পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মৃত্তিকা মাইতি

    মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ৮

    সর্বাণী মিত্র সরাসরি তাকেই বললেন, ‘প্র‌থম দিকে তোমার কাজে খুশিই হয়েছিলাম আমরা। নিজের মতো থাকতে। কোনও পলিটিক্সে জড়াতে না। এখন কি কাজে মন নেই? না কি ভাল লাগছে না আর? কোনও অসুবিধে থাকলে বলতে পারো। আমরা কাউকে জোর করে রাখি না।’

    কথার মাঝখানে শম্ভুনাথ ঘোষ গম্ভীর গলায় একরকম হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম, এইসব মেয়েদের দিয়ে হবে না। দায়িত্ববোধ নেই, কাজে ফাঁকি মারে। সেদিনই তো দেখলাম অফিস আওয়ারে পিছনের বাগানে ঘুরছিল।’ তারপর তিনি সোজাসুজি পরমাকে বললেন, ‘তোমার যদি না পোষায়, রেজিগনেশন দিয়ে দাও। আমাদের পরিষ্কার কথা, এখানে থাকতে গেলে এখানকার নিয়ম মেনে চলতে হবে। সবসময় মেয়েদের সঙ্গে থাকতে হবে।’

    কেউ দেখতে পাচ্ছে না— পরমা দু’হাতের মুঠো শক্ত করে বসে। চোখের পাতা নামিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে যাতে জল না পড়ে। মিথ্যে অপমান করলে সেই দুঃখ এবং অভিমান কোনওটাই সে সহ্য করতে পারে না। কোনওরকমে নিজেকে আটকে বসে রইল। এখন কথা বলতে গেলেই ঝুরো মাটির মতো খসে পড়ে যাবে।

    মঞ্জরী বললেন, ‘কাজ ফেলে ঘুরে বেড়ায়? এরকম করলে তো চলবে না। সর্বাণীদি, তুমি যা ডিসিশন নেবার নাও, আমার কিছু বলার নেই।’

    পরমা মঞ্জরীদির দিকেও তাকাতে চাইল না। তিনি তো বলেই দিয়েছিলেন হোমে ঢোকার পর আর পরমাকে চিনবেন না।

    ‘সেদিন ও ঘুরছিল ছুটি ছিল বলে। তোমাকে তো আমি বলেছিলাম শম্ভু। পুরনো কথা টেনে আনছ কেন এখানে? আর তারপর থেকে ও ছুটিও নেয়নি কোনও।’

    শুক্লাদির কথায় এতক্ষণে পরমা দেখল তার দিকে। এখনও তার চশমা ঢিলে হয়ে এসেছে। তুলে দিতে পারলে ভাল হত।

    শম্ভুনাথ খানিক বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ‘ও, সেটা বাদ দিচ্ছি তাহলে। কিন্তু কাল যে কাণ্ডটা করল, মেয়েদের একা ছেড়ে ঘুরতে বেরিয়ে গেছিল, তারও কি কোনও কারণ আছে আপনার কাছে শুক্লাদি? প্রীতি, উর্মিলা— এদের তো কাজের ভুল দেখতে পাই না কখনও। কারণ তারা নিজেদের দায়িত্ব বোঝে।’

    এবার রাগ জমা হচ্ছিল পরমার মাথায়। এত কিছু হচ্ছে অথচ প্রীতি নিজের দোষটা স্বীকার করলেই সব মিটে যায়। কিন্তু সে কোনও কথাই বলছে না। ভাবতে ভাবতে তার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হল পরমা। প্রীতিকে এরকম ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন? এমনিতে ও ফর্সা, তার ওপর আরও সাদা লাগছে। কী হয়েছে? শরীর খারাপ না কি?

    শুক্লা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, ‘পরমার কাজে কখনও ভুল দেখা যায়নি শম্ভু। তাও কোনও ঘটনা যদি ঘটে গিয়ে থাকে তাহলে ওকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। অন্তত আমার তাই মত। তুমি কী বল সর্বাণী?’

