পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ১০

দালাল তাকে চোরাপথে বর্ডার পার করে নিয়ে এল ইন্ডিয়ায়। বেচে দিল। তারপর থেকে মুম্বইয়ের কামাথিপুরায় দিন কাটছিল জুলেখার। বছর তিনেক পরে পুলিশ উদ্ধার করে তাকে। সেখান থেকে কলকাতায়। শেষে এই আশ্রয় হোমে।

মেয়েটা এখনও বরের কাছে ফেরার আশা রাখে। মাঝেমধ্যেই পরমাকে বলেছে, ‘আমার বর যদি আমারে একটু জায়গা দেয় আন্টি, সারাজীবন তার কেনা বাঁদি হয়ে থাকব। এত ভালোবাসা দেব যা কেউ কাউরে দিতে পারে নাই।’ বলতে বলতে থেমে যেত সে। তারপর আবার বলত, ‘যারা ঘরে আসত, তারা তো শরীরটারে নিয়ে খুশি হত। মনের কথা জানতে চাইত না। ভালো তো বাসতই না। বরও ভালোবাসে নাই। বেচে দিয়েছে। কিন্তু যে লোকটা আমার এতবড় ক্ষতিটা করল তারে কেন এখনও ভুলতে পারি না? মনকে কেন বুঝ দিয়ে উঠতে পারি না আন্টি? কেন সে আমারে শুধু একটু ভালোবাসতে পারল না?’

জুলেখার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতে হয়েছে পরমাকে। সেও তো এই উত্তরই খুঁজেছে নিজের জীবনে। তবু অবাক হতে হয় জুলেখাকে দেখে। সে এখনও বরের কাছে ফিরতে চায়! বরের সঙ্গে থাকতে চায়! আসলে মেয়েরা যে জায়গা থেকে ভাবে, ছেলেদের বোধহয় সেই জায়গাটাই নেই।

পরমার ভাবনার ভেতরেই ঘরে ঢুকে এল সঞ্চিতা। ‘উর্মিলাদি তোমাকে বড়বাড়িতে ডাকছে।’

উঠে বসল পরমা। ‘কেন গো?’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ১

‘দুপুরে মাংস হয়েছে না, মেয়েরা বায়না ধরেছে তোমার হাত থেকে খাবার নেবে। তারা বলছে নতুন আন্টি সবাইকে সমান দেয়। একে বেশি, তাকে কম করে না। যত্ন করে থালায় গুছিয়ে দেয়।’ একটু থেমে সঞ্চিতা আবার বলল, ‘ওদের যখন তোমাকে ছাড়া চলবে না তখন আর কী, চলো এবার।’

পরমা জানে কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। বড়বাড়ির মেয়েরা সঞ্চিতা, উর্মিলা বা প্র‌ীতির কাছ থেকে খাবার নিতে চায় না। তারা বলে, আন্টিরা যে মেয়েদের পছন্দ করে তাদের বেশি বেশি করে দেয়। বাকিদেরটা নাকি ছুড়ে ছুড়ে থালায় ফেলে।

সঞ্চিতা বলল, ‘তুমি ওখানে যাও, আমি ছোটবাড়ির খাবার দিয়ে দিচ্ছি।’

যাওয়ার আগে একবার জুলেখার কাছে গেল পরমা। ‘আম্মির কথা ভেবে মনখারাপ করে থাকিস না। খেয়ে নিবি। আমি ওই বাড়ি থেকে ফিরে এসে যেন আগের জুলেখাকে পাই।’

বড়বাড়ির মেয়েরা থালা হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে উশখুশ করছে। পরমাকে দেখতে পেয়ে হাতের থালা পিটিয়ে হল্লা শুরু করল তারা। ‘খিদে পেয়েছে, কখন দেবে আন্টি? দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেল তো।’

