনের মানুষ, তবে দরকারে পড়লে যে কঠিন হতে পারে তার প্র‌মাণও তুমি পেয়েছ। আমাদের নিয়ে ভেবো না।’

‘ভাবব না! এত নোংরা নোংরা কথা বলছে!’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

‘হ্যাঁ, তা বলছে অবশ্য। তবে কী জান, কোথাও থেকে পচা গন্ধ পেলে আমরা জায়গাটা না খুঁজে আগে নিজেদের নাকে চাপা দিই। এটাও তেমনি। আমি ওই ছেলেটিকে বললাম, আপনার যদি এসব বলতে ভালো লাগে, বলতে পারেন। তবে কিছু করতে পারবেন না। বরং আপনার বন্ধুর কাছে গিয়ে জানতে চান পরমা ঠিক কী কারণে চলে এসেছে তাকে ছেড়ে। সাহস থাকলে সত্যি কথা স্বীকার করুক।’

‘এরপরেও কথা বলেছে তোমার সঙ্গে?’

‘হ্যাঁ। বলল, ও পালিয়ে বাঁচবে ভেবেছে? আপনারা ওকে রেখে দিয়ে বিপদে পড়বেন কিন্তু। আমি বললাম, হুমকি দিয়ে কোনও লাভ হবে না। বিপদে আপনারা পড়তে চলেছেন। তার ব্যবস্থাই করছি। এই কথাটা বলতেই ফোনটা কেটে দিল।’

পরমা বলল, ‘পালিয়ে তো আমি আসিনি। ওদের মুখের ওপর বলে তবে এসেছি।’

‘সে তো তুমি জান, আমরাও জানি। কিন্তু ওদের কাছে সেটাও তো রাগের একটা বড় কারণ। এতদিনের চেপে রাখা কথা সকলের সামনে বলে দিলে রাগ হবে না!’

পরমার মনে হচ্ছিল, সত্যিই যদি ওরা অনিন্দ্যদের কোনও ক্ষতি করার চেষ্টা করে! সে তো কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু এরাই বা তার জন্য কেন এত কিছু মেনে নিচ্ছে? জীবনে এরকম মানুষের দেখা ক’জন পায়!

‘হ্যালো, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ পরমা?’

‘হ্যাঁ, শুনছি।’

‘তোমার বিয়েটা আসলে একটা ব্লান্ডার। খুব ভুল হয়েছে আমাদের। ভেবেছিলাম তুমি ভালো থাকবে। কিছুই হল না। তোমার মেজদি যে জেনেশুনে এরকম একটা জায়গায় তোমায় টেনে নিয়ে যাবে তাও ভাবতে পারিনি। তবে তুমি কিন্তু ভেঙে পড়ো না কোনওভাবেই। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

পরমা বলল, ‘এক জীবনে আর কত কিছু করতে পারব অনিন্দ্যদা?’

‘পারবে পারবে। জীবন এত ছোট নয়। তোমাদের হোমে তো কত মেয়ে রয়েছে। তাদের কথা একবার ভেবে দ্যাখো। তোমার অবস্থা আর যাই হোক, তাদের মতো তো নয়। ওদের সঙ্গে যা হয়েছে তেমন তো হওয়ার ছিল না। তবু তো ওদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই সুন্দর জীবনের কথা ভাবে। সবাই হয়তো পাবে না। যে পাবে সে অন্য ভাবে বাঁচবে। আর তুমি ছোটবেলা থেকে শুরু করে অনেক তো লড়েছ। আরেকটু লড়ো।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

চুপ করে রইল পরমা। অনিন্দ্যদার কথা শুনলে মনে হয় লোকটা কোনও গাছের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে— দ্যাখো, রোদ্দুর আছে, হাওয়া আছে, জলও পাবে। বেঁচে থাকো। সত্যিই তো। এইসব মেয়ের লড়াই তার চেয়ে কত কঠিন। সে পারবে না কেন?

অনিন্দ্য বলল, ‘আচ্ছা শোনো, আমি এবার ছেড়ে দেব। তোমার বউদি তো আজ কোথাও বেরোবে না জান। সঞ্চারীকে নিয়ে আমি মা-বাবার ওখানে যাই একটু। আবির দিয়ে আসবে। তোমাদের ওখানে রং খেলা হয় না কি?’