    সবাই সর্বাণী মিত্রর দিকে দেখল কিন্তু কারও কিছু বলার সাহস নেই। সঞ্চিতা আর অপির্তাকে দেখে পরমার মনে হল তারা যেন মিনতির চোখে তাকিয়ে রয়েছে সর্বাণীদির মুখে। যদিও পরমা একটা কথা বুঝতে পারছিল না। শুক্লাদিও তো জানতেন কালকের ঘটনা কেন ঘটেছে, তবু কিছু বললেন না কেন?

    এবার ঈশিতা মুখ খুললেন। বললেন, ‘এত মেয়ে, কার মনে কী ঘুরছে, কখন কী ঘটাবে তা তো বোঝা মুশকিল। হোম-মাদারদেরও দোষ দেওয়া চলে না।’

    সর্বাণী একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, যা হওয়ার হয়ে গেছে। আগেই বলে দিয়েছি, এই খবর যেন বাইরে না বেরোয়। নবনীতাদি ফোনে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কোনওরকম গণ্ডগোল চান না।’ তারপর পরমার দিকে দেখলেন তিনি। ‘এটা তোমার প্র‌থম ভুল বলে একটা সুযোগ দিচ্ছি। এরকম যেন আর না ঘটে। মন দিয়ে কাজ করো। যাও, সবাই কাজে যাও। মিটিং শেষ।’

    রিনি আর অনু উঠে গিয়ে বসল তাদের টেবিলে। অপির্তা চলে যাচ্ছিল গেটে। পরমা আর সঞ্চিতাও বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। সঞ্চিতা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় শুক্লা এগিয়ে এসে পরমার হাতদুটো চেপে ধরলেন। ‘সকলকে নিয়ে চলতে গেলে কখনও কখনও চুপ করে থাকতে হয়। না হলে গোলমাল আরও বাড়ে। আমি কী বলতে চাইছি আশা করি তুমি বুঝেছ। মনে কোনও ক্ষোভ রেখো না।’ কথাটা বলেই তিনি আবার ফিরে যাচ্ছিলেন অফিসে।

    ওরা দুজন হাঁটতে শুরু করল। উর্মিলা চলে গেল ছোটবাড়িতে খাবার দিতে। মিটিং বসেছিল বারোটায়। তারপর অনেক সময় পেরিয়ে গিয়েছে। মেয়েরা দুপুরের খাবার পায়নি এখনও

    পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ১

    সঞ্চিতা পরমাকে টেনে দাঁড় করাল রান্নাঘরের সামনে। ‘দেখলে, প্রীতিদিকে নিয়ে কেউ কিছু বলল? সবাই কিন্তু জানে দোষটা কার। এরকম সহ্য হয় বলো?’

    পরমা বলল, ‘আমি আর কী বলতাম। শুক্লাদির কথা তো শুনলে।’

    ‘ওর ওই দোষ, কখন কার হয়ে কথা বলেন তার ঠিক নেই। বললেন তোমার হয়ে কিন্তু প্রীতিদির দোষটা চেপে রেখে। তাও বললেন এইজন্য যে উনিই তো তোমায় সেদিন স্কুলঘরের ডিউটিটা দিয়েছিলেন। সেটা আবার যদি সামনে এসে পড়ে!’

    পরমা বলল, ‘বাদ দাও। চলো, বড়বাড়ির মেয়েদের খাবার দিই।’

    দু’জনে এগিয়ে যাচ্ছিল। দেখতে পেল প্রীতি অফিস থেকে বেরিয়ে তাদের দিকেই আসছে। একেবারে সামনে এসে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও পরমা। মিটিংয়ে সবার সামনে কিছু বলতে পারিনি।’

    সঞ্চিতা রেগেই ছিল। এবার সুযোগ পেয়ে বলল, ‘তাহলে এখন আর কাঁদুনি গেয়ে কী লাভ?’

