পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মৃত্তিকা মাইতি

    মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ৭

    হোমে যখন এসেছিল তখন মণি নিজের মনে কথা বলত শুধু। তারপর সেটাই পাগলামি হয়ে দেখা দিতে লাগল। সবাই বলে একটু একটু করে এখন পুরো পাগল হয়ে গিয়েছে। গায়ে ময়লা একটা চুড়িদার, মাথার চুল জট পাকিয়ে একশা। কাছে গেলেই দেখা যায় বিজবিজ করছে বাচ্চা-বুড়ি সব উকুন। মাথাটাকে পুরো ঝাঁজরা করে দিচ্ছে। খসে খসে গায়েও কিছু পড়ে নিশ্চয়ই। তবে মণির তাতে কিছু আসে-যায় না। দিন-রাত মাথাটার ভেতরে যা যুদ্ধ চলছে তা সে অনুভবই করে না হয়তো, বা করলেও বলতে পারে না। এক পায়ে চটি পরে ঘোরে। ছেঁড়াটা তার হাতেই থাকে সবসময়। এখানকার মেয়েদের মধ্যে অনেকটা বড়ই হবে মণি। যদিও দরকার পড়লে তাকে সকলেই নাম ধরে ডাকে। পাগলদের আর কে কোনকালে দাদা-দিদি বলেছে! এমনিতে শান্ত থাকে মণি। কিন্তু রেগে গেলে রক্ষে নেই। গালাগালি করে, ধারেকাছে কাউকে ঘেঁষতেই দেয় না। গেলে কামড়াতে আসে নয়তো হাতের সামনে যা পায় ছুড়ে মারে। এই মণিকেই আবার দু’বেলা ওষুধ খাওয়াতে হয় পরমাকে।

    পরমা ভাবছিল, মণি তাকে মারল কেন? হতে পারে সে এসে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। পরমা তার দিকে খেয়াল করেনি বলে রেগে গিয়েছিল। কিন্তু মণির কি হয় এরকম?

    ওই দেখা যাচ্ছে— মণি এখন হাঁসগুলোর পিছনে পড়েছে পুকুরপাড়ে। ওগুলোরও আবার খুব তেজ। মাঝেমধ্যে তেড়ে আসে। নতুন এসে পরমাও ওদের তাড়া খেয়েছিল একবার।

    এ সময় পরমার চোখ গেল ছোটবাড়ির দিকে। ও কী! সবাই দৌড়চ্ছে কেন? কী আবার হল ওখানে! সে দিদিমণিকে বলল, ‘দেখবেন দিদি, মেয়েরা ঘরের বাইরে যেন না বেরোয়, আমি আসছি কিছুক্ষণের মধ্যে।’

    ছোটবাড়িতে পৌঁছে পরমা দেখল তুমুল হইচই চলছে। পায়েল একটা ঘরের মধ্যে একা ঢুকেছিল। ছিটকিনি দিয়ে রেখেছে। ঈশিতাদি আর অন্য মেয়েরা দরজা পেটাচ্ছে। অফিস থেকে সর্বাণীদিও এসে পড়েছেন। তিনি বললেন, ‘এক্ষুনি শংকরকে ডাকো, দরজা ভাঙতে হবে।’

    শংকরের সঙ্গে অফিস স্টাফ মৈনাকও এসে পড়েছিলেন। দু’জনের বারবার ধাক্কায় দরজা খুলে গেল। অন্য কয়েকজনের সঙ্গে পরমাও ভেতরে ঢুকে যা দেখল তাতে মাথা ঘুরতে লাগল তার। পায়েল সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। গলায় ওড়না জড়ানো।

    মৈনাক ততক্ষণে তার পা-দুটো ওপর দিকে তুলে ধরেছেন। শংকর টুলে চড়ে ফ্যান থেকে ওড়নাটা আলগা করতে পারল। প্যাঁচ খুললে দেখা গেল পায়েলের গলায় লাল হয়ে দাগ বসে গিয়েছে। শ্বাস চলছে ধীরে ধীরে।

