বুধবার, নভেম্বর ১৩

মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৮

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ অষ্টম পর্ব। 

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব: মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

পড়ুন আগের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৭

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৯

ছ’‌মাস পর আরও বড় অপরাধ করল বিলু। খুব বড় অপরাধ। মধুমালতী আর নিজেকে বোঝাতে পারল না। সে শুধু বিয়ে ভাঙল না, বিলুকে বাড়িও ছাড়তে বলল।

‘‌হয় তুই থাকবি, নয়তো আমি। আজ রাতেই সিদ্ধান্ত নিবি।’‌

বিলু শান্ত ভাবে বলেছিল, ‘‌সিদ্ধান্ত নেওয়ার কী আছে?‌ এ বাড়ি তোর মধু।’

‌বিলু সেই রাতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

‌মাঝখানে অনেকটা সময় চলে গেছে। মধুমালতী পথ চলেছে অনেকটা। পুরুষমানুষ দেখেছে অজস্র। কখনও হেসে, কখনও ধমক দিয়ে, কখনও বডিগার্ড দিয়ে তাদের দূরে রেখেছে। কখনও একটু ছাড়ও দিয়েছে। তবে বড় ভাবে টলেনি কখনও। এতদিন পরে টলল। একদিন, একবার। সে কথায় পরে আসা যাবে।

বিলুর আবার ফিরে আসাটা আকস্মিক। তবে পুরোটাই বদলে ফিরেছে যেন। প্রথমবার তাড়িয়ে দিলেও, পরে পথে লোকটার দূরাবস্থা দেখে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যায় মধুর। নিজেই ফিরিয়ে আনে। নখ, দাঁত ভাঙা মানুষটাকে খানিকটা করুণায়, খানিকটা কৃতজ্ঞতায় রেখে দিয়েছে। তবে দু’জনের কথাবার্তা, আচরণে কখনও সখনও মনে হয়, পুরনো সম্পর্কের দেওয়ালে একটা ভালবাসার চিড় যেন রয়ে গেছে। ভুলও হতে পারে। হয়তো মধুমালতী মজাই করে। খেলা করে।

সে দিন মধুমালতীর নাভির আংটি দেখে বিলু গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ‘ফালতু মানুষের কি ভাল লাগতে নেই ?‌’

মধু ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘‌নেকু। বাতেলা ছেড়ে সত্যি কথা বল, খারাপ লাগছে?‌’‌

বিলু বলল, ‘‌বললাম তো, হেভি হয়েছে। তবে এমন জায়গায় লাগিয়েছিস, কেউ দেখতে পাবে না। ভাল জিনিস লাগলেও পয়সা জলে।‌ এসব জিনিসের যে কী মানে কে জানে।‌’‌

মধু হেসে বলল, ‘‌তাতে কী হয়েছে?‌ তুই তো দেখছিস। এরপর আরও ভিতরে পড়ব। এইখানে।’

মধু হাত দিয়ে নিজের বুকের মাঝখানটা দেখায়।‌‌ বিলুও হেসে বলে, ‘‌ধুশ! আমার দেখা না দেখায় কী হবে?‌ আমি একটা মানুষ হলাম?‌’‌

মধু গাড়ির স্টিয়ারিং ধরবার মতো হাতদুটো সামনে রেখে শরীরটাতে মোচড়াতে লাগল। সেই অবস্থাতেই বলল, ‘‌কেন হলি না? মানুষ হতে‌ কে বারণ করেছিল?‌’

বিলু আয়না থেকে চোখ সরিয়ে বলল, ‘‌কেউ করেনি, তবে ইচ্ছে করলেই সব হওয়া যায় না। মানুষ হওয়া কি চাট্টিখানি কথা রে মধু‌?‌ বহুৎ ঝামেলা।’‌‌

মধু মুখে ব্যঙ্গের ভঙ্গি করে বলল, ‘‌ওরে বাবা, ক’বছর বাইরে ভিক্ষে করে‌ খুব লেকচার শিখেছিস তো!‌‌ কোনওদিন কলেজে না পড়েই কলেজের প্রফেসর হয়ে গেলি যে।‌‌’

বিলু আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, ‘অ্যাই একদম বাজে বকবি না। কোন শালা বলে আমি কলেজে পড়িনি?‌ কলেজ টপকাতে পারিনি ঠিকই, ভর্তি তো হয়েছিলাম। ক্লাসেও গিয়েছি।’‌‌‌

মধু হেসে বলল, ‘‌কলেজ টপকাবি কি?‌ মাল টপকাতেই তো সময় চলে যেত। গুণ্ডামি করে গেলি।’‌

