রবিবার, জুলাই ২১

মেঘমল্লার – ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ১

প্রচেত গুপ্ত

খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দুটো খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক।

 এখন সকাল দশটা বেজে আঠাশ বা উনত্রিশ মিনিট হবে।

এতো নির্দিষ্ট করে সময় বলার কারণ আছে। সেই কারণে পরে যাচ্ছি। তার আগে বলে নিই, এই মুহূর্তে আমরা যে ঘরের মধ্যে রয়েছি তার এক পাশে একটি বড় টেবিল। টেবিলের দু’‌পাশে চেয়ার। এক দিকে সাদা তোয়ালে ঢাকা একটি চেয়ার। চেয়ারটি শক্তপোক্ত, ভাল। নীচে এবং পিঠে অল্প গদি। উল্টো দিকে তিনটে সাধারণ কাঠের চেয়ার। চেয়ার ঠিকঠাক হলেও, টেবিল খুবই অপরিষ্কার। কাগজ, ফাইল, স্পাইরাল বাইন্ডিং করা রিপোর্ট স্তূপাকৃত হয়ে আছে। কিছু কিছু টেবিল থাকে যাদের দেখলে ভয় করে। একমাত্র যার টেবিল সে শুধু খুশি হয়। এই টেবিল সেই রকম। সব সময়ে মনে হয়, খানিক আগে কেউ লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে।

এই লণ্ডভণ্ড হওয়া টেবিলে কাগজপত্রের ওপর দু’টো বই তেরচা ভাবে রাখা। একটির নাম ‘‌ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের পরম্পরা’‌, অন্যটির নাম ‘‌প্রেতলোক ও পরলোক’‌। প্রেতলোক ও পরলোক বইটির ওপর চামড়ার খাপে মোড়া একটা রিভলভার পড়ে আছে আলগোছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, প্রেতলোকে যাবার কারণ হয়ে সে মুচকি হাসছে। চামড়া খাপ গাঢ় বাদামি এবং চকচকে। মুখে রিভলভার বললেও এটি আসলে একটা নাইন এম এম পিস্তল। সার্ভিস পিস্তল। এই পিস্তল সম্পর্ক বিদ্যে জাহিরের কিছু নেই। আজকাল ইন্টারনেট খুললেই সব জানা যায়। মশা টু কামান সব। ‘‌আমি বিরাট লেখাপড়া করে জেনেছি’‌ বললে লাভ নেই। সবাই ধরে ফেলে। শুধু এইটুকুই বলবার, অস্ত্রটি ভাল। সেমি অটোমেটিক। আমরা একে ‘‌রিভলভার’‌ নামেই ডাকব।

রিভলভারটি যে ভদ্রলোকের, তাঁর বয়স বছর চুয়াল্লিশ মতো। লম্বা-চওড়া, পেটানো চেহারা। দাড়ি-গোঁফহীন মুখ। চোখে ঝকঝকে বুদ্ধি। কিন্তু মানুষটা এই বিষয়ে একেবারেই নির্লিপ্ত। এটাই নিয়ম। বুদ্ধি যাদের থাকে তারা বুদ্ধি নিয়ে মাথা ঘামায় না। ভাবটা এমন, থাকলেই বা কী, না থাকলেই বা কী?‌ কম্মে তেমন লাগছে কি?‌ এটাও বুদ্ধির লক্ষণ। বোকারা সব বোকামি করেই ভাবে মস্ত বুদ্ধির কাজ করলাম। বুদ্ধিমানেরা বুদ্ধি ব্যবহারে কখনই তৃপ্ত হয় না। সবজান্তা ভাব তো থাকেই না, উল্টে এদের জ্ঞানের ক্ষেত্রে এক ধরনের আকুলতা কাজ করে। আরও জানতে চায়। আরও শিখতে চায়। জানা, শেখার কাজে বাছবিচার থাকে না।