    ছোটবাড়ির পিছনের ডাক্তারখানা থেকে ডাক্তার চলে এসেছেন। পায়েলের কবজিতে খানিকক্ষণ আঙুল চেপে রেখে তিনি বললেন, ‘তাড়াতাড়ি এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়াতে হবে। ফ্যান চালিয়ে দিন, শ্বাস নিতে কষ্ট যেন না হয়।’

    যে ফ্যানে পায়েল একটু আগে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করেছিল সেটাই ঘুরতে শুরু করে হাওয়া ছড়াতে লাগল। কিন্তু বাকি মেয়েগুলো এত ভয় পেয়ে গিয়েছে যে তাদের মধ্যে একজন তারপরেও কোথা থেকে একটা হাতপাখা এনে সেটা দিয়েও হাওয়া করতে শুরু করল।

    আস্তে আস্তে চোখ খুলল পায়েলের। উর্মিলা দুধ নিয়ে এসেছে। খাওয়ানো হল তাকে।

    ডাক্তার গুহ বললেন, ‘ওকে শুইয়ে দিন এবার। পরে একটা ওষুধ দিচ্ছি। বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে। ভাগ্য ভাল যে দরজাটা খুলে ফেলতে পেরেছেন। আর খানিকক্ষণ ঝুলে থাকলেই কিছু করা যেত না।’

    এতক্ষণ পরমা নড়তে পারেনি। ঘরের একপাশে বসে ছিল। মনে হচ্ছে কোমরের কাছ থেকে শরীরের বাকিটা নেই। কী দুঃসাহস এইসব মেয়ের! এতবড় একটা কাণ্ড করার আগে ভয় করেনি ওর!

    গত মাসেই তো ব্লেড দিয়ে হাত কেটে ফালা ফালা করে নিয়েছিল এই পায়েল। হোম-মাদাররা জানতে চাইলে বলেছিল, ‘এখানে আমি থাকব না। কেউ ভালবাসে না আমাদের। সারাদিন ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রাখা হয়, ঠিক করে খাওয়াদাওয়া পাই না, কেন থাকব?’

    শুধু এতেই শেষ নয়। সর্বাণী মিত্রকে অবধি শাসিয়েছিল সে। সরকারি কোনও অফিসার যদি হোমে আসে তাহলে তার কাছে নালিশ করবে— এখানে তারা ভাল নেই।

    যখনই কোনও মেয়ে এরকম কাণ্ড ঘটায় তখনই সর্বাণীদি ভয় পেয়ে গিয়ে তাকে কিছু সুযোগসুবিধে করে দেন। সে বাইরে বেশিক্ষণ থাকতে পারে। দোকান থেকে তার পছন্দের খাবার আসে আলাদা করে। চাইলে সাজগোজের জিনিসও আনিয়ে নিতে পারে। পায়েল তো সেইরকম কিছু সুযোগ পাচ্ছিল। তাহলে আবার এর মধ্যে হল কী?

    পরমা শুনেছে, সরকারি কেউ নাকি হোমের কাজকর্ম দেখতে আসেন কখনও। এসে সরাসরি মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেন। জানতে চান তারা কেমন আছে এখানে? তখন যদি কোনও বেফাঁস কথা বেরিয়ে আসে তাহলে ওপরমহলকেই তার কৈফিয়ত দিতে হবে। তবে এখনও তেমন কাউকে চোখে দেখেনি সে। ইন্সপেকশনে কারও আসার কথা জানতে পেরেছে না কি মেয়েরা? কই, হোম-মাদারদের কাছে তো এরকম কোনও খবর নেই।

    পায়েল তার বাঙ্কে চোখ বন্ধ করে শুয়ে। অন্য বাঙ্ক থেকে কয়েকটা মেয়ে সেদিকে জুলজুল করে তাকিয়ে বসে আছে। কে জানে, আবার যদি কিছু ঘটে! পরমাও বসে ছিল। একজন এসে খবর দিল, ‘বাইরে সর্বাণীদি ডাকছেন।’ পরমার এতক্ষণে মনে পড়ল, প্র‌ীতি তো নেই। মনে হয় সে এখনও ফিরতে পারেনি। কী হবে এবার?

