মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ নবম পর্ব।

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব: মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

পড়ুন আগের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৮

কলকাতা বা কাছাকাছি হলে মধু নিজের গাড়িতে যায়। সাউন্ড নিয়ে মিউজিক হ্যান্ডসরা আগে চলে যায় বড় গাড়িতে। দূরে কোথাও যেতে হলে অবশ্য মধু সেই গাড়িতেই ওঠে। বেশি দূরে নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে খরচ পোষাবে না। গত তিন বছর ধরে মধুর গাড়ি চালাচ্ছে পরাণ। মধু ডাকে ‘‌পরানদা’‌। বয়স্ক পঞ্চাশের ঘরে। ধর্মপ্রাণ মানুষ। মাথায় চন্দনের তিলক কেটে আসে। অতিরিক্ত সাবধানে গাড়ি চালায়। রাস্তা ফাঁকা পেলেও স্পিড তোলে না। এই ড্রাইভারে সবার আপত্তি।

‘‌পরাণদার গাড়িতে চড়লে বাড়ি পৌঁছতে রাত কাবার হয়ে যাবে।’‌
মধু বলে, ‘‌হোক কাবার। গাড়ি সাবধানে চালানোই উচিত।’‌

মধু যে গাড়িতেই প্রোগ্রামে যায়, গাড়ির সামনের সিটে বলাকা বসে। চুপ করে থাকে। গোড়ার দিকে মিউজিক হ্যান্ডসের দু’–‌এক জন কথাবার্তা বলার চেষ্টা করেছিল। সুবিধে করতে পারেনি। লিড গিটারের কঙ্কন ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছিল। এক দিন ফাংশন শেষে আড়ালে পেয়ে, কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, ‘‌তোমার রিভলভারে গুলি আছে বলাকা?‌’
বলাকা মুচকি হেসে বলেছিল, ‘‌না, রিভলভারে নেই, হাঁটুতে আছে।’‌

বলতে বলতে জিনস পরা বাঁ পা-টা সে অল্প তুলেছিল। নিমেষের আঘাতে মুখ দিয়ে ‘‌কঁক’ করে এক ধরনের ‌চাপা আওয়াজ করতে পেরেছিল কঙ্কন। ফেরার সময়ে গোটা পথ গাড়িতে এক দিকে কাত হয়ে বসতে হয় তাকে। ব্যথায় কুঁকড়ে ছিল। সবাই জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছে?‌ কোথায় লেগেছে?‌ কী ভাবে লাগল?‌ কঙ্কন একটারও জবাব দিতে পারেনি। শুধু বলেছিল, ‘‌ও কিছু নয়, ঠিক হয়ে যাবে।’

বলাকা মুখ ফিরিয়ে তাকায়ওনি।‌

বলাকা আর বিলুর মধ্যে সম্পর্কেও সমস্যা আছে। মনে হয়, দু’জনে দু’জনকে দেখতে পারে না। মুখোমুখি হলে হয় মুখ ঘুরিয়ে নেয়, নয়তো খোঁচা দিয়ে কথা বলে।

তালড্যাংরার একটা প্রোগামে তো দু’জনে রীতিমত ঝগড়া লেগে গেল। স্টেজের পিছনে সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল বলাকা। খবর ছিল, এলাকাটা গোলমেলে। আগে কয়েক বার ফাংশনের সময়ে ঝামেলা হয়েছে। বলাকা অ্যালার্ট ছিল। বিলুও সেদিন গিয়েছিল। সে স্টেজে চেয়ার টেনে বসতে যায়। বলাকা আপত্তি করে। সিঁড়ির পথ ফাঁকা রাখতে হবে। দরকার হলে ‘‌দিদি’কে তাড়াতাড়ি বার করে নিয়ে গাড়িতে তুলে দিতে হবে। বিলু রেগে যায়।

‘অ্যাই মেয়ে, তুমি জানো আমি কে ‌?‌’‌
বলাকা নিস্পৃহ ভাবে বলেছিল, ‘‌জানার দরকার নেই।’‌
বিলু চোখ কটমট করে বলেছিল, ‘‌তোমার দিদিকে আমি আঠেরো বছর ধরে চিনি। আমি তার বাড়িতে থাকি তুমি জানো না?‌’‌
বলাকা ঠান্ডা গলায় বলে, ‘‌কিছু এসে যায় না। আপনি এখানে দাঁড়াবেন না।’‌
বিলু দাঁতে দাঁত পিষে বলে, ‘‌তোমার দরদ বেশি মনে হচ্ছে।’‌
বলাকা বলে, ‘‌দরদ নয়, টাকা বেশি। নিরাপদ রাখবার জন্য দিদি আমাকে অনেকটা টাকা দেন। আপনি সরুন।’‌
বিলু চাপা গলায় বলে, ‘‌মধুর সঙ্গে তোমার যোগাযোগ কে করিয়ে দিয়েছিল?‌ আমি করিয়ে দিয়েছিলাম।’

