বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১০

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ দশম পর্ব।

আরও পড়ুন: 

প্রথম পর্ব: মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

পড়ুন আগের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ৯

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১১

‘‌পিনু, ও পিনু, পিনু এলি?‌’

রজনী একটানা ডেকে চলেছেন। গলায় জোর নেই। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। তার পরেও থামছেন না।

‘ও পিনু, সাড়া দিস না কেন?‌ বাড়ি এলি?‌’‌

নন্দিনী‌‌ পাশের ঘরে পড়ছে। কিছু দিন পরেই তার পরীক্ষা। সরকারি চাকরি পরীক্ষা। তার প্রিপারেশন চলছে। বড় পোস্টের পরীক্ষা নয়, নিচু পোস্টের পরীক্ষা। দু’‌বছর আগেও এই পরীক্ষায় বসেছিল সে‌‌, পারেনি। এবার পেতেই হবে। আবার কবে পরীক্ষা হবে তার ঠিক নেই। একটা না একটা ফ্যাকড়ায় চাকরির পরীক্ষা আটকে যায়। এভাবে গড়াতে গড়াতে এক দিন বয়স পেরিয়ে যাবে। যদিও এখন নন্দিনী‌‌র বয়স মোটে চব্বিশ বছর। চব্বিশের থেকে একটু বেশি। চব্বিশ বছর তিন মাস। তাতে কী?‌ বয়স বাড়তে কত ক্ষণ?‌

নন্দিনী‌‌ টেনশনে মধ্যে রয়েছে। খবর আছে, এই বছর প্রশ্ন হবে অতিরিক্ত কঠিন। খবরের কাগজে লিখেছে, একুশ লক্ষ অ্যাপ্লিকেশন জমা পড়েছে। ভ্যাকেন্সি মোটে তিনশো সতেরো। তার মানে একটা পোস্টের পিছনে ছুটছে তিনশো সতেরো ডিভাইডেড বাই একুশ লক্ষ জন। ভাবতেই মাথা ঝিমঝিম করে। প্রশ্ন কঠিন হবে না তো কী হবে?‌ এমন কঠিন হবে যে দাঁত ফোটাতেও সমস্যা আছে। ফেসবুকে এই নিয়ে ঠাট্টাতামাশা চলছে। দাঁত বার করা চুল উসকো-খুসকো একটা ছেলের ফোটো দেওয়া হয়েছে। নীচে লেখা—

‘‌‌এবারের প্রশ্নে যে দাঁত ফোটাবে তার একটা দাঁত তো যাবেই, আশপাশের আরও তিন–‌চারটে দাঁতও নড়বে। তাই পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে ডেনটিস্ট নিয়ে যান। তিনি পরীক্ষার মাঝখানে মাঝখানে দাঁতের ট্রিটমেন্ট চালাবেন। নইলে ফোকলা দাঁতে পরীক্ষা হল থেকে বেরোতে হবে। চাকরিও হবে না, আবার দাঁতও যাবে। ছেলেদের দাঁত গেলে অত সমস্যা নেই, মেয়েদের সমস্যা আছে। বিয়ে আটকে যাবে।’‌

মজার কথা হল, ইতিমধ্যেই নন্দিনীর বেশ কয়েক বার বিয়ে আটকেছে।

কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকে তার বিয়ের চেষ্টা চলেছে। এক বার তো ঘুঁটি অনেক দূর পর্যন্ত পেকেও সাপের মুখে পড়ল। পিছলে সাঁই করে শূন্যের ঘরে। ছেলে কিন্তু ‘সুপাত্র’ ছিল‌। মুর্শিদাবাদ টাউনে নিজেদের দোতলা বাড়ি। এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টে চাকরি। মাইনের পরেও আছে ‘‌এক্সট্রা ইনকাম‌’‌। বয়স একটু বেশি, এই যা। তা হোক। সোনার আংটি শুধু বাঁকা হলেও দামী নয়, পুরনো হলেও দামী। নন্দিনীকে দেখতে এসে ছেলের চুলে এবং গোঁফে কলপ করা বাবা গর্বের সঙ্গে ‘‌এক্সট্রা ইনকাম‌’-এর কথা জানিয়েছিলেন‌।

