বুধবার, মে ২২

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৫

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ৫

ছোট কয়েকটা আলোর মালা ঝোলানো হয়েছে দু’বাড়িতে। শংকর একটা বড় গাছ কিনে এনে বসিয়েছে বাঁধানো বেদির ওপর। জ্যান্ত গাছ নয়। নকল। তার এ ডাল ও ডালে ঝুলছে ছোট ছোট বল, ঘণ্টা, তারা, রঙিন চৌকো বাক্স। সবুজ রঙের নকল পাতাগুলোর সঙ্গে তারাও মাঝে মাঝে দুলে উঠছে হালকা হাওয়ায়। পাশে দাঁড়িয়ে লাল জামা, লাল টুপি, সাদা দাড়িওয়ালা ছোট্ট সান্তাক্লজ। রাতে ওই গাছেও আলো জ্বলে উঠবে। এই হল হোমের পঁচিশে ডিসেম্বরের ছবি।

পরমা যখন লোকের বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল তখন ঠিক করে জানত না এখানকার পঁচিশে ডিসেম্বরের মানে। গাছ যে কী করে নকল হয় তাও ভেবে পায়নি। সে তো কত আসল গাছে উঠে বসে থেকেছে। কুল গাছ থেকে কুল, চালতা গাছ থেকে চালতা, নারকেল গাছ থেকে নারকেল অবধি পেড়ে খেয়েছে। বড়দিন কথাটা অবশ্য শুনেছে গ্রামে। স্কুল ছুটি থাকে সেই সময়। বড় বড় ছেলেমেয়েরা বলে ফিস্টি করব। তারা চাঁদা তুলে ডিমের ঝোল ভাত রান্না করে খায়। ছোটরা হাতে পয়সা পায় না। বাড়ির চাল নুন তেল সব নিয়ে মাঠে চলে যায়। শীতের মাঠ ফেটে হাঁ হয়ে থাকে অনেক জায়গায়। বেখেয়ালে পা গলে গেলে মচকে যাবে। সে সব বাঁচিয়ে ভাল জায়গা বেছে নেওয়া। সেখানে বসে কাঠকুটো জ্বালিয়ে রান্না করে খেয়েই তারা খুশি। কেউ যাবে খেজুর গাছ থেকে শুকনো পাতা আর ডাল ভেঙে আনতে, কেউ কেটে আনবে কলাপাতা। মাঠ থেকে মদরঙ্গা শাক তুলে ভাজা হবে। পুকুর থেকে ছোট ছোট বোষ্টুমি মাছ আর গেড়িয়া চিংড়ি ধরে চচ্চড়ি।

কলকাতায় থাকতে থাকতে মালুম হয়েছিল ব্যাপারটা কী। সাহেবদের ব্যাপারটা নিজেদের মতো করে নিয়ে নেওয়ায় বেশ একটা হুল্লোড় আছে। লোকে এখানে কেক খায়, পিকনিক করে, চিড়িয়াখানায় ঘুরতে যায়, ভাল কমলালেবু না পাওয়া গেলে তাদের মনখারাপ হয়। আর আগের দিন রাতে বাড়ির ছোটরা মোজায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেয় মশারির কোনায় বা অন্য কোথাও। তাদের বাবা-মা রাতে নানা জিনিস দিয়ে ভরিয়ে দেয় সেই মোজা। সকালে বলে সান্তাক্লজ গিফ্‌ট দিয়ে গিয়েছে। সান্তাক্লজ বল্‌গা হরিণের গাড়ি করে ঘোরে। গ্রামের দিকটায় অন্ধকার। রাস্তা গুলিয়ে যাবে বলে বোধহয় যাওয়া হয় না তার।

হোমে যদিও এসবের কিছুই নেই। সকালটা বাইরে থাকার অনুমতি পেয়েছে মেয়েরা। তাতেই তারা খুশি। তাদের জন্যে পনেরো-কুড়িটা কেক এসেছে। কাটার পর হাতে হাতে দিয়ে দেওয়া হবে। আজ অফিস স্টাফদের ছুটি। তবে সর্বাণী মিত্র এসেছেন। আর ঈশিতা, কৃষ্ণা, শুক্লা। সকালবেলায় মেয়েদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে যাবেন।

