রবিবার, অক্টোবর ২০

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪

 

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১৪

সঞ্চিতা দোতলায় থাকে। সে ঢুকে যেতে পরমা উঠে এল তিনতলায়। জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। এখান থেকে পুকুর, নীচের মাঠমতো জায়গাটা, তার মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া বাঁধাই ফালি রাস্তাটা দেখা যায়। অনেকক্ষণ ধরে একটা কুবো পাখি ডাকছে কোথাও। সেই ডাক এই দুপুরকে শান্ত করে রেখেছে। কী নির্জন। যেন কোথাও কোনও গোলমাল নেই। কিছু যেন ঘটছে না পৃথিবীতে। পরমার চোখ পাখিটাকে খুঁজছিল। পেল না।

প্র‌ীতির বিছানায় গিয়ে বসল সে। মেয়েদের দেখছিল। যারা স্কুলে যায় সেরকম কয়েকজন তাদের বইপত্র ওলটাচ্ছে। ওদের তো টিউশন যাওয়ার উপায় নেই। যতটুকু পারে নিজেরাই পড়ে। স্কুল থেকে ফিরে কখনও সেখানকার কথা তোলে না। ওদের কারও কি কোনও বন্ধু হয়নি সেখানে? অন্য মেয়েরা কি কথা বলে না ওদের সঙ্গে? এখনও জানে না পরমা।

সে আর এক দিকে তাকাল। কেউ নখ কাটছে, কেউ রং লাগাচ্ছে নখে। কিছু মেয়ে জানলার পাশে বসে এ ওর মাথার উকুন বেছে দিচ্ছে, চুল আঁচড়াচ্ছে। একজনের বাঙ্কে তিন-চারজন। ফেলে আসা জীবনের গল্প করছে। কার কাছে কত টাকা আছে সে কথাও উঠে আসছে।

পরমা জানে ওরা কোন টাকার কথা বলাবলি করছে। একসময় যা তারা রোজগার করেছিল তা তাদের কাছেই থাকে। তবে হোমে আসার পর সেই টাকা বা কারও সোনার জিনিস অফিসে জমা দিয়ে দিতে হয়। কারও বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা হলে তখন ফিরিয়ে দেওয়া হবে। নতুন মেয়ে এলেই মনিটররা তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে তল্লাশি চালায়। যা বেরোয়, অফিসে সর্বাণী মিত্রর কাছে জমা পড়ে। কিন্তু অনেক মেয়ে আছে যারা সব টাকা জমা করে না। এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখে যেখানে কেউ হাত দেওয়ার কথা ভাবতেও পারবে না।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ১                       পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ২

যখন কোনও নতুন মেয়ে হোমে আসে তখন একটা ফর্মে তার নাম-ঠিকানা লিখে নেওয়া হয়। পরে পাসপোর্ট ছবি তুলে লাগানো হয় ফর্মের ওপর। অনেক মেয়ে এত ছোট থেকে ঘর ছাড়া যে ঠিকানাই জানে না। বাপ-মায়ের দেওয়া নাম অবধি ভুলে গিয়েছে। যেখানে থাকত তারাই নতুন নাম দিয়ে দিয়েছে। ছোটবাড়িতে একটা মেয়ে আছে যে এখনও নিজের পাঁচটা নাম চালাতে চায়। যখন যেটা ইচ্ছে। কোনটা আসল বোঝাই যায় না। খাতায়-কলমে তার নাম যদিও রঞ্জু। বেশিরভাগই নিজেদের আগের কথা বলতে চায় না। কেউ শান্ত, নীরব হয়ে যায়। কেউ কেউ রেগে খারাপ ব্যবহার করে। বদ্ধ থাকতে থাকতে বোধহয় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তারা। যেমন এই বড়বাড়িরই উত্তরা— সে সাপ ভাবত নিজেকে। হাতদুটোকে ফণার মতো মাথার ওপর তুলে ধরে ঘুরে বেড়াত। সুরভী বলে আর একটা মেয়ের বুকে কামড় বসিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছিল। উত্তরা আর সুরভী অবশ্য এখন খুব বন্ধু। সবসময় হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়ায়।

‘আন্টি আন্টি, চাবি দাও। ও বাড়ির জুলেখাদি এসেছে।’

মনিটর সোনালির গলা পেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠল পরমা। ‘কী হয়েছে রে? কারও কিছু হল না কি?’

