বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১৫

বড়বাড়ির তিনতলায় ওষুধ দিতে গিয়ে পরমা দেখল মাঝখানের বাঙ্কে চোখ বুজে শুয়ে আছে কল্পনা থাপা। সে তার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল।

‘কী হয়েছে? শুয়ে কেন?’

কল্পনা চোখ খুলল। ‘বুখার লাগছে আন্টি, তাই।’

কপালে হাত ছোঁয়াল পরমা। হ্যাঁ, গা গরম রয়েছে খানিকটা। সে বলল, ‘ওষুধটা খেয়ে নাও। শুয়েই থাকো। আমি জ্বরের ট্যাবলেট এনে দিচ্ছি একটু পরে। সঙ্গীতা আর মিতালি কোথায়? ওদের ওষুধটাও তো দিতে হবে।’

‘ওরা দু’তল্লায় গেছে। গল্প করতে।’

বোতল থেকে জল গলায় ঢেলে ওষুধ খেয়ে নিল কল্পনা। তারপর বলল, ‘তুমি এখানে একটু বসবে আন্টি?’

এই মেয়েগুলোর মাঝে মাঝে জ্বর হয়। পেটখারাপ চলে কয়েকদিন ধরে। তার যে কোনও ওষুধ আবার দেওয়া যায় না এদের। দরকারি ওষুধ ডাক্তার দিয়ে রেখেছেন। তাই দিতে হবে। পরমা বসে পড়ল কল্পনার বিছানায়।

কল্পনা বলল, ‘আগে যে আন্টি ওষুধ দিত সে পাশে ভি আসত না। আমরা যেতাম আনতে। আলমারির দরওয়াজা খুলে বলত নিয়ে নে।’

কথাটা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় পরমা বলল, ‘বাদ দাও, ও কিছু জানত না।’

‘কেউ কিছু জানে না আন্টি। আমার ঘরের লোগ ভি জানে না কি আমার কী হল।’

কল্পনার সঙ্গে কথা বললে তার কষ্ট উসকে দেওয়া হবে। কিন্তু বলা আর শোনাও যে দু’রকমের ওষুধ তা এতদিনে বুঝে গিয়েছে পরমা। তাই সে জানতে চাইল, ‘কে কে আছে তোমার বাড়িতে?’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

‘মা-বাবা-ভাই-বহিন।’ বলতে বলতে চুপ করে গেল কল্পনা। আনমনা চোখে জানলার বাইরে তাকিয়ে। এ ঘরে অন্য মেয়েদের কয়েকজন কথা বলে চলেছে। কেউ চুপ করে শুয়ে। কেউ আবার বারান্দায় গ্রি‌ল ধরে দাঁড়িয়ে। কল্পনা থাপা যেন সব কিছু থেকে দূরে। বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি জানি না ওরা বেঁচে আছে না কি মরে গেছে।’

‘সে কী!’ চমকে উঠল পরমা। ‘মরে যাবে কেন সবাই!’

‘যেতে পারে। নেপালে ভুকম্প হুয়া থা না! কত লোগ মরে গেল। খবর পেলাম সিন্ধুপালচক একদম সাফ হয়ে গেছে। ওখানেই ঘর ছিল আমাদের।’

হ্যাঁ, সেই ভুমিকম্পের কথা তো পরমাও জানে। অনেক আগে শুনেছিল। তবে এইবার সে বুঝতে পারল কল্পনার ভেতরে কেন পুরনো কথা উঠে এসেছে আজ। কাল সন্ধেবেলায় ভূমিকম্প হয়েছিল। টের পেয়েছিল সবাই। খানিকটা হইচই, চেঁচামেচিও হয় তাই নিয়ে। কিছু মেয়ে বলছিল তালা খুলে দিতে। বাইরে চলে যেতে চায় তারা। খোলা যায়নি যদিও। এরকম কিছু হলে হোম কোন নিয়ম মানবে তা বলে রাখা হয়নি যে। মাটির কাঁপুনি অবশ্য খানিক পরেই থেমে যায়। কিন্তু বাইরের সেই ভূমিকম্প যে কল্পনার মনের ভেতরটা নড়িয়ে দিয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে এখন। তবু সে বলল, ‘এরকম ভাবতে নেই কল্পনা।’

‘ভাবতে আচ্ছা লাগে আন্টি। আমি নেই, ওরা ভি নেই।’

‘নেই কে বলল। এই যে আছ।’

‘না না।’ মাথা দোলাল কল্পনা। ‘আমি আর ফিরব বলো? পাহাড়ের উপর ওই ঘর— আর দেখব? জান আন্টি, আমাদের ঘরের পাশে একটা সিন্দুর গাছ ছিল। মনে আছে।’

‘সিঁদুর!’ অবাক হল পরমা। ‘মানে যে সিদুঁর মাথায় পরে?’

