রবিবার, জুলাই ২১

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পর্ব – ২

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব:পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১

পরের পর্ব:পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৩

জলখাবার খেয়ে আবার বেরিয়ে এল পরমা। প্র‌ায় সবাই জানে আজ তার ছুটি। অফিস চলছে জোরকদমে। সে বড়বাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে আলাদা করে শুনতে পাচ্ছিল ফ্যানের আওয়াজ, কম্পিউটারের কিবোর্ডের ওপর খটাখট শব্দ। নিজেদের ঘরে মেয়েরাও কথা বলছে একসঙ্গে। সেইসব কথা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে আসছে বাইরে। পরমা আজ কোনও কিছুতেই নেই। সব মিলিয়ে কিছু হারিয়ে যাওয়ার মনখারাপ ঘিরে ধরল তাকে।

কেন যে তার এমন হয়! কখনও চড়া রোদ, কখনও ঝমঝম বৃষ্টি, কখনও বিকেলের আকাশের কমলা-হলুদ আলো মনটাকে চেপে ধরে। মোচড় দিয়ে ওঠে ভেতরটা।

সে আর দাঁড়াতে পারছিল না। চলে গেল পুব দিকের বুটিক ঘরে। রূপা, কবিতা, আহানার সঙ্গে আরও তিন-চারজন মেয়ে মিলে শাড়িতে প্রি‌ন্ট করে। পরমা আগেও গিয়েছে দু-একবার কিন্তু দাঁড়িয়ে থেকে দেখার সময় পায়নি।

কিছু কাপড় বাইরের দড়িতে ঝুলছে। ঘরে ঢুকে দেখল, বড় বড় দুটো টেবিলে টান টান করে কাপড় পাতা। মেয়েরা ছাঁচ হাতে ছাপ বসাচ্ছে। দুটো টেবিলে দু’রকমের প্রি‌ন্ট হচ্ছে। কাঁথা সেলাই করা, হাতে ছাপা শাড়ি এখান থেকে বাইরে গিয়ে বিক্রি হয়।

রূপা বলল, ‘নতুন আন্টি, কেমন লাগছে বলো তো?’

পরমা বলল, ‘খুব সুন্দর হচ্ছে। আমাকে শেখাবি?’

মেয়েরা একসঙ্গে হেসে উঠল। ‘কেন আন্টি মজা করছ!’

‘মজা নয় রে, সত্যি শিখতে চাই। শেখার কি শেষ আছে?’

‘তোমরা পড়াশোনা শিখেছ, ভাল ঘরের মেয়ে, এখানে চাকরি কর। তোমরা কি আমাদের কাজ শিখবে?’

মুখে হাসি টেনে এনে পরমা ভাবছিল, মেয়েরা তাকে কী মনে করে! বড়ঘরের মেয়ে? আদরে মানুষ, শিক্ষিত? তাই তাদের আন্টি হয়ে এসেছে!

ভাবারই কথা। প্র‌ীতি, উর্মিলা আর সঞ্চিতা নিজেদের চারপাশে একটা দেওয়াল তুলে রেখেছে। মেয়েরা সেই দেওয়াল টপকে তাদের কাছে পৌঁছতেই পারে না। আর অর্পিতা তো সবসময়েই গম্ভীর। যদিও পরমার মনে হয়, অর্পিতা ইচ্ছে করেই ওরকম। সে যে এখানে শুধু সবচেয়ে পুরনো তাই নয়। সেও হোমেই মানুষ। অন্য হোম থেকে তাকে এনেছিলেন সর্বাণীদি। কেন তাহলে অর্পিতা নিজেকে আলাদা করে রাখে মেয়েদের থেকে?

প্র‌ীতি প্র‌থম দিকে পরমাকে বলত, ‘মেয়েদের সামনে একটা ইমেজ ধরে রাখতে হয়। বুঝিয়ে দিতে হয় তোমরা আমাদের মতো নও। আমরা আলাদা। নয়তো ওরা গুলিয়ে ফেলবে, বুঝলি? এখানে ওরা অন্যের আশ্রয়ে থাকে। আর আমরা নিজেদের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছি। ওদের বেশি গুরুত্ব দিবি না। সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রাখবি। আমাদের যা কাজ, শুধু সেটুকুই করব।’

নিজের যোগ্যতা যে কী তা জানেই না পরমা। কথাটা শুনে তার খুব খারাপ লেগেছিল। বলেছিল, ‘কিন্তু প্র‌ীতিদি, কাজের জন্য তো মাসের শেষে মাইনে পাই আমরা। মেয়েদের ভাল রাখার আর ভালবাসার কী হবে তাহলে? ওদের যদি কাছেই না টানলাম তবে এখানে থেকে করব কী?’