‘হ্যাঁ, শুধু আবির।’

‘বাঃ, তাই তো ভাল। যাও, তুমিও যাও। আবার পরে কখনও কথা বলব। শুধু একটা কথা বলে রাখি। কোনও অজানা নম্বরের ফোন এলে ধরবে না। বউদি ফোন করবে তোমায়। কথা বোলো। চিন্তা করো না। আমরা আছি।’

অনিন্দ্য ফোন ছেড়ে দেওয়ার পরেও পরমা নড়ল না জায়গাটা থেকে। ছোটবাড়ি থেকে মেয়েদের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। হুল্লোড়। খুব হাসছে কেউ। রং মাখাচ্ছে নিশ্চয়ই। এখন গেলেই ওরা তাকেও ধরবে। যাওয়া হবে না পরমার। অনেক কথা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পিছন দিকে। বিবর্ণ, রংহীন কথা সব।

সেদিন বিয়ের পর ওরা তাড়াহুড়ো করেই গাড়িতে নিয়ে তুলেছিল পরমাকে। মন্দির থেকে আড়াই-তিন ঘণ্টার রাস্তা দেবাশিসদের বাড়ি। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

লাল মোরাম ফেলা চওড়া রাস্তা শেষ হয়েছিল একটা সরু রাস্তার মুখে। কিছুটা গিয়েই থেমে গেল গাড়ি। সামনে পুকুর। তার পাশের ফালি পথটুকু দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। নামতে হল। দেবাশিসের দিদি, জামাইবাবু, ভগ্নীপতি আর অন্য আত্মীয়রা আগেই নেমে গিয়েছে। চারপাশে অন্ধকার। শুধু দূরে কোথাও কয়েকটা টিউবলাইট সাদা আলো ছড়াচ্ছে। পরমা শুনতে পেল, সেখান থেকে ভেসে আসছে গান— এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে, আমার এ ঘরে থাকো আলো করে…

‘দেখি দেখি, সরো সবাই। মুখটা দেখি, কেমন হয়েছে দেবুঠাকুরপোর বউ।’ একজন এসে পরমার হাত চেপে ধরল। তার হাতে একটা লম্ফ। পরমা বুঝতে পারছিল না এত তাড়াহুড়োর কী আছে। সে তো পালিয়ে যাচ্ছে না।

‘এ বাবা, ঠাকুরপো! তোমার বউ তো দেখি কালো!’

কথা শুনে পরমা ঘোমটার ফাঁক দিয়ে তাকে একবার দেখে নিল। মহিলা ফর্সা বটে। অন্ধকারেও তা বোঝা যাচ্ছে।

পাশ থেকে একজন বয়স্ক মহিলা বললেন, ‘না না, কালো নয়, একটু চাপা।’

অন্য একজন ধমকে উঠল।, ‘ও কী কথা রত্না? নিজের রংটা পরিষ্কার বলে মুখে দেখি কিছুই আটকায় না। দু-দুটো বাচ্চার মা, এখনও বিবেচনা করে কথা বলতে শিখলে না!’

রত্না হাসছিল। বলল, ‘আচ্ছা চলো, আলোয় গিয়ে ভালো করে দেখব তাহলে।’

পরমাকে একরকম টানতে টানতেই নিয়ে গেল সে। একেবারে উঠোনে গিয়ে থামল। আগে থেকে সেখানে আরও অনেকে ভিড় জমিয়েছে বউ দেখতে।

দেবাশিসের ছোট বোন অর্চনা এসে বলল, ‘এবার যা করার করো, অনেক রাত হয়েছে, বউ ঘরে তোলা হবে।’

অর্চনা মন্দিরেও পরমার পাশে পাশে ছিল। দু’জনের বয়স কাছাকাছি হবে। ভাব করার চেষ্টা রয়েছে তার।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

দরজায় এনে দাঁড় করানো হল পরমাকে। সামনে সেই রত্নাবউদি বরণডালা হাতে দাঁড়িয়ে। বলল, ‘এসো গো নতুন বউ। আমাকেই তোমায় ঘরে তুলতে হবে। তোমার শাউড়ি তো এ কাজ পারবে না।’

