বৃহস্পতিবার, মে ২৩

মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১৮ (শেষ পর্ব)

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ শেষ পর্ব

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব: মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

পড়ুন আগের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১৭

খানিক আগে মেঘমল্লার ফাইল শেষ করেছেন বসন্ত সাহা। এখন চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছেন।

ফাইল পড়ার সময়ে হাজার প্রশ্ন মাথায় ভিড় করে আসছিল, আকাশে যেমন একটু একটু করে মেঘ জমে। অল্প কয়েকটা নমুনা এ রকম—

পিনাকী কি সত্যিই স্টেজের সামনে চাদর মুড়ি দেওয়া কাউকে দেখেছিল?‌ না ‌নিজে বাঁচতে মিথ্যে বলছে?‌ আর যদি সত্যি কাউকে দেখে থাকে তার হাইট কত? তিনি যে হাইটের কথা ভাবছেন সে রকম?‌ মধুমালতী আর বিলু কি শেষ পর্যন্ত স্বামী–‌স্ত্রী ছিল?‌ নাকি ডিভোর্স হয়ে গেছে?‌ মধুমালতী কেন বিলুকে পিনাকীর গল্প করেছিল?‌ প্রতিশোধ? ‘‌তুমি আমাকে শরীরে তৃপ্তি দিতে পারোনি, এবার মজা দেখ। আমি ভালবাসার পুরুষ পেয়ে গেছি।’‌ নাকি খেলাচ্ছলে বলেছিল?‌‌ সত্যি কি শিবনাথের অপারেশনটা ঠিক মতো হয়নি?‌

এখন মনে জমা সেই সব মেঘ এক এক করে সরিয়ে দিচ্ছেন বসন্ত সাহা। প্রশ্নের জবাব নিজেই খুঁজে পাচ্ছেন। বৃষ্টি হয়ে যেন আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে।

সেই দশটায় অফিসে ঢুকেছেন, এখন পাঁচটা বাজে। তার মানে বসন্ত সাহা দীর্ঘ সময় ‘‌মেঘমল্লার’‌–‌এর মধ্যে রয়েছেন। মাঝখানে ছোটো একটা মিটিং করেছেন। কয়েকটা ফোন করেছেন। তার মধ্যে একটা ফোন ছিল কলকাতার এক সেন্ট্রাল জেলে। সেখানকার এক অফিসার তাঁর বিশেষ পরিচিত। আর ফোন করেন মেদিনীপুরের এক থানায়। তৃতীয় ফোনটা রঞ্জনীকে। ঘটনার দিন ফাংশনের জায়গায় আলো কেমন ছিল জানার জন্য।

রঞ্জনী জানিয়েছে, রাস্তার মোড়ে হলেও, স্টেজ ছাড়া সবটাই ছিল অন্ধকার। আজকাল এ রকমই হয়। গানের অনুষ্ঠানে শিল্পীর জন্য আলোর খেলা থাকে। এতে এক ধরনের উত্তেজনা এবং মাদকতা তৈরি হয়। এখানেও তা-ই ছিল। চার পাশ অন্ধকার করে স্টেজে রঙিন আলোর খেলা চলছিল। একে বলে ‘‌সাইকোডোলিক’‌। এক বার আলো, এক বার অন্ধকার। মধুমালতী এবং বাজনদারদের দিকে আলো ঘুরে ঘুরে পড়ছিল। এমনকি স্ট্রিট লাইটগুলো পর্যন্ত নিভিয়ে রাখা হয়েছিল। কোনও অবস্থাতেই দর্শকদের মুখ দেখা সম্ভব নয়। যারা স্টেজে থাকে তাদের পক্ষে তো একবারেই নয়। তাদের চোখ পুরো ধাঁধিয়ে থাকে। আততায়ী এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।

