মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    প্রচেত গুপ্ত

    খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ দ্বাদশ পর্ব।

    রঞ্জনী কাল অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে ছিল। রেডে গিয়েছিল। মধুমালতীর কেসটার জন্যই রেড। প্রথমে যায় মধুমালতীর বাড়ি। রঞ্জনীর মনের ভিতর কেমন খচখচ করছিল। মনে হচ্ছিল, বেশ কয়েক বার গেছে, তার পরেও ওই বাড়িতে আবার তার যাওয়া উচিত। কেসটা হাতে আসার পরে কম করে তিন বার মধুমালতীর বাড়িতে যাওয়া হয়ে গেছে রঞ্জনীর। কখনও তন্নতন্ন করে সার্চ চালিয়েছে। কখনও বিলুর সঙ্গে কথা বলে চলে এসেছে। যদি কোন নতুন ক্লু মেলে। মেলেনি।

    তার পরেও রঞ্জনীর বিশ্বাস, এ বাড়ি থেকে কিছু একটা ক্লু সে পাবেই পাবে। সেটা কোনও জিনিস হতে পারে, আবার মানু্ষও হতে পারে। হঠাৎ না বলে যেতে হবে। যদিও এই বাড়ির সামনে চব্বিশ ঘণ্টা লোক রাখা আছে। বিলু কোথাও বেরোলেও তাকে ফলো করা হয়। বিলু বেরোয় খুব কম। কাছাকাছি একটু দোকান বাজারে গেল, এই পর্যন্তই। তার মোবাইল ফোন ট্যাপ করা আছে। ছেলেটা  বাড়িতে ছিল। রঞ্জনী বাকিদের জিপে বসিয়ে একাই ঢুকল। বিলু চমকালো না। সে যেন জানে, পুলিশ এখন তার বাড়িতে মাঝেমধ্যেই আসবে। তার ওপর এই মহিলা অফিসার খুবই কড়া। গত কয়েক বারের মতোই যথেষ্ট খাতির করে রঞ্জনীকে ঘরে ঢোকায় বিলু।

    ‘‌ম্যাডাম বসুন। চা করে দেব?‌’‌
    রঞ্জনী অন্যমনস্ক ভাবে বলল, ‘‌না বসব না। আমি একটু ঘরগুলো ঘুরে দেখব।’
    বিলু বলল, ‘‌লাইট জ্বালিয়ে দিচ্ছি।’
    রঞ্জনী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘‌না দরকার নেই। আমি শুধু তোমার ঘরটা দেখব।’‌
    বিলু খুব সহজ ভাবে বলল, ‘‌আসুন ম্যাডাম।’‌

    তার সহজ হতে সমস্যা নেই। ‌এই নিয়ে তিন বার তার ঘর তল্লাশি করেছে পুলিশ। ঘর খুবই ছোটো। মধুমালতী যে তাকে আবার করুণা করে থাকতে দিয়েছিল, এই যথেষ্ট। এই ঘর পুলিশ অফিসার রঞ্জনী দু‘‌বার দেখেছে। আর এক বার দেখলে সমস্যা কী?‌

    রঞ্জনী একাই ঘরে ঢুকল। জিনিসপত্র খুবই কম।  বিছানা নেড়ে, সুটকেস ঘেঁটে নতুন কিছুই পাওয়া গেল না। সব আগেই দেখা হয়ে গেছে। খানিকটা মন খারাপ করেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল। হঠাৎই থমকে গেল। বিছানার ও-পাশে ওটা কী পড়ে রয়েছে?‌ একটা কাপড়ের টুকরো না ?‌ সাদা রঙের, রুমালের মতো। রঞ্জনী ঝুঁকে পড়ে কাপড়ের টুকরোটা তুলল। ভুরু কুঁচকে গেল তার। দ্রুত হাতে কাপড়ের টুকরোটা পকেটে ভরল। বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ভুরু আরও গভীর ভাবে কুঁচকে গেল।

    বিলু হাত কচলে বলল, ‘‌কিছু পেলেন ম্যাডাম?‌’‌
    রঞ্জনী কঠিন গলায় বলল, ‘‌আমি তো কিছু পাওয়ার জন্য আসিনি।’‌

