বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৬

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ৬।

থাকতে থাকতে অন্য বাড়ির কাজের মাসিদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল পরমার। তাদেরই একজন মিতাদি। সে বলল, ‘এক বাড়িতে কাজ আছে, মাইনেও বেশি দেবে, যাবি? আমি সেখানে ঠিকে কাজ করি।’

রাজি হয়ে গেল পরমা। এখানে থাকতে আর ভাল লাগে না। সারাদিন দিদার গোটা শরীর টিপতে টিপতে তার নিজের শরীর ব্যথা হয়ে গিয়েছে। তাই সে একদিন বলেই দিল, ‘আমি আর থাকব না। তোমরা অন্য লোক দেখে নাও।’ এখন পরমা কথা বলতে শিখেছে। আগের মতো মাথা নিচু করে শুধু শোনে না।

বেরিয়ে এসে পরমার মনে হল, এই সময়টাই তার নিজের। কারও হুকুম নেই। মনের মধ্যে ভয় কাজ করছে না। এখন আমি কারও কেনা নই। ছোটবেলায় স্কুলে স্বাধীনতা দিবস পালনের সময় উঁচু বাঁশের মাথায় যেমন পতাকা উড়ত, যেমন পতপত শব্দ হত হাওয়ার ঝাপটে, তেমন আমিও যেন একটি পতাকা।

তবে পতাকা হয়ে ওড়ার জীবন বড় কম সময়ের। কেননা সব রাস্তাই সরু হতে হতে এসে থামে নতুন কাজের বাড়ির সামনে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই অন্য এক জীবন। সেখানে কোনও পরিচয় নেই। একটাই নাম— কাজের লোক।

পরমার বয়স বেড়ে হয়েছে পনেরো-ষোলো। তাই কাজের বোঝাও বেড়েছে। মাইনে বেড়ে সাড়ে তিনশো থেকে পাঁচশো। এই বাড়িতে কাকু-কাকিমা আর তাদের ছেলে-বউমা এবং দু’মাসের ছেলে। পরমার কাজ সেই ছেলে সামলানো। বউদি অফিস করে। বাচ্চাকে দেখাশোনার জন্যে আয়া রেখেছিল। সেন্টার থেকে আসত। কিন্তু সপ্তাহখানেক থেকেই চলে যেত। এই করে তিনটে সেন্টারের আয়া আসা এবং পালানো দুটোই হয়ে গেছে। কেন? সে কথা পরমা বুঝেছিল পরে। তার কাজ বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া, জামাকাপড় কাচা, দুধের বোতল পরিষ্কার করে গরম জলে ফুটিয়ে আবারও পরিষ্কার জলে ধোয়া, আপেল সেদ্ধ করে খাওয়ানো।

পরমা জানত না শহরের বাচ্চা এত আদরে মানুষ হয়! তাদের গ্রামে তো ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো মাটিতে ঘষড়ায়। তাদের মা’রা বুকের দুধ খাওয়ায়, নয়তো নিজেরা যখন ভাত খায় তখন সেই ভাত চটকে বাচ্চার মুখে পুরে দেয়। সেইভাবেই তারা বড় হয়ে যায় একদিন।

 

বাচ্চার কাজের পাশাপাশি কাকিমা ঘরের কাজও চাপাতে লাগল পরমার ঘাড়ে। তাও মুখ বুজে করছিল সে। পরমার কাজে এতই খুশি হল কাকিমা যে তার নামটাই বদলে দিল। বলল, ‘তুই আমার ঘরের লক্ষ্মী রে। এখন থেকে তোকে আমরা লক্ষ্মী বলেই ডাকব।’

পরমা এ বাড়িতে কাজে এল কিন্তু যে তাকে এনেছিল সেই মিতাদি ঠিকে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেল কী কথায় রাগারাগি করে।

