বাণিজ্যে বসত

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অনিতা অগ্নিহোত্রী

    প্রেসিডেন্সী কলেজে অর্থনীতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর অর্থনীতির পাঠ শেষ করে চলে গিয়েছিলেন হিমালয়ের কোলে জাতীয় অ্যাকাডেমিতে। দু’বছরের জন্য আইএএস অফিসারের ট্রেনিং নিতে। প্রিয় শহরের প্রতি একরাশ অভিমান ছিল মনে।
    তারপর ঝাড়খণ্ডের কয়লা খনি অঞ্চল, মধ্য ও উত্তর ওড়িশার অরণ্য পর্বত স্কুল মালভূমিতে প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ। প্রশাসনের বুকের পাঁজর হয়ে বসে মানুষের প্রতি উত্তরদায়িত্বের ভাবনায় প্রতি নিয়ত দ্বন্দ্ব ও সংশয়ে দীর্ণ হওয়া। কবিতার পাশাপাশি গল্প লেখা চলেছে বাংলার বাইরের জনজীবন নিয়ে।
    বড় বাঁধ প্রকল্পের পুনর্বাসন নীতির প্রয়োগ করতে গিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষদের গ্রামে পৌঁছোন। সেই সময়েই শুরু হল রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকারের সংঘর্ষের নতুনতর পাঠ। এর পর বিদেশে ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স পড়তে পড়তে লিখে ফেলা প্রথম উপন্যাস, ভুলতে না পারা মহুয়ার দেশ নিয়ে।
    ১৯৯৬ সাল। অর্থনৈতিক উদার নীতি তখন টলমল পায়ে হাঁটতে শেখা এক শিশু। পনের বছর বাংলার মাটি থেকে নির্বাসনের পর ফিরে এলেন বাঙালী সাহিত্যিক। সদ্য রূপ বদলানো বৈদেশিক বাণিজ্য অফিসের শীর্ষে। কিন্তু এই কি তাঁর ফেলে যাওয়া শহর?
    প্রশাসনের অন্তরমহলের ভাষ্য নয়, মানুষের আঙিনায় বসে দেখা রাষ্ট্রের রূপ। প্রান্তিক জীবনের নিত্যকার লড়াই, জীবনে লিপ্ত হয়ে থাকার আখ্যান। ১৯৯৬-২০১৬ এই দু’দশক ব্যাপী সততসঞ্চরমান, সৃজনশীল শিল্পীর লেখা— চলন বিল।

    আরও পড়ুন:

    প্রথম পর্ব : আমার শহর

    এসপ্ল্যানেড ইস্টের রাজপথ ধরে বয়ে যাওয়া ট্রাফিকের কোলাহলের মধ্যে বসে মাঝে মাঝেই তীব্র হয়ে উঠত আত্ম-অনুসন্ধানের বাসনা।

    এ কোন আমি? এই আমিই কি কেওনঝড়ের জুয়াং রমণীদের বলেছিলাম, কেরোসিনের পয়সা সরকার দেবে না। আমাদের বাজেট নেই। রাতে পড়াশোনা করতে হলে তারা যেন নিজেরা ব্যবস্থা করে নেয়। আর সেই মেয়েরা মুঠো মুঠো শাল, করঞ্জ বীজ জমিয়ে রাখত নিজেদের হাটের পসরা থেকে, জ্বালানি কিনবে। এই আমিই তো বাঁধের জলের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারকে বলেছিলাম, জমির বদলে জমি দিতে পারছে না সরকার, তারা যেন নগদ টাকায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে তাড়াতাড়ি জমি দেখে নেয়। সরকারের প্রতিভূ ছিলাম আমিই।

