মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৬

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    প্রচেত গুপ্ত

    খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক।  

    বাংলোর বাইরে এসে গাড়িতে ওঠার সময় ওসি চাপা স্বরে বললেন, ‘‌স্যার এই নিন, একটা টুকরো পেয়েছি। দোমড়ানো মোচড়ানো অবস্থায় বাগানে পড়ে ছিল। মিলিয়ে দেখতে হবে।’‌
    বসন্ত ওসির কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ওয়ান্ডারফুল। আমি জানতাম কিছু না কিছু পাওয়া যাবে। পুলিশ চাইলে অনেকটাই পারে।’‌

    অফিসে ফিরে বসন্ত সাহা খাম থেকে ছেঁড়া স্ক্রিপ্ট আর বাগান থেকে পাওয়া  টুকরো নিয়ে বসলেন।‌ একটু পরে একা একাই হো হো করে হেসে উঠলেন। খামটা আলোর সামনে তুলে ধরে ভাল করে দেখলেন। তিনি যা সন্দেহ করেছিলেন, সেটাই ঠিক। স্ক্রিপ্ট, ছেঁড়া কাগজের টুকরো, খাম– সব একসঙ্গে ভরে একটা ফাইল করে, ওপরে লিখলেন ‘‌ফর ফরেনসিক’‌। এবার ফোন করলেন বড়সাহেবকে।

    ‘‌বসন্ত, তোমার জন্যই এত রাত পর্যন্ত অফিসে বসে আছি। কিছু হল?‌’‌
    বসন্ত বললেন, ‘‌হয়ে গেছে স্যার।’‌
    বড়সাহেব উচ্ছ্বসিত গলায় বললেল, ‘‌ভেরি গুড। আমি জানতাম তুমি গেলে একটা সুরাহা হবে।’‌
    বসন্ত বললেন, ‘‌সুরাহা হবে কি না জানি না স্যার। তবে আমার চেয়ে থানার ওসির ক্রেডিট কিছু কম নয়। তিনি একটা জিনিস খুঁজে না পেলে কেসটা সলভ করা যেত না। তবে ফরেনসিকে পাঠিয়ে একটা রিপোর্ট নিতে হবে। আমি নিশ্চিত সেই রিপোর্টের সঙ্গে আমার অনুমান মিলবে।’‌
    বড়সাহেব আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘‌কী ব্যাপার বলো তো! তোমার গলায় হাসির আভাস পাচ্ছি মনে হচ্ছে।’‌
    বসন্ত হেসে বললেন, ‘‌খানিকটা হাসিরই বিষয় স্যার। এটা এক ধরনের ইনসিকিউরিটি আর ঈর্ষার কেস।’‌
    বড়সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘‌ঈর্ষা!‌ প্রফেশনাল?‌’‌
    বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌না স্যার, যৌন ঈর্ষা।’‌
    বড়সাহেব  বললেন, ‘‌অ্যাঁ!‌ বল কী বসন্ত।’‌

    বসন্ত  বললেন, ‘‌হ্যাঁ স্যার। এত দিন পরে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ওই অভিনেতা ভদ্রলোককে নিয়ে তাঁর স্ত্রী ইনসিকিউরিটিতে ভুগছেন। স্বামীর সিনেমার স্ক্রিপ্ট লুকিয়ে পড়ছেন। যেখানেই কোনও নারীর সঙ্গে ইন্টিমেট দৃশ্য বা ডায়লগ পাচ্ছেন, পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলছেন। স্ক্রিপ্টের দুয়েকটা ছেঁড়া জায়গায় চুমু বা বিছানায় ঘনিষ্ঠ হওয়ার কথা থেকে আমার সন্দেহ হয়, কিন্তু পাতা ছেঁড়া থাকায় পুরো বুঝতে পারিনি। একটা ছেঁড়া অংশ মিলিয়ে শিওর হলাম। এটা ওই মহিলার এক ধরনের মানসিক সমস্যা।’‌

