সোমবার, মার্চ ২৫

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ১

মৃত্তিকা মাইতি

মেয়েদের হোম। নাম তার আশ্রয়। এখানে কেউ এসেছে সোনাগাছি থেকে, কেউ পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার হয়ে, ঠাঁই পেয়েছে আঁস্তাকুঁড়ে ফেলে যাওয়া মেয়েও। দেশ, ধর্ম, জাত, ভাষা আলাদা হলেও এখানে তাদের একটাই পরিচয়। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত। হোম-মাদারের কাজ পেয়ে এখানেই এসে পড়ে পরমা। তার নিজের জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে দুঃখ আর অপমান। তবু সে মিশে যেতে থাকে হোমের মেয়েদের সঙ্গে। এক একজনের জীবনের কথা তোলপাড় তোলে মনে। সেইসঙ্গে সামনে আসতে থাকে হোমের নানা সমস্যা, চোরা দুর্নীতি, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। পরমা জড়িয়ে পড়ে সমস্ত কিছুর সঙ্গে। এ যেন এক খাঁচা। পাখিঘর। যার ঠিকানা শুধু জানে মুক্তির আকাশ। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ প্রথম পর্ব।

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব:পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২

জায়গাটা কলকাতা থেকে খুব দূরে নয়। ঘণ্টা দেড়েকের রাস্তা। বাস থেকে নেমে হাঁটাপথ। চারদিক গাছপালায় ভরা। শিরীষ, আকাশমণি, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, আম, জাম, নারকেল, তেঁতুল আরও কতরকমের গাছ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু’পাশে। ছায়া আর রোদ্দুরের মাঝে পা ফেলে ফেলে যেতে হবে। কানে আসবে অনেক পাখির ডাক। মুখ তুলে দেখলে চোখে পড়বে পুরনো নকশার কয়েকটা পাকা বাড়ি। সামনে বারান্দা। ছাদের পাঁচিলে জাফরি বসানো। অনেক একচালা ঘরও রয়ে গিয়েছে এদিকে। ওপরে চাপানো টালি কি অ্যাসবেস্টস। ঘরের সামনে পানাপুকুরে দলে দলে হাঁস ঘুরছে নিজেদের মনে দু’পায়ে জল কেটে কেটে। বর্ষায় মাঠঘাট জলে থইথই করে। মাঠ পেরিয়ে, পুকুর বেয়ে শামুক উঠে আসে রাস্তায়। কিছু জমিতে চাষ হয়। ধানিজমি আছে দূরে। দিনের ছায়া নামার মুখে কোনও এক বাড়ির বউ তার হাঁসদের ডাকে— ‘আয়, চই চই চই।’ প্যাঁক প্যাঁক শব্দ করে হাঁসগুলো জানান দেয় ঘরে ফিরছে তারা। পাখির দলও কিচিরমিচির রব তুলে ফেরে নিজেদের বাসায়। সূর্য ডোবার পর আশেপাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসে শাঁখের আওয়াজ। সন্ধে দিচ্ছে কেউ। সঙ্গে টং টঙা টং, টং টঙা টং কাঁসরের শব্দ।

এসবের মাঝেই বিঘা তিনেক জমির ওপর চারদিকে লাল রঙের পাঁচিল ঘেরা জায়গাটা অনড়। যেন কোনও কঠিন দুর্গ। বিরাট লোহার গেটের মাথার ওপরে বোর্ড। বড় বড় করে লেখা— আশ্রয় হোম। নীচে ছোট অক্ষরে— গোবিন্দপুর। দরজার মোটা মোটা লোহার আংটাদুটো ধরে নাড়া দিলে তার ছোট্ট খোপ দিয়ে উঁকি দেবে সিকিউরিটি গার্ড। ‘কাকে চাই?’ এমনি এমনি ঢোকা খুব শক্ত। বড় গেটের পেটের ভেতরে ছোট গেট আছে আর একটা। সেটা খুলে গেলে তবেই যাওয়া যাবে।

দক্ষিণ দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে দু’জন গার্ডের বসার চেয়ার-টেবিল। পিছনে তাদের জিরিয়ে নেওয়ার গুমটি ঘর। তবে এখন একজন গার্ডই রয়েছে। তার পাশের চেয়ারে বসে অন্য আর একজন।

