পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১৩

রাখি আর নুসরতের কাছাকাছি বসে ওদের খেলা দেখছিল নিতু। বড় মেয়েরা তাকে পছন্দ করে না। তারা জানে, নিতু মুক্ত পাখি হয়ে একদিন উড়ে যাবে। নিতুর ওপর তাদের ঈর্ষা আছে বা রাগ। কয়েকজন তাকে নিয়ে কথা চালাচালি করে। পরমার কানেও এসেছে সেসব। বলছিল, ‘ছুঁড়ি টাকার জন্যে কার সঙ্গে শুয়েছিল, পেট হয়ে গেছে, এখন মিথ্যে কথা বলে নামাতে এসেছে হোমে। খালি হয়ে আবার চলে যাবে কারও কাছে। ওসব নখরা বহুত দেখা আছে। কত মাগিকেই দেখেছি।’

নোংরা কথাগুলো বন্ধ করতে সর্বাণীদিকে বলে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিল পরমা। সমঝে গিয়েছে সেই মেয়েরা। এখনও হয়তো বলে, তবে অন্যের কানে পৌঁছয় না। কিন্তু নিতুর সঙ্গে মেশে না তারা। বোঝাতে গেলে বলে, ‘ও তো কিছুদিন পরে চলেই যাবে, আমাদেরকে বন্ধু করে লাভ কী।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

উঠে পড়েছে নিতু। পরমা খেয়াল করল, আয়া যেখানে বাচ্চা কোলে করে ঘুরছে সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে সে। না, গেল না তো। দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাচ্চাটা কেমন করে হাত-পা নাড়ছে, মুখ দিয়ে কী আওয়াজ করছে, আয়া তাকে কীভাবে কোলে নিয়েছে— দূর থেকে সব লক্ষ করছিল নিতু। কিন্তু কাছে গেল না। শুধু একটা হাত দিয়ে নিজের পেট জড়িয়ে ধরে রেখেছে।

গায়ের পাশে ঝাপটা খেয়ে মুখ ঘোরাতে হল পরমাকে। গা ঘেঁষে বসে পড়ছে প্রীতি। পা-দুটো ঘাসের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে মাথাটা পরমার কাঁধে রাখল। তার হাবভাবে অবাক হয়ে যাচ্ছিল পরমা। ‘কী হল তোমার প্রীতিদি? ফোনে কথা বলছিলে তো। মুখটা এরকম লাগছে কেন?’

প্রীতির মুখে লালচে ভাব ছড়িয়ে। চোখদুটো ঝিলিক দিয়ে উঠল। ‘কথা কি আর শুধু কথা থাকে রে! কেন? আমার কি হুলিয়া বদলে গেছে না কি?’

সে বোধহয় নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল। তাও না পেরে বলেই ফেলল, ‘তুই একা একা জীবন কাটাচ্ছিস কী করে পরমা? রাতে যখন কম্বলের তলায় ঢুকিস, মনে হয় না পাশে কেউ থাকলে ভাল লাগত?’

এতক্ষণ পরমা যে দুনিয়ায় ছিল, চোখের সামনে যাদের দেখছিল সেখানে প্রীতিকে ঠিক উলটোদিকের কেউ বলে মনে হচ্ছে। সে সামান্য চুপ করে থেকে বলল, ‘মানুষ যা চায়, সবসময় তা পায় না প্রীতিদি।’ তারপর মনে হল, কোনও ভারী কথা বললে তা এই ঘাসেই লুটোবে। তাই ঠোঁটের কোণে হাসি এনে তাকাল। ‘আজ তুমি এইসব কথা নিয়ে পড়লে যে! শরীর-টরীর খারাপ নয় তো?’ প্রীতির কপালে হাত দিয়ে দেখল পরমা। তাপ রয়েছে। ‘তোমার জ্বর না কি?’

‘তোকে বোঝানোটাই খুব মুশকিল, বুঝলি।’

‘কী হয়েছে না বললে বুঝব কেমন করে?’

‘তুই কখনও কাউকে খুব গভীরভাবে ভেবেছিস পরমা?’