    বড়সাহেব বললেন, ‘‌এটুকুই কি প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে?‌ এতে কি বলা যায় কাজটা অ্যাক্টরের স্ত্রীই করছেন?’‌

    বসন্ত বললেন, ‘‌না স্যার। এতে স্ত্রীর ব্যাপারটা প্রমাণ হয় না। আর একটু আছে। আমি স্ক্রিপ্টগুলোর দুটো জায়গায় রঙের হালকা ছোঁয়া দেখতে পাই। ডিফারেন্ট কালার। আমার সন্দেহ হয়, কীসের রঙ?‌ অভিনেতা ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলার সময়ে পাশে তাঁর স্ত্রী বসেছিলেন, হঠাৎ তার হাতের আঙুলে নজর পড়ে। নেলপলিশ। ছেঁড়া স্ক্রিপ্টের গায়ে লেগে থাকা রঙ কোথা থেকে এসেছে, নিমেষে বুঝতে পারি। আমি নানা রকম কথা বলে ওদের আটকে রাখি, যাতে ওসি ছেঁড়া টুকরো খোঁজার সময় পান। অভিনেতার মোবাইল নম্বর লেখার নাম করে খাম এগিয়ে দিই ওই মহিলার কাছে। ওখানে নেলপলিশের দাগ পেয়েছি। ফরেনসিকে গেলে স্ক্রিপ্টের গায়ে লেগে থাকা রঙের সঙ্গে এই রঙ মিলে যাবে।’

    বড়সাহেব বললেন, ‘সাবাস বসন্ত।’‌

    ‌বসন্ত বললেন, ‘‌থ্যাঙ্কিউ স্যার। কিন্তু এই রিপোর্ট ওই অভিনেতাকে আপনি কী ভাবে জানাবেন সেটা আপনাদের বিষয়। অনুগ্রহ করে আমাকে জড়াবেন না। মহিলা ভীষণ রাগী। খুব ধমক দিয়েছেন। এবার গেলে কামড়ে দেবেন। ওঁর কাউন্সেলিং করা দরকার।’‌

    দুজনেই হো হো আওয়াজে হেসে উঠলেন।

    ছন্দা, বসন্ত সাহার গা ঘেঁষে শুয়ে গল্পটা শুনছিল। মৌনী নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্লাস ফাইভের পর থেকেই তার শোয়ার ঘর আলাদা। এখন সে ক্লাস টেনে পড়ছে। ডিনার সেরে খাটে আধশোয়া হয়ে স্বামীর কাছে স্ক্রিপ্ট-রহস্য শুনছিল ছন্দা। এবার আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে এল। গায়ে হাত দিয়ে বলল, ‘‌সত্যি তোমার খুব বুদ্ধি।’‌

    বসন্ত স্ত্রীকে কাছে টানলেন।

    ‘‌বুদ্ধি নয়, চোখ কান খোলা বলতে পারো। আরও কিছু কো-ইন্সিডেন্স আছে। অভিনেতার স্ত্রী পার্টিতে যাওয়ার জন্য যদি সাজগোজ, মেকআপ না করে থাকতেন, আমি ওঁর হাতের নেলপলিশ দেখতে পেতাম না। মহিলা একটা ভুল করছেন। অভিনেতার ফোন নম্বরটা লিখে দিতে রাজি হওয়াটা ঠিক হয়নি। ভদ্রলোক সামনেই তো বসেছিলেন। বলা উচিত ছিল, ওকে দিন। আসলে মহিলা বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি পুলিশ তাড়াতে চাইছিল। নিজের অপরাধবোধ আছে।’‌

    ছন্দা তার স্বামীর মতোই সুন্দর। কলকাতার একটা নামকরা স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। চাকরি, সংসার, মেয়েকে মানুষ করার পরেও শরীরটাকে একেবারে স্লিম রেখেছে। সে স্বামীর বুকের ওপর উঠে আসে।

