সোমবার, নভেম্বর ১৮

মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১৫

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ পঞ্চদশ পর্ব।

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব: মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

পড়ুন আগের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১৪

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১৬

অফিসে এসে ‘‌মেঘনল্লার’‌ ফাইল নিয়ে পড়েছেন বসন্ত।

জেরার অংশগুলো দেখছেন মনোযোগ দিয়ে। কোনও অংশে পেনসিল দিয়ে দাগ দিচ্ছেন। কোথাও পাশে নোট রাখছেন পেনসিল দিয়ে। এবার একটা কাগজের টুকরো টেনে নিলেন। ওপরে লিখলেন— ‘‌লিস্ট অব সাসপিশাস পিউপল।’‌ লেখাটার দিকে একটু তাকিয়ে, সেটা কেটে লিখলেন, ‘‌সন্দেহভাজন।’‌

যে-হেতু আমাদের এই কাহিনির একটি বড় অংশ রঞ্জনী রায় এবং তার সহকারীদের নেওয়া জবানবন্দি থেকে তৈরি, তাই আমরা পুনরাবৃত্তিতে যাব না। আমার শুধু গোয়েন্দা বি সাহার দাগ দেওয়া অংশগুলোয় চোখ বোলাই। এই অফিসার কার কোন কথাগুলোয় গুরুত্ব দিচ্ছেন এক বার দেখে নেওয়া যাক।‌ উনি নোটেই বা খসখস করে কী লিখছেন? এগুলোর দিকে তাকালে রহস্যের কুয়াশা খানিকটা কাটতে পারে।

তবে তার আগে একটি জরুরি কথা জানিয়ে রাখা যাক।

অফিসে ‌আসার সময়ে বসন্ত যখন গাড়িতে ছিলেন, রঞ্জনী রায় তাকে মোবাইলে ফোন করে। জানায়, গত কাল যে দু’টি প্রশ্ন তাকে করা হয়েছিল, তার একটির উত্তর পাওয়া গেছে, একটির পাওয়া যায়নি। প্রোগ্রাম অর্গানাইজার, যাকে ইমপ্রেসিওর বলা হয়, সেই মোহন পাকড়াশির স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন অ্যাক্সিডেন্টে। স্বামী –‌স্ত্রী দার্জিলিঙে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। বিকেল শেষ হয়ে আসছিল। পাহাড়ে ওঠার পথে একটা সময়ে গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভার টয়লেটে যায়। মোহন পাকড়াশির স্ত্রী সেই সুযোগে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। তাঁর হাতে ছিল ক্যামেরা। তিনি গাড়ি থেকে সরে, খাদের ধারে গিয়ে ফটো তুলতে থাকেন। আলো কম থাকলেও ফটো তোলার জন্য দৃশ্য খুবই সুন্দর ছিল। কুয়াশায় ঢেকে আসছিল পাহাড়।

চল্লিশ বছর আগের কথা। তখন দার্জিলিঙের পথ এখনকার মতো এত জমজমাট ছিল না। এত ঘনঘন গাড়ি ওঠানামা করত না। অনেকটাই নির্জন, অনেকটাই প্রাকৃতিক। পাখির ডাক, ঝোরায় জল পড়ার আওয়াজ শোনা যেত স্পষ্ট। মোহন পাকড়াশি স্ত্রীকে বারণ করেন। ফিরে আসতে বলেন। মহিলা শোনেননি। ফোটো তোলার আনন্দে আরও এগিয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেননি কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে চলেছে। এক সময়ে তিনি একটা পাথরে পা রাখতে যান। সেটি হড়কে যায়। চোখে ক্যামেরা রেখেই হমড়ি খেয়ে পড়েন মহিলা। পড়েন খাদে। মোহন পাকাড়াশির চিৎকারে ড্রাইভার ছুটে আসে।