“বুঝলেন তো, জমিজমার কাজ। এদিক সেদিক হয়েই যায়। আমি বলি, যখন হয়েই যায়, তখন আর খালি হাতে হবে কেন?‌ আমার ছেলে তো ফেলনা নয়। তা ছাড়া উপরি পায় ক’জন?‌ যাদের যোগ্যতা আছে তাদেরই তো লোকে ঘুষ দেয়। আমাকে আপনাকে তো কেউ ঘুষ দেবে না। দেবে কি না?‌”

নন্দিনীর দাদা পিনাকী মাথা নামিয়ে থাকল। মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। বড়মাসি গদগদ মুখে বললেন, “ঠিকই তো। আমাদের কেউ ঘুষ দেবে না। আপনার ছেলে যোগ্য বলেই দেয়। ঘুষ পাওয়া অত সহজ নয়। গুণ লাগে। আপনার ছেলে গুণী ছেলে।”

বিয়ে ফাইনাল হয়ে যাওয়ার মুখে মুখে ছেলের বাড়ি থেকে জানিয়ে দিল, ‘সরি।‌ ছেলের জন্য ভাল চাকুরে বউ জুটতে চলেছে। ভগবানের কৃপায়, সেই মেয়ের চাকরিতেও উপরির ব্যবস্থা আছে। বাড়িতে ডবল উপরির সুযোগ ছাড়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। গুণী ছেলের বউ গুণী হলেই মানাবে।‌’

সে বার বড়মাসি দোকান বাজার পর্যন্ত শুরু করে দিয়েছিলেন। নন্দনীর বিয়ের জন্য ‘‌উঠে পড়ে লাগা’র দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। দায়িত্ব তাঁকে কেউ দেয়নি, নিজে থেকে নেওয়া। টানাটানির সংসারে মেয়েকে ‘‌পার’‌ করে দেওয়া আত্মীয়দেরই কর্তব্য। তবে কর্তব্যে বারবার ধাক্কা খাওয়ায় তিনি এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তা-ই হয়। কর্তব্য বারবার আঘাত হতাশ হয়ে পড়ে, হাল ছেড়ে দেয়। তাকে দোষ দেওয়া যায় না।

নন্দিনী‌‌র বিয়ে এত বার ভাঙার কারণ কী?‌ সে তো খারাপ দেখতে নয়। গড়পতা বাঙালি মেয়েদের মতোই। গায়ের রঙ ফর্সা নয়, কিন্তু ‘‌ফর্সা ফর্সা’‌ ভাব রয়েছে। সেটাই বা কম কী?‌ চোখ দু’টো বড়। নাক খুব লম্বা নয়, তবে গোল মুখের সঙ্গে মানানসই। ঠোঁট দু’টোও পাতলা। সেই পাতলা ঠোঁট থেকে হাসি বা কান্না যা-ই বেরোক মন্দ লাগে না। সব মিলিয়ে এক ধরনের সারল্য আছে। পুতুল সারল্য। বউ-আঁকড়া পুরুষমানুষ এই সারল্য পছন্দ করে। তার পরেও এই মেয়ের বিয়ে আটকে যাচ্ছে। বাপ মরা, অসুস্থ মা, প্রায় বেকার দাদার সংসারে বিয়ে আটকে থাকা কাজের কথা নয়।

নন্দিনীও তাই মনে করে। বিয়ের ব্যাপারে সে কখনও আপত্তি করেনি। তবে বিয়ে ভেঙে গেলে সে খুশিই হয়। খুশির কারণ অতি গোপন। তার এক জন ভালাবাসার মানুষ আছে। এই ভালবাসার কথা কাউকে বলা যায় না। এমনকী যাকে ভালবাসে তাকেও নয়। সে-ও ঘুণাক্ষরে কিছু জানে না। নন্দিনী নিজেরে মনেই সেই ভালবাসা নিয়ে আছে। তাতে যে সে দুঃখিত এমন নয়। মেনে নিয়েছে। সব ভালবাসা নিজের চাওয়া পাওয়াতে গিয়ে শেষ হয় না।

