রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৭

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ সপ্তম পর্ব। 

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব: মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

পড়ুন আগের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৬

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৮

মধু তার নগ্ন হাত নীচে নামালো। ছোট একটা নিশ্বাস ফেলল। না, ‘‌আর্টিস্ট’‌‌ হওয়া আর তার এ জীবনে হবে না। অনেক হ্যাপা। ফাংশনের লাইন ছেড়েছুড়ে নতুন করে গান শিখতে হবে। মাস্টার ঠিক করতে হবে। রোজ সকালে তানপুরা নিয়ে গলা সাধতে হবে। তাতেও কিছু হবে কি না সন্দেহ। সন্দেহ কেন, হবেই না। কত লোকে তো গান শেখে, শিল্পী হয় ক’‌জন?‌ একটা প্রোগ্রামও জোটে না। এই ধরনের গায়িকাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা হয়েছে। খারাপ লাগে। এই তো সেদিন হাবড়ায় শো করতে গিয়ে এক শান্তশিষ্ট মেয়ের সঙ্গে দেখা। রেডিও, টিভিতে গান করে। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবে বলে বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত হারমোনিয়াম কোলে নিয়ে উইংসের পাশে বসে ছিল। সুন্দর একটা তসর পরেছে। লম্বা বেণী বেঁধে তাতে ফুল দিয়ে। অনেক ক্ষণ বসে থেকেও স্টেজ পাচ্ছিল না। মধু এসে যেতে অর্গানাইজাররা তাকে বলল, ‘‌আর প্যানপ্যাননি চলবে না দিদি। রাত হয়ে গেছে, পাবলিক এবার হল্লোড় চাইছে। আপনি চট করে একটা গেয়ে নেমে আসুন। অত দূর থেকে এসেছেন।’‌

মেয়েটি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘‌আমি তো টাকা নিচ্ছি না। দু’টো গান অন্তত গাইতে দিন।’‌
অর্গানাইজাররা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘‌তা হলে ঠিক দু’টো। পাবলিক খেপে গেলে কিন্তু জানি না।’‌

সেই মেয়েটি একটা গান ধরল। আজ তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা। গান দু’তিন লাইন গড়ানোর পরেই‌ ফুটবল মাঠ বোঝাই শ্রোতারা এমন চিৎকার, টোন-টিটকিরি শুরু করল, যে গান থামিয়ে চোখমুখ লাল করে বেচারিকে নেমে আসতে হল। মধুর খুব খারাপ লাগল। মেয়েটার গলা কী মিষ্টি!‌ তার থেকে হাজার গুণ বেশি। স্টেজ থেকে নামার সময়ে সে মেয়েটির হাত ধরে ফেলল।

‘‌কিছু মনে করবেন না ভাই।’‌
মেয়েটা এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল। চোখে মুখে ঘেন্না।

এই রিস্ক কে নেবে? এ কূলও যাবে, ও কূলও যাবে। খিদের সময়ে পেটে গামছা বেঁধে থাকতে হবে। তাড়াড়া ‘‌‌আর্টিস্ট’‌‌ হওয়ার যোগ্যতা তার আছে নাকি?‌ নেই। তার পরেও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে। মা যে ছোটোবেলায় গান শেখাত তা কি খালি রাত ‌বাড়লে মাচায় নেচেকুঁদে ফিল্মের গান গাওয়ার জন্য? এসব মাথায় এলেই মধু নিজেকে ধমক দেয়।

‘‌এই করেই তুমি বেঁচেবর্তে আছো বাপু। কসবার কাছে দেড় কামরার একটা ফ্ল্যাট কিনেছো, ছোটো একটা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কিনেছো। তোমার নাচাকোঁদা গানের সঙ্গে বাজিয়ে পাঁচটা মিউজিসিয়ান করে কম্মে খাচ্ছে। আর কী চাই?‌‌’‌

