মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ তৃতীয় পর্ব। 

 

মধুমালতী বুঝতে পারল, সমস্যাটা জটিল দিকে যাচ্ছে। মাথা ঠান্ডা করে সামলাতে হবে। ভয়ে পেয়েছি বুঝতে দিলে চলবে না। সে এক পা এগিয়ে ছেলেটির পিঠে হাত রাখে।

‘‌ভাই, এদিকে এসো। তোমাকে একটা কথা বলি।’

একটু অন্ধকারে নিয়ে গিয়ে ছেলেটির হাতে ক’টা একশো টাকার নোট ধরিয়ে দেয়।

‘‌এটা কী দিদি!‌‌’‌

মধুমালতী ফিসফিস করে বলে, ‘‌তুমি আমাদের এখান থেকে বেরোবার শর্টকাট পথটা দেখিয়ে দেবে। আরও পাঁচশো টাকা দেব।’

ছেলেটি চাপা গলায় বলল, ‘‌মাছশ্যামা আমাকে মেরে ফেলবে।’‌
মধুমালতী বলে, ‘‌জানতে পারবে না। তুমি মোটরবাইক নিয়ে সামনে যাবে। এই নাও আরও দু’শো টাকা রাখো।’‌
ছেলেটি কাঁপা গলায় বলল, ‘‌দিদি, ওই লোক ভয়ঙ্কর। ওর কাছে রিভলভার আছে। পরে আপনাকে খুঁজে বার করে মারবে। কলকাতায় ওর গুন্ডা আছে।’‌

মধুমালতী আরও একশোটা টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘‌কলকাতা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। মালিককে মোবাইলে বলে দাও আমি মোটরবাইকে উঠতে রাজি হইনি। গাড়ি আমাকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে। নাও, আর দেরি কোরো না, তোমার মোটরবাইকে ওঠ।’‌ ‌

সে দিন বেরিয়ে আসতে পারলেও মধু ভয় পেয়েছিল খুব। যত ক্ষণ না বড় রাস্তা পেয়েছে দম বন্ধ করে বসেছিল। ছেলেটা যদি ভুল পথে নিয়ে যেত, কিচ্ছু করার ছিল না। ওইটুকু ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। গরিব ছেলে, অতগুলো টাকার লোভ সামলাতে পারল না। ছেলেটার চেহারা দেখেই মনে হয়েছিল, কোথাও একটা ভালমানুষি আছে। ওই মনে হওয়াতে ভুল হলে একটা কেলেঙ্কারি হতো।

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব: মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

পড়ুন আগের পর্ব:  মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ২

ঘটনা এখানে শেষ হয়ে গেল ভেবেছিল মধুমালতী। হয়নি। শ্যামাপদ মাল্লা মোবাইল নম্বর জোগাড় করে এক দিন দিনের বেলাতেই ফোন করল।

‘‌দিদিভাই, এটা অন্যায় হল। আপনাকে আমি নেমন্তন্ন করলাম, আপনি আমাকে ঘুরিয়ে দিলেন? কী করতাম রিভলভার দিয়ে গুলি করে মেরে আপনাকে জলে ফেলে দিতাম?‌ দুটো সিদ্ধ খাই বলে এত অপমান?‌’‌

মধুমালতী কড়া গলায়‌ বলল, ‘‌আপনি ভয় দেখাচ্ছেন?‌’‌

ওদিক থেকে মাছশ্যামা বলল, ‘‌ছি ছি, দিদিভাই ভয় দেখাব কেন?‌ শিকার ফসকে গেলে কেউ ভয় দেখায়? ভয় পায়। আপনাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছি। আপনি নিশ্চয় এরকম ভাবে আরও অনেককে ঠকিয়ে পালিয়েছেন। কার রাগ থেকে যায় কে জানে!’‌
মধুমালতী বলে, ‘‌আমাকে নিয়ে ভয় পেতে হবে না। ফোন ছাড়ুন।’‌
শ্যামাপদ মাল্লা বলল, ‘‌সাবধানে থাকবেন দিদিভাই। দিনকাল ভাল নয়।’‌