    বাইরে এসে যদিও দেখল সঞ্চিতা, উর্মিলা, প্র‌ীতি, অর্পিতা সবাই রয়েছে। অফিস স্টাফরাও অনেকে দাঁড়িয়ে। অন্য দিন এরকম হলেই পরমার মনে হয়, সবাইকে দাঁড় করিয়েছে— এবার স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং শুরু হবে। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ছোটখাটো কথা সেরে নেন সর্বাণীদি। সেই মিটিংয়ের এমনই একটা নাম দিয়েছে পরমা মনে মনে। আজ অবশ্য কথাটা ভেবেও পরমা হাসতে পারল না। ঠোঁট খোলা চলবে না এখন। সে চোখের ইশারায় প্র‌ীতির কাছে জানতে চাইল— কখন এলে? প্র‌ীতিও ইশারায় দেখাল অর্পিতাকে। পরমা বুঝে গেল, অপির্তাদি ফোন করে ডেকে নিয়েছে।

    সর্বাণী মিত্র আঙুল তুলে বললেন, ‘এই খবর যেন কোনওভাবেই বাইরে লিক না হয়। তাহলে আমাকে নিয়ে টানাটানি হবে। সেটা হলে কিন্তু সবার বিপদ। মনে থাকে যেন।’

    হোম-ইনচার্জের গলায় শাসানির সুর টের পাচ্ছিল পরমা। এরকম করে বলছেন কেন সর্বাণীদি!

    এই সময় শুক্লা বললেন, ‘মেয়েদের কেউ যদি বলে দেয়!’

    ‘ওদের নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না, আমি সামলে নেব।’

    কথা শুনে সবাই বুঝে গেল হোম-ইনচার্জ রেগে আছেন।

    ঈশিতাকে সর্বাণী জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি প্রেজেন্ট থাকতে এরকম একটা ঘটনা ঘটল কী করে?’

    ‘আমি মেয়েদের নিয়ে বাইরে বসে ছিলাম। কেউ একজন এসে খবর দিল পায়েল দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।’

    ছুটকি বলে একটি মেয়ে হাত তুলল, ‘আমি খবর দিয়েছি আন্টি।’ সে জানে, এইরকম ব্যাপারে সাহায্য করার কথা জানলে সর্বাণী আন্টি আলাদা চোখে দেখেন। কিছু বখশিসও দেন।

    বিরক্তির সঙ্গে সর্বাণী বললেন, ‘মেয়েরা এসে খবর দিচ্ছে! এই বাড়ির দায়িত্বে কে ছিল?’ সকলেই চুপ। এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। পরমা বলতে পারছে না প্র‌ীতির নাম। এখানে যদি বলে দেয় তাহলে যাচ্ছেতাইভাবে অপমানিত হবে প্র‌ীতি। সে মুখ বুজে রইল। পরে শুক্লাদিকে বললেই হবে। কিন্তু ভাবতে ভাবতেই যা শুনতে পেল তা ঠিক বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার।

    গলা নামিয়ে প্র‌ীতি বলছে, ‘দিদি, পরমা ছিল দায়িত্বে।’

    কথাটা শুনে মনে হল পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে। খাদে পড়ে যাওয়া থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না তাকে। এটা কী করল প্র‌ীতিদি? নিজেকে বাঁচাতে মিথ্যে কথা বলছে? রাগে পরমার ইচ্ছে হল চিৎকার করে ওঠে। তবু সে মাথা ঠান্ডা রাখল। দেখা যাক কী হয়।

    এবার সর্বাণী চোখ লাল করে পরমার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘কী করছিলে তুমি? এতটা ইরেসপন্সেবল কী করে হতে পার? একটা বড় কিছু ঘটে গেলে তার দায় কে নিত?’