এখানেও তাই ঘটছে।

বুদ্ধিমান, স্মার্ট চেহারার মানুষটি একটা স্টিলের কৌটো খুলেছেন। কৌটোতে রয়েছে দই। বাড়িতে পাতা টক দই। ভদ্রলোক প্রতিদিন ঘড়ি মিলিয়ে সাড়ে দশটায় এই দই খাবেন। একটু এদিক ওদিক হওয়ার উপায় নেই। সকালের এই দইটুকু না খেলে সারাদিন অস্থির হয়ে থাকেন। ওঁর দই খাওয়া দেখলেই বোঝা যায়, ঘড়িতে এখন সাড়ে দশটা বাজতে চলল। সেই হিসেবেই বলা, এখন দশটা আঠাশ বা উনত্রিশ। ভদ্রলোক চামচ দিয়ে দই মুখে নিলেন। চোখ বুজে স্বাদ অনুভব করলেন। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, খুশি হয়েছেন।

এবার আসা যাক টেবিলের এপাশে।

এদিকের তিনটি চেয়ারের একটিতে একজন মেয়ে বসে রয়েছে। বয়স খুব বেশি হলে বত্রিশ–‌তেত্রিশ। এই মেয়েকে অতিরিক্ত সুন্দরী বললে ভুল বলা হবে না।  ফর্সা, লম্বা। টিকোলো নাক, চিবুক। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। মাথার চুল টেনে খোঁপা করে বাঁধা। সৌন্দর্যে এক ধরনের শিক্ষা, সাহস আর ব্যক্তিত্বের ছাপ। সে ফুলহাতা সাদা শার্ট এবং গাঢ় মভ রঙের ট্রাউজার্স পরেছে। ট্রাউজার্সে নিখুঁত ভাবে ইন করা শার্ট। কোমরে চওড়া বেল্ট। চেয়ারে হেলান না দিয়ে পিঠ সোজা করে বসে আছে মেয়েটি। একটা অ্যাটেনশনের ভঙ্গি। ভীতু বা তেলমারা ধরনের অ্যাটেনশন নয়, ডিসিপ্লিনড অ্যাটেনশন। এই মেয়ের নাম রঞ্জনী।

‘‌তুমি একটু দই খাবে রঞ্জনী?‌’

‘‌থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আমি লাঞ্চ করে এসেছি।’‌

‘‌খেলে পারতে। আমার বউ দইটা খুবই চমৎকার বানায়। অনেকে ভাবে দই বানানোটা কী আর এমন ব্যাপার?‌ কথাটা ঠিক নয়। দই বানানো ষথেষ্ট ডিফিকাল্ট। সাজো কত দিনের পুরনো হবে, সেই সাজো বাটির গায়ে কী ভাবে লাগাতে হবে, দুধ কতটা ঘন হবে সব কিছুর হিসেব আছে। দই পাতার জন্য ঠিকঠাক পাত্র লাগে। তাতে দুধ ঢালারও টেকনিক আছে । হুড়মুড় করে ঢাললে হবে না। ধীরে ধীরে ঢালতে হবে। কুককে দিয়ে এসব হয় না। ছন্দা নিজে হাতে অতি যত্নে এসব করে।’‌

রঞ্জনী হেসে বলল, ‘‌স্যার ইউ আর লাকি। ম্যাডামের রান্নার হাত খুবই ভাল। আপনি জানেন না স্যার, আমি মাঝমধ্যে ওঁকে ফোন করে রেসিপি জেনে নিই। একটাই কন্ডিশন, তিনটে রেসিপি শিখলে একটা গান শোনাতে হবে।’‌

বসন্ত সাহা ভুরু তুলে অবাক হয়ে বললেন, ‘‌তাই নাকি!‌‌’‌

‌রঞ্জনী হেসে বলল, ‘‌হ্যাঁ স্যার, আমার হাজব্যান্ড খেতে ভালবাসে। রকমারি খাবার পছন্দ করে। ম্যাডাম আমাকে হেল্প করেন। গতমাসের ফার্স্ট উইকে হঠাৎ তিন দিন ধরে খুব বৃষ্টি হল। মনে আছে স্যার?‌ বে অফ বেঙ্গলের ওপর একটা ডিপ্রেশন হয়েছিল?‌’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌মনে আছে বৈকি। অফিসের সামনে জল জমে গেল। অনেকেই আসতে পারেনি। আমি গাড়ি থেকে একবারে অথৈ জলে পড়লাম।’‌‌