‌সেদিন ‌একটু দূরে সোফায় বসে যত্ন করে মদ খাচ্ছিল বিলু। এমন ভাবে দু‘‌হাতে গ্লাস ধরেছিল যেন অল্প সময়ের জন্য এ-ই ‘‌অমৃত’‌ তার কাছে এসেছে। ঠিক মতো খাতির করতে না পারলে পালাবে। মধুর প্রায় নগ্ন শরীরের দিকে তার মনোযোগ নেই। এর থেকে অনেক বেশি উন্মুক্ত মধুমালতীকে সে দেখেছে। আঠেরো বছর আগে থেকে এই মেয়েকে সে চেনে। মধুরও তখন ষোলো। তবে সেই পরিচয়পর্বটি বেশি দিনের ছিল না। পাঁচ বছরের। ঠিক হিসেব করলে বলা যায় পাঁচ বছর ‌মাস দুয়েকের। ষোলো থেকে একুশ। একেবারে কমও নয়। মাঝখানে প্রায় এগারো বছরের ব্যবধান। কোনও যোগাযোগ ছিল না। দু’‌বছর আগে আবার এক দিন এসে হাজির।

সেদিন বিকেলে কালবৈশাখীর ঝড় উঠেছিল। সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। ঝড়ে গাছ পড়ে ইলেকট্রিকের লাইন ছিঁড়ল। ঘনঘন বাজ আর বিদ্যুতের ঝলকানি। অন্ধকার ঘরে বসে নতুন ফিল্মের গান তুলছিল মধু। নতুন গান ছাড়া প্রোগ্রাম জমানো যায় না। পার্টি বায়না করবার সময়ে এসে বারবার বলে যায়।

‘‌লেটেস্ট হিটগুলো চাই দিদি।’‌

বৈশাখ মাসে প্রোগ্রাম থাকে না। বর্ষাতেও তাই। এই সময়ে ঘরে বসে গান তুলে নিতে হয়।

দরজায় আওয়াজ হতে এমার্জেন্সি লাইট হাতে উঠে গেল মধু। এই ঝড়জলে কে এল? কোনও পার্টি?‌ ফোন না করে তো বাড়িতে আসবে না। দরজা খুলে থমকে গিয়েছিল‌ মধুমালতী। বিলু। ভিজে কাক হয়ে গেছে। আগের থেকে অনেকটা রোগা আর বুড়ো হয়েছে, তবু এই অন্ধকারে অসুবিধে হল না।

‘‌কী রে ঘরে ঢুকতে দিবি না?‌’‌

বোকার মতো হেসে বলল বিলু। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে জায়গাটা জল পড়ে ভরে যাচ্ছে। হাতের সুটকেসটা থেকেও জল পড়ছে।

হাতের এমার্জেন্সি আলোটাকে হ্যারিকেনের মতো ওপরে তুলে ধরে মধু বিড়বিড় করে বলল, ‘‌বিলু, তুই!‌ তুই কোথা থেকে!‌’‌
বিলু বাঁ হাত দিয়ে মুখের জল মুছে নিয়ে ‌হেসে বলল, ‘‌আকাশ থেকে। ঘরে ঢুকতে দে। অনেক কষ্টে তোর এই ফ্ল্যাটের ঠিকানা জোগাড় করেছি।’‌
মধু অবাক গলায় বলল, ‘‌কী করে পেলি?‌’‌

‘‌গান গেয়ে এত নাম করেছিস, তোর ঠিকানা পেতে সমস্যা কী?‌ গয়েশপুরের গাইতে গিয়েছিলি। ওদের একটা ছেলেকে চিনি.‌.‌.‌ সর ঢুকতে দে। চিন্তা করিস না, কাল চলে যাব।’‌

মধু দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। পরে রাতে ভাত বেড়ে দিতে দিতে নিচু গলায় বলেছিল, ‘‌আবার এসেছিস কেন?‌’‌
বিলু গরম ভাতে মুসুর ডাল মাখতে মাখতে বলেছিল, ‘‌কোনটা বলব?‌ সত্যিটা না মিথ্যেটা?‌’
মধু চাপা গলায় বলেছিল, ‘‌বাজে কথা রাখ।‌ এত বছর পরে কেন এসেছি আবার?‌’‌
বিলু ভাতে কাঁচা লঙ্কা ভাঙতে ভাঙতে বলল, ‘‌যদি বলি তোর জন্য মন কেমন করছিল‌ বিশ্বাস করবি?‌’‌

