মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    প্রচেত গুপ্ত

    খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ চতুর্দশ পর্ব।

    রতনের মায়ের মেজাজ খুবই কড়া। ‌রঞ্জনীকে যত্ন করে রান্না শেখায়। ভুল হলে রেয়াত করে না। বকাবকি করে।

    ‘‌বললাম না, এই সময় গ্যাসটা সিমে রাখতে?‌ এতটা বাড়িয়ে দিলে কেন?‌’‌
    ‘‌সরি রতনের মা, ভুল হয়ে গেছে।’‌
    ‘এরকম ভুল হওয়া ঠিক নয়। ‌রান্না তোমার চোর-ডাকাত ধরা নয়। অনেক ধৈর্য লাগে। মন লাগে।’‌
    ‘‌আমি জানি রতনের মা। চোর–‌ডাকাত ধরা অতি সহজ কাজ। অনেকটা তোমার পুকুরে খাপলা জাল ফেলে মাছ ধরার মতো। জাল ছোড়ো আর খপ করে মাছ ধরো। রান্না করা তার থেকে ঢের কঠিন।’‌
    আবার এই রতনের মা বলে, ‘‌বুঝলে দিদি, আমার মাঝেমধ্যে খুব অবাক লাগে।’‌
    ‌রঞ্জনী বলে,‌ ‘‌কেন গো?‌’‌
    রতনের মা বলে, ‘‌এত বাড়িতে রান্নার কাজ করেছি, দিদি, বৌদি, মাসিদের কী মেজাজ সব!‌ বাপ রে!‌ যেন এক একটা পুলিশ। মুখে মুখে ধমকধামক দেয়। পারলে ধরে নিয়ে ফাটকে পোরে। এক দিন কামাই করলে গজগজ করে। দেরি হয়ে কৈফিয়ৎ চায়। অথচ তুমি সত্যিকারের পুলিশ হয়েও কখনও গলা তুলে কথা বলো না।’‌
    রঞ্জনী হাসতে হাসতে বলে, ‘‌ও মা‍‌!‌ তোমার ওপরে গলা তুলে কথা বলব কেন?‌’‌
    রতনের মা বলে, ‘ওরা যে বলে।’‌

    রঞ্জনী বলে, ‘‌আসলে কী জানো, যারা ঠিক জায়গায় বকাঝকা করতে পারে না, অন্যায় মুখ বুজে, মেনে চলে আসে, তারাই বাড়িতে বকাঝকা করে বেশি। ও সব ধরতে নেই। তুমি আমাকে বল, আঁচ দেব কত ক্ষণ?‌’‌

    রঞ্জনী ইলিশ রোস্টের রেসিপি সরিয়ে মাথাটা বালিশের ওপরে এলিয়ে দিল। সাউন্ড বক্সে আলতো করে সরোদ বাজছে। আলি আকবর বাজাচ্ছেন নট ভৈরব। সকালের রাগ। রঞ্জনীর খুব প্রিয়। নট আর ভৈরব দু’টো রাগের মিশ্রণে নট ভৈরব। রঞ্জনীও বাজাতে চায়। তবে জটিলতা আছে। ওপরে কর্ডে নট বাজিয়ে নীচের কর্ডে ভৈরবকে ধরে রাখতে হয়। ‘‌রে’‌ আর ‘‌গা’‌–‌এর ওপরে ‘‌নট’ বাজবে।‌ ভৈরবের অনেকটাই থাকে ‘‌ফ্ল্যাট রে’‌–‌তে। ‘‌সা’‌ আর ‘‌মা’‌-ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটু এদিক হলেই গেল। ‘‌মিডল অক্টেভে’‌-ই এই  রাগের যত কারিকুরি। বাংলায় বললে মধ্য সপ্তক।