নতুন নাম পেয়ে খুশি হওয়ার মতো কিছু ছিল না পরমার। সে কাজে লক্ষ্মী আর নামেই লক্ষ্মী। তাছাড়া সব আলাদা। লক্ষ্মীর জন্য বাজার থেকে আলাদা চাল আসত। লাল লাল মোটা চাল। তাকেই বলা হত ফুটিয়ে খাওয়ার কথা। মালিকদের সঙ্গে তো তার রান্না হতে পারে না। লক্ষ্মী বড় বাটি করে ভাত বসিয়ে দিত স্টোভে। মোটা চাল গ্যাসে সেদ্ধ হতে সময় নেবে। তাই কেরোসিনে কাজ চালাতে হত তাকে। ভাত হয়ে গেলে অ্যালুমনিয়ামের থালা নিয়ে কাকিমার সামনে দাঁড়ালে তরকারি তুলে ভাতের মধ্যে ঢেলে দিত। হ্যাঁ, তখন অবশ্য মালিকদের তরকারিই পেত লক্ষ্মী। তারপর রান্নাঘরে আরশোলার জঙ্গলে বসে খেতে হত তাকে।

এতকিছুর পরেও লোকগুলোর ওপর কৃপা বজায় রেখেছিল লক্ষ্মী। তবে একদিন তার কাজে ভুল হয়ে গেল। নারায়ণের ভোগের বাসনে মাছের ঝোল ঢেলে ফেলেছিল সে। তাতেই লক্ষ্মীর চুলের মুঠি ধরে নারায়ণের পায়ের কাছে ঠুকতে লাগল কাকিমা।

পাথরের নারায়ণ নড়ল না। একেই দু’বেলা পুজো করতে হয়েছে তাকে। সে আসার পর কাকিমা পুজোও ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন রক্তমাংসের লক্ষ্মী আর সহ্য করল না। জামাকাপড় ব্যাগে ভরে বেরিয়ে পড়ল।

কোথায় যাবে? কার কাছে থাকবে? কিছুই জানে না। কনককাকির কাছে গিয়ে থাকার উপায় নেই। নতুন জায়গায় কাজের খবর সে কাকিকে জানিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল গ্রামে বাবাকে খবর দিয়ে দিতে।

এখন সে কী করবে! মিতাদির কথা মনে পড়ল। তার বাড়ি চেনে পরমা। মিতাদিই একদিন নিয়ে গিয়ে চিনিয়ে দিয়েছিল।

হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, এই জীবনে কেউ নেই তার। সে একেবারে একা। শহরের লোককে ভালবেসে যতই কাজ করে দাও, তাদের মন আর গলে না। সাত বছরে জানা হয়ে গেছে পরমার। শহুরে বাবুরা টাকা দিয়ে ঝি-চাকর পোষে। তাদের ভালবাসে না। শুধু কাজ আদায় করে নেয়। রাগে দুঃখে মাথা ফাটছে পরমার। চোখ জ্বালা করছে।

যেতে যেতে এতক্ষণ খেয়াল করেনি— দুটো ছেলে তার পিছু নিয়েছে। আজবাজে কথা বলছে, গায়ের কাছে চলে আসছে কখনও। নিজেদের সঙ্গে পরমাকেও একবার চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়েছিল কাকিমার ছেলে-বউমা। তার মনে হল, সেখানে জন্তুগুলো খাঁচায় পোরা ছিল আর এখানে সব খোলাই ঘুরছে। তবে এতদিনে পরমা শহুরে প্যাঁচালো গলির কিছু কিছু চিনে গিয়েছে। এ গলি ও গলি দৌড়ে ছেলেগুলোকে এড়িয়ে যেতে পারল সে।

মিতাদির বাড়ি গিয়ে দেখল সে তখনও কাজ থেকে ফেরেনি। ছেলে আর মেয়েটা ঘরে। বাচ্চাদুটো তাকে চেনে। তারা বলল, ‘মাসি তুমি বসো। মা একটু পরেই চলে আসবে।’

মিতাদির বর মরে গিয়েছে চার-পাঁচ বছর আগে। রিকশা চালাত। কিছু রেখে যেতে পারেনি বউ-বাচ্চার জন্যে। সেই থেকে মিতাদিকে ঠিকে কাজ করতে হয়।

দু’দিন খুব ভাল কেটেছিল পরমার। মিতাদি একদিন পিঠে বানাল তার জন্যে। পরমাও নিজের টাকা থেকে মাংস এনে খাওয়াল সবাইকে। তাদের বাড়ি থেকে চলে আসার সময় বাচ্চাদুটো মনখারাপ করছিল। ‘মাসি, আবার এসো আমাদের বাড়ি। কেউ কখনও আসে না আমাদের কাছে।’

মিতাদি বলল, ‘আসবে কেন, আমার কী আছে? টাকা থাকলে সবাই আসত। দাদা-বউদি, দিদিরা সকলেই তো আছে। কেউ কখনও এসে জিজ্ঞেস করে কেমন আছি?’