বাইরের চাপা গলায় মেঘ ডেকে উঠল। মধুমালতী গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘‌ফালতু কথা বলবি না। অনেক দিন আগেই তো সব চুকেবুকে গেছে। কেন এসেছিস তবে?‌’‌

বিলু ভাতের গরাস মুখে তুলে আরামে চোখ বুজে ফেলল। সে সুটেকেসে করে যেটুকু জামাকাপড় এনেছে, তার অনেকটাই ভিজেছে। মধুর একটা শাড়ি লুঙ্গির মতো করে পেঁচিয়ে পড়েছে।
‘‌টাকা পয়সার জোর টানাটানিতে পড়েছি রে। দু’‌বেলা খাবার জোটানোই মুশকিল। মাথা গোঁজার জায়গা নেই। সঙ্গে সব সময় সুটকেস নিয়ে ঘুরি। যেখানে জায়গা পাই ঢুকে যাই।’

কথা শেষ করে ‘‌হো হো’‌ আওয়াজে হেসে উঠল বিলু। বিদ্যুৎ চমকে কোথাও মেঘে ডেকে উঠল ফের।
মধু চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘‌‌আমি কী‌ করব ?‌ তোকে টাকা দেব ?‌ না বাড়িতে রেখে খাওয়াব?’‌‌
বিলু  হাসিমুখে বলল, ‘‌কত বছর পর তোর হাতের রান্না খাচ্ছি বল তো?‌ তখন অবশ্য তুই রাঁধতে গেলেই ভাত পুড়িয়ে ফেলতিস। পোড়া ভাত খেয়ে ঢেকুর তুলতাম।’‌
একটু চুপ করে থেকে মধু কঠিন গলায় বলেছিল, ‘আজ ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, নইলে আজই খাওয়াদাওয়ার পর চলে যেতে বলতাম। সে কথা বলছি না। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে যাবি। তোকে এক পয়সাও দেব না। এখানে থাকতেও দেব না।’‌‌‌
বিলু সহজ ভাবে বলল, ‘আহা, অত চটামটি করছিস কেন?‌ ‌ঠিক আছে, কালই চলে যাব। আর এক হাতা ভাত দে। হ্যাঁ রে, ঘরে ডিম আছে ‌?‌ ভেজে দিবি?‌’‌

পরের দিন মধু ঘুম থেকে ওঠার আগেই বিলু চলে যায়। যে ছোটো ঘরটায় সে শুয়েছিল, তার খাটের ওপর মধুর শাড়িটা ভাঁজ করে রেখে যায়। ঘুম ভেঙে উঠে সেই শাড়ি হাতে মধুমালতী অনেক ক্ষণ নিজের মতো করে কাঁদে।

আকাশ তখন ভোরের আলোয় ঝকঝকে। কে বলবে কাল রাতে অমন ঝড়জল হয়েছে?‌

এই বিলুকে মধুমালতীই আবার নিয়ে এসেছে।

দেখা হয়েছিল পাটগ্রামের কাছে একটা চা কাম ভাত–‌রুটির দোকানে। প্রোগ্রাম সেরে ফিরছিল ‌মধুমালতী। হাড় কাঁপানো শীতে চায়ের দোকান দেখে গাড়ি থেকে দলবল নিয়ে নেমে পড়ে। চা খেতে আগেও এ রকম ভাবে বহু বার নেমেছে। ছেলেরা বাথরুমে যায়। সিগারেট বিড়ি খায়। সে দিন সঙ্গে বাজনদার ছিল মাত্র দু’জন। দোকানে ভিতরের বেঞ্চে বসে কয়েক জন ভাত না রুটি খাচ্ছিল। শীতের রাত। ডিনার টাইম পেরিয়ে গেছে। চাদরে, মাফলারে, মাঙ্কিক্যাপে মাথা ঢাকা তাদের। বলতেই গরম চা করে দিল। মধুরা চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে দোকান থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। কুয়াশা জমেছে। হাইওয়েতে ওঠার জন্য আরও খানিকটা যেতে হবে। এক বার হাইওয়ে ধরে নিলে কলকাতা বেশি দূর নয়। লরি বা কুয়াশার ঝামেলায় না পড়লে ঘণ্টাখানেকের মামলা। মধুমালতী তার দুই মিউজিসিয়ানের সঙ্গে প্রোগ্রামের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা করছিল। সাউন্ডে কিছু সমস্যা ছিল। কিছু ক্ষণের মধ্যে দোকান থেকে হট্টগোল ভেসে আসে।

