রবিবার, ডিসেম্বর ৮
TheWall
TheWall

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ৯

পরমার চোখ খবরের কাগজের হরেক খবর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। পৃথিবীর এককোণে এই ছোট্ট জায়গাটায় বসে বাকি জগতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ তো এই কাগজেই। রাজনীতি, ডাকাতি, জঙ্গি হামলা, ধর্ষণ, বায়ুদূষণ, মিছিল, দুর্ঘটনা, ডেঙ্গি, সিনেমা, খেলা, অ্যাসিড হামলা, বিউটি কনটেস্ট, কোনও গ্রামের ধান ঝাড়াইয়ের ছবি— সব একসঙ্গে। মানুষের অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। হয়তো পৃথিবীরও।

তবে এর মধ্যে একটা খবরে ঝুঁকে পড়ল পরমা। বউদের ওপর বরদের অত্যাচার গোটা দেশের মধ্যে এ রাজ্যেই সবচেয়ে বেশি। আর বেশি মেয়ে পাচার। সেইসঙ্গে নাবালিকাদের বিয়েও। এই তো লেখা— ‘‘সমীক্ষা বলছে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দুই চব্বিশ পরগনার মতো সীমান্তবর্তী জেলা থেকে রোজই মেয়ে পাচারের মতো ঘটনা ঘটে। ফাঁদ পেতে বসে থাকে পাচারকারীরা। বিয়ের টোপ দিয়ে নিষিদ্ধপল্লিতে বিক্রির মতো ঘটনার বাস্তব ছবিও ধরা পড়েছে। ফলে মেয়ে একটু বড় হলেই মা-বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ।’’

ওসব জায়গায় নাকি বাবা-মায়েরা পাচারের ভয়ে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। কী সমস্যার কী সমাধান! এই খবরে মেদিনীপুরের নাম নেই। কিন্তু পরমাদের ওখানেও তো তেরো-চোদ্দো থেকে মেয়েদের বিয়ে শুরু। তাও আবার পণ ছাড়া বিয়েই হবে না। ঘড়ি, আংটি, সাইকেল, শয্যা দিতে হবে। সঙ্গে টাকা। ছেলে যেমনই হোক আর যা-ই করুক। সে যদি সারাদিন টো টো করে ঘুরেও বেড়ায় তাহলেও তিরিশ হাজার টাকা পণ চাইতে পারে। বিয়ে হয়েও যায়। সবাই সব জানে, সব খবর রাখে, তবু হয়।

খবর ছেড়ে চারের পাতায় ঝুঁকে পড়ল পরমা। অনিন্দ্যদাদের বাড়িতেই তার কাগজ পড়ার অভ্যেসের শুরু। দাদাই বলেছিল, ‘আর কিছু পড় না পড়, চারের পাতাটা পড়বেই কিন্তু।’

এই পাতায় একটা চিঠি ছাপা হয়েছে। ‘‘আমাদের দেশের নারীপাচারকারীদের কথা সংবাদপত্রে অনেকবার পড়েছি। অনেকে ধরা পড়েছে, অনেকে পড়েনি। যারা ধরা পড়েছে, তাদের কেমন শাস্তি হয়েছে? কারণ পাচারকারী দিনকে দিন আরও বেড়ে যাচ্ছে, নারীদের আরও সর্বনাশ হচ্ছে। এটা কি চলতেই থাকবে? গ্রামের অশিক্ষিত গরীব মা-বাবারা দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে অনেক সময় তাদের মেয়েদের বিক্রি করে দেয়। মেয়েরা হয়ে যায় পণ্য। তারপর অত্যাচারিত নির্যাতিত হতে হতে বিভিন্ন হাত ঘুরে তারা এমন জায়গায় পৌঁছয় যা কল্পনা করলেও গা শিউরে ওঠে। প্র‌তিদিন খবরের কাগজে এদের কথা পড়ব? এর কোনও সুরাহা হয় না?’’

পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ১

চিঠিটা লিখেছেন এক মহিলাই। নদীকুল, নিমতা বলে একটা জায়গা থেকে। মনে হয় আজ প্র‌থম পাতার খবরটার সঙ্গে ভেবেচিন্তেই এই চিঠিটা ছাপানো হয়েছে।

কাগজ রেখে সোজা হয়ে বসল পরমা। এসব নিয়ে ভাববার, ব্যথা পাওয়ার মানুষ আছে তাহলে! হ্যাঁ, আছে তো নিশ্চয়ই। এরা যেন থাকে। এদের খুব দরকার।

‘এই পরমা। চলো, যাবে তো?’ ডাকল সঞ্চিতা।

জলখাবারের বাজনা বাজছে। তার মানে ওষুধ দেওয়ার সময়ও হয়ে গেল। উঠতে হবে। অর্পিতা বলল, ‘রাজীব আর আমার খাবারটা পাঠিয়ে দিস তো। ওদিকে আর যাব না তাহলে।’ ঘাড় নাড়ল সঞ্চিতা।

অন্য অনেক কিছু করলেও, ওষুধ দেওয়ার কাজটা মেয়েদের দিয়ে হবে না। কোন ওষুধটা কার, কখন কাকে দিতে হবে, পরমাই জানে। আর জানে উর্মিলা। পরমা এখানে আসার আগে তার ওপরেই ওই দায়িত্ব ছিল।

এইচ আই ভি পজেটিভ আছে তিনটে মেয়ের। ওদের একটাই ওষুধ, দিনে একবার দিতে হয় কিন্তু সময় একেবারে বাঁধাধরা। প্র‌তিমাসে ওই তিনজনকে গাড়িতে করে নিয়ে যান শুক্লা হালদার। ওদের গ্রি‌ন বুক আছে। এইচ আই ভি রোগীদের খুঁটিনাটি লেখা থাকে ওখানেই। যাওয়ার সময় সেগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে হয় তিনজনকে। এক মাসের বেশি ওষুধ দেওয়া হয় না। প্রত্যেকের জন্য একটা করে কৌটো। আবার কবে ওষুধ নিতে যেতে হবে তার তারিখ দেওয়া থাকে গ্রি‌ন বুকেই। ফুরিয়ে যাওয়ার তিন-চার দিন আগে সেই তারিখ মনে করিয়ে দিতে হয় শুক্লাদিকে।

পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ২

বড়বাড়ির দোতলায় ওঠামাত্রই তাকে দেখতে পেয়ে পিছু নিল রাখি। ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’

পরমা জানে এবার কী হবে। তবু বলল, ‘ওপরে।’

‘কেন?’

‘দিদিদের ওষুধ দিতে।’

‘আমিও যাব।’

‘তুমি নুসরতের সঙ্গে খেলছিলে না?’

‘আমি এখন তোমার সাথে ওষুধ দেব।’

হাসল পরমা। ‘আচ্ছা চলো।’

রাখি অমনি তুরতুর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করে দিল।

তিনতলায় একটা র‍্যাকের ওপরের বাঙ্কে থাকে সঙ্গীতা সাউ, মাঝখানে কল্পনা থাপা আর নীচেরটায় মিতালি দাস। তিনজন এই র‍্যাকেই নিজেদের জায়গা বরাদ্দ করে নিয়েছে। এ ঘরের অন্য মেয়েরা এরকম কিছু বলেনি। গা বাঁচানোর কোনও চেষ্টাও করে না। মেলামেশা দেখলে এদের ব্যাপারটা আলাদা করে বুঝতেও পারবে না কেউ। অবশ্য দেখতে আসছেই বা কে? কাগজের খবরে পড়েছে পরমা বেশ কয়েকটা ঘটনা। এইচ আই ভি পজেটিভ জানাজানি হয়ে গিয়েছে বলে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। শহরে বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়তে বলেছে। এই হোমের মেয়েগুলোর কথা কেউ জানে না।

পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৩

কল্পনা তার বাঙ্কে বসে মাথা নিচু করে গুনগুন করছে। গান গাইছে সে। জানে পরমা। আগেও কানে এসেছে। সুরটা কেমন ঝিমধরানো কিন্তু কথাগুলোর মানে বোঝা যায় না। আজ সে সঙ্গীতা আর মিতালির হাতে ওষুধ দেওয়ার পরে কল্পনাকে বলল, ‘কী গাইছ, জোরে গাও না, আমরাও শুনি।’

লজ্জা পেয়ে গেল কল্পনা। চুপচাপ ওষুধ খেয়ে মুখ নামিয়ে বলল, ‘ও নেপালি গান।’

‘সেটাই তো শুনতে চাইছি।’

কল্পনা চুল ঝাঁকাল। ‘না না, পারব না।’

পরমা বসে পড়ল তার বাঙ্কে। ‘আমি শুনবই।’

ওদের কথা শুনতে শুনতে কয়েকজন মেয়ে কাছে ঘেঁষে এসেছে। ‘আন্টি, আমরাও শুনব তাহলে। ও আমাদের কোনওদিন শোনায়নি।’

কল্পনা কারও মুখের দিকে না দেখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তারপর চিকণ গলায় গাইতে শুরু করল—

