পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১১

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১১

বেরিয়ে এসে পিছন ফিরে একবার দেখল পরমা। বহুদিন পিঞ্জরায় আটকে রাখা কোনও পাখিকে ছেড়ে দিলে সে উড়তে পারে না। ঝুপঝাপ মাটিতে পড়ে যেতে থাকে। মনে হচ্ছে তারও এখন সেই অবস্থা। যেন বাইরে হাঁটতে ভুলে গেছে। জুতোর ভেতরে ঘেমে উঠছে পা।

গাছের ছায়া ঢাকা গোবিন্দপুরের রাস্তা ধরে হাঁটছিল পরমা। আশেপাশের ঘরের মেয়ে-বউদের কেউ কেউ তাকে দেখছে। কাছেই একটা পুকুরের চারপাশ ঘিরে অনেক লোক। পরমা বুঝতে পারল, ওরা টাকা জমা রেখে মাছ ধরতে বসেছে। তাদের গ্র‌ামের বড়বিলেও এরকম বসে অনেকে। তাছাড়া ডাক হয়। নিলাম ডাকে। যে বেশি টাকা ছড়িয়ে নিলাম জেতে, বড়বিলের সব মাছ তার। ইস, একটু দাঁড়িয়ে গেলে দেখা যেত এখানে কার ছিপে কী উঠল। তবে তার উপায় নেই।

মিনিট কুড়ি হাঁটার পর বড়রাস্তা পেল সে। বাস, অটো, অন্য কত গাড়ি চলছে। মঞ্জরীদি তাকে এখান দিয়েই নিয়ে এসেছিল একদিন। অদ্ভুত লাগছিল আজ। হোমের বাইরের পৃথিবী তো তার অজানা নয়। তবু মনে হচ্ছিল চারপাশের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট যেন গর্জন করে উঠছে। কত রকমের শব্দ। কানে তালা লেগে যাবে যেন। সে যেন ধুলো হয়ে উড়ে যাচ্ছে সব কিছুর ভেতর দিয়ে।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

বাসের নম্বর বলে দিয়েছিলেন সর্বাণীদি। খানিকক্ষণ দাঁড়ানোর পর তেমন একটা পেয়ে উঠে পড়ল পরমা। একটু পরে একটা সিটও পেয়ে গেল। বাসে কত লোক কারণে অকারণে কথা বলে চলেছে। হাসছে, চেঁচাচ্ছে, ঝগড়া করছে। সবাই, সব কিছু কত স্বাভাবিক। তবু পরমার কেন মনে হচ্ছে, প্রত্যেকটা মানুষ যেন সামান্য সময়ের জন্য একে অপরের গা ঘেঁষে রয়েছে। একটু পরেই কেউ কারও খোঁজ রাখবে না আর। আশেপাশের সমস্ত জায়গা পড়ে থাকবে শুধু।

এইরকম একটা বাস থেকেই এই সেদিন উদ্ধার পেয়েছে একটা বাচ্চা মেয়ে। যে তাকে পাচার করছিল সে ধরাও পড়েছে। মেয়েটা থাকত ঢাকায়। কাজ দেওয়ার নাম করে তাকে যশোরে নিয়ে যায় একজন। তারপর অন্য লোক বর্ডার পার করিয়ে নিয়ে আসে বনগাঁয়। সেখান থেকে রাজারহাটে। ধমকি দিয়ে, শাসিয়ে তাকে হাওড়ার বাসে তোলা হয়েছিল। ছক ছিল মহারাষ্ট্রের নাগপুরে পাচারের। যে লোক মেয়েটিকে নিয়ে যাচ্ছিল সে বাসেরই আর একজনকে তার স্মার্টফোনটা দিয়ে ট্রেনের রিজার্ভেশনের মেসেজটা পড়ে দিতে বলেছিল। তাতেই সেই মানুষটির সন্দেহ হয়। তাছাড়াও তার মনে হয়েছিল মেয়েটি ভয়ে কাঁটা হয়ে বসে রয়েছে। তার সঙ্গে কথা বলতেই সব বেরিয়ে আসে। সেই মানুষটিই পুলিশকে জানান। খবরটা পড়ার পর পরমার মনে হয়েছিল, কী সাহস সেই মানুষের যিনি নিজের কথা না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মেয়েটির জন্য! ভিড় থেকে এসে ভিড়েই ফিরে গিয়েছেন। কিন্তু আসলে তিনি আলাদা। এরকম মানুষ আরও হয় না কেন?