‘ওদের ভাল রাখার দায়িত্ব তো আমাদের নয়। হোম যারা চালায় তাদের। আর আমাদের ভালবাসায় ওদের কোনও দরকার নেই।’

‘ভালবাসা চায় না এরকম কেউ আছে? চেয়েও তো পায় না অনেকে।’ কথাগুলোর সঙ্গেই জড়িয়ে গভীর একটা শ্বাস বেরিয়ে এসেছিল বুকের ভেতর থেকে।

প্র‌ীতিকে যদিও থামানো যায়নি। বলল, ‘ভাল বুদ্ধি দিচ্ছি, শোন। যতদিন গা ভাসিয়ে থাকবি, থাকতে পারবি। নয়তো পরে আমার কথা মিলিয়ে নিস।’

পরমা যখন এসব ভাবছিল তখন পিছন থেকে ডাক পড়ল— ‘তুমি এ সময় এখানে?’

মঞ্জরীদির গলা। মেয়েদের দিক থেকে ফিরে পরমা বলল, ‘হ্যাঁ দিদি, শুক্লাদি জোর করে আজ আমাকে ছুটি দিয়েছেন।’

মঞ্জরী একটু টেনে বললেন, ‘ও…।’ তারপর ছোট্ট হাসি বিনিময় করে আবার খাতায় মুখ নামিয়ে নিলেন।

ঘরে ঢোকার সময়েই পরমা দেখেছিল মঞ্জরী ভৌমিক টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে একমনে কী লিখছেন। তাই বিরক্ত করেনি। এই ঘরে দুটো চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা স্টিলের আলমারি রাখা। যারা বুটিক শেখে তারা মঞ্জরীর আন্ডারে কাজ করে। অফিসে ঢুকে খাতায় সই করে তিনি চলে আসেন নিরিবিলি ঘরটাতে। দুপুরে খাওয়ার সময় দু-চারটে কথা বলে নিজের খাবারটুকু খেয়েই আবার চলে আসেন এখানেই। সন্ধেবেলা মেয়েদের জায়গামতো পাঠিয়ে দিয়ে, বুটিক ঘরে তালা ঝুলিয়ে, অফিসে চাবি জমা করে চলে যান। তাছাড়া হোমের অন্য কোনও ব্যাপারে জড়ান না মঞ্জরী। নিজেকে পরিপাটি রাখতে পছন্দ করেন। লম্বা ছিপছিপে চেহারা। ফর্সা। তার ওপর হালকা মেকআপ নিয়ে থাকেন সবসময়। মেকআপ বক্স তার হাতব্যাগেই থাকে। সকালে যেভাবে পরে আসেন, ফেরার সময়েও শাড়ি সেইভাবেই পাটপাট হয়ে থাকে শরীরে। চুলের বিনুনি থাকে কোমরের কাছে। মঞ্জরী যখন হেঁটে যান, দেখে মনে হয় তিনি এই হোমের তৃতীয় রাজহাঁসটি।

দেড় মাসে এই নিয়ে মাত্র দু’বার তিনি পরমার সঙ্গে কথা বললেন। অথচ এই মঞ্জরীদির হাত ধরেই পরমা ঢুকেছিল হোমে। অনিন্দ্যদার বন্ধু মঞ্জরীদি। দাদার কথাতেই কাজটা দেখে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মেয়েটিকে নিয়ে চলে এসো। সর্বাণীদির সঙ্গে কথা বলে রাখব আমি।’

অনিন্দ্যদা গড়িয়ার কাছে হোমের হেডঅফিসে নিয়ে গিয়েছিল পরমাকে।

হোম-ইনচার্জ সর্বাণী মিত্র ইন্টারভিউ নিলেন। বয়েসে ষাট-বাষট্টি। শ্যামলা রং। লম্বা চুল। চশমার ওপাশে বড় বড় চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। দেখে বোঝা মুশকিল মানুষটা শান্ত না রাগী।