‘কাকে? গভীর মানে কী?’

‘এই ধর তোর বরকে, একেবারে জড়িয়েমড়িয়ে… জাপটে পাওয়ার মতো করে…’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

এবার পরমা খানিকটা ইচ্ছে করেই হেসে উঠল। ‘তুমি কি ফোনে কথা বলতে বলতে সেরকম কিছু ভেবে এলে?’

প্রীতি বলল, ‘আবীরটা না এত পাজি হয়েছে! ফোনেই দুষ্টুমি করতে থাকে। দীঘায় গিয়ে কেমন পাগলামি করছিল আমাকে নিয়ে— ওইসব এখন মনে করিয়ে দিল। ঠিক থাকা যায় বল!’

‘উঃ, কী করছ প্রীতিদি?’ ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল পরমা। এতক্ষণ প্রীতি তার হাতের কনুইয়ের ওপরের দিকটা দু’হাতে পাকাচ্ছিল। এখন একেবারে নখ বসিয়ে দিয়েছে।

লজ্জা পেয়ে গেল প্রীতি। ‘সরি রে, খুব সরি।’

‘এরকম করছ কেন তুমি বলো তো?’

‘বলব? এখন আমার আবীরের কাছে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। ওরও নিশ্চয়ই আমার মতো মনে হচ্ছে। পরের ছুটিতে আমরা আবার দীঘা যেতে পারতাম কিন্তু মেয়েটা বারবার বলছে বাড়ি যেতে। উর্মিলাদি ছুটি কাটিয়ে ফিরে এলেই তো ও মাসে সঞ্চিতা নেবে। তারপর যাব। যাবই।’

পরমা বলল, ‘তোমরা দীঘা গেছিলে কবে?’

‘গতমাসেই গেছিলাম। বাড়ি যাব বলে ছুটি নিয়েছিলাম কিন্তু আবীর বায়না ধরল। তাই দীঘা চলে গেলাম।’

‘ও। তোমাদের ব্যাপার, আমি কী বলব বলো।’

‘ফিরে আসার পর তোকেই তো বলতে গেছিলাম কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফিরে তুই এমন হয়ে পড়েছিলি যে বলাই হল না।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

এবার পরমার মনে পড়ল। সেদিন প্রীতি আগ বাড়িয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। কিন্তু পরমাকে বলার জন্য সে  আকুল হয়েছিল কেন? উর্মিলা বরের সঙ্গেই থাকে। তাকে বলে লাভ নেই তাই? সঞ্চিতার এখনও বিয়ে হয়নি। অপির্তার তো হবেই না। পরমার বর আছে অথচ সে তার সঙ্গে থাকতে পায় না। রসালো কথা বলে তাকে উসকে দিতে গিয়েছিল প্রীতি? পরমাকে সে তাহলে চেনেনি। একটা মানুষের সঙ্গে জীবন জড়িয়ে ফেলার পর নিজেকে যদি পরগাছা বলে টের পেতে হয় তখন মনে লাগে। সেখানে শরীর হাঁটকালেও কিছু মেলে না।

প্রীতি আবার গায়ে ঠেলা দিচ্ছে। তার দিকে তাকাতেই সে পরমার মুখটা ধরে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে মিচকি হেসে বলল, ‘দ্যাখ দ্যাখ, ওখানে কী চলছে!’

‘কোথায়?’

‘সর্বাণীদির গাড়ির কাছে।’

পরমা দেখল স্কুলঘরের কিছুটা দূরে পাঁচিল লাগোয়া জায়গাটায় সর্বাণী মিত্রর গাড়ি দাঁড় করানো। তাতে হেলান দিয়ে হোমেরই একটি মেয়ে পল্লবী আর গাড়ির ড্রাইভার গল্প করছে। কী কথায় মেয়েটা হাসতে হাসতে ছেলেটার গায়ে হাত দিয়ে ঠেলেও দিল।

প্রীতি আবার বলল, ‘দেখেছিস কীরকম! অনেকদিন ধরেই চলছে ওদের প্রে‌মপর্ব।’

পরমা এবার প্রীতিকে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ‘যা শুনেছি তা ঠিক? পল্লবীর সঙ্গে না কি ওর বিয়ে দেবেন সর্বাণীদি?’