    দ্বিতীয় রেড অর্জুন ধীমানের বাড়ি। এই লোককে বলাকা মেয়েটি খুন করেছে বলে পুলিশে কেস হয়েছিল। বাড়িতে এখন অজুর্ন ধীমানীর ভাগ্নে থাকে। সেই খবর আগে থেকেই রঞ্জনীর কাছে ছিল। অর্জুন ধীমানী খুন হওয়ার পরে এখানে বেশ কয়েক বার পুলিশ এসেছে। লোকাল থানায় কেস ডায়েরিতে তা লেখাও আছে। একটা লম্বা সময়ে বাড়িটা সিল করা ছিল। তদন্তের স্বার্থে। পরে একমাত্র ওয়ারিসন ভাগ্নে এসে কোর্টে অ্যাপিল করে বাড়ির দখল নিল। রঞ্জনী আজ এসেছে, ছোটো একটা খটকা নিরসন করতে। এই খটকা তার গত কাল বিকেলেই তৈরি হয়। অফিসে বসে কাজ করার সময়ে।

    ‘‌মেঘমল্লার’‌ কেসের অরিজিনাল ফাইল রয়েছে বসন্ত সাহার কাছ। রঞ্জনী জেরক্স কপিটা নিয়ে আফিসের চারতলার ঘরে বসে ঘাঁটছিল। আস্ত বড় ঘর পাওয়ার মতো সিনিয়র সে এখনও হয়নি। তবে একটা খুপরি পেয়েছে। তাতে সুইং ডোর আছে। কাগজপত্রে স্তূপাকৃত টেবিল, স্টিলের আলমারির মাথাতেও ফাইল। কম্পিউটার বস্তুটি কত দিন হল এসে গেছে, তা-ও সরকারি অফিস থেকে কাগজের পাহাড় সরানো যায়নি। আশ্চর্যের কথা, এই গন্ধমাদন থেকে বিশল্যকরণীটি আজও সরকারি কর্মচারীরা ঠিক খুঁজে বার করে। কৃতিত্ব আছে বটে। তবে ধাপে ধাপে কিছু দফতরে কম্পিউটারকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়েছে। এটাও ভাল লক্ষণ।

    যাই হোক, আজ ফাইলের পাতা উল্টোতে উল্টোতে রঞ্জনীর হঠাৎ খোলা জানলা দিয়ে বাইরে নজর পড়ে। চোখ আটকে যায়। খানিকটা দূরে একটা বাড়ির ছাদে একটা ছোটো ছেলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। কলকাতার পুরনো এলাকা এখনও সবটা ফ্ল্যাট হয়ে যায়নি। ছাদ, চিলেকোঠা, কার্নিশ—এসব  রয়েছে। ছেলেটার ঘুড়ি আটকে গেছে চিলেকোঠার কার্নিশে। ছেলেটা দেওয়ালের গা থেকে বেরিয়ে থাকা ইঁটে পা রেখে রেখে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে উঠে গেল ওপরে। আটকানো ঘুড়িটা খুলেও দিল। সুতোয় বাঁধা ঘুড়ি ভেসে পড়ল ছাদে। কিন্তু তার পরে আর সেই ছেলে নামতে পারছে না। এক বার এদিক যাচ্ছে, এক বার ওদিক। রঞ্জনী মন দিয়ে ঘটনাটা দেখতে থাকে। ভয়ও পায়। ছেলেটা পড়ে যাবে না তো?‌ সে নামবে কী করে?‌ বাপ রে, কী দুষ্টু!‌ হঠাৎই চিলেকোঠার আড়াল থেকে আর একটি ছেলে বেরিয়ে আসে। সে একটু বড়সড়। কিশোরই বলা চলে। সে দেওয়াল থেকে বেরোনো একটা ইঁটে পা রাখে এবং ওপরের আটকে থাকা ছেলেটির দিকে হাত বাড়ায়। এবার সেই ছেলে এক হাতে তার বন্ধুকে ধরে, অন্য হাতে দেয়াল আঁকড়ে ধীরে ধীরে নেমে আসে। দু’জনে মিলে মহানন্দে আবার ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করে।