রেশম ফিরিরি… রেশম ফিরিরি…

উড়ি না যাউ কি ডাঁড়ামা বাঞ্জাং রেশম ফিরিরি…

দু’বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়ার পর সে থামলে পরমা বলল, ‘মানেটা বলে দাও, না হলে বুঝব কী করে।’

‘মানে!’ কল্পনার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সমস্যায় পড়েছে। ঠোঁট চেপে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আবার লাজুক মুখে বলল, ‘একদম সহি বলতে পারব না। হতে পারে— মন আমার রেশমি রুমাল…উড়ব শুধু উড়ব… না কি চলে যাব উঁচা পাহাড়ের উপরে!’

‘বাঃ, সুন্দর তো!’ কথাগুলো ভাল লেগেছে পরমার। কল্পনার কথায় ‘স’-এর ওপর জোর পড়ে। একটু আধো আধো শোনালেও পছন্দ হয়ে যায়। হাসল পরমা। ‘তুমি কিন্তু ভালই বাংলা বলো।’

পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৪

কল্পনার ঠোঁটেও অল্প হাসি। ‘এখানে থাকতে থাকতে শিখে গেলাম। আগে তো হিন্দি ভি বলতে পারতাম না। শুধু থারু আর গোর্খালি।’

‘এবার গানটা পুরো শোনাও।’

সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল কল্পনা। গলায় মিনতি। ‘না আন্টি, আর না, আর মনে নেই। সত্যি বলছি।’

পরমা মুখ তুলল। ‘এটা কিন্তু ভাল হচ্ছে না।’

‘সত্যি বলছি, ইয়াদ নেই।’

‘না, সত্যি বলছ না।’

কল্পনা ঝুঁকে পরমার হাঁটুতে হাত রাখল। ‘আচ্ছা, অন্য দিন শোনাব, প্লিজ আন্টি।’

চোখ বড় বড় করে পরমা বলল, ‘কথা রইল কিন্তু।’

‘ঠিক আছে।’

মণিকে ওষুধ দেওয়া বাকি এখনও। যদিও সেটা খাওয়ার পরে। দোতলার ওষুধের আলমারির চাবি পরমার কাছেই থাকে। ওষুধটা নিয়ে নিল। আর ওপরে আসার দরকার নেই। নীচেই পেয়ে যাবে মণিকে।

দোতলায় এসে রাখি আবার তার জায়গায় চলে যাচ্ছিল। তখন পরমা দেখতে পেল, রিমা নামের মেয়েটা তার বাঙ্কে বসে। কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরে নেলপলিশ পরা দেখছে। এরা সবসময় রিমার আশেপাশেই থাকে। এই মেয়েটার জন্য এখানে কিছু আলাদা খাতির তোলা আছে। কেন, তা এখনও অবধি উদ্ধার করতে পারেনি পরমা। বছরে একবার ম্যাটাডোর বোঝাই করে মেয়েদের জামাকাপড় আসে। বেশিটাই সালোয়ার-কামিজ। শাড়িও থাকে, কিছু ফ্রকও। আর থাকে ব্রা, প্যান্টি, স্যানিটারি ন্যাপকিন। শেষেরটা যদিও বেশি জমানো থাকে না। পরেও কেনা হয় দরকারমতো। জামা ঢিলেঢালা হোক কিংবা আঁটসাঁটো— মেয়েদের তাই পরতে হয়। দৈবাৎ কারও মাপসই হলে আলাদা। রিমা কিন্তু বাইরে বেরিয়ে নিজের পছন্দমতো কিনে নিয়ে আসে। সবই দামি। তার হাতে টাকাও থাকে। ইচ্ছে হলে ড্রাইভার শংকর বা কোনও গার্ডকে দিয়ে খাবার আনাতে পারে। মেয়েরা যখন সময় মেনে ঘরে ঢুকে যেতে বাধ্য হয় তখন কোনও কোনওদিন রিমা বাইরে ঘুরে বেড়ায়। কেন যে এই ব্যবস্থা তা জানে না পরমা। দু-একবার জানার চেষ্টা করেছিল। শুনল, নবনীতাদির নির্দেশে ছাড় আছে রিমার। কে জানে কী ব্যাপার।

