রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬

  • 136
  •  
  •  
    136
    Shares

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১৬

বিকেলে পল্লবীকে আশ মিটিয়ে সাজাল মেয়েরা। পরনে বেনারসি, মাথায় চেলি, কপালে চন্দনের ফোঁটা। হোম-মাদাররা গেল আর্শীবাদ করতে। মাথায় ছোঁয়াল ধান দুব্বো। কেনাকাটা করতে কেউ বাইরে বেরোতে পারেনি। তাই প্র‌ত্যেকে পাঁচশো টাকা করে দিল পল্লবীর হাতে।

বাইরে থেকে খবর এল বর এসেছে। সর্বাণীদি ডাকছেন বরণ করতে। বরযাত্রীদের গাড়ি হোমের ভেতরে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে। ছেলের আত্মীয়-পরিজন কেউ নেই। তারই বয়েসি বন্ধুবান্ধব এসেছে জনাছয়েক।

বরণ করল উর্মিলা। আবার বেজে উঠল শাঁখ। আবার উলুধ্বনি। সব মিলিয়ে হোম কেমন অচেনা হয়ে উঠেছে।

ছাঁদনাতলায় যাওয়ার আগে রেজিস্ট্রি হল। রেজিস্টার এসে বসে ছিলেন অফিসঘরে।

বরযাত্রীদের নিয়ে গিয়ে বসানো হল ছোটবাড়ির ছাদে। তাদের দেখাশোনার ভার মনিটর মেয়েদের ওপর দিয়েছেন সর্বাণী। সরবতের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। একজন শুধু রয়ে গেল দেবজিতের সঙ্গে।

প্র‌ীতি বলল, ‘এটা সর্বাণীদির একটা চাল। যে ছেলেগুলো বরযাত্রী এসেছে তারাও যদি দু-একটাকে পছন্দ করে ফেলে এই তালে!’

পরমার মনে হল, পল্লবী তার ভালবাসা বোঝাতে পেরেছে তা যেমন সত্যি তেমনই দেবজিৎ নামের এই ছেলেটা যা করেছে তা সোজা কাজ নয় মোটেই। তার জন্যেই হোমে আজ এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটছে। ভাবতে গেলেও পালাই পালাই করবে অন্য ছেলেরা। তবে দেবজিতের বন্ধুরা তো জানে তারা কোথায় এসেছে, তাদের বন্ধু কাকে বিয়ে করছে। তাই দেবজিতের মতো তাদেরও একটা সম্মান প্র‌াপ্য। সে হেসে প্র‌ীতিকে পালটা বলল, ‘তাহলে তো আমি চাইব চালটা কাজে লেগে যাক।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

সন্ধেবেলার লগ্ন। বিয়ে শুরু হয়ে যাবে। এই সময় প্র‌ায় একটা হইচই শুনতে পেল পরমা। ‘দিদি এসেছেন, দিদি এসেছেন।’

গেট দিয়ে ঢুকছে এগজিকিউটিভ ডিরেক্টরের বিরাট গাড়ি। দিদি মানে নবনীতা দত্ত। কাজে আসার পর থেকে পরমা প্র‌ায় সকলের মুখেই এর কথা শুনে আসছে। আশ্রয় হোম এর হাতেই তৈরি। এতদিনে এই প্র‌থম তাকে দেখার সুযোগ হল। গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে এলেন। বয়স বাষট্টি থেকে পঁয়ষট্টির ভেতরে হবে। ফর্সা রং। ছোট চুল ঘাড় অবধি। তার বেশিটাই রেশমি সাদা। গলায় সোনার চেন। হাতে বালা। ভারী শরীরটা শাড়িতে মোড়া। চোখে দামি চশমা। তবে আশেপাশে যে কেউ আছে তা তিনি দেখতে পাচ্ছেন বলে মনেই হচ্ছে না।

গটমটিয়ে মণ্ডপে উঠে এলেন নবনীতা দত্ত। মুখে হাসি নেই, কারও সঙ্গে কোনও কথাও নেই। রঙিন কাগজে মোড়া দুটো প্যাকেট বর-কনের হাতে ধরিয়ে দিলেন। দু’জনে তাকে প্র‌ণাম করল। তাদের মাথায় হাত ছুঁইয়ে মণ্ডপ থেকে নেমে চলে গেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে সর্বাণী মিত্রও গেলেন তার পিছনে পিছনে। হোম-ইনচার্জ যে নবনীতাকে দেখামাত্র শক্ত হয়ে গিয়েছেন তা চোখ এড়ায়নি পরমার। সে কিছুটা অবাক হল। সর্বাণী মিত্ররও ভয় পাওয়ার লোক আছে তাহলে!