    পরমার মনে হচ্ছিল এখানে এখন অন্য কেউ নেই, এবার সঞ্চিতা প্রীতিকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেবে। সে বলল, ‘সঞ্চিতা, তুমি গিয়ে মেয়েদের খেতে দিতে শুরু করো, আমি যাচ্ছি।’

    প্রীতি আরও কী বলে তা শোনার জন্যে দাঁড়াতে চাইছিল সঞ্চিতা কিন্তু বেলা হয়ে গিয়েছে, যেতেই হল তাকে।

    পাশের জাম গাছটার কাছে পরমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রীতি বলল, ‘আমি বাধ্য হয়ে চুপ করে আছি গো, বিশ্বাস করো। এখন যদি কোনও কারণে চাকরিটা চলে যায়, কোথায় গিয়ে থাকব? ভয়ে তাই কিছু বলতে পারিনি। আবীর বলেছে আর কিছুদিনের মধ্যেই ও আমাকে বিয়ে করতে পারবে। ততদিনে আমার ডিভোর্সটাও হয়ে যাবে। আর কোনও বাধা থাকবে না। এখানে অন্যের মন জুগিয়ে আর পেরে উঠছি না। এবার থিতু হতে চাই। যতদিন না বিয়েটা হচ্ছে, আমাকে তো এখানেই থাকতে হবে, বলো?’

    আবেগ দেখাতে গিয়ে তুই থেকে তুমিতে চলে এসেছে প্রীতি। তার কতটা সত্যি তা জানতে চায় না পরমা। তবু সে বুঝতে চাইছিল প্রীতির কথা। এতদিনেও অল্পই জেনেছে। বলল, ‘তোমার মেয়ে তখন কার কাছে থাকবে? আবীরদা কি মেয়েকে মেনে নেবে?’

    প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আবীর আমার কাছে ওর নিজের একটা বাচ্চা চায়।’

    ‘তাহলে তোমার মেয়ের কী হবে?’

    ‘মেয়ে ওর দাদু-দিদার কাছে থাকবে। বাবা-মাও নাতনিকে ছেড়ে থাকতে পারে না। ছোট্ট থেকে ওদের কাছেই মানুষ। মাইনে থেকে কিছু টাকা পাঠানো ছাড়া মেয়ের প্র‌তি আর কোনও কর্তব্য করতে পারি না আমি। মেয়েও বলে দিয়েছে, দাদু-দিদাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।’

    ‘এখন কত বয়েস ওর?’

    ‘এই তো নয় চলছে।’

    ‘তাহলে তো অনেক কিছুই বোঝে।’

    ‘হ্যাঁ, তার মায়ের কষ্টও বোঝে সে।’

    ‘তোমার বাবা-মা বারণ করছেন না? মেয়েকে তাদের কাছে রেখে তুমি অন্য একটা জীবনে ঢুকতে চাইছ!’

    ‘একা আছি, তাতেই তারা বেশি কষ্ট পাচ্ছে। বলেই দিয়েছে, যার সঙ্গে সুখে থাকবে বলে মনে করছ, তার সঙ্গেই থাকো। মেয়ের চিন্তা করতে হবে না, ওকে আমরা মানুষ করব।’

    পরমা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার আর ভাই-বোন নেই?’

    ‘না রে, বাবা-মায়ের আমি একটিই।’

    ‘বরের সঙ্গে ঠিক কী নিয়ে ছাড়াছাড়ি হল তোমার?’ সাহস করেই জানতে চাইল পরমা।

    পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ২

    শ্বাস ছেড়ে মুখ নামিয়ে প্রীতি বলল, ‘মনের মিল হচ্ছিল না। আমার সাজগোজ, ঘোরাঘুরি তার পছন্দ নয়। সন্দেহও করে। তার পরেও থাকছিলাম। কিন্তু কত দিন থাকা যায়? মেয়ে হওয়ার পর দূরত্ব আরও বেড়ে গেল। সে চাইছিল ছেলে, কিন্তু হল মেয়ে। এতে তো আমার কোনও হাত নেই, বল?’ মুখ তুলল প্রীতি। ‘মেয়ে নিয়ে চলে এলাম বাপের বাড়ি। কিছুদিনেই বুঝে গেলাম, সম্পর্কটা থেকে দু’জনেই একেবারে সরে গেছি। অথচ দ্যাখ, পছন্দ করেই বিয়ে করেছিলাম, বাবা-মা’র অমতে। তাদের কষ্ট দিয়ে।’

