বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১২

ফেরার গোটা রাস্তাটাই কেমন ঘোরের মধ্যে পেরিয়ে এল পরমা। কখন পৌঁছে গিয়েছে বুঝতেই পারেনি। ওঃ, আবার ঢুকতে হবে সেই খাঁচায়। এখানে মেয়েরা বাচ্চা পাখির মতো আর তাদের আন্টিরা মা-পাখি। বাচ্চা সামলানোই শুধু তাদের কাজ।

ভেতরে গিয়ে দূর থেকেই দেখতে পেল নিতু রান্নাঘরের সামনের রাস্তাটায় পায়চারি করছে। সে যখন হাঁটে তখন হাত দিয়ে পেটটাকে ওপর দিকে তুলে ধরে চেপে রাখে। ভার বোধহয় আর বইতে পারছে না মেয়েটা। হাত-পাগুলো রোগা রোগা। শরীরের সব মাংস যেন তার পেটে গিয়ে জড়ো হয়েছে। দিন যত এগিয়ে আসছে, তার অবস্থাও জটিল হয়ে উঠছে। হোমে যে ডাক্তার বসেন তিনিই যতটুকু দেখেন। তাছাড়া কেউ বলে দেওয়ারও নেই যে বাচ্চা হওয়ার আগে কীভাবে থাকতে হয়। যেভাবে থাকলে সুবিধে মনে হচ্ছে সেভাবেই থাকছে নিতু।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

পরমাকে দেখতে পেয়ে মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে এল নিতু। ‘আন্টি, এনেছ?’

এই যাঃ, একেবারেই ভুলে গিয়েছিল পরমা। ফুচকা আর টক জল তো আনা হয়নি। গোটা রাস্তাটাই জুলিয়েনের কথা ভাবছিল।

‘এ বাবা, মাফ করে দে নিতু। মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে একেবারে। আচ্ছা, তুই দুঃখ পাস না। শংকরদা বা অন্য কাউকে দিয়ে আনিয়ে দেব।’

‘লেকিন আন্টি, আমার খুব খাট্টা খেতে মন করছে।’

‘কী করি বল তো, আমি তো এখন আর বেরোতেও পারব না।’

কী যেন ভেবে নিয়ে নিতু বলল, ‘একঠো চিজ দিতে পারবে?’

‘কী? বল না।’

‘ওই ইমলি পেড় থেকে নরম পাতা পেড়ে দাও। নমক আর হরি মির্চ দিয়ে বেটে খাব।’

হোম থেকে বেরোলে খাতায় সময় লিখে যেতে হয়। ফিরে এসেও লিখতে হয় আবার। পরমা তাই বলল, ‘অফিসে একবার ঘুরে আসি। নয়তো কৈফিয়ত দিতে হবে এত দেরি করেছি কেন?’

‘নেহি আন্টি, পেড়ে দিয়ে যাও।’

নিতু তেঁতুলপাতাগুলোর দিকে লোভীর মতো তাকিয়ে। তার কাতর মুখটা দেখে পরমা তেঁতুল গাছের কাছেই গেল। এখানে আর এক কাণ্ড। নীচের পাতাগুলো সব মুড়িয়ে খেয়ে ফেলেছে মেয়েরা। পাতা নিতে গেলে গাছে চড়তে হবে। খাওয়াদাওয়া হয়নি। সকাল থেকে বেরিয়ে শরীর আর মন দুটোই খুব ক্লান্ত। কিন্তু এখানে গাছে ওঠা যাবে তো? কেউ দেখতে পেলে কী হবে? আন্টির গাছে চড়ার খবর রটে গেলে তাকে তাড়িয়েই না দেয়!