‘‌তুমি শালা, পয়সা না দিয়ে খেয়ে রোজ রোজ পালাবে ভেবেছো?‌’‌
‘‌আরে বলছি তো আজ পয়সা নেই।’‌
‘‌তা হলে খেলি কেন? এই নিয়ে দু’দিন হল। সে দিনও তো টাকা দিসনি।‌’‌
‘‌খুব খিদে পেয়েছিল। কাল পরশু এসে দাম মিটিয়ে দেব।’‌
দোকানের ভিতর থেকে কে যেন বলল, ‘‌শালার জামা প্যান্ট খুলে রাখ।’‌
‘‌ধুস, ওই ছেঁড়া জামা প্যান্টের দাম কী?‌’‌
‘‌দাম লাগবে না। শীতের রাতে ন্যাংটা করে ছেড়ে দে। বিনি পয়সায় খাওয়ার মজা বেরিয়ে যাবে।’‌

একটা ষণ্ডা মতো লোক এগিয়ে গিয়ে লোকটার জামা চেপে ধরল।
লোকটা বলে ওঠে, ‘‌আরে!‌ কী করছেন.‌.‌.আমি কিন্তু.‌.‌.‌‌’
ষণ্ডা বলল, ‘‌জামা কাপড় খুলে নিলেই বু্ঝতে পারবি কী করছিস।’‌‌

এবার মধু ফিরে তাকায়। লোকটাকে টেনে দোকান থেকে বার করা হয়েছে। গা থেকে চাদর পড়ে গেছে। সত্যি সত্যি তার জামা প্যান্ট খোলার চেষ্টা হচ্ছে। দোকানের বাইরের অল্প আলোতেই বিলুকে চিনতে পারে মধুমালতী। ভিতের চমকালেও, বাইরে নিজেকে শান্ত রেখে সে এগিয়ে যায়। কঠিন জীবন তাকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিখিয়েছে।

‘‌কত টাকা দিতে হবে?‌ ওর খাবার আর আমাদের চায়ের বিল কত হয়েছে?‌‌’‌
দোকানের লোকটা বলে, ‘‌দিদি, আপনি কেন ওর দিতে যাবেন?‌ এই হারামি শালা রোজ.‌.‌.‌।’‌
মধুমালতী গলা আরও কঠিন করে বলে, ‘‌কত টাকা দিতে হবে সেটা বলুন। অত গাল দিচ্ছেন কেন?‌ আমি এর থেকে বেশি খারাপ কথা জানি। শুনবেন?‌’‌
তার পরে সব টাকা মিটিয়ে বিলুকে চাপা গলায় বলে, ‘গাড়িতে ওঠ।’‌
বিলু হতভম্ব বয়ে বলে, ‘‌আমি উঠব!‌‌ না না।’‌
মধুমালতী দাঁতে দাঁত ঘষে বলে, ‘কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠতে বলছি, উঠে পড়।’
প্রোগ্রামে সবার সঙ্গে ফেরার সময় বড় গাড়ি থাকে। বিলু সেই গাড়িতে ওঠার সময়ে ‌দোকানের ভিতর থেকে কে যেন বলে ওঠে, ‘‌উরিব্বাস্‌, লোকটা এই মেয়েছেলেটার চেনা মাইরি!‌’‌

মধুমালতী গাড়িতে উঠতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলে, ‘কেন শা‌লা?‌ তাতে তোমার কোনও অসুবিধে আছে?‌’‌