সর্তক হল মধুমালতী। একবার ভাবল, পুলিশকে বলে রাখবে, তার পর মনে হল, জীবনের একটা সময় এত পুলিশ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে, আর নয়। ঠিক করল, এক জন বডিগার্ড রাখবে। দেহরক্ষী। খোঁজ নিতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত অনেক ভেবেচিন্তে যাকে পছন্দ হল সে একটা মেয়ে। বেঁটেখাটো গাট্টাগোট্টা চেহারা। রিভলভার চালাতে জানে। ছুরি, ব্লেড দিয়ে গলা অথবা শরীরে কোনও একটা জায়গা চিরে দিতে পারে। এতে যে আক্রমণ করতে আসে, সে রক্ত দেখে বিরাট ঘাবড়ে যায়। পালানোর পথ খুঁজে পায় না। এই মেয়ে গলায় ফাঁস পরাতে পারে। পুরুষমানু্ষের শরীরের সবথেকে স্পর্শকাতর জায়গায় এমন ভাবে মারতে পারে যে সেই ব্যথা সামলাতে পাক্কা দু’দিন লেগে যাবে। পেশার ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর প্রকৃতির। তবে যত না নিষ্ঠুর, তার থেকে বেশি নির্বিকার। ছোটবেলা থেকে দারিদ্র‌্য আর নানা ধরনের অত্যাচার তাকে নিষ্ঠুর করছে। ঠকতে হয়েছে বারবার। ফলে ক্রুর আচরণ তাকে বিচলিত করে না। সে নির্বিকার থাকে।

এই মেয়ে এক সময়ে অর্জুন ধিমানী নামে এক অবাঙালি লোকের গলা কেটে খুন করেছিল। লোকটির সঙ্গে তার প্রেম ছিল। সেই প্রেম মন থেকে শরীরে যায়। এক বার অ্যাবরশনও করতে হয়। পরে অর্জুন সম্পর্ক অস্বীকার করে। স্বাভাবিক ঘটনা। গরিব ঘরের মেয়ে। মদত দেওয়ার মতো পিছনে কেউ নেই। ছোটোবেলা থেকে সবাই যেভাবে ঠকিয়েছে, এই লোকও তাই করে। তবে মেয়ে এবার আর ছাড়েনি। শোনা যায়, সে অর্জুন ধিমানীকে খুন করে। ছুরি দিয়ে নয়, খুন করে দাড়ি কামানোর ক্ষুর দিয়ে।

এক রবিবার সকালে সে অর্জুনের বাড়ি যায়। অর্জুন মোড়ায় বসে রেডিওয় এফএম চ্যানেলে হিন্দি গান শুনছিল এবং দাড়ি কামাচ্ছিল। সামনের চেয়ারে রাখা ছিল একটা গোল আয়না। মেয়েটি আসায় সে বিরক্ত হয়। তবে মুখে আপত্তি কিছু করে না। মেয়েটি এটা সেটা বলতে বলতে অর্জুনের পিঠে ভর দিয়ে নরম গলায় বলে, বিয়ে করতে হবে না। শুধু তাকে মাঝেমধ্যে আদর করলেই চলবে। তার শরীর ছটফট করে। এই প্রস্তাবে অর্জুন খুশি হয়। সে কথা চালাতে শুরু করে। একটু আধটু টাকাপয়সা দেওয়ার কথাও বলে। একটা পর্যায় মেয়েটি জামা কাপড় খুলতে খুলতে বলে, ‘‌দেখো, তুমি না বাসলেও আমি আজও তোমাকে কত ভালবাসি।’ এক সময়ে সব কিছু খুলে নগ্ন হয়ে যায় সে। ঘুরে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এতে গালের এক দিক ভর্তি সাবান নিয়েও অর্জুন ধিমানী সামান্য বিচলিত হয়। যতই অনেক বার দেখা থাকুক, মেয়েমানুষের শরীর তো। একই শরীর বারবার অচেনা হয়ে আসতে পারে। নারীশরীর পুরুষকে যেমন ভালবাসে তেমন জব্দও করতে পারে। তবে মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যই বিচলিত হয়েছিল অর্জুন। সেই মুহূর্তটুকুকেই কাজে লাগায় মেয়েটি। নীচু হয়ে ঝুঁকে নাকে ঠোঁটে শরীরের স্পর্শ দিয়ে ক্ষুরটা তার হাত থেকে কেড়ে নেয় এক ঝটকায়। নিমেষে গলায় টেনে দেয়।