গ্রিলের এ পাশে চেয়ারে বসে উর্মিলা। পরমা তাড়াতাড়ি ডেকচির ঢাকনাগুলো তুলে দেখল— দুটোয় ভাত, একটায় মাংস আর একটায় উচ্ছে-আলু মাখা। সে উর্মিলাকে বলল, ‘তুমি ভাতটা দাও, আমি অন্যগুলো দিচ্ছি।’

উর্মিলা দু’হাতা করে ভাত তুলে দিচ্ছিল। পরমা দিচ্ছে একতাল করে আলু-উচ্ছে মাখা, দু’টুকরো মাংস আর আলু। সঙ্গে ঝোল। সে জানে, আরও লাগলে মেয়েরা পরে এসে নেবে। মাসের এই একটা দিন তারা খিদে পুরো মিটিয়ে নিতে পারে।

একটু পরেই কয়েকটা মেয়ে ফিরে মাংস চাইতে এল। চোখ নাচাল তারা। বলল, ‘আন্টি, আজকের রান্নাটা ফাটাফাটি হয়েছে।’

উর্মিলা পরমাকে বলল, ‘এদের ঝক্কি তুই সামলাস কী করে বল তো! আমার তো বাবা ধৈর্য থাকে না।’

পরমা হাসল। ‘তুমি এতদিন এখানে রয়েছে, তোমারও নিশ্চয়ই ধৈর্য আছে উর্মিলাদি। তা না হলে চলল কী করে। আর আমার কথা যদি বল তাহলে বলব, আমি তো ছোট থেকে জেনে এসেছি খাবার দিতে গেলে সবসময় মন খুলে দিতে হয়। না হলে উলটোদিকের মানুষটার নাকি তৃপ্তি হয় না। আর এরা তো কত দুঃখী সব মেয়ে, তাই না?’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ২

কথাগুলো উর্মিলার কতটা পছন্দ হয়েছে তা তার মুখ দেখে বুঝতে পারল না পরমা। সঞ্চিতা চলে এসেছে। পিছনে অর্পিতা। সঞ্চিতা বলল, ‘অর্পিতাদিকেও ডেকে নিয়ে এলাম।’

উর্মিলা বলল, ‘ভালো করেছিস। একসাথে খাওয়া যাবে।’

ছুটির দিনে হোম-মাদাররা একসঙ্গে খেতে পারে। অফিস চালু থাকলে তো তা হয় না। কাজের ফাঁকে যে যার মতো খেয়ে নেয়।

অর্পিতা বলল, ‘রাজীবের খাবারটা কেউ দিয়ে আয়। সে গেটে বসে আছে।’

সঞ্চিতা এগিয়ে এসে পরমাকে বলল, ‘তুমি আমাদেরটা বাড়ো। আমি ওকে দিয়ে আসছি।’

উর্মিলা চোখ মটকে ফিক করে হাসল একবার। ‘রাজীবের ওপর একটু বেশি টান পড়েছে মনে হচ্ছে, কী হল রে সঞ্চিতা?’

কোনও কথা না বলে সঞ্চিতাও একটু হেসে থালা হাতে বেরিয়ে গেল। পরমা বুঝতে পারছিল, উর্মিলার চোখেও ব্যাপারটা ধরা পড়েছে। কতদিন ধরে চলছে কে জানে। তবে মন্দ কী! তার তো ভাবতে ভালোই লাগছে। মনে মনে হেসে খাবার বাড়তে শুরু করল সে। আজ তাদের চারজনের থালা। প্র‌ীতি ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছে। সোমবার ফিরবে।

পরমাকে বাটিতে মাংস তুলতে দেখে অর্পিতা বলল, ‘মেটে বেছে দিস তো রে। ভালবাসি আমি।’ অমনি উর্মিলাও বলল, ‘আমাকে কচকচি দিতে ভুলিস না।’

পরমা বলল, ‘কত মাংস এনেছিলে আজ? রয়ে গেছে অনেকটা।’