ছেলেমেয়েদুটোর চোখে জল। তাদের জড়িয়ে ধরল পরমা। তারও আজ কষ্ট হচ্ছে। এরা তো আপন নয়! রক্তের কোনও সম্পর্কই নেই এদের সঙ্গে। দু’দিন এসে ছিল এই যা। সারাবছর যাদের বাড়ি কাজ করে প্রাণপাত করে তাদের তো পরমার জন্য কষ্ট হয় না! ছেড়ে চলে আসার সময় তারও মনে লাগেনি। তবে এখন কেন? আবার নতুন বাড়িতে ঢুকতে হবে, তাই কি?’

 

 

মিতাদিই পরমাকে নিয়ে গিয়েছিল অনিন্দ্যদা আর সুতপাবউদির বাড়ি। হ্যাঁ, সেখানে একটু মাটি পেয়েছিল সে।

ভাবনা ছিঁড়ে গেল পরমার। কেন কে জানে, বাইরে কুকুরদুটো খুব চিৎকার করছিল। থেমেছে তারা। এখন আবার ঝিঁঝির ডাক শোনা যাচ্ছে। দূরে কোথাও কেউ যেন চেঁচিয়ে উঠল। তার কথা বোঝা যাচ্ছে না। ফিকে আওয়াজ ভেসে আসছে শুধু। রাত ঘন হয়ে উঠছে।

অন্ধকারেই সে ঘরের ভেতরে তাকাল। জীবন তার হাত ধরে এইখানে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে। পরে কী হবে, কোথায় যাবে, আন্দাজও করতে পারে না পরমা। বাঙ্কে শুয়ে থাকা মেয়েগুলোকে দেখে মনে হয় তারা সকলে মিলে যেন রাতের ট্রেনে চলেছে। পরমাও তাদেরই সঙ্গে। কোন ভোরে যে পৌঁছবে। আদৌ কোথাও ভোর আছে?

 

 

কয়েকদিন আগে সোনাগাছি থেকে যে দু’জন নতুন মেয়ে এসেছে তাদের নাম তানজিলা বেগম আর সাহানা নস্কর। ছোটবাড়িতে অশান্তি হচ্ছে তাদের নিয়ে। অন্য মেয়েরাও মাথা ঠিক রাখতে পারছে না। স্টাফ মেম্বাররা মেয়েদের নিয়ে কাউন্সিলিংয়ে বসছেন।

সাহানা, তানজিলার মুখের ভাষা এখনও বদলায়নি। প্রীতিকে বলছিল, ‘ওরে আন্টি, ছেড়ে দে আমাদের। বন্ধ থাকতে পারছি না এখানে। পুলিশ ঢ্যামনাগুলো যেখান থেকে ধরে এনেছে সেখানেই দিয়ে আয় রে।’

এমনিতেই নাক উঁচু থাকে প্রীতির। এখন কিনা একটা মেয়ে তাকে তুইতোকারি করছে! সে বলল, ‘তোদের কী করে পথে আনতে হয় সেই টেকনিক আমাদের জানা আছে, বুঝলি।’

অন্য একটা মেয়ে তানজিলাকে থামাতে চাইছিল। ‘আন্টিকে এভাবে বলিস না, চুপ কর।’

উলটে তানজিলাই তাকে চুপ করিয়ে দিল। নাইটিটা হাঁটু অবধি তুলে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তুই থাম মাগি! বকর বকর করে কানের মাথা খেয়ে নিল আমার।’