এটা সত্যি। বলাকার খবর মধুমালতীকে বিলুই প্রথম দেয়। সে কোথাও থেকে এই মেয়ের খবর শুনেছিল। মধুমালতীও‌ তখন বডিগার্ড খুঁজছে।

বলাকা বলে, ‘‌আপনি যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন বলে ডিউটি করব না? আপনি এখান থেকে সরে যান।‌’
বিলু বলে, ‘‌তোমাকে‌ দেখে নেব।’
‌বলাকা এই হুমকিতে পাত্তা না দিয়ে সে দিন বলেছিল, ‘‌আচ্ছা দেখবেন।’‌

এই ঝগড়ার কথা দলের সবাই জানে। মধুমালতীর কানে গেলে সে দু’জনকেই আলাদা করে ধমক দেয়।

বিলু বলেছিল, ‘তুই জানিস না, ওটা একটা বদ মেয়ে!’‌‌
মধু বলেছিল, ‘‌আমার বদ মেয়েই দরকার। তুই ওকে ওর ডিউটি করতে দিবি। আর কোনও দিন যেন না শুনি প্রোগ্রামে গিয়ে ঝগড়া করেছিস। সবাই সে দিন শুনেছে। ছিঃ ছিঃ।’‌
‘‌তোর প্রোগ্রামে আর কখনও যাবই না।’‌
মধু বলেছিল, ‘যেতে হবে না। আমার লোকদের কাজে নাক গলাবি না। তোকে বাড়িতে থাকতে দিয়েছি দয়া করে। কোনও রকম মাতব্বরি করবি না।’

বিলু মাথা নামিয়ে নেয়।

আর বলাকা বলেছিল, ‘দিদি, বিলুদাকে কাজের সময়ে আমার ধারে কাছে আসতে বারণ করে দেবেন।’‌
মধু তাকে শান্ত করবার জন্য বলেছিল,‌‘‌আহা, ও তো আমার সঙ্গে অনেক দিন আছে। ও আমার খারাপ চাইবে কেন?‌’‌
বলাকা বলল, ‘‌সে সব জানি না। আমাকে বিরক্ত করে। এক দিন বলল, গাড়িতে ও নাকি সামনের সিটে বসবে। আর এক দিন বলেছে, যে দিন যে দিন উনি থাকবেন, স্টেজে আমাকে থাকতে হবে না।’‌
মধু হাত তুলে শান্ত করতে চাইল। বলল, ‘‌তুই তো এত ঝগড়ার মধ্যে যাস না বলাকা।’
বলাকা চোখ-মুখ লাল করে বলল, ‘‌তোমার ওই লোক ঝগড়া করতে বাধ্য করছে। যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল বলে মাথা কিনে নেয়নি। সে দিন বলছে, প্রোগ্রামের সময় তোমাকে দেখলাম মেলায় ঘুরে আইসক্রিম, ঘুগনি খাচ্ছো। এই তোমার ডিউটি?‌’‌‌
মধু হেসে ফেলে বলল, ‘ছেলেমানুষি বন্ধ কর বলাকা। ‌আমি ওকে বলে দিয়েছি। তুইও ঝামেলা করবি না।’

বলাকার ছেলেমানুষি রাগ কমল না।

বলল, ‘সে দিন আসতে দশ মিনিট দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে, হাত উল্টে ঘড়ি দেখার ভান করল। নিজের মনে বলল, বডিগার্ডের বদলে এদের টাইমগার্ডের ট্রেনিং নেওয়া উচিত।’‌ ‌
মধু হো হো করে হেসে উঠল। বলাকা গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