প্রীতি বলল, ‘আমিও তো তাই শুনছি। ভালই পটান পটিয়েছে পল্লবী ছেলেটাকে। না হলে এখানকার মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে চায়?’

ঘুরে তাকাল পরমা। ‘এভাবে কেন বলছ প্রীতিদি! ছেলেটা নিশ্চয়ই তাহলে ভালো। বিয়ে যদি সত্যিই হয়, মেয়েটার কত উপকার হবে বল তো। ওর জীবন পালটে যাবে। একজন অন্তত এখান থেকে বেরিয়ে সুখের মুখ দেখবে।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

প্রীতি বলল, ‘দ্যাখ, এদের সুখ কি আর এত সহজে আসে!’

পরমা আর কথাটায় থাকতে চাইছিল না। বলল, ‘চলো, মেয়েদের ঘরে নিয়ে যাই চলো। তুমি ছোটবাড়ির মেয়েদের ডেকে নাও, আমি দেখি মণি চলে গেছে কিনা। তাকে খুঁজে না নিয়ে গেলে আবার কোথায় রয়ে যাবে।’

প্রীতি উঠে চলে গেল। চারপাশে যেমন সন্ধে নেমে আসছে তেমনই এই হোম, তার গাছপালা আর পুকুরের ওপর ছেয়ে যাচ্ছে অন্ধকার। ঘরে চলে যাচ্ছে মেয়েরা। অফিস স্টাফদের মধ্যে অনু আর রিনিকে আগেই চলে যেতে দেখেছে পরমা। বাকিরা সর্বাণী মিত্রর সঙ্গে বেরোবে।

পরমা মণির খোঁজে এদিক ওদিক ঘুরছিল। তবে তাকে না পেয়ে পেল অন্য আর একজনকে। সে পিঙ্কি। স্কুলবাসের ড্রাইভার হরিপদদার সঙ্গে বাসের ভেতরে বসে গল্প করছে। গলা পেয়ে উঠে দেখে দু’জনে একটা সিটে পাশাপাশি বসে।

‘এখানে কী করছিস পিঙ্কি?’

কেমন যেন শুকনো গলায় সে বলল, ‘গাড়ি ধোয়া দেখছিলাম আন্টি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

স্কুলবাস বড় বলে সেটা এই বড়বাড়ির পিছনে রাখা হয়। ফিরে এসে ড্রাইভার সাফসুতরো করে। কিন্তু সে তো অনেক আগে। পরমা বলল, ‘এই অন্ধকারে গাড়ি ধোয়া হচ্ছে?’

পিঙ্কি মুখ নামিয়ে নিল। তারপর কিছু না বলে নেমে যাচ্ছিল বাস থেকে। পরমা এবার হরিপদকে বলল, ‘স্কুলবাস তো কখন এসে গেছে। আপনি এতক্ষণ এখানে কী করছেন? এখন তো আপনার থাকার কথা নয়।’

হরিপদ কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছে। আমতা আমতা করে বলল, ‘না মানে, মেয়েটার সঙ্গে একটু গল্প করছিলাম। আমি যখন ফিরে গাড়ি ধুই তখন ও এসে দাঁড়ায় তো, তাই…।’ বলেই বোকা বোকা একটা হাসি হাসল।

পরমা কঠিন গলায় বলল, ‘না, গল্প করবেন না। সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে, আপনিও যান এবার।’

লোকটা আরও কী বলতে যাচ্ছিল। না শুনে নেমে এল পরমা। পঞ্চাশ-বাহান্ন বছরের একজন মানুষ। তার এখনও বুদ্ধিশুদ্ধিই হয়নি। কোথায় মেয়েটাকে ঘরে পাঠিয়ে দেবে, তা নয়, উলটে তার সঙ্গে ভাব জমাচ্ছে! গল্প করলেও করতে পারে কিন্তু বাসের ভেতরে উঠে বসে থাকবে কেন?