হাড়গোড় ভাঙা মৃহদেহ পাওয়া যায় তিনশো ফুট নীচ থেকে। আশ্চর্যজনক ভাবে একটি পাহাড়ি ঝাউ গাছ ক্যামেরাটিকে বুকে জড়িয়ে রক্ষা করে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটা ছিল দামিনীকে নিয়ে। বি সাহা জানতে চেয়েছিলেন, দামিনী কোথায়?‌ মধুমালতীর ঠাকুমার ছোটোবেলায় হারিয়ে যাওয়া সখী। যার নাম ‘দামিনী’ হলেও, মধুমালতীর ঠাকুমা তার সঙ্গে ‘সই’ পাতিয়েছিলেন। নাম দিয়েছিলেন, মধুমালতী। যাকে দেখতে নাকি অবিকল তার নাতনির মতো। কোথায় হারিয়ে গেল সে?‌

রঞ্জনী জানিয়ে দিয়েছে, এই উত্তর পাওয়া যায়নি।

বি সাহা বললেন, ‘‌ঠিক আছে। ওর খোঁজ না পেলেও চলবে। কিন্তু প্রথমটা ভেরি ইমপর্ট্যান্ট রঞ্জনী। আমার এ রকমই সন্দেহ হচ্ছিল। দার্জিলিঙের যে থানা এলাকায় অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছিল, তাদের ফাইলটা ওপেন করতে বলো। এখনই মেল পাঠাও। ক্যামেরাটা কোথায় আছে দেখো। যদি পাওয়া যায়। অনেক সময়ে থানার মালখানাতে পড়ে থাকে। আর ওই মোহন পাকড়াশি লোকটাকে ক্লোজ কর।’‌
রঞ্জনী উত্তেজিত গলায় বলল, ‘‌করছি স্যার। লোক দিয়ে দিচ্ছি। আর দু’টো কথা ছিল। কাল রেইডে গিয়ে.‌.‌.‌।’‌
বি ‌সাহা বললেন, ‘‌পরে শুনব।’‌
এর পরে বসন্ত সাহা অফিসে এসে ফাইল খুলেছেন। দেখা যাক, জেরার কোন অংশগুলোকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বলাকা মন্ডল (‌গায়িকার দেহরক্ষী)

——————‌

প্রশ্ন: তুমি সে দিন মধুমালতীর ডিউটিতে যাওনি কেন?‌
বলাকা: আমার কাজের চাপ ছিল।
প্রশ্ন: কী কাজ?‌
বলাকা: আমি সেলাইয়ের কাজ করি।
প্রশ্ন: বডিগার্ড হয়ে সেলাইয়ের কাজ করাটা কেমন বেমানান নয় কি?‌
বলাকা: কী করব?‌ আমার নামে মিথ্যে মামলা হওয়ার পরে কেউ আর সিকিউরিটির কাজ দিতে রাজি হতো না। কোনও বাড়ি বা শপিং মলে দাঁড়িয়ে কাজ করব না। জেলে থাকার সময়েই সেলাই শিখেছিলাম।
প্রশ্ন: সে দিন সেলাইয়ের কাজ কোথায় করছিলে?‌
বলাকা: বাড়িতে। দর্জির দোকান থেকে অর্ডার এনে কাজ করছিলাম।


প্রশ্ন: কেউ সাক্ষী আছে?‌
বলাকা: আমি একা থাকি। কসবায় একটা ঘর নিয়ে থাকি। সাক্ষী কে থাকবে?‌ তবে আশপাশের ঘরে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। তারা হয়তো আমার সেলাই মেশিনের আওয়াজ শুনে থাকতে পারে। সে দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেছিলাম।