এদের সঙ্গেই বন্ধুর মতো মিশতে হয় হোম-মাদারদের। পুরনো জীবনের কথা জানতে হয়। তাদের সুখ-দুঃখকে নিজের করে নিতে হয়। বাড়ি কোথায়? বাবা-মা, ভাই-বোন আছে কিনা? তারা কী করে গেল ওইরকম জায়গায়? কেন গেল? কেউ কি ফুঁসলে নিয়ে ওখানে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিল? ছোটবেলায় ইচ্ছে কী ছিল? এখন সুযোগ পেলে তা করবে কিনা? কথা বলে বলে মনের মধ্যে ঢুকতে হয়। পুরনো আবেগ, স্বপ্নকে ফিরিয়ে আনতে হয় চোখের সামনে। অনেকে আছে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসে নতুন জীবনের পথে। অনেককে আবার দিনের পর দিন বুঝিয়েও কিছু হয় না। মুখে মুখে তর্ক করে। তেড়ে আসে। হাতের সামনে কিছু থাকলে ছুড়ে মারে।

হোমের নিয়ম— মেয়েরা কোনও স্টাফের গায়ে হাত তুললেও তারা কিছু করবে না তাদের। ভালবেসে, বুঝিয়ে শোধরানোর চেষ্টা করবে। ছ’মাস ছোটবাড়িতে রেখে, কিছুটা সহবৎ শিখিয়ে তারপর বড়বাড়িতে পাঠানো হয়। কিন্তু কখনও কখনও বাইরে থেকে নতুন মেয়ে এসে ছোটবাড়িতে গোলমাল পাকালে সেখানকার শুধরে যাওয়া মেয়েরাও বিগড়ে যেতে থাকে আবার।

আজ স্টাফ মেম্বার ঈশিতা ছোটবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে বসেছেন। নানা গল্প শুনিয়ে তাদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন। ছোট-বড় কোনও বাড়িতেই টিভি নেই বা নেই এমন কিছু যা দিয়ে মেয়েরা সময় কাটাবে। এক আছে লুডো। বছরের পর বছর সকাল, সন্ধে, দুপুর ও রাতে একই জিনিস খেলে খেলে বিরক্ত হয়ে গেছে তারা। সর্বাণী মিত্রর অর্ডারে অফিস-স্টাফরা মেয়েদের সঙ্গে কিছুটা সময় গল্প করে কাটান। তাই ঈশিতা ছোটবাড়িতে।

 

অফিস চলছে। সঞ্চিতা আর উর্মিলা বড়বাড়ির কাজে রয়েছে। পরমার ডিউটি পড়েছে আজ স্কুলবাড়িতে। একজন দিদিমণি আসেননি। অন্যজন একা ছোট-বড় এতগুলো মেয়েকে সামলাতে পারবেন না। কে কোন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায় খেয়াল রাখা মুশকিল। শুক্লা হালদার তাই পরমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।

ঘরের বাইরে ফালি দাওয়াটায় পরমা এতক্ষণ পায়চারি করছিল নাগাড়ে। এবার বসে পড়ল। পা টাটাচ্ছে। বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিল। আরামের একটা শ্বাস পড়ল তার। নিজের স্কুলের কথা মনে পড়ছিল। সেই স্কুলও ছিল মাটির। চারটে ঘর। ওয়ান থেকে ফোর। ওয়ান আর টুয়ের ছেলেমেয়েরা মাটিতে বসে পড়ত এখানকার মতোই। থ্রি‌ আর ফোর বেঞ্চে। স্কুলের সামনে ছিল বড় একটা খেলার জায়গা। কী শক্ত তার মাটি! ছেলেরা কাচের গুলি দিয়ে খেলত আর মেয়েরা কিতকিত নয়তো পিট্টু। অঙ্ক স্যারের ভয়ে কোনও কোনওদিন স্কুল পালিয়ে কয়েকজন গিয়ে বসে থাকত খালধারে।     গ্রামে কোনও বিয়েবাড়ি থাকলে তো কথাই নেই। সারাদিন সেখানে কাটিয়ে চারটের সময় স্কুলে ফিরে জানলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ব্যাগ বের করে নেওয়া। পরের দিন হেডমাস্টারমশাইয়ের কাছে ঠ্যাঙানি। সেই স্কুলও কি তার মতো বড় হয়ে গিয়েছে? সে গেলে স্কুল তাকে চিনতেই পারবে না হয়তো। তবে যাবেই বা কী করে? সে রাস্তা তো বন্ধ।