    পরমা শুধু বলতে পারল, ‘দিদি, আমার ডিউটি স্কুলঘরে ছিল।’

    ‘আবার কথা বলছ তুমি! লজ্জায় তো কিছু বলাই উচিত নয় তোমার।’

    চোখে জল এসে গিয়েছে পরমার। কোনওরকমে আটকে নিয়ে শুক্লাদির দিকে দেখল। তিনি ইশারায় সর্বাণীদিকে থামালেন কিন্তু জানালেন না যে পরমার কোনও দোষ নেই।

    সর্বাণী বললেন, ‘সামনের মিটিংয়ে তোমরা সবাই উপস্থিত থাকবে।’ তারপর তাকালেন ছুটকির দিকে। ‘তুমি আমার সঙ্গে অফিসে এসো।’ বলেই ধুপধাপ করে পা ফেলে সেদিকে চলে যাচ্ছিলেন তিনি।

     

    আজ সপ্তাহের মিটিং। অফিস স্টাফরা সবাই এসেছে। অন্য কোনওদিন কামাই করলেও মিটিংয়ে হাজির থাকতে হয় সকলেই। হোম-মাদাররাও হাতের কাজ রেখে দু’বাড়িতে তালা লাগিয়ে চলে এসেছে। এ সময় মনিটর মেয়েদেরও বাইরে রাখার নিয়ম নেই।

    খাঁ খাঁ করছে হোমের ভেতরটা। দুটো রাজহাঁস ডাঙায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গী মণি পাগলি। গেটে একা সিকিউরিটির রাজীব। এখন হঠাৎ কেউ হোমে এলে তার মনে হতে পারে কোনও নিষ্প্রাণ জায়গায় এসে পড়েছে। বুঝতেই পারবে না এত মানুষের বাস এখানে। যত গুঞ্জন সব বড়বাড়ির অফিস ঘরের লোকজনের মধ্যে।

    লম্বা চৌকো টেবিলের এ মাথা আর ও মাথায় ভারী চেয়ার। একটায় বসেছেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজার শম্ভুনাথ ঘোষ, অন্যটায় হোম-ইনচার্জ সর্বাণী মিত্র। টেবিলের দু’পাশে মুখোমুখি বসেছে স্টাফ মেম্বার আর হোম-মাদাররা।

    সাধারণত মিটিং হয় প্রত্যেক শুক্রবার। মূল বিষয় থাকে হোম। মেয়েদের কীভাবে ভাল করা যায়, নিয়মের কিছু পালটে দিয়ে অন্য কোনও নিয়ম চালু করা যায় কিনা, মেয়েদের আচরণ বদলানোর সহজ উপায় কী— এইসব আলোচনাই চলে। তাতে হোম-মাদারদের কখনও ডাকা হয়, কখনও হয় না। তাদের নিয়ে বসা হয় মাসে একবার। সমস্যা জানার জন্যে।

    এখানে আসার আগে সঞ্চিতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল পরমার। সে বলল, ‘যারা উঁচুতে রয়েছে তারা কিন্তু কারও মাথা মোড়াতে পারে আজ। দোষ তোমার না থাকলেও আমি জানি মিটিংয়ে কী হবে। তুমি আসার আগে আমার সঙ্গেও এরকম হয়েছে। আমরা তো আর অন্যের মতো শম্ভুনাথ আর মৈনাকের গায়ে ঢলে ঢলে পড়তে পারি না, তাই অন্যের দোষও আমাদের গায়ে এসে পড়ে। সিনিয়রদের মুখের ওপর কিছু বলতেও পারবে না, সেসব তাদের সহ্যের বাইরে।’

    পরমা বুঝতে পারছিল সঞ্চিতার ইঙ্গিত প্র‌ীতি আর উর্মিলার দিকে। কিন্তু ওসব শোনার ইচ্ছে নেই তার। তাই বলল, ‘নবনীতাদির সঙ্গে কথা বলতে পারি না আমরা?’

    চমকে উঠল সঞ্চিতা। ‘ওরে বাবা, কার নাম করলে তুমি! তিনি কি হোমে আসেন, না আমাদের সঙ্গে কথা বলেন? চেনেনই না। কতজন হোম-মাদার আছে তা জানেন নাকি! কে আসছে, কে যাচ্ছে, তা নিয়ে ওর মাথাব্যথা নেই। সব ভার সর্বাণীর ওপর ছেড়ে রেখেছেন।’

    পরমা হেসে ফেলল। সঞ্চিতা এতটাই রেগে আছে যে সর্বাণীদির নাম ধরে বলছে।

    ‘হাসছ তুমি! কোনওদিন দেখেছ নবনীতাদি মিটিংয়ে এসেছেন? তিন-চার মাসে একবার করে দামি গাড়ি চেপে বেড়াতে আসেন।’