এখানে স্টার চিহ্ন দিয়ে রঞ্জনী নীচে নোট লিখেছে। বলাকার বাড়ি তল্লাশির সময়ে সত্যি অনেক সেলাইয়ের জামাকাপড় পাওয়া যায়। পায়ে চালানো একটা সেলাই মেশিনও রয়েছে। সেটি দেখলেই বোঝা যায়, এতে রোজ কাজ হয়। ঘরটা ছোট। এ রকম আরও ক’টা ঘর আছে পাশে। আশপাশের ঘরের লোকজনের সঙ্গে পুলিশ কথা বলে দেখেছে, সত্যি ঘটনার দিন বলাকার বন্ধ ঘরে সেলাই মেশিনের আওয়াজ একটু সময়ের জন্যও থামেনি। রাত পর্যন্ত টানা চলেছে।

প্রশ্ন: দেশের বাড়ি কোথায়?‌
বলাকা: জয়নগরে। ছোটোবেলায় খেলাধুলো, গাছে চড়া, পুকুরে লাফানো ভাল লাগত। লেখাপড়ার থেকে দৌড়ঝাঁপ বেশি ভালবাসতাম। বাবা ছোটোবেলায় চলে গিয়ে আর এক মহিলাকে বিয়ে করল। আর এল না। মা মারা গেল ক্লাস ফাইভে। কাকা–‌কাকিমার কাছে মানু্য। স্কুল শেষ করে কলকাতায় এলাম। কলেজেও ভর্তি হলাম। তার পরে ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ে ঢুকে পড়লাম। সিকিউরিটি সার্ভিসে চাকরি পেতে কলেজ বন্ধ হয়ে গেল।
প্রশ্ন: মধুমালতীর কাছে কে নিয়ে গেল।
বলাকা: বিলু।
প্রশ্ন: কী করে আলাপ?‌
বলাকা: জেল থেকে বেরিয়ে সেলাই করি আর কাজ খুঁজি। শুধু সেলাইতে তো পেট চলে না। হালকা কোনও সিকিউরিটির কাজ যদি পাই। ওই লোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল একটা অফিস। সে-ও গেছিল পিওন, গার্ডের ধান্ধায়। সে-ই আমায় দিদির ফোন নম্বর দেয়।
প্রশ্ন: তোমার দিদি কেমন মানুষ ছিল?‌
বলাকা: খুব ভাল। মাথা উঁচু করে বাঁচত। যেটুকু রঙ ঢঙ করত, এই পেশায় সেটুকু লাগে। তবে কোনও বেটাছেলে যাতে অসভ্যতা করতে না পারে, তার জন্য আমায় রেখেছিল।
প্রশ্ন: কারও সঙ্গে গোপন সম্পর্ক ছিল?
বলাকা: আমি জানি না। কারও বদমাইশি সহ্য করত না। এক জনের ছাড়া।
প্রশ্ন: সে কে?‌
বলাকা: ওই শয়তানটা, বিলু। তাকে খুব ভালবাসত।
প্রশ্ন: বিলু শয়তান কেন?‌
বলাকা: কিছু না করে পায়ের ওপর পা তুলে দিদির পয়সায় খেত। মদও খেত। আমার পিছনে খুব লেগেছে হারামিটা। চাকরিটা খাবার তাল খুঁজত।
প্রশ্ন: মধুমালতী ওকে পছন্দ করত?
বলাকা: খুব। শয়তানটাও ভালবাসত।
প্রশ্ন: তোমার নাকি রিভলভার আছে?‌