বিলু গ্লাসে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, ‘যাঃ ‌এখন আর ওসব বলিসনি, লজ্জা করে। ছুরি, বোমা, দানার কারবার তো কবে ছেড়ে দিয়েছি।’‌

মধু ঘুরে এসে বিলুর সামনে দাঁড়াল। ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়িয়ে বিলুর চিবুক নেড়ে বলল, ‘‌আহারে পুঞ্চু মুঞ্চু। আমার সোনা ভদরনোক হয়ে গেছে। তোর সেই জং ধরা রিভলবারটা কোথায় গেল?‌’‌

বিলু জবাব দিল না। গ্লাসের মদে মন দিল।‌‌

বিলু নামের এই ছেলে মধুর কে হয়?‌ আত্মীয় তো নয়। তবে?‌ চেহারা রোগাভোগা। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে। বাঁ পায়ে সমস্যা রয়েছে। কীসের সমস্যা?

মধুমালতী–‌বিলুর সম্পর্ক নিয়ে কৌতূহল দেখানোর লোক তেমন নেই। পুরনো কথা কেউ জানে না। নিজের গণ্ডির বাইরে মধু কারও সঙ্গে মেশে না বললেই চলে। আত্মীয়স্বজন নেই। যে দু–‌একজন আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তারাও রাখে না। রাখবার কথাও নয়। যে মেয়ের মা খুন হয়েছে, আর সেই খুনের দায়ে বাবা জেলে গেছে সেই মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবার দরকার কী? তাছাড়া মেয়ে নিজেও তো সুবিধের নয়। রাতে নেচেকুঁদে বেড়ায়। না চেনাই ভাল।‌ বাকি রইল মধুর সঙ্গে যারা বাজায়। তারা প্রফেশনাল। কেউ কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। কখনও সখনও নিজেদের মধ্যে একটু আধটু কথা হয় এইমাত্র। এর মধ্যে সিন্‌থেসাইজারের কাজল আর ঢোলকের বিষ্ণু হালকা গসিপ করে। কেচ্ছা ভালবাসে। তাও বেশি নয়। পুরুষমানুষ কেচ্ছায় রস পায় না। লিড গিটারের কঙ্কন, বেস গিটারের অর্ক’‌র তো মুখে কথাই নেই। কাজ শেষে ঠিকমতো পেমেন্ট পেলেই হল। জাজু কঙ্গো বাজায়। সে বোঝে রিদম্‌ আর গাঁজা। প্রোগ্রামের আগে পরে গাঁজা না খেলে তার চলে না। এরা কার কাছে কে থাকে, তাই নিয়ে কেন মাথা ঘামাবে?‌ এই জগতের নিয়মটাই এরকম। নিজের ধান্দায় ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া সবাই যে সব সময় থাকে এমন নয়। প্রোগ্রাম বুঝে টিম ছোটো, বড় হয়।

এই গণ্ডির বাইরে একজনের সঙ্গেই মধুমালতীর যোগাযোগ হয়েছে‌। মাস ছ’য়েকের যোগাযোগ, কিন্তু ইতিমধ্যেই সেই সম্পর্ক তীব্র হয়েছে। সেই যোগাযোগের খবর কেউ জানে না। মজা করবার জন্য বিলুকে একদিন হালকা ভাবে বলেছিল।

বিলু বলল, ‘‌কী নাম?‌’‌

মধুমালতী বলল, ‘বলল তো ‌পিনাকী।’‌

‘‌তোর‌ ফ্যান?‌’‌

মধু হেসে বলল, ‘‌দূর শালা আমার আবার ফ্যান কী?‌ বরং উলটো। বলল, এসব হাবিজাবি গান করতে আপনার ভাল লাগে ‌?‌’

বিলু হাই তুলে বলেছিল, ‘‌বাবা, সাহস আছে তো।’‌

মধু বলল, ‘‌শো এর শেষে দুম্‌ করে এসে নিন্দে করল বলেই মনে আছে। ‌পুরুষমানুষের প্রশংসা আমার জানা আছে। বলে গলা ভাল আসলে বুকের কথা বলতে চায়।’

বিলু বলল, ‘‌উফ্‌, আজকাল তুই বড্ড মুখ খারাপ করিস মধু। আগে এমন ছিলি না।’‌

মধু হাতের কাজ করতে করতে বলল, ‘‌সমস্যা আছে?‌’‌

বিলু আবার হাই তুলতে তুলতে বলে, ‘‌না, সমস্যা কী ‌?‌ আমার কোনও কিছুতেই সমস্যা নেই। অন্যের দয়ায় যে বেঁচে থাকে তার সমস্যা কী?‌ তোর ওই পিনাকীর কথা আর একটু শুনি।’