এই ছেলের সঙ্গে নন্দিনীর চোখে দেখা হয়েছে মাত্র তিন বার। বাড়িতে এসেছে দু‘‌বার। পথে এক বার। ‘‌লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’‌ কথাটা এত দিন শুনেই এসেছিল নন্দিনী। এবার নিজের জীবন দিয়ে টের পেল। জীবন নাকি ‘‌সাইট’?‌‌ এমন মায়াভরা চোখের পুরুষ সে জীবন দেখেছে বলে মনে করতে পারল না। অনেক ভাবল। ভেবে বুঝতে পারল, এমন চোখ শুধু দেখেনি তা নয়, আর দেখতেও পাবে না। একেই বোধ হয় বলে হৃদয়ের একূল ওকূল দু’কূল ভেসে যায়। হায় সজনী। নন্দিনী আসলে এক জন সাধারণ এবং রোম্যান্টিক মেয়ে।

ছেলেটি বাড়িতে প্রথম বার এলে নন্দিনী দাদার কথামতো চা দিতে যায়। ছেলেটি আমতা আমতা ভাবে জিজ্ঞেস করেছিল, “একটা বিস্কুট দিতে পারেন? অনেক ক্ষণ না খেয়ে থাকলে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা চাগাড় দেয়।‌”

নন্দিনী অপ্রস্তত হয়েছিল। তাদের বাড়িতে বিস্কুট থাকে না। দোকান থেকে এনে দিতে গেলে চা জুড়িয়ে যাবে। সে খানিকটা বোকার মতোই বলে ফেলে, “রুটি আছে। দেব?‌”

সেই ছেলে বলেছিল, ‘না, থাক।’‌

নন্দিনী তার পরেও রুটি এনে দেয়। একটু ঘি ফেলে গরম করে দেয়। ভাগ্যিস শিশির তলানিতে একটু ছিল। সঙ্গে সিম আলুর তরকারি। মায়াভরা চোখের ছেলেটি নজরে পড়ার মতো তৃপ্তি করে সেই রুটি-তরকারি খায়। দ্বিতীয় দিন বাড়িতে এসে সুন্দর করে হেসে বলেছিল, “চিন্তা করবেন না। আজ শুধু চা দিলেই হবে। খেয়ে এসেছি।”

নন্দিনী ঘরে থাকা চিঁড়ের পোলাও দিয়ে এসেছিল। আর শেষ বার দেখা হল নন্দনের সামনে। মুখোমুখি হতে এমন লজ্জা পেল, যে ভাল করে কথাই বলল না।

‘‌আপনি কেমন আছেন?‌’‌ আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিল নন্দিনী।
‘‌ওহ্‌, আপনি!‌ এই তো এই দিকে একটা কাজে এসেছি।’
নন্দিনী উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘‌প্রোগ্রাম?‌’‌
ছেলেটি অস্বস্তি এবং লজ্জা নিয়ে ব‌‌লল, ‘‌না না, সে রকম কিছু নয়..‌.‌ওই আর কী?‌’

নন্দিনী ভাব জমানোর চেষ্টা করে।

‘‌তা হলে কোনও ফাংশন দেখতে এসেছেন?‌’‌
ছেলেটি আরও লজ্জা পেয়ে বলে, ‘‌এক জনের সঙ্গে একটু দেখা করতে এসেছিলাম। ওই আর কী.‌.‌.‌’

কথা শেষ না করেই শিশির মঞ্চের দিকে হনহনিয়ে হেঁটে গেল‌। পালিয়ে বাঁচল যেন।

নন্দিনী জানে, এই মানুষের সঙ্গে তার কখনওই সংসার করা হবে না। ছেলেটি বিবাহিত। সুন্দর বউ এবং চার বছরের একটি ছেলে আছে। বেঁচে থাকার জন্য সেই ছেলেকে যার সঙ্গে অবিরাম লড়াই করতে হয়, তার নাম দারিদ্র‌্য।