বলাকা গেলে বিলু খুব একটা মধুমালতীর সঙ্গে প্রোগ্রামে যায় না।

তবে বলাকা আজ যায়নি, বিলুও আসেনি। সে বাড়িতে রয়ে গেছে। তার জ্বর। বিকেলে বেরোনোর সময় মধু দেখল নিজের ঘরে চাদর গায়ে কুঁকড়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। কপালে হাত দিল। জ্বর খুব বেশি নয়, তবে গা গরম। ঘুম না ভাঙিয়ে বেরিয়ে আসে মধু। ‌

মধুমালতী আজ গানের মুডে ছিল। পার্টি ভাল টাকা-পয়সা দিচ্ছে।
একটা রবীন্দ্রনাথ, দুটো চালু বাংলা সিনেমা, একটা পুরনো আধুনিকের পর মধু  ফোক ধরেছে।

‘‌এক ফুলে চার রঙ ধরেছে\‌ সে ফুলে ভাব নগরে কি শোভা করেছে\‌ কারণবারির মধ্যে সে ফুল \‌ভেসে বেড়ায় একূল ওকূল.‌.‌.‌।’‌

গলা তুলেছিল তার সপ্তকে।

আজকাল প্রোগ্রামে ফোক লাগে। লোকসঙ্গীত। শুধু এয়ারকন্ডিশন হলের বা বাউল ফেস্টিভালের বোদ্ধা শ্রোতারা নয়, মাচার  ফাংশনের পাবলিকও এখন ফোক চাইছে। সঙ্গে হাত ঘুরিয়ে, কোমর দুলিয়ে নাচছে। তাই মধুকেও চড়া হিন্দি ফিল্মে ঢোকার আগে একটা দু’টো গেয়ে নিতে হয়। তার ফোক গাইতে ভালও লাগে। ‘‌হৃদ মাঝারে রাখব’‌, ‘‌তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা’‌ ধরনের পপুলার গান শিখে নিয়েছে। ইদানীং লালনের কিছু অচেনা গানও গাইছে।

গাওয়ার আগে ফট করে নিজের লুকটা একটু বদলে নেয়। কপালে একটা পাগড়ি টাইপ ফেট্টি বাঁধে। হাতে তুলে নেয় একতারা। ছেঁড়া জিনস, শর্ট টপ আর ওপরে চাপানো হাঁটু পর্যন্ত ঝোলা, ফুল শ্লিভ কোটের সঙ্গে ফেট্টি, একতারা ভাল যাচ্ছে। এক ধরনের অ্যাপিল তৈরি হয়েছে। আজ অবশ্য ফেট্টি বা একতারা ছিল না।

মধু জানে তার চেহারায় একধরনের বন্য ভাব আছে। সাজপোশাক, চেহারার মধ্যে সেই বুনো ভাব বাড়িয়ে রাখে মধুমালতী। ছোটো করে কাটা চুল কোঁকড়ানো। গায়ের রঙ তামাটে। চোখে কালো শেড, ঠোঁটে ডার্ক লিপস্টিক নিয়ে তামাটে ভাব আরও বাড়িয়ে দেয়। মুখ লম্বাপানা। টানা চোখের চাহনিতে এক ধরনের তীক্ষ্ণতা আছে। দেখলে মনে হয়, এই মেয়ে চার পাশের সব কিছু জরিপ করে নিতে জানে। সব চেয়ে ভাল ওর ছিপেছিপে চেহারাটি। গানের সঙ্গে শরীরে হাল্কা দোলা দেয়। পাবলিক পছন্দ করে। বেশি প্রোগ্রাম পাওয়ার পিছনে মধুর এই আকর্ষণ একটা বড় কারণ। তার গলা আহামরি কিছু নয়। বরং ওঠা-নামার সময়ে কখনও কখনও গোলমাল করে। এ সব গলদ অ্যাপিয়ারেন্সে ঢেকে দেয় মধু।

এটা কলকাতার একেবারে গা-ঘেঁষা একটা পাড়া। পিনকোডে কলকাতাই। চার রাস্তার মোড় বন্ধ করে স্টেজ করা হয়েছে। পাড়ার ক্লাব তাদের পঁচিশ বছর সেলিব্রেট করছে।‌ সন্ধে থেকে চলছে প্রোগ্রাম। মধুকে এক ঘণ্টার ওপর ক্লাব ঘরে বসে থাকতে হয়েছিল। পাড়ার ব্যাপার। অনেক চেনাজানাকে আগে চান্স দিতে হয়েছে। ক্নাবের সেক্রেটারি বলে গেছে। দ্বিতীয় বার এল কাঁচুমাচু হয়ে।