‌রঞ্জনী বলল, ‘‌আমিও আসিনি স্যার। এদিকে নয়নও অফিস গেল না। বলল, খিচুড়ি খাব। সামথিং স্পেশাল। সামথিং স্পেশাল খিচুড়ির আমি কী জানি?‌ ‌কুক হিসেবে আমি ভেরি ব্যাড। ম্যাডামকে ফোন করলাম। উনি বললেন, বাড়িতে কী আছে?‌ আমি বললান, তেমন কিছু নেই। কুক অ্যাবসেন্ট। ফ্রিজে আনাজপাতির সঙ্গে কিছুটা ধনেপাতা আছে দেখছি। ম্যাডাম বললেন, ওতেই হবে। আমাকে ধনেপাতা দিয়ে একটা এক্সেলেন্ট প্রিপারেশন বলে দিলেন। ধনিয়া খিচুড়ি। একটু বেশি ঝাল । নয়ন তো খেয়ে মুভড স্যার। পরের দিন যাতে আবার সামথিং স্পেশালের জন্য বায়না না করে তার জন্য বৃষ্টির মধ্যেই জোর করে অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু তিনটে রেসিপি হয়ে গিয়েছিল তাই আমাকে আমার কথা রাখতে হল স্যার। ম্যাডাম আমার কাছে একটা বর্ষার গান চাইলেন। আমি হোয়াটসঅ্যাপে গেয়ে পাঠালাম।’‌

বসন্ত সাহা চোখ বড় করে বললেন, ‘‌বাপ্‌ রে!‌ এ সব তো আমি কিছুই জানি না। কী গান গেয়েছিলে?’‌

‌রঞ্জনী একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘‌ও কিছু নয় স্যার, আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে গানের কয়েক লাইন।’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘রঞ্জনী, তুমি তো গানবাজনার চর্চা করো, এক সময়ে রাগাশ্র‌য়ী সঙ্গীতের পাঠও নিয়েছো।’‌

রঞ্জনী লজ্জা পেয়ে বলল, ‘‌অত কিছু নয় স্যার। মেয়েরা একটা বয়েসে যেমন নাচ-গান শেখে আর কী। তার পরে ইন্টারেস্ট বাড়ল, গ্র‌্যাজুয়েশন করে মিউজিক নিয়ে আবার রবীন্দ্রভারতীতে ভর্তি হয়ে গেলাম। ব্যাচেলর অব মিউজিক করলাম। তার পরে মাস্টার অব মিউজিকও কমপ্লিট করলাম। একবারেই পাগলামি স্যার। বাড়িতে তো খুব বকাবকি করেছিল। এখন আবার ওসব ছেড়েছুড়ে এই কাজে ঢুকে পড়েছি। চাকরি আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকি।’

‘বুদ্ধির এই একটা সমস্যা রঞ্জনী। কোথাও গিয়ে সে দু’দণ্ড জিরোতে পারে না। আরও শিখি মনে হয়। বুদ্ধি কম হলে এই ঝামেলা থাকে না। তোমার বর নয়ন যেন কী করে?‌’‌

‌রঞ্জনী বলল, ‘নয়ন ‌কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার স্যার। এখন বলছে চাকরির পাশাপাশি পোলট্রি বানাবে।’‌

‘‌বল কী!‌ ‌কম্পিউটার ইঞ্জনিয়ার পোলট্রি বানাবে!‌’‌

‌রঞ্জনী সামান্য হেসে বলল, ‘‌কী বলব বলুন তো স্যার?‌ সাতগাছিয়ার কাছে জমি দেখেছে। বলেছে শনি–‌রবি করে গিয়ে ওখানে থাকবে। পোলট্রি থেকে যত ডিম পাওয়া যাবে তার একটা পার্ট বাজারে দিয়ে খরচ তুলে নেবে, বাকি সবটাই স্কুলে স্কুলে পাঠিয়ে দেবে বিনি পয়সায়। মিড ডে মিলে যাতে ছেলেমেয়েরা খেতে পারে। নয়ন বলছে, সমাজের জন্য কিছুই তো করি না, হেলদি মুরগির হেলদি এগ বিলি করে খানিকটা রেসপনসিবিলিটি পালন করি।।’‌