ছেলেটি নন্দিনীর দাদার বন্ধু। নাম অঙ্কুশ। দাদারই মতো টাকাপয়সা নিয়ে বেসামাল। বেসামাল হওয়ারই কথা। জীবিকার জন্য যে কম্মটি সে বেছেছে, তাতে দু’‌বেলা ভাত জোটানো কঠিন। অঙ্কুশ বাঁশি বাজায়। বিভিন্ন প্রোগ্রামে আর্টিস্টরা ভাড়া করে নিয়ে যায় তাকে। আজকাল গানের প্রোগ্রামে বাঁশি ব্যবহার হয়, কিন্তু বংশীবাদককে সব সময় লাগে না। সিনথেসাইজার চলে এসেছে, ট্র‌্যাক চলে এসেছে, সে রকম হলে ইউটিউব থেকে বাঁশির সুর ডাউনলোড করে ব্লুটুথে চালানো হয়। তার পরেও ওরিজিনাল ফ্লেভার আনবার জন্য কোনও কোনও আর্টিস্ট বাঁশিওলাকে ডাকে। সংখ্যায় খুবই কম। খুব বড় আর্টিস্ট হলে বা টিভিতে গানের প্রোগ্রাম হলে আলাদা কথা। সে আর ক’জন সুযোগ পায়?‌ অঙ্কুশের সে সুযোগ হয়নি। সে তেমন কেউ নয়। নামটাম কিছুই করেনি। ছোট আর্টিস্টরা মাঝেমধ্যে ডাকে। টাকা পয়সা কম দেয়। অঙ্কুশের স্ত্রী স্কুলে সামান্য একটা চাকরি করে বলে রক্ষে। নইলে হয়তো না খেয়েই থাকতে হতো।

এই লোকের সঙ্গে প্রেম‍‌! তার পরে আবার পরকীয়া! অসম্ভব বললেও কম বলা হবে।

মানুষ দু’টো জগতে বাস করে। একটা বাস্তব, একটা কল্পনার। সাধারণ মানুষ কল্পনার জগৎকে জোর করে চাপা দিয়ে রাখে। যাতে সে মাথা তুলে ফোঁস করতে না পারে। দুনিয়ায় ‘‌বাস্তবের মাটিতে পা দিয়ে চলা’কে গুণের এবং উচিত বলে মনে করা হয়। যারা তা করে না, তাদের বলা হয় বোকা। খুব অল্প কিছু মানুষই এই নিয়ম ভাঙে। কখনও কখনও কল্পনার ঝাঁপি খুলে দিয়ে কল্পনার সঙ্গে খেলা করে। নন্দিনীও করে।

সে মাঝেমধ্যেই এক জন শিল্পীকে বিয়ে করেছে, তার সঙ্গে ঘরসংসার করছে ভেবে বিভোর হয়ে যায়। তার একান্ত কল্পনার জগতে এই পুরুষটি তার স্বামী। মনে মনে তার সঙ্গে স্ত্রী হিসেবে কথাও বলে নন্দিনী। তৃতীয় ব্যক্তি সব সময়েই দু’জনের প্রেমকে হাস্যকর এবং বোকামি বলে মনে করে। এমনকী দুই প্রেমে ভাসা দুই নরনারীর যৌনক্রীড়াকেও তামাশা ছাড়া কিছু মলে হয় না। মনে হয় বোধবুদ্ধি সব লোপ পেলে মানুষ এমন করতে পারে। তার পরেও প্রেম একই ভাবে চলতে থাকে। নন্দিনীর বেলাতেও তাই।

‘‌অ্যাই, তুমি খেতে বসবে না ‌?‌’‌
‘‌দাঁড়াও নন্দিনী, আর একটু গড়িয়ে নিই।’‌
‘‌‌একদম নয়, অনেক গড়িয়েছো। এবার ওঠো লক্ষ্মীটি। স্নানে যাও।’
‘‌প্লিজ নন্দিনী, দেখছো না বাঁশিতে একটা সুর তুলছি।’‌
‘তবে রে, শুয়ে শুয়ে বাঁশিতে সুর তোলা হচ্ছে!‌ আমার সঙ্গে ঠাট্টা?‌ ‌দাঁড়াও এক বালতি জল এনে তোমার মাথায় ঢেলে দিচ্ছি।’‌

‌অঙ্কুশ আবদার করে। বলে, ‘অনেক সময়ে মনে মনেও সুর তোলা যায়। তার আগে বাঁশিটা এক বার দাও নন্দিনী। সুরটা শোনাই। একটা ফোকের প্রিলিউড।’‌