    পরমা বলল, ‘এখনও তো পছন্দ করেই করতে চাইছ।’

    ‘হ্যাঁ, তা চাইছি। ওই ঘটনার পর ভেবেছিলাম জীবন বুঝি শেষ। কিন্তু তারপর আবীর এল। ওর মধ্যে আলাদা একটা রোমান্স আছে জানিস। আমাকে সবরকমভাবে সুখী করে। এতটাই ভালবাসে যে নিজের বাবা-মা’র বিরুদ্ধে গিয়ে বউকে ছেড়ে চলে আসছে শুধু আমার জন্য।’

    চমকে উঠল পরমা। ‘আবীরদা বিবাহিত! বউ আছে জেনেও তুমি তাকে বিয়ের জন্য তৈরি হচ্ছ?’

    ‘আরে বউটা আবীরকে সুখী করতে পারে না। তারও নাকি কার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। আবীর আমার সঙ্গে একটা সুন্দর সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখছে।’

    ‘কী জানি প্রীতিদি, কোন জটিল সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়েছ নিজেকে। শুনে ভয় ভয় করছে। ভাল করে ভেবে নিয়ো। একবার ঘা খেয়েছ, আবার কিছু ঘটলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’

    ‘ও নিয়ে তুই ভাবিস না। আবীর আমাকে খুব ভালবাসে।’ বলেই প্রীতি কথাটা শেষ করে দিল। ‘অনেক বেলা হয়ে গেছে। চল যাই। দু’জনে এতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে গল্প করছি, কেউ দেখতে পেলে আজকেই হয়তো গেটের বাইরে করে দেবে।’

    পরমা বলল, ‘তুমি যাও, আমি যাচ্ছি।’

    ‘আয়, আয়।’ বলে তড়বড়িয়ে খাওয়ার ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল প্রীতি।

    তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল পরমা। ডিভোর্স হওয়ার আগেই শাঁখা-সিঁদুর সব ফেলে দিয়েছে প্রীতি। পরমা তো  কিছুই ছাড়তে পারেনি এখনও। কিন্তু সে পরেই বা থাকে কেন? দেখানোর জন্য? এসব তো তার পরিচয় নয় আর। হোম-মাদারদের খাতায় লেখা আছে— পরমা সরকার। তার আগের নাম। পরের জীবনটা বয়ে বেড়িয়ে কী লাভ? প্রীতিই  কি ঠিক করেছে তাহলে? এই মেয়েটার ধরন আসলে কী? এত প্র‌শ্ন মাথায় এসে ভিড় করেছে যে ভাবনার খেই হারিয়ে ফেলছে সে। প্রীতি কি ঠিকঠাক ভাবছে সব? বরকে ছেড়ে চলে এসেছে। বাবা-মা, মেয়েকে ফেলে আবারও চলে যাবে। কার কাছে? এমন একজন মানুষ যে নিজেও তার বাবা-মা, স্ত্রী— কারও হতে পারেনি। সে-ই কিনা প্রীতিকে সুখী করবে!  সত্যি কি জীবনে সুখী হবে প্রীতি?