খোকন বলে একজন রোজ আসে বাইরে থেকে। তার কাজ পাম্প চালানো, জেনারেটরের দেখভাল করা। তাছাড়া ড্রাইভার শংকর গাড়ি নিয়ে যখন বাজারে যায় তখন খোকনও থাকে। অর্পিতার কথামতো বাজার তুলতে হয় দু’জনকে। বাজারের ভার যেহেতু তার তাই তা নিয়ে কোনও কথা সহ্য করতে পারে না অর্পিতা। সে ফোঁস করে উঠল, ‘ছুটির দিনে মেয়েরা একটু ভাল করে খাবে না? পঁয়ত্রিশ কিলো এনেছি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৩

পরমা বলল, ‘একটু কেন, ভালোই খেয়েছে। তারপরেও বেঁচে গেছে, তাই বলছি। যা আছে, সব রাতে দিয়ে দেব তাহলে।’

‘তাই দিস।’

পরমার মনে হচ্ছিল, যে অর্পিতা মেয়েদের ভালো করে খাওয়ানোর কথা বলছে সে-ই আবার মেয়েদের টিফিন থেকে নিয়ে খায় কী করে! ভাবতে ভাবতে যার যার থালা হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজেরটা নিয়ে বসে পড়ল সে। সঞ্চিতাও ফিরে এসেছে। সে তার থালা নিয়ে নিল।

খেতে বসে অর্পিতা যেন নিজের মনে কথা বলতে বলতে পরমার প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে ফেলল আজ। ‘কী করব বল? বাজার করার জন্যে আমার হাতে যা টাকা দেয় তাই দিয়েই যা পারি করি। বুঝি, ওই দিয়ে মেয়েদের হয় না। কিন্তু বলার উপায় নেই। আমাদেরও কী হয়! তাই ছোটদের বেঁচে যাওয়া টিফিন থেকে খেয়ে ফেলি। লজ্জা লাগে রে!’

সঞ্চিতা আর উর্মিলা মুখ নামিয়ে খেয়ে চলেছে। অর্পিতাও চুপ করে গিয়েছিল। এবার একটা অন্য কথা পেড়ে ফেলল পরমা। এই তার এক দোষ। বেয়াদব ভাবনাগুলো কেন যে চলে আসে! বলল, ‘আচ্ছা, পায়েল ঠিক কী কারণে সেদিন গলায় দড়ি নিতে গেছিল বলো তো?’

সবাই থাকলেও তার প্র‌শ্নটার লক্ষ্য আসলে অর্পিতা। কেননা অফিসের অনেক কথাই সে জানে কিন্তু অন্য হোম-মাদারদের বলে না।

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৪

অর্পিতার বদলে যদিও আগে মুখ খুলে ফেলল উর্মিলা। বলল, ‘আমি যতটুকু শুনেছি, পায়েলের বাড়ি খুঁজে পাওয়া গেছে। সে কথা জানে মেয়েটা। তাই বাড়ি যাওয়ার জন্যে ভয়ংকর সব কাণ্ড ঘটাচ্ছে। এটা নাকি ছুটকি সেদিন বলেছে সর্বাণীদিকে।’ বলতে বলতে উঠে গিয়ে উর্মিলা মাংসের ডেকচিতে কী যেন খুঁজছিল। সেখান থেকেই আবার, গলা তুলল ‘শুধু পায়েল নয়, আরও চার-পাঁচজনের বাড়ি পাওয়া গেছে।’

পরমা বলল, ‘সে কী কথা! তবে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে না কেন? তাহলে তো মেয়ের সংখ্যাও কমে।’