    ‘‌অভিনেতার নাম কী গো?‌’‌

    ‘‌উঁহু ওটি বলব না। প্রফেশনাল সিক্রেসি।’‌
    ‘‌আমি কি কাউকে বলতে যাব?‌’‌
    ‘‌না যাবে না, তা হলে আমাকেই বা বলতে বলছো কেন?‌’‌
    ছন্দা স্বামীর মুখের ওপর মুখ নিয়ে গিয়ে বলে, ‘‌আমি কি তোমার পর?‌’‌
    বসন্ত এক হাত দিয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘‌তুমি নও, ওই অভিনেতা আর তাঁর স্ত্রী তো পর।’‌
    ছন্দা স্বামীর গালে নাক ঘষে আদুরে গলায় বলে, ‘‌ইস্‌, অন্যের বউয়ের সাজগোজের দিকে তো খুব নজর হয়েছে দেখছি। এমনকী হাতের নেলপলিশও দেখা হচ্ছে আজকাল!’‌
    বসন্ত পাশে ফিরে গাঢ় স্বরে বলেন, ‘‌এবার আমি আমার বউকে দেখব।’
    ছন্দার নাইটির ফিতেতে হাত রাখেন বসন্ত।
    ছন্দা ফিসফিস করে বলে, ‘‌অ্যাই কী হচ্ছে?‌ আগে আলোটা নেভাও।’‌
    যত্ন করে নাইটির ফিতে খুলতে খুলতে বসন্ত বলেন, ‘‌আলো নেভালে দেখব কী করে?‌’‌
    ‘‌এত বছর হয়ে গেল, এখনও দেখা মেটেনি।’‌
    বসন্ত ফিসফিস করে বললেন, ‘‌তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে।’‌

    বসন্ত হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পটা নেভালেন। বাইরে গুরুগুরু করে মেঘ ডেকে উঠল। নগ্ন স্ত্রীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বসন্ত বললেন, ‘‌মেঘমল্লার। এবার মেঘ ভেঙে বৃষ্টি।’‌
    ছন্দা গোটা শরীর দিয়ে স্বামীর আদর নিতে নিতে আশ্লেষে বলল, ‘‌দুষ্টু।’‌

    খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়লেন বসন্ত সাহা। রঞ্জনীর ফাইল নিয়ে বসলেন। ফাইলের কোনায় ছোটো করে লেখা কোডনেম দেখে মুচকি হাসলেন।

    আমরাও আবার ‘‌মেঘমল্লার’‌ ফাইলে ঢুকে পড়ি।

    মধু নাভিতে রিং লাগিয়েছে তিন মাস হল। অনেক দিনের শখ।

    ‌এবারের ফাংশনের সিজন শুরু হওয়ার আগে। মোবাইল খুলে অনলাইনে অনেক ঘাঁটাঘাটি করে রিং বেছেছে। রিং ঝুলে সামান্য বড়। নাভির ঠিক ওপর থেকে শুরু। মাঝখানে ছোটো ফুলকাটা তারা। সেই তারার মাঝখানে এক বিন্দু সবুজ পাথর, নিচে আঁকশি ঝুলছে। জাহাজের নোঙরের মতো। মধুর ছিপছিপে, চিকন পেটে এই জিনিস এক ধরনের আকুতি তৈরি করেছে। মনে হচ্ছে, শরীর যেন বন্দর খুঁজছে। সেই বন্দরে নোঙর ফেলবে।

    একদিন রাতে মধুর পেটে সেই রিং দেখতে পেয়ে বিলু চোখ বড় বড় করল। মধু তখন আয়নার সামনে।

    ‘আরিব্বাস!‌ কী লাগিয়েছিস মাইরি!‌‌’‌
    মধু আয়নার ভিতর থেকে ভুরু কুঁচকে বলে, ‘‌কেন?‌ খারাপ লাগছে?‌’‌
    বিলু চোখ আরও বড় করে বলল, ‘‌খারাপ কী বলছিস!‌‌ ঘ্যাম হয়েছে। হ্যাঁ রে, জিনিসটা রুপোর নাকি?‌’‌
    মধু ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘‌রুপো না সোনা জেনে তোর লাভ কী?‌ তোর তো তামা কিনে দেওয়ারও মুরোদ নেই। শালা, ভিখিরির বাচ্চা।’
    ‌বিলু মধুর গালাগালি‌ গ্রাহ্য করে না। আজও করল না। বলল, ‘‌আরে বাবা, আজ নেই, এক দিন তো হতেও পারে। তখন দেখিস,  মুক্তো বসিয়ে দেব।’‌