সোনালি আবার বলল, ‘জুলেখাদি নীচে ডাকছে তোমায়।’

পরমা গিয়ে দেখল দোতলা থেকে নেমে সঞ্চিতাও দাঁড়িয়ে। ‘কী হয়েছে সঞ্চিতা?’

‘নিতুর অবস্থা বাড়াবাড়ি, ব্যথা উঠেছে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। অর্পিতাদি উর্মিলাদিকে নিয়ে যাবে। তুমি ছোটবাড়িতে যাও, আমি এখানে থাকছি।’

‘তুমিই তো যেতে পারতে ওখানে।’

সঞ্চিতা যেন কুঁকড়ে গেল। ‘না না, ওই মেয়েগুলোর সঙ্গে থাকতে ভয় করে আমার।’

পরমা সঞ্চিতাকে চাবি দিয়ে জুলেখাকে নিয়ে রওনা দিল।

ছোটবাড়ির বাইরের বারান্দায় নিতু ব্যথায় কাতরাচ্ছে। নাইটিটা পা অবধি উঠে গিয়েছে।। পাশে চাদরটা পড়ে। বাকি মেয়েগুলো অবাক হয়ে তাকে দেখছিল। পরমা অর্পিতাকে বলল, ‘তোমরা দুজনে পারবে? অফিসে জানিয়েছ তো? কী বলল? টাকাপয়সারও তো ব্যাপার আছে। আজ তো আবার সর্বাণীদি নেই।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ৩                      পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ৪

সর্বাণী মিত্র কোনও কারণে আসেননি আজ। হয়তো হোমের কাজে বাইরে কোথাও গিয়েছেন। অথবা নিজের। অর্পিতা বলল, ‘শুক্লাদি এসে দেখে গেছেন। আমাদেরই যেতে বললেন। সর্বাণীদিকে ফোনও করে দিয়েছেন। উনি হাসপাতালে পৌঁছে যাবেন বলেছেন। হোমের ব্যাপার বলে হাসপাতালে স্পেশাল ব্যবস্থা আছে। অসুবিধা হবে না। যেতে যেতে আমিও সর্বাণীদির সঙ্গে ফোনে কথা বলে নেব। শংকরদা গাড়ি আনলেই বেরিয়ে যাব আমরা।’

উর্মিলা তৈরি হয়ে এসে পড়েছে। সে গিয়ে নিতুর পাশে বসল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।

অর্পিতার কথার মধ্যেই গাড়ি নিয়ে চলে এল শংকর। বাইরে থেকে হাঁক দিল, ‘দিদি, চলুন এবার।’

শুক্লা, কৃষ্ণা আর ঈশিতা এসে দাঁড়িয়েছেন। ধরাধরি করে বসিয়ে দেওয়া হল নিতুকে। অর্পিতা আর উর্মিলা বসল তার দু’পাশে। গেট ছেড়ে বেরিয়ে গেল গাড়ি।

ছোটবাড়িতে তালা লাগিয়ে দিল পরমা। তবে নিজে বাইরেই রইল। শুধু মেয়েরাই থাক কিছুক্ষণ ওখানে। তারাও চঞ্চল। সবার মুখেই আজ নিতুর কথা। পরমা এখন হাঁটবে একটু। অস্থির লাগছে। নিতুর কী হয় না জানা অবধি শান্ত হবে না মন। নতুন এক অতিথি আসছে পৃথিবীতে। না, পৃথিবী নয়, হোমে বলাই ভালো। কারণ ভদ্র সমাজ তাকে গ্র‌হণ করবে না। হোমের নাম আশ্রয়, এইটুকুই যা সান্ত্বনা। কিন্তু আসছে কে? ছেলে, না কি পোড়াকপাল নিয়ে কোনও মেয়ে?

 

কেমন হয়েছে দেখতে? নিতুর মতো? ভাল আছে সে?

এরকম আরও অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল অর্পিতা আর উর্মিলাকে। নিতুকে যেদিন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিনই সন্ধেবেলায় নর্মাল ডেলিভারি হয় তার। অর্পিতা আর উর্মিলা হোমে ফেরামাত্রই তাদের ঘিরে ধরেছিল পরমা ও সঞ্চিতা। সঙ্গে মেয়েরাও। কী হয়েছে নিতুর? ছেলে না মেয়ে?