উর্মিলা ছুটি থেকে বাড়ি গিয়েছিল। ফেরার পর ছোটবাড়ির কাজে বহাল। এবার ছুটি নিয়েছে প্রীতি। অর্পিতাকে এখনও গেটে থাকতে হচ্ছে। বড়বাড়িতে অনেক মেয়ে। একা সামলানো মুশকিল সঞ্চিতার। শুক্লা তাই ক’দিনের জন্যে দিনেরবেলায় তার সঙ্গে পরমাকেও বড়বাড়িতে থাকতে বলেছেন।

সেখানে গিয়ে পরমা দেখল শুক্লাদি নীচের হলঘরে বসে একটা বড় কেক টুকরো করছেন। রাখি আর নুসরত তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে দু’হাতে ভর রেখে সামনের দিকে দুলছে। হয়তো ভাবছে কখন কাটা শেষ হবে আর তারা তাদের ভাগের টুকরোটা পাবে।

পরমাকে ঢুকতে দেখে শুক্লা বললেন, ‘ছোটবাড়িতে চৌত্রিশজন, না?’

কথা শুনে অবাক না হয়ে পারল না পরমা। শুক্লাদির এখনও মনে থাকে না কোন বাড়িতে কতজন মেয়ে! বোর্ডে তো লেখা আছে। সেখানেও চোখ রাখেন না মনে হয়। সে বলল, ‘দু’জন নতুন মেয়ে এল তো সেদিন, তাদের নিয়ে ছত্রিশ।’

কেকের টুকরো গুনে স্টিলের বড় গামলায় রেখে মনিটর দোলাকে ডাকলেন শুক্লা। ‘উর্মিলা আন্টির হাতে দিয়ে এসো। ও বাড়ির মেয়েদের দিতে বলো।’ তারপর তাকালেন পরমার দিকে। ‘আমরা যাওয়ার আগে এ বাড়ির মেয়েদের ঘরে ডেকে তালা দিয়ে দাও। আমি ওদের কেক দিয়ে দিচ্ছি।’ কথাটা শেষ করার পরেও কাছে ডাকলেন পরমাকে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, ‘একটা গোটা কেক রান্নাঘরে রাখা আছে, তোমরা পরে কেটে খেয়ে নিয়ো।’

পরমা সরে দাঁড়াল। কাউকেই কি সে এখনও বুঝে উঠতে পারছে না! শুক্লাদিও মেয়েদের খাবার সরিয়ে রেখেছেন! বিরক্তি হল। দাঁড়াতেও ইচ্ছে করছিল না। বলল, ‘আমি যাচ্ছি। মেয়েদের পাঠিয়ে দিচ্ছি ঘরে। সঞ্চিতা কোথায় জানেন?’

‘সে তো স্নানে গেল।’

বড়বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে থালা বাজিয়ে মেয়েদের ঘরে ডেকে নিল পরমা। তারপর গেল বাথরুম লাগোয়া ছোট ঘরটাতে। এটা কখনও সখনও তাদের গল্প করা জায়গা। অফিস নেই বলে স্নানের তাড়াও নেই আজ। দেখল সঞ্চিতা মেঝেয় উবু হয়ে বসে। সামনে স্টিলের ছোট বাটিতে মাটি মাটি রঙের কীসব গোলা। পাশে কাচের লম্বাটে শিশি। তাকে দেখেই ফিচ করে হেসে ভুরু নাচিয়ে সঞ্চিতা বলল, ‘একটা জিনিস লাগাবে?’

‘কী গো?’

‘মুলতানি মাটি, গোলাপ জলে মেখেছি। রাজীব এনে দিয়েছে।’ কথাটা বলে ফেলেই একটু লজ্জা পেল সে।

‘মানে আমাদের গেটের রাজীবদা! তাই বলো!’

সঞ্চিতা বলল, ‘এই, ঠাট্টা কোরো না কিন্তু।’

‘আরে! তা কেন করব। জানতাম না, তাই। কিন্তু তুমি ওসব মাখছ কেন?’

‘মুলতানি মাটি মাখলে বলে ফর্সা হয়।’

‘হয় না কি? আমি জানি না তো।’

‘তুমি মাখবে না?’

‘আমি তো কিছু মাখি না সঞ্চিতা। ভাল করে চান করে নিই, তাতেই হয়ে যায়। বরং তুমি লাগাও, আমি দেখি।’

‘তোমার ফর্সা হতে ইচ্ছে করে না?’