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

অফিসের বাইরে এখন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। যা হয় হবে। শাড়িটা উঁচিয়ে কোমরে গুঁজে নিয়ে ডালগুলো ধরে ধরে উঠে গেল পরমা। ওপরের ছোট্ট ছোট্ট ডাল থেকে পাতা চুঁছে নিতে লাগল।

নীচে থেকে নিতু আনন্দে হাততালি দিচ্ছিল। তবে আওয়াজ কম রেখে। চাপা গলায় বলল, ‘বেশি করে নাও আন্টি, যেন কাল ভি খেতে পারি।’

অনেকদিন পর আবার কোনও গাছে উঠল পরমা। গ্র‌ামে থাকতে গাছ তো তার ঘরবাড়ি ছিল একরকম। তেঁতুল, আম, জাম, কুল, আমড়া, শিল্লাকুল, সাবড়া— কত যে খেয়েছে বন্ধুদের নিয়ে। তাদের দলে সে ছিল সবচেয়ে পাকা গাছুড়ে। নারকেল গাছে চড়ে নারকেলও পেড়ে এনেছে। এমনকী একবার ছেলেদের সঙ্গে বাজি রেখে তাল গাছ বেয়েও উঠে গিয়েছিল। হাওয়ার টানে ভয় করছিল খুব। তবু ওপর থেকে তাল ফেলতে ছাড়েনি।

আজ এই গাছটা থেকে নামতে ইচ্ছে করছে না তার। পাতার ফাঁক দিয়ে উঁচুতে তাকাল। ওখানে কী বিরাট নীল আকাশ। বেয়ে বেয়ে যদি উঠে যাওয়া যেত! আর কোথাও ফিরত না সে তাহলে। কিন্তু তা হওয়ার নয়। মানুষ শুধু আকাশ দেখে। উড়তে পারে না। পাখিরা পারে।

পাতা আঁচলে বেঁধে নেমে এল পরমা। ‘নে, খা যত পারিস।’

নিতুর হাতে পাতা ধরিয়ে পরমা চলে গেল অফিসে। গিয়ে দাঁড়াল হোম-ইনচার্জের টেবিলের সামনে। ‘দিদি।’

সর্বাণী বললেন, ‘এসে গেছ তুমি, বসো। কেমন দেখলে জুলিয়েনকে?’

‘ভাল না। যে কোনওদিন—’ কথাটা শেষ করতে পারল না সে।

‘ফল কিনে দিয়েছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘ভাল করেছ।’

‘কিন্তু ডাক্তারবাবুকে পাইনি দিদি। কথা বলতে পারিনি।’

মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলেন সর্বাণী। ‘ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। কথা বলার দরকার ছিল না। অনেকদিন কেউ যায়নি তাই তোমাকে পাঠানো। যাও, চেঞ্জ করে হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও। বিকেল হয়ে এল প্র‌ায়।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

স্নান সেরে খেতে গেল পরমা। লালশাক ভাজা আর পেঁপে-আলুর ঝোল। খিদের মুখে তাড়াহুড়ো করে গরস নিচ্ছিল। গলায় আটকে গেল। পাশে হাতড়াতে গিয়ে খেয়াল পড়ল জল নিয়ে বসেনি। হিক্কা আসছে। জল আনবে বলে উঠতে যাচ্ছিল, বোতল নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল প্র‌ীতি। তার কাছ থেকে প্র‌ায় কেড়ে নিয়ে ঢকঢক করে কিছুটা গলায় ঢালল পরমা। তারপর শান্ত হয়ে জানতে চাইল, ‘কখন এলে প্র‌ীতিদি? বাড়ির সবাই ভাল আছে তো?’

‘বারোটা নাগাদ এসেছি। উর্মিলাদির কাছে শুনলাম তুই নাকি জুলিয়েনকে দেখতে গেছিলি?’

‘হ্যাঁ গো। জান, মেয়েটা খুব অসুস্থ, বোধহয় বাঁচবে না।’

‘তাকে যা রোগে ধরেছে, বাঁচবেই না। কিন্তু তুই ভাল করে চানটান করেছিস তো? তাই দেখতে এলাম।’

‘কেন বলো তো? কী হয়েছে?’