মধু বলল, ‘‌আর কী শুনবি?‌‌ আর কিছু নেই। সেই ছেলে নাকি দু’দিন আমার প্রোগ্রাম শুনেছে। তারপর একদিন এসে বলল, এতো সুন্দর গলা নিয়ে কেন মাচায় উঠে টুকলি গান করি?‌ তাই নিয়ে আপত্তি।’

বিলু উঠতে উঠতে বলেছিল, ‘‌বুঝেছি পিছন পাকা। দাড়ি আছে?‌ কাঁধে ঝোলা?‌’‌

মধুমালতি বলল, ‘‌কী করে বুঝলি?‌ দু’টোই আছে।’‌

‘‌এরা এরকমই হয়। আমার সঙ্গে দেখা হলে পাছায় লাথি খাবে।’‌

‌মধু বলেছিল, ‘দেখা হবে না।’‌

পিনাকী নামের এই যুবকের সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে মধুর। শুধু হুট করে ফাংশনে দেখা নয়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেও দেখা হয়েছে। বিলুকে এই কথা বলবার পরেও একদিন এই যুবককে বাড়িতে ডেকেছিল মধু। সে দিন বাড়ি ছিল ফাঁকা। বিলু দশদিন ধরে ভ্যানিশ। খুব বৃষ্টির দিন ছিল সেটা। পিনাকীকে মোবাইলে ডেকেছিল মধু। পিনাকী আসতে চায়নি। বলেছিল, ‘‌আসব না।’‌

‘‌এলে প্রমাণ করে দিতাম আমিও গাইতে পারি।’‌

পিনাকী বলেছিল, ‘‌প্রমাণের দরকার নেই। আমি জানি, তুমি পারো।’‌

মধু বলেছিল, ‘থাক, জানতে হবে না।’‌‌

আধ ঘণ্টার মধ্যে কাক ভেজা হয়ে এসেছিল পিনাকী। বিলুর ফিরে আসার দিনের মতোই। ভেজা জামা প্যান্ট ছাড়তে চায়নি কিছুতেই। ভিজেই বসেছিল বেতের চেয়ারে। মধু আদা দিয়ে চা এনে দিল।

‘‌নাও, প্রমাণ দাও। গান শোনাও।’‌

বাইরে নতুন করে ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছে তখন। মধু খালি গলায় গান ধরে, ‘‌আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে.‌.‌.‌মেঘমল্লারে সারা দিনমান বাজে ঝরনার গান.‌.‌.‌।’

গান শেষ হলে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়িয়েছিল পিনাকী।

‘‌এ বার যাব।’‌

মধু অবাক হয়ে বলল, ‘‌এই বৃষ্টির মধ্যে! ভিজে যাবে।‌‌’

পিনাকী বলল, ‘‌ও অসুবিধে হবে না। ভিজেই তো আছি।’‌

পিনাকী এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলে। মধু এগিয়ে এসে দরজা আড়াল করে দাঁড়ায়। মুখ তুলে বলে, ‘‌আমার গান কেমন লাগল, না বলে চলে যাবে?‌’

পিনাকী মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। ঝুঁকে পরে। মধুর মুখে মুখ নামায়। ঠোঁটে তার বৃষ্টি ভেজা ঠোঁট চেপে ধরে শক্ত ভাবে। দীর্ঘ চুমুর সময়ে মধু বুঝতে পারে, এই আদর সে আগে কখনও পায়নি। এত ভালবাসা পুরুষের থাকে?‌ বিলুও তাকে চুমু খেয়েছে কয়েকবার। স্বামীও খেয়েছে। সে চুমুতে এই আদর, এই পৌরুষ ছিল না। প্রাণহীন চুমু। যেন করতে হয়, তাই করা।

সদর দরজা খোলা আছে ভুলে গিয়ে পিনাকীকে বেডরুমে টেনে নিয়ে যায় মধু। সেখানে এক এক করে তার ভিজে পোশাক খুলে দেয়।

পিনাকী ‌লজ্জা পেয়ে ফিসফিস করে বলে, ‘‌একটা কিছু দাও। গায়ে দিই।’‌

মধু তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘‌না দেব না।’‌ তারপর নিয়ে যায় বিছানায়। তারপর উন্মত্তের মতো তাকে নিজের মধ্যে নিতে থাকে। এই প্রথম যেন যে পুরুষের স্বাদ পাচ্ছে। ভালবাসার পুরুষ। নিজের জানা অজানা সব কৌশলে সে পিনাকীকে তৃপ্ত করতে চায়। বাইরে ঝড় ওঠে।