অর্পিতা খবরটা জানিয়েছিল। মেয়ে হয়েছে নিতুর। মা-মেয়ে দুজনেই ভাল আছে।

সেই নিতু আজ হোমে ফিরছে বাচ্চা নিয়ে। এ ক’দিন নিতুর মা তার দেখাশোনা করেছে হাসপাতালে। আজ সর্বাণী তাকে নিয়ে আসবেন।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ৫                       পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ৬

মেয়েদের মধ্যে হইচই পড়ে গেছে। তারা বড়বাড়ির নীচে বাচ্চা থাকার ঘরে কাপড়ের দোলনা ঝুলিয়েছে। বাংলাদেশি মেয়েরা ছোট ছোট কয়েকটা কাঁথা সেলাই করে রেখেছে। আগে থেকে যে ওখানে রয়েছে সেই কাজল হাতবদল হয়ে মেয়েদের কোলে কোলে ঘুরছে। কিছু বুঝবে না জেনেও কেউ কেউ তাকে বলছে, ‘তোর একটা বোন আসছে কিন্তু।’ শুধু পরমা কেন, অন্য কেউই তাদের বারণ করতে পারেনি। ব্যাপারটা নিয়ে আনন্দ করা উচিত নাকি মুখ চুন করে থাকা দরকার তা বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। পরমার শুধু মনে হচ্ছিল, আত্মীয়তা চোখে দেখা যাচ্ছে না বলেই যেন সকলে উদ্যোগী হয়ে উঠেছে সেজন্য। রক্তের সম্পর্কের বাইরে এ যেন অন্য কিছু পাওয়া।

দুপুরের দিকে গাড়ি থেকে নামল নিতু। বাচ্চাটা তার মায়ের কোলে।

সর্বাণী চলে গেলেন অফিসে। বাচ্চা আর নিতুকে নিয়ে যাওয়া হল বড়বাড়িতে।

দু’জনকে একরকম ঘিরে ধরল মেয়েরা। তবে ছোঁয়া বারণ। দূর থেকেই দেখল সবাই। কচি আঙুলগুলো মুঠো হয়ে রয়েছে। চোখ বন্ধ করে দোলনায় শুয়ে কয়েকদিনের নরম পাখি।

পরমা খেয়াল করল মা পাখির সাড়াশব্দ নেই কিছুতেই। সে দোলনার একপাশে পা ছড়িয়ে ভুরু কুঁচকে চোখ বন্ধ করে বসে। নিজের কষ্টটাই মুখে ফুটে রয়েছে বেশি। বাচ্চার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। পেটের ভেতরের ভারী জিনিসটা থেকে মুক্তি পেয়েছে নিতু। চোদ্দো-পনেরো বছরের মেয়েটা কি শান্তিটুকুই পেতে চাইছে? বসে থাকতে থাকতে শুয়েই পড়ল সে।

ঘরের ভিড় কমল একসময়। হল্লা শেষ করে চলে গিয়েছে মেয়েরা। দোলনাটার পাশে গিয়ে বসল পরমা। ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে দেখছিল সে। তোর মা আছে, কিন্তু নেই। তুইও আছিস, আবার নেইও।

আয়া অন্য বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বসে। মুখে দুধের বোতল গোঁজা। পরমার ভেতরটা নড়ে উঠল। নিতুর কাছে এ শুধুই এক যন্ত্রণা। তিতকুটে একটা ব্যাপারকে গিলতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর সহজ, স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরে যেতে পারবে মেয়েটা? যে লোকটার জন্যে তার এই হাল সে নিশ্চয়ই বহাল তবিয়তে রয়েছে। ওরা থাকে। থেকে যায়। আঠেরো বছর হয়নি এমন মেয়েদের নাকি রেড লাইট এলাকা থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়। ঈশিতাদির কাছ থেকে শুনেছিল পরমা। জানতে পারেনি তাদের ঘরে যারা যায় সেই লোকগুলো কি ধরা পড়ে কোনওদিন? কেউ কিছু বলে তাদের? সুড়সুড় করে পালিয়ে গিয়ে বাকিদের সঙ্গে মিশে যায় তারা।

ভাবনার দেওয়াল ভেঙে ঘরে ঢুকে এলেন শুক্লাদি। ‘মেয়েরা কি আজ দুপুরের খাবারদাবার পাবে না? এখানে বসে থাকলেই হবে? নাকি বাচ্চা এসেছে সেই আনন্দে হোমের সব কাজ বন্ধ থাকবে!’