‘উনি কখনই হোম-মাদারদের সঙ্গে কোনও কথা বলেন না, না উর্মিলাদি?’ জিজ্ঞেস করল পরমা।

‘চেনেন কাউকে যে বলবেন? এক অর্পিতাকে জানেন আর আমাকে। তাও কখনও বলেননি। হোম-মাদারদের কাজে রাখেন সর্বাণীদি। কিন্তু অফিস স্টাফরা যদি ওর কাছে কারও নামে চুকলি করে তাহলে উনি সত্যিমিথ্যে না জেনেই তাকে বের করে দেবেন। তাও আবার ফোনেই জানিয়ে দেন সর্বাণীদিকে।

‘কন্যাদান কে করবেন? আসুন।’ তাড়া দিচ্ছিলেন পুরোহিত। উর্মিলা ডাকতে গেল সর্বাণীকে।

পরমা সঞ্চিতাকে বলল, ‘ছোটবাড়ির চাবি তো আমার কাছে। গিয়ে ছেলের বন্ধুদের ডেকে আনি। বিয়ে দেখবে তো নিশ্চয়ই। তা না হলে সবাই শুদ্ধু আটকে থাকবে।’

সঞ্চিতা হেসে উঠল কুলকুল করে। ‘ছেলেগুলো বোধহয় খুব গল্প করছে। বেচারারা জানেই না যে এখানকার নিয়মে ওরাও তালাবন্ধ! যাও যাও।’

গল্প সত্যিই হচ্ছিল। তবে বেশি কথা বলছিল মনিটর মেয়েরাই। এই প্র‌থম বাইরের এত ছেলে হোমের ভেতরে এসেছে। তাও আবার হোম-ইনচার্জ মেয়েদের মিশতে দিয়েছেন তাদের সঙ্গে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

ওদের নিয়ে নেমে এসে পরমা দেখল সর্বাণীদি বসে পড়েছেন আসনে। তিনিই করবেন কন্যাদান। সে অর্পিতার কাছে জানতে চাইল, ‘নবনীতাদি কোথায়? ‘

‘তিনি চলে গেছেন। থাকেন নাকি এতক্ষণ!’

বর, কনে আর সর্বাণী হাতজোড় করে বসে। পল্লবী তার গোত্র জানে না। হোমের খাতায় নামই আছে শুধু। এখানে অনেক মেয়েরই তাই। সর্বাণী মিত্রর গোত্র দিয়ে হবে বিয়ে। ঠাকুরমশাই মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করে দিয়েছেন খানিক আগেই।

নমঃ অপবিত্র পবিত্র বা সর্বাবস্থাং গতোপি বা

যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্য অভ্যান্তরঃ শুচি

নমঃ সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যং বরেণ্যং বরদং শুভম….

মণ্ডপে এখন ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গিয়েছে। তার মধ্যে ইশিতাকেও দেখতে পেল পরমা। আজ অফিস ছুটি ছিল। বিয়েতে থাকবে বলে সে সন্ধেবেলায় এসেছে। তবে মঞ্জরীদি আসেননি। কেন এলেন না, জানে না পরমা। আর নেই শম্ভুনাথ ও মৈনাক। সকালে একবার মুখ দেখিয়েই তাদের কর্তব্য শেষ।

হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে‌ ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীত

সদাচার পৃথিবীং ধ্যামুতেমাং কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম

মন্ত্রগুলো পরমার কানে ফিকে হয়ে পৌঁছচ্ছিল। এখনও আরও কত মন্ত্র পাঠ হবে। এই আলো, ফুল, মালা, শাড়ির খসখস, টুকরো কথা, গড়িয়ে পড়া হাসি আবছা হয়ে যাচ্ছে তার কাছে। ফিরে ফিরে আসছিল অন্য একটা দিন।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

তার বিয়ে হয়েছিল মন্দিরে। দিনেরবেলায়। সেদিন আরও কয়েকজনের বিয়ে ছিল সেখানে। তাদের ওদিকে এরকম হয়। যারা বাড়িতে বিয়ে দেওয়ার খরচ করতে পারে না তারা ছেলে-মেয়েকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে কাজটা সেরে ফেলে।

পরমার তো তাও হওয়ার কথা ছিল না। কে দেবে তার বিয়ে?

তখন সে অনিন্দ্যদাদের বাড়িতে। তিন বছর পেরিয়ে গিয়েছে। একদিন তার মেজদি চন্দনার ফোন এল। ‘আমাদের এখানে একটা ছেলে দেখেছি তোর জন্যে। এ বাড়িতে তো তুই এসেছিস কয়েকবার। তখন দেখেছিস মনে হয়। তারও তো আসা-যাওয়া আছে এখানে। ওই দেবাশিসের কথা বলছি রে, মনে পড়ছে? ওরাও তোকে চেনে। তোর কথা উঠলেই বাবা শুধু শুধু কান্নাকাটি করে— মেয়েটার বয়স হয়ে যাচ্ছে, এখনও বিয়েটা দিতে পারলাম না। ওর সব বন্ধুর বিয়ে হয়ে গেছে। তারা এখন একটা-দুটো বাচ্চার মা। তা দাদার কাছে কথাটা পেড়েছিলাম। সে বলে দিল, তুই যদি পারিস কর, আমি কিছু পারব না। বড়দিকে বললাম, সে বলল, আমার অবস্থা তো জানিস। আরে অন্তত মন্দিরে বিয়ের খরচটা তো করতে হবে! সেটুকু না হলে আমি কীভাবে এগোই?’

পরমার কুড়ি হয়ে গিয়েছে। সে জানে, তার বিয়ে নিয়ে কাঁদা ছাড়া আর কিছু করার নেই বাবার। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে, কোনও এক অসুখ কুরে কুরে খাচ্ছে বাবাকে। পরে বুঝেছিল, মা মারা যাওয়ার পর থেকে মন ভেঙে গিয়েছে বাবার। ছেলের সংসারেও তো সুখে থাকতে পারল না কোনওদিন।

ওপারে মেজদি বিরক্ত হল। ‘কী রে, শুনছিস? কিছু বলছিস না কেন?’

‘কী বলব?’

‘এতদিন কলকাতায় আছিস। তোর তো কিছু জমেছে, না কি?’

পরমা যখনই গ্র‌ামে গিয়েছে তখন বাবাকে কিছু হাতখরচ দেওয়ার পর বাকি সব তো দাদাকেই দিয়েছে। দিদিকে সে কথা বলা যাবে না। তাহলে আরও চেঁচাবে। কী বলবে ভাবছিল। দিদিই তাকে বাঁচিয়ে দিল।

‘এখন আর বেশি কথা বলতে পারছি না। পাওয়ার মারা নেই ফোনে। এক টাকা করে কাটছে। ছাড়ছি। এদিকে কী হয় দেখে পরে ফোন করব।’ ঝড়ের বেগে কথা শেষ করে লাইন কেটে দিল সে।

তখন পরমার কাছে কোনও মোবাইল থাকত না। বাড়িতে সুতপাবউদির নম্বর দেওয়া ছিল। সেই ফোনেই করেছিল দিদি। ফোন ফিরিয়ে দেওয়ার সময় বউদি চেপে ধরল। ‘কে করেছিল? দাদা? আবার টাকা চাই?’