    এখানেও আমি তাই। আমাদের এই অফিসে রফতারিকারক কোম্পানিগুলোর জন্য একবছরে প্রোৎসাহন হিসেবে মঞ্জুর হয়েছে আট হাজার কোটি টাকা। যথাসাধ্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই দেওয়া, তবু রফতানির হিসেবের মধ্যে পরিমাণকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা, হাওয়ালা কারবারের টাকা ঢুকে পড়া, এতো নিয়মিতই হচ্ছে। যত বড় বেসরকারি কোম্পানিই হোক, লাইসেন্স হস্তান্তরের নামে যে পবিত্র ছলাকলার আশ্রয় তারা নেয়, তাও সর্বজনবিদিত। অর্থনৈতিক উদারনীতি একদিকে সুদের হার কমিয়ে মধ্যবিত্তের সামান্য পুঁজিতে ছোবল মারছে, অন্য দিকে আমদানি শুল্ক কমিয়ে আমদানিকারকদের হাতে তুলে দিচ্ছে অপর্যাপ্ত বৈভব। আমার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বিনয়ে বিগলিত হয়ে যে কোম্পানিগুলো ধন্যবাদ দিয়ে যাচ্ছে প্রত্যহ, তাঁদের কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য, বৈষম্য পূর্ণ নীতি পালনের দায়িত্ব নিয়ে আমি কি তাঁদের বন্ধু হয়ে যাইনি, ব্যক্তিগত সততার নিখুঁত রেকর্ড সত্ত্বেও?

    মাঝে মধ্যেই বণিকসভাগুলোর তদ্বিরে ওপেন হাউস বলে একধরনের সভা ডাকা হয়। তাতে নিমন্ত্রণ করে আনা হয় দিল্লির বাণিজ্য মন্ত্রকের শীর্ষ স্থানীয় অফিসারদের। পাঁচ তারা হোটেলে যতবার খুশি চা-কফি, স্ন্যাকস, লাঞ্চ কিংবা ডিনার। খরচ যোগায় কোম্পানিগুলো, কাজেই তাদের প্রশ্নের মুখে প্রায়ই আগল থাকে না। যে সব বিধিনিষেধের ফলে তাদের মুনাফা কম হচ্ছে, সেইগুলো অবিলম্বে বাতিল করার দাবি করতে থাকে। এখানে এজেন্ট বা ব্রোকারদের ঢোকায় কোনও বিধিনিষেধ থাকে না। কাজেই তারাও প্রশ্ন তুলতে থাকে, অমুক ব্যাপারে কেন তাদের ফাইলে মঞ্জুরি দেওয়া হয়নি, অর্থাৎ ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার চেষ্টা।

    কলকাতার এজেন্টদের সংগঠন আমাকে মনে করে পরম শত্রু, যেহেতু অফিসে তাদের টাকা ছড়ানোর উপর আমার নিষেধাজ্ঞা। আমার বদলি করিয়ে দেবে বলে তারা একবার টাকা পয়সা তুলে দিল্লির এক বিশেষ দফতরে গিয়েছিল। সেখানে নাকি তাদের বলা হয়, এই টাকায় এই অফিসারের বদলি হয় না। দশগুণ একটা অঙ্ক বলা হয়েছিল। সেটা তুলতে না পারায় তাদের আবেদন না-মঞ্জুর হয়ে যায়। এসব গল্পের মধ্যের রটনার অংশ থাকে, তবু শুনে মন্দ লাগল না। মনে পড়ল, কেরিয়ারের গোড়ায় আমি যখন মহকুমা শাসক, আমার বদলির জন্য লাখ দু’য়েক টাকা তুলে রাজধানী পটনা গিয়েছিল কয়লা খনির মাফিয়া বর্গ। আমার ভাবমূর্তির হিসেবে টাকার অঙ্কটা কম বলে তাদেরও ফিরে আসতে হয়েছিল। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পনেরো বছরে আমার বদলির বাজারদর যথেষ্ট বেড়েছে, অর্থাৎ বাজার অর্থনীতির আমিও এক একক জেনে উৎফুল্ল হলাম।

    ওপেন হাউসগুলোকে আমার মনে হয় টাকার মাসল দেখিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত কেনার অপচেষ্টা। দারিদ্র্য রেখার ধারে কাছে যাঁদের বসত, সরকারি অফিসের দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢোকার সাহসই যাঁরা অর্জন করতে পারবেন না এক জীবনে, তাঁদের জন্য সরকারি উদ্যোগে এমন ওপেন হাউস করলে কেমন হয়?  দরিদ্রের তো এজেন্ট নেই, তাঁদের সভায় কি বিরাজ করবে নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ্য?