বসন্ত সাহা উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ‘‌ওয়ান্ডারফুল!‌’‌

‌রঞ্জনী এবার মুখে শুকনো করে বলল, ‘‌স্যার, আপনি ওয়ান্ডারফুল বলছেন, কিন্তু এই হ্যাপা কে সামলাবে বলুন তো? আমি তো খুব ভয়ে আছি, উইকেন্ডে‌ আমাকে গিয়ে না মুরগির ডিম গুনতে হয়।’

স্মার্ট ভদ্রলোক ‘‌হো হো’‌ আওয়াজে হেসে উঠলেন। আবার দই খেতে খেতে দ্রুত বিষয়ান্তরে গেলেন।

‘আচ্ছা ‌রঞ্জনী, রাগসঙ্গীতে ‌এতো যে রাগ রাগিনী, এতো বৈচিত্র, মাধুর্য্য, সুরের এতো আয়োজন কীভাবে সম্ভব হল?‌‌ ভাবলে বিস্ময় জাগে না?‌ মানুষের কী আশ্চর্য ক্ষমতা বলো তো!‌’‌

রঞ্জনী উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘‌তা তো বটেই স্যার। সরগমকে অতি গভীর ভাবে অধ্যয়ন করলে তবেই রাগ–‌রাগিনীর সৃষ্টি করা যায়। সঙ্গীতের গুরুদেবেরা সুরের ভিতর থেকে যে রস বার করে এনেছেন, সে তো প্রায় সমু্দ্র মন্থনের মতো।’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘ঠিক বলেছো। রঞ্জনী, তুমি কি বলতে পার কানাড়া রাগে এতো শাখাপ্রশাখা কেন। সেদিন বইতে পড়ে অবাক হয়ে গেলাম। আড়ানা কানাড়া, আভোগী কাড়ানা, কৌশিকী কানাড়া, কাফি কানাড়া। আমি তো রইসা কানাড়া বা শাহানা কানাড়ার নামই কখনও শুনিনি। রাগ শোনা তো দূরের কথা। এত সূক্ষ্ম ফারাক বোঝার জন্য কান আর মন দুটোই থাকা দরকার। এই যে ঝরঝর মুখর গানটার কথা তুমি বললে, ওটা তো মেঘমল্লার রাগের ওপর। তাই না?‌ শুনলেই মনে হয়, বৃষ্টি পড়ছে। আমার মাঝেমধ্যে অবাক লাগে। হাউ ইজ় ইট পসিবল্‌?‌’‌

রঞ্জনী আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘ঠিক ‌স্যার। মেঘমল্লার যেমন বৃষ্টি নামায়, তেমন ভৈরবী ভোরের আলো ফোটায়। রাত শুরুতে আভোগি, বেশি রাতে আদানি। স্বরের চলন-গমন, ছোটো ছোটো মীড়, সরগরমের কোমল-কড়ির তফাতে সুরস্রষ্টারা এক একটা রাগ-রাগিনী তৈরি করেছেন। আপনি তো স্যার জানেন তানসেন মল্লারকে একটু এদিক ওদিকে করে মিঞা কি মল্লার বানিয়েছিলেন। টৌড়িকেও তাই। মিঞা কি টৌড়ি। সে যে কী অপূর্ব!‌ সামান্য কড়ি মা, কোমল ধা–‌এর‌ ওপর কাজ। চট করে বোঝা যাবে না, মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে, স্পষ্ট ফারাক রয়েছে।’‌

ভদ্রলোক দই খাওয়া শেষ করে কৌটোর মুখ বন্ধ করে বেল বাজালেন। গনা নামে একজন এসে কৌটো আর চামচ নিয়ে গেল। রোজকার মতো আজও সে কৌটো ধু্য়ে ফেরত দেবে।