নন্দিনী আধো গলায় বলে, ‘নিজের জীবনের প্রিলিউডই ঠিক মতো হল না, উনি গানের প্রিলিউড তুলছেন।

‌‘‌এই অবেলায় যদি তোমার বাঁশি শুনতে বসি তা হলে সংসারের সব কাজ চৌপাট হয়ে যাবে।’‌

অঙ্কুশ বলে, ‘‌কিচ্ছু হবে না। অত সংসার নিয়ে ভেবো না তো। ইস নন্দিনী, তুমি যদি গান করতে খুব ভাল হত। তোমার সঙ্গে ঘুরে বাঁশি বাজাতাম। কাজের জন্য মধুমালতীর পিছন পিছন ঘুরতে হত না। তা-ও তো কাজ পাই না। নেহাত আজকাল একটা দুটো ফোক গাইছে বলে বাঁশি লাগছে।’

‌এই পর্যায়ে নন্দিনী মনে মনেই খাটের এক পাশে বসে পড়ে। সে-ই অঙ্কুশের বুকে হাত দেয়। অঙ্কুশ নন্দিনীকে দু’‌হাত দিয়ে কাছে টেনে নেয়। বুকের ওপর আলতো শুয়ে পড়ে নন্দিনী। অঙ্কুশ তার চিবুক ছোঁয়।

‘‌তোমাকে আর মধুমালতীর পিছন পিছন ঘুরতে হবে না।’
অঙ্কুশ হেসে বলে, ‘‌খাব কী? তোমাকেই বা খাওয়াব কী‌?‌’‌‌
নন্দিনী তার চিবুকে চিবুক রেখে বলে, ‘‌আমি গান শিখব। আমি গাইব।’‌

নন্দিনীর একটা বিয়ে ভেঙেছিল, গানের গলা নেই বলে। সেই সম্বন্ধ খারাপ ছিল না। পাত্র’র পারিবারিক ব্যবসা। মফঃস্বল শহরে স্টেশন রোডে বড় মুদির দোকান। মেয়ে তাদের পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হল, বিপত্নীক মেয়ের বাবার আবার গানবাজনা শখ। উনি ঠুংরি, গজল জানা মেয়ে খুঁজছেন। সন্ধ্যের পর ছেলে দোকান সামলাবে, উনি বাড়িতে কোঁচা মেলা ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি পরে বসে পুত্রবধূর সঙ্গে সঙ্গীতচর্চা করবেন। নন্দিনীর গানের গলা নেই বলে সেই সম্বন্ধ কেঁচে যায়।

অঙ্কুশের সঙ্গে মনে মনে নন্দিনী শরীরের ভালোবাসাও করে।

‘‌অ্যাই কী হচ্ছে?‌’‌
‘‌কী আবার হবে?‌ আমার বউকে আদর করছি।’‌
‘‌ইস্‌, এই ভর সন্ধ্যেবেলা.‌.‌.‌।’‌
‘‌কেন ‌সন্ধ্যেবেলা কি আদর করতে নেই?‌’‌
‘তা বলে একেবারে এই ভাবে জামাটামা খুলে দিয়ে.‌.‌.‌ইস্‌।’‌

নন্দিনী মাঝেমধ্যে ভাবে, বিয়ে হলে ‌এই প্রেম ছেড়ে সে অন্য পুরুষের সঙ্গে থাকবে কী করে?‌‌ তার পরেও জানে থাকতে হবে। মনকে সে সেই ভাবেই বুঝিয়েছে। অন্য কারও সঙ্গে থাকাটা হবে বাস্তব, আর অঙ্কুশের সঙ্গে থাকাটা হবে কল্পনার।