এই ফোনটার পরে করিডোরে অন্যমনস্ক ভাবে কিছু ক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেছেন বসন্ত সাহা। তার পরে এক ঘণ্টার জন্য বেরিয়েছিলেন। একটি বাড়ি দেখতে যান। ভিতরে ঢুকে নয়, বাইরে থেকে ঘুরে বাড়িটা দেখেছেন। পুরনো কলকাতার বাড়ি। একতলায় চার–‌পাঁচটা ছোটো ছোটো ঘর। আলাদা আলাদা ভাড়া দেওয়া হয়। ঘরগুলো এমন ভাবে তৈরি যাতে সামনে এবং পিছনে দু’‌দিক থেকেই যাতায়াত করা যায়। সামনে কমন উঠোন। পিছনে একটা করে লোহার গেট। ওই গেট খুলে বেরোলে পাশের ঘরের কেউ জানতে পারে না। এই বাড়ির ঠিকানা তিনি পেয়েছেন রঞ্জনীর ফাইল থেকেই। ফিরে এসে তিনি টেবিলে রাখা প্যাডটা টেনে নেন। এই প্যাডে ‘‌মেঘমল্লার’‌ পড়তে পড়তে সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করেছিলেন। তালিকাটি ছিল এরকম—

১) শ্যামাপদ মাল্লা
২)‌ পিনাকী
৩)‌ মোহন পাকড়াশি
৪)‌ বলাকা
৫)‌ বিলু
৬)‌‌ ভাড়াটে খুনি (‌তাকে টাকা দিল কে?‌)
৭) এদের বাইরে‌ অদৃশ্য কেউ (‌যে আছে, কিন্তু মনে পড়ছে না)।‌‌

তালিকাটা হাতে নিয়ে চোখের সামনে তুলে ধরলেন বসন্ত। যেন লেখা নামগুলোতে মানুষের মুখগুলো দেখা যাচ্ছে। এমন কী, যে অদৃশ্য, তার অস্পষ্ট মুখটাও কাগজের গায়ে ভেসে ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল। চেনার সময় দিল না। পেনটা নিয়ে একটা একটা করে নাম কাটতে লাগলেন বসন্ত। দুটো নামের পাশে টিক চিহ্ন দিলেন। একটার পাশে জিজ্ঞাসা। তার পরে পেন দিয়ে নোটের পাশে বড় বড় করে লিখলেন— এই ফাইলের নাম রঞ্জনী কেন ‘‌মেঘমল্লার’‌ দিয়েছে?‌ তার অবচেতন মনে কি কোনও ক্লু উঁকি দিয়েছিল?‌ নাকি নিছকই রাগ ভালবেসে। যেমন ও করে থাকে।

বসন্ত সাহা অনুভব করলেন, ‘‌মেঘমল্লার’ রাগটাই তাঁর ইন্টারেস্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই রাগ শুধু শুনলে হবে না, রাগের উপর  কয়েকটা গানও শুনতে হবে। জেরায় মোহন পাকড়াশি রঞ্জনীকে কয়েকটা গানের কথা বলেছে না?‌ পুরোনো গান। ওগুলো শুনতে হবে। আজকাল নতুন, পুরোনো কোন গান পাওয়াই ঝামেলার নয়। ছন্দাকে বললেই হবে। কত রকম অ্যাপ হয়েছে। কম্পিউটার খুললেই পাওয়া যায়। ছন্দাই ডাউনলোড করে দেবে। কিছু দিন আগেও তো গান শোনা মানে হয় গ্রামাফোন রেকর্ড নয় টেপ রেকর্ডার। তবে সে-ও খারাপ ছিল না। খুব ছোটোবেলার কথা এক ঝলক মনে পড়ে গেল পুলিশ অফিসারের। বাবা রেকর্ড চালিয়ে বেগম আখতার শুনতেন। ‘জোছনা করেছে আড়ি/‌ আসে না আমার বাড়ি।’ মনে হত, সামনে বসে কেউ গাইছে। পরে টেপ রেকর্ডার এল। নিজের গলা রেকর্ড করে চমকে উঠেছিলেন। ক্যাসেট, সিডি কিছু পাওয়া যায় আজকাল?‌‌