উঠে পড়ল পরমা। ‘এই যাচ্ছি আমি’ বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল সে। হোমে থাকতে থাকতে কতকিছুই না দেখে এরা। তাই বোধহয় এখন আর কোনও ঘটনাই মনে দাগ কাটে না শুক্লা হালদারদের।

রোদ পড়ে আসার মুখে মুখে ছোটবাড়ির মেয়েদের বাইরে যেতে দিল পরমা। তারপর রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল। ওখানে একটা ড্রামে ভর্তি করে চা রাখা থাকে। সেই দুপুর থেকে মাথাটা দপদপ করছে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ৭                       পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ৮

এই সময় সামনে থেকে রাখি এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। ‘জান আন্টি, আরও একটা বোন এসেছে আমাদের ঘরে। তুমি দেখেছ?’

এই মেয়েটার সামনে সব কিছু জল হয়ে যায় পরমার। ‘আমি তো দেখেছি, তুমি কখন দেখলে?’

‘স্কুল থেকে এসেই দেখলাম তো। এখন আমার দুটো বোন আন্টি।’

‘হুঁ। আদর করেছ তাকে?’

‘কী করে করব, সে তো ঘুমোচ্ছে। আর নতুন আন্টি হাত দিতে দেয়নি বোনের গায়ে। বকেছে আমায়।’

আয়ার কথা বলছে রাখি। তার কাছে সবাই আন্টি। নিতুর মেয়েকেও দেখতে বলা হয়েছে আয়াকে। মায়ের কাছে থাকলে অভ্যেস খারাপ হয়ে যাবে। পরে আর মা ছাড়া রাখা যাবে না। তাই নিতু কিছুদিন হোমে থাকলেও বাচ্চাকে বেশি দেওয়া হবে না তার কাছে। এভাবে অসুবিধে না হলে নিতুকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কথামতো এসে নিয়ে যাবে তার মা।

পরমা বলল, ‘তুমি তো স্কুল থেকে এসেছিলে, গায়ে ধুলোবালি লেগে ছিল, তাই হাত দিতে দেয়নি। বোনের যদি অসুখ করে। আমি নতুন আন্টিকে বলে দেব। পরে গিয়ে আদর করে আসবে।’

সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সঞ্চিতা। রাখি নুসরতের সঙ্গে খেলতে চলে গেল। সঞ্চিতা বলল, ‘জান, ওই পল্লবীর তো বিয়ে একেবারে ঠিক হয়ে গেছে। হোম থেকেই হবে।’

‘কার কাছে শুনলে?’

‘শুনে এলাম অফিস থেকে। সর্বাণীদি মিটিং করছেন। কেলে বুড়ো থেকে শুরু করে স্টাফদের সবাইকে ডাকলেন। আমি তাই খাতাপত্তর নিয়ে চলে এলাম। ওই ছেলেটার সঙ্গেই হবে।’ সঞ্চিতা হাত তুলে সর্বাণী মিত্রর ড্রাইভারকে দেখাল। সেখানে পল্লবীও রয়েছে। অন্যদিনের মতো দু’জনে গাড়িতে হেলান দিয়ে গল্পে মশগুল।

পরমা বলল, ‘বাঃ, এ তো ভালো খবর। কত সমস্যার মধ্যেও একটা শুভ কাজ অন্তত হবে। কয়েকদিন আনন্দ করা যাবে। পল্লবী জানে নিশ্চয়ই তার বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে?’

‘জানবে না! ও তো নিজের বিয়ের ব্যবস্থা নিজেই করল। ছেলেটার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে একদম।’

‘এভাবে কেন বলছ সঞ্চিতা? ওর তো প্র‌শংসা করা উচিত। কোনও বাধা না রেখে এখানকার একটা মেয়েকে পছন্দ করে ভালোবেসে বিয়ে করছে! ক’জন এরকম পারে বলো তো?’

‘টাকা পেলে অনেকেই করবে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ৯                      পড়ুন পাখিঘর পর্ব  ১০

‘মানে? কী বলছ তুমি?’

‘পল্লবীর যা টাকা আছে সব তো ও-ই পাবে। ছেলেটার বাবা-মা কেউ নেই। নিজে তো থাকে একটা ভাড়াবাড়িতে।’

‘কত টাকাই বা আছে পল্লবীর?’