‘তোকে কেউ কিছু বলেনি?’

‘না তো। সর্বাণীদি শুধু গিয়ে দেখে আসার কথা বলেছিলেন।’

‘বলবে কেন, তুই যদি যেতে না চাস! জুলিয়েনের টিবি হয়েছে। ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে রেখে এসেছিল। এত মেয়ের মধ্যে তো আলাদা করে রাখা সম্ভব নয়। ছোঁয়াচে রোগ। তুই যে গেলি, খেয়াল করলি না যে ওটা টিবি রুগিদের ওয়ার্ড!’ কথাগুলো বলে প্র‌ীতি খানিকটা হালকা চাউনিতে তাকাল। ‘সরল বলে তোকে দিয়ে সব কাজ করিয়ে নেয়।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

মন থমথমে হয়ে গেল পরমার। হাসপাতালের ওই মহিলা, নার্স সবাই ভেবেছিল দেখতে এসেছে যখন তখন সে নিশ্চয়ই জানে। টিবি হয়েছে মেয়েটার! তাই নিয়ে এত কিছু! সে বলল, ‘এতে করিয়ে নেওয়ার কী আছে প্র‌ীতিদি? আউটডোর তো আমার কাজের মধ্যেই ছিল। মেয়েটাকে একবার দেখতে যদি, বুঝতে। ভুগে ভুগে কী অবস্থা হয়েছে তার! কোনদিন হয়তো মরেও যাবে। না জেনেই যে গেছি তাতে কোনও ক্ষতি হয়নি আমার। পাঠালে আবার যাব।’

‘ও, আচ্ছা। ভাল কথা বলতে এসেছিলাম। বাকিটা তোর মর্জি।’ কথাটা ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল প্র‌ীতি।

এঁটো হাতে বসে রইল পরমা। জুলিয়েনই বারবার চোখে ভাসছে তার। হাসপাতালের বিছানায় সেইভাবেই হয়তো কুঁকড়ে পড়ে আছে। তাকে ছাড়াই কবে পেরিয়ে গিয়েছে হোমের পঁচিশে ডিসেম্বর। সে জানেই না। তার জন্যে দুলে ওঠেনি কোনও ঘণ্টা, কোথাও নেই কোনও তারা। একটুকরো কেকও কেউ তুলে দেয়নি মুখে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

চোখ বুজে শুয়ে কী ভাবে মেয়েটা? যে বদ্ধ ঘরে দিনের পর দিন শরীরের ওপর ধামসেছে তার খদ্দেররা, সেই ঘর কি ফিরে ফিরে আসে মনে? না কি এই হোম, যা ছিল তার আশ্রয়? ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায় কি তার? সেও হয়তো পরমার মতোই গাছ বাইত, জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটত পুকুরে, বন্ধুদের সঙ্গে হুটোপাটি করে খেলত মাঠে। কারও মেয়ে, কারও বোন, হয়তো বা কারও বউ ছিল একদিন। আজ কোনও পরিচয়ই নেই তার। অনাথের মতো শেষ নিঃশ্বাসের দিকে চলেছে। তার বাড়ির লোকেরা জানতেও পারবে না কোথায়, কীভাবে মরে যাচ্ছে তাদের মেয়েটা।

বিকেলের নিভে আসা রোদ গায়ে মেখে মেয়েরা ঘুরছিল। দুটো বাড়িই ফাঁকা। এখনও শীতকাল রয়েছে। দিন ছোট। তাড়াতাড়ি অন্ধকার নামে।

উর্মিলা ছুটিতে বাড়ি গিয়েছে। সঞ্চিতা বুটিকের ঘরে। এখানে যে ছাপা শাড়ি, কাঁথা কাজের শাড়ি তৈরি হয় সেগুলো বাইরের কয়েকটা বুটিক থেকে এসে কিনে নিয়ে যায়। তারই হিসেব করছে সঞ্চিতা মঞ্জরীদির সঙ্গে বসে। প্র‌ীতি ছোটবাড়িতে ছিল। মেয়েরা এখন বাইরে বলে সে যে কোথায়, কোন কাজে ব্যস্ত তা জানে না পরমা।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