মাথার মধ্যে দপ আলো জ্বলে উঠল বসন্ত সাহার। ইস! এইটা মাথায় আসতে এত সময় লাগল!‌‌

মুচকি হেসে ইন্টারকম তুলে রঞ্জনীর নম্বর টিপলেন বসন্ত সাহা। ‘‌এক বার আসবে?‌ তোমার কালকের রেইডের গল্পটা শুনব। দেখি, তুমি কেমন গোয়েন্দা হয়েছো। নাকি এখনও গায়িকা হয়েই বসে আছো?‌’‌

কথা শেষ করে ‘‌হো হো’‌ আওয়াজ করে হেসে উঠলেন বসন্ত। তাঁর হালকা লাগছে। এবার জমিয়ে এক কাপ চা খেতে হবে।
রঞ্জনী প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকল।

‘‌স্যার, আপনি কেস সলভ করে ফেলছেন?‌’‌

বসন্ত সাহা চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, ‘‌আমি করিনি। তুমিই করেছো। একটু আধটু বাকি আছে। সেটাও তুমি করবে। আমি তোমাকে অ্যাসিস্ট করেছি মাত্র। এই কেসে তুমি ডিটেকটিভ আমি সহকারী। ওয়েল ডান রঞ্জনী।’‌

রঞ্জনী রায় লজ্জা পেল। ‘‌কী যে বলছেন স্যার!‌’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘ঠিকই বলছি। তার আগে তুমি এখনই তোমার টিমকে রেডি করো। যা করার আজ রাতেই করতে হবে। কেউ যেন পালিয়ে না যায়।’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌কেউ পালাতে পারবে না। অঙ্কুশ, পিনাকী থেকে শ্যামাপদ মাল্লা পর্যন্ত সবার পিছনে লোক দেওয়া আছে।’‌
বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌ভেরি গুড। ‌তোমার বাড়িতে টেপ রেকর্ডার আছে?‌’‌

রঞ্জনী অবাক হয়ে বলল, ‘‌টেপ রেকর্ডার!‌ না তো স্যার। আমাদের এখানে ভয়েস রেকর্ডার আছে। অনেক সময়ে জেরার জন্য ব্যবহার করি। দিতে বলব?‌’

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌না ওই জিনিস নয়। আগেকার দিনে যেমন পাওয়া যেত। বড়, গাবদা। জোরে চালালে আশপাশের বাড়িতেও শুনতে পাবে। আছে?‌‌’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌না স্যার। এখন তো ল্যাপটপে স্পিকার কানেক্ট করলেই হয়। জোরে শোনা যাবে। আমিও তো বাড়িতে এ ভাবে শুনি। ব্লু টুথে।’‌

বসন্ত সাহা একটু হেসে বললেন, ‘‌রঞ্জনী, তোমার বাড়ির কথা হচ্ছে না। ‌যে বাড়ির কথা হচ্ছে, সেখানে এত সব থাকবে বলে মনে হয় না। যাই হোক, কালকের রেইডের কথা বলো।’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌স্যার, বিলুর বাড়ি থেকে আমি একটা রুমাল পেয়েছি। যার কোণে রঙিন সুতো দিয়ে সেলাই করে বাংলায় লেখা ‘ল’। বলাকা সেলাই জানে।’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌নেক্সট?‌’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌গোড়া থেকেই আমার সন্দেহ হচ্ছিল, অর্জুন লোকটাকে বলাকাই খুন করেছে। কেস সাজাতে কোথাও নেগলিজেন্স হয়েছিল। সেই কারণে মেয়েটা ছাড় পেয়ে যায়। আমি কাল স্পটে গিয়ে দেখেছি, ওই বাড়ি থেকে খুন করে দোতলা থেকে পালানো খুব সমস্যা নয়, যদি দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি ওকে সাহায্য করে। আমার বিশ্বাস তা-ই হয়েছিল। মেয়েটাকে চাপ দিলে ও সব স্বীকার করবে।’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘ধন্যবাদ। ‌আমার খটকা দূর করে দিলে রঞ্জনী।’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌আর একটা কথা স্যার। মোহন পাকড়াশি যদি তার স্ত্রীকে খাদে ধাক্কা মেরে ফেলেও দিয়ে থাকে, প্রমাণ করা যাবে না। আমি ওই থানার সঙ্গে কথা বলেছি। কেস ফাইল দেখে ওরা জানিয়েছে, সেই সময়েও একই সন্দেহ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর ক্যামেরাটা মোহন পাকড়াশি নিয়ে গিয়েছিল।’‌