নন্দিনী কী ভাবে কঠিন পরীক্ষা সামলাবে বুঝতে পারছে না। বই, নোটস, সাজেশন নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। যেখান থেকে যেমন যেমন খবর পাচ্ছে, তেমন তেমন পড়ার চেষ্টা করছে। বেশি পড়ারও তো সময় নেই। অফিসে যেতে হয়। অফিসের কাজ ঝামেলার। ঝামেলার থেকেও খানিক বেশি। প্রাইভেট কোম্পানিতে সেলসে আছে সে। মাসে টার্গেট না হলেই নয়। কমিশন তো হবেই না, মাইনেও বন্ধ। একেই তো ওইটুকু মাইনে, বন্ধ হয়ে গেলে গেল। তার পরেও নন্দিনী কাজটা চালিয়ে যাচ্ছে, তার কারণ, এক্সপেরিয়েন্স হচ্ছে। আজকাল যে কোনও কাজে প্রথম প্রশ্ন করে, ‘‌কোথায় কাজ করতেন?‌ এক্সপেরিয়েন্স কী? এক্সপেরিয়েন্স নেই?‌ তা হলে অ্যাপ্লাই করছেন কেন?‌‌’

এখানে কাজ করলে, অভিজ্ঞতা আছে সেটা তো বলতে পারবে।‌

বিএ পাশ হয়ে গেল তিন বছর। শুধু ক’টা টিউশনি নিয়ে আর ক’দিন পড়ে থাকবে?‌ তিন জনের সংসার হোঁচট খেতে খেতে চলে।‌ লোকে বলে, বাড়ির একমাত্র ছেলে যদি মানুষ না হয় তা হলে এরকমই ঘটে। ‌নন্দিনীর মাঝে মাঝে মনে হয়, সত্যি কি দাদা মানুষ হয়নি?‌ তা-ই হবে। তিরিশ-ছুঁই এক শক্তসর্মথ যুবক যদি পাকা রোজগারপাতি করে বাড়ির দায়িত্ব না নেয়, তা হলে তাকে কি মানুষ বলা যায়?

তবে পিনাকীর যে একেবারে রোজগারপাতি নেই তাও নয়। মাঝেমাঝে কিছু টাকা এনে বোনের কাছে দেয়। কখনও দুশো–‌তিনশো, কখনও হাজার। হাজার কমই হয়।

‘রেখে‌ দে।’
নন্দিনী বলে, ‘‌দাদা, মায়ের ওষুধ লাগবে।’‌
পিনাকী মাথা নামিয়ে বলে, ‘এখন এটা দিয়ে ম্যানেজ কর। পরে দেখছি।’‌

এই সময়ে নন্দিনী চুপ করে যায়। কী বা বলবে? ছ’‌বছরের‌ বড় দাদাকে তো আর বলা যায় না, “দাদা, এ বার একটা চাকরি বাকরি দেখ।” বরং তার খারাপই আগে। পরপর দু’টো অফিস বন্ধ হয়ে গেল। একটা থেকে কাজ চলে গেল। এর পরে চাকরি খোঁজার মন থাকে?‌

রজনী ডেকে চলেছেন।

“পিনু পিনু , ও পিনু,  বাড়ি এলি?‌”

নন্দিনীর ঘরের দরজা বন্ধ। তার পরেও ডাক কানে আসছে। ডাক যে জোরে তা নয়, তবুও ভনভনে মাছির মতো বিরক্তকর। গত তিন বছর ধরে এই কাণ্ড চলছে। সন্ধে হলেই শুরু হয়। রজনী ছেলেকে ডেকে চলবেন টানা। যত ক্ষণ না রাতের খাবার খাইয়ে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এত দিনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অভ্যস্ত হওয়া তো দূরের কথা, বিরক্তি বাড়ছে নন্দিনীর। ইচ্ছে করে, উঠে গিয়ে মুখে সেলোটেপ লাগিয়ে দিয়ে আসে। তা সম্ভব নয়। সাতষট্টি বছরের অসুস্থ বৃদ্ধার মুখে সেলোটেপ লাগানো যায় না। নিজের মা হওয়ায় আরও সম্ভব নয়।

নন্দিনী গুনগুন আওয়াজ করে পড়ছে। আওয়াজ করে পড়ার কারণ মায়ের ডাক যাতে কানে না ঢুকতে পারে।

