বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৪

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – 8

অফিস বসে গিয়েছে। শম্ভুনাথ ঘোষ খাতায় কীসব লিখে চলেছেন। অফিস স্টাফ মৈনাক মজুমদারও তার টেবিলে কাজে ব্যস্ত। অনু আর রিনি নামের মেয়েদুটি পাশাপাশি দুটো কম্পিউটারে টাইপ করছে। সর্বাণী মিত্র ফাইলের দিকে মুখ নামিয়ে রেখেছেন। পরমা কাগজ-কলম নিয়ে শুক্লা হালদারের সঙ্গে বসে পরের সপ্তাহে কোনদিন কী রান্না হবে তার লিস্ট তৈরি করে রাখছিল।

সপ্তাহে দু’দিন মাছ, দু’দিন ডিম, একদিন নিরামিষ আর রবিবারে মাংস পাওয়ার কথা মেয়েদের। তা যদিও হয় না। সেসব শুধু তালিকায় তোলা থাকে। আসলে যা হয় তা হল— চার দিন নিরামিষ, দু’দিন ডিম, এক দিন মাছ। মাসে একবার মাংস। অনু আর রিনি এখানেই খায়। একসময় ওরা হোমেরই মেয়ে ছিল। খুব ছোট অবস্থায় আসে। এখানে থেকেই পড়াশোনা শিখেছে। কম্পিউটারের কোর্স করেছে। তারপর এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর নবনীতা দত্ত তাদের কাজে নিয়ে নিয়েছেন। ওরা বাইরে ঘর ভাড়া করে থাকে আর হোমে ওদের চাকরি।

পরমার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। সে তার খাতাপত্র নিয়ে শুক্লাদির কাছ থেকে উঠে পড়তে যাচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘বড়বাড়িটা একবার ঘুরে এসো। মেয়েরা কী করছে দ্যাখো।’

বড়বাড়ির দোতলায় ওঠামাত্র রাখি দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল পরমাকে। পাঁচ বছরের এই মেয়েটা ক’দিনেই পরমার খুব ন্যাওটা হয়ে গিয়েছে। তাকে পেলেই শাড়ির খুঁট নয়তো সালোয়ার-কামিজের ওড়না ধরে আগু-পিছু ঘুরতে থাকে। পরমার কাছে অনেক বায়না থাকে তার। নালিশও জানায়। এখন যেমন হাঁটুর কাছটা বেড় দিয়ে মুখ ওপরে তুলে ধরল।

‘আন্টি, ময়নাদি আমায় খারাপ কথা বলেছে। তুমি তাকে বকবে চলো।’

হাসি চেপে গম্ভীর ভাব আনার চেষ্টায় পরমা বলল, ‘ময়নার এত সাহস যে তোমায় বাজে কথা বলে! চলো তো দেখি।’

‘শুধু ওকে নয় আন্টি, পিউদি সেদিন আমায় মেরেছে, তাকেও বকতে হবে।’

‘মেরেছে! এতবড় কথা! দুজনকেই আজ খুব করে বকে দেব। দেখাচ্ছি মজা।’

মেয়েরা কেউ বাঙ্কে বসে আছে পা ঝুলিয়ে। কেউ বা শুয়ে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। গলাটা ভারী করে চোখ পাকিয়ে পরমা বলল, ‘কে রাখির গায়ে হাত দিয়েছে শুনি। আমি বলছি, কেউ এরকম করবে না। ওকে বকাও চলবে না। খারাপ কথা তো একদম বাদ। তারপরেও যদি কেউ কিছু কর তাহলে রাখি আমায় বলে দেবে। তখন কিন্তু কঠিন শাস্তি দেব।’

রাখি অবাক হয়ে পরমার দিকে দেখছিল আর মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিল। তবে ঘরের বাকি মেয়েরা ফিকফিক করে হাসছে বুঝতে পেরে সে ভুরু কুঁচকে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘ওরা নুসরতকেও বকে আন্টি। চুল ধরে টানে। নুসরত তো আমার বন্ধু। তুমি বলে দাও, ওকেও যাতে কিচ্ছু না করে।’

এবার নুসরত তার বাঙ্ক থেকেই বলল, ‘হ্যাঁ আন্টি। বলে দাও ওদের সব্বাইকে।’