পরমার জীবনের কিছু কথা শোনার পর বলেছিলেন, ‘দুঃখী মেয়েরাই দুঃখী মেয়েদের কষ্ট বোঝে। আমাদের যা কাজ তা তোমার পারা উচিত। কী, পারবে তো? পরমা ঘাড় কাত করে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল। সর্বাণী বললেন, ‘এক তারিখ থেকে কাজে লেগে যাও। তিন মাস কাজ দেখে তবেই চাকরি পারমানেন্ট করব।’

হোমে আসার দিন রাস্তায় মঞ্জরীদি বলেছিলেন, ‘আমার রেফারেন্সে তুমি যাচ্ছ, কিন্তু মনে রেখো, হোমের ভেতরে আমি তোমাকে চিনি না, না তুমি আমাকে চেন।’

দুপুরের খাওয়ার বাজনা বাজছে। অনেকটা সময় পার করে দিতে পেরেছে পরমা। মেয়েরা সবাই চলে গেল খেতে। সে বুটিক ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। দাঁড়াল গিয়ে টিউবওয়েলটার সামনে। খাওয়া শেষ হতে ঘণ্টা দুয়েক লাগে। অফিস স্টাফরাও এই সময় খেয়ে নিয়ে আধ ঘণ্টা শরীর ছেড়ে দেয় চেয়ারে।

এই কলপাড় থেকে দূরে একটা ছোট একতলা বাড়ি দেখা যায়। ড্রাইভার শংকর মণ্ডল তার বউ আর দুই মেয়ে নিয়ে হোমের ভেতরে ওখানেই থাকে। পাশের ঘরে জেনারেটর আর পাম্প একসঙ্গে। তার গায়ে একটা কাঠের গুমটিতে আছে দুটো অ্যালশেসিয়ান। দিনেরবেলা ভেতরে থাকলেও রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। গোটা জায়গাটায় পাক মারে তারা।

পরমা দেখতে পেল শুক্লাদি আসছেন কলের দিকে। ওরা দুই বোন এখানে চাকরি করেন। শুক্লা হালদার বিয়ে করেননি। ছোট বোন কৃষ্ণা দে অন্য এন জি ও-র সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাছাড়া ডোনার জোগাড়ের চেষ্টা করেন। বয়েস পঞ্চাশ-বাহান্ন। শুক্লাদির পঞ্চান্ন হবে। পরমার কাছে এসে তিনি বললেন, ‘পাম্প করো তো কলটা, বোতল ভরব।’

‘আপনি এলেন কেন? কোনও মেয়েকে দিলেই তো ভরে দিত।’

শুক্লা পরমার কথার দিকে না গিয়ে বললেন, ‘তোমাকে ছুটি দিয়ে তো ঝামেলা হল দেখছি।’

‘কেন শুক্লাদি?’

‘এখানকার লোকগুলো যা! শম্ভুনাথ বোধহয় তোমাকে বাইরে দেখে সর্বাণীর কানে তুলেছে। ও আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, তুমি আজ বাড়ি গেলে না কেন?’

শম্ভুনাথ ঘোষ এখানকার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজার। সে যে তার সুনজরে নেই তা এতদিনে বুঝে গিয়েছে পরমা। শুক্লা বললেন, ‘ভাবছিলাম সর্বাণীকে বুঝিয়ে বলব, তবে তার আর দরকার নেই। তুমি একবার অফিসে এসো।’

শুক্লাদি চলে যাওয়ার পর পরমার মনে হল, তার সব কথা ভাগ্যিস তিনি জানেন না। কী ভাবতেন তাহলে! যদি জানতে পারেন এমন একজনকে তারা চাকরিতে রেখেছেন যে একদিন লোকের বাড়িতে কাজ করত! প্র‌ীতি, সঞ্চিতা, উর্মিলা, অর্পিতাই বা কী ভাববে তাকে নিয়ে? পরমার সঙ্গে আর মিশবে তারা? পড়াশোনা না জানলে, বংশ পরিচয় না থাকলে এখানকার মানুষ তো ঠিক করে কথাই বলে না। প্রয়োজনও মনে করে না। বুটিক ঘরের মেয়েগুলো তাকে কত কিছু বলছিল একটু আগে। বড়ঘরের মেয়ে, আদরে মানুষ, শিক্ষিত! তারা যদি জানত তাদের আন্টি কী!