মেয়েদের কারও গায়ে চাদর তো কেউ সোয়েটার চাপিয়েছে। মণির ওসবে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে কিছুতেই চাদর রাখতে পারে না। ছুড়ে ফেলে দেয়। কুঁচকে যাওয়া সিন্থেটিক একটা চুড়িদার তার গায়ে। শীত পড়েছে বলে জলের ধারেকাছেও ঘেঁষে না। অন্য হোম-মাদাররাও কাছে যায় না ভয়ে। একমাত্র পরমা দু-তিন দিন পরপর বালতি করে জল ঢেলে দেয় তার মাথায়। তাতেই তার স্নান হয়ে যায়। জামা ছাড়ে না, গা মোছে না, রোদে ঘুরতে ঘুরতেই শুকিয়ে যায় একসময়। ওই স্নানটুকুই করাতে গিয়ে পরমা মণির কাছে কখনও চটিপেটা খেয়েছে, কখনও সে আঁচড়ে দিয়েছে। অফিস থেকে পরমাকে বলা হয়েছিল মণির খুব কাছে না যেতে। তবুও সে যখন যা পারে করে তার জন্য।

এখন যেমন অফিসে জানিয়ে স্টোররুম থেকে একটা সোয়েটার নিয়ে মণিকে পরানোর চেষ্টায় ছিল। কিন্তু সে কিছুতেই পরবে না। দুজনের ধস্তাধস্তি হচ্ছিল একরকম। প্র‌ীতি এসে পড়েছে। তার চোখ মোবাইলে। অন্য হোম-মাদাররা বোতাম টেপা ছোট ফোনেই কাজ চালিয়ে নেয়। প্র‌ীতির ফোন দামি, টাচ স্ক্রিন। ঠিক ফাঁক খুঁজে হোয়াট্‌স অ্যাপে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়।

যেন মজা দেখছে এইভাবে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল প্র‌ীতি। এবার অবশ্য সে কাছে এসে বলল, ‘তুই আবার ওই পাগলের পিছনে পড়েছিস?’

‘কী করব প্র‌ীতিদি, কিছুতেই গরমজামা গায়ে নেবে না। ঠান্ডা আছে তো। একটু এসে ধরো না।’

প্র‌ীতিও চেষ্টা করল। তবে দুজনে মিলে তাকে ধরায় মণি আরও রেগে গালাগালি দিতে লাগল আর কিল মারতে শুরু করল।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

হার মানতে হল পরমাকে। মণি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একটা শুকনো জামডাল কুড়িয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেল বড়বাড়ির পিছন দিকে।

প্র‌ীতি বলল, ‘দেখলি কী হল?’

‘কী বলব বলো। আমরা ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়ছি, ওর কি কিছুই হয় না?’

প্র‌ীতি বেশ বুঝদারের মতো বলল, ‘এত কড়া কড়া ওষুধ খায়, তাতেই বোধহয় ঠান্ডা কেটে যায় ওর।’

পরমা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। এই সময় প্র‌ীতির ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনের তাকিয়েই পরমাকে চোখ টিপে দূরে সরে গেল সে। গলা নামিয়ে কথা বলছে। পরমা জাম গাছটার নীচে ঘাসে বসে পড়ল।

মণিটা কি কোনওদিন ঠিক হবে না? তাহলে হয়তো জানা যেত তার বাড়ি কোথায়। কে কে আছে। আদৌ তার কেউ ছিল কিনা।

হোমে অবশ্য একটা গল্প চালু আছে মণিকে নিয়ে। হোম-মাদার আর মেয়েরা তা বিশ্বাসও করে। ভেতরের খবর কারওরই ঠিক জানা নেই। অফিসের মাথারাও পরিষ্কার করে কিছু বলে না।