জলখাবারের পালা শেষ হলে মিনুকে ওষুধ খাইয়ে দিল পরমা। গোড়ার দিকে যখন দিতে যেত তখন থু থু করে গায়ে ছিটিয়ে দিয়েছে কতবার। খামচে দিয়েছে। এখনও ওষুধ দেখলেই আগে বেশ খানিকক্ষণ মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না না’ করে নেয়। তারপর পরমার হাতটা চেপে ধরে ঠায় তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। কী যে ভাবে, খুব জানতে ইচ্ছে করে পরমার। চেনা কারও মুখ খোঁজে কি? কোনওদিন জানা যাবে না। ওষুধ খেয়ে নিয়ে পরমার ভাবনাটাকেও ছুটি দিয়ে দেয় মণি।

পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৫

বড়বাড়ির পিছনে বাথরুম। স্নান সারবে বলে সে দিকে যাচ্ছিল পরমা। দেখতে পেল, তেঁতুল গাছের নীচে কলতলার বাঁধানো চাতালে চুল ছেড়ে দিয়ে বসে আছে একটা মেয়ে। অন্যজন কাঁচি চালাচ্ছে খচখচ। নুসরত আর রাখি ছোট বলে তাদের চুল কাটাতে নাপিতকে ঢুকতে দেওয়া হয়। বাকি মেয়েরা একে অন্যের চুল কেটে দেয়। তার কোনও ছিরিছাঁদ থাকে না। আনাড়ি হাতে থাকার কথাও নয়। তবু তারমধ্যেই কেউ কেউ কায়দা করে কপালের দু’পাশে চুলের গুছি ঝুলিয়ে রাখে। চুল কাটার সময় খুব মজা ওদের। কারটা কত খারাপ হচ্ছে তাই নিয়েই বোধহয়। এখন তিনটে মেয়ে বাকি দু’জনকে নিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। পরে ওই দু’জন হাসবে।

স্নান সেরে ছোটবাড়িতে চলে এল পরমা। দুপুরের খাওয়ার দেরি আছে এখনও। এসে দেখল, কিছু মেয়ের স্নান হয়ে গিয়েছে। তারা সামনের বারান্দায় বসে সেই একঘেয়ে লুডোই খেলছে। কেউ কেউ আবার লড়াই করছে কে আগে বাথরুমে ঢুকবে।

ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়াতে হল পরমাকে। বিছানাটা নোংরা হয়ে ছিল। পরিষ্কার করার সময় পাচ্ছিল না। এখন দেখল, ধোয়া একটা চাদর টানটান করে পাতা। বালিশের ঢাকনাও বদলানো হয়েছে। পাশে রাখা মশারিটা নেই। কে করল এসব! জুলেখা কোথায়? সে-ই বলতে পারবে। আসুক। চুল খাটের পাশে ঝুলিয়ে দিয়ে পরমা গা ছেড়ে দিল বিছানায়।

চোখ বন্ধ করে কপালের ওপর হাত রেখে শুয়ে ছিল সে। বাইরে মেয়েদের লুডো খেলার হুড়ি শোনা যাচ্ছে। তার মধ্যেও মাথার ভেতরে এসে জড়ো হচ্ছে হাজার ভাবনা। কতদিন বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। বাবাকে দেখেনি কতদিন। কেমন আছে বাবা? কী করছে এখন? দাওয়ায় বসে বিড়ি টানছে? টানলে বুকে হাঁফ ধরে। কতবার বারণ করেছে, শোনেনি। সে যেমন বাবার কথা ভাবছে, বাবাও তেমনই তার কথা ভেবে ভেবে কষ্ট পাচ্ছে নিশ্চয়ই। মনে হতেই চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে জল নেমে যাচ্ছিল বালিশে। আর কোনওদিন কি সে গ্রামে ফিরে যেতে পারবে? ছুঁতে পারবে বাবাকে?

পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৬

গায়ে কেউ নাড়া দিচ্ছে। হাত সরিয়ে দেখল জুলেখা দাঁড়িয়ে। মাথায় গামছা বাঁধা। যাতে দেখা না যায় এভাবে চোখ মুছে নিল পরমা। জিজ্ঞেস করল, ‘চানে গেছিলি?’

‘হ্যাঁ। তোমার চাদর, মশারি সব কেচে মেলে দিয়ে এলাম। ময়লা হইছিল খুব।’

‘তুই করেছিস এসব?’

‘আর কে করবে? তোমারে কে ভালবাসে জান না?’

জুলেখা মাথায় বাঁধা গামছা খুলে ভেজা চুল ঝেড়ে নিল। তারপর জানলার গ্রিলে সেটা ছড়িয়ে দিয়ে ফিরে এসে বসল পরমার পাশে। মনখারাপ উড়ে যাচ্ছিল একটু একটু। অনেক কিছুই ভুলিয়ে দেয় এই মেয়েটা। শুয়ে শুয়েই পরমা বলল, ‘তুই আমাকে ভালবাসিস বুঝি?’