বসন্ত সাহা এবার কঠিন মুখ করে বললেন, ‘‌এই লোকটাকে ছাড়া যাবে না রঞ্জনী। আমি আমার তালিকায় ওর নামের পাশে নোট অফ ইন্টারোগেশন বসিয়েছি। বাট আই অ্যাম শিওর, ও মধুমালতীর মায়ের সঙ্গে প্রেম করতো। তোমার জেরায় লিপিকা সেনকে বারবার লিপি নামে সম্বোধন করেছে। একা গান শোনার কথা বলেছে, মেঘমল্লার রাগের কথা বলেছে। আমার অনুমান, ও নিজের বউকেও খুন করেছে। আমরা প্রমাণ করতে পারলাম না। যদি ক্যামেরাটা পাওয়া যেত, দেখা যেত একটাও কুয়াশার ফোটো নেই। থাকবে কী করে, বউয়ের ফোটো তোলার ঘটনাটা তো বানানো। আগে বউকে ধাক্কা দেয়, তার পরে ক্যামেরাটা ফেলে দেয়।’‌

রঞ্জনী চোখ বড় করে বলে, ‘‌সে কী!‌’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌তুমি তো জানো জেলের কয়েদিদের মধ্যে চর থাকে। জেলার, সুপারদের খবর সাপ্লাই করে। এমন এক জনকে বলে রেখেছিলাম শিবনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশতে। তাকে শিবনাথ বলেছে, সে তার স্ত্রীকে পুরো খুন করেনি। সে দিন ট্যুর থেকে ফিরে এসে দেখে, বউ আধমরা। গান শোনার নাম করে এসে মোহন পাকড়াশি তাকে আধমরা করে দিয়ে গিয়েছিল। কেন শিবনাথকে ছেড়ে লিপিকা তার কাছে চলে যাচ্ছে না?‌ এই ছিল তার রাগের কারণ। মেয়েটাকে আধমরা করে ফেলে চলে যায় মোহন। ফিরে এসে বউয়ের মুখে এ কথা শুনে নিজের রাগ সামলাতে পারেনি। সে-ও লিপিকার গলা টিপে ধরে। সেই দৃশ্য জানলা থেকে দেখেছিল মধুমালতী। শিবনাথ মনে করে তার বউকে মোহনই মেরেছে। ফ্যাক্ট হচ্ছে, দু’জনেই দায়ী। শাস্তি পেল একা শিবনাথ।’‌

রঞ্জনী উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল, ‘‌স্যার, লোকটাকে ধরে আনি?‌’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘না, এখনই নয়। ‌একটা একটা করে এগোতে হবে। মোহন পাকড়াশিতে ঘিরে রাখো। এই কেসটায় আসলে তিনটে মার্ডার জড়িয়ে আছে।

আজ রাতেই বলাকা আর বিলুকে অ্যারেস্ট করো রঞ্জনী। মধুমালতীকে খুনের চার্জ দিয়ে কাল ওদের কোর্টে নেবে। পরে অজুর্ন ধীমানীর কেসটাও অ্যাটাচড্ করবে। ওরা দু’জনে মিলে এই দুটো মার্ডার করেছে। ওদের কাছ থেকে জেনে নেবে, আসল রিভলভারটা বলাকা কোথায় রেখেছে ?‌ আর বলাকার বাড়িতে সার্চ করলে আমি নিশ্চিত, একটা টেপরেকর্ডার পাওয়া যাবে। যেখানে ও সেলাই মেশিনের আওয়াজ টেপ করে রাখে। সেটাই জোরে চালিয়ে দেয়। যাতে আশপাশের বাড়ির লোক মনে করে, মেয়েটা সেলাই করছে। সে দিন পিছনের দরজা দিয়ে ও বেরিয়ে যায়। মধুমালতীকে গুলি করে ফিরে আসে। এই ভাবে সে হয়তো আরও দুষ্কর্ম করেছে। চাপ দিলে বলে দেবে। সেলাই মেশিনের আওয়াজ শুনিয়ে অ্যালিবাই সাজায়।’