     

    ফোর্থ স্যাটারডে হোমের অফিস ছুটি থাকে। বিশেষ দরকার না পড়লে স্টাফরা কেউ আসে না। মাসের শেষ শনিবার মেয়েদের কাছে উৎসবের দিন। হোম-মাদাররাও অপেক্ষায় থাকে। রবিবারগুলো বাদ দিলে এই আর একটা দিন তারা ছুটি পায়। না হলে তো এখানে কাজ থাকুক না থাকুক, শিরদাঁড়া শক্ত করে থাকতে হয়।

    সকাল থেকেই মেয়েদের হল্লা চলছে। হোম-মাদারদের কাজ ভাগ করে নিয়েছে দু’বাড়ির পাঁচ মনিটর মেয়ে। সকালের চা দেওয়া দিয়ে শুরু করেছে। দুপুরের রান্না কী হবে তাও তারাই বুঝিয়ে দিয়েছে সবিতামাসিকে। বাকি মেয়েদের সবাইকে অবশ্য বাইরে ছাড়া যায় না। কাজের জন্য যাদের দরকার তারাই বেরোতে পারে। সেই মেয়েরা হোম পরিষ্কার করে। ঘরের ভেতরের ঝুল ঝাড়া, বাইরে ঝাড়ু লাগানো, মরা ঘাস উপড়ে সাফ করা। তার সঙ্গে আছে কাচাকাচি, জামাকাপড় কড়কড়ে করে শুকিয়ে নেওয়া। শীত আসার মুখে মুখে একপ্র‌স্থ লেপ-কম্বল রোদে পড়েছিল। এখনও তার কিছু কিছু রোদ খাচ্ছে। শংকরও আজ পুকুরে চুন দেবে, পাড়ের আগাছা তুলবে।

    পরমা আর একটু বেলায় উঠবে ভেবেছিল কিন্তু মেয়েদের চেঁচামেচিতে থাকা যাচ্ছিল না। ছোটবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল সে। গায়ে নাইটি, তার ওপর হাউসকোটটা চাপিয়ে নিয়েছে। সকালবেলা তাড়াহুড়ো করে স্নান সেরে তৈরি থাকতে হবে না আজ। ভেবেই আরাম হল। রান্নাঘরে চলে গেল সে। উর্মিলা কেমন ঢিলে দিয়ে বসে আছে সেখানে। তার পাশে বসে কয়েকটা মেয়ে আদা-পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াচ্ছে, সেদ্ধ করা আলুর খোসাও। পরমা সবিতাকে বলল, ‘কী গো মাসি, টিফিনে কী হচ্ছে?’

    মাসি হেসে বলল, ‘কেন, আজ যা হয়। ফেনাভাত আর আলুসেদ্ধ, সাথে ঘি।’

    পরমা জানে কী হচ্ছে, তবু শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিল। মনটা কেমন করে ওঠে তার। গ্রামের কথা ভেসে আসে। দেশের মানুষ তো তিনবেলাই ভাত খায়। সেও খেত। যখন লোকের বাড়ি কাজ করতে চলে এসেছিল তখন একবার ভাত পেত। শহরের লোকেরা বেশিরভাগ একবেলাই ভাত খায়। তারও তাই বরাদ্দ ছিল। হোমে আসার পর সেটা বেড়ে দু’বার হয়েছে। রোজ এত মেয়ের জন্য রুটি করা সম্ভব নয় বলে রাতেও ভাত হয়। সকালের টিফিনে মুড়ি-ঘুগনি থাকে। কখনও শুধু চা আর মুড়ি। পাঁউরুটি অথবা চাউমিনও হয়ে যায় এক-আধ দিন। কিন্তু জলখাবারে গরম গরম ফেনাভাতের সঙ্গে আলুসেদ্ধ, সে মাসে একবারই। মন তখন আনন্দে নেচে ওঠে। পরমা ভাবল, সকালের চা দিয়েই আনন্দটা ধরা যাক। উর্মিলাকে বলল, ‘চা খেয়েছ?’