এতক্ষণে অর্পিতা মুখ খুলল। ‘মেয়ে কমিয়ে লাভ কী? বরং বাড়িয়েই তো বেশি লাভ। যত দেখাবে তত টাকা। মাঝে মাঝে যে হোম দেখানোর জন্য ডোনারদের নিয়ে আসা হয়, সে কি এমনি? নবনীতা দত্ত তো তাদের কাছ থেকেই টাকা পান। এখন মেয়ে আসা কে জানে কেন কম। তাই পুরনো মেয়েদের ধরে রেখে দিচ্ছে। আগে এত মেয়ে আসত, জায়গা হত না বলে অন্য হোমে পাঠিয়ে দিতে হত। সেটা হাওড়ার কাছে। ওদের সঙ্গে আমাদের হোমের যোগাযোগ আছে।’

পরমার মনে হল, মেয়ে কম আসছে? পৃথিবীর লোকজন কি সব শুধরে গেল তাহলে? না, তা কী করে হবে! এত সহজে সেরে যাওয়ার নয় এই অসুখ। এটা থেকেই যাবে। তাদের এই হোমের মতো আরও অনেক হোম তৈরি হবে যেখানে আরও বেশি বেশি মেয়ে রাখা যায়। এগুলো হল ক্যাপসুল। ওষুধের মতো কাজে লাগানো হবে। অসুখ থেকে যাবে বাইরে।

ওদের কথার মধ্যেই গ্রিলের ওপাশে একটা মেয়ে থালা হাতে এসে দাঁড়াল। অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল পরমা। ‘তুই খাসনি পিঙ্কি?’

‘আমার জন্যে নয় আন্টি। রিমাদির খাবার নিতে এসছি।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৫

এত মেয়ের মধ্যে দু-একজন খেতে না এলে সবসময় খেয়াল রাখা যায় না। পরমা বলল, ‘সে খেয়ে যায়নি?’

‘না।’

‘নিজে না এসে তোকে পাঠাল কেন? যা, গিয়ে তাকে পাঠা।’

চলেই যাচ্ছিল পিঙ্কি। অর্পিতা দাঁড় করাল তাকে। গলা নামিয়ে পরমাকে বলল, ‘কী করছিস! চাকরি বাঁচাতে চাস তো খাবার দিয়ে দে। আর রিমা নামটা ভাল করে মাথায় বসিয়ে নে। ও যখন যা খুশি করবে, কিছু বলবি না।’

রিমা এর আগেও একদিন অন্য একটা মেয়েকে খাবার নিতে পাঠিয়েছিল। পরমা দেয়নি। রিমাকেই আসতে হয়েছিল পরে। পরমা বলল, ‘সে তো দেখেইছি। কিন্তু কেন?’

অর্পিতা বলল, ‘রিমা নবনীতা দত্তর কাছের লোক। তোর-আমার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে নবনীতাদি নিজের গাড়ি পাঠিয়ে ওকে নিয়ে যান। এখনও দেখতে পাসনি, তবে পাবি।’

‘কোথায় যায় ও?’

হেসে উঠল উর্মিলা। ‘এখন প্র‌ীতি থাকলে কী বলত শুনতিস! গাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিত। ওই মেয়েটাকে যা দেওয়ার দিয়ে দে। পরে আমি তোকে বলব।’

সবার খাওয়া শেষ। যে যার মতো বেরিয়ে যাচ্ছিল। ডেকচিগুলোয় ঢাকা দিয়ে দিল পরমা। ভাত আর মাংস বেঁচেছে। রাতের জন্য থাকবে।

কাজ সেরে বাইরে আসতেই ফোন বেজে উঠল। সুতপাবউদি ফোন করছে। ধোয়া হাত তাড়াতাড়ি জামাতেই মুছে ফোন ধরল। ‘হ্যাঁ বউদি, বলো।’

‘কী রে, তুই ভালো আছিস তো?’

‘হ্যাঁ, তোমরা সবাই কেমন?’