    পাঁচতারা হেটেলের সুখাদ্য সুপেয় গ্রহণ করে, আর প্রতিপত্তিশীল বণিক সমাজের সান্নিধ্যে আমি অনায়াসে পেজ থ্রি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম কলকাতায়, কিন্তু মনে মনে নানা সূক্ষ্ম আত্মবিশ্লেষণ করে নিজের ও অন্যের জীবনকে করে তুললাম দুর্বিষহ। আসলে স্থিতধীর মত বাস্তবকে গ্রহণ করাই হল প্রশাসনে সাফল্য অর্জনের সূত্র। কিন্তু আমার স্বভাবের মধ্যেই নিহিত আছে দ্বন্দ্বের বীজ। নিজের অবস্থানের নৈতিকতাকে যাচাই করে দেখার মধ্যে নিশ্চিত অশান্তি জেনেও বারবার সেই পথে পা বাড়াই। লেখায়, কাজে নিজের স্বভাবকে অতিক্রম করতে চাইনি বলে নানা সমস্যায় পড়েছি। কিন্তু সেই জন্যেই হয়তো মানুষ হিসেবে আমার ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছি প্রতিকূলতার মধ্যেও।

    রফতানি যোগ্য বস্তুর জন্য যেমন কাঁচামাল আমদানি করা যেত, তেমনই আমদানি করলে শর্ত থাকত রফতানির দায় পূর্ণ করার। যাতে বৈদেশিক মুদ্রা এসে জমা হয় দেশের ভাণ্ডারে। কাঁচামালের আমদানি কাগজে কলমে কম দেখিয়ে আনার প্রবণতা ছিল অনেক কোম্পানির মধ্যে । আবার কোনও কোম্পানি হয়তো আমদানি করে নিয়েছে, তারপর যথেষ্ট পরিমাণ রফতানি করেনি, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ঘাটতি থেকে যেত। এই সব কেসগুলোর উপর নজর রাখতে হত। তাছাড়া হাওয়ালা বা অন্য অর্থনৈতিক দুর্নীতির কেসগুলো রেফার করতাম ডি আর আই অর্থাৎ ডিরেক্টরেট অফ রেভেনিউ ইনটেলিজেন্স-এ। সেখানেও তখন একজন সৎ ও দক্ষ এক বাঙালি অফিসার, পরে যিনি কাস্টমস ও সেন্ট্রাল এক্সাইজ বোর্ডের শীর্ষে বসেছিলেন— তাঁর সঙ্গে আমার টিমওয়ার্ক খুব ভাল জমে গেল। একটি বৃহৎ রফতানিকারকের উপর আমাদের নজর ছিল, আমদানি শুল্ক ফাঁকি দেওয়াটা সে শিল্পকলার পর্যায়ে নিয়ে গেছিল। শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হয়েছিল। এখন সেই সংস্থা দেশের বৃহত্তম বাণিজ্য সংস্থাগুলোর অন্যতম। এবং নির্বাচনী ফলাফলের পর সরকার গঠনেও তার যথেষ্ট প্রভাব।