‘রঞ্জনী, আমার মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে এসব ছেড়েছুড়ে গানবাজনা নিয়ে পড়ে থাকি। আমি তো তোমাদের মতো গাইতে পারি না, ভগবান সে গুণ আমাকে দেননি। তবে শুনতে তো পারি। সুর না থাক, মন প্রাণ তো রয়েছে। তোমার বউদিকে এই প্রস্তাব দিয়েছি। সে বলেছে, কাজকর্ম ছাড়ায় তার আপত্তি নেই, তবে রাত দিন বাড়িতে খেয়াল চলতে থাকলে তিনি গৃহত্যাগ করবেন। তখন দই কে বানিয়ে দেবে?‌ এই জন্য ঠিক এগোতে ভরসা পাচ্ছি না। পেরে যাব।’‌

রঞ্জনী হাসি লুকোল।

এবার এই ঘর এবং ঘরের ভিতরকার দু’‌জন মানুষের পরিচয় দিই।

এদের আলোচনা শুনলে মনে হতে পারে, এটি কোনও রন্ধন বা সঙ্গীত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। অথবা যারা কথা বলছে, একটু পরেই তারা রাগ-রাগিনী বিষয়ক সেমিনারে অংশ নিতে যাবে।

একবারেই তা নয়। এই ঘরটি গোয়েন্দা পুলিশের অফিসঘর। স্মার্ট, টক দই খাওয়া পুরুষটি এক জন দুঁদে ইনস্পেক্টর। নাম বি সাহা। পুরো নাম বসন্ত সাহা। এই পুলিশ অফিসারটির সঙ্গে কোনও কোনও পাঠকের ইতিমধ্যেই হয়তো পরিচয় হয়ে থাকবে। তখন তিনি কলকাতা একটি থানায় পোস্টেড ছিলেন। এখন প্রোমোশন হয়ে রাজ্য গোয়েন্দা দপ্তরে চলে এসেছেন। তার কাছে একটি অদ্ভুত কেস আসে। এক মহিলার আত্মহত্যার বহু বছর পর থানায় চিঠি এল। উড়ো চিঠি। যে চিঠি ফেলে দেওয়াটাই রীতি। এই অফিসার কোনও চিঠি ফেলতেন না। উড়ো চিঠিটি তিনি পড়লেন। সেখানে লেখা ছিল, মহিলা আসলে আত্মহত্যা করেননি। তাঁকে খুন করা হয়েছিল। ইনস্পক্টের বি‌ সাহা কেসটি সুয়ো মোটো হিসেবে গ্রহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত রহস্যের আবরণ মুক্ত করেন। এরকম বহু খটমট রহস্যের তিনি সমাধান করেছেন। এক জন বুদ্ধিমান, সৎ, সফল অফিসার হিসেবে পুলিশ মহলে এই ভদ্রলোক পরিচিত। আবার একটু ‘‌খেপাটে’‌ হিসেবেও পরিচিত। তা অবশ্য বোঝাই যাচ্ছে, খেপাটে না হলে গোয়েন্দা অফিসার সকালবেলা অফিসে এসে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে আলোচনায় বসেন?‌‌