অফিসে ঢুকে শুক্লা হালদারের সঙ্গে দেখা করল সে। তিনি বললেন, ‘তোমার পুরো ছুটি আর হচ্ছে না পরমা। দুটো নতুন মেয়ে এসে গেছে। তুমি খাতায় লিখে ছোটবাড়িতে নিয়ে নাও তাদের। অন্য ফর্মালিটিগুলোও করে নিয়ো।’

পরমা অফিস ছেড়ে বেরিয়ে এল। তার ছুটি শেষ। অল্প একটু পড়তে না পড়তেই স্কুল থেকে একেবারেই ছুটি হয়ে গিয়েছিল। তারপর কাজের বাড়ি। সেখানকার ছুটি তো ছুটি ছিলই না। গ্র‌ামে থাকতে আসল ছুটি ছিল ছোটবেলায়। গাছে ওঠার, গোরু চরানোর, সাঁতার কাটার, মাঠে মাঠে ছুটে বেড়ানোর। তা আর কোনওদিনও পাবে না সে। সব ছুটি ফুরিয়ে গেছে।

গেটের দিকে চলে গেল পরমা। তার অতিথি সাজার খেলাও শেষ।

 

 

সকাল ছ’টা দশ-পনেরোয় স্কুল বাস বেরিয়ে যাওয়ার পরে কাজ থাকে হোম-মাদারদের। তারপরেও কিছুটা সময় পাওয়া যায় হাতে। তারা তখন একসঙ্গে বসে চা খায়, গল্প করে। দশটা থেকে অফিস স্টাফদের আসা শুরু। সেখানে কাজকর্ম চালু হয়ে যায়। তার আগে হোম-মাদাররা রাতের জামাকাপড় ছেড়ে, স্নান করে তৈরি হয়ে থাকে। সর্বাণী মিত্র এসে যদি দেখেন কেউ এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে, তখনই অফিস ঘরে ডেকে পাঠান। অন্য স্টাফদের সামনেই রাগারাগি শুরু করে দেন। আবারও মনে করিয়ে দিতে থাকেন হোমে কী কী চলবে আর চলবে না। তবে কাজে জয়েন করার দিন থেকে প্রত্যেককেই বলে দেওয়া হয় নিয়মকানুন। সকলে সেই নিয়ম মুখস্থও করে ফেলে।

পরমা বড়বাড়ির মেয়েদের সকালের চা দেওয়া শেষ করল। সঙ্গে দুটো করে বিস্কুট। কেটলিতে চা কুলোয় না। রান্নার মাসি বড় হাঁড়িতে চা বানিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের তিনটে বালতিতে ঢেলে দেয়। একটা চলে যায় ছোটবাড়িতে, বাকি দুটো বড়বাড়ির। পরমা খালি বালতিদুটো খাবার দেওয়ার জায়গায় বসিয়ে রেখে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে।

রান্নাঘরের বাইরে উর্মিলা খাতা হাতে বসে আছে। যেসব মেয়ে স্কুলে পড়ে তাদের রেজিস্টার খাতা। উর্মিলার সকালের কাজ হল কতজন মেয়ে স্কুলে গেল তাদের নাম এন্ট্রি করা, সকলে টিফিন নিয়েছে কিনা দেখা। যখন তারা দেড়টা নাগাদ হোমে ফেরে তখন আবার খাতা দেখে মিলিয়ে নিতে হয় সবাই ফিরল কিনা। ওদের যাওয়ার সময় প্র‌ায় রোজই পরমা বাইরে এসে দাঁড়ায়। ছাই রঙের স্কার্ট আর সাদা জামা পরে লাইন দিয়ে বাসে ওঠে মেয়েগুলো। কী যে সুন্দর দেখতে লাগে! এক একদিন মনে হয় সেও চলে যায় ওদের সঙ্গে।

‘চা খেয়েছ উর্মিলাদি?’

‘না, তোদের জন্যই অপেক্ষা করছি। প্র‌ীতি তো ছোটবাড়ির চা দিয়ে এখনও এল না। কী যে করে! তুই এতগুলো মেয়ের চা দিলি, আর ও ওই ক’টা মেয়েকে দিয়ে আসতে পারল না? এত কুঁড়ে না!’ বলেই অভিযোগ টেনে লম্বা করার মতো শোনাল, ‘ওর অনেক কাজই ও মেয়েদের দিয়ে করায়।’

এখানে এর কথা তাকে বলা একরকমের খেলা মনে হয় পরমার। যেন ছোটবেলার চু কিতকিত। কত কথা যে লাফায়। আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে। এরকম শুনলে সেও তার ঘর থেকে গুটি ছুড়ে দেয়। তবে সেটা কথা নয়। হাসি। সেভাবেই একটু হেসে বলল, ‘চা ঢালতে থাকি, ততক্ষণে এসে যাবে।’ তারপর জানতে চাইল, আজ ক’জন মেয়ে গেল স্কুলে?’