খবরের কাগজ থেকে বিশেষ কিছু খবর বেছে নিয়ে পড়ে চলেছে সিকিউরিটির রাজীব। আর সেগুলো মন দিয়ে শুনছে ও একটা করে ফুট কাটছে হোম-মাদার অর্পিতা।

এরমধ্যে তাদের কাছে এসে দাঁড়াল পরমা। সে জানে এটা এখন এদের রোজের ব্যাপার। মাইনে নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল বেশ কয়েকদিন ধরে। হোমের সকালের দু’জন সিকিউরিটির মধ্যে একজন বিদায় নিয়েছে। আছে এই রাজীব। অবস্থা সামাল দিতে তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে অর্পিতাকে। আবার কাউকে না পাওয়া অবধি এভাবেই চলবে। মেয়েদের হোম, যেমন তেমন লোক পেলে হবে না।

অন্য দিন এদিকে আসার সুযোগ থাকে না পরমার। অর্পিতা গেটে থেকেও খোঁজ রাখে কে কী করছে। তার কথা না শুনলেও বিপদ। পৌঁছে যাবে হোম-ইনচার্জ সর্বাণী মিত্রর কানে। কিন্তু আজ পরমার ঘটনা অন্য। আজ সে দেখবে ও শুনবে।

‘কী হল? কাজ ফেলে এখানে কী করছিস?’ অর্পিতা তার মুখের দিকে তাকিয়ে।

পরমা অল্প হেসে বলল, ‘আজ আমার ছুটি অর্পিতাদি।’

‘ছুটি!’ ভুরু কুঁচকে গিয়েছে অর্পিতার। ‘কে ছুটি দিল তোকে?’

‘শুক্লাদি।’

‘ও, তা ছুটি নিয়ে কী করবি?’

প্রশ্ন বটে একটা। মাস দেড়েক হতে চলল এই হোমে এসেছে পরমা। মাসে তিনটে ছুটি পাওনা হোম-মাদারদের। একটাও নেয়নি সে। নিয়ে করবে কী? যাবে কোথায়? অনিন্দ্যদাদের বাড়ি গিয়ে যে থাকবে তারও উপায় নেই। বিয়ের আগে সেখানে ছিল। বিয়ের পরেও সেখানেই গিয়ে উঠতে হয়েছিল। অশান্তি তাকে তাড়া করে ফিরেছে। তার জন্য ওদের ওপরেও উৎপাত কম হয়নি। ওখানে আর যেতে চায় না পরমা। তাই কাল মাদার-ইনচার্জ শুক্লা হালদারকে বলেছিল, ‘আমার ছুটি লাগবে না দিদি।’

তিনি বললেন, ‘কেন? শ্বশুরবাড়িতে যাবে না তুমি?’

পরমার জীবনের কিছু কিছু কথা অন্য হোম-মাদাররা জানে। শাঁখা-সিঁদুর পরে ঘুরছে কিন্তু বর থাকতে সে এখানে কেন? শুধু চাকরি করতে? কৌতূহল হওয়ারই কথা। নিজের মতো করে তা সামলেছে পরমা। কিন্তু অফিস স্টাফরা তো সব জানে না। যে কোনওদিন প্রশ্ন ছিটকে আসতে পারে, এমন ধরেই নিয়েছিল পরমা। ছোট করে জবাব দিল, ‘না।’

‘ও।’ একটু থমকেছিলেন শুক্লা। ‘তা নিজের বাড়িতে তো যেতে পারবে?’

‘শ্বশুরবাড়ি, বাপেরবাড়ি, কিছুই নেই আমার শুক্লাদি।’

‘তোমার বউদি একদিন দেখা করতে এল না তোমার সঙ্গে! দাদাও তো এসেছিল জানি।’

অনিন্দ্যদা আর সুতপাবউদি এসেছিল এর মধ্যে। আলাদা আলাদা দু’দিন। দু’জনের সঙ্গেই গেটের বাইরে গিয়ে দেখা করতে হয়েছে পরমাকে। সে বলল, ‘ওরা আমার নিজের দাদা-বউদি নয়।’

‘তবে?’

‘ওদের বাড়িতে আমি—’ বলতে গিয়ে সামলে নিতে হল পরমাকে। ‘ওখানে আমি থাকতাম। আমার বিয়েও ওরাই দিয়েছিল। তাও আমি টিকিয়ে রাখতে পারিনি।’

‘তারাই এসেছিল এখানে?’