বসন্ত সাহার টেবিলের উল্টো দিকে যে মেয়েটি বসে আছে সে-ও একজন পুলিশ অফিসার। জুনিয়র অফিসার। নাম আমাদের আগেই জানা হয়ে গেছে। রঞ্জনী। রঞ্জনী রায়। এ মেয়েও সাহসী এবং বুদ্ধমতী। সেই কারণে চাকরির শুরুতেই তাকে গোয়েন্দা বিভাগে নেওয়া হয়েছে। মেয়েটি অন্য রকম। গান নিয়ে লেখাপড়ার পর পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছে। সরোদও বাজাতে পারে আবার রিভলভারও চালাতে পারে। ও মনে করে গানে মন বাঁচে, পুলিশে প্রাণ বাঁচে। দুঃখের কথা, প্রাণ বাঁচানোর থেকে প্রাণ চলে যাওয়ার কেসই তার কাছে আসছে বেশি। তাকে অপরাধী খুঁজে বার করবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওপরমহল এই মেয়েটিকে ভরসা করতে শুরু করেছে। জটিল কেস হলে তাকে সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে রাখা হয়। আবার স্বাধীন ভাবেও দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এখন একটা মার্ডার কেসের ব্যাপারে ডিটেকটিভ বসন্ত সাহা তার জুনিয়র রঞ্জনী রায়ের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। এই খুনটির বিষয়ে রঞ্জনী গত পনেরোদিন ধরে প্রবল খাটাখাটনি করেছে। হেডকোয়ার্টার থেকে তাকে কেসটা দেওয়া হয়েছে। এর পিছনে বি‌ সাহার পরামর্শ ছিল। রঞ্জনী জানে না। প্রকাশ্যে একজন গায়িকাকে গুলি করে মেরে খুন করা হয়েছে। শুধু প্রকাশ্যে নয়, একেবার স্টেজে গান গাইবার সময়। এই ঘটনা পুলিশের জন্য যথেষ্ট বিড়ম্বনার। খবরের কাগজে লেখালিখি হচ্ছে। নানা রকম গল্প বেরোচ্ছে। সরকারও চাইছে অপরাধী ধরা পড়ুক। পুলিশের উপর চাপ আসছে। প্রথমে থানা তদন্ত করেছে। কিছু লাভ হয়নি। দুয়েক জনকে আটক করে, জেরা করে ছেড়ে দিতে হয়েছে।

রঞ্জনী রায় স্পেশ্যাল ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পাওয়ার কারণ আছে। পুলিশের বড়কর্তারা জানেন, তাদের এই বুদ্ধিমতী মহিলা অফিসারটি এক সময়ে গান বাজনার সঙ্গেও জড়িত ছিল। একজন গায়িকা হত্যার তদন্ত সে নিশ্চয় ভাল পারবে।

রঞ্জনী খুব খাটছে। বিভিন্ন স্পটে গেছে। কখনও গোপনে, কখনও ইউনিফর্মে। নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করেছে। সন্দেহভাজন, অ–‌সন্দেহভাজনদের ডেকে জেরা করেছে। কম করে তিনটি থানায় গিয়ে পুরনো কেস ডায়েরি দেখেছে। জেলখানায়, আদালতে গিয়ে নথিপত্র ঘেঁটেছে। কেস হিস্ট্রি খতিয়ে পড়েছে। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে পুরনো খবরের কাগজ উল্টেছে। তার পরেও ধোঁয়াশা কাটিয়ে বেরোতে পারছে না। অপরাধীর মুখ কখনও স্পষ্ট হচ্ছে, কখনও মিলিয়ে যাচ্ছে। মোটিভ কখনও বুঝতে পারছে, কখনও গুলিয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই সে তার সিনিয়র বসন্ত সাহার শরণাপন্ন হয়েছে। তিনি আজ অফিসের শুরুতেই ফাইলটা দিতে বলেছেন। পড়ে দেখবেন। তাঁর হাতে সময় নেই। সাতদিন পরেই লন্ডন যাচ্ছেন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের একটা ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশ নেবেন। দেশের খুব অল্প কয়েক জন পুলিশ অফিসার এই সুযোগ পেয়েছে। এখানকার বড়কর্তরাও চেয়েছেন, তিনি ট্রেনিংটা নিয়ে আসুন। তার মানে যা করবার তাড়াতাড়ি করতে হবে। হাতে সময় নেই।

রঞ্জনী সেই ফাইল নিয়ে এসেছে। ফাইলের ওপর কেস নম্বর লেখা। আর এক কোণে খুব ছোটো করে পেনসিলে লেখা ‘মেঘমল্লার’‌‌। রঞ্জনী রায়ের এই একটা অদ্ভুত অভ্যেস। এক একটা কেসের সে একেকটা কোড নেম দেয়। সেই সব কোড নেম হয় রাগরাগিনীর নামে। সরকারি ভাবে কিছু না, তার পরেও অনেকেই জেনে যায়। ভাবে, এক সময়ে গান শিখেছে, সেই নেশাটা ছাড়তে পারেনি। নইলে খুনের ফাইলের কোড নেম থাকবার কারণ কী? সত্যিই তেমন কোনও কারণ নেই, তার পরেও রঞ্জনী রায়ের মাথায় কিছু একটা কাজ করে। এক ধরনের খচখচানি হয়।