রঞ্জনী বলল,‘থ্যাঙ্কিউ স্যার। সন্দেহ হলেও, শিওর না হয়ে কিছু করতে পারছিলাম না। ভুল করলে হেডকোয়ার্টার ছেড়ে কথা বলতো না, মিডিয়াও ছিঁড়ে খেত। গায়িকা প্রকাশ্যে খুন হওয়ায় কেসটা সেনসিটিভ‌ হয়ে গেছে।’‌

বসন্ত সাহা বললেন,‘‌আমিও নিশ্চিত হতে পারতাম না রঞ্জনী। ওরা ভুল করেছে বলেই পেরেছি। বিলু আর বলাকা দু’জনেই পিনাকীর ঘাড়ে খুনটা চাপাতে চেয়েছিল। তোমার করা জেরা পড়লেই বোঝা যায়, এটা প্ল্যান করা ছিল। বোকাদের প্ল্যান। শুধু তা-ই নয়, জেরার সময়ে বিলু আর বলাকা দু’জনেই পরস্পরকে আক্রমণ করে গেছে, গালাগালি দিয়েছে। কেস ফাইলটা পড়ার সময় থেকেই আমার কেমন খটকা লাগছিল। মধুমালতীর সামনে যেন ইচ্ছে করে ঝগড়া দেখাচ্ছে। একে অপরের বিরুদ্ধে ছেলেমানুষের মতো নালিশ করছে। বোঝাই যাচ্ছে, এই ঝগড়া একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত নয়। তার পরে মারাত্মক ভুলটা করল বলাকা। খেলনা রিভলভারের কথা বলতে গিয়ে ও সুতাহাটা মেলার কথাটা বলে ফেলেছে। ওই রিভলভারটা দেখিয়ে ওভারস্মার্ট হতে গিয়েছিল, তোমাদের ধোঁকা দিতে চেয়েছিল। উল্টে নিজেই ধরা পড়ে গেল। কঙ্কনের দিদিও বলেছে, সুতাহাটায় বিলুকে একটি মেয়ের সঙ্গে দেখেছে। দু্য়ে দুয়ে চার করতে দেরি হয়নি। সেই মেয়েটিই বলাকা। দু’জনের অনেকদিনের সম্পর্ক। অন্য মেয়ের সঙ্গে ভাব ভালবাসার খবর পেয়েই বিলুকে বাড়ি থেকে মধুমালতী তাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি আজ সুতাহাটা থানায় ফোন করেছিলাম। এক দম্পতির নানা ধরনের ঠগ জোচ্চুরি, জালিয়াতির অভিযোগ তাদের কাছে আছে। কিন্তু তাদের ধরতে পারেনি।‌‌’‌

রঞ্জনী বলল, ‘মধুমালতীতে মারার মোটিভ কী স্যার?‌’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌সহজ মোটিভ রঞ্জনী। মার্ডার ফর গেইন। মধুমালতী গান গেয়ে অনেকটাই টাকা করেছে বলে আমার ধারণা।’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌হ্যাঁ স্যার। আমরা ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট দেখে নিয়েছি। অ্যামাউন্টটা বেশ বড়। একা মানুষ, খরচ কম ছিল। তার ওপর এত দিন কাজ করছে।’‌

বসন্ত বললেন, ‘‌ওর ফ্ল্যাটও আছে।’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌সেটার ভ্যালুয়েশনও কম নয়।’‌

বসন্ত বললেন, ‘‌সবই স্বামী হিসেবে বিলু ক্লেম করবে ভেবেছিল। অনেক টাকা পেয়ে যেত। বলাকা ক’দিন পরে বিলুকে অফিসিয়ালি বিয়ে করে নিত। তার মানে টাকা ওরও। অবশ্য বিয়েটা যদি না এত দিনে হয়ে গিয়ে থাকে।’‌