‘হ্যাঁ, এই যে তুমি পরেছ। সিন্দুর কো রুখ দেখনু বোয়কো ছা?’ বলেই হেসে উঠল কল্পনা। ‘তুমি সিন্দুর গাছ দ্যাখনি? বড় বড় পাতা, লাল ফল।’ দু’হাতের আঙুল জোড়া দিয়ে প্র‌দীপের মতো দেখাল সে। ‘শুখা ফল ভাঙলে সিন্দুর মেলে।’

ওই হাসিটুকুর পরেই আবার ছায়া পড়ে আসছিল কল্পনার মুখে। পরমা বলল, ‘এরকম মনখারাপ করতে নেই।’

কল্পনার গলা নেমে এল। ‘থোড়া জমিন ছিল আমাদের। ওখানে যা সবজি হত তাই বাজারে বেচত বাবা। কিন্তু ইতনা সারা পেট। আমার এক মওসি ছিল। গাঁওওয়ালি মওসি। সে বলল, কল্পনাকে দাও, কাঠমাণ্ডুতে গারমেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ আছে, নিয়ে যাচ্ছি। টাকা পাবে। সেই মওসির সাথে গেলাম আমি। মওসি আমাকে দিল একটা লোকের হাতে। বলল, ফ্যাক্টরির লোক, ওর সাথে যা। ফিরে গিয়ে মওসি ঘরে কী বলেছিল জানি না। ভূকম্প হলেও সে মনে হয় জিন্দা আছে। আরও কত মেয়ের সত্যানাশ করবে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

খানিক চুপ করে থেকে কল্পনা বলল, ‘আগে আমি কভি গাঁও ছেড়ে যাইনি। কাঠমাণ্ডু কোথায় জানিই না। সেই লোক আমায় বর্ডারে নিয়ে চলে এল। বলেছিল, তোর বাতচিত এখানে কেউ বুঝবে না। বেশি মুখ খুলবি না। আমি যা বলব তাই করবি। ফির সে আমাকে বর্ডারের এপার ইন্ডিয়ায় একটা বাড়িতে নিয়ে রাখল। ওখানে আরও তিনটে মেয়ে ছিল। বলল সবাই নাকি ফ্যাক্টরিতে কাজ করবে। ফির আমাদের চালান করে দিল আগ্র‌ায়। সেই কোঠাবাড়ি দেখে আমি বুঝতে পারলাম, লেকিন আর কিছু করার নেই। পহেলা দিন যে লোক ঘরে এসেছিল তার উমর চালিশ পার। আমার তখন ষোলা সাল।’

পরমা হাত চেপে ধরল কল্পনার। সেও নিজের হাত রাখল পরমার হাতের ওপর। বলে যাচ্ছিল, ‘ও লোক যাওয়ার পর আরও পাঁচ আদমি এসেছিল। এক কে বাদ এক। খাট থেকে নেমে দাঁড়াতে ভি পারিনি। শুধু খুন গিরেছিল।’

পরমা বলল, ‘কল্পনা, এবার তুমি চুপ করো। ওসব কথা মনে কোরো না।’

কল্পনা তাকাল তার দিকে। ‘মনে এসে যায় আন্টি। জান, তারপরেও আমি না বলেছিলাম, তাই ওই কোঠির মালকিন আমায় রড দিয়ে পিটেছে, চামচ গরম করে গায়ে চেপে দিয়েছে। লেকিন সব পিছন দিকে। সামনে লাগালে শরীর বদসুরত হয়ে যাবে না! দু’বচ্ছর আমায় আগ্র‌ায় রেখেছিল। ফির ও আমায় বেচে দিল। সোনাগাছিতে এসে গেলাম। জান আন্টি, ওসব মহল্লায় কী বলে! নেপালি মেয়েরা এড্‌স বিমারি সারাতে পারে। তাই তাদের সাথে শোনেসে—’

শুকনো ঠোঁটে যেন হেসে উঠল কল্পনা। ‘ওখানে আরও চার বচ্ছর। তারপর আমারই এইচ আই ভি হয়ে গেল। আমি জাগা পেলাম এই হোমে। এখানে দু’বচ্ছর হল। কত দিন বাঁচতে হবে! যত জলদি মরে যাই তত ভাল। এখানে জোর ভূকম্প হতে পারে না আন্টি?’