‘‌বোঝেনই তো। লোকালদের তুলতে হচ্ছে। আপনকে স্টেজ দিতে একটু দেরি হচ্ছে।’‌
মধু বলল, ‘‌সে  আপনারা যখন খুশি স্টেজ দিন, আমি এগারোটার এক মিনিট বেশি থাকব না।’‌
সেক্রেটারি বলল, কী বলছেন দিদি!‌ দশটার পরেই তো জমবে। মিনিমাম বারোটা করুন।’
মধু মাথা নেড়ে বলল, ‘‌অসম্ভব। সাড়ে এগারোটার এক মিনিট বেশি হবে না। কাল সকালে বোরোতে হবে। আসানসোলে প্রোগ্রাম আছে।’

মুখে ‘‌প্রোগ্রাম বললেও। মধু জানে এগুলো আসলে ‘‌খেপ’। তার মতো সিঙ্গারের প্রোগ্রাম আবার কী?‌

ক্লাব সেক্রেটারি হন্তদন্ত বলল, ‘‌ঠিক আছে, ঠিক আছে দেখছি।’‌
মধুমালতী মিথ্যে হাই তোলার ভান করে বলল, ‘‌দেখুন।’‌

প্রোগ্রামের আগে মধুমালতী বাজনার ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে। বাড়িতে তো একটা রেওয়াজ থাকেই। সেটা সকালে হতে পারে আবার আগের দিনও হতে পারে। তা ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। তাতে কথা চালাচালি হয়। তার পরেও যদি অদলবদল কিছু করতে হয় প্রোগ্রামের ঠিক আগে বলে নেয়। অবশ্য সব প্রোগ্রামে তো আর এত বাজনা লাগে না। পার্টি বুঝে ব্যবস্থা। আজ ছেলেদের সঙ্গে কথা হয়ে  গিয়েছিল গাড়িতেই। গানের লিস্ট সকলের কাছেই আছে। গত সপ্তাহে কৃষ্ণনগরের একটা প্রোগ্রামের রিপিট হবে। ছেলেরা এদিক ওদিক ঘুরছে। ব্যাক স্টেজের গ্রিনরুমে এক কোণে একা বসে মোবাইল ঘাঁটছিল মধুমালতী। হঠাৎ ফোন আসে পিনাকীর। মুচকি হেসে মধু ফোনটা তোলে।

ওপাশ থেকে পিনাকী বলে, ‘‌আমি কোথায় বলো তো?‌’‌
মধু বলে, ‘‌জানি না। কোথায়?‌’
পিনাকী বলে, ‘‌বলব না।’‌
‘‌বলতে হবে না, আমি জানি। আমি কি গাধা?‌’‌
পিনাকী বলে, ‘না তুমি বুদ্ধিমতী। ‌তা হলে বল।’‌
‘‌বলব না।’‌
‘‌মধু, আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি।’‌
মধু চাপা গলায় বলল, ‘‌এক দিন আমার সঙ্গে শুয়েই ভালোবেসে‌ ফেললে?‌ আমাকে বলছো কেন?‌ বলো আমার শরীরকে ভালবেসেছো।’‌
‘‌ঠাট্টা নয়। সে দিন তোমার বাড়িতে না গেলেও আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি তো তোমার কাছে শরীর চাইনি মধু।’‌
মধু হেসে বলল, ‘‌আমি চেয়েছিলাম। আবার চাই।’‌
পিনাকী ছেলেমানুষি কাঁপা গলায় বলল, ‘তোমার ভালো লেগেছে?‌’‌
মধু বলল, ‘‌বুঝতে পারোনি?‌ অমন ভালোলাগা আমার আগে কখনও লাগেনি।’‌
পিনাকী বলল, ‘‌সত্যি?‌’‌
মধু বলল, ‘‌না, মিথ্যে।’‌
পিনাকী বলল,  ‘মধু, একটা সিরিয়াস কথা বলব?‌’‌
মধু বলল, ‘না বলবে না। জীবনে অনেক সিরিয়াস কথা শুনেছি, আর নয়।’‌‌
পিনাকী বলল, ‘‌এ ভাবে স্টেজে উঠে নাচানাচি বন্ধ করো। এ সব থার্ড ক্লাস কাজ।’‌
মধু একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘‌আমার রুটি রুজিকে গাল দেবে না।’
‘‌তুমি এ সব থামাও। লোকে ‌এই সব মেয়েকে খারাপ ভাবে।’‌