পরমা মাথা নেড়ে বলল, ‘ও হ্যাঁ, নুসরতকেও কেউ বিরক্ত করবে না। শুনে রাখো সব্বাই। না হলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।’

এবার রাখি খুশি হয়ে গটমটিয়ে চলে যাচ্ছিল নুসরতের বাঙ্কের দিকে। ছোট বলে দু’জনকেই নীচের দিকে শুতে দেওয়া হয়। দশটায় হোমের ভেতরের ছোট স্কুল শুরু হলে দু’জনেই সেখানে যাবে। এখন খেলছে। সাত বছরের নুসরতের একটা মেয়ে-পুতুল আছে। তার মা কোনকালে যেন দিয়ে গিয়েছিল। পুতুলটার জামা ছিঁড়েখুড়ে গিয়েছে। হাত-পা মাঝে মাঝেই খুলে পড়ে। তবু দু’জনের খেলার শেষ নেই। এখন তাকে নিয়েই আবার মেতে গেল ওরা।

পরমা ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল। গ্রামে তাদের বাড়ির দাওয়ার দেওয়ালে বেশ উঁচুতে ঝোলানো থাকত একটা আয়না। পায়ে ডিঙি মেরেও সেখানে নিজেকে দেখা যেত না বলে পুকুরের জলে দেখত পরমা। রাখিকে দেখলে মনে হয় সে যেন আবার সেই পুকুরে উঁকি দিয়েছে। লালচে চুল, ভাসা ভাসা চোখ, সেফটিপিন খোলা জামা। মায়ের ভালবাসা, শাসন ছাড়া নিজের একার একটা দুনিয়া। তবে পরমার বাবা রয়েছে এখনও। দাদা, বউদি, দিদিরা আছে। আছে বন্ধুরাও। সে তাদের দেখতে পায় না শুধু। এই মেয়েটার তো কেউ নেই। আস্তাকুঁড় থেকে তুলে আনা হয়েছিল তাকে। বড় হতে হতে সব জেনে যাবে সে। গোটা পৃথিবীটাকেই বকে দিতে ইচ্ছে করবে হয়তো। কিন্তু নালিশ জানানোর মতো কাউকে পাবে না। যদি চিরকাল এমন ছোটটাই থেকে যেত! তা তো হওয়ার নয়। মানুষ যে কেন বড় হয়!

মেয়েরা বাইরে। পরমা তাদের কাছাকাছি ঘুরছিল। সঞ্চিতা এসে খবর দিল, ‘মাইনে হচ্ছে, অফিসে চলে যাও।’ এমনিতে চলতি মাসের শেষ দিন কিংবা পরের মাসের এক তারিখেই হয়ে যায়। এ মাসে পাঁচ তারিখ হয়ে গিয়েছে।

অফিসে এখন অনেকেই রয়েছে। মৈনাকের সঙ্গে কী একটা কথা বলতে বলতে হাসি সামলাতে না পেরে উর্মিলা প্রায় গড়িয়ে পড়ছে তার টেবিলে। আর প্রীতি শম্ভুনাথের চেয়ারের একদিকের হাতলে বসে মাটিতে পা ঠেকিয়ে।

পরমা সোজা গেল মৈনাকের টেবিলে। ভাউচারে সই করে মাইনেটা তার কাছ থেকেই নিতে হয়। অন্যবারের মতো এবারও অস্বস্তি হচ্ছে পরমার। তার সামনে ভাউচারটা এগিয়ে দিলেন মৈনাক। সই করতে গিয়ে পরমা দেখল সেই একই ব্যাপার। টাকা বেশি লেখা রয়েছে। এত তো পায় না সে। লেখা একরকম আর টাকা অন্যরকম হবে কেন? এবার তো জানতেই হবে। সে কাগজটার দিকে চোখ রেখে বলল, ‘এখানে কি কোনও ভুল হচ্ছে?’

মৈনাক কিছু বলার আগেই শম্ভুনাথ বললেন, ‘কোথাও ভুল হচ্ছে না। সই করো।’

‘কিন্তু টাকাটা বেশি লেখা যে।’

‘ওটা থাকে। সব বললে তুমি কি বুঝবে?’