    ‘হ্যাঁ রে খেয়েছি। তুই তো জানিস, ঘুম ছাড়ানোর জন্য সকালে আমার চায়ের দরকার পড়ে আগে।’

    ‘তাহলে যাই, গেটে গিয়ে চা খেয়ে আসি।’

    ‘যা, ওদের যতবারই খাওয়াস কেন, না নেই। বরং খুশি হবে নিয়ে গেছিস বলে।’

    পড়ুন পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৩

    পরমা চলে গেল গেটে। সেখানে সঞ্চিতাও ঘাঁটি গেড়েছে। তারও স্নান হয়নি। নাইটির ওপর একটা সোয়েটার নিয়ে চলে এসেছে। অর্পিতাও আছে। তবে কী শনি কী সোম, সকালে স্নান তার অভ্যেস। রোজকার মতো শার্ট-প্যান্ট পরে ফুলবাবুটি হয়ে বসেছে।

    পরমা বলল, ‘সঞ্চিতা, তুমিও এখানে!’ তার কথায় সঞ্চিতা লজ্জা পেল বলে মনে হচ্ছে। ও, এখানে রাজীব রয়েছে, তাই। রাজীবের জন্যই তো এসেছে সঞ্চিতা। খানিকটা অভিমানের সুরে পরমা এবার বলল, ‘আমাকে ফেলে তোমরা সবাই চা খেয়ে নিলে!’

    অর্পিতা বলল, ‘ঢেলে দে না এক কাপ করে, তোর সঙ্গেও খাচ্ছি।’

    কাপগুলো ওদের কাছেই রাখা। চায়ের কেটলি নিয়েই এসেছিল পরমা। ঢেলে দিল। বিস্কুটের প্যাকেট খুলে রাখল পাশে। হোমে এই দুটো জিনিস অফুরন্ত। যে যত খুশি খেতে পারে। অফিসের দিনে বড় কেটলি করে রাখা থাকে। যার দরকার হয়, ঢেলে নেয়।

    টেবিল থেকে খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল পরমা।

    এই সময় সঞ্চিতা কাপ হাতে উদাস গলায় বলল, ‘ভাবলে কী অদ্ভুত লাগে, না? আমাদের সঙ্গে বাইরের লোকেদের কোনও সম্পর্ক নেই, না তাদের সঙ্গে আমাদের কোনও যোগাযোগ আছে।’ সে যেন কথাগুলো হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছিল, ‘আমরা এই পাঁচিল ঘেরা জায়গাটায় লুকোচুরি খেলছি। কেউ খুঁজে বারই করতে পারবে না কোনওদিন। আরও বেশি মনে হয় ছুটি থাকলে। সারাদিনে কারও আসার থাকে না। মানুষদের থেকে অনেক দূরে আমরা!’

    অর্পিতা আর রাজীব হাঁ হয়ে তার কথা শুনছিল। পরমা অবাক হল না, কেননা অনেক সময় তারও এরকম মনে হয়। সে সঞ্চিতার চোখদুটো লক্ষ করছিল। তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার দৃষ্টি এখানে নেই।

    যেন সঞ্চিতার কথায় তার ভেতরেও ব্যাপারটা উঠে এসেছে এভাবে অর্পিতা মাথা নাড়ল। ‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আজ তো আবার দিদিমণিরাও কেউ আসে না। সব ঘরেই তালা ঝুলছে। আর মেয়েদের দ্যাখ, কোনও কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই। একটা হুজুগ পেলেই সময় কেটে যায় ওদের।’

    জামাকাপড় কেচে বাইরের দড়িতে মেলে দিচ্ছিল মেয়েরা। বিছানার চাদর, তোশক, বালিশের ঢাকনা, বালিশ— সব রোদে পড়েছে। কারও কারও সোয়েটার কিংবা চাদর আগে থেকেই ছিল। এখানে আসার সময় নিয়ে এসেছে। যাদের নেই তাদের দেওয়া হয়। সেসবও রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে রং-বেরঙের জামাকাপড়ের মেলা বসেছে।

    পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

    এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

    অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

     

    মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

    আগের পর্ব

    পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭

    আরও পড়ুন:

    পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৪

    পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৫ 

    পাখিঘর উপন্যাস পর্ব ৬

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More