‌সেই থেকে বিলু আবার মধুমালতীর কাছে। কাছে মানে খুব কাছে নয়। কোনও দিন থাকে, কোনও দিন থাকে না। এই ছেলের সামনে মধু শরীর নিয়ে সংকোচ করে না। কেন?‌ বিলুকে কি সে ‘‌‌পুরুষ’‌ হিসেবে গন্য করে না?‌ কেন?‌ বিলুর কি কোনও সমস্যা আছে?‌

সমস্যা আছে। মধুর নগ্নতায় তার উত্তেজনা হয় না। শুধু মধু নয়, কোনও নারী শরীরই তাকে জাগাতে পারে না। আদর, সম্ভোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মাঝপথে নিজেকে প্রত্যাখান করে। অথচ প্রেমের কোনও খামতি নেই। মনে প্রেম থাকলেও, বিলুর শরীর বিলুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তাই মনে মনে কামনা করেই আত্মরতিতে সুখ পেতে চায়।‌

বিয়ের পর ডাক্তারের কাছে গেল। মধুমালতীই পাঠাল।
‘‌একবার যা।’‌
‘‌ও ঠিক হয়ে যাবে।’‌
‘ছ’‌মাসেও ঠিক হল না.‌.‌.‌ডাক্তারের সঙ্গে কথা বল।’‌
বিলু মাথা নামিয়ে বলেছিল, ‘‌এসব ডাক্তারের ওষুধ খেলে ঠিক হওয়ার নয়। আমি অন্য ব্যবস্থা করব।’‌
মধুমালতী ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেছিল, ‘‌না হোক, তা-ও যাবি। আমার জন্য যাবি। আমার শরীর বলে কিছু নেই?‌ ন্যাতানো স্বামীকে নিয়ে আমি আর কত দিন ঘর করব‌?’‌

ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়েছিল বিলু। লাভ হয়নি। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘সরি, কিছু করবার নেই। এই অসুখ সারাতে বাজারে ওষুধের নামে যা বিক্রি হয়, আমি দিতে পারব না। ওতে ভয়াবহ অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এই অবস্থা আপনাকে ‌মেনে নিতে হবে। তবে বিয়ে করাটা আপনার উচিত হয়নি।’‌

বিলুকে ছোটবেলা থেকে চিনত মধুমালতী। তবে কথাবার্তা ছিল না। একই পাড়ায় থাকলে যেটুকু মুখ চেনা হয়। ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশার স্বভাব ছিল না মধুর। তা ছাড়া পাড়ায় বিলুর সুনাম ছিল না। বরং উলটোটাই। গুন্ডা মস্তানদের দলেই তাকে ফেলা হত। মধুমালতীর মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মীয়পরিজন, প্রতিবেশী, পরিচিতরা সবাই পালাল। এই ভয়ংকর কেলেঙ্কারিতে কে জড়াবে? কিশোরী মধুমালতী দিশা হারা। শুধু তার মাকে খুন করা হয়েছে এমন নয়, খুনি তার বাবা। মধু বেশির ভাগ সময়েই কথা বলতে পারত না, থরথর করে কাঁপত। এই সময়ে এগিয়ে আসে বিলু। তখন তার বয়সও আঠেরোর বেশি নয়। থানা, মর্গ, সৎকার সব কাজেই হতচকিত, শোকে বিহ্বল কিশোরীর পাশে থাকে সে। শিবনাথকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে আরও কাছে আসে। এমনও হয়েছে, বিলু রাতে মধুমালতীদের বাড়ির সদর দরজার বাইরে ক্যাম্প খাট পেতে শুয়ে থেকেছে। তাকে কেউ ঘাঁটাত না। সবাই জানত, ছেলেটা কাছে অস্ত্র আছে।

মধুও হয়তো জানত, তাতে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে সমস্যা হয়নি। বিলু বয়েসে একটু বড় হলেও মধুমালতী ‘‌তুমি’ থেকে ‘‌তুই’‌-এ চলে যায়। বন্ধুত্বেই যায়। তখনও প্রেমের ব্যাপারটা সামনে আসেনি। এই ভাবে চার বছর চলার পরে মধুমালতীই এক দিন দুম করে বিয়ের প্রস্তাব দিল। বিলু গুটিয়ে যায়।‌