    রঞ্জনীকে তার শিক্ষক বলেছিলেন, ‘‌‌চাইলে তুমি ‘‌ফ্ল্যাট নি’–‌‌তেও কাজ করতে পারো।’‌
    রঞ্জনী বলেছিল,‌ ‘‌সে তো আরও কঠিন হবে।’‌
    শিক্ষক হেসে বলেছিলেন, ‘‌এমনিতেই যথেষ্ট কঠিন।’‌

    রঞ্জনী সেটা বুঝতে পারে সরোদ নিয়ে বসলে। শুধু নট ভৈরব নয়, সব রাগই কঠিন। সেতার, সরোদ বাজানো মোটেই সহজ কথা নয়। বাজাচ্ছো বাজাও, তবে ঠিক মতো সময় আর আদর না পেলে যন্ত্র তোমার হাতে সাড়া দেবে না। রঞ্জনীর সময় কোথায়?‌

    পুলিশের কাজে ঢোকার পর থেকে গান নিয়েই বসা হয় না, তো সরোদ। সরোদ তো শখ করে শিখেছিল। ওকে বাজানো বলে না। তখন সবাই বলল, একটা ভাল ইনস্ট্রুমেন্ট শিখে রাখলে গান নিয়ে লেখাপড়ায় সুবিধে হয়, গাইতেও সুবিধে। এক সময়ে খুব ইচ্ছে হয়েছিল, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হবে। রেজওয়ানা বন্যার মতো। দেশে বিদেশে গেয়ে গেয়ে বেড়াবে। সবাই ভালবাসে। সে আর হল কই‌?‌ পুলিশ সার্ভিসে তার পরীক্ষা দেওয়াটা একবারে হঠাৎ। একটা ঘটনা তাকে এতটাই উত্তেজিত করেছিল, যে সে ঠিক করে পুলিশের কাজই করবে।

    বেশ কয়েক বছর আগের কথা। রঞ্জনীর মাসি থাকতেন মালদায়। একা মানুষ। বিয়ে থা করেননি। অনেকটা সন্ন্যাসিনীর মতো জীবনযাপন। মেয়েদের স্কুলে পড়াতেন। পড়ানোটাই ছিল তাঁর নেশা। মনে করতেন, মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোটাই দেশের জন্য সব চেয়ে বড় কাজ। যে দেশে মেয়েরা বেশি শিক্ষিত, সেই দেশই সব থেকে বেশি সভ্য, উন্নত হতে পারে। মাসি স্কুলের হেডমিস্ট্রেসও হন পরে। কড়া ধাঁচের মহিলা ছিলেন। কোনও রকম ইনডিসিপ্লিন সহ্য করতে পারতেন না। শুধু ছাত্রীদের নয়, স্কুলের প্রশাসনও সামলাতেন কড়া হাতে। সবাই ভয় পেত, সমীহ করত।

    তবে শুধু কড়া নয়, মেয়েদের প্রাণ দিয়ে ভালও বাসতেন। তাদের আপদে বিপদে সব সময় পাশ থাকতেন। মানু্ষ তাঁকে খুবই পছন্দ করত। বেশ চলছিল। হঠাৎই স্কুলের ক্লাস টেনের একটা মেয়ে নিখোঁজ হল। গরিব ঘরের মেয়েটি ছিল খুবই মেধাবী, বোর্ডের পরীক্ষায় এক থেকে দশের মধ্যে থাকলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না। দেখতেও ফুলের মতো। রঞ্জনীর মাসী খুবই উতলা হয়ে পড়লেন তার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় ছুটলেন। মেয়েটির পাড়ায় গেলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বললেন। পুলিশের বড় বড় অফিসারের কাছে গেলেন। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গেলেন। থানায় ঠায় বসে থাকলেন। দু’দিন পরে গঙ্গায় মেয়েটির লাশ ভেসে উঠল। রেপ করে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছ। পোস্টমর্টেম থেকে জানা  গেল, এক জন রেপ করেনি, অনেকে মিলে করেছে।