    মধু এক্সারসাইজ় করছিল। হাত দু’টো সামনে তুলে পাতলা কোমর নির্দিষ্ট ব্যবধানে একবার ডান, এক বার বাঁ দিকে ঘোরাচ্ছে। বলল, ‘‌থাক। তোমায় আর মুরোদ করতে হবে না। যেমন আছো, তেমন থাকো। শালা, সে দিন আমি না বাঁচালে জামা প্যান্ট ছাড়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হত। ওরা তো অ্যাকশন শুরু করেছিল।’

    বিলু গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ‘অত সহজ হতো না। আমি একেবারে নাদান হয়ে যাইনি।’‌
    মধু ব্যঙ্গের হেসে বলল, ‘‌কী করতিস?‌ তোর ওই সেকেলে রিভলভারটা থেকে গুলি করে মারতিস?‌ ওটা থেকে গুলি বেরোয়?‌’‌
    বিলু সহজ ভাবে বলল, ‘‌দরকার হলে বেরোয়।’‌
    মধু ভুরু কুঁচকে বলল, ‘‌কই সে দিন তোকে অত খিস্তি করছিল, জামা প্যান্ট খুলে দিতে গেল, তুই তো কিছু করলি না!‌’
    ‌বিলু বলল, ‘‌গুলির দাম আছে। ও সব ছোটো কাজে থ্রি-নট-থ্রির গুলি খরচ করা যায় না।’‌

    মধু তুচ্ছ করার ভঙ্গিতে বলল, ‘‌ফুঃ, আমার তো সন্দেহ হয়, আদৌ তোর কাছে মালটা আর আছে কি না। সেই কত বছর আগে দেখেছিলাম.‌.‌.’
    বিলু গ্লাসে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, ‘‌খদ্দের খুঁজছি।‌ ভালো দাম পেলে বেচে দেব।’‌
    মধু বলল, ‘‌তোর ওই জং ধরা মাল কেউ নেবে না। লোহালক্কড়ের দোকানে বেচে দে।’‌

    সেদিন লাল স্পোর্টস ব্রা আর একটা ডার্ক গ্রে রঙের সুতির স্লিপ পায়জামা পরেছিল মধু। দাঁড়িয়েছিল আয়নার সামনে। একেবেঁকে, সোজা হয়ে, ঝুঁকে নিজেকে দেখছিল। স্টেজে পারফরমেন্সের সময় এসব ভঙ্গি লাগে। এটা তার রোজকার কাজ। অনেক বছর ধরে চলেছে। তেরো বছর বয়েসে প্রথম স্টেজে উঠেছিল। একবারে হঠাৎই। সে-ও ছিল এক অদ্ভুত ঘটনা।

    ঝাড়গ্রাম থেকে খানিকটা ভিতরে গিয়েছিল লিপিকা সেন। নাচ–‌গানের প্রোগ্রাম ছিল তার। কলকাতায় একই সঙ্গে নাচ–গানে যেসব ‘‌মাচা আর্টিস্ট’‌দের তখন বেশ নাম-ডাক, লিপিকা ছিল তাদের এক জন। গ্রামে-গঞ্জে এদের কদর ছিল বেশি। সকালে কলকাতা ছাড়ার সময়েই লিপিকা সেনের শরীর খারাপ হল। সন্ধ্যের মুখে শুরু হল পেট ব্যথা। রাতে প্রোগ্রাম শুরুর আগে ব্যথার চোটে লিপিকা দুমড়ে মুচড়ে গেল। সেই অবস্থায় স্টেজে ওঠা অসম্ভব।