‘না। তাতে আর আলাদা করে কী হবে!’

সঞ্চিতা যেন ভাল করে দেখল পরমাকে। ‘তুমি ঠিক আমার মতো কালো নও, তুমি হলে শ্যামলা। মুখটাও আমার মতো গোল নয়। সবচেয়ে সুন্দর চোখদুটো! কেমন ভাসা ভাসা। আর সুন্দর হচ্ছে চুল। আচ্ছা, ছোটবেলা থেকেই তোমার চুল এমন লম্বা?’

পরমার মুখে একটু দুষ্টু হাসি এসে ভর করল। ‘না, এই কী দেখছ! আরও লম্বা চুল ছিল আমার। ছোটবেলায় আমি আরও লম্বা ছিলাম তো।’

কথাটা প্র‌থমে ঠিক ধরতে পারেনি সঞ্চিতা। তারপর হেসে উঠে বলল, ‘পাজি কোথাকার!’

পরমা বলল, ‘নাও, অনেক হয়েছে। তুমি এবার তাড়াতাড়ি চান সেরে এসো।’

‘যাচ্ছি, তবে তোমায় একটা কথা বলার ছিল।’

‘বলো না।’

‘মেয়েদের খাওয়া হয়ে গেলে আমি কিন্তু গেটে গিয়ে বসব। ওর সঙ্গে একটু সময় কাটাতে পারব তাহলে। অন্য দিন তো অফিস থাকে। যাওয়ার উপায় নেই। তা ছাড়া গেটে তো এখন শুধু রাজীবই আছে। কবে আবার অন্য গার্ড চলে আসবে।’

দিনেরবেলার জন্য আর একজন গার্ড এখনও কেন খুঁজে পাওয়া গেল না তা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না পরমা। অর্পিতাদি রাজীবের সঙ্গে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে বলে কি এরা গা করছে না? সে বলল, ‘আচ্ছা যেয়ো। অর্পিতাদিকে এখানে পাঠিয়ে দিয়ো তাহলে। সেও খানিকটা ছাড় পাবে।’

সঞ্চিতা হেসে মাথা হেলিয়ে দিল। ‘বিকেলে তাহলে আমিই চপ সাপ্লায়ারকে ফোন করে দেব ওখান থেকে।’

হেসে ফেলল পরমা। বিকেলের টিফিনে একদিন মুড়ির সঙ্গে চানাচুর তো অন্য দিন আলুর চপ কিংবা বেগুনি। গজাও থাকে কখনও। গোবিন্দপুরে কানাইদা চপ ভাজে বাড়ির সামনের দোকানে। ঘণ্টা দেড়েক আগে ফোন করে দিলে ছ’টার মধ্যে এসে গেটে পৌঁছে দিয়ে যায়। এত ঝাল দেয় যে চোখে জল চলে আসে। তবে হুসহাস করলেও খায় সবাই। ওই চোখের জল মেয়েদের কাছে কিছুই নয়।

মেয়েদের রাতের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর হোম-মাদাররাও খেয়ে নিয়েছিল। তারপর হাতের কাজ সেরে সাড়ে দশটা নাগাদ ছোটবাড়িতে ঢুকতে পেরেছে পরমা। আলো নেভাতে এখনও আধ ঘণ্টা বাকি। মেয়েরা এই সময়টায় বিছানা ঝাড়ে, জামাকাপড় পাট করে, চুলে চিরুনি চালায়। কলঘর থেকে জল পড়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। শোওয়ার আগে সেখানে যাওয়ার লাইন পড়ে যায়।

পরমা একটা বই নিয়ে বসে ছিল নিজের বিছানায়। এখানে আসার আগে আনা ফ্র্যাঙ্কের ডায়েরি আর এই বইটা দিয়েছিল অনিন্দ্যদা। সরোজ নলিনী দেবীর জীবনী। গুরুসদয় দত্তর লেখা। বলেছিল, ‘পড়ে দেখো। স্কুল-কলেজে লেখাপড়া না শিখেও অনেক কিছু করা যায়, যদি মনের জোর থাকে, যদি সত্যিকারের আধুনিক হয় কেউ।’

বইটা পড়তে শুরু করেছে পরমা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ভূমিকায় চোখ রেখেছিল।