কল্পনার হাত ছাড়িয়ে নিতে পারছিল না পরমা। তবু তাকে উঠে দাঁড়াতে হল। আর শুনতে পারছে না সে। বলল, ‘তুমি শুয়ে থাকো কল্পনা। আমায় যেতে হবে। ওদের ওষুধ দিতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

শুয়েই পড়ল কল্পনা। ‘হ্যাঁ আন্টি, তুমি যাও। ওদের ভি তো বাঁচতে হবে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

দোতলায় এসে সঙ্গীতা আর মিতালিকে ওষুধ দিয়ে দিল পরমা। কল্পনার বিষণ্ন মুখ তখনও ছেড়ে যায়নি তাকে। নেমে আসতেই দেখল নুসরতের হাত ধরে অর্পিতা বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে। সে জিজ্ঞেস করল, ‘ওকে নিয়ে কোথাও যাচ্ছ অর্পিতাদি?’

‘হ্যাঁ, ওর মা এসেছে। তাই নিয়ে যাচ্ছি। তোর জন্যে দাঁড়াতে হল। এ বাড়ির গেটে তালা দিয়ে দে।’

কথাটা শেষ হতে না হতেই পিছনে হুড়মুড় করে গেট ঠেলে বেরিয়ে এল রাখি। চেঁচিয়ে উঠেছে সে, ‘আমিও যাব ওর সাথে।’

অর্পিতা চোখের ইশারায় পরমাকে বলল, ‘ওকে আটকা।’

নিচু গলায় বললেও কথাটা রাখির কানে পৌঁছে গিয়েছে। সে আরও এগিয়ে এসে চোখ বড় বড় করে বলল, ‘না, আটকাবে না। আমি যাবই। ওকে কেন নিয়ে যাচ্ছ?’

হেসে ফেলল অর্পিতা। ‘এ তো মুশকিল হল দেখছি। আচ্ছা, তুমিও চলো, কিন্তু আগেই বলে রাখছি, গেটের কাছে শুধু নুসরত যাবে। তোমায় দূরে থাকতে হবে।’

তালা লাগিয়ে দিয়েছে পরমা। রাখি তার কড়ে আঙুলটা ধরে নিল। ‘আমি এই আন্টির সাথে যাব।’

‘ভাল, তাই এসো।’ অর্পিতা নুসরতকে নিয়ে মেন গেটের দিকে যাচ্ছিল। রাখির হাত চেপে পরমা ইচ্ছে করেই ছোট ছোট পা ফেলছে। নুসরতের মা যে আছে তা জানে কিন্তু সে যে মেয়েকে দেখতে এখানে আসে তা জানা ছিল না। এতদিনে কখনও দেখেনি।

অর্পিতা গেটের কাছাকাছি পৌঁছে নুসরতের হাত ছেড়ে দিতেই সে দৌড়ে চলে গেল। তাকে দেখে হাঁটু মাটিতেই রেখে যে বসে পড়েছে তার মাথায় গোলাপি ওড়না চাপানো। তিরিশ-বত্রিশ হবে। রোগাটে গড়ন। দু’দিকের চোয়ালের হাড় কিছুটা উঁচু। সে জড়িয়ে ধরে আদর করছে নুসরতকে। গালে চুমু দিচ্ছে। হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মাথায়।

অর্পিতা ফিরে এসে পরমার পাশে দাঁড়াল। ‘সাত মাস আগে একবার এসেছিল রুবিনা। তারপর এই আজ।’

‘কোথায় থাকে নুসরতের মা?’

‘যেখানে থাকার। সেখানে মেয়েকে রাখবে না বলে এখানে দিয়ে গেছে। আর যাই হোক, খাওয়াপরা পাচ্ছে, লেখাপড়াটা শিখছে। ওখানে থাকলে তো একটু বড় হতে না হতেই ওর দশা হতে পারে। লাইনের মেয়ের মার্কা পড়ে যাবে।’

‘শুধু মা-ই আসে দেখা করতে?’