সব শেষ হতে খানিক ক্ষণ লাগে। মোড়া থেকে পড়ে যাওয়া, মেঝেতে শুয়ে ছটফট করা, রক্তে চার পাশ ভেসে যাওয়াতে সময় তো লাগবেই। সেই সময়টা দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েটি জামাকাপড় গায়ে দেয়। পাশের টেবিলে রাখা অর্জুনের চিরুনি দিয়ে মাথার চুল আঁচড়ায়।  ক্ষুরের রক্ত ও হাতের ছাপ অর্জুন ধিমানীর জামা দিয়ে পরিষ্কার করে, তারপর ধরিয়ে দেয় মেঝেতে চোখ ঠিকরে পড়ে থাকা মৃত মানুষের হাতে। ঘরের ভিতর থেকে দরজা আটকে দেয়। বারান্দার দরজা খুলে, বারান্দায় যায়। আকাশে ছিল মেঘের ঘনঘটা। খানিক আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। মেয়েটি খুব সাবধানে বারান্দার রেলিং টপকে দোতলা থেকে কার্নিশে নামে। এটা বাড়ির পিছন দিক। সেখান থেকে পাঁচিল বেয়ে একতলায় নেমে যায়। বাড়িতে ওঠার সিঁড়ির নিচে রাখা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ‘‌কিছুই হয়নি’‌ ভান করে। কেউ তাকে দেখে বলে মনে হয় না।

পথে যেতে যেতে কানে মোবাইলের ইয়ারফোন গুঁজে দিয়ে গান শুনতে থাকে। নিজের বাড়ি ফিরে এসে আনাজ কেটে রান্না করে। তার পরে বাড়িতে তালা দিয়ে স্টেশনে গিয়ে দু’টো কুড়ির ট্রেন ধরে। কলকাতায় সেই গাড়ি ঢোকে চারটে বারোতে। এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করবার পর, মেয়েটি একটু ক্লান্তি বোধ করে। সস্তার টিকিট কেটে একটি সিনেমাহলে ঢোকে এবং ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে যখন সিনেমাহল থেকে বেরোয় দেখে তুমুল বৃষ্টিতে শহর ভেসে গেছে।

পুলিশকে বোকা বানানো সহজ নয়। মেয়েটি দ্রুত ধরা পড়ল। ধরতে যথারীতি পুলিশ তেড়ে জেরা করে। মারধরও হয়। শেষ পর্যন্ত জেলে ঢুকতে হয়। তবে এক বছর যেতে না যেতে প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাসও হয়। তার বিরুদ্ধে কোনও কিছুই প্রমাণ করা যায় না। এমনকী মেয়েটি যে সেই সময়ে ওখানে ছিল তা-ও নয়। বরং যে লোকটি  খুন হয়েছে তার হাতে লেখা একটি চিঠি মেয়েটির উকিল আদালতে জমা দিয়েছিল। তাতে হিন্দি–‌বাংলায় মেশানো ভুল বানানে, বিশ্রী হাতের লেখায় লেখা— ‘‌তোমাকে না পেলে আমি সুইসাইড করব। কী ভাবে করব, তা-ও জানিয়ে রাখছি। আমি যে ক্ষুর দিয়ে দাড়ি কামাই সেটা নিজের গলায় চালিয়ে দেব।’‌

উকিলবাবু আদালতে চিঠি পেশ করে বলেছিলেন, ‘‌ধর্মাবতার, এই ব্ল্যাকমেলের চিঠি আমার মক্কেল আজ হাজির করছে না, যবে পেয়েছিল, সেদিনই থানায় জমা করে। থানা স্ট্যাম্প মেরে জমা নেয়। এই দেখুন সেই কপি।’