    এদিকে লোকে লোকারণ্য। ফসল উঠে যাওয়ার পরে শুকনো খেতে স্টেজ বাঁধা হয়েছে। ত্রিপল দিয়ে চার পাশ ঘেরা। সস্তার টিকিট কিনে লোক ঢুকেছে। ছালা পেতে বসার ব্যবস্থা। ছালা হল চটের আসন। নিজেকেই বাড়ি থেকে আনতে হবে। ওসব জায়গায় যেমন হয়। এক দিন গান, তিন দিন যাত্রা। লিপিকার পক্ষে নাচ–‌গান তো দূরের কথা সোজা হয়ে দাঁড়ানোই তখন কঠিন। এই অবস্থায় ‘‌প্রোগ্রাম ক্যানসেল’‌ বললে আগুন জ্বলে যাবে। পাবলিক তুলকালাম কান্ড করবে। অর্গানাইজারদের মাথায় হাত। কী হবে?‌

    সে দিন স্টেজে উঠেছিল এক বালিকা। সস্তার ফ্রকের ওপর আড়াআড়ি জড়িয়ে নিয়েছিল শাড়ি-ছেঁড়া জড়ির পাড়। মুখে পাউডার, চড়া লিপস্টিক। কপালে একটা বড় করে টিপ। চুল ঝুঁটি করে মাথার ওপর বাঁধা। হাতে মাইক্রফোন নিয়ে ছুটে এসে ছেলেমানুষি অথচ নিখুঁত সুরে গান ধরেছিল, ‘‌এই ঘুম ঘুম চাঁদ.‌.‌.‌।’ সেই সঙ্গে হাত ঘুরিয়ে নাচ।‌ হাততালিতে ফেটে পড়ল ধানখেত।

    এই বালিকাই আজকের মধুমালতী। সিঙ্গার মধুমালতী সেন।

    ঘরে ঘুরতে-ফিরতে মায়ের গান শুনতে শুনতে গাইতে জেনেছিল সেই বালিকা। শেখেনি কখনও। কোনও দিন ফাংশন করবে ভাবা তো দূরের কথা, মেয়েটি গাইতে চাইতও না। প্রোগ্রাম-টোগ্রামের ধারে কাছে ঘেঁষেনি। যদি বা দু’–‌একবার গেছে, স্টেজের পাশে বসে গান শোনার থেকে ঘুরে বেড়াতে সে মজা পেয়েছে বেশি। শরীর ভাল নয় দেখে, সেই বার মায়ের সঙ্গে ঝাড়গ্রাম গিয়েছিল। মা-ই নিয়ে গিয়েছিল। যদি বাড়াবাড়ি হয়, সেবা করতে পারবে। সেই ‘‌সেবা’‌ যে গান দিয়ে হবে মা–‌মেয়ে দু’জনের কেউই জানত না।

    মধুমালতী সেনের গায়িকা জীবনের সেই শুরু।

    এর পরে মাঝেমধ্যেই মেয়েকে নিয়ে গাইতে যেত লিপিকা। শুরুতে মেয়ে একটা গান গাইত। অর্গানাইজরাও খুশি হল। একটু অন্য রকম হল। পরে তারা চাইত।

    ‘‌মেয়েকেও নিয়ে যাবেন দিদি।‌ ‌ওর তো বেশ নাম হচ্ছে। পাবলিকের ভাল লাগবে। ছোটো ছেলেমেয়েদের গলায় গান শুনতে সবাই মজা পায়।’‌