    সারাদিন অফিসে ইউনিয়ন এবং এজেন্টদের সঙ্গে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের পর হা-ক্লান্ত বাড়ি ফিরতাম। অফিস শেষের কাজ থাকত নিজের ও মায়ের বাড়ির বাজার করা। ওষুধ কেনা এবং সেগুলি যথাস্থানে পৌঁছনো। বাবার ব্যাক রেস্ট, চাকা চেয়ার ইত্যাদি বিকল হলে সেগুলির বদল বা মেরামত করানো। বাবা শয্যাশায়ী, তিনি নিজে গৃহবন্দী রোগীর সেবায়, কিন্তু আমার মায়ের কোনও কাজই সময়ে না হলে চলবে না। অনেক সন্ধে করে বাড়ি ফেরার সময় সন্তানেরা ঘুমিয়ে পড়ত। শ্বশুর শাশুড়ি জেগে থাকতেন। আমার কাছে এসে বসতেন খাওয়ার সময়। ভাষা নিয়ে এই মহারাষ্ট্রীয় পরিবারের কৌতূহলের শেষ নেই। তাঁদের আগ্রহে কেনা হয়েছিল বর্ণ পরিচয়, সহজ পাঠ। বাংলা কাগজ থেকে হেড লাইন পড়ে লেখা মকশো করতেন। রাত সাড়ে দশটার সময় একজন আশি অপর জন সত্তর বছরের দুই বাংলা ভাষা শিক্ষার্থীর উদ্যম দেখে হাসি কান্না একই সঙ্গে পেত।

    আলিপুরের বেলভেডিয়ার রোডে তিন কামরার ফ্ল্যাট। কেন্দ্রীয় সরকারের আবাসন। ঘন গাছগাছালির পর্দা ঘেরা তিন তলার ওই বাসায় কত যে বসন্ত, কত বর্ষার গতায়াত দেখেছি। সামনের বারান্দায় ডালপালা নিয়ে ঝুঁকে থাকত একটি আমগাছ। নীচে আরও বড় বড় আমের গাছ, শিরীষ, তেঁতুল,কাঠ চাঁপা। বোঝা যায় আবাসনটা এক কালে বানানো হয়েছিল গাছগুলোকে যথাস্থানে রেখেই। বর্ষার পর তাদের বাড় অসহ্য, অত্যধিক মনে হলে আবাসিক অফিসাররা পূর্ত বিভাগকে ডাকতেন, তারা পাতা-সহ বিশাল ডাল কেটে ভূপতিত করে দিত। গাছকে সজীব প্রাণী বলেই জেনেছি, শৈশব কেটেছে হাজরা পার্কে গাছেদের সঙ্গে কথা বলে। ফিল্ডে এমন কি ভুবনেশ্বরে সচিবালয়ে থাকাকালীনও আমার সামনে কোনও গাছের ডাল কেউ কাটবে, তা অসম্ভব ছিল। কিন্তু এই বৃক্ষবিদ্বেষী মহানগরে আমি অফিসের বাইরে সাধারণ, নগণ্য। পূর্ত বিভাগের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কলহ এবং ট্রাকআরোহী গাছ হন্তারকদের আটকানোর নিষ্ফল চেষ্টা করা ছাড়া আমার কোনও ক্ষমতা ছিল না।

    ছেলে মেয়েরাও হয়েছে আমারই মতন। তাদের সামনে গাছেদের বাঁচাতে না পেরে নিজেকে আরও অসহায় মনে হত। একবার আমাদের নীচতলার বাগানের সুন্দর অতিবৃদ্ধ আমগাছটার ডাল ইলেক্ট্রিক করাতে কাটা পড়ার উপক্রম হতেই মেয়ের কান্না ভরা ফোনে ছুটে অফিস থেকে বাড়ি এলাম। মাটিতে ছড়ানো অজস্র পাতা, খণ্ড ছিন্ন প্রাচীন শাখা — বাড়ি ঢোকার মুখে ধ্বংসের এই নির্মম মূতি দেখে শোকের থেকে তীব্রতর হয়েছিল ক্রোধ। এই শহরের মানুষ প্রত্যহ নানা হিংস্রতা বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়। অথচ নিঃশব্দ নিরস্ত্র গাছেদের হনন লীলায় তাদের বীরত্ব বিকশিত হয়। এ ব্যাপারে বাঙালি অবাঙালির কোনও রুচিভেদ দেখিনি।

    না, আমার শৈশব কৈশোরের কলকাতা এত নির্মম ছিল না।

    অলঙ্করণ – সৌজন্য চক্রবর্তী

    (ক্রমশ)

    অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত। 

    প্রথম পর্ব :

    আমার শহর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More