এরপরে‌ বেসকুর খালাস ছাড়া উপায় কী?‌

এই মেয়েকে মধুমালতী পেয়ে গেল। তার কর্মকাণ্ড শুনে বুঝতে পারল শ্যামাপদ মাল্লা ধরনের লোককে সামলাতে গেলে এইরকম বডিগার্ডই তার দরকার।

‘‌তুমি ‌আমার বডিগার্ডের কাজ করতে পারবে?‌’‌
‘‌আপনি ঠিকমতো টাকা দিলে পারব, না দিলে পারব না।’‌
‘‌কীভাবে কাজ করবে ?‌’‌
‘আপনি‌ ইশারা করবেন। মেরে দেব।’
ম‌ধুমালতী আঁতকে উঠে বলে, ‘সে কী!‌ মেরে দেবে মানে!‌ যখন তখন মানুষ খুন করা যায় নাকি?’‌

মেয়েটি সহজ ভাবে বলে, ‘যাবে না কেন?‌ অবশ্যই যায়। পয়সা কেমন পাচ্ছি তার ওপর নির্ভর করছে। ‌আপনি যেমন ইশারা দেবেন, তেমন মার দেব। হাত ভাঙতে বললে হাত ভাঙব, দু‘‌পায়ের মাঝে লাথি মারতে হলে মারব, ব্লেড চালাতে হলে চালাব। যদি মেরে ফেলতে বলেন, তা-ই করব। মেরে ফেলবে।’

মেয়েটির নাম বলাকা। সুন্দর নাম। নাম শুনলেই মনে হয় এক ঝাঁক আকাশে দূর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। নাম বলাকা হলেও এই মেয়ে কিন্তু ‘‌বলাকা’‌র মতো সুন্দর নয়। বরং উল্টো। বয়স বোঝা যায় না। একুশ বাইশ হতে পারে, আবার তেইশ–‌চব্বিশও হতে পারে। আগেই বলা হয়েছে বেঁটেখাটো, গাট্টাগোট্টা চেহারা। গায়ের রঙ ময়লার থেকেও বেশি। কালো বলাই উচিত। গোলপানা মুখে নাক থ্যাবড়া, চোখ ছোটো। মুখে মঙ্গোলিয়ান ধাঁচ রয়েছে। এই বয়েসের মেয়েদের মধ্যে যে স্বাভাবিক মিষ্টত্বটুকু থাকে, বলাকার মধ্যে সেটাও নেই। তবে আর পাঁচটা মেয়ের মতো নিজের চেহারা নিয়ে সে একবারেই চিন্তিত নয়। থ্যাবড়া করে খানিকটা পাউডার বা মোটা করে লিপস্টিক লাগিয়ে সে তার অসৌন্দর্য ঢাকবার চেষ্টা করে না। চেহারা নিয়ে সে মোটেই ভাবিত নয়।

কম কথা বলা এই মেয়ে যেদিন যেদিন মধুমালতীর ফোন পায় চলে আসে। রোজ তাকে আসতে হয় না। কলকাতা থেকে একটু দূরে গেলেই তাকে ডাকা হয়। ফাংশন সাধারণ সন্ধ্যের পর হয়। বলাকা সকালের দিকে একটা কাজ করে। দরজির দোকানে সেলাইয়ের কাজ। জেলে থাকার সময় সেলাই শিখেছিল। মেয়েটির বড় গুণ হল, মধুমালতীর বিষয়ে কোন উৎসাহ নেই। সে এমন এক জনের বডিগার্ড হয়েছে, যে গ্ল্যামার জগতের সঙ্গে যুক্ত। উচ্চ মার্গের কিছু না হলেও গ্ল্যামার তো বটেই। স্টেজ, মেকাপ, ড্রেস, আলো, শরীর সবই আছে। ‘‌দিদি’‌ গান গেয়ে রোজগার করে। অন্য কোনও মেয়ে হলে নানা রকম কৌতূহল দেখাত। বলাকা দেখায় না। কোনও দিন হয়তো আগে চলে এলো, ব্যাগে করে আনা সেলাই ফোঁড়াই বার করে কাজ করে। নয়তো মোবাইল ফোন নিয়ে খুটখাট করে। মধু তখনও রেওয়াজ করছে।