এতসব ভাবতে ভাবতেই বড়বাড়ির পিছন দিকটা ঘুরে দেখা হয়ে গেল পরমার। ছোটবাড়ি আর রান্নাঘরের মাঝখানের জায়গায় একটা ল্যাম্পপোস্ট আছে। আলো জ্বলে উঠেছে সেখানে। আর একটা রয়েছে গেটের কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হোমের বাকি সব জায়গা গিলে নেবে অন্ধকার। তাড়াতাড়ি ঘুরে আবার জাম গাছটার কাছাকাছি আসতেই মণিকে পেয়ে গেল পরমা।

‘এই মণি, চল ঘরে যাবি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

সে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে। মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিল। এরকম আগেও হয়েছে। এগিয়ে গিয়ে তার হাত চেপে ধরল পরমা। ‘চল বলছি। আয় আমার সঙ্গে।’

ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল মণি। ফের মাথা ঝাঁকাল জোরে জোরে। পরমা বলল, ‘কথা শোন মণি। চলে আয়।’ বলতে বলতে পরমা আবার তার ডান হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিল। মণি খপ করে সেই হাতটা তুলে মুখের কাছে নিয়ে চলে গেল। তারপর একেবারে চেপে দাঁত বসিয়ে দিল সেখানে।

‘মা গো! ছিঁড়ে নিয়েছে রে!’ কঁকিয়ে উঠল পরমা।

প্রীতি বোধহয় কাছাকাছিই ছিল। চিৎকার শুনে ছুটে এল। সঞ্চিতাও এসে পড়েছে। হাতটা দেখে সেও চেঁচিয়ে উঠল। ‘এঃ, এ তো রক্ত বার করে দিয়েছে। কী বজ্জাত মেয়ে রে বাবা!’

চেঁচামেচি শুনে অফিসের কয়েকজনও বেরিয়ে এসেছে। তারা তো বেরোনোর মুখে মুখেই ছিল। এগিয়ে এলেন সর্বাণী মিত্র। ‘কী হয়েছে কী এখানে?’

পরমা কিছু বলার আগেই সঞ্চিতা বলে উঠল, ‘দেখুন না দিদি, মণি কী করেছে!’

দেখে গম্ভীর হয়ে গেলেন সর্বাণী। ‘ডাক্তার গুহ এখনও রয়েছেন। পরমাকে নিয়ে যাও ওর কাছে। আর মণিকে কেউ ধরো না এখন।’

কথাটা না বললেও চলত। মণির ধারেপাশে যাওয়ারও সাহস নেই কারও। পরমা সঞ্চিতার সঙ্গে গেল।

কামড় বসিয়ে দেওয়া জায়গাটা ওষুধ দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন ডাক্তারবাবু। হালকা একটা ব্যান্ডেজও বেঁধে দিলেন। তারপর ইঞ্জেকশন নিতে হল পরমাকে। মানুষেরও দাঁতে নাকি বিষ থাকে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

বাইরে এসে পরমা দেখল অফিস স্টাফরা চলে গিয়েছে। সর্বাণীদির গাড়ি গেটের বাইরে। তবে তিনি তখনও দাঁড়িয়ে। শুক্লাদিও যাননি। কিছুটা দূরে প্র‌ীতি আর অপির্তা। সেইসঙ্গেই পরমা দেখতে পেল, তাদের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে মণি।

সঞ্চিতা সিঁটিয়ে যাচ্ছিল। মণি একেবারে পরমার সামনে এসে থামল। সর্বাণী কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। পারলেন না। মণি চুপচাপ পরমার বাঁ হাতটা নিয়ে নিল নিজের হাতের ভেতরে। তারপর সেইভাবে জড়িয়েই তাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল বড়বাড়ির দিকে। ব্যান্ডেজের নীচে হাত টনটন করছে। অন্য হাতে সুচ ফোটানোর ব্যথা। তবু পরমা যেন ভুলে যাচ্ছিল সব। পিছনে ঘুরে অন্যদের দিকে তাকাল না সে। তাকালে এই অন্ধকারেও যদি ওরা তার চোখের জল চিকচিক করে উঠতে দেখে!