মণি নাকি খুব বড়ঘরের বউ ছিল। গাড়ি, বাড়ি, টাকার কোনও অভাব নেই তাদের। একেবারে রাজরানি ছিল মণি। কিন্তু তার বর আগে থেকেই জড়িয়ে ছিল আর এক মেয়ের সঙ্গে। বাড়ির কথায় বিয়ে করেছিল গরীব ঘরের মণিকে। তারপর ফেলেই রেখেছিল। মানতে পারেনি মণি। অনেকদিন চুপ করে থাকার পর যখন সে মুখ খুলল তখনই শুরু হল গোলমাল। প্র‌থমে ঝগড়া। পরে বেদম মার। তখন আবার মুখ বন্ধ হয়ে যায় মণির। সেই বিরাট বাড়িতে তেমন কাউকে সে পায়নি যে তার হয়ে দুটো কথা বলবে। তারপর বর বলতে শুরু করল, মণি আসলে পাগল। দেখতে সুন্দর বলে তার বাড়ির লোকেরা পাগলামি লুকিয়ে বিয়েটা দিয়েছিল। লোভে পড়ে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

ঘরের এককোণে বসে থাকতে থাকতে শেষে একদিন সেই ঘর ছেড়েই বেরিয়ে এসেছিল মণি। কিন্তু কোনও ঠিকানায় পৌঁছতে পারেনি। বাপের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। মা-বাবা হাত তুলে নিয়েছিল। বড়লোক বাড়ির বউ হয়েও কেউ যদি তার জায়গা ধরে না রাখতে পারে তাহলে সে দোষ কার? তাকে আর ফেরত নেওয়া যায় নাকি! মণি বোধহয় সেখানে যেতেও চায়নি। অথবা কোথায় যেতে হবে তা ততদিনে ভুলে গিয়েছে। পরনে দামি শাড়ি, গায়ে গয়না নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিল। নিজের মনে কথা বলেছে। খিদে পেলে লোকের কাছে হাত পেতেছে।

তাকে ওই অবস্থায় দেখে কয়েকজন রাস্তা থেকেই থানায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে সে আশ্রয় হোমে। তারপরেও নাকি পুলিশ খোঁজাখুঁজি করেছিল। কাগজে ছবিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেউ যোগাযোগ করেনি। মণিও কিছু বলার অবস্থায় ছিল না। অনেকে বলে মণি ইচ্ছে করেই বলেনি। সেই থেকে হোমেই আছে সে। যদিও পাগল বলে তাকে এতদিনে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়ার কথা। তবু মণি রয়ে গিয়েছে এখানেই। কে জানে, হয়তো একমাত্র পাগল বলে মেনে নেওয়া হয় তাকে। অর্পিতা একবার গল্প করেছিল, মণির গয়নাগাটি নাকি এখনও অফিসের আলমারিতে তোলা আছে। সেটা কি তাকে এখানে রেখে দেওয়ার কোনও কারণ হতে পারে?

পরমার মাঝে মাঝেই মনে হয়— মণির নাম কি আসলে মণিমালা? কোথাকার রানি সে? কোথায় বা তার রাজ্য? এখন বদ্ধ পাগলের ঠিকানা হয়েছে এই আশ্রয় হোম। টুকরো টুকরো কথা জুড়ে জুড়ে জীবনের একটা গল্পই তৈরি হয়ে গিয়েছে তার! না কি সেসব সত্যি? জানে না পরমা।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