‘বলতে পারেন। বুঝতেও তো পারি।’

গম্ভীর হয়ে গেল শম্ভুনাথের মুখ। ‘হোম-মাদারদের মাইনে থেকে কিছু টাকা কেটে রাখা হয়। হোমের ফান্ডে জমা পড়ে সেটা। বাকিটা সর্বাণীদিকে জিজ্ঞেস কোরো, জানতে পেরে যাবে।’

সর্বাণী মিত্র আজ কোনও কারণে আসেননি। তবে শম্ভুনাথ যে সে কথা ভেবে বলেননি তা পরমা জানে। সে বলল, ‘ও, ঠিক আছে। তাই করব তাহলে।’

কেন কে জানে, প্রীতির দিকে একবার তাকালেন শম্ভু। তবে পরমাকে আর কিছু বললেন না।

টাকাগুলো গুনে নিচ্ছিল পরমা। শুনতে পেল প্রীতি বলছে, ‘আমার ওই টাকাটাও মাইনের সঙ্গেই দিয়ে দিয়ো শম্ভুদা। না হলে কিন্তু—’

আড়চোখে পরমা দেখতে পেল বাকি কথা ইশারায় হচ্ছে দুজনের মধ্যে। কোন টাকার কথা বলছে প্রীতি? ও তো আউটডোর করে না। অথচ প্রত্যেক মাসেই এরকম বলে প্রীতি আর উর্মিলা। আলাদা টাকা যে কোন কাজের জন্যে পায় তা বোঝা যায় না।

পরমার হয়ে গিয়েছে। সে দরজার দিকে এগোতেই শুক্লা বললেন, ‘একটু এদিকে এসো পরমা। কাজ আছে তোমার সঙ্গে।’

শুক্লাদির পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসল সে। তিনি আলমারি থেকে একটা খাতা আর পেন বের করে এনে রাখলেন তার সামনে। ‘মেয়েদের কাজের একটা লিস্ট বানাতে হবে। কোন বারে কে কী করবে। আমি বলে বলে দিচ্ছি, তুমি লিখে যাও। রিনি বা অনু কাউকে দিলে কম্পিউটারে টাইপ করে প্রি‌ন্ট আউট বের করে দেবে। তার আগে বেশি কাটাকুটি হলে আবার অসুবিধে।’

পরমা খাতায় লাইন টেনে বাঁ দিক ধরে মেয়েদের নাম লিখতে শুরু করল। মাঝখানে বার আর ডান দিকে কার কী কাজ— এইভাবেই সাজাচ্ছিল। এই সময় কানে এল উর্মিলার কথা, ‘ও তো কলির কেষ্ট। সবসময় গোপিনীদের মাঝে থাকে। শ্রীকৃষ্ণের ভাগ্যও বোধহয় এত ভাল ছিল না।’

কথা শুনে অনেকগুলো গলা একসঙ্গে হেসে উঠল। খাতা থেকে মুখ তুলল পরমা। বলতে গেলে তিনজন এখন মৈনাকের টেবিলের সামনে জমেছে।

শম্ভুনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ, আজ এ ফুল তো কাল ও ফুলে মধু খাচ্ছে।’

আবারও হাসির রোল উঠল। প্রীতি বলল, ‘মেয়েদের তো এ ব্যাপারে এক্সপিরিয়েন্স আছে শম্ভুদা।’

মৈনাক মাথা নেড়ে বললেন, ‘কিন্তু আমাদের শংকরের তো সেরকম এক্সপিরিয়েন্স নেই। যা হয়েছে বউয়ের সঙ্গে। তাও তো বেটা বউকে ভয় পায় বলে মনে হয়।’

পরমা বুঝল ড্রাইভার শংকর মণ্ডলকে নিয়ে কথা হচ্ছে। তাকে কোথায় পেল এরা? জানলা দিয়ে তার চোখ গেল কলপাড়ের দিকে। ওখানে তেঁতুল গাছ আছে একটা। শংকরদা কয়েকটা মেয়েকে তেঁতুল পেড়ে দিচ্ছে। ওইজন্যেই তাহলে এই! পরমা দেখছিল মেয়েদের। ছোট্ট ছোট্ট তেঁতুলের জন্য কীভাবে লাফালাফি করছে তারা। ঠিক করে এখনও বড়ই হয়নি। সবে ফুল থেকে বেরিয়েছে তেঁতুলগুলো। মেয়েরা খাওয়ার বায়না ধরে থাকবে। কিছু বায়না তারা হামেশাই করে থাকে শংকরদার কাছে। ওদের খুশি করতে গিয়ে এদের কতখানি প্র‌শংসা পাচ্ছে তা যদি জানত শংকরদা!