বড় একটা শ্বাস পড়ল পরমার। তারপর সে যেন নিজেকেই বলল, ‘হ্যাঁ, এখনও ওরা আমার হাত ছাড়েনি।’

শুক্লার চোখে একটা ভারী চশমা ঝোলানো থাকে। মাঝে মাঝেই সেটা তার জায়গা ছেড়ে নেমে এলেও তিনি অনেকক্ষণ পরে টের পেয়ে ঠেলে তোলেন। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এমন দেখলেই পরমার অস্বস্তি হতে থাকে। মনে হয় নিজেই তুলে দেয় সেটা। তোলা যায় না যদিও। সেভাবেই শুক্লাদি বলছিলেন, ‘তাহলে তুমি ছুটি নিয়ে হোমেই ঘুরে বেড়িয়ো। কোনও কাজ করতে হবে না তোমাকে। আর কী বলব!’

কথাটা জেনে এবার অর্পিতা বলল, ‘ও, তুই নতুন বলে শুক্লাদি ছাড় দিচ্ছেন। আমার বেলায় তো এমন হয়নি। অবশ্য সে কবেকার কথা! আর হলেই বা কী হত। যেতাম কোন চুলোয়! ভাল, ঘুরেই বেড়া তাহলে। তুই আজ আশ্রয় হোমের অতিথি।’

আবার হেসে সিমেন্টে ঢালাই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকল পরমা। ছুটিটা এড়ানো গেল না। তার ওপর এই! চাকরি করতে এসে এক দিনের অতিথি হয়ে গিয়েছে সে। কেমন যেন পাগলামো। তবে তাই হোক।

পশ্চিম দিকে পুকুর। অনেকদিন হয়ে গেল পরিষ্কার হয়নি। জলে শ্যাওলা পড়ে গিয়েছে। হোমের গাড়ির ড্রাইভার শংকরদা মাঝেমধ্যে জলে চুন দেয়। ভুলে গিয়েছে হবে। আজ খেয়াল করে দেখছে পরমা। পাড়ের চারপাশে কচি কচি ঘাসের জঙ্গল। জলের ওপর কিছু কলমি শাকের নরম ডগা ভাসছে। এখানে দুটো রাজহাঁস আছে। একটার পালকগুলো পুরো সাদা, অন্যটার সাদার মধ্যে এখানে ওখানে বাদামি। সে দুটো ঘুরছে পুকুরের মাঝখানে। কয়েকটা জলঢোঁড়া সাপও আছে। তারা মাথা তুলে এপার ওপার হলে চোখে পড়ে।

পুকুরের উলটো দিকে ছোটবাড়ি। দোতলা। তবে ওপরে কোনও ঘর নেই। জাল দিয়ে ঘেরা। মেয়েরা জামাকাপড় মেলে। ওরা থাকে একতলায়। চারটে ঘর। তাতে তিনটে করে লোহার র‍্যাক রাখা। এক একটা র‍্যাকে আবার তিনটে করে বাঙ্ক। সেখানে যার যার বিছানা পাতা। র‍্যাকগুলোর তলায় চাকা লাগানো। ঠেলে এদিক ওদিক করা যায়। হিসেবমতো এখানে মোট ছত্রিশজন মেয়ে থাকার কথা। আপাতত দুটো খালি। এই বাড়িতেই মেয়েদের একটা ঘরের দরজার পাশে পরমার বিছানা। অন্য ঘরে থাকে আর এক হোম-মাদার উর্মিলা। বাকি দুটোয় দু’জন মনিটর।

ছোটবাড়ির পিছনে ডাক্তারখানা। একটা ঘরে সপ্তাহে দু’দিন ডাক্তার বসেন। তার লাগোয়া আর একটা ঘর আছে। সেখানে থাকে জামাকাপড় আর একপাশে বাসনপত্র।

পরমা ছোটবাড়িতে ঢুকে পড়ল। মেয়েরা কেউ শুয়ে আছে, কেউ বিছানা গোছাচ্ছে। কেউ আবার দাঁতে ব্রাশ ঘষছে। মনিটর আয়েষা তার বিছানার চাদর ভাঁজ করতে করতে বলল, ‘গুড মর্নিং আন্টি।’