‘আমরা ঠিক আছি।’ বলেই সুতপা জানতে চাইল, ‘তোদের সেই মিটিংয়ে কী হল? কোনও সমস্যায় পড়িসনি তো?’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৬

পায়েলের গলায় দড়ি দেওয়ার ঘটনার পর প্র‌ীতি যে তার ওপর দোষ চাপিয়েছে তা বউদিকে জানিয়েছিল পরমা। এখন যতটা পারা যায় বাঁচিয়ে বলতে হবে। না হলে চিন্তা করবে। তার জন্য অনেক করেছে ওরা। ওদের আর চিন্তায় ফেলতে চায় না সে। তাই বলল, ‘সব ঠিক আছে বউদি। আমিও ঠিক আছি।’

সুতপার গলায় ভরসা ভেসে এল। ‘ভয় পাবি না। কিছু হলে বলবি। মনে জোর রাখবি। আমি আর তোর অনিন্দ্যদা সবসময় পাশে আছি। ভাল থাকিস।’

আরও কয়েকটা কথার পর ফোন ছেড়ে দিল বউদি। মাঝে মাঝেই হয় অনিন্দ্যদা নয় সুতপাবউদি খোঁজ নেয়। জীবনে এখন এরা ছাড়া আছেই বা কে। শ্বশুবাড়িতে থাকতে পারেনি পরমা। কী করতে পারত সব জেনে যাওয়ার পর? কিন্তু সবাই তো বলল তারই দোষ। ওই ঘটনার পরেও চেষ্টা করা দরকার ছিল। নিজের দাদা-বউদি সুতো কেটে দিয়েছে। ভয় পেয়েছে বোধহয়। সারাজীবন যদি তাকে টানতে হয়! দুই দিদিও খোঁজ নেয়নি। সবাই যেন ইচ্ছে করেই হারিয়ে ফেলেছে পরমাকে। হোমে অনেককেই রক্তের সম্পর্ক, নাড়ির টান নিয়ে কথা বলতে শোনে সে। তার নিজের ভাই-বোনেদের কি তাহলে নাড়ি নেই? মনে মনে হেসে উঠতে যাচ্ছিল পরমা। তার বদলে চোখে জল এসে দাঁড়াল।

ঠিক এই সময় জুলেখার কথা মনে পড়ে গেল। বড় কষ্টে আছে মেয়েটা। দেরি না করে ছোটবাড়ির দিকে এগিয়ে গেল পরমা।

 

 

অফিসে ঢুকেই সর্বাণী মিত্র ডেকে পাঠিয়েছিলেন উর্মিলা আর পরমাকে। শুরুতেই কেন ডাক পড়ল! কী হল আবার? কাজ ফেলে হাজির হল দু’জনে।

সর্বাণী বললেন, ‘বেরোতে হবে। একটা মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি, তাকে দেখে আসতে হবে। পরমা, তুমি জান না, উর্মিলা ওর কথা আগে থেকেই জানে। ঠিক করো কে যাবে। অর্পিতা গেটে। প্র‌ীতি এখনও ফেরেনি বাড়ি থেকে। হোমের কাজ তো চালাতে হবে। সঞ্চিতা একা পারবে না। এখানে আরও একজনকে দরকার। বাইরের কাজটা কে করবে বলো।’

উর্মিলা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘দিদি, আমি থাকছি, পরমা যাক। তাছাড়া ওরই তো আউটডোর করার কথা।’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৭

সর্বাণী বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি তোমার কাজে চলে যাও।’ তারপর পরমার দিকে তাকালেন। ‘বসো, তোমাকে কিছু বোঝানোর আছে।’

বসে পড়ল পরমা। সর্বাণী জিজ্ঞেস করলেন, ‘চিনে যেতে পারবে তো?’