হোমের গোটা চত্বরে এখন কেউ নেই। রাজহাঁসগুলো ডাঙায়। কখনও ডানা ঝাপটাচ্ছে, কখনও পালকের ভেতর ঠোঁট ঢুকিয়ে চুলকে নিচ্ছে।

তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবাক হল পরমা। প্রীতিদি এদিকে কোথায় আসছে? তার তো এখন ছোটবাড়িতে ডিউটি ছিল। আসছে যাকে বলে সেজেগুজে। পরমা বুঝতে পারে না প্রীতি কেন জিন্‌স-টপ পরে। মাঝারি গড়ন, মোটাসোটা চেহারা। মাথার চুল কাঁধের কাছে। আর সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে তার পেট। সবসময় সামনের দিকে ঝুলে রয়েছে। তবু জিন্‌স পরার শখ ছাড়েনি। পরমাকে শাড়ি পড়তে দেখে সে টিপ্পনী কাটত গোড়ার দিকে।

বেশ তাড়াতাড়ি হেঁটে এসে প্রীতি নিচু গলায় বলল, ‘এই পরমা, ও বাড়িটার দিকে একটু চোখ রাখিস। আমি বেরোচ্ছি।’

খুব রাগ হল পরমার। মাঝেমধ্যেই প্রীতি বেরিয়ে যায় এর-তার ঘাড়ে কাজ চাপিয়ে। সে বলল, ‘কী করে চোখ রাখব বলো তো? যতক্ষণ স্কুল চলবে, শুক্লাদি আমাকে এখান থেকে নড়তে মানা করেছেন।’ কথাগুলো নিজের কানেই খুব রুক্ষ শোনাল। তাই তারপর সে কিছুটা নরমভাবে বলল, ‘আমি আজ তোমাকে সাহায্য করতে পারব না প্রীতিদি। অন্য কাউকে বলো।’

অসহায়ের মতো মুখ করে প্রীতি বলল, ‘সে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। না গেলে রেগে যাবে। এখন কী করি বল তো?’

‘তোমার সে কে বোঝাও, তুমি একজায়গায় চাকরি কর। যখন তখন ডাকলেই বেরোতে পারবে না।’

‘এইবারের মতো হেল্প করে দে লক্ষ্মীটি, আর কক্ষনও বলব না। না গেলে ও যদি রেগে চলে যায়, আমার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে রে। আর কাকেই বা বলব বল? তুই একটু লক্ষ রাখিস, তাহলেই হবে। ঈশিতাদি ভেতরে আছেন, তোকে ওখানে যেতে হবে না। আমার খোঁজ পড়লে একটা কল করে নিস।’ কানের কাছে হাত নিয়ে আঙুলের কায়দায় ফোন দেখাল প্রীতি।

‘গেটে অপির্তাদি আছে, তাকে কী বলবে?’

‘ওকে আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব।’ বলেই হাতের দুটো আঙুলে টুসকি মেরে তড়বড়িয়ে চলে গেল প্রীতি।

মনে আনন্দের শেষ নেই মেয়েটার। পরমা জেনে গিয়েছে, বরের সঙ্গে এখনও ডিভোর্স হয়নি প্রীতির। তবে সপ্তাহে তিন-চার দিন বয়ফ্রেন্ড আসে দেখা করতে।

 

গাছের ফাঁক দিয়ে তাকাল পরমা। পুকুরের ওপারে ছোটবাড়ি দেখা যায়। চেঁচিয়ে ডাকলে শোনাও যাবে। বারান্দায় লোহার গ্রিলের দরজায় ভেতর থেকে তালা ঝুলছে। ঈশিতাদি চেয়ারে বসে আছেন। মেয়েরা কেউ চেয়ারের হাতল ধরে ঝুলছে, কেউ মেঝেতে কনুই লাগিয়ে দিয়ে দুলছে। পরমা চোখ সরিয়ে নিল। সবাই একজায়গায় আছে, এই ভাল। একা ছাড়লেই কে যে কী করে বসে!