পরমা হাসে। দশটা থেকে ঢুকতে শুরু করে অফিস স্টাফরা। তারা সবাই সবাইকে মর্নিং উইশ করে। শুনে শুনে মেয়েরাও শিখে নিয়েছে। তবে আজকের মর্নিং তার নিজের কাছে গুড না কি ব্যাড, সে কথা জানে না পরমা।

এই সময় আর এক মনিটর জুলেখা বাথরুম থেকে চেঁচাতে চেঁচাতে বেরিয়ে এল। পরমাকে দেখেই সে বলল, ‘আন্টি, দেখবে চলো, বাথরুমগুলোর কী অবস্থা করে রেখেছে ওরা। বেসিন থাকতে ওখানেই খাওয়ার থালা ধোয়। পানি দেওয়ার বালাই নাই। দাঁত মেজে মেঝেতে থুতু ফেলে রাখে। কেউ আমার কথা শুনতেই চায় না।’

প্র‌থমটায় খুব রাগ হল পরমার। কেন যে ঘরে ঢুকল! তার তো আজ ছুটি। তারপর মনে হল, মেয়েরা তো এসব বোঝে না। একবার দেখেই যাই।

তবে বাথরুমে ঢুকে যা দেখল তাতে বমি বেরিয়ে আসার জোগাড়। গোটা গোটা ভাত, হলদে হয়ে যাওয়া সবজির টুকরো, পাকানো শাক চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। সঙ্গে টোকো গন্ধ। পরমা বুঝে উঠতে পারে না, এত বড় বড় সব মেয়ে, তারা এত নোংরা থাকে কী করে!

মুখোমুখি ঘরগুলোর মাঝখানে লম্বা প্যাসেজ। পরমা প্রায় সকলকে সেখানে জড়ো করল। কথাটা বলার ইচ্ছে ছিল না। তবু মেয়েদের শোনানোর জন্য চেঁচিয়ে উঠল— ‘ছোটবাড়ির মনিটর জুলেখাবিবি আর আয়েষা, এদের কথা যারা শুনবে না, বিকেলে তাদের বেরোনো বন্ধ।’

পরমা জানে, এই একটি জিনিসকে মেয়েরা ভয় করে। সারাবছর তারা আশ্রয় হোমের দুটো বাড়িতে আটকে থাকে। শুধু রোজ বিকেলে দু’ঘণ্টার জন্য বেরোতে দেওয়া হয়। তখনই যা হাত-পা ছড়িয়ে ঘুরে বেড়ানো। যদিও পুজো, ঈদ আর বড়দিনে নাকি নিয়ম অন্য। পরমা এখনও সেরকম কিছু পায়নি। তবে সে তো বছরে মাত্র কয়েকটা দিন। কোন সময়ে, কত দিন বিল্ডিংয়ের গেট খোলা থাকবে সেই মঞ্জুরি এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর নবনীতা দত্ত ফোনে জানিয়ে দেন হোম-ইনচার্জ সর্বাণী মিত্রকে। তিনি কম্পিউটার থেকে নোটিশের প্রি‌ন্ট আউট নিয়ে হোমের অফিসরুমে লটকে দেন। সেখান থেকেই জানতে পারে হোম-মাদাররা। বিকেল ছাড়া অন্য সময় খাবার জলটুকু নিতেও বাইরে আসতে পারে না মেয়েরা। ঘরের মনিটর সবার বোতল একসঙ্গে করে জল নিয়ে গিয়ে দেয়। সারাদিনের মধ্যে ওইটুকু বেরোনোও যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে দিনরাত ঘরের মধ্যেই আটকে থাকতে হবে মেয়েদের। তারা সেটা কোনওভাবেই চাইবে না।

পরমা জুলেখাকে বলল, ‘আজ থেকে যারা তোর কথা শুনবে না, এসে আমাকে বলবি, বুঝেছিস?’

ছোটবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল পরমা। ঢালাই রাস্তাটা ধরে আরও কয়েক পা এগিয়েই রান্নাঘরে পৌঁছে গেল। এখানে এখন হুড়োহুড়ি চলছে। সকালের টিফিন, দুপুরের খাবার। রান্নার সবিতামাসির দম ফেলার সময় নেই। একবার মুখটা তুলে একটু হেসে নিয়েই মন দিল নিজের কাজে। সকলেই ব্যস্ত। কিন্তু পরমাকে কেউ কোনও কাজের কথা বলতে পারছে না। সে এক কাপ চা ঢেলে নিয়ে বেশ আরামে সুড়ুত সুড়ুত করে খাচ্ছে আর দেখছে— এ মাথা থেকে ও মাথা কেমন তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছে সবাই। আজ তার কাজগুলোও পড়েছে ওদের ঘাড়ে।

চা শেষ করে পরমা চলে গেল রান্নাঘরের পিছন দিকে। এদিকটায় অনেকখানি জায়গা জুড়ে নারকেল, আম, জাম, পেয়ারা আর সুপুরি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। হোমের ভেতরে থেকেও এই জায়গাটায় নিজেকে মুক্ত বলে মনে হয় পরমার। আর আজ সময় যেন তাকে পাশে রেখে দৌড়চ্ছে। সে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের বাইরে।

গাছগুলোকে পিছনে রেখে একটু এগোলেই ছোট স্কুলঘর। এখন অবশ্য তালা ঝুলছে। দশটায় স্কুল বসবে। দুটো ঘর। বাঁশের ভেরা বাঁধা। ওপরটা খড় দিয়ে ছাওয়া। সেই খড় আসে পাশের গ্রাম থেকে। ড্রাইভার শংকর খোঁজ করে নিয়ে আসে। বছরে একবার খড় বদল হয়। দু’জন দিদিমণি আসেন। যাদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়েস পেরিয়ে গিয়েছে তারা বাইরের স্কুলে গিয়ে পড়তে পারে না। এখানে পড়ে। অবশ্য যাদের ইচ্ছে আছে তারাই শুধু আসে। তবে তাদের সঙ্গে চার-পাঁচ বছরের কয়েকটা মেয়েও আছে। দিদিমণিরা এসে দু’দলকে একসঙ্গে একই পড়া পড়িয়ে যান।

পাশে আরও একটা ঘর আছে। এটাও একইরকম। শুধু মাপে একটু বড়। যেসব মেয়েরা একেবারেই পড়তে চায় না তারা এখানে শাড়িতে এমব্রয়ডারির কাজ শেখে। শেখানোর জন্য একজন মহিলা আসেন, সোম থেকে শুক্র। এদের মধ্যে কিছু বাংলাদেশি মেয়ে আছে, তারা কাঁথা সেলাই করতে পটু। সুচ-সুতো দিয়ে নতুন নতুন নকশা তোলে।

বড়বাড়ির একজন মেয়ে হাতে একটা থালা ঝুলিয়ে একহাত মাপের লাঠি নিয়ে থালাটার পিছন দিকে পেটাচ্ছে। ঝন…ঝনা…ঝন…ঝন…। বিকট আওয়াজ। জলখাবারের বাজনা বাজছে। রোজ তিনবার একইরকম। যখনই পরমা এটা শোনে, তার মনে হয়, কোথায় যেন কী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হোমে এসে প্র‌থম এমন শুনে উর্মিলাকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এইভাবে আওয়াজ করে মেয়েদের খেতে ডাকা হয় কেন? যাকে দিয়ে থালা বাজাচ্ছ তাকেই তো রুমে পাঠানো যায়। খাবার খেতে মানুষকে এভাবে ডাকতে আছে!’

কথাটা শুনে দুই হোম-মাদার উর্মিলা আর প্রীতি হেসে উঠেছিল। ‘তোর মতো ভাবলে এরকম জায়গায় কাজ করা মুশকিল আছে। আমরাও এসে এই জিনিসই দেখছি। যা চলছে চলতে দে, আমাদের মাথা ঘামিয়ে কী লাভ? এত মেয়েকে কীভাবেই বা ডাকবি? এ তো বাড়ি নয় যে নিজের বরকে ডাকব— হ্যাঁ গো এসো, খাবার বেড়েছি।’ কথাগুলো বলার সময় উর্মিলা চোখ গোল করে ভুরুদুটো ওপরে তুলে হাত-মুখ নেড়ে বলছিল। শেষে হেসে গড়িয়ে পড়েছিল পাশের চেয়ারে।

উত্তর দিকে এই বড়বাড়ি। তিনতলা। দোতলা আর তিনতলায় আলাদা কোনও ঘর নেই। পুরোটাই একটা করে হল। তার লাগোয়া তিনটে করে বাথরুম। এক একটা হলঘরে উনিশটা র‍্যাক। এখানেও একটা র‍্যাকে তিনজন মেয়ে থাকে। কখনও বাড়ে, কখনও কমে। এখন রয়েছে পুরো একশো চোদ্দোজন। এছাড়াও এ বাড়িতে থাকে তিনজন হোম-মাদার অর্পিতা, সঞ্চিতা আর প্রীতি।