‘বুঝিয়ে দিলে পারব নিশ্চয়ই।’

কীভাবে যেতে হবে বলে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন সর্বাণী। তারপর আবার বললেন, ‘কিছু ফলটল কিনে দিয়ো মেয়েটিকে। মৈনাককে বলে দিচ্ছি, খরচ নিয়ে নাও ওর কাছ থেকে।’

টাকা নিয়ে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে এল পরমা। কাজে আসার পর এই প্র‌থম সে হোমের পাঁচিলের বাইরে পা রাখবে। মনের মধ্যে একটা আনন্দ হচ্ছে। মনে আছে রাস্তাঘাট? হাসপাতালটা খুঁজে বার করতে পারবে তো? একটু ভয়ও হচ্ছে। জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়তে হবে। সে চলে গেল খাওয়ার জায়গায়।

সঞ্চিতা আর উর্মিলা খাচ্ছিল। নিজেরটা বেড়ে নিল পরমা। মুড়ি আর ঘুগনি।

উর্মিলার মুখে খাবার। সেভাবেই হঠাৎ বলতে শুরু করল, ‘হাসপাতালে যেতে পারব না আমি। হোমে থেকে কাজ সামলানো অনেক ভালো। কোথায় কোন মেয়ে কী অসুখ বাধিয়ে পড়ে আছে! তাকে দেখতে গিয়ে সঙ্গে করে কিছু নিয়ে আসি আর কি! তখন তো হোম আমাকে দেখতে যাবে না।’

সঞ্চিতা কিছু বলছে না। পরমার মনে হচ্ছিল কথাগুলো তাকে শোনানো হচ্ছে। তবু চুপ করে রইল। নিজের মনে কথা শেষ করে খেয়ে বেরিয়ে গেল উর্মিলা।

এবার সঞ্চিতা বলল, ‘তোমায় টাকা দিয়েছে অফিস থেকে?’

‘হ্যাঁ।’

‘ঠিক আছে। গাড়িভাড়া কত হল, অন্য কিছু লাগল কিনা— যেখানে যা খরচ হবে তার একটা বিল তৈরি করে জমা দিয়ে দিয়ো। নিজের থেকে কিছু কোরো না।’

সুতপাবউদির কাছ থেকে পাওয়া আর একটা তাঁতের শাড়ি আছে। কেচে মাড় দিয়ে রাখা। সেটা পরে তৈরি হয়ে নিল পরমা। কাঁধের ঝোলানো ব্যাগে জলের বোতল আর চাদর নিল। কখন ফিরতে পারবে কে জানে।

বেরিয়ে আসতেই নিতুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তার। অন্য মেয়েরা দিনেরবেলায় বন্ধ থাকলেও বাইরে থাকার ছাড় পায় মণি পাগলি। আর পায় এই নিতু। কখনও হাঁটে, কখনও কোনও গাছের ছায়ায় গিয়ে বসে থাকে। সে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ আন্টি?’

পড়ুন পাখিঘর পর্ব ৮

একটু বাইরে যাচ্ছি রে। কাজ দিয়েছে।’

‘একদম বাহার?’

‘হ্যাঁ। হাসপাতালে যেতে হবে।’

‘ও। আসার সময় আমার জন্য ফুচকা আনবে? আর বেশি করে খাট্টা পানি।’

কয়েকদিন হল টক খাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে মেয়েটা। পরমা বলল, ‘আচ্ছা, দেখব। যদি পাই, নিয়ে আসব।’

গেটে চলে এল সে। ‘রাজীবদা, গেট খুলুন। বেরোব।’

‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে এত পরিপাটি হয়ে?’

পরমা ঠোঁটের কোণে হাসল। ‘যাচ্ছি কোথাও, বলব কেন?’

অর্পিতা রাজীবের সঙ্গে এখনও গেটের ডিউটিতে। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ঝাঁঝিয়ে উঠল সে, ‘বল না। এত ঢং করিস কেন?’

হকচকিয়ে পরমা বলল, ‘বাব্বা, হাসপাতাল যাচ্ছি, জুলিয়েন বলে কাউকে দেখতে।’

অর্পিতা চুপ। গেট খুলে দিল রাজীব।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More