‘বাসব না? তুমি যে মায়ের মতো।’

‘কী বললি তুই!’ উঠে বসল পরমা। তার চেয়ে জুলেখা চার-পাঁচ বছরের বড় তো হবেই। ওর জীবন তো সরলরেখায় চলেনি। অথচ নিজে কত সরল রয়ে গিয়েছে মেয়েটা!

‘আমার মন রাখছিস?’

জুলেখা বলল, ‘না গো আন্টি, তোমারে সত্যিই কেমন যেন মা মা মনে হয়। সবাইরে ভালবাস। কখনও বিরক্ত হও না। অন্য আন্টিদের মতো নও তুমি। তোমার একটা লালপেড়ে শাড়ি আছে না, সেইটা যখন পরো, গা থেকে একটা সোন্দর গন্ধ পাই। এক্কেবারে আমার আম্মির মতো। তোমারই মতো বড় বড় চোখ আম্মির।’

পরমা বলল, ‘তাই বুঝি তোর মায়ের মতো লাগে আমাকে?’

চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল জুলেখা। যে শাড়িটার কথা সে বলছে সেটা সুতপাবউদি দিয়েছিল পরমাকে। তাঁতের, খোলটা খুব মোলায়েম। পরমা জুলেখার চিবুকে হাত দিয়ে মুখটা তুলে ধরল। ‘আমার ওই শাড়িটা তুই নিবি?’

‘না না।’ মাথা ঝাঁকিয়ে দিল জুলেখা। ‘আমি তো বলেছি তোমারে ভাল লাগতেছিল।’

‘সে আমি বুঝেছি। আমার তো নতুন কিছু নেই, পরা জিনিসই দিতে চাইছি। নে না।’

‘না, সে আমি পারব না।’ বলতে বলতে উঠে নিজের বাঙ্কের দিকে চলে যাচ্ছিল জুলেখা। পরমা তাকিয়ে রইল সেদিকে।

হোমে আসার পর একটু একটু করে মেয়েটার কথা জেনেছে সে।

ভাইবোনদের মধ্যে জুলেখাই বড়। বাড়ি বাংলাদেশে। কয়েক কাঠা ধানি জমি আর ছোট একটা মাটির ঘর। সেখানেই থাকত চার ভাইবোন আর বাবা-মা। সংসারের অবস্থা ভাল ছিল না বলে জুলেখা আর তার পরের ভাই পড়তে পায়নি। ছোট ভাই আর বোন পড়ত।

সতেরো বছরে ছেলে দেখে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল জুলেখার। কিন্তু তার রূপ নেই। তাছাড়া গরীব ঘরের মেয়ের জীর্ণ শরীর। তাই বর তাকে পছন্দও করল না। বলল, ‘রূপ নাই— তা না হয় চলে যাবে। বাইরের লোকে তো মুখ দেখতে পাবে না। কিন্তু আমি খুশি হব কীসে? গতরও তো নাই।’

পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৭

তারপর শুরু হল জুলেখার ওপর চাপ। বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনো, নয়তো সেখানেই ফিরে যাও। জুলেখা তার আব্বুজানের কাছে বলতে পারেনি টাকার কথা। সে জানে, সামর্থ থাকলে বিয়ের সময়েই দিয়ে দিত আব্বু।

বর মানেনি কিছুই। একদিন জুলেখাকে নিয়ে গিয়ে রেখে এল বাপের বাড়ি। সাফ কথা, এবার টাকা সমেত মেয়ে না পাঠালে সে আবার বিয়ে করবে।

জুলেখার আব্বু টাকা জোগাড় করতে পারেনি। ওদিকে পাড়াপড়শিরা খোঁচাতে ছাড়ছে না। বিয়ে দেওয়ার পরেও মেয়ে এখানে কেন? আব্বু তাকে ফেরত নিয়ে গেল শ্বশুরবাড়ি। বলেছিল, ‘মেয়েটারে তোমরা রাখো। যত তাড়াতাড়ি পারি টাকা জোগাড় করে দিয়ে যাব।’

দিন, মাস, বছর কেটে গেল। জুলেখার আব্বু আর টাকা নিয়ে ফেরেনি। তাই একদিন আবার বাপের বাড়ি যাওয়ার নাম করে নিয়ে গিয়ে বর তাকে তুলে দিয়েছিল দালালের হাতে। সরল, শান্ত জুলেখা সেদিন কিছুই করতে পারেনি। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথও চিনত না সে।

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮

Comments are closed.