পরমা জানে শাশুড়ি কেন পারবে না। বিয়ের কাজে বিধবার কোনও অধিকার নেই।

বরণ হয়ে গেল। রত্না বলল, ‘কলসিটা কাঁখে নাও তো।’

পরমার সামনে জলভরা পেতলের ঘড়া বসানো। তুলতে হবে। তাদের দেশের নিয়ম এটা। নতুন বউকে কাঁখে কলসি, মাথায় ধানের কুনকে নিয়ে দুয়ার থেকে ধান ফেলতে ফেলতে ঘরের ভেতরে গিয়ে লক্ষ্মীর আসনে রাখতে হয়।

কলসি তুলতে যাচ্ছিল পরমা। রত্নাবউদি আটকাল। ‘দাঁড়াও বাপু দাঁড়াও। বউ কেমন কাজের হবে তা দেখে নিতে হবে না?’

কোথা থেকে এক ওঁচা শুকনো ঢেলামাটি এনে ভারী করার জন্যে ফেলে দিল কলসিতে। ‘এবার তোলো তো দেখি। শুনেছি তো কলকাতায় ছিলে, দেশের কাজকম্ম কিছু পার? না কি সেসব কিছুই শেখনি?’

আসা থেকে কেন যে মহিলা তার পিছনে পড়ে রয়েছে তা পরমা বুঝতে পারছে না। নতুন জায়গা, কিছু বলাও যাবে না। সে এক ঝটকায় তুলে নিল কলসি। রত্না মাথায় বসিয়ে দিল ধানভরা কুনকে।

বাঁ কাঁখে কলসি, ডান হাতে কুনকে থেকে ধান ফেলতে ফেলতে নতুন সংসারে পা রাখল পরমা।

একটু পরে তার ননদ তাকে নিয়ে গেল একটা ঘরে। ‘এটাই তোমার আর দাদার ঘর। কাপড় বদলে নাও, তারপর খাবার জায়গায় নিয়ে যাব।’

পরমা এখন একটু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার সুযোগ পেল। ঘরে হলুদ বাল্‌ব জ্বলছে। মাটির দেওয়ালের এদিক থেকে ওদিকে টাঙানো দড়িতে কিছু অগোছালো জামা-প্যান্ট, গামছা, লুঙ্গি। অন্য দিকে একটা জানলা। সেখান দিয়ে বাইরেটা দেখা যায় কিন্তু এখন সবই অন্ধকারে। জানলার নীচে মাটিতে কয়েকটা ইটের ওপর তক্তা পাতা, সেখানে লোহার একটা বড় ট্রাঙ্ক। তালা ঝুলছে। মেঝেয় মাদুর পাতা।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১২

দরজায় টোকা পড়ল। খুলে দেখে দেবাশিস। পরমার সঙ্গে করে আনা জিনিসপত্র নিয়ে সে সামনে। শীত লাগলে যেমন গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় সেরকম হচ্ছিল পরমার। এখন নিশ্চয়ই ও তার সঙ্গে কথা বলবে? কী বলবে? কৌতূহল, না কি আনন্দ, না ভয় তার ভেতরে ছটফট করছে বুঝে উঠতে পারছিল না পরমা।

দেবাশিস কোনও কথা না বলে জিনিসগুলো রেখে একটা জামা-প্যান্ট নিয়ে বেরিয়ে গেল।

সেই রাতেই ছিল বউভাত। খেয়েদেয়ে চলে গেল পাড়ার সব লোকজন। ঘরের কুটুমদেরও খাওয়া হয়ে গেল। পরমা চলে এসেছিল। একটু পরে শাশুড়ি আর বড় ননদ এল। শাশুড়ি বলল, ‘বউমা, খেয়ে নেবে চলো। অনেক রাত হয়েছে। দেবু বোধহয় কোথাও গেছে। তার জন্যে আর বসে থেকে লাভ নেই। তুমি খেয়ে শুয়ে পড়ো। সে এলে আমরা দিয়ে দেব।’

অবাক হয়ে গেল পরমা। সে বুঝতে পারছিল না এরকম দিনে কোথায় যেতে পারে দেবাশিস। তাও আবার বাড়ির লোককে না জানিয়ে!