জায়গামতো পৌঁছে একটু থমকে গেল পরমা। এর আগে কোনওদিন কাউকে হাসপাতালে দেখতে আসতে হয়নি তাকে। তার ওপর ডাক্তারের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না। অনিন্দ্যদাদের বাড়িতে একবার তার শরীর খারাপ হয়েছিল। সুতপাবউদিই নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তার দেখাতে। পরমাকে কিছু বলতেই হয়নি তখন। কিন্তু এখানে তো কেউ নেই। তাকেই কথা বলতে হবে। সে সাহস জোগাড়ের চেষ্টা করছিল।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

ক্লাস ফোর অবধি বিদ্যে। তারপর লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ। অন্য বাড়িগুলোর মতোই অনিন্দ্যদাদের ওখানেও একরকম মন তৈরি করে কাজে ঢুকেছিল সে। তাদের পাঁচ বছরের মেয়ে সঞ্চারীর দেখাশোনা আর রান্নাবান্না। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গিয়েছিল, এরা অন্য বাড়ির মানুষদের মতো নয়। তারা যা খায়, পরমাও তাই। এককোণে মাটিতে বসে পা মুড়ে খেতে হয়নি কোনওদিন। তাকে নিয়ে এক টেবিলেই খেতে বসে অনিন্দ্যদা আর সুতপাবউদি। তাদের মেয়ের সঙ্গে এক বিছানাতেই শোয় পরমা। গোড়ার দিকে নিজেরই কেমন লাগত। কলকাতার বাবুলোকেরা এরকমও হয়! এত ভালো ব্যবহার করছে কেন? কাজের লোক কী, তা জানে না এরা? তাকে নিজের বাড়ির লোকের মতো ভালোবাসতে হয় কখনও!

পরমা সবসময় গুটিয়ে রাখত নিজেকে। কিন্তু দাদা-বউদির মেয়ে তাকে একা থাকতে দিত না। সকাল সকাল স্কুলে চলে যেত। সাড়ে বারোটায় ফিরেই শুরু হয়ে যেত বায়না। ‘পিপির সঙ্গে খেলব, পিপির কাছে চান করব।’ পিপি মানে পিসি। সে খেতও পরমারই হাতে। তার আরও এক বায়না ছিল শোওয়ার সময়ে গল্প শোনা। দাদা-বউদি তাকে প্র‌চুর গল্পের বই কিনে দেয়। রাতে তারাই গল্প পড়ে শোনাত কিন্তু দুপুরে পরমার রেহাই ছিল না। আবোল-তাবোল, ঠাকুমার ঝুলি, আলোর ফুলকি— আরও কত কী যে পড়ে শোনাতে হয়েছে মেয়েটাকে। ও বাড়িতে থাকার সময়েই পরমা গল্পের বই পড়তে শিখেছে। শুনতে শুনতে সঞ্চারী ঘুমিয়ে পড়লে চোখে জল চলে আসত তার। আগে তো কখনও এসব বই ছুঁয়েও দেখেনি সে। স্কুলে আরও যদি পড়তে পারত! তারপর কলেজে। কিছুই হল না।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

একেবারে হয়নি কি? সময় করে অনিন্দ্যদা পড়াত ইংরেজি, বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল। অফিস থেকে ফিরে সুতপাবউদিও পড়িয়েছে বিজ্ঞান, শিখিয়েছে অঙ্ক। সবই পরমার কাজের ফাঁকে ফাঁকে। পড়াতে বসে দাদা বলত, ‘স্কুলের পড়াশোনাটাই সব নয় পরমা। তোমার ভেতরে যে শিক্ষা আছে তাকে প্র‌কাশ করাই আসল। আমরা যাদের শিক্ষিত মানুষ বলি তাদের কতজন ভালো করে কথাই বলতে জানে না। তুমি ছোটবেলা থেকে অনেক কিছু পাওনি। সে দোষ তোমার নয়। পরে যদি পাওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে তা নেওয়াই উচিত। গেঁয়ো বলে একটা কথা আছে জান তো। গ্র‌ামে থাকলেই কেউ গেঁয়ো হয় না। হয় আসলে মনে। শহরেও তেমন মানুষই বেশি। চিন্তাভাবনা পরিষ্কার রাখবে, তোমার গ্র‌ামকে ভুলবে না কখনও, তাহলেই হবে।’