উর্মিলা হাঁফ ছাড়ার মতো করে বলল, ‘পঁয়ত্রিশজনের সকলেই গেছে। বাব্বা, কাল আর আমাকে অ্যাবসেন্ডের চিঠি লিখতে হবে না। কী জ্বালা বল তো! যেদিন কোনও মেয়ের স্কুলে যেতে ইচ্ছে হবে না সেদিন সে নখরা ধরে থেকে যাবে। পরের দিন আমাকে মিথ্যে কথা লিখতে হবে টিচারকে। শরীর খারাপ ছিল তাই যেতে পারেনি। ভালই আছে সব এরা!’

উর্মিলার কথা ফুরোতেই পরমা রান্নাঘরে চলে গেল। ওপরে স্টোররুম। মাসকাবারি জিনিসপত্র ওই ঘরেই। চাবি থাকে আর এক হোম-মাদার সঞ্চিতার কাছে। এখন সে ছুটিতে বাড়ি গিয়েছে বলে চাবির গোছা পরমার জিম্মায়। সেগুলো দেখতে ছোট কিন্তু ভার অনেক। স্টোররুমে কখন কোনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে তা লিস্টে লিখে রাখা, রান্নাঘর কোন জিনিসটা ফুরিয়ে গেল তা বের করে দেওয়া। কাজের শেষ নেই। সারাক্ষণ তালা খোলা আর বন্ধ করা। এই ঝামেলা অন্য কেউ নিতে চায়নি।

সবিতামাসি লোহার বড় ওভেনের ওপর ডেকচিতে জল গরম করতে বসিয়েছে। মেঝেতে ঢালাও বিন্‌স, গাজর, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ। দু’জন হেল্পার রঘুদা আর নিমাইদা সেগুলো কাটছে। পরমা জানতে চাইল, ‘টিফিনে চাউমিন হচ্ছে মাসি?’

‘হ্যাঁ গো নতুন আন্টি, আজ সবাই চাউমিন খেয়ো। অর্পিতা আন্টি তো তাই বলে গেল সকালে।’

মাসির একটা ধরন আছে। তার চেয়ে ছোট বা বড় সব হোম-মাদারকেই আন্টি বলে ডাকে। রান্নাঘরে গেলেই খাতির করে চা খাওয়ায়, সুখ-দুঃখের গল্প শোনায়। পাশের গ্র‌ামেই তার বাড়ি। বয়েস পঞ্চাশ-বাহান্ন হবে। মাঝারি গড়ন, মোটা বেশি নয় কিন্তু দেখলে মনে হয় হাড় থেকে যেন মাংস ঢিলে হয়ে গিয়েছে। রং কালো। মাথার পাতলা কয়েকগাছি চুল সবসময় হাতখোঁপা করা। পরনে আটপৌরে ঢঙে সাধারণ ছাপা শাড়ি। সবিতামাসির মধ্যে নিজের গ্র‌ামের বউগুলোকে দেখতে পায় পরমা। মেয়ের বিয়ে দিয়েছে মাসি। তারপর ছেলে নিজে পছন্দ করে বউ নিয়ে আসার পর থেকেই নাকি গোলমাল। সেই বউমার জ্বালাতেই তাকে বেরোতে হয়েছে। সেরকমই তো বলে।

‘তোমার হেল্পারদের বলে দাও বিন্‌স দেখে কাটতে। গত সপ্তাহে বিন্‌সে পোকা রয়ে গেছিল। এইসব পোকামাকড় খাইয়ে মেয়েগুলোকে মারবে, সঙ্গে আমাদেরকেও!’

মাসি বলল, ‘কী করব বলো দিকি। ঝা বাজার এনে দেবে তাই তো রাঁধব। আনাজপাতি ঠিক করে পাই? ডালে জল মিশিয়ে সেও ট্যালট্যালে করতে হয়। ভাতে কাঁকর থাকলে আমার দোষ? কিন্তুক আমায় কথা শুনতি হয়।’

এরমধ্যে প্র‌ীতি যে তার কাজ সেরে আসতে পেরেছে তা বোঝা গেল। সে পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘সকাল সকাল কী এত বকবক করছিস? চা নিয়ে আয়। ক’টা বিস্কুট বেশি আনিস। খিদে পেয়েছে।’