বড়বাড়ির একতলার বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই অফিস। অফিস ঘরের দেওয়ালে একটা ব্ল্যাকবোর্ড টাঙানো আছে। সেখানে রোজ চক দিয়ে মেয়েদের হিসেব লিখে রাখতে হয়। দু’বাড়ি মিলিয়ে মোট একশো আটচল্লিশ। না, তা তো নয়। ভুল হচ্ছে। প্লাস ওয়ান থাকে একজন। পাশে ব্র্যাকেটের ভেতরে তার নাম লেখা— জুলিয়েন। নামটুকুই দেখে আসছে পরমা। মেয়েটাকে কোনওদিন দেখেনি। সে নাকি হাসপাতালে। তবে রয়েছে হিসেবের মধ্যেই।

অফিসের পাশেই একটা লম্বা-চওড়া ঘরে রোজ রেজিস্টার খাতায় মেয়েদের নাম ডাকা হয়। সন্ধে ছ’টায় এখানেই মেয়েরা টিফিন খায়। সেই ঘরটাতেও এখন কাঠের পার্টিশন দিয়ে আলাদা জায়গা বের করা হয়েছে। দু’মাসের একটা বাচ্চা আছে সেখানে।

কোন হাসপাতালে সবে জন্মানো এক মেয়েকে ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল মা। যে ঠিকানা দিয়ে ভর্তি হয়েছিল সেটা ঝাড়খণ্ডের। পুলিশ সেখানে গিয়ে কাউকে খুঁজে পায়নি। হাসপাতাল শিশু কল্যাণ কমিটির কাছে চিঠি লেখে। তারাই এই হোমে যোগাযোগ করে বাচ্চাটাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওই পার্টিশনটাই তার আশ্রয়। বাচ্চাটার জন্য দিন-রাতের দু’জন আয়া রাখা হয়েছে। আয়া মানে পাশের গ্রামের কোনও বাড়ির বউ।

বড়বাড়ির পিছন দিকে লম্বালম্বি বিশ ফুট মাপের একটা আটচালা, ওপরে অ্যাসবেস্টস। রান্নাঘর থেকে ভাত-তরকারির বড় বড় ডেকচি এখানে এসে জড়ো হয়। খাওয়ার ঘণ্টা পড়লে মেয়েরা থালা হাতে নেমে আসে। যার যার থালা-বাটি-গেলাস তার কাছেই থাকে। খাওয়া হয়ে গেলে নিজেদেরই ধুয়ে তুলে রাখতে হয়। অফিসঘরের পাশে লোহার গ্রি‌ল দিয়ে খাঁচা মতো করা আছে। তার ভেতর দিয়ে এসে লাইন দেয় তারা। হোম-মাদাররা গ্রিলের বাইরে থেকে গোল গোল বড় হাতায় খাবার তুলে খোপের ভেতর দিয়ে গলিয়ে থালায় চালান করে দেয়। কোনওদিন শাকভাজা আর মাছের ঝোল, কোনওদিন আলু-কুমড়োর ঘ্যাঁট, কখনও ডিম কিংবা পাঁচমিশেলি তরকারি।

পাশেই একটা ঘর আছে, সঙ্গে বাথরুম। হোম-মাদাররা এখানে স্নান করে তৈরি হয়। তাছাড়াও নিজেদের মতো কিছুক্ষণ সময় কাটাতে পারে। বেশি আসে পরমা আর সঞ্চিতা। দু’জনেরই বয়েস কাছাকাছি। কখনও গল্পগাছা গড়ায় তাদের।

এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।

অলঙ্করণ – দেবাশিস সাহা

মৃত্তিকা মাইতির জন্ম ১৯৮৯ সালে, পূর্ব মেদিনীপুরে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরে নিজের চেষ্টায় যা শিখেছেন তাতে তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁত বোনা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি পর্যন্ত সবই করেছেন জীবনের প্রয়োজনে। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। লেখালেখিতে নবীন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

পরের পর্ব :

পাখিঘর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ২

Shares

Comments are closed.