মেয়েরা ছড়িয়ে রয়েছে নিজেদের মতো। কেউ কেউ গল্প করছে। কেউ ঘুরছে এ গাছ ও গাছের নীচে। পরমা দেখেছে, এই সময়টায় কেউ আবার বাইরে এসেও ঘাসের ওপর চুপ করে বসে থাকে মাথা ঝুঁকিয়ে। সব কথা বোধহয় ফুরিয়ে গিয়েছে তাদের। অতীত মনে রাখার মতো নয়। বর্তমান নিয়ে কিছু করার নেই। ভবিষ্যত দেখতে পায় না। ওদের মাথার ভেতরে হয়তো শুধুই অবসাদ ঘুণপোকা হয়ে ঘুরছে।

দূরে বেদির কাছাকাছি বসে অর্পিতা। তাকে ঘিরে কয়েকটা মেয়ে। তাদেরই একজন হাত মেলে রেখেছে অর্পিতার সামনে। সে কি ওদের ভাগ্য বলে দিচ্ছে? খুব হাসছে ওরা। কী এমন বলছে অর্পিতা?

মাটিতে ঘর এঁকে কিতকিত খেলছে রাখি আর নুসরত। অন্য সময় পরমাকে দেখলেই ছুটে আসে রাখি। এখন বন্ধুর সঙ্গে খেলায় মেতে রয়েছে, তাই বোধহয় খেয়াল করেনি। ওদের দেখতে দেখতেই খেয়াল গেল শংকরদার ঘরের দিকে। বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে তার দুই মেয়ে। বড়জন কোয়েল, ক্লাস সেভেন। ছোট দোয়েল, ফাইভ। জানে পরমা। ওরা দেখছে রাখি আর নুসরতকে। দোয়েল কিছুটা এগিয়ে এসেছিল। তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল তাদের মা— শংকরের বউ কাকলী। পরমা শুনতেও পেল তার গলা।

‘বলেছি না, ওদিকে পা বাড়াবে না।’

ঘাড় ঘোরাল দোয়েল। ‘ওরা খেলছে মা, যাই না একটু।’

‘খেলুগ গে। তোমরা যাবে না ওখানে। চলে এসো।’

দুজনেই মুখ চুন করে চলে গেল ভেতরে। কাকলী বন্ধ করে দিল দরজা।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১০

এরকম আগেও দেখেছে পরমা। এখানে থাকলে কী হবে, এখানকার মেয়েদের পছন্দ করে না শংকরদার বউ। দোয়েল-কোয়েলকে কারও সঙ্গে কথা বলতে দেয় না। হয়তো ভাবে হোমের মেয়েদের সঙ্গে মিশে তার নিজের মেয়েরা কোথা থেকে কী শেখে! ওরা আগে থাকত ডায়মন্ডহারবারে দিকে। উত্তর রাধানগর না কী যেন গ্র‌ামের নাম। উর্মিলাদি বলেছিল একদিন। সেখানেই শংকরদাদের বাড়ি। এখানে থাকলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ পাওয়া যাবে বলে শংকরদা পরে তাদের নিয়ে এসেছে।

পরমা চোখ সরিয়ে নিল। হাসপাতালে ফেলে যাওয়া যে বাচ্চা মেয়েটা বড়বাড়ির ভেতরে কাঠের দেওয়ালের আড়ালে বড় হচ্ছে তাকে এখন কোলে নিয়ে বাইরে ঘুরছে আয়া। পাঁচ মাস বয়স হয়ে গেল তার। নামও হয়েছে একটা। কাজল। রোজ বিকেলে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আয়া তাকে ঘুরিয়ে নিয়ে যায়। মেয়েটা কোনওদিন জানতেও পারবে না কে তার মা, কোথায় তার বাবা। এই বিরাট পৃথিবীতে আপন কেউ নেই। একটু বড় হলেই আয়াকেও সরিয়ে নেওয়া হবে তার কাছ থেকে। আস্তে আস্তে অন্য মেয়েদের সঙ্গে বড় হয়ে উঠবে। তারপর? তার জীবনের সঙ্গে যে কী হবে তা জানে না পরমা। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে যা ঘটে তা আসলে কী? শুধুই অস্থিরতা?

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১১

Comments are closed.