‘না।’

‘তাহলে কে করেছিল? কী কথা হল বল।’

বলতেই হল সব কথা। শুনে বউদি দারুণ খুশি। ‘তোর মেজদিকে আমি এক্ষুনি ফোন করছি। আমরা দেব তোর বিয়ে।’

খুব লজ্জা পেয়েছিল পরমা। বিয়ের কথা হচ্ছে সেজন্যে নয়। এ বাড়ির দু’জন পাগল লোক তার বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগছে বলে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

অনিন্দ্যদা আর সুতপাবউদিকে সত্যিই থামানো যায়নি। সেদিনই না হলেও পরে মেজদির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোনে ফোনেই সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। শুধু বলেছিল, ‘ছেলেটি ভালো নিশ্চয়ই? সব দেখেশুনে নিয়েছেন তো? পরমা কিন্তু খুব ভালো মেয়ে। ওর মতো মেয়ে পাওয়া কম কথা নয়।’

মেজদি বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার বোন, আমি জানি না! দেবাশিসও ভালো ছেলে। বাবা বেঁচে নেই, দুই দিদি, এক বোন। তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িঘর ভালো, চাষবাসের জমি আছে। বোন ভালোই থাকবে।’

পরমা ভেবেছিল যার সঙ্গে বিয়ের কথা হচ্ছে তাকে যদি একবার ভালো করে দেখতে পারত। সেও তো দেখত পেত তাকে। তার না হয় আর কোনও উপায় নেই। বিয়ে যে হচ্ছে এই ঢের। তার ওপর নিজের দিদি সম্বন্ধ এনেছে। কিন্তু ছেলের বাড়ি থেকেও মেয়েকে নিয়ে কিছু বলল না? তারাও মেজদির ওপর ভরসা করে বসে আছে?

ঠিক হল পরমা বাড়ি যাবে। সেখানে মন্দিরে গিয়ে বিয়ে। কেনাকাটা সব কলকাতা থেকেই করল সুতপাবউদি আর অনিন্দ্যদা। ছেলের হাতের আংটি, পরমার বেনারসি, হাতের চুড়ি, কানের দুল, এমনকী গলার হার অবধি। সে থামানোর চেষ্টা করেছিল। কত টাকা খরচ করে চলেছে এরা তার জন্য! কেন এমন করছে?

মেজদি বলল, ‘সে ওদের আছে তাই দিচ্ছে।’

দাদার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে ছিল না। তবু পরমা তাকে ফোনে বলল, ‘তুমি এদের বারণ করো। আমার লজ্জা করছে।’

বাবলা বলল, ‘তোর ওই দাদার সাথে তো কথা হয়েছে আমার। ওরা দেবে বলছে, আমি বারণ করতে যাব কেন?’

শুধু বড়দি শুনে বলেছিল, ‘ওরা তোকে ভালোবাসে রে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

কাজের ফাঁকে ফাঁকে পরমার মনে উথালপাথাল হত ভাবনা। কেন এরা এত ভালোবাসে! কোথায় থাকে ভালোবাসা? রক্তের ভেতরে বয়ে যায়? সে তো কেউ নয় এদের। কাজের মেয়ের বিয়েতে কোনও কোনও বাড়ি থেকে দেয় হয়তো। কিন্তু এখানে তো শুধু তা নয়।

বিয়ের একদিন আগে ওরা হইহই করে পরমাকে নিয়ে গেল তার গ্র‌ামের বাড়ি। গাড়িতে চাপিয়ে। যাওয়ার আগে সুতপাবউদি পরমার আঙুলে একটা আংটি পরিয়ে দিল। ‘এটা আমার মায়ের আংটি, আমায় দিয়েছিল, আমি তোকে দিলাম। মায়ের আর্শীবাদ ভেবে সবসময় পরে থাকিস।’

পরমা ঠিক করেছিল কাঁদবে না। কিছুতেই কাঁদবে না এদের জন্য। ফ্ল্যাটের তিনটে ঘরের মধ্যে যেটায় সে থাকত সেখানে ঢুকে খাটের ওপর শুধু চুপ করে বসে ছিল অনেকক্ষণ। তবুও তার চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি শেষপর্যন্ত।

বাড়ি যাওয়ার পথে সব ওদের দেখাতে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল পরমা। বিরাট প্র‌ান্তর, তালের বন, তুফান গাজির মেলার মাঠ, বিলের ধারে বেড়ার ছোট ছোট টুঙ্গিপালা। ভোলেনি সে, কিছুই ভোলেনি এতদিনেও।