আরও বই দাদা ধরিয়ে দিয়েছিল একটু একটু করে। সেখানে বিভূতিভূষণ দিয়ে শুরু। তারপর বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশংকর, সতীনাথ, মানিক, আশাপূর্ণা, মহাশ্বেতা। আরও কত লেখক। তারাই বোধহয় বদলে দিয়েছেন পরমার পরিচয়। যা পড়ে তাই যে ভাল লাগে। সকলেই তার প্রি‌য় লেখক। না, তা নয়। সবচেয়ে প্রি‌য় বঙ্কিম। ওই শক্ত ভাষা পেরোতেই পারবে না ভেবেছিল। পেরিয়েই প্রে‌ম। খুব গোপন প্রে‌ম। এখন মাঝে মাঝে একটা কথা মনে হলে আপনমনেই হেসে ওঠে পরমা। বঙ্কিমচন্দ্রকে পেলে বলত, আমাকে বিয়ে করবেন? করুন না। আমি একটা দুর্গেই থাকি। আমিও দুর্গেশনন্দিনী।

আজ পরমা আর কোনও বাড়ির কাজের লোক নয়। চাকরি করে। সে যে স্কুলে বেশি দূর পড়েনি তা তাকে দেখে বুঝতে পারে না কেউ। সঞ্চিতাকে একবার বলেছিল। বিশ্বাসই করেনি।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

হোমে যখন এতদিন চাকরি করতে পেরেছে তাহলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতেও অসুবিধে হবে না। যেতে হবে চেস্ট ডিপার্টমেন্টের ফিমেল ওয়ার্ডে। বাড়িটা খুঁজে নিয়ে সিঁড়ির মুখে পৌঁছে গেল সে। গেটের সামনে টুলে বসে একজন। তাকে বলে দোতলায় উঠে গেল। বেড নম্বর বলে দিয়েছিলেন সর্বাণীদি। প্র‌থম তিনটে ঘর ছেড়ে পরেরটায় আছে জুলিয়েন।

ঢুকতে গিয়ে পা আটকে গেল। কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। সব ঘোলাটে। তিন-চারটে জানলা রয়েছে কিন্তু সেগুলোতে এত জামাকাপড় গোঁজা যে বাইরের আলো ঢোকার রাস্তা বন্ধ। তার ওপর মশা মারার কয়েলের ধোঁয়া পাক খাচ্ছে। মিনমিনে ভাব নিয়ে জ্বলছে কয়েকটা টিউবলাইট। এখন দিন না রাত তাই ভুল হয়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চোখ সইয়ে নিতে হল। নাকে আসছে ব্লিচিংয়ের ঝাঁঝালো গন্ধ। এখানে কিছুক্ষণ থাকলে সুস্থ মানুষই তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। রুগিরা আছে কী করে!

এটা ঠিক ঘর নয়। জায়গাটা তাদের হোমের বড়বাড়ির হলের মতো। দেওয়াল লাগোয়া দু’ধারে বেড। মাঝখান দিয়ে যাওয়া-আসার পথ। আন্দাজে মনে হচ্ছে তিরিশটার মতো বেড রয়েছে। চার-পাঁচটা ফাঁকা। বাকিগুলোর কোনওটায় বাচ্চা, বুড়ি নয়তো মাঝবয়েসি মহিলা। কমবয়েসি মেয়েও আছে। কয়েকটা বেডের সামনে কেউ রুগিকে ওষুধ খাওয়াচ্ছে তো কেউ বিছানা পরিষ্কার করছে। ওরা কি বাড়ির লোক? দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। ওরাই সবকিছু করে? তাই নিয়ম? নার্স কিংবা আয়া কেউ নেই?

হলঘরের একেবারে শেষ মাথায় এসে বেড নম্বর খুঁজে পেল পরমা। কিন্তু এখানে তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না! জুলিয়েন কোথায়? পাশের বেডের গায়েই যে মহিলা দাঁড়িয়ে তাকে পরমা জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, এখানে যে ছিল সে কোথায় জানেন?’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

মহিলা নাজেহাল হচ্ছিলেন তার রুগি নিয়ে। বোধহয় অনেকক্ষণ ধরে শাড়ি বদলানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু তাকে ওঠাতে পারছেন না। বিড়বিড় করে বলছিলেন, ‘একটু পাশ ফেরো মা, জড়িয়ে দিই অন্তত যাহোক তাহোক।’

পরমা আবার জানতে চাইল, ‘দিদি, এই বেডের মেয়েটি কোথায় বলতে পারেন?’