‘কেন?‌ তোর কীসে আপত্তি?‌ এ ভাবে কত দিন চলবে?‌ তা ছাড়া গানবাজনার জগতটাকেও সামলাতে হবে তো। গায়িকা মধুমালতী এক জন পুরুষের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছাড়াই থাকে এই প্রচার তো ভাল নয়। শহরে কিছু নয়, আমার প্রোগ্রাম তো পাড়া গাঁতেই বেশি।’‌
বিলু বলল, ‘‌তুই বেশি ভাবছিস।’‌
মধুমালতী বলল, ‘‌আমাকে তো বেশিই ভাবতে হবে। এইটুকু জীবনে অনেক বেশি দেখে ফেলেছি। ‌আমরা বিয়ে করব।’‌
বিলু একটু চুপ করে থেকে বলে, ‘‌আমি তোর যোগ্য নই মধু।’‌
‘‌কেন?‌’‌
‘‌তুই শিল্পী মানুষ। আমি কিস্যু নই। কাজকর্মও কিছু করি না।’
মধুমালতী বলে, ‘‌এবার করবি। বিয়ের পর করবি।’
বিলু ভয় পেয়ে বলে, ‘‌না না, যদি কিছু না পারি?‌’‌
মধুমালতী বিলুর গাল টিপে হেসে বলে, ‘‌যেমন আছিস তেমন থাকবি, আমার পাহারাদার।’‌

বিলু গম্ভীর হয়ে থাকে। মধুমাল‌তী গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তোকে এত দিন তো বলিনি, আজ বলছি। এত দিন পাশে পাশে আছিস, কোনও দিনও, এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে অসম্মান করিসনি। জোর করে তো নয়ই, এমনকী ছলছুতো করেও ছুঁয়ে দেখিসনি। একটা অসহায় মেয়েকে যে কেউ হলেই.‌.‌.‌এমন গুন্ডাকেই আমার বর হিসেবে পছন্দ।’‌

বিলু আরও গম্ভীর হয়ে যায়। গম্ভীর হয়েই বিয়ে করে। মধুমালতী প্রথম রাতেই বু্ঝতে পারে গোলমাল হচ্ছে। ক’টা দিন কাটতে বুঝতে পারে, এই গোলমাল ঠিক হবার নয়। থম মেরে যায় মেয়েটা। তখন তার কতই বা বয়েস? মনে স্বপ্ন। ঘর সংসারের স্বপ্ন। স্ত্রী, মা হওয়ার স্বপ্ন। বাবা–‌মার ঘটনায় ভেঙে পড়া মাস্তুলটাকে আবার সারিয়ে নিয়ে, সোজা করে ভেসে পড়ার স্বপ্ন। এই অক্ষমতার কথা জানানো উচিত ছিল বিলুর। হাবিজাবি অনেক বলছিল, কিন্তু নিজের গোলমালটা বলেনি।

কী হবে এখন?‌ সামনে পুরো জীবনটা পড়ে রয়েছে। সেই জীবনে শরীরও থাকবে। সেই শরীরকে কী বোঝাবে? এই অপরাধ কেন করল বিলু?‌ দরজা বন্ধ করে অনেকটা কান্নাকাটি করল মধুমালতী। এক সময়ে নিজেকে শান্তও করল।‌ সময় নিয়ে নিজেকে বোঝাল। বিলু তার জন্য যা করেছে, তাতে এই ভয়ংকর সত্যটুকু মেনে নিতে হবে। এটা নিয়েই চলতে হবে বাকি জীবন। মনকে শক্ত করল। তার পরেও শরীর মাঝেমধ্যে অশান্ত হত। ডাক্তারের কাছে বিলুকে পাঠাল জোর করে। কাজ হল না। মধুমালতী শোয়ার জায়গা আলাদা করল।

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৮

Comments are closed.