বলাকা: ফলস। খেলনা রিভলভার। দিদিকে ভরসা দেওয়ার জন্য। আমি রিভলভার পাব কোথা থেকে ম্যাডাম?‌ এই দেখুন একেবার ওরিজিনালের মতো। কোমরে গুঁজলে আপনার মতো লাগবে। সুতাহাটার রাসমেলা থেকে কিনেছে। ফাংশনে গেলে মাঝেমাঝে জামা তুলে শো দিতাম। নিন এটা রেখে দিন।
প্রশ্ন: কাজটা ঠিক করোনি। অন্যায় করছো।
বলাকা: পেটের জন্য এইটুকু তো করতেই হয়। আমি তো অন্যায় কিছু করিনি। অন্যায়কে আটকেছি। শেষ পর্যন্ত পারলাম না। আফশোস হচ্ছে। তবে আমি তো থাকতাম দিদির পিছন দিকে। গুলি করা হয়েছে সামনে থেকে। আমি থাকলেই বা কী করতে পারতাম?‌
প্রশ্ন: কে খুন করতে পারে বলে তোমার মনে হয়?‌
বলাকা: কাউকে মনে হয় না ম্যাডাম। শুধু এক জনকে.‌.‌.‌
প্রশ্ন: কে?‌ নাম বল। তোমাদের দলের কেউ?‌
বলাকা: না, পিনাকী নামের একটা চ্যাংড়া ছেলে। ক’দিন ধরে দিদির পিছনে ঘুরঘুর করছিল। ফাংশনে গান শুনতে আসত। দিদির সঙ্গে আলাপ করে টুকটাক কথা বলত। হয়তো দিদি বকাবকি.‌.‌.‌
প্রশ্ন: তার জন্য একেবারে খুন!‌ এটা বেশি হয়ে যাচ্ছে না?‌
বলাকা: ম্যাডাম, অভয় দিলে একটা কথা বলি।
প্রশ্ন: বলো।
বলাকা: কাউকে কখনও বলিনি। আজ আপনাকে বলছি ম্যাডাম। এক দিন দুপুরে দিদির বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেলাই মেশিনটা খারাপ হয়েছিল, সারাতে হবে। বেতনের কিছুটা যদি অ্যাডভান্স পাই। সে দিন খুব ঝড়–জলের দিন ছিল। ইচ্ছে করেই ফোন করে যাইনি। টাকার কথা সামনে বলাই উচিত। তা ছাড়া সামনে দাঁড়ালে দিদি খালি হাতে ফেরাতে পারবে না। কিছু না কিছু দেবেই। গিয়ে দেখি দিদির বাড়িতে সদর দরজা খোলা। একটু অবাক হয়েই ভিতরে ঢুকি। দরজার পাশে ভিজে চুপচুপে হয়ে যাওয়া ছাতা রাখি। কাউকে দেখতে না পেয়ে কয়েক পা এগোই। দিদির কি তবে শরীর খারাপ?‌ দরজা না আটকে শুয়ে পড়েছে?‌ হঠাৎই চাপা গলায় ধমকানি শুনি। দিদির গলা। শোয়ার ঘর থেকে ভেসে আসছে।
প্রশ্ন: কী কথা ভেসে এল?‌
বলাকা: দিদি ধমক দিচ্ছে, আজ তোমাকে ছেড়ে দিলাম পিনাকী। এই ভাবে যদি আর কোনও দিন আমার বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করো, সোজা পুলিশে ফোন করব। তোমার মতো ছুঁচোকে মারতে পুলিশও ডাকতে হবে না। আমার বডিগার্ডই যথেষ্ট। পেটে তাক লাথি খেলে বুঝবে। দরজা খোলা দেখে তুমি আমার বেডরুম পর্যন্ত ঢুকে পড়েছো কোন সাহসে!‌ এই শেষ বারের মতো তোমায় মাফ করে দিলাম।
প্রশ্ন: তার পরে?‌ তুমি কি করলে?‌ পিনাকী লোকটাকে মারলে?‌
বলাকা: না না। আমি তাড়াতাড়ি ছাতা নিয়ে পালিয়ে এলাম। দিদির পার্সোনাল ম্যাটার, আমাকে না বললে, আমি কেন নাক গলাতে যাব?‌
প্রশ্ন: তোমার দিদিকে কে খুন করেছে বলে মনে হয়?‌
বলাকা: এই নোংরা ছেলেটাই সে দিনের হুমকির বদলা নিয়েছে।

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১৬

Comments are closed.