উর্মিলা বাড়ি থেকে ফেরার পর এ মাসেও ছুটি নিয়েছে প্রীতি। সঞ্চিতা নেয়নি বলে সুযোগ পেয়ে গিয়েছে সে। কেন সঞ্চিতা গেল না তা জানা নেই পরমার। তবে প্রীতি মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি গিয়েছে নাকি আবারও প্রে‌মিককে নিয়ে দীঘায়, তাও জানে না পরমা।

পরমাকে বড়বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে। তার চাকরি পাকা হয়ে গিয়েছে। তবে কোন বাড়ির কাজ সে করবে তা এখনও ঠিক করে বলা হয়নি। কখনও এটা, কখনও ওটা। যেন দুই বাড়ির মধ্যে মাঝি রাখা হয়েছে তাকে। কাজগুলো পার করিয়ে নেওয়া। বিরক্ত হয়ে দু-একটা কথা না বলে পারেনি সে। একবার সেই নিয়ে শম্ভুনাথের সঙ্গে ঝগড়াও হয়ে গিয়েছে। তখন তাকে থামিয়েছিলেন শুক্লা হালদারের বোন। কৃষ্ণাদি বলেছিলেন, ‘শম্ভুনাথ আর সর্বাণীর মুখে মুখে তর্ক কখনও কোরো না। তাহলে চাকরি রাখতে পারবে না। আমরাই দ্যাখো ওদের ওপর কথা বলি না। তুমি ভাল কাজ করলেও তখন সেটা কেউ দেখবে না কিন্তু।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

কথাটা শুনে রাগ বেড়ে যাচ্ছিল পরমার। অন্যায় মুখ বুজে মেনে নেবে? তাহলে ছোটবেলায় ঘর ছেড়েছিল কেন? দাদা-বউদি অকারণ কথা শোনাত। অপমান কী, তখন সে বুঝত না। অভিমান তো বুঝত। বরের অন্যায়ও সে মেনে নেয়নি। মুখ খুলেও ফল হয়নি দেখে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। আর এখানে চুপ করে থাকতে হবে? পরমা টের পাচ্ছিল সেসব কথা মনে পড়ে যাওয়ায় কপালের মাঝখানের শিরাটা ফুলে উঠেছে। রেগে গেলেই তার এরকম হয়।

ছোটবাড়িতে নিতু রয়েছে। এখন আর নড়াচড়া করার অবস্থায় নেই সে। বিছানায় বসে থাকতে থাকতে শুয়ে পড়ছে মাঝে মাঝেই। আজ সকালে পরমা কাছে যেতেই বলল, ‘আন্টি, আমি আর পারছি না। খুব দর্দ হচ্ছে। সফেদ পানি জ্যায়সা কুছ নিকল রহি হ্যায়।’ উর্মিলাকে নিতুর দিকে চোখ রাখতে বলল পরমা। তারপর গেল বড়বাড়িতে।

ঢোকার আগে একবার বাথরুমে যাওয়ার দরকার পড়েছিল। গিয়ে দেখল পাশের ছোট ঘরটায় বসে রয়েছে সঞ্চিতা।

‘তুমি এখানে! কী হয়েছে? কিছু ভাবছ মনে হয়।’ পরমা বসে পড়ল চেয়ারে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

সঞ্চিতার মুখে ছায়া ফেলেছে চিন্তা। ‘অনেক কিছুই ভাবছি। কী করি বলো তো? আমার বন্ধুদের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। আমাকে দেখলেই তাদের মায়েরা কথা তোলে। বাবা-মাকে বিরক্ত করে। বয়েস হয়ে যাচ্ছে, মেয়ের বিয়ে কবে দেবে?’