পরমা চার কাপ চা ঢেলে থালায় সাজিয়ে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। প্র‌ীতি ছোটবাড়ি থেকে দুটো চেয়ার এনে আগেই বসিয়ে রেখেছে। একটায় চায়ের থালা রেখে প্র‌ীতির হাতে বিস্কুটগুলো ধরিয়ে দিল সে। গেটের দিকে মুখ ঘুরিয়ে একটা হাঁক দিল— ‘অপির্তাদি, তোমার চা নিয়ে যাও।’

ইদানীং সকালে বিছানা ছেড়ে অর্পিতার একটাই কাজ থাকে। মুখ ধুয়ে বাজারে চলে যায়। বাজার থেকে ফিরে সেই যে গেটে গিয়ে বসে, সারাদিন সেখান থেকে আর নড়তে চায় না। কেউ কোনও কাজের কথা বললে একটাই উত্তর, ‘সর্বাণীদি আমাকে গেট ছেড়ে উঠতে বারণ করেছেন।’

প্র‌ীতি চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, ‘মেয়েরা আজ টিফিনে কী নিয়ে গেল উর্মিলাদি?’

‘মাখন-পাঁউরুটি। কেন?’

‘কিছু বাঁচেনি? ক’টা বিস্কুটে পেট ভরে? যাই, রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসি।’

প্র‌ীতি উঠতে যাচ্ছিল। তার আগেই উর্মিলা বলল, ‘সাবধান, লেডি মাস্তান আসছে।’ কথাটা শুনে ওদের দু’জনের সঙ্গে পরমাও না হেসে পারল না।

অর্পিতাকে দেখলে পরমার একটা কথাই মাথায় আসে। সে যেন এক্ষুনি কাউকে গুঁতিয়ে দেবে। প্র‌ীতি বলল, ‘উর্মিলাদি, তুমি কিন্তু ওর নামকরণটা ভালই করেছ।’

অর্পিতার বয়স চল্লিশ হবে। শরীরটা গোলগাল। মাথাটা আকারে ছোট, হাত-পাগুলো রোগা রোগা। সকলেই তাকে ছেলেদের মতো শার্ট-প্যান্ট পরতে দেখে আসছে বরাবর। চুলও ছেলেদের মতোই কাটা, মাঝখানে সিঁথি করে দু’দিকে আঁচড়ানো। সে চুলে কোথাও কোথাও পাক ধরেছে। ডান হাতের পাঁচ আঙুলে পাঁচটা আংটি। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের নখটা প্র‌ায় ওই আঙুলের সমানই বড়, বেঁকে গিয়েছে নীচের দিকে। তাতে আবার সবসময় লাল নেলপলিশ লাগানো থাকে। হাতদুটো পিছনে মুড়ে যখন হাঁটে তখন মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে। এই হাবভাবের সঙ্গেই আরও একটা বিশেষ ব্যাপার আছে তার। প্র‌থমে কারও সঙ্গে আলাপ জমাবে, তারপর তার হাত দেখতে চাইবে। আর দেখেই বলবে, ‘গ্র‌হ ভাল যাচ্ছে না কিন্তু। স্টোন নিতে হবে।’

পরমাকেও গোড়াতেই একবার ধরেছিল। হাতটা কোলের ওপর টেনে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, ‘তোর বৃহস্পতি ভাল যাচ্ছে না, পোখরাজ ধারণ করতে হবে, তাহলেই দশা কেটে যাবে।’ তারপর গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি অপরিচিত লোকের কাছ থেকে এক হাজার করে নিই। তুই আমার পরিচিত, ছ’শো দিবি।’

কথা না বাড়িয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল পরমা। কিন্তু হোমের পুরনো অনেকেই তার এই ব্যবসা থেকে রেহাই পায়নি। প্র‌ীতির আঙুলে পাথর বসানো আংটি। উর্মিলার কামিজের হাতার নীচে উঁকি দেয় চেনে জড়ানো পাথর। উর্মিলাকে নিয়ে হাসাহাসি করলে কী হবে, ওরাও তো এসবে বিশ্বাস করে। পরমা জানে, হাতের ওইটুকু সব রেখায় ভাগ্য নেই। তার ছোট্ট জীবনটা ভেতরে ভেতরে এত বড় যে ওখানে আঁটবে না। আর সামনে কতটা পড়ে আছে তা জানতেও চায় না সে।

 

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

 

পরের পর্ব 

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৩

Comments are closed.