‘‘আজকালকার দিনে যে নারী কেবল একান্তভাবেই গৃহিণী তিনি আমাদের আদর্শ নহেন, ঘরে বাইরে সর্বত্রই যিনি কল্যাণী তিনিই আদর্শ। যাঁহার জীবন কেবলমাত্র চিরাগত প্রাদেশিক প্র‌থা ও সংস্কারের ছাঁচে ঢালা তিনি আদর্শ নহেন কিন্তু যাঁহার মধ্যে বৃহৎ বিশ্বের জ্ঞান ও ভাবের বিচিত্র ধারা গভীর ও সুন্দরভাবে সঙ্গতি লাভ করিতে বাধা না পায় তিনিই আদর্শ।’’

‘তুমি অনেক বই পড়েছ, না নতুন আন্টি?’

বইয়ের পাতার মাঝখানে আঙুল রেখে মুখ তুলে দেখল পরমা। জুলেখাবিবি এসে দাঁড়িয়েছে। ঠোঁটে হাসি ভাসিয়ে তুলল সে। ‘না রে, খুব অল্প।’

‘উঁ, মিথ্যা কথা।’ ঠোঁট ওলটাল জুলেখা। ‘আমার তো পড়ালেখা হয়ই নাই।’

‘হয়নি যদি তো এখানে ভেতরে যে স্কুল আছে সেখান যাস না কেন?’

জুলেখা কথাটার উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘তুমি পড়তেছ বলে আলো নিভাইনি। শুবে না?’

‘ও হ্যাঁ।’ উঠে দাঁড়াল পরমা। ‘নিভিয়ে দে। আমি কাল আবার পড়ব না হয়।’

ঘর অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর বিছানায় শুয়েও ঘুম আসছিল না পরমার। হোমে আসার পরপরই মাদার-ইনচার্জ শুক্লা হালদার তাকে বলে দিয়েছিলেন, ‘মেয়েদের ভালবাসবে কিন্তু সতর্কও থাকবে। না হলেই সুযোগ নেবে ওরা।’ আর অর্পিতাদি বলেছিল, ‘কোনও বাড়ির চাবি হাতছাড়া করবি না কখনও। কেউ কিন্তু পালিয়েও যেতে পারে। পারেনি যদিও, তবে এর আগে সেই চেষ্টা হয়েছে।’

মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে পরমা বুঝতে পারে না, ওদের একইসঙ্গে ভালবাসতে আবার অবিশ্বাস করতেও বলা হয়েছে তাহলে? তা না হলে এ বাড়ির দরজার চাবি বালিশের ভেতরে ভরে রাখতে হয়েছে কেন তাকে? বাইরে থাকলে নাকি তার ঘুমন্ত অবস্থায় কে কখন নিয়ে নেবে বলা যায় না। তারপর উড়ে যাবে।

মানুষ শখে পাখি পোষে। হলুদ, সবুজ, নীল। খাঁচার ভেতরে রেখে দানাপানি খাওয়ায় তাদের। সে তো অন্য। আর কোনও কোনও মানুষ আড়কাঠি হয়ে এই পাখিগুলোকে এখান থেকে ওখান থেকে ধরে বিক্রি করে দেয়। খুব দামি পাখি সব। অনেক টাকার লেনদেন। পাচারের ব্যবসা। গোটা দুনিয়া জুড়ে কেনাবেচা চলছে। তারপর আবার সেই পাখিদের মুঠোর ভেতরে নিয়ে তাদের পালক আতিপাতি করে ঘেঁটে দেখার মানুষও রয়েছে। কিছু পাখি যখন এইরকম কোনও জায়গায় এসে পৌঁছয় ততদিনে পৃথিবী ভুলে গিয়েছে তাদের। পাখিগুলোর রং উঠে গিয়েছে।

এখানে পরমা নতুন আন্টি। মনে হলেই কেমন লাগে। তার জীবন এদের মতো নয়। অথচ কোথা থেকে যেন সেও এসে পড়েছে এই খাঁচায়। ছোটবেলা থেকেই উড়তে হয়েছে তাকে। মাটিতে নেমেছে কি ধড়ফড় করে উঠেছে বুক।

গ্রাম থেকে কলকাতায় যখন প্র‌থম এসেছিল তখন সে কিছুই চিনত না, জানত না। যা দেখছে, সবই নতুন। বড় বড় সব বাড়ির মাঝখান দিয়ে সরু সরু রাস্তা। রিকশা, ট্যাক্সি, মোটরসাইকেল, মানুষ একসঙ্গে গুঁতোগুঁতি করছে সকাল থেকে রাত্তির। কে আগে যাবে।