আরও কিছু কথা ভেসে আসছিল কানে। শম্ভুনাথ বললেন, ‘বউয়ের শরীর তো ঢিলে হয়ে গেছে। দু-দুটো মেয়ে হয়ে গেছে, আর কিছু থাকে! এখানে কয়েকটা মেয়ে আছে, বেশ ডাঁটো। টাইট ফিগার। শংকরকে দোষ দেওয়া যায় না। চোখের সামনে ভাল জিনিস থাকলে সকলেরই একটু আধটু চোখ চলে যায়।’

উর্মিলা হাসি মিশিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘শম্ভুদা, তুমিও!’

প্রীতি আর উর্মিলা ওদের তুমি করে কথা বলে। আগেই জেনেছে পরমা। মৈনাকও হেসে বললেন, ‘আফটারঅল পুরুষ তো!’

স্টাফ মেম্বার ঈশিতা বসু অন্য টেবিলে মুখ নিচু করে কাজ করছেন। অনু আর রিনিও কম্পিউটারের দিকে ঠায় তাকিয়ে। পরমা আর সহ্য করতে পারছিল না। শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছে তার। উর্মিলা আর প্রীতি তো মেয়ে। তারা এত নির্লজ্জ হচ্ছে কী করে? এইরকম কথাই কি চলে এখানে?

শুক্লা হালদার এরমধ্যে আচমকা হইহই করে উঠলেন, ‘এই পরমা, কী করছ তুমি? বুধবারে বাথরুম পরিষ্কার করা তো ময়নার কাজ বললাম। কী লিখছ ওখানে?’

পরমা খাতায় তাকাল। কিছু একটা লেখার চেষ্টা হয়েছিল। বদলে আঁকিবুঁকি হয়েছে মাত্র। সেটা কেটে ময়নার নাম লিখল সে।

শুক্লা বললেন, ‘ঠিক আছে, আজ এই পর্যন্ত থাক। আবার পরে বসা যাবে।’

পরমা উঠে পড়তে যাচ্ছিল। তাকে যাতে এসব কথা শুনতে না হয় সেইজন্যেই কি শুক্লাদি কাজ শেষ করে দিলেন? এইসময় হঠাৎ শব্দ করে চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ঈশিতা। ‘শম্ভুদা, মেয়েদের নিয়ে এরকমভাবে বলবেন না। আমরা কি জানি এখানে যারা রয়েছে তাদের জীবনটা কী? ওরা আসলে ঠিক কেমন? এতদিন তো হয়ে গেল। তাও কি জানি?’

সকলে থমকে গিয়েছে। শুক্লা এবার পরমাকে বললেন, ‘তুমি যাও। মেয়েদের দ্যাখো গিয়ে।’

খাতাটা অনুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল পরমা। ঈশিতাদিও বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। মুখটা থমথমে। পরমা ভাবছিল তার সঙ্গে একটু কথা বলবে। তারপর মনে হল, সে তো এখানে নতুনই বলতে গেলে। শুরুর দিকে কৌতূহল থেকে কিছু কথা জেনেছিল ঈশিতার কাছ থেকে। আজ না হয় থাক। পরে কখনও সুযোগ পেলে বলবে।

হাঁটছিল পরমা। চোখ গেল একটু দূরে। দু’বাড়ির মাঝে ঘাসজমির ওপর সিমেন্টে বাঁধানো একটা চৌকো বেদি আছে। সেখানে একা বসে একটা মেয়ে। এ হল নিতু। অন্য মেয়েরা এখানে সেখানে ঘুরছে এই বিকেলে। এই মেয়েটার সঙ্গে তারা বিশেষ কথা বলে না। পরমা তার দিকেই এগিয়ে গেল।

‘এখানে কী করছিস নিতু?’