পরমা বলল, ‘তোমাকে তো তবু বেশি বয়েসে বলছে। আমাদের ওখানে মেয়ের পনেরো হলেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। আর তা যদি কেউ না করে তাহলে পাড়াপড়শিরা তিষ্ঠোতে দেবে না। অবশ্য বাবা-মায়েরাও মেয়েদের বেশিদিন রাখতে চায় না ঘরে। পণ ছাড়া তো বিয়ে হবে না। সেটা কোনওরকমে জোগাড় করতে পারলেই হল।’

সঞ্চিতা করুণ মুখে হাসল। ‘আমরা তো টাউন থেকে অনেকটা দূরে থাকি। সেখানেও একই ব্যাপার। আামাদের বর্ধমানই বল আর তোমাদের মেদিনীপুর— সব সমান।’

‘তাহলে কলকাতাকেও জুড়ে নাও। আমাদের মতো না হলেও, এখানেও হয়। খবরেই তো পড়েছি। কত আর লুকোবে!’

সঞ্চিতা তার নিজের কথায় ফেরত গেল। ‘বাড়িতে বিয়ের জন্যে তাড়া দিচ্ছে। ছেলেও দেখতে শুরু করেছে। বলছে, অনেক হয়েছে চাকরি, আমাদের জন্যে তোকে আর কিছু করতে হবে না। এদিকে আমি কিছুতেই রাজীবের কথাটা জানাতে পারছি না। তাই এবারে বাড়ি যাব না বলে ছুটির অ্যাপ্লিকেশনও করিনি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

হায় রে। এইজন্যে সঞ্চিতা বাড়ি যায়নি! পরমা বলল, দু’জনে দু’জনকে পছন্দ কর যখন, বিয়েটা করেই ফেলো।’

‘তোমাদের দেখে আর সাহস পাচ্ছি না যে। উর্মিলাদির বর পঙ্গু। সংসার চালাতে তাকে চাকরি করতে হচ্ছে। প্রীতিদি বরের সঙ্গে থাকতে পারেনি, মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়িতে। অর্পিতাদি তো বিয়েই করেনি। আর তুমি— তোমারও তো সংসার হল না পরমা। তাই ভয় করছে।’

‘আমার কথা তো সবই জান তুমি। কিন্তু সবার জীবন কি সমান হয়? তোমারটা হয়তো অন্যরকম হল।’

‘কী করে ভাবব বল তো অন্যরকম হবে? রাজীব তো নিজের বাড়িতে জানাতেই চাইছে না, উলটে বারণ করছে।’

‘বারণ কীসের?’

‘ওরা চক্রবর্তী, ব্রাহ্মণ। আমরা পাল। বাবা-মা যদি মেনে না নেয়, তাই ভয় পাচ্ছে। আগে বিয়ে করে নিয়ে তারপর দু’বাড়িতে জানাতে চায়।

‘তুমি কী করার কথা ভাবছ?’

‘জানিয়ে হলেই ভাল হত। পরে যদি কোনও সমস্যা হয়! রাজীব কিছুই বুঝতে চাইছে না। তাছাড়া বাবা-মার একমাত্র মেয়ে আমি। তাদের তো কিছু ইচ্ছে থাকতে পারে। শেষ অবধি কী হবে জানি না।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১১

‘ওর বাড়িতে কে কে আছে?’

‘বাবা-মা আর এক ছোট বোন, সে এখন পড়ছে। বাবা কোন দোকানে হিসেব দেখার কাজ করেন। নরম মানুষ নাকি। মা-টা একটু শক্ত ধরনের তবে ও বুঝিয়ে নেবে বলছে।’

কথা গম্ভীর দিকে যাচ্ছিল। জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ কতকিছু নিয়ে যে মানুষ মাথা ঘামায়! একসময়ে নিজেরাই বানিয়েছিল। এখন আর সামলাতে পারছে না। সঞ্চিতার মন হালকা করে দিতে চেয়ে পরমা বলল, ‘অত ভেবো না। তোমরা দু’জন ঠিক থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

সঞ্চিতার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ‘তুমি কিন্তু খুব ভাল বন্ধু পরমা।’

‘তাই! আচ্ছা বেশ। এবার আর গোমড়া মুখে না বসে থেকে চলো তো।’

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More