বড় বাড়িগুলোর একটায় তাকে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছিল কনককাকি। ছোট বলে রান্নাবান্না করতে হত না। ঘর ঝাড়পোঁছ, বাড়ির ফাইফরমাস খাটা। খাওয়াপরা আর মাসে আড়াইশো টাকা মাইনে।

কাকি তাকে রেখে দিয়ে চলে গেল। পরমা লেগে গেল কাজে। বাড়ির মালিকের চালের ব্যবসা। তাকে পরমা কাকু বলে ডাকতে শুরু করল। তার বউকে কাকিমা। তাদের এক মেয়ে ছিল— রুমাদি। কলেজে পড়ত। সে পরমাকে খুব ভালবাসত। কলেজ থেকে ফিরে তার পিছনে পড়ে থাকত। বাড়ি কোথায়? সেখানে কে কে আছে? এত ছোট বয়েসে কেন তাকে বাড়ির লোক কাজে পাঠিয়েছে? প্রশ্নের যেন শেষ ছিল না। খুব রাগ হত পরমার। মনে মনে বলত, আমার বাড়ির লোক যদি আমাকে ঘরেই রাখবে, তোমাদের কাজ করে দেবে কে? কিন্তু মুখে কিছু বলত না। একে দিদি তাকে ভালবাসে, তায় বয়েসেও বড়। আর কনককাকি বলে গিয়েছে, ‘ওরা মালিক লোক, মুখে মুখে কিছু বলবি না ওদের।’

সারাদিন রুমাদির মায়ের কথা শুনতে হত। রান্নার আগে কাকিমা বলত ‘সব্জিগুলো কেটে দে।’ রান্না হয়ে গেলে বলত, ‘গ্যাস মুছে পরিষ্কার কর।’ পরমা সেই প্র‌থম জেনেছিল গ্যাস কী জিনিস! এতে আবার আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা যায়। তাদের গ্রামে তো কাঠ, খড় আর গোবরের ঘঁসি বানিয়ে শুকিয়ে নিয়ে চুলায় দিতে হত। কত খড়কুটো, কাঠ, ঘুঁটে সে বয়ে দিয়েছে রাঁধাশালে। তাতেও আগুন ধরত না। ফুঁ দিতে দিতে চোখ লাল হয়ে যেত। শহরে এসবের বালাই নেই। লাইটার নিয়ে গ্যাসে ঠুকলেই আগুন জ্বলে। এখানকার মানুষ কত আরামে থাকে! তবুও তাদের কাজের লোক দরকার হয়।

গ্যাস মোছা হয়ে গেলে কাকিমা বলত, ‘খাটের পায়াগুলো ভাল করে মুছে দে। ভীষণ ধুলো জমে গেছে।’

পরমার কাজের বিরাম নেই। কোনও একটা সেরে কিছুক্ষণ বসলেই কাকিমা তক্ষুনি দাঁড় করিয়ে বলে, ‘মাথার পাকা চুল ক’টা বেছে দে তো।’ তাই করতে হয় পরমাকে। টাকা দিয়ে কাজের লোক রেখেছে!

গ্রামে কারও বাড়িতে টিভি ছিল না তখন। পরমার এক কাকার ছেলের ভিডিও ছিল। পাড়ার সবাই চাঁদা তুলে সেই কৃষ্ণেন্দুদাকে দিলে সে শো করত। সবাই ঝেঁটিয়ে যেত দেখতে। এখানে ঘরে ঘরে টিভি। তা দেখা নিয়ে আবার মা-মেয়ের ঝামেলা লেগে যেত। রুমাদি দেখবে হিন্দি সিনেমা। তার মা দেখবে বাংলা সিরিয়াল। পরমার কিছু বলার নেই। সে দর্শক। তবে টিভির নয়। ঘরের এককোনায় মাটিতে বসে দেখত মা-মেয়েকে। বুকের মধ্যে ব্যথা করত, দমবন্ধ হয়ে আসত তার। এখানে বিকেলে পাড়াতো ভাই-বোনদের সঙ্গে কেউ খেলা করে না। মাঠে-ঘাটে দৌড়য় না। হাসতে হাসতে পেটে খিলও ধরে না। এখানে পাশের বাড়িতে যারা থাকে তাদের রোজ দেখে কিন্তু কেউ কাউকে চেনে না! শহরে কারেন্ট গেলে সবাই অন্ধ। আর দেশে অন্ধকারেও সব যেন দেখতে পেত তারা।