‘মা কি বহুত ইয়াদ আ রহি হ্যায় আন্টি।’ বলতে বলতেই সে কাঁদতে শুরু করল।

পরমা তার একেবারে কাছে চলে গেল। চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, ‘কাঁদছিস কেন বোকা মেয়ে, তোর মা তো আসে দেখা করতে।’

‘নেহি আন্টি, আমি এখানে থাকব না। তুমি মুঝে মাকে পাস পাঠিয়ে দাও।’

তাকে বোঝানোর চেষ্টায় পরমা বলল, ‘তুই কাঁদলে তোর বাচ্চার ক্ষতি হবে তো, তোরও হবে। কাঁদিস না।’

‘নেহি আন্টি, এ বাচ্চা আমার চাই না। পেট মে বহুত দর্দ হোতি হ্যায়।’

মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে পরমা। মা হওয়া কী তা তো এ বোঝেই না! মাকে ছেড়ে, নিজের ঘর ছেড়ে এখানে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তার পেটে যে কিছু একটা বাড়ছে সেই যন্ত্রণা তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে।

মেয়েটিকে তার মা চার মাসের মাথায় এই হোমে নিয়ে এসেছিল। পরমা এসেছে তারও মাস দুয়েক পর। তখন কিছুই জানত না। পরে নিতুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে জানতে পেরেছে। উর্মিলাও বলেছে কিছুটা।

হোমে এসে তার মা সর্বাণী মিত্রর পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘মেরি ইজ্জত বাঁচা লো দিদি, মেরি ইজ্জত বাঁচা লো। হামার মেয়েকে এখানে রেখে লিন। নেহি তো বেরাদরি মে মুখ দিখাতে পারব না।’

বাসন্তীর বর বউ আর মেয়েকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। বাড়ি ছিল বিহারের বেগুসরাই। বরের হাত ধরে একদিন কলকাতায় চলে এসেছিল বাসন্তী। এখন গোবিন্দপুর রেলস্টেশনের কাছে কোন এক বস্তিতে ভাড়া থাকে। সেটা এখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে। মরদ চলে যাওয়ায় বাসন্তীকে লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাতে হয়। বর যে আর এক জায়গায় সংসার ফেঁদে বসেছিল তা জেনেও কিছু করতে পারেনি সে।

নিতুর বয়স চোদ্দো। তাকে ঘরে রেখে মা কাজে বেরিয়ে যেত সারাদিনের জন্য। ফিরত সেই সন্ধে পার করে। কিছুদিন পর তাদের বাড়িওয়ালা কাকা রোজ দুপুরে ওদের ঘরে আসতে শুরু করেছিল। নিতুকে খুশি করার জন্য সাজার জিনিস এনে দিত, খাবারদাবারও নিয়ে আসত মাঝে মাঝে। কখনওসখনও কিছু টাকাও হাতে গুঁজে দিয়েছে। তখনও কিছু বুঝেই উঠতে পারেনি নিতু। বাবা নেই, মা সারাদিন থাকে না। কাকা তাকে এটা ওটা কিনে দেয়, ভালবাসে। নিতুও ধীরে ধীরে পছন্দ করতে শুরু করেছিল কাকাকে।

একদিন সেই কাকাই অন্য চেহারায় দেখা দিল।

সেদিন দুপুরে খেয়েদেয়ে নিতু শুয়ে ছিল। বিছানার পাশে বসে গল্প করছিল কাকা। বসে থাকতে থাকতেই একসময় নিতুর ওপর ঝুঁকে পড়ে তার ফ্রক খোলার চেষ্টা শুরু করে দেয়। উঠে বসতে চেয়েও পেরে ওঠেনি সে। সেই কাকা শুধু ফিসফিস করে বলছিল, কিছু হবে না, কিছু হবে না। তারপরেও নিতুর বাধা পেয়ে তার ফ্রক ছিড়েখুঁড়ে ফেলে দেয়। নিজেও জামাকাপড় খুলে ফেলে নিতুর হাত-পা চেপে রেখে উঠে পড়ে তার ওপর। চিৎকারও করতে পারেনি সে। তারই ছেঁড়া ফ্রক মুখে গুঁজে দিয়েছিল কাকা।