ঘরে ঢুকে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। কতদিন পর আবার বাবাকে ফিরে পেল। বাবার গায়ে এখনও ধানখেতের সেই গন্ধ লেগে আছে। দুজনে কিছুক্ষণ কেঁদে নিচ্ছিল প্র‌াণভরে। মন হালকা হওয়ার পর কথা বলতে পারল।

অনিন্দ্যদা বাড়ির সকলের জন্যে জামাকাপড় এনেছিল। তাও আটকাতে পারেনি পরমা। সেসব দেওয়াথোওয়া হল।

বিয়েতে আত্মীয় বলতে শুধু বড়দি এসেছে বর আর দুই ছেলে নিয়ে। মেজদি বরযাত্রীদের সঙ্গে মন্দিরেই পৌঁছে যাবে। পরমার সব বন্ধুই বিয়ে হয়ে অন্য অন্য গ্র‌ামে। তাদের নেমন্তন্নই বা করবে কে? তবে আশেপাশের জ্ঞাতি বউদি-কাকিমা-জেঠিমারা রয়েছে। তারা অবাক হয়ে কলকাতার লোকজনদের দেখছিল। আর এতদিন যে ছোট্ট মেয়েটা পরমার গায়ে গায়ে থাকত সেই সঞ্চারী হাঁ করে দেখছিল গ্র‌ামের লোকদের। তবে এখনও সে তার পিপির কাছছাড়া হয়নি। পরমা যেখানে যাচ্ছে, সেও চলেছে তার পিছু পিছু।

পরমার না হল আইবুড়ো ভাত, না হল গায়েহলুদ। নিজের দাদা-বউদি ওইটুকুও করল না তার জন্য। দাদা চাষের সময় চাষ করে। অন্যসময় কখনও ইটভাটায়, কখনও আবার মজুরদের ঠিকাদার হয়ে বাইরে বাইরে যায়। বলল, ‘লেবারদের পেমেন্টই দিতে পারিনি। কোথা থেকে কী করব? বোনের বিয়ে দিচ্ছি শুনে তারাই না চড়াও হয় বাড়িতে!’

বিয়ের দিন সকালে সুতপাবউদি পরমাকে আলতা পরিয়ে, গয়নাগাঁটি দিয়ে সাজিয়ে, শাড়ি পরিয়ে নিয়ে গেল মন্দিরে। গাড়িতে তুলে নিয়েছিল বাবাকে। পিছনের তিনটে ভ্যানে দাদা-বউদির সঙ্গে বাড়ির লোকেরা গেল অতিথির মতো। আর পাড়ার কয়েকজন। কনককাকি আর মিতাদির কথা মনে পড়ছিল পরমার। গ্র‌ামে থাকে বলে কাকির বড়মেয়ে আসতে পেরেছে। কনককাকি আর ছোটমেয়ে কলকাতায়। মিতাদিও তো জানতেই পারল না।

গ্র‌াম ছাড়িয়ে বাসরাস্তার একধারে অশ্বত্থ গাছের নীচে নীলকুমারীর মন্দির। বহু পুরনো। নীল রঙের মূর্তি, চার হাত। সবাই বলে খুব নাকি জাগ্র‌ত। পাশেই বাঁধানো বড় পুকুর। কত মেয়ের যে এখানে বিয়ে হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে তার কোনও হিসেব নেই।

খুব অদ্ভুত লাগছিল পরমার। একটু পরেই এমন একজনের সঙ্গে তার দেখা হবে যাকে দেখতে হবে বাকি জীবনভর। অথচ এখন তাকে সে প্র‌ায় চেনেই না।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১২