    পরমা বলল, ‘সে ওর গাড়ি আছে তাই নিয়ে আসেন। তোমার হলে তুমিও ঘুরো।’

    সঞ্চিতা আরও চটে গেল। ‘আমাদের কপাল সেরকম নয়। মেয়েরা ঠিকঠাক খেতে পায় না, জামাকাপড় পায় না, হোম-মাদারদের যা মাইনে পাওয়ার কথা তা তারা পায় না কিন্তু নবনীতা দত্তর কুকুরগুলোও এসি গাড়ি করে ঘোরে।’

    পরমা বলল, ‘কাজে জয়েন করার আগে সর্বাণীদি বলে দিয়েছিলেন মাইনে কত হবে। সেটা তো আমি পাই, কিন্তু প্রতিমাসে ভাউচারে সই করার সময় দেখি সেখানে বেশি টাকা লেখা রয়েছে। অন্তত আমার তো তাই।’

    সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল সঞ্চিতা। ‘তোমার একার নয়, আমারও। এভাবেই চলছে। কোনও কথা তুললে চাকরি বাঁচাতে পারবে না। সর্বাণীদি বলেছিলেন কাজ দেখে পরে মাইনে বাড়বে। তুমি না হয় দু-তিন মাস এসেছ, আমার তো এক বছর হয়ে গেল, বেড়েছে কি? ওদিকে প্র‌ীতিদি আর উর্মিলাদিকে দ্যাখো, ওদের মাইনেও বাড়ে, এক্সট্রা টাকাও পায়। এগুলো একচোখামি নয়? তবে ওদের ভাউচারেও কিন্তু টাকা বেশি লেখা থাকে।’

    পরমা বলল, ‘আমরা তো আমাদের মাইনে নিয়ে ভাবছি। মেয়েরা ভাল খেতে পায় না, জামাকাপড় পায় না, সে কথা তো কেউ বলে না। তবু তুমি বললে। আমাকে তো শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছিল, খাবার যা দেওয়ার, একবারই দেওয়া যাবে। ফিরে কেউ চাইলে দেওয়ার নিয়ম নেই।’

    মাথা নাড়ল সঞ্চিতা। হোম-মাদারদের সকলকেই তেমন বলা আছে। সেইজন্যই মেয়েদের কেউ আধপেটা থাকলেও আমাদের কিছু করার নেই।’

    হোমে ফ্রিজ নেই। কেন নেই, জানে না পরমা। মেয়েদের কম করে খাবার দিতে দিতে শেষ অবধি বেঁচে গেলে ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।  কোনও কোনওদিন সেরকম হয়।

    সঞ্চিতা এখনও তার কথা থামায়নি। বলল, ‘আর জামাকাপড়ের কথা বলছ! বছরে একবারই দেওয়া হয়। পুজোর সময়। ব্যাস, ওই চলবে। মাঝখানে যদি ছিঁড়ে যায় তাহলে সেলাই করে পরতে হবে। তাও তো করে নেয় অনেকে। যারা পারে না তাদের ভরসা সেফটিপিন। ব্রা, পান্টি ছিঁড়ে ধুলধুলে হয়ে গেলেও পাওয়া মুশকিল।’

    পরমার মনে পড়ল, বেশ কয়েকটা মেয়েকে সালোয়ার-কামিজে সেফটিপিন লাগিয়ে ঘুরতে দেখেছে সে। বড়বাড়ির একজনকে জিজ্ঞেস করেছিল। সে বলল, ‘অফিসে তো স্লিপ দিয়েছিলাম আন্টি। বলল এখন হবে না।’