খাওয়ার পাট চুকলে সবাই শুয়েও পড়ল। বিছানায় জেগে রইল পরমা। দেবাশিস কখন এসে পড়ে। তারপর শুয়ে থাকতে থাকতে তারও চোখ লেগে এসেছিল। দেবাশিস এল আরও রাতে। খেয়েছে কিনা বলল না। পরমার সঙ্গে কোনও কথা না বলেই ঘুমিয়ে পড়ল।

বাকি রাতটা আর তেমন ঘুমই হল না পরমার। তার কী দোষ হয়েছে কোনও? না কি দেবাশিস এরকমই?

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৪

আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পরমা বিছানা ছেড়ে উঠে এল। আজ তার নতুন সকাল। কাজের বাড়িতে নয়, নিজের ঘরে ঘুম ভেঙেছে। ভোরের আলোয় বাড়িটা দেখল ভাল করে। মাটির একচালা। ডানদিকে একটা শিল্লাকুলের গাছ। তার পিছনে কয়েকটা আম আর পেয়ারাও। বাঁদিকে একটা চালতা। পাশেই খড়ের গাদা। সামনে বড় উঠোন। উঠোন পেরিয়ে পুকুর। ওই পুকুরের পাড় দিয়েই কাল এসেছে সে। পিছন দিকটায় গেল পরমা। সেখানে গোয়ালঘর। দুটো গরু বাঁধা। ছাইগাদার পাশে পেঁপেগাছ। তাতে অনেক পেঁপে ঝুলছে। শহরে থাকতে এসব কিছুই পেত না পরমা। মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। উবু হয়ে বসে সামনের জমির ঘাসগুলো ছুঁয়ে দেখছিল সে।

খিড়কির দরজা খুলে বেরিয়ে এল অর্চনা। ‘তুমি এখনও গা ধোওনি বউদি? নিয়মটাও তো করনি তাহলে! দাদাকে যে পাড়ার ওই ঠাকুমা কাল বারবার করে বলে দিয়েছিল— কোথায় সে?’

‘তোমার দাদা তো ঘুমাচ্ছে।’

‘এখনও সময় আছে। ডেকে আনো তাকে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৫

পরমা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কী বলে ডাকবে? দেবাশিস তো নিজের থেকে কোনও কথাই বলেনি কাল। সে কী করে আগে বলে? অর্চনাকে বলল, ‘তুমি গিয়ে ডেকে আনো না।’

অর্চনা আর কথা খরচ না করে ঘরে ঢুকে গেল। একটু পরে নিয়ে এল দাদাকে। তারপর পরমার কানে কানে বলল, ‘পুকুরে গিয়ে একডুবে যা পাবে তাই কুড়িয়ে নিয়ো। দাদাকে বলা আছে। তোমরাই যাও। অন্য কাউকে থাকতে নেই সেখানে।’

দেবাশিস এগিয়ে যাচ্ছিল। পরমা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে তার কাছে গেল। দেবাশিসের হাতে দুজনের মাথার টোপর, রজনীগন্ধার বাসি মালা। পরমা আর কথা না বলে থাকতে পারল না। লজ্জা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এসব নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?’

‘ঠাকুমা বলেছিল এগুলো পাঁকে পুঁতে দিতে। তাই নাকি নিয়ম।’

এই প্র‌থম দেবাশিস তার সঙ্গে কথা বলল। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে। দেবাশিসের গায়ের গন্ধ পাচ্ছিল পরমা। একটা অচেনা মানুষকে বিয়ের পর এতটা কাছের মনে হতে পারে! বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার। দেবাশিসের কথার শব্দ যেন রক্তের ঘুরপাক বাড়িয়ে দিয়েছে শরীরে।

পুকুরে ডুবে কতগুলো গেঁড়িগুগলি আর খেজুর-কুলের কয়েকটা দানা পেয়েছিল পরমা। ফিরে এসে অর্চনাকে বলল। তারপর জানতে চাইল, ‘কেন তুলতে বলেছিল গো?’

‘তোমাদের ছেলে হবে না মেয়ে তা জানার জন্যেই নতুন বর-বউকে দিয়ে ওই নিয়ম করানো হয়। বিয়ের পর আমিও করেছি। দাদা কী পেয়েছে?’

লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিয়েছিল পরমা। বলেছিল, ‘ও কী পেয়েছে তা তো জানি না।’

দেবাশিস বলেছিল সে কিছুই পায়নি।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬

Comments are closed.