কিছুক্ষণের মধ্যেই বরপক্ষ চলে এল। আড়চোখে একবার দেবাশিসের দিকে তাকাল পরমা। হ্যাঁ, মেজদির শ্বশুবাড়িতে আগে দেখেছিল একে। মাথায় চুল একটু কম। শক্তপোক্ত চেহারা। মেজদি এসে দেখা করে গেল পরমার কলকাতার দাদা-বউদির সঙ্গে। তারপর তাদের ডেকে নিয়ে গেল দেবাশিসের কাছে। তার বাড়ির লোকেরাও সবাই এসেছে। সঞ্চারী যদিও কারও সঙ্গে কথা বলছিল না। পরমাপিপি তাকে ছেড়ে অন্য কোথায় চলে যাবে তাই তার মনখারাপ।

ওঁ মম ব্রতে হৃদয়ং দধাতু, মম চিত্তমনু চিত্তং তেহস্তু

মম বাচমেকমনা জুষস্ব বৃহস্পতিস্ত্বা নিযুনক্তু মহ্যং

মন্ত্রের মানে বোঝেনি পরমা। কেই-বা বোঝে। শুধু আউড়ে যায়। তাড়াহুড়ো করেই হয়ে গেল বিয়ে। আরও অনেক বর-কনে লাইনে রয়েছে যে। বিয়ের তারিখে অনেক বিয়ে থাকে মন্দিরে। কোনও একজনের জন্যে বেশি খরচ করার মতো সময় নেই ঠাকুরমশাইয়ের।

বিয়ে চুকে যেতে যতক্ষণ। বরপক্ষ গাড়ি ভাড়া করে এসেছিল। তারা যাবে এবার। সুতপাবউদি এগিয়ে এসে দেবাশিসকে বলেছিল, ‘আমাদের মেয়েটাকে যত্নে রেখো কিন্তু।’ বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল পরমা। গায়ে চাপানো নতুন পাঞ্জাবি একটা কোণ তুলে ধরে চোখ মুছছে বারবার। আর কেঁদে চলেছে সঞ্চারী। তার পরমাপিপির জন্য জল পড়ছে টপটপ করে।

সকলকে রেখে পরমা সেদিন চলে গিয়েছিল সংসারে। আট-ন’বছর ধরে কলকাতায়। এর বাড়ি, তার বাড়ি, অন্যের ঘর গুছিয়েছে, কাজ করে দিয়েছে। আজ তার নিজের ঘর হল। একেবারে নিজের।

তখনও পরমা জানে না কতখানি ভুল ভেবেছিল সে।

ওঁ দ্যৌঃ শান্তিঃ অন্তরীক্ষং শান্তিঃ পৃথিবী শান্তিরাপঃ শান্তি

রোষধয়ঃ শান্তিঃ বনস্পতয়ঃ শান্তিঃ বিশ্বেদেবাঃ শান্তিঃ

ব্রহ্ম শান্তিঃ সর্বং শান্তিঃ

এখানে বিয়ে শেষ। শান্তিজল ছিটিয়ে পড়ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে আম্র‌পল্লব থেকে। সবাই মাথা নামিয়ে নিয়েছে। শান্তিই তো চায় মানুষ। জল, স্থল, অন্তরীক্ষের শান্তি। এই জলের মতোই তা যদি অনায়াসে ঝরে পড়ত জীবনে! সে আর হয় কোথায়! পরমা পায়নি। পল্লবী যেন পায়।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৪

হোমে বাসর জাগার উপায় নেই। পরের দিন বাসি বিয়ের কথাও ওঠে না। পল্লবীর জিনিসপত্র সব গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাকে যেতে হবে এবার। কাছের বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে সে। বড়দের প্র‌ণাম করতে গিয়েও ফুঁপিয়ে উঠল। ‘তোমাদের সঙ্গে অনেক বাজে ব্যবহার করেছি, খারাপ কথা বলেছি, আমাকে মাপ করে দিয়ো। আর্শীবাদ করো যেন সুখে থাকতে পারি।’ রান্নার সবিতামাসিও এসে দাঁড়িয়েছে। সকলেরই ভেজা চোখ। মেয়েরা তাকে নিয়ে গিয়ে তুলল গাড়িতে। গেটে রাজীবের ডিউটির সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। তবু সে থেকে গিয়েছিল এই বিয়ের জন্যই। সে-ই গিয়ে হাট করে খুলে দিল দরজা।

উড়ে গেল পল্লবী নামের পাখিটা।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫

Comments are closed.