    দৃশ্যটি রঞ্জনী মাথায় যেন বিদ্যুতের ঝলক খেলিয়ে দিল। উত্তেজনায় সে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।  সিদ্ধান্ত নেয়, আজই অজুর্ন ধীমানীর বাড়িতে যেতে হবে। দিনের বেলায় নয়। দিনের বেলায় বাড়ি বন্ধ থাকলে তালা ভাঙতে হবে। সে সবে ঝামেলা আছে। কোর্ট থেকে পারমিশন বার করতে হবে। অনেক সময় নষ্ট। তা ছাড়া সে যে কাজের জন্য যাবে, সেটা দিনে করা মুশকিল। বাইরের লোক দেখতে পেলে ভিড় করবে। রাতে ওই অজুর্ন লোকটার ভাগ্নে বাড়িতে থাকে বলে খবর আছে। রঞ্জনী এক জন প্লেন ড্রেসের ওয়াচারকে ওই বাড়ির সামনে পাঠিয়ে দিল। ছেলেটা বাড়ি ঢুকলে যেন খবর দেয়। সে আরও দু’জন সাব ইনস্পেক্টরকে রেডি থাকতে বলে। অফিসে বসেই অপেক্ষা করতে লাগল। ফোন এল রাত দশটায়।

    ‘‌ম্যাডাম, এই মাত্র উবারে না ওলাতে চেপে এল। সঙ্গে আর দু’‌জন আছে।’‌

    রঞ্জনী টিম নিয়ে বেরোল আরও এক ঘণ্টা পরে। ছেলেটা জমিয়ে বসুক।

    ভাগ্নের বয়স ছব্বিশ–‌সাতাশ বছর। অতি বজ্জাত ছেলে। সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে মদ খাচ্ছিল, সঙ্গে পয়সা দিয়ে তাস। মাঝের ঘরে ফরাস পেতে চলছিল আসর। কাকা দুম করে খুন হয়ে যাওয়ায় অনেক টাকা হাতে চলে এসেছে। ফ্ল্যাট এসেছে। চিন্তা কী?‌ কাকার টাকায় ফুটানি।

    দোতলায় উঠে অনেক বার ডোরবেল বাজাতে ভাগ্নে দরজা খুলল। ইউনিফর্মে রঞ্জনীকে দেখে বেশ থতমতই খেল।

    ‘আপনার বাড়ি সার্চ করতে এসেছি।’‌
    সেই ছেলে নেশা ঢুলু-ঢুলু গলায় বলল, ‘মানে!‌ কীসের সার্চ?‌’‌
    রঞ্জনী কড়া গলায় বলল,‌ ‘দরকার আছে। আমার একটা মার্ডার কেসের ইনিভেস্টিগেশনে এসেছি। সরুন ঢুকতে দিন।’‌

    নেশায় টাল খাওয়া যুবক দরজা আটকে বাংলা, হিন্দি মিশিয়ে চিৎকার করে উঠল।

    ‘‌ইমপ‌‌সিবেল, ঢুকতেই দেব না! আমার মামা যখন খুন হয়েছিল, পুলিশের বাচ্চারা অনেক বার এসেছে। শালারা খুনি ধরে রাখতে পারল?‌ ওই মাগী তো ড্যাংড্যাং করে জেল থেকে বেরিয়ে গেল। পুলিশ শালা হারামির বাচ্চা, ঘুষখোর। ওই মেয়েটার কাছ থেকে টাকা খেয়েছিল।’‌

    রঞ্জনীর হাত নিশপিশ করছিল। তার সঙ্গে যে দু’জন পুরুষ পুলিশ ছিল, তারা তো তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে যায় আর কী! রঞ্জনী হাত বাড়িয়ে তাদের নিরস্ত করল। দাঁতে দাঁত চেপে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘‌মামা খুন হওয়া‌য় তো আপনার সব থেকে সুবিধে হয়েছে। এত বড় সম্পত্তি ভোগ করছেন। খুনটা আপনি করেননি তার কী প্রমাণ?‌ পথ ছাড়ুন, আমাদের সার্চ করতে দিন। খুনের মামলা তামাদি হয় না। তামাদি বোঝেন?‌ পুরোনো হয় না।’