‘আবার কী! বাবাকে কোথায় পাবে! মেয়েরা দশ মাস ধরে বয়ে বেড়ায় তো। তাদের ধরে ফেলা খুব সোজা। ছেলেরা উধাও হয়ে গেলেও কিছু করা যাবে না। আর ওদের ওখানে কে যে কার—।’ কথাটায় থেমে গেল অর্পিতা। তারপর আবার বলল, ‘হয়তো রুবিনা জানে কিন্তু বলার উপায় নেই।’

এই সময় নুসরত মুখ ঘুরিয়ে তাকাল রাখির দিকে। হাত নেড়ে চেঁচিয়ে ডাকল। ‘এই, তুই আয়। আয় না এখানে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

রাখি মুখ তুলে পরমার দিকে দেখল। আলগা হয়ে গেল পরমার হাত। এক পা দু’পা করে রাখি এগিয়ে যাচ্ছে ওদের দু’জনের দিকে। একেবারে কাছে যেতেই নুসরতের মা তাকেও জড়িয়ে ধরল। তার গালেও সে চুমু দিচ্ছিল একটু আগের মতোই।

অর্পিতা বলল, ‘এর আগে যতবার নুসরতকে দেখতে ওর মা এসেছে, বায়না করেছে রাখি। আমি ছাড়তে পারিনি। দেখা করার টাইম তো দশটা থেকে আড়াইটে পর্যন্ত। তখন অফিসের সবাই থাকে। বেচাল হলেই নিয়ম দেখাবে। আজ তাড়াতাড়ি এসে পড়েছে রুবিনা। তাছাড়া তুই আছিস। তাই রাখিকে ছাড়তে পারলাম। অন্যের মায়ের আদরও যদি একটু পায়, পাক।’

পরমা অর্পিতার কথা থেকে সরে ওদের দিকে যাচ্ছিল। আরও কাছ থেকে দেখে সে বুঝতে চায় কত কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে রুবিনা। গিয়ে শুনতে পেল নুসরত বলছে, ‘তুমি যাবে কেন মা? থাকো না এখানে আমাদের সাথে। আন্টিরা খুব ভালো। কিছু বলবে না। অনেক জায়গা আছে। আমি আর রাখি তোমার কাছে শোব।’

রুবিনার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামছে। নুসরতকে আবার জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তো থাকতে পারব না রে মা।’

‘তাহলে আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চলো। আমাকে, আর ওকেও।’ রাখিকে দেখাল নুসরত। ‘আমরা এখানে থাকব না।’

নুসরতের মাথায় হাত রাখল রুবিনা। ‘তা কি হয়। আমার সোনা মা তো তার মায়ের কষ্ট বোঝে, সে এখানেই থাকবে। আমার মা সব বোঝে, তাই না?’ বলতে বলতে সে উঠে দাঁড়াতেই পরমা নুসরত আর রাখির হাত ধরে ফেলল।

‘ভালো হয়ে থাকবে, আন্টিদের কথা শুনবে।’ এরপর শুধু এইটুকু বলেই রুবিনা ছোট গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। নুসরত কাঁদছে। পাশে রাখির চোখে যদিও জল নেই। সে কেমন ভ্যাবলা হয়ে দেখছে সব।

অর্পিতা তার জায়গা থেকে নড়েনি। দু’জনকে দু’হাতে ধরে তার কাছে পৌঁছে দিল পরমা। সে ওদের নিয়ে বড়বাড়িতে ঢুকে যাচ্ছিল। তবে সেখান থেকে সরে আসতে গিয়ে পরমা থমকে গেল। গান শোনা যাচ্ছে না? হ্যাঁ, কল্পনা থাপা গাইছে। এখন সে গলা ছেড়েই গায়। বাইরে থেকেই শোনা যাচ্ছে সেই গানটা। তার সঙ্গে মিলিয়ে কেউ যেন তারের কোনও বাজনার ছড় টেনে চলেছে। বাড়িটার শরীর বেয়ে নেমে আসছে পাহাড়িয়া সুর আর কথা।

রেশম ফিরিরি… রেশম ফিরিরি…

উড়িনা যাউ কি ডাঁড়ামা বাঞ্জাং রেশম ফিরিরি…

রেশমি রুমাল হয়ে কে যে কোথায় উড়ে যেতে চায়! পারে না। শুধু গান গেয়ে যায়।

 

 

সকাল থেকে সানাই বাজছে। হোমের উঁচু পাঁচিল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই সুর। আজ পল্লবীর বিয়ে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