এবার মহিলা শাড়িটা মায়ের গায়ের ওপর রেখে পরমার দিকে ঘুরে গিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ গা, তোমরা কি মানুষ নও? আমি তো মায়ের কাছে দিনরাত পড়ে আছি তবুও বলে ঠিক করে নাকি তার দেখাশোনা হচ্ছে না। আমাদের মতো ঘরে এর চেয়ে বেশি আর কী করতে পারি? টাকা থাকলে না হয় নার্সিংহোমে দেখানো যেত। তা সেই অবস্থা থাকলে তো! সরকারি ডাক্তারখানায় যা করছে তাই সহ্য করছি। আর তোমরা কী! মেয়েটাকে সেই যে রেখে গেলে, আর দেখতেও এলে না! তার জন্যে কি ঘরে একটু জায়গা হচ্ছিল না? নিজেরা তো দিব্যি সুখে আছ, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ওকে না হয় এককোণে ফেলে রাখতে। রোজই দুঃখ করে কাঁদে আর বলে, আজও কেউ এল না। কী যে কষ্টে আছে মেয়েটা! এখন কি দেখতে এসেছ আছে না গেছে?’

নাগাড়ে বকবক করে মহিলার ঝাঁজ বোধহয় একটু পড়ল। গলার আওয়াজ নামিয়ে বললেন, ‘কে হয়, দিদি না ননদ?’

কথাগুলো শুনতে শুনতে পরমার রাগ হচ্ছিল কিন্তু শেষের কথাটা তাকে নাড়িয়ে দিল। সত্যিই তো, জুলিয়েন তার কে হয়? কী বলবে সে? দিদি বা ননদ তো নয়ই। জুলিয়েনের ইতিহাস তো ইনি বুঝবেন না। আত্মীয় বললে এককথায় হয়ে যায়। তাই বলবে?

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

মহিলা আবারও বললেন, ‘কী, কে হয় তোমার?’

আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সে। ঠিক তখনই একটা মেয়ে একরকম হামাগুড়ি দিয়ে এসে সামনের বেডে শুয়ে পড়ল। দেখে ভয় পেয়ে গেল পরমা। এ মানুষ না কঙ্কাল! কুচকুচে কালো শরীরে হাড়ের ওপর চামড়াটাই যেন আছে শুধু। পাকানো দড়ির মতো। ময়লা একটা নাইটি পরনে। মাথায় পাতলা কয়েকগাছি চুল খোঁপা করা। ছোট্ট শরীরটা শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠছে আর পড়ছে।

কিছুক্ষণের জন্যে কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পরমার। তারপর কোনওমতে মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, ‘তুমি কি জুলিয়েন?’ সে একবার চোখ খুলে পরমাকে দেখে আবার বন্ধ করে নিল।

‘এই শরীরে কোথায় গেছিলে তুমি?’

এবার আঙুল তুলে দেখাল জুলিয়েন। পরমা পিছন ফিরে বুঝল বাথরুমে।

কেমন আছ তুমি— কথাটা মুখ দিয়ে বেরোল না পরমার। একে দেখার পর এ কথা জানতে চাওয়ার কোনও মানে হয় না। জুলিয়েনের মাথার কাছে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতরে কিছু ওষুধ। পাশে জলের বোতল। বেডের রেলিং থেকে একটা কাপড়ের ব্যাগ ঝুলছে। সেখানে হাত ভরে দেখল কয়েকটা নোংরা জামাকাপড় ছাড়া আর কিছু নেই।

‘সকালে কিছু খেয়েছ জুলিয়েন?’

সে আর নড়ল না। চোখও খুলল না।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

পাশের সেই মহিলা বললেন, ‘এখান থেকে যা দেয় খায়। বেশিটা তো ফেলাই যায়। সে খাবার কি মুখে তোলার জো আছে! আমার মা তো খেতেই চায় না। না খেয়ে উপায় নেই তাই।’

পরমা জিজ্ঞাসা করল, ‘কোনও নার্স আসে না?’