‘তা চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হাজার হবে।’

‘তাতেই বা অসুবিধে কীসের? বিয়ের পর ও টাকা তো দু’জনেরই হবে।’

সঞ্চিতা বলল, ‘এখনও সবটা জানি না। শুক্লাদি বেরোলে জানতে পারব।’

‘তুমি যাই বল সঞ্চিতা, আমি কিন্তু খুব খুশি। শুধু টাকার জন্যে এটা হচ্ছে না।’

‘তোমার তো সবেতেই বাড়াবাড়ি পরমা।’

আর তর্কে গেল না সে। সঞ্চিতার কথা বেসুরো ঠেকছে। তার বিয়েটা তো এখনও পেকে ওঠেনি। রাজীব ঝুলিয়ে রেখেছে। সঞ্চিতার কষ্টটা বুঝল পরমা। বলল, ‘বিয়েটা হচ্ছে কবে, জানতে পারলে কিছু?’

‘ফাল্গুনে মনে হয়।’

‘সে তো তাহলে এসেই গেল।’

‘হ্যাঁ, তাই বোধহয় মিটিংটা সেরে নিচ্ছে সর্বাণীদি। এরপর নিশ্চয়ই কেনাকাটা শুরু করবেন।’

কথা শেষ করে সঞ্চিতা চলে গেল বড়বাড়ির দিকে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসছিল উর্মিলা। দু’জনে থেমে গেল মুখোমুখি। সঞ্চিতা বড়বাড়িতে ঢুকে যেতেই উর্মিলা হাতের ইশারায় ডাকল পরমাকে। কাছে যাওয়ার পর বলল, ‘পল্লবী মেয়েটার বিয়ে।’

‘জানি, সঞ্চিতা বলল। আমার তো শুনে খুব ভালো লেগেছে উর্মিলাদি।’

‘ভালো হলেই ভালো। বিয়েটাই তো সব নয়। সংসার ঠিক থাকতে হয়।’

এ কথা তো পরমাও খুব বেশিরকমের জানে। বিয়ের পর মাত্র দেড় মাস থাকতে পেরেছিল শ্বশুরবাড়িতে। সংসার হয়ে ওঠেনি। উর্মিলা নিশ্চয়ই তাকে শোনাচ্ছে না কথাটা। তাই সে বলল, ‘ওদের সংসার ভালোই হবে দেখো।’

এবার বড় করে শ্বাস ফেলল উর্মিলা। ‘তাই যেন হয়। সংসার যে মানুষকে কী করে! উনিশ বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল আমার, জানিস। ছেলে হল একুশে। ভালই তো ছিলাম। বর কলের মিস্তিরি। কত দূরে দূরে কল বসাতে যেত। শুধু চৈত্র মাসের শেষে সে কোথাও যাবে না। গাজন গাইত, ঝাঁপান খেলত। ওই ছিল তার নেশা। গাজনের আসরে আমিও গেছি কতবার। শুধু ঝাঁপান দেখলেই ভয় করত। ওই অত উঁচু থেকে পড়তে দেখে হাত-পা কাঁপত থরথর করে। ও বলত কিছু হবে না। এ হচ্ছে কায়দার ব্যাপার। কিন্তু পড়ল সেই একবার বেকায়দায়। এই কোমরের কাছে শিরদাঁড়ায় এমন লাগল যে আর সারল না। তখন তাকে নিয়ে কত ডাক্তারের কাছে, কত হাসপাতালে যে ছুটেছি। একটা হুইল চেয়ারও পাইনি, স্ট্রেচার, ট্রলি নিয়েও কেউ এগিয়ে আসেনি। দিনের পর দিন কার্ড করিয়ে, নাম লিখিয়ে বসে থেকেছি খেয়ে না খেয়ে। কেউ কিছু করতে পারল না। ডাক্তাররা বলল, অপারেশন করাতে হবে। অত টাকা কোথায় পাব? তাছাড়া তাতেও ঠিক হবে কিনা বলা যায় না। তখনই হাতের বাইরে খরচ হয়ে গেছে। মনে হল সবাই মিথ্যে বলছে। আমরা গরীব বলে ঠকাতে চাইছে আমাদের। ওদের ওপর রাগ হয়ে গেল খুব, ঘেন্না হল, গায়ে জ্বালা ধরে গেল। সেই থেকে হাসপাতালে আর যাই না। ও শুয়ে রইল ঘরে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১                       পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১২

পরমা চুপ করে শুনছিল সব। সে বুঝতে পারছিল কেন উর্মিলা হাসপাতালের নাম শুনলেই তেতে ওঠে। বলল, ‘তাহলে সেদিন নিতুকে নিয়ে গেলে যে।’

‘গেলাম। না গেলে মেয়েটার বিপদ হত যদি! ওর তো কোনও দোষ নেই।’

এবার অবাক হয়ে গেল পরমা। উর্মিলাদি যদি এরকমই ভাবতে পারে তাহলে অন্যসময় মেয়েদের নিয়ে টিটকিরি করে কেন? তাদের কি বোঝে না?