লোকটা যখন তাকে ছাড়ল তখন বিছানায় আর দু’পায়ের ফাঁকে রক্ত দেখে ভয় পেয়ে যায় নিতু। এতক্ষণ কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল তার। আবার কাঁদতে থাকে সে। ‘তুমি কী করেছ আমার সঙ্গে— মাকে বলে দেব।’

তখন শুরু হয় ভয় দেখানো। ‘বলে দ্যাখ, এ কথা কাউকে বললে তোদের মা-মেয়ে দু’জনকেই মেরে ফেলব। কেউ বাঁচাতে পারবে না।’

সত্যিই ভয় পেয়েছিল নিতু। লোকটার গায়ে খুব জোর। বাবা থাকলে তবু হত। সে আর মা কী করে পারবে এর সঙ্গে! তাছাড়া এ তো তাদের বাড়িওয়ালা। যদি উঠে যেতে বলে! কোথায় যাবে তারা?

তারপর থেকে মাঝে মাঝেই কাকা হানা দিতে শুরু করল সেই দুপুর দেখে। কিছু না বলে লাশ হয়ে পড়ে থাকত নিতু। তবু সামলাতে পারেনি। একদিন বমি শুরু হল। অম্বল হয়েছে ভেবে মেয়েকে ওষুধ এনে দিত বাসন্তী। কিন্তু নিতুর অম্বল আর সারে না। তখন মা তাকে নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে।

ততদিনে চার মাস হয়ে গিয়েছে।

বাসন্তীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কে করল এতবড় সর্বনাশ? মেয়েকে বারবার পুছতাছ করলে সে মুখ খোলে। লোক জানাজানির ভয়ে বাসন্তী তাকে নিয়ে চলে আসে হোমে। আশেপাশে বলেছিল মেয়েকে দেশের বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছে।

সব শুনে সর্বাণীদি থানায় যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু বাসন্তী কেঁদে পড়ে বলল, ‘না দিদি, ওই আদমিকে হামি ধরেছিলাম, সে কুছুই মানছে না। আর এ কথা একবার বাহারকে লোগ জানলে মেয়েকে নিয়ে কী করব? শাদি করাতে পারব না।’

কথা হয়— নিতু হোমেই থাকবে। হোমই তার দেখাশোনা করবে। বাচ্চা হয়ে গেলে এখানে তাকে রেখে মেয়েকে নিয়ে চলে যাবে বাসন্তী। যদি অবশ্য মেয়ে হয়। ছেলে হলে কিছুদিন রেখে অন্য জায়গায় পাঠাতে হবে।

পরমার হাত ধরে নাড়া দিল নিতু। ‘বোলো না আন্টি, মা কব আয়েগি?’

নিতুর মায়ের ওপর রাগে জ্বলে যাচ্ছিল পরমা। কেন কিছু বলল না কখনও? ওই লোকটার ওপরে আক্রোশে পুড়ে যাচ্ছিল সে। কেন শাস্তি হবে না ওর?

তবু পরমা কিছু বলতে পারল না। এতক্ষণ এই মেয়েটার সব কথা তার মনে পড়ে যাচ্ছিল হুহু করে। না, এর সব কথা, সব কষ্ট সে কি জানে? জানা সম্ভব? ঈশিতাদি ঠিকই বলেছেন। এতদিনে শম্ভুনাথরাও যদি একটু জানার চেষ্টা করত! বাড়ি ছেড়ে আছে, বাচ্চা চাই না বলে কাঁদছে মেয়েটা! বাচ্চা হওয়ার পরেও কি একই কথা বলবে? মা হওয়ার কোনও অনুভূতি হবে? থাকবে কোনও আনন্দ? বাচ্চা রেখে চলে যাওয়ার সময় কোনও কষ্ট হবে না ওর?

নিতুর হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল পরমা। কী বলে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পেল না। উঠে পড়ল সে। হাঁটতে থাকল অন্য মেয়েদের দিকে। বাঁধানো বেদির ওপর একা বসে রইল নিতু।

 

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

পরের পর্ব  আগামী শুক্রবার

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

আরও পড়ুন:

আগের পর্ব:

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৩

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব:পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১

দ্বিতীয় পর্ব: পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২

পঞ্চম পর্ব: পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৫

Comments are closed.