এবারে কোড নেম দেওয়ার সময়েও কি মেঘ–‌বৃষ্টির কথা তার মাথায় ঘুরেছে?‌ সেখান থেকে ‘‌মেঘমল্লার’‌?‌ যে রাগ মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নিয়ে আসে।‌ মেঘ বলতে এখানে রঞ্জনী রায় কি রহস্যের কথা বলেছে?‌ সেই রহস্য ভেদ করে, অপরাধীকে চিনতে না পারবার অশান্তি, গুমোট অস্বস্তি কেটে শান্তিধারা চাইছে?‌

বসন্ত সাহা হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘‌দাও, ফাইলটা দেখি।’‌

রঞ্জনী আগ্রহ নিয়ে ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘‌একটু বলি স্যার?‌’‌

বি সাহা বড়সড় ফাইলটা খুলতে খুলতে বললেন ‘‌বল।’‌

রঞ্জনী এবার নড়েচড়ে বসল। যা বলল তা এররকম—

এই মামলায় তিনটি খুনের ঘটনা রয়েছে।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে আজ থেকে আঠেরো বছর আগে। সেই ঘটনায় স্ত্রীকে খুন করবার দায়ে এক স্বামীর জেল হয়। দ্বিতীয় ঘটনায় প্রাক্তন প্রেমিককে একটি কমবয়সি মেয়ে খুন করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। এটিও পুরনো। পাঁচ বছর আগে ঘটেছিল। পুলিশ মেয়েটিকে ধরে, জেলেও পাঠায়। কিন্তু সে ছাড়া পেয়ে যায়। অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি। তিন নম্বর ঘটনাটি এখনকার। গায়িকার হত্যারহস্য। খুব বড় কোনও গায়িকা নয়, পথেঘাটে স্টেজ বেঁধে যেসব প্রোগ্রাম হয় সেখানে গান করে। মূলত চটকদারি ফিল্মের গান, নকল গান। তবে এই গায়িকার চাহিদা আছে। শহর, গ্রামে সর্বত্রই ডাক পড়ে। এ রকমই একটি ফাংশনে গায়িকাকে স্টেজে গান গাওয়ার সময়ে গুলি করা হয়েছে। কলকাতাতেই ঘটেছে। হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মেয়েটি মারা যায়। এই হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজনদের তালিকাটি দীর্ঘ। অনেকে নাম রয়েছে।

এই তিন ঘটনার মিল একটিই। পুলিশের কাছে সব অভিযুক্ত এবং সন্দেহভাজনই বলেছে, ‘‌আমি খুন করিনি’‌। এটাই স্বাভাবিক। অপরাধী চট করে দোষ স্বীকার করে না। সামান্য চোরও বলে আমি চুরি করিনি, খুনি তো বলবেই। প্রথম ঘটনায় অভিযুক্তের সাজা হয়েছে। কারণ ঘটনায় সাক্ষ্যটি ছিল অব্যর্থ। একবারে আই উইটনেস। ফলে অভিযুক্ত যতই ‘‌আমি খুন করিনি’‌ বলুক, কোনও লাভ হয়নি। তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

প্রশ্ন হল, সত্যি কি এই সাজাপ্রাপ্ত মানুষটি অপরাধী নয়?‌ সাক্ষ্যে কোনও গোলমাল ছিল?‌ আই উইটনেসের বুঝতে কোনও ভুল হয়েছে?‌ পুলিশও সেই ভুলের ওপর নির্ভর করে কেস ডায়েরি সাজায়?‌ গোলমাল এমনই যে আইন তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হয়?‌ দ্বিতীয় ঘটনায় যে মেয়েটি তার প্রেমিকাকে হত্যা করেছিল, সে-ই বা বেঁচে গেল কীভাবে?‌ মিথ্যে প্রমাণ হাজির করে?‌ নাকি সত্যিই সে নিরপরাধ?‌ আর এই তিন নম্বর খুনটি তো একেবারে প্রকাশ্যে ঘটেছে। এভাবে প্রকাশ্যে সাধারণত রাজনীতির লোকজন খুন হয়। সবার চোখের সামনে এক জন গায়িকাকে গুলি করল কে?‌