এই সময়ে তৃতীয় একজন এ বাড়িতে আসে। তার মাথায় ছাতা। দরজা খোলা দেখে অবাক হয়। মধু কি বাথরুমে?‌ দরজা ভুল করে খুলে গেছে ‌?‌ নাকি ঝড়ে ছিটকিনি ভেঙেছে ?‌ লোকটা বাড়িতে ঢোকে। ছাতা বন্ধ করে পাশে রাখে। কয়েক পা এগোতেই শোবার ঘর থেকে চাপা গোঙানির আওয়াজ পায়। গোঙানির মধ্যে যেন আনন্দ, তৃপ্তি রয়েছে। কীসের গোঙানি?‌ লোকটা আরও এগিয়ে উঁকি মারে। দুই নগ্ন নর–‌নারীকে দেখে থমকে যায়। এক মুহূর্ত থেকে সে  ফিরে যায় সদর দরজায়। ছাতা নেয়, দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।

মধু বা পিনাকী জানতেও পারে না।

যাই হোক, মধুমালতী দেখছে, বিলু এবার ‘‌ভ্যানিশ’‌ হওয়ার অসুখ নিয়ে ফিরেছে।  হঠাৎ  কিছু না বলে উধাও হয়ে যায়। একমাস, দু’মাস পর্যন্ত খোঁজ থাকে না। কোথায় যায় তার ঠিকানা কিছু নেই। থাকলেও বলে না। সঙ্গে মোবাইল নেই। ফলে যোগাযোগ করবার পথও বন্ধ। অবশ্য কেউ যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে যায় এমনটাও নয়। মধু প্রথমদিকে একবার দু–‌বার চেষ্টা করত।

‘‌হ্যাঁরে বিলু, তুই যাস কোথায়? দেশের বাড়ি?‌’‌

বিলু বলে, ‘আমার কোনও দেশের বাড়ি নেই।’‌

মধু স্থির চোখে বলে, ‘‌বাজে কথা। নিশ্চয় তুই কোথাও গিয়ে থাকিস। কোথায় থাকিস?‌ আবার বিয়ে, মেয়েছেলে?‌’

বিলু সামান্য চুপ করে থাকে।

মধু বলে, ‘‌যা খুশি কর। আমার কিছু আসে যায় না। আমিই বা তোকে জিগ্যেস করতে যাচ্ছি কেন?‌ তুই কে?‌’‌

বিলু যেমন যায়, আবার দুম্‌ করে ফিরেও আসে। এমন স্বাভাবিক ভাবে আসে যেন বাজারে গিয়েছিল, ভিড় থাকায় দেরি হল। মধু কখনও চিৎকার করে, কখনও চুপ করে থাকে। যখন যেমন মুড থাকে। চিৎকার করলে বলে, ‘‌দূর হয়ে যা। আমার বাড়িতে পা রাখবি না।’

বিলু কাঁধের‌ ব্যাগ নামিয়ে নির্বিকার ভাবে বলে, ‘‌দু’টো দিন থেকে চলে যাব।’‌

মধু আরও চিৎকার করে ওঠে, ‘‌কেন তুমি আমার বাবু নাকি? আমি তোমার বাঁধা মেয়েছেলে ‌?‌ যখন খুশি আসবে যাবে আসবে আর আমি তোমার পা ধুইয়ে দেব, বুকের আঁচল দিয়ে পা মুছিয়ে দেব?‌ বেরিয়ে যা শালা। আগে বেরিয়ে যা বলছি।’

বিলু শান্ত ভাবে বলে, ‘চিল্লাস না। গলা বসে গেলে গাইতে পারবি না। আজ প্রোগ্রাম নেই?‌’‌

মধু আরও রেগে যায়। মুখ ভেঙিয়ে বলে, ‘ইস আমার বিরাট গলা দেখার লোক এসেছে রে?‌ ‌আমি গাইতে‌ পারি কি না পারি তোর কী?‌ আমি বলেছি তুই আমার ভাল–মন্দ দেখ? বলেছি তোকে?‌‌ তুই আগে চোখের সামনে থেকে যা।’‌

বিলু হাত তুলে বলে, ‘‌আচ্ছা চলে যাব। তোর তাড়িয়ে দেওয়ার কোনও দাম মেই। কতবারই তো তাড়ালি। দুপুরে ভাত খেয়ে চলে যাব। আজ রান্না কী?‌’