‘আসে, সময়ে সময়ে। তবে তাদের যা দেমাক!’

‘ডাক্তার কোথায় বসেন?’

‘বেরিয়ে ডান হাতের পানে। কিন্তু গিয়ে কোনও লাভ নেই গো। আজ আসে না। আর ওই মেয়ে যে ডাক্তারের হাতে পড়েছে তাতে সুস্থ হয়ে ফিরে যেতে পারবে কিনা কোনও ভরসা নেই।’

ডাক্তার আজ আসেন কিনা তা না জেনেই হোম-ইনচার্জ তাকে পাঠিয়ে দিলেন এখানে! ডাক্তারকে পেলে মেয়েটার কী হয়েছে জানতে পারত পরমা। জুলিয়েনের সঙ্গে আর কোনও কথা না বলে বেরিয়ে এল। কোনও নার্সকে পাওয়া যায় যদি।

বাইরের করিডরে একজনকে পাওয়া গেল কিন্তু তিনি বললেন, ‘ওখানে তো আমি নেই, যার ডিউটি সে কোথায় বলতে পারব না। ডাক্তার যেদিন থাকবেন সেদিন আসুন খোঁজ নিয়ে, সব জেনে যাবেন।’

নেমে এল পরমা। গেটের মুখে দুটো ফলের দোকান দেখে এসেছিল। কিছু আপেল, কলা আর বেদানা কিনে ফেরত গেল জুলিয়েনের কাছে। সে তখন হাঁটু মুড়ে কুঁকড়ে শুয়ে। ঠান্ডা লাগছে কি মেয়েটার?

‘জুলিয়েন, এই জুলিয়েন।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

কয়েকবার ডাকার পর তাকাল সে। ঘোলাটে চোখদুটো পরমার মুখে আঠা হয়ে লেগে রইল কিছুক্ষণ। তারপর শুধু একটাই কথা বেরোল— ‘আন্টি।’ তার চোখের কোণ গড়িয়ে নেমে আসছিল জল।

ডাকটা যেন কত কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিল পরমাকে কিন্তু তার কিছু করার নেই। সে শুধু বলতে পারল, ‘ফলগুলো খেয়ো, সময়মতো ওষুধ নিয়ো— এবার যে আমাকে যেতে হবে জুলিয়েন।’

কোনও কথা বলল না সে। চোখ বুজল আবার।

পরমা ব্যাগ থেকে চাদরটা বের করল। কী হবে এটা দিয়ে। লাগবে না তার। পাট খুলে বিছিয়ে দিল জুলিয়েনের গায়ে।

পাশের মহিলা বোধহয় ফলটল দেখে খুশি হয়েছেন। বললেন, ‘ও নিয়ে চিন্তা কোরো না। নার্স এসে একসময় খাইয়ে যাবেখন। মাঝেমধ্যে এসে মেয়েটাকে একটু দেখে যেয়ো। এখন তখন অবস্থা তো।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৯

অনেক বেলা হয়েছে। পরমা রাস্তার পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। আসার আগে হাজার রকম ভেবেছিল সে। জুলিয়েনকে গিয়ে কেমন দেখবে, কীভাবে ভাব জমাবে তার সঙ্গে। মেয়েটা নিশ্চয়ই অবাক হয়ে যাবে পরমাকে দেখে। দু’জনের কেউই কাউকে দেখেনি আগে। তাকে অবাক করতে এসে নিজেই হতাশ হয়ে ফিরছে। কী হয়েছে মেয়েটার তাও জানতে পারল না। শুধু এইটুকু বুঝেছে, বেশিদিন বাঁচবে না।

ভাবতে গিয়ে বিষাদে ভরে উঠছিল মন। বাড়িঘর, আত্মীয়স্বজন ছাড়া কোথায় পড়ে আছে মেয়েটা। হোমে যাদের কাছে এসেছিল তারাও যত্ন নেয়নি। এভাবেই একদিন নিভে যাবে। কেউ কিচ্ছু করবে না। অথচ একদিন কেউ বাধ্যই করেছিল অন্ধকার গলিতে গিয়ে ঢুকতে। তারপর আর তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কেউ থাকে না। বাকিরা আঙুল তুলে দাগিয়ে দেয় গলির মেয়ে বলে।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More