রঞ্জনী বলল, ‘স্যার, খুনটা বিলু করল না কেন?‌’‌

বসন্ত সাহা ভুরু কুঁচকে একটু ভাবলেন। বললেন, ‘ঠিক বলতে পারব না। তবে আমার একটা অনুমান আছে। বলা‌‌কা বিলুকে পুরো বিশ্বাস করতে পারেনি। যদি গুলি করতে গিয়ে হাত কাঁপে?‌ তবে পিনাকীর সঙ্গে শরীরের সম্পর্কের কথা যে ফলাও করে বলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। জেরাতে অবশ্য উল্টোটা বলেছে। তবে বিলুকে অবিশ্বাস করার আরও কারণ আছে। যতই হোক, এক সময়ে প্রেমই তো ছিল। আর একটা কারণও হতে পারে, বলাকা খুনে অভ্যস্ত। সে আগেও খুন করেছে। এরা ভাড়াটে লোক দিয়ে কাজ করানোর এলিমেন্ট নয়। চাদর মুড়ি দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে একটা গুলি ছুড়ে পালিয়ে আসা কী এমন ব্যাপার?‌ কেউ তো দেখতে পাচ্ছে না। এ কাজে কাউকে ভাড়া করতে গেলে, অনেক টাকা লেগে যেত। সে টাকা কেন খরচ করবে?‌ তা ছাড়া, মধুমালতীর প্রোগ্রামের সঙ্গে বলাকা অভ্যস্ত ছিল। কখন আলো জ্বলবে, কখন নিভবে– সবটা জানত। তুমি আর দেরি কোরো না রঞ্জনী। বেরিয়ে পড়ো। নয়নকে একটা ফোন করে দাও, আজ তোমার গোটা রাতের ঝামেলা।’

রঞ্জনী রায় একটু চুপ করে থেকে অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, ‘‌স্যার একটা কথা বলব?‌ আপনি রেগে যাবেন না তো?‌’
বসন্ত সাহা হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘‌আগে শুনি।’

‌রঞ্জনী বলল, ‘আমি বলাকা আর বিলু দু’জনকেই আজ সকালে এখানে নিয়ে এসেছি। কিছু বলিনি। দরকার আছে বলে বসিয়ে রেখেছি। খুব রাগারগি করছে। তাতে ধমক দিতে হয়েছে। বিলু লোকটাকে চড়-থাপ্পড়ও দিতে হয়েছে। ওরা যে খুনটা করেছে, সেটা বুঝতে পেরেও কোন পথে কেসটা সাজাব, সেটা স্পষ্ট হচ্ছিল না। এ বার হয়েছে। এত ক্ষণ আপনাকে বলিনি বলে রাগ করবেন না।’

‌বসন্ত সাহা মুগ্ধ বিস্ময়ে ‌রঞ্জনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘‌সাবাস! এই না হলে গোয়েন্দা। আমাকে সত্যি হার মানিয়ে দিলে ‌রঞ্জনী। এত অপরাধ বুঝতে পারি, তোমার এই অপরাধটা বুঝতে পারিনি। যদিও বোঝা উচিত ছিল। কালকের রেইডের পরে আমার জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকার মেয়ে তুমি নও। তুমি খুব বুদ্ধিমতী। আমিই বোকা হয়ে যাচ্ছি। অন্যকে আন্ডার এস্টিমেট করা হচ্ছে বোকা হয়ে যাওয়ার প্রথম লক্ষণ। তবে এই অপরাধের সাজা হবে। আমি বিদেশ থেকে ফিরলে এক দিন তুমি আর নয়ন আমাদের বাড়িতে আসবে। ডিনার করবে। তার আগে মেঘমল্লারে গান শোনাবে।’‌

‌রঞ্জনী বলল, ‘‌অবশ্যই স্যার। তবে দিনটা বৃষ্টির হতে হবে। নইলে মেঘমল্লার জমবে না। আর আমি ম্যাডামকে চমকে দিয়ে রেঁধে নিয়ে যাব ইলিশ মাছের রোস্ট।’‌

কথা শেষ করে ‌রঞ্জনী উঠে দাঁড়িয়ে টান টান হয়ে স্যালুট করল। (শেষ)

Shares

Comments are closed.