মধু অশ্লীল ভঙ্গি করে বলে, ‘তোমার ইয়ে‌ রান্না শালা।’‌

বিলু আরও ‌শান্ত ভাবে বলে, ‘‌আহা এত রাগছিস কেন? আগে এমন ছিলি না। কত শান্ত ছিলি। আচ্ছা, ঠিক আছে আর এরকম হুটপাট যাব না। যাওয়ার আগে তোর পারমিশান নেব। হল?‌‌ ভাত দে।’‌

মধু আরও রেগে গিয়ে বলে, ‘‌‌কেন? আমার বাড়িতে‌ ভাত খাবি কেন?‌ ভাত কি মুফতে জোটে ?‌ নিজে রোজগার করে ভাত খা গিয়ে। নির্লজ্জ, বেহায়া কোথাকারে।’

বিলু নির্বিকার ভাবে বলে, ‘‌এই ক’‌মাস তো তাই করছিলাম। নিজের রাইস নিজে আর্ন করবার চেষ্টা করলাম। একটা কাজ জুটিয়ে ছিলাম। ফেরি সার্ভিসের টাইমকিপার। লঞ্চঘাটে সাতটা তিনটে ডিউটি। ভাল লাগল না, চলে এলাম।’‌

মধু আবার খিস্তি দিয়ে বলে, ‘‌তুমি একটা বাল। কোনওদিনই কাজ রাখতে পারবে না। সারাজীবন আমার পিছন মারবার জন্য বসে থাকবে। পেটে টান পড়লেই ঘাড়ে এসে উঠবে। আর নয়। এবার দারোয়ান ডেকে পাছায় লাথি মেরে তাড়াব। ভাবছো কী?‌ মারবার জন্য পিছন শুধু আমারই আছে?‌ তোমার নেই?‌’‌

কোনও কোনও সময় মধুমালতী শান্ত হয়ে থাকে। মাস তিন–‌চারের উধাও জীবন শেষ করে বিলু চুপিচুপি বাড়িতে এসে ঢোকে। ক্যাম্বিসের ব্যাগ থেকে গামছা বের করে স্নানে যায়। মধু তার দিকে না তাকিয়ে বলে, ‘‌সাবান নিয়ে ঢুকবি। তিনমাস স্নান করিস নি। পুরো একটা সাবান শেষ করে তারপর বেরোবি।’‌

বিলু বাথরুমে গেলে মধু  খাবার গরম করতে যায়।‌ এ বাড়িতে এই ছেলের সব খরচ মধুর। থাকা, খাওয়া, মদ।

এক আধদিন মধুর সঙ্গে প্রোগ্রামে যায় বিলু। স্টেজের এক কোনায় চেয়ার নিয়ে বসে থাকে। যেখানে স্টেজে বসা যায় না,  সেখানে নিচে কোথাও থাকে। মধু যে তাকে নিয়ে যায় এমন নয়, নিজেই গাড়িতে গিয়ে বসে। কোনওদিন হয়তো মধু বলে, ‘‌তুই গিয়ে কী করবি?‌’‌

বিলু গম্ভীরভাবে বলে, ‘‌পাবলিক রিঅ্যাকশন দেখব।’‌

মধু বলে, ‘‌তোমাকে কে এই দায়িত্ব দিয়েছে?‌’‌

বিলু আরও গম্ভীর ভাবে বলে, ‘‌কেউ দেয়নি। আমি নিজেই নিয়েছি।’

মধু বলে, ‘‌সরি। এই দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে না। তুমি নেমে যেতে পারও।’‌

বিলু সহজ ভাবে বলে, ‘‌ঠিক আছে পাবলিক রিঅ্যাকশন নেব না। এমনি বসে থাকব। তোর গান শুনে কেউ ছ্যা ছ্যা করলে চুপ করে থাকব।’‌

মধু তেড়েফুঁড়ে বলে, ‘‌আমার গান শুনে কেই ছ্যা ছ্যা করলে তোর শালা কী?‌’‌

বিলু মুখ ফিরিয়ে আরও সহজ ভাবে বলে, ‘‌আমার আর কী?‌ কিছুই না। তোর পয়সা খাইদাই। নিন্দে শুনলে খারাপ লাগবে না?‌’

মধু দাঁত কিড়মিড় করে বলে, ‘‌তুই গাড়ি থেকে নামবি?‌ আগে নাম। নাম বলছি।’

আবার এই মধুই কোনওদিন প্রোগ্রামের বোরোনোর সময় বলে, ‘‌কী রে যাবি নাকি?‌’‌

বিলু বলে, ‘‌আমি গিয়ে কী করব?‌’‌

মধু বলে, ‘‌আমার ব্যাগ বইবি। তিন মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে গাড়িতে উঠে আয়।’

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৯

Comments are closed.