    রঞ্জনীর হেডমিসট্রেস মাসি পাগলের মতো হয়ে গেলেন। যে করেই হোক অপরাধীদের ধরতে হবে। তাঁর স্কুলের মেয়ের ওপর এই নৃশংসতা কিছুতেই মেনে নেবেন না তিনি। এক বার ছাড়া পেলে অপরধীরা আবার এই কাজ করবে। স্থানীয় পুলিশের ওপর ‘‌ওপরতলা ‌চাপ’‌ দেওয়ার জন্য তিনি কলকাতা পর্যন্ত ছুটে আসেন। ক’দিন এসে রঞ্জনীদের বাড়িতে থাকেন। দু‘‌জন নেতার সঙ্গে দেখা করেন। এক জন সরকার পক্ষের, এক জন বিরোধী দলের। তাঁরা আশ্বাস দেন। পুলিশের বড় অফিসারদের ফোন করে বলে দেন, অপরাধীদের ধরতেই হবে। রঞ্জনীর মা তাঁর দিদির এই ছোটাছুটিতে যথেষ্ট ঘাবড়ে যান। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন।

    ‘‌দিদি, তুমি এই ঘটনাটা নিয়ে বেশি লাফালাফি কোরো না। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। মেয়েটাকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।’
    রঞ্জনীর মাসি বললেন, ‘‌কী বলছো!‌ কী হয়ে গেছে?‌ একটা ভয়ংকর অপরাধ হয়ে গেছে, কিন্তু যারা অপরাধ করল তাদের তো শাস্তি এখনও হয়নি! মেয়েটার বাবা–মা গরিব, দুর্বল। তাদের পক্ষে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কথা বলা সম্ভব নয়। কে করবে?‌ আমাকে করতেই হবে।’‌
    রঞ্জনীর মা বললেন,‌ ‘‌যারা এই কাজ করতে পারে, তারা ভয়ানক। তোমার ক্ষতি করে দেবে দিদি। আমার ভয় করছে।’‌
    রঞ্জনীর মাসি ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘‌আমার ক্ষতির ভয়ে ওই ভয়ানক লোকগুলো ছাড়া পেয়ে যাবে?‌‌ আবার তো ওরা একাজ করবে। ওই ফুটফুটে মেয়েটাকে যদি তুমি দেখতে এ কথা বলতে পারতে না।’‌

    এই কথা বলতে বলতে রঞ্জনীর মাসি মুখে দু’‌হাত চাপা দিলেন। ওই সময়ে রঞ্জনী ছিল। সে বলেছিল, ‘‌মাসি যা করছে ঠিক করছে। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাপোর্ট করছি। যদি আমার কোনও সাহায্য লাগে তো বলো। তোমার সঙ্গে কোথাও যেতে হলে আমি যেতে পারি মাসি। আই অ্যাম রেডি।’‌

    এই কথা শুনে তার মা ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন, ‘তুই কী করবি?‌ তুই গান–‌বাজনা নিয়ে আছিস, তাই থাক। খুনিদের পিছনে তুই দৌড়বি কী করে?‌’‌
    ‌রঞ্জনীর মাসী বলেছিলেন, ‘‌ধন্যবাদ রঞ্জি। যদি প্রয়োজন হয় তোমাকে নিশ্চয় সঙ্গে নেব। গান–‌বাজনা নিয়ে থাকলে নৃশংস অপরাধীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যায় না, এমন নয়।’‌

    জোরদার তদন্তের ব্যবস্থা করে আবার মালদা ফিরে যান রঞ্জনীর মাসি। কলকাতা থেকে ফোন পেয়ে পুলিশ নড়েচড়ে বসল। গুন্ডা-বদমাশদের বিভিন্ন ডেরায় হানাও দিতে শুরু করল। ধড়পাকড় শুরু করল। এদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ থাকে। সেই যোগাযোগ ধরে এক সময়ে মূল অপরাধীদের কাছে পৌঁছেও গেল পুলিশ। সব ক’জনকেই ধরে ফেলল। পাঁচ জনের গ্যাঙ।