উর্মিলা তখনও বলে যাচ্ছিল, ‘যে যা বলেছে তাই করেছি। তাগা-তাবিজ, মাদুলি। মন্দিরে গিয়ে পড়ে থেকেছি, দরগায় গিয়েছি। তাতেও কিছু হয়নি। ভগবানের নাম করেই তো ও করত ওসব। সেই ভগবানও তো কই কিছু করল না। টাকার জন্যে আমায় বেরোতে হয়েছে। ব্যাটারি কারখানায় কাজ করেছি, ব্লাউজ সেলাইয়ের কাজ করেছি। তাতেও যন্ত্রণা। বরের কথা জানার পরেই সেখানকার লোকেদের ছোঁকছোঁকানি দেখা দিত। অনেক জায়গায় ঘুরে শেষে এই কাজটা পেলাম। ও ঘরেই থাকে, নিজেরটুকু করে নেয় কোনওমতে। শাশুড়ি আছে, বাকি কাজ সামলায়। ছেলেটার তেরো-চোদ্দো হল। তাকে কিছু আর বলতে হয় না। পড়াটা চালিয়ে যেতে পারলেই হল। বাবা-মা আমায় মাধ্যমিক অবধি পড়িয়েছিল, তাই দিয়েই তো খাবারের জোগাড় করতে পারছি।’

পরমা বলল, ‘তোমার অনেক টাকার দরকার, তাই না উর্মিলাদি?’

‘হ্যাঁ রে। হোম-মাদারদের মাইনে তো এত কম নয়। তুই তো জানিস, অফিস থেকেই পুরোটা দেওয়া হয় না। ওইজন্যে আগে কয়েকজন কাজ ছেড়ে চলে গেছে। কাউকে আবার এরা ছাড়িয়েও দিয়েছে। তাই তো ওই শম্ভুদা আর মৈনাকদাকে ম্যানেজ করে চলি। যেভাবে হোক টাকা জোগাড়ের চেষ্টায় থাকি। একস্ট্রা কাজ দেখিয়ে ওরা কিছু বেশি পাইয়ে দেয়। কী করব বল? বর বিছানায় পড়ে থাকে বছরভর। যদি একটা ছোটখাটোও কিছু করতে পারত, তাহলে—। চারজনের সংসার, কী করে যে সামলাই তা আমি ছাড়া কেউ জানে না।’

এখন মেয়েরা বাইরে। এখানে দাঁড়িয়ে কথা বললে ধমক খেতে হবে না হয়তো। তবু উর্মিলা বলল, ‘তুই কোথায় যাবি যা। গল্প করছি দেখলে আবার কে কী বলবে। আমি অফিসে যাই। কৃষ্ণাদি কেন ডেকেছিল দেখে আসি।’

উর্মিলা চলে গেল। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই পরমা দেখল পল্লবী এগিয়ে আসছে। সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ‘আন্টি—।’ এইটুকু বলেই লালচে ভাব ফুটে উঠল তার গালে। পরমা বুঝতে পারল লজ্জা পাচ্ছে মেয়েটা। আবার আনন্দ চেপেও রাখতে পারছে না।

সে বলল, ‘শুনেছি আমি। ছেলেটার নামটা কী বল তো?’ এটা জানতেই চাইছিল পরমা। ওকে শুধু সর্বাণীদির ড্রাইভার ভাবতে ভাল লাগছে না তার।

পল্লবী বলল, ‘দেবজিৎ।’

হেসে উঠল পরমা। ‘শুধু দেব হলে আরও ভাল হত?’

এবার হেসে ফেলল পল্লবীও। ‘না, এই ভাল।’

পরমা তার হাত চেপে ধরল। ‘আগের সব কথা ভুলে যাবি। নতুন হয়ে যাবি একেবারে।’

‘পারব আন্টি?’

‘নিশ্চয়ই পারবি।’

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩

Comments are closed.