    কোনও কিছুর দরকার পড়লে চিরকুটে লিখে অফিসে জমা করতে হয় মেয়েদের। মঞ্জুর হলে তবেই পাওয়া যাবে। পরমা খোঁজ নিয়েছে। বেশিরভাগ চিরকুট পড়েই থাকে। কোনও মেয়ে যখন হোমে আসে তখন সে সঙ্গে করে নিয়ে আসে তার জামাকাপড় কিংবা অন্য দরকারি জিনিস। অনেকদিন পর্যন্ত তাতেই কাজ চলে যায়। এখানে তাই গা করে না অফিসের কেউ। সে বলল, ‘এসব কথা নবনীতাদিকে বলার দরকার ছিল। না হলে হোম-মাদারদের নিয়ে যে মিটিং হয় সেখানে তো বলতে পারি।’

    তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সঞ্চিতা। ‘খবরদার ওসব করতে যেয়ো না। খেয়াল করে দ্যাখো, একমাত্র অর্পিতাদি ছাড়া হোম-মাদারদের মধ্যে পুরনো বলতে কেউ নেই। আমার কথা ছেড়ে দাও। প্র‌ীতিদি আর উর্মিলাদি তিন বছর টিকে রয়েছে ম্যানেজ করে করে। আসলে কী জান, এরা বেশিদিন কাউকে রাখতে চায় না। যদি ভেতরের কথা জেনে ফেলে! তাই লোক বদলায়। তারমধ্যে তুমি আবার এইসব ভাবছ! সবই জানি বুঝলে। এরা কীরকম বলো তো, বাইরের লোকের পায়ে পড়বে আর নিজেদের লোককে ঠকাবে। ফরেনাররা এলে তাদের সামনে মেয়েদের নাচায় আর মেয়েদের নামেই ডোনেশন তোলে। বেশিটা ওপরমহলে ভাগ হয়ে যায় আর সেখানে যারা লেগে থাকে জোঁকের মতো, তারাও কিছু পায়। তবে বেশি খাওয়ার চেষ্টা করলেই আবার মুখে নুন ঢেলে দেয়। ওই করে আগে দু’জনের চাকরি গেছে।’

    ‘মেয়ে নাচানোর ব্যাপারটা আবার কী সঞ্চিতা? আমি তো কই দেখিনি।’

    ‘থাকো, দেখতে পাবে। নবনীতাদি আজ দিল্লি, কাল বাংলাদেশ করে বেড়ায়। লন্ডন অ্যামেরিকা থেকে মুরগি ধরে আনে। নিজের বাড়িতে রাখে। খাওয়ায় দাওয়ায়, কলকাতা ঘুরিয়ে দেখায় আর ভাল কাজ করছি বলে মাথা মুড়িয়ে টাকা নেয়। তারাও মেয়েদের নাচ-গান সেলাই-ফোঁড়াই দেখে খুশি হয়ে টাকা ডোনেট করে। সেসব টাকা যাচ্ছে কোথায় বলতে পার? শুধু টাকা নয়, ফরেনাররা যাওয়ার আগে মেয়েদের নতুন জামাকাপড় দিয়ে যায়। গতবার যারা এসেছিল, আমাদেরকেও একটা করে সিল্কের শাড়ি দিয়ে গেছে। সেটা আমরা পেয়েছি কিন্তু মেয়েরা তো তাদেরটা পায়নি। এ তো গেল ওদের কথা। কিন্তু হোমে সবচেয়ে বদমাইশ যদি কেউ থাকে, সে হচ্ছে ওই কেলে বুড়ো শম্ভুনাথ।’

    পরমা বলল, ‘এ নামটা কে দিয়েছে?’

    এবার সঞ্চিতা হেসে ফেলল। ‘কত দিক দিয়ে কত টাকা মারে, তবু শরীরে মাংস নেই বুড়োর। হাড় বেরিয়ে পড়েছে, ঢ্যাঙা, তার ওপর কুচকুচে কালো। আমি তাই ওকে কেলে বুড়ো বলি।’

    শম্ভুনাথ এখন তাদের সামনে নেই। তবু যেন তাকে দেখতে পেল ওরা। প্র‌াণ খুলে হাসল দু’জনে।

    মিটিংয়ে গিয়ে অবশ্য হাসি শুকিয়ে গেল পরমার।

    পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

    এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

    অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

    মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

    আগের পর্ব

    পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৬

    আরও পড়ুন:

     পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ১

     পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ২

     পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ৩

     পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ৪

    পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ৫

    পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ৬

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More