আগের দিন ডেকরেটরের লোক এসে ছোটবাড়ির ছাদে প্যান্ডেল বেঁধে গিয়েছে। বরযাত্রীরা বসবে। কাপড়ে মোড়া গেট দাঁড় করানো হয়েছে মেন গেটের বাইরে। ওপরে থার্মোকলের প্র‌জাপতি। ভেতরে তোড়জোড় চলছে জোরকদমে। অন্য দিন পাম্প চালিয়ে, শংকরের সঙ্গে বাজার এনে দিয়ে খোকন চলে যায়। আজ তাকে রেখে দেওয়া হয়েছে। দু’জনে মণ্ডপ সাজাচ্ছে বাঁধানো বেদির ওপর। বিয়ে ওখানেই হবে। ওদের সঙ্গে অবশ্য আরও দু’জন রয়েছে। শংকরের দুই মেয়ে। দোয়েল আর কোয়েল। তারা ফুল বসাচ্ছে মণ্ডপের কাপড়ে। প্লাস্টিকের নকল ফুল নয়। আসল ফুল এনে দিয়েছে শংকর।

দু’বাড়ির পাঁচজন মনিটর মেয়েই কাজে হাত লাগিয়েছে। বেদির ওপর বসে হলুদ বাটছে কবিতা আর জুলেখা। মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে আলপনা দিচ্ছে দোলা। অন্য দু’জন সোনালি আর আয়েষা বরণডালা সাজানোর জন্যে এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছিল। জুলেখা আর আয়েষাকেও যে ডাকা হয়েছে তা নিয়ে কেউ কোনও কথা তোলেনি। এখানে ওসব নিয়ে কেউ ভাবে না।

ডালা সাজাচ্ছে শংকরের বউ কাকলী। জল সইতে লাগবে। পরমার মনে হল আজ কাকলীদি না এসে পারেনি। সর্বাণী মিত্র তাকে আলাদা করে বলে এসেছিলেন যাতে মেয়েদের নিয়ে সে আসে। স্ত্রীআচারের কাজগুলোয় হাত লাগাতে হবে। হোমের কোনও কাজেই থাকে না কাকলী। তবে এটাতে এসেছে। দুই মেয়েকেও ছেড়েছে।

সানাই শুনলে কী যেন হয় পরমার। একইসঙ্গে আনন্দ আর দুঃখ মোচড় দিয়ে ওঠে ভেতরে। তবে আজ আরও মনখারাপ মিশে গিয়েছে তার সঙ্গে। বাকি মেয়েরা যে আটকে রয়েছে তালার ওপাশে। আজ সারাদিনে তাদের বেরোনো নেই। হোম-মাদারদের কাছে তারা বায়না করেছিল। কিন্তু সর্বাণী মিত্রর কড়া নির্দেশ— ওদের বাইরে রাখা যাবে না। রোজকার মতোই গ্রি‌লে মাথা ঠেকিয়ে তাকিয়ে রয়েছে মেয়েগুলো। চোখ দেখলে মনে হবে আজ যেন সত্যিই শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাদের। রাখি আর নুসরত শুধু বাইরে। দুই বন্ধু হাত ধরাধরি করে তিড়িংবিড়িং লাফাচ্ছে। মণিও বাইরে। তবে মাথাখারাপ মেয়েকে কেউ হিসেবের মধ্যে আনে না।

জল সইতে নিয়ে যাওয়া হল পল্লবীকে। পুকুরের মাঝখানে দুটো রাজহাঁস আগে থেকেই জল ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা খেলছে। উলটো পাড়ে মণি দাঁড়িয়ে। সে আজ সব কিছুতেই হাসছে। শব্দ করে করে হাসছে। মণির এই হাসির কারণ কেউ জানে না। বিয়ে নিয়ে তার এত মজা কীসের?