    যুবকটি এবার দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রঞ্জনীর দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘‌ইউ বিচ্‌। প্রপার ওয়ারেন্ট ছাড়া এক পা ঘরে ঢুকলে লাথি মেরে বার করে দেব।’

    রঞ্জনী এ বার চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকল এবং ডান হাত দিয়ে ছেলেটাকে ঠাসিয়ে একটা চড় মারল। সুন্দর দেখতে মেয়ের হাতে এত জোর থাকতে পারে, সেই ছেলে বুঝতে পারেনি। সে টাল খেয়ে দেওয়ালের গায়ে পড়ে। কোনও রকমে মাথা তুলে দাঁড়াতে রঞ্জনী একই রকম জোরে উল্টো গালে আর একটা চড় কষায়। এবার সে ব্যবহার করে বাঁ হাত। ছেলেটি এ বার উল্টে পড়ে। রঞ্জনী চোখের ইঙ্গিত করায় পিছন থেকে এক জন পুরুষ পুলিশ কর্মী এগিয়ে আসে। ভাগ্নেকে চুলের মুঠি ধরে টেনে তোলে। ছেলেটি এ বার ভয় পেয়ে যায়। সে হাত জোর করে কাঁপতে কাঁপতে থাকে।

    ‘‌বহুৎ গলতি হো গয়া ম্যাডাম। শরাব পিনেসে চড় গ্যয়া। মাফ কর দিজিয়ে। প্লিজ মাফ কর দিজিয়ে।’‌

    রঞ্জনীর গোটা টিমই তত ক্ষণে ঘরে ঢুকে পড়েছে। রঞ্জনী সেইভাগ্নের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, ‘নেশা কী করে কাটাতে হয় আমরা জানি। মুখটা বড্ড ভদ্রলোকের মতো হয়েছে দেখছি। ইউনিফর্ম পরা পুলিশের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলছিস, সাধারণ মহিলাদের সঙ্গে কী আচরণ করিস বুঝতেই পারছি। নে, কান ধরে ওঠ-বোস শুরু কর। যত ক্ষণ আমার এখানে থাকব, ওঠ-বোস থামাবি না। থামলেই মার হবে। ওঠবোস করবি আর জোরে জোরে গুনবি। যেন শুনতে পাই। শুরু কর।’‌

    অজুর্ন ধীমানীর ভাগ্নে কান ধরে ওঠ-বোস শুরু করল। তার সঙ্গীরা তো ঘরের এক কোণে গিয়ে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রঞ্জনী তাদের দিকে তাকালও না। সে কোনও ঘরে গেল না। সোজা গেল বারান্দায়। আলো জ্বালিয়ে, টর্চ ফেলে ভাল করে দেখতে লাগল, অজুর্ন ধীমানীর আততায়ীর পালিয়ে যাওয়ার পথটা ঠিক কী ছিল। সেই ইটে পা রেখে ছেলেগুলো চিলেকোঠার কার্নিশে উঠে যায়। এখানে কার্নিশ থেকে দেওয়াল বেয়ে তিন চারটে পা নেমে বাড়ির পাশের পাঁচিলটা পাওয়া যাবে। সেটাও খানিকটা উঁচু।

    রঞ্জনী এ বার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসারকে বলল,‘‌আমি এই রেলিং টপকাব। টপকে নিচে নামবার চেষ্টা করব।’‌

    অফিসার বলল, ‘‌ম্যাডাম, এই অন্ধকারে!‌’‌

    রঞ্জনী বলল, ‘‌অন্ধকারে ছাড়া উপায় কী?‌ দিনের বেলা করতে গেলে তো সার্কাস হচ্ছে বলে ভিড় হয়ে যেত। আপনি নীচে যান। যদি দরকার হয় আমায় হেল্প করবেন।’‌ তার পরে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আর এক সহকর্মীকে বলল, ‘আপনি টর্চটা ধরে আলো ফেলবেন।’‌

    অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More