‘‌কী রে, ভাল লাগছে?‌’‌
বলাকা ঠান্ডা গলায় বলে, ‘‌লাগছে।’‌
মধুমালতী বলত, ‘‌ও রকম করে বলছিস কেন?‌ ভাল করে বল। কোথাও খটকা লাগছে না তো?‌ সুর কাটছে?‌’‌
বলাকা গম্ভীর ভাবে বলে, ‘‌আমি গান বুঝি না দিদি।’‌
মধু বিরক্ত গলায় বলে ‘‌গান বোঝা না বোঝার কী আছে?‌ এই সব গান তো শুনিস।’‌
বলাকা বলে, ‘‌না শুনি না।’‌
মধুর এ বার রাগ হয়। গানের বাড়িতে কাজ করে, অথচ গান শোনে না!‌ এ কেমন স্বভাব?‌
‘‌কেন শুনিস না?‌’
বলাকা বলে, ‘‌গান শোনার সময় কই?‌ রোজগারের পিছনেই দিন কেটে যায়।’‌
মধু বলত, ‘‌রোজকার তো ভালই করছিস। আমার সঙ্গে আছিস, সেলাই করছিস। একলা মানুষ। খরচাপাতিও তেমন করিস না। আর রোজগারের কী দরকার?‌’‌
বলাকা সংক্ষেপে বলে, ‘‌দরকার আছে।’‌
মধু অবাক হয়ে বলে, ‘‌ বাড়িতে আরও টাকা লাগে?‌‌’‌
বলাকা উঠে যাওয়ার আগে ঠান্ডা গলায় বলে, ‘‌না। অন্য দরকার আছে।’‌
বলাকা হাবেভাবে স্পষ্ট করে দেয়, সে চাইছে না এই  বিষয়ে আরও কথা চলুক। কোনও বিষয়ে অতিরিক্ত কথাই তার পছন্দ নয়। মধুও বেশি ঘাঁটায় না। তারপরেও এক দিন না বলে পারেনি।

‘‌একটা কথা জিজ্ঞেস করা উচিত নয়, তার পরেও করব। কারণ তুই আমার কাছে কাজ করিস, সত্যিটা জেনে রাখা দরকার।’‌
বলাকা নিস্পৃহ ভাবে বলে, ‘‌তোমার কাছে ডিউটি করি মানে সব সত্যি বলতে হবে তার কোনও মানে নেই।’‌
মধুমালতী বলে, ‘‌তা হলে বলিস না।’
‘‌আগে প্রশ্নটা শুনি। বলা-না-বলা তো আমার ইচ্ছের ওপর।’‌
মধুমালতী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। বলে, ‘‌তুই নাকি একটা লোককে.‌.‌.‌ক্ষুর দিয়ে.‌.‌.‌।’‌
বলাকা সহজ ভাবে বলে, ‘‌পুলিশকে বলেছিলাম, আমি খুন করিনি। তোমাকে বলছি, হ্যাঁ, ক্ষুর গলায় টেনে দিয়েছিলাম। আর কিছু জিজ্ঞেস করবে?‌’
মধুমালতী বলল, ‘‌না। তুই কিছু মনে করলি না তো?‌’‌
‘‌আমি চট করে কিছু মনে করি না। তোমাকে সত্যিটা বললাম, এতে আমার ওপর তোমার ভরসা বাড়বে।’‌‌‌

মধুমালতী বুঝেছিল, এই মেয়েটার থাকা দরকার। থাকলে বাইরের বদ মতলবের লোকেরা বিরক্ত করতে সাহস পায় না। ঘরেও সেফ। মিউজিশিয়ান, অর্গানাইজারদের যাতায়াত রয়েছে। অন্য পুরুষও আছে। যতই চেনা হোক, পুরুষমানুষকে বিশ্বাস করা যায় না।  তবে সব থেকে বড় কথা, বলাকার নিস্পৃহ ভাব।