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১২

পা ডোবানো জলে উর্মিলা দাঁড়িয়ে। কিছু ফুল ছড়িয়ে কী যেন পুজো সারল সে। তারপর একটা দা দিয়ে জলেই গুণ চিহ্ন কেটে কলসীর মুখে বসানো আমের পল্লব সামলে জল তুলে নিল। হোম-মাদারদের মধ্যে উর্মিলা, প্র‌ীতি আর পরমা এয়ো বলে তাদের গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন সর্বাণী। তাও আবার অফিসে ডেকে, বিনয়ের সঙ্গে। সিঁড়ির এক ধাপ ওপরে কাকলী আর পরমা। পল্লবীকে নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটা মেয়ে। হাসিতে কথায় আজ তাদের মুখ খুলে গিয়েছে। পল্লবীর গায়ে টোকা মেরে কবিতা বলল, ‘তোর বরের যদি একটা ভাই থাকত না রে, তাকে বিয়ে করে তোর জা হয়ে যেতাম।’

আয়েষা বলল, ‘এখান থেকে বেরিয়ে হয়তো আমাদেরকেই ভুলে যাবে। বরের আদর ছেড়ে এখানকার কথা কি আর মনে পড়বে? পাখি খাঁচা ছেড়ে বেরোলে সে আর খাঁচাকে মনে রাখে না।’

দোলা পল্লবীর মুখ ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে। ‘এত মেয়ের মধ্যে তোকেই কেন পছন্দ করল রে? কী জাদু করেছিস? আমাদেরও শিখিয়ে দে না।’

লজ্জায় পল্লবীর মাথা বুকের কাছে গিয়ে ঠেকেছে। রঙটা চাপা। তবে আজ তাকে দেখতে লাগছে ভারি সুন্দর। পরনে লালপেড়ে হলুদ শাড়ি। হাতে শাঁখা, পলা। সকালে মেয়েরাই পরিয়ে দিয়েছে তাকে। সঙ্গে কয়েকগাছি কাচের চুড়িও। গলায় সোনালি হার। সর্বাণী মিত্র দিয়েছেন। তবে কানের দুলদুটো সোনার। পল্লবীর নিজেরই। এতদিন হোমের লকারে রাখা ছিল। এমনকী এই বিয়ের খরচের বেশিটাই তার টাকা থেকেই হচ্ছে। পরমার মনে হল, মুক্তির আনন্দ রয়েছে পল্লবীর মনে। তাই তার রূপ যেন খুলেছে আজ।

বাটা হলুদ নিয়ে এসে পড়ল জুলেখা। বরের গায়ে লাগানো হলুদ এখানে আসবে না। পাঠানোর তো কেউ নেই। তিনজন এয়ো মিলে হলুদ মাখিয়ে দিল। উলু পড়ল। শাঁখ বাজল। তারপর পল্লবীকে তারা ছেড়ে দিল মেয়েদের হাতে। তারা অপেক্ষা করছিল হলুদ খেলার।

অর্পিতা আর সঞ্চিতা দূরে দাঁড়িয়ে। পরমা খেয়াল করল এসব দেখতে দেখতে জ্বলজ্বল করছে সঞ্চিতার চোখ। সে ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই অর্পিতা বলল, ‘সুন্দরবনের কাছাকাছি কোন একটা গ্র‌ামে পল্লবীর বাড়ি ছিল, জানিস। ওখানেরই একটা ছেলে বিয়ের নাম করে কলকাতায় নিয়ে এসে বিক্রি করে দিয়েছিল ওকে। আজ সত্যিকারের বিয়ে হচ্ছে মেয়েটার।’

গায়েহলুদ শেষ হলে সবাই স্নান সেরে নিল। তারপর খাওয়াদাওয়া। পল্লবীর জন্য আজ দই–চিঁড়ে।

আগের দিন ঘটা করে তার আইবুড়ো ভাত হয়েছে। মেয়েদের রান্না সেরে আলাদা কয়েকটা পদ রেঁধে দিয়েছিল সবিতামাসি। তিন রকমের ভাজা, ডাল, চাটনি। সঙ্গে অর্পিতার এনে দেওয়া মাছের মুড়োর ঝোল।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১৩

অর্পিতা কখনও এরকম কাজ করেনি। কাল সে নিজের টাকায় বড় এক রুইমাছের মুড়ো এনেছিল। তারপর সবিতাকে দিয়ে ভাল করে রান্না করিয়েছে।

শুক্লা হালদার বলেছিলেন, ‘হঠাৎ কী হল তোমার?’

অর্পিতা বলল, ‘কার কাছে যেন শুনেছিলাম আইবুড়ো ভাতে নাকি বড় মাছের মুড়ো দিতে হয়।’ বলতে বলতে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল সে। পরমা দেখছিল তাকে। কে জানে কোথায় অর্পিতাদি লুকিয়ে রাখে তার মন! কেউ যে ছুঁয়ে দেবে তার আর পথ নেই।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪

Comments are closed.