নতুন এসে ছোটবাড়িতেই ডিউটি পড়েছিল পরমার। আচমকা একদিন তাপসী বলে একটা মেয়ে মেঝেয় পড়ে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল। তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বিরাট জিভ বের করে গোঙাচ্ছে আর মাঝে মাঝে অন্য মেয়েদের বর্তমান, ভূত-ভবিষ্যৎ নাকি গড়গড় করে বলে দিচ্ছে। তারা ভয় পেয়ে এ ঘর ও ঘর ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছিল। চিৎকার করে বলছিল, ‘ওকে ভূতে ধরছে! ওর ঘাড়ে ভূত চেপেছে!’

ওই অবস্থায় পড়ে হকচকিয়ে গিয়েছিল পরমা। এটা কী হচ্ছে? মরে যাবে না তো মেয়েটা!

সে যাত্রায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল জুলেখাবিবি। বড়বাড়ি থেকে আহানাকে ডেকে নিয়ে এল। আহানা এসেই তাপসীকে দু’হাতে চেপে ধরে বিড়বিড় করে কী বলে ফুঁ দিয়ে গালে চটাচট চাপড় মারতেই ছেড়ে গিয়েছিল তাপসীর ভূত। না হলে তার আলজিভ দেখে ভয়ে পরমার নিজেরই আলজিভ বেরিয়ে আসছিল আর একটু হলে।

জুলেখা পরমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে বলল, ‘ভয় পেয়ো না আন্টি। মেয়েরা তোমাদের ভয় পাওয়ানোর লেগেই এমন করে। থাকতে থাকতে জেনে যাবে। বুঝে যাবে তখন। অন্যসব আন্টিও জানে। চিন্তা কোরো না, আমি থাকব তোমার সাথে সাথে।’

ধাতস্থ হয়ে পরমা বলল, ‘আহানা বিড়বিড় করে কী বলছিল রে?’

‘ও তন্তরমন্তর জানে আন্টি। কাউকে ভুতেফুতে ধরলে ঝাড়ফুঁক লাগায়। সকালবেলা জলপড়াও খাওয়ায়। সর্বাণী আন্টি ওরে খুব মানে।’

‘শিখল কোথা থেকে?’

‘তা তো জানি না আন্টি।’

সেদিন থেকে জুলেখাকে ভাল লেগে গিয়েছিল পরমার। এখন তো আলাদা একটা টান পড়ে গিয়েছে তার ওপর।

পড়ার ঘরের ভেতরে মেয়েরা রব তুলে পড়া মুখস্থ করছে। পাশে সেলাইয়ের ঘরের আবার অন্য চেহারা। আট-ন’জন মেয়ে সেখানে কিন্তু কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। শান্তভাবেই শাড়িতে সুতো বসাচ্ছে।

‘উঃ মা গো!’ কঁকিয়ে উঠল পরমা। কীসের যেন ঘা এসে পড়েছে পিঠে। ফিরে দেখল, দাঁড়িয়ে রয়েছে মণি। এক হাতে একপাটি ছেঁড়া হাওয়াই চটি, অন্য হাতে গাছের শুকনো ডাল। ওটা দিয়েই মেরেছে। ভীষণ জ্বালা করছে। হাত বোলানোরও উপায় নেই। জায়গাটায় হাত পৌঁছচ্ছে না। রেগে গিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, ‘ছড়ি ফেলে দে মণি, যা এখান থেকে।’

নড়ল না মণি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে।

আরও জোরে চিৎকার করল পরমা। ‘বলছি না, যা এখান থেকে।’

পরমার রাগ দেখে মণিও রেগে গেল। ছড়ি উঁচিয়ে ধেয়ে এল তার দিকে।

‘ওরে বাবা রে!’ বলে পিছিয়ে গেল পরমা। না হলে পাগলিটা খেপে গিয়ে আরও ক’ঘা বসায় তার ঠিক নেই।

কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে পরমাকে বকে নিজেই চলে গেল মণি।

 

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আগের পর্ব

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৫

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব:পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১

দ্বিতীয় পর্ব: পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২

তৃতীয় পর্ব: পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৩

চতুর্থ পর্ব: পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৪

Comments are closed.