প্রথম দিন ইন্টারভিউয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ে মধুমালতী এই মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বডিগার্ডের কাজ করতে চাইছ, তোমার কাছে কোনও উইপন আছে?‌’‌
বলাকা বলেছিল, ‘‌আছে।’‌
মধুমালতী বলল, ‘‌কী উইপেন?‌’‌
বলাকা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘‌রিভলভার আছে।’‌
মধুমালতী থমকে যায়। ভুরু কুঁচকে বলে, ‘‌রিভলভার!‌ রিভলভারের লাইসেন্স আছে?‌’‌
বলাকা বলে, ‘‌আছে। দেখবেন?‌’
মধুমালতী বলল, ‘‌না। লাইসেন্স কী ভাবে পেলে?‌’‌
বলাকা বলে, ‘‌কিছু দিন সিকিউরিটি সার্ভিসে কাজ করেছি। ওরা গভর্নমেন্টের কাজ পেয়েছিল‌। সেখানে লেডিজের দরকার হয়। ওরাই আমাকে লাইসেন্স করে দেয়।’‌
মধুমালতী  ভুরু কুঁচকে বলে, ‘‌কাজটা কী ছিল?‌’‌
বলাকা বলে, ‘‌এক জনের কাজ আর এক জনকে বলা যাবে না।’‌

ব্যাস, এই কথা শোনবার পর মেয়েটিকে নিতে আর দেরি করেনি মধু। দুয়েক জন বলেছিল, প্রফেশনাল লোক রাখো। যাদের বাউন্সার বলে। লম্বা–‌চওড়া চেহারা হবে। ব্ল্যাক ক্যাট। ওদের নিলে দেখাবেও ভাল। প্রেস্টিজ বাড়বে। মধুমালতী কান দেয়নি। এ ধরনের সিকিউরিটি রাখতে অনেক খরচ। মাচা সিঙ্গারের অত খরচের মুরোদ নেই। তা ছাড়া, এতে ছোটোখাটো ফাংশন হাতছাড়া হয়ে যাবে। বেশি দামী শুনলে শনিপুজো, ইতুপুজো, ঘটিপুজো, ফুটবল টুর্নামেন্টের ট্রফি জেতার ফাংশন, পাড়ার ক্লাবের পঁচিশ বছরে ডাকই জুটবে না। মনে হবে কাক গায়ে ময়ূরের পালক লাগিয়ে ঘুরছে। তার বডিগার্ড লোক দেখানোর হলে চলবে না। পুরুষমানুষের ঝামেলা ঠেকানোর জন্য দরকার।

বলাকাকে ফাংশনের সময় গ্রিনরুম, স্টেজের কাছে রাখে মধুমালতী । শুরুতে স্টেজে ওঠার সিঁড়ির মুখটায় থাকে। যাতে হুটহাট কেউ উঠে যেতে না পারে। শেষ হলে একেবারে স্টেজে এসে পাশে দাঁড়ায়। গাড়িতে ওঠা পর্যন্ত পাশ ছাড়ে না।

তবে সব ফাংশনে যে বালকাকে মধুমালতীর লাগে না, সে তো আগেই বলা হয়েছে। এই মেয়ে ক্যারাটে জানে না। কনুই দিয়ে গোঁত্তা দিতে জানে। সেই গোঁত্তা তলপেটে লাগলে সামলানো মুশকিল। হাতের পাঞ্জাগুলো ছোটো, কিন্তু শক্তপোক্তো। কাউকে চেপে ধরলে ছাড়ানো কঠিন। হাতের আঙুলগুলো বেঁটে হলেও জোর আছে। সেরকম সমস্যা থাকলে শার্ট বা শালোয়ার তুলে কোমরে রাখা রিভলভারটা কায়দা করে দেখিয়ে দেয়। মধুমালতীকে সে বলেছিল, ‘উইপন সব সময়ে বার করতে হয় না। ‌অনেক সময়ে শো-তেই কাজ হয়ে যায়।’

কাজ সত্যি হয়। গায়ের ওপর পড়তে আসা পুরুষমানুষের ভিড় পাতলা হয়ে যায়।

যাই হোক, আবার আগের কথায় ফেরা যাক।

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

পড়ুন পরের পর্ব :  মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৪

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More