    এর পর থেকেই ‘‌খেলা’ শুরু হল। যাদের ধরা হয়েছিল‌ তাদের সঙ্গে প্রায় সব ধরনের রাজনীতির লোকদেরই দহরম-মহরম ছিল। সবারই গুন্ডা-বদমাশ লাগে। পাঁচ ক্রিমিনালকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের উপরে চাপ আসতে শুরু করল। বিভিন্ন স্তর থেকে ধরাধরি হতে লাগল। আমাদের দেশে অর্থ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা একসঙ্গে কাজে নেমে পড়লে সেই ধাক্কা সামালানো খুব কঠিন।

    তবে লোকাল থানার পুলিশ ছিল মরিয়া। কিছুতেই ওই পাঁচ জনকে তারা ছাড়বে না বলে ঠিক করল। শক্ত মামলায় বেঁধে ফেলতে চাইল। ‌রঞ্জনীর মাসি প্রতিদিন কোর্টে ছুটতেন। এদিকে মেয়েটির বাবা–‌মাকে ভয় আর লোভ দেখানো শুরু হল। ‌রঞ্জনীর মাসির কাছেও টেলিফোনে থ্রেট কল এল।

    শেষ পর্যন্ত স্থানীয় থানার পুলিশ নিজের জোর বজায় রাখতে পারল না। উপযুক্ত সাক্ষ্য–‌প্রমাণের অভাবে পাঁচ জনই ছাড়া পেয়ে গেল। ‌রঞ্জনীর মাসি কিন্তু ছাড়লেন না। তিনি বড় উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। পাঁচ অপরাধীর ছাড়া পাওয়ার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করবেন। তার জন্য তিনি নিজের যাবতীয় সঞ্চয়ের টাকা খরচ করে ফেলতেও তৈরি ছিলেন তিনি। কিন্তু তা আর হয়নি। এক দিন উকিলের বাড়ি থেকে ফেরার পথে তাঁর রিকশায় ধাক্কা মেরে একটা ট্রাক পালিয়ে যায়। মাসি প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু কোমর ভেঙে যায়। ছ’‌মাস বিছানায় শুয়ে থাকলেন। সোজা হয়ে দাঁড়াতে লাগল আরও এক বছর।

    ‌রঞ্জনী এই ঘটনার পরেই সিদ্ধান্ত নেয়, পুলিশে চাকরি করতে হবে।

    ‌রঞ্জনীর মোবাইল বেজে উঠল। নম্বর দেখে ধড়ফড় করে উঠে বসল।‌‌‌ আলি আকবরের নট ভৈরবের ব্যাক গ্রাউন্ডে বড় সাহেবের গলা চি‌নতে অসুবিধে হল না। পুলিশের ডিপার্টেমেন্টের একেবার ওপর দিকের দু’চারজনের এক জন। এরা রঞ্জনীদের মতো ইনস্পেক্টরদের সঙ্গে কখনও সরাসরি কথা বলেন না। রঞ্জনী প্রায় বিছানা থেকে নেমে স্যালুট ঠোকে আর কী!

    ‘‌স্যার।’
    ‘‌রঞ্জনী, ওই গায়িকার কেসটা এবার গুটিয়ে আনুন। সেক্রেটারি কালকে ফোন করেছিলেন।’‌
    ‘‌স্যার।’‌
    ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপরাধীকে ধরতে হবে।’‌
    ‘‌স্যার।’‌
    ‘‌আপনার যদি লজিস্টিক কোনও সাপোর্টে লাগে ডিপার্টেমেন্ট থেকে নিয়ে নেবেন।’‌
    ‌‌‘স্যার।’‌

    ফোন কেটে বিছানায় আবার ধপ করে বসে পড়ল রঞ্জনী। ইলিশ মাছের রোস্ট মাথায় উঠল।

    অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More