মধুর মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল।

‘‌লোকের কথা আমার অনেক দেখা হয়ে গেছে। বয়ে গেছে। আমি খারাপ।’
পিনাকী  বলল, ‘মধু ‌তোমার গলা সুন্দর।’‌
মধু দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘‌আমার বুকও সুন্দর।’‌
পিনাকী মিনতি করা গলায় বলল, ‘‌প্লিজ মধু। তুমি এসব বন্ধ করে একটা দু’টো ভাল প্রোগ্রাম করবে। রেডিওতে গাইবে, টিভিতে গাইবে। বড় বড় হলে লোকে তোমার গান শুনতে যাবে। রাস্তার মাচায় উঠে লাফানো বন্ধ কর।’‌
মধু রাগে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘‌এসব ফালতু কথায় আমি ভুলি না। আমি নিজে কতটা পারি আমি জানি।’‌
পিনাকী একটু চুপ করে থেকে বলে, ‘‌মধু, তোমার ভদ্র জীবন ভালো লাগে না?‌’‌
মধু বলে, ‘‌আমার জীবনটা ছোটোলোকের?‌ একটা মেয়ে জীবনের ভয়ংকর সময়ে সব সামলে মাথা তুলে বেঁচে আছে, এই পেশার জন্য। পুরুষ মানুষ আমাকে ছিঁড়ে খেত। এটা ছোটোলোকের জীবন?‌’‌
‘‌আমি তা বলিনি।’

মধু চাপা গলায় হুংকার দিয়ে বলে, ‘‌এক দিন শুতে দিয়েছি বলে এত জোর ফলাচ্ছো?‌’‌
পিনাকী বলে, ‘‌তুমি মিছিমিছি রাগ করছো মধু। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। সুন্দর, সুস্থ একটা জীবন দিতে চাই‌। কিন্তু তোমাকে স্টেজে উঠে এই নাচানাচি বন্ধ করতে হবে।’‌‌
‘‌আজ এ সব বলছো। যখন ভাল লাগবে না, নিজের উপার্জনেই খেতে হবে আমাকে। মেয়েদের উপার্জন সব চেয়ে জরুরি। বিয়ের থেকেও অনেক বেশি। ‌তোমাকে কখনওই বিয়ে করব না। কোনও দিনও করব না। তোমাকে আজ ঠিকমতো চিনতে পারলাম।’
পিনাকী বলল, ‘‌প্লিজ রাগ করো না মধু।’‌
মধু নিজেকে সামলে ঠান্ডা গলায় বলে ‘পিনাকী, ‌তুমি আমাকে আর বিরক্ত করবে না।’‌
এবার পিনাকী উত্তজিত গলায় বলে, ‘হাজার বার করব। তুমি যদি আমাকে বিয়ে করতে রাজি না হও, আমি যা খুশি করব।’‌‌
‘‌কী করবে?‌’‌
পিনাকী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘‌দরকার হলে খুন করব। আমার কাছে রিভলভার আছে। এক সময়ে আমি রাজনীতি.‌.‌.‌।’‌
মধু সহজ গলায় বলল, ‘পারলে খুন কর। এই তো স্টেজের সামনেই বসে আছো। ভেবেছো আমি বুঝতে পারি না?‌ আমিও এক্ষুনি প্রোগ্রাম শুরু করছি। কর গুলি।’‌

কথা শেষ করে ফোন কেটে দেয় মধুমালতী। স্টেজে ওঠার জন্য তার ডাক পড়ে।

এই ক্লাবের নিজেদের অ্যাম্বুলেন্স আছে। কিন্তু ঘটনা এতটাই অর্তকিতে ঘটল, যে অ্যাম্বুলেন্সের কথা কারও মাথায় এলো না। একটা ট্যাক্সি ধরে রক্তমাখা অচৈতন্য মধুকে পাঁজাকোলা করে তোলা হল। ট্যাক্সিতে উঠল বিষ্ণু, কঙ্কন আর অঙ্কুশ। হাসপাতালে গেট পেরোনোর সময় মধু, যার ভাল নাম মধুমালতী, নিঃশব্দে মারা গেল। যারা তাকে কোলে নিয়ে বসেছিল, তারা জানতেও পারল না। জন্মের সঙ্গে মৃত্যুর এটাই ফারাক। জন্ম জানান দিয়ে আসে, মৃত্যু আসে চুপিসারে।

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল।

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

(আগামী পর্ব  মঙ্গলবার)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More