    লিপিকা বলত, ‘‌নিয়ে গেলে ওকে কী দেবে?‌ আমার টাকার মধ্যেই হিসেব ধরবে নাকি? তাহলে ও যাবে না।‌’‌
    ‘‌ঠিক আছে কিছু গিফট দেব। পুতুল?‌ খেলনা?‌’
    লিপিকা বলতে, ‘ও সবে কী হবে?‌ ‌একটা ভাল জামা দিও।’
    ‘তাই হবে। জামার আর দাম কত। তবে দিদি একটা নয়, তাহলে মেয়েকে দিয়ে দু’‌তিনটে গান করিয়ে দেবেন প্লিজ। আমরা আগে থেকে অ্যানাউন্স করিয়ে রাখব, আজ মা–‌মেয়ে দু’জনেই গাইছে।’
    লিপিকা আঁতকে উঠে বলত, ‘‌না না, এসব কোরো না। ওর বাবা জানলে রাগ করবে।’‌‌ ‌

    কিছু দিন যেতেই স্টেজে ওঠায় মজা পেয়ে গেল মধুমালতী। তার সঙ্গে উপহারের টান ছিল। কখনও জামা, কখনও ব্যাগ, কখনও পাইডার–‌ক্রিম। স্কুলের চাপ না থাকলে মায়ের সঙ্গী হয়ে পড়ত। বাড়িতে মায়ের কাছে বসে রেওয়াজ শুরু করল। এক সময়ে বুঝতে শিখল, স্টেজের সামনে ভিড় করা মানুষ শুধু গান শোনে না, তাকে দেখেও। নিজের চেহারা সম্পর্কে সচেতন হতে শিখল বালিকা থেকে কিশোরী হয়ে ওঠা মধুমালতী।

    এর পরে যত দিন স্টেজে উঠছে, দিনের শেষে এক বার করে আয়নায় সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখে নিয়েছে মধু। শরীরের কোথাও মেদ বাড়ল কি ? শরীর হল গানের মতো। সুরের মতো। তাল কাটলে বিপদ। সেই শরীরেরও তাল কাটা লাগছে না তো?‌ বুক, কোমর একই রকম আকর্ষণীয় রয়েছে? নাকি ভারি হয়েছে? এখন আরও বেশি করে নজর করতে হয়। চৌত্রিশ তো বয়স হিসেবে মেয়েদের জন্য কম নয়। এখনই সাবধান হওয়ার সময়। স্টেজে একটু মোটা লাগলেই গোলমাল। চড়া আলো মোটা ভাব তিন গুণ বাড়িয়ে দেয়। পাবলিকের সামনে সব চলে, মোটা চলে না।

    বাঁ হাতে মাইক্রোফোন ধরার ভঙ্গি করে ডান হাত মুঠো করে বার কয়েক মাথার ওপর ছুড়ল মধু। ইউটিউবে বিদেশের রক আর্টিস্টদের এই ভঙ্গি দেখেছে সে। এতে মেয়েদের স্ট্রং আর সেক্সি দেখায়। তবে সেখানে ডিপ কাট্ জামা পরতে হবে। স্যান্ডো গেঞ্জি ধরনের কিছু হলে সব চেয়ে ভাল। বুক–‌পিঠ অনেকটা দেখা যাবে। তবে পাড়া-গাঁয়ে ঘুরে মাচার প্রোগ্রামের জন্য এত পোষাবে না। উচিতও নয়। ভাববে স্ট্রিপটিজ হচ্ছে। ইউপি, বিহারের কোনও কোনও মেলায় এরকম জামা–‌কাপড় খোলা নাচের ব্যবস্থা আছে। তাছাড়া এখন সে শুধুই ভাড়া করা সিঙ্গার। এর নকল, তার নকল করে হিট ফিল্মের গান গায়। কোমর দুলিয়ে নাচে। আসর জমে ওঠে। ‘‌আর্টিস্ট’‌ বলে কেউ পোঁছে না। যাদের নামকরা গায়ক–‌গায়িকা ডাকার মুরোদ নেই অথচ জমাটি প্রোগ্রাম চাই, তারাই ডাকে। কোনও কোনও সময়ে আবার বিখ্যাতদের আগে উঠে ভিড় জমাতে হয়।

    সত্যি করে কোনও দিন ‘‌আর্টিস্ট’‌ হতে পারলে তখন ওসব হাত ছোড়াছুড়ি, শরীর দেখানোর কায়দা করা যাবে।

    অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More