এক বছর ছিল রুমাদিদের বাড়ি। তারপর কনককাকি তাকে নিয়ে গেল গ্রামে। কতদিন পর বাবাকে কাছে পেয়ে পরমার সে কী আনন্দ! মুখ দিয়ে কথাই বেরোল না। বাবাও কথা বলতে পারেনি। মাথায়-পিঠে হাত বোলাচ্ছিল আর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। কিছুক্ষণ পর বাবা বলল, ‘দাদাকে গিয়ে প্র‌ণাম কর। তার হাতেই টাকা তুলে দে।’ বাবা ভেবেছিল টাকা পেয়ে ছেলে খুশি হবে বোধহয়। মেয়েকে আর যেতে হবে না শহরে।

তার দাদা বাবলা টাকা পেয়ে খুব খুশি হল। কিন্তু বাবার কোলের মেয়েকে পনেরো দিন পর ফিরে যেতে হল কলকাতায়।

দ্বিতীয়বার যখন সে এল, সেবার কনককাকি তাকে অন্য এক বাড়িতে কাজে ঢোকাল।

এই বাড়ির আবার ধরন অন্য। স্বামী-স্ত্রী অফিসে বেরিয়ে যায়। তাদের এক ছেলে আছে, ছোট, স্কুলে পড়ে। তবে তাকে দেখতে হবে না পরমাকে। দেখতে হবে শাশুড়িকে। শ্বশুর মারা গিয়ে বুড়ি একা হয়ে গিয়েছে। তার ওপর পায়ে বাত। বিছানা ছেড়ে নড়তে পারে না। তার একজন সঙ্গী চাই। পরমাই নাকি হবে সেই সঙ্গী। টাকা থাকলে কতরকমভাবেই না খরচ করে এরা। সময় কাটানোর জন্য মানুষ পোষে। মাইনেটা একটু বেশি বলে কাকি ঢুকিয়ে দিয়ে গেল।

সারাদিন দিদার ঘরে থাকতে হয়। মহিলা নিজেকে দিদা ডাকতে বলেছে। সকাল-বিকেল জ্বালায়। ক্ষণে ক্ষণে চা খায়। সেই চা পরমাকেই করতে হয়। আগের এক বছরে গ্যাস জ্বালিয়ে চা করতে শিখে গেছে সে।

দিদার পাকা চুল ওপড়ানো, চুল আঁচড়ে বিনুনি করা, জামাকাপড় কেচে দেওয়া— সবই করতে হত তাকে। বাকি সময় পা টিপতে হত। দিদা ঘুমিয়ে পড়লে সেও খাটের পাশে মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে পড়ত। পরমা ওঠার আগে দিদা উঠে পড়লে তাকে পা দিয়ে খোঁচা মেরে মেরে তুলত। চোখ মেললেই সেই চায়ের জ্বালা।

এই করেই কাটছিল দিন। মাসে একবার কাকি আসত দেখা করতে। কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে, শহরের রাস্তাঘাট চিনিয়ে আবার ভরে দিয়ে যেত বুড়ির ঘরে। বাইরে বেরিয়ে পরমার মনে হত সে এখন শিকলভাঙা পাখি। কাকির ছোটমেয়ে বুলুর সঙ্গে দেখা হত। ইট কাঠ লোহার ভেতরে বয়ে আসত ফেলে আসা মাঠের এলোমেলা হাওয়া। সেই বাতাসে ঘাম শুকিয়ে যায়, ধান গাছের মাথা নুইয়ে পড়ে, পুকুরের জলে কাঁপন ওঠে। পায়ে পায়ে ধুলোমাটি মেখে ছুটতে থাকে দুটো মেয়ে মনে মনে। সেই সময়টুকই নিজের মতো করে বাঁচত তারা।

এইভাবেই কেটে গিয়েছিল আড়াই বছর। মাঝখানে শুধু বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পেরেছিল একবার।

 

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

 

আগের পর্ব:

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৪

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব:পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১

দ্বিতীয় পর্ব: পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২

তৃতীয় পর্ব: পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৩

Shares

Comments are closed.