খুবই খটমট জিনিস, মাথায়  ঢুকছে না। অথচ খবর আছে, এই লেখা থেকেই লাইন তুলে প্রশ্ন হবে। লেখাটি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের। নাম ‘‌‌বাঙালির মস্তিস্ক ও তাহার অপব্যহার’‌। এ রকম একটা গুরুগম্ভীর বিষয় প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে গেলে কোন কম্মে লাগবে নন্দিনী বুঝতে পারছে না। কিন্তু তিন জন তাকে এই লেখার কথা বলেছে। এর পরে কী ভাবে ফেলে দেওয়া যায়?‌ এই জিনিস হাতে পাওয়া নন্দিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। অনেক তেল দেওয়ার পরে মালা জেরক্স দিয়েছে। মালাও এ বার পরীক্ষায় বসছে। অতি বদ মেয়ে। স্বার্থপর দি গ্রেট। তার ওপর কুচুটে আর লাগানিভাঙানি আছে। এর কথা ওকে বলে গোলমাল পাকাতে ভালবাসে। বড় জায়গায় কোচিং নিচ্ছে। খরচ করছে। সেই কারনে ভাও বেড়েছে। ফোন করলে কেটে দেয়। তার পরেও নন্দিনী কিছু মনে করে না। গরিব মানুষের অত মনে করলে চলে না।

মাঝেমধ্যে ফোন ধরলে গদগদ গলায় বলে, ‘কী রে, পড়ছিলি?‌’
মালা বানানো হাই তুলে বলে, ‘‌না। শুয়ে আছি। কাল রাত জেগে পড়েছি তো।’‌
নন্দিনী মিথ্যে উচ্ছ্বাস এনে বলল, ‘‌বাবা!‌ এত পড়ছিস!‌ একেই তুই বুদ্ধিমতী, তার ওপর হেভি খাটছিস, তোকে কে আটকায়?‌ ঠিক পেয়ে যাবি।’‌
মালা প্রশংসায় পাত্তা না দেওয়ার ভান করে বলল, ‘পেলেই বা কী ছাতার মাথা হবে?‌ আমি তো স্কুলে পড়াব না। আমাকে আসলে আইএএস ক্র‌্যাক করতে হবে। বাপির স্বপ্ন মেয়ে আইএএস হোক। আমার তো কোনও উপায় নেই।’‌

নন্দিনী মনে মনে বলে, ‘‌বেটা গুলবাজ’‌।

মালা যে কোচিং-এ পড়ে, তারা পরীক্ষার সাত দিন আগে ‘‌লাস্ট মিনিট’‌ সাজেশন ছাড়ে। ওটাই আসল। ওই সাজেশনের জন্যই সবাই টাকা ঢেলে ভর্তি হয়। মালার কাছ থেকে ওই সাজেশন ম্যানেজ করতে হবে। ‌

নন্দিনী আবার জোরে জোরে পড়তে লাগল। স্কুলে পড়ার সময় জোরে জোরে না পড়লে বাবা বকুনি দিত। বলত, ‘‌যে লেখাপড়ার সময় জোরে পড়ে না, তার ভাগ্যেরও জোর হয় না।’‌

কচুর মাথা। ছোটোবেলা থেকে তো এত জোরে জোরে পড়েছে, কী ভাগ্য হল?‌

সদর দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। নন্দিনী পড়া থামিয়ে মুখ তুলল। বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে গেল। এই সময়ে কে এল?‌

ডোরবেল আছে, তবে বহু দিন ধরে অচল। ডোরবেল রেখেই বা কী লাভ?‌ পিনাকী আর নন্দিনী বাইরে থাকলে, উঠে গিয়ে কে দরজা খুলবে? নীলিমার তো সে ক্ষমতা নেই। ভাই–‌বোন দু’জনের কাছেই চাবি থাকে। খুলে ঢুকে পড়ে। অসুস্থ বৃদ্ধাকে বাইরে থেকে লক করে যেতে ভয় হয়, উপায় কী? চব্বিশ ঘণ্টা পাহারাদার রাখার মতো সঙ্গতি তাদের নেই‌। আয়া রাখা এখন খুব কস্টলি।

আবার কড়া নাড়ার আওয়াজ। এবার জোরে। তাড়া থাকলে যেমন হয়।

নন্দিনী ঘর থেকে বেরোল।

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

পড়ুন পরের পর্ব: মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১১

Comments are closed.