যেটা উল্লেখ করবার মতো কিছু নয়, তার পরেও অকারণে বলা যায়, তিনটি হত্যাকাণ্ডের আগে পরে হয় বৃষ্টি হয়েছিল, নয় মেঘ করেছিল। গায়িকাকে গুলি করার পরেও বৃষ্টি নামে মুষলধারে। স্টেজ থেকে রক্ত মুছে যায়।

চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে সবটা শুনলেন বসন্ত সাহা। মাঝখানে দু’‌বার মোবাইল বাজল, দু’বারই নম্বর দেখে কেটে দিলেন।

‘‌তুমি কি তিনটে মার্ডার নিয়ে কাজ করছো রঞ্জনী?‌’

রঞ্জনী বলল, ‘‌না স্যার। আমি শুধু ওই সিঙ্গারের মার্ডার কেসটার আই ও। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে বাকি দু’টো ঘটনার সঙ্গে এটার কোথাও লিঙ্ক রয়েছে। সুতোর মতো।’‌

‌বি সাহা চিন্তিত গলায় বললেন, ‘‌হতে পারে। আবার না-ও পারে। এই মেয়েটার মার্ডার হয়তো তোমাকে বিফুল করছে। এটা একেবারেই স্বতন্ত্র। এর অন্য কোনও মার্ডারের সম্পর্ক নেই।’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌আমার তা মনে হয় না স্যার।’‌

বসন্ত সাহা এই কথায় খুশি হলেন। সিনিয়রের মত ঘাড় কাত করে মেনে নেওয়া মানে তদন্তে গোলমাল হচ্ছে। এই মেয়েটি কখনওই তা করে না। সে ঠিক পথেই এগোচ্ছে।

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌তোমার ফাইলটা পড়ি।’‌

রঞ্জনী বলল, ‘‌ফাইলে শুধু ডকুমেন্টস, ফাইন্ডিংস আর ইন্টারোগেশনগুলো সাজিয়েছি।’

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌তোমার ইনভেস্টিগেশন ফাইল সব সময়েই ভাল হয়। গল্পটা পাওয়া যায়।’‌

‘‌থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’‌

বসন্ত সাহা বললেন, ‘‌‌তুমি এবার যেতে পার রঞ্জনী। আমি ফাইলটা মন দিয়ে পড়ি। যদি জানার কিছু থাকে ফোন করব তোমাকে।’

রঞ্জনী উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করল। বলল, ‘‌আচ্ছা স্যার।’‌

‌রঞ্জনী ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে ইলস্পেক্টর বি সাহা দুটো কাজ ‌করলেন। বেল বাজিয়ে গনাকে ডেকে বললেন, ‘বাইরের বিজি লাইটটা জ্বালিয়ে দাও।’‌ আর নিজে মোবাইল ফোনটা সামনে রাখলেন। নম্বর দেখে গুরুত্ব বুঝে তুলবেন।

তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে ডুব দিলেন ফাইলে।

আমরাও এবার সেই ফাইলের ভিতর ঢুকব, তবে পুলিশি ভাষায় ঢুকব না। তথ্য, নথি, সাক্ষ্যকে মিলিয়ে নেব। সাজিয়ে নেব। যেখানে ফাঁক সেখানে প্রয়োজনে কল্পনার সাহায্য নেব। এমন কিছু কথা আমরা বলব যা পুলিশের পক্ষে স্পষ্ট জানা সম্ভব নয়। অস্পষ্ট ভাবে আঁচ করেছে হয়তো। যেমন কারও মনের কথা। যেমন দুজন মানুষের ভাব ভালোবাসা, ঘৃণা, ক্রোধ, প্রতিহিংসা এবং অবশ্যই সেক্স। আমরা সেসব জায়গাতেই উঁকি দেব। ঘটনা চলবে ঘটনার মতো। আমরাও গল্প বলতে বলতে যাব।

গোয়েন্দা বসন্ত সাহা ফাইলে ডুবে গেলেন।

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা 

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব : মেঘমল্লার– ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস / ২

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Comments are closed.