চুরি হয়ে গিয়েছিল দ্য ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’, সন্দেহের তালিকায় প্রথমেই ছিলেন পিকাসো

বিখ্যাত কবি অ্যাপোলিনেয়ার আদালতে স্বীকার করেছিলেন, তিনি আর পিকাসো, দুজনে মিলে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেছিলেন। কোন প্রমাণ!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী
    ১৯১১ সালের ২১শে আগস্ট

    আকাশে সবে ভোরের আলো দেখা দিয়েছিল। প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়ামের ভেতরে রাখা দেওয়াল আলমারি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এক ব্যক্তি। সারারাত অপেক্ষা করেছিলেন এই মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য। দ্রুত হাতে দেওয়াল থেকে ফ্রেমে আঁটা মোনালিসাকে নামিয়ে ফেলেছিলেন। তারপর ফ্রেম থেকে মোনালিসার ছবিটি খুলে নিজের ওভারকোট দিয়ে মুড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ল্যুভর মিউজিয়াম থেকে।

    পরের দিন, ২২ আগস্ট ১৯১১। সকাল ন’টায় চিত্রশিল্পী লুইস বেরোদ ল্যুভর মিউজিয়ামে এসেছিলেন। মোনালিসা যেখানে রাখা ছিল সেখানে গিয়ে দেখেছিলেন,  চারটি পেরেক হাহাকার করছে। মোনালিসা নেই। আতঙ্কিত লুইস, মিউজিয়ামের প্রধান নিরাপত্তারক্ষীকে কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মোনালিসা কোথায়? প্রধান নিরাপত্তারক্ষী বলেছিলেন, ছবিটি হয়ত অন্য কোথাও প্রদর্শিত হচ্ছে।

    প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম।
    কিন্তু সন্দেহ কাটেনি শিল্পী লুইসের

    মিউজিয়ামটির বিভাগীয় প্রধানের কাছে চলে গিয়েছিলেন, প্রধান নিরাপত্তারক্ষীর কথার সত্যতা যাচাই করতে। শিল্পীকে বিভাগীয় প্রধান জানিয়েছিলেন, মোনালিসাকে অন্য কোথাও প্রদর্শনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যে দুঃসংবাদটি পৌঁছে গিয়েছিল সংবাদপত্রগুলির অফিসে।  পরের দিন সকালে ফরাসি কাগজে কাগজে শিরোনাম হয়েছিল, ‘অভাবনীয়: মোনালিসা কোথাও নেই!”, ‘ল্যুভর থেকে চুরি হয়ে গেল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা!’

    মোনালিসা চুরির খবরটি দাবানলের আকার নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ইউরোপে। ফ্রান্সের বর্ডার সিল করে দেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল জনগণ। ল্যুভর মিউজিয়ামের কিউরেটর থিওপেলি হোমলোকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, মোনালিসার ছবিটি যিনি খুঁজে এনে দেবেন, তাঁকে কোনও প্রশ্ন ছাড়াই ৪০ হাজার ফ্রাঁ দেওয়া হবে। একই উদ্দেশ্যে, প্যারিস জার্নাল ৫০ হাজার ফ্রাঁ পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

    কে এই মোনালিসা!

    ইতালীয় চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এক অমর সৃষ্টি হল মোনালিসা। তেলরঙ দিয়ে আঁকা হয়েছিল এই বিশ্ববিখ্যাত ছবিটি। লিওনার্দো যখন ফ্রান্সে এসেছিলেন, ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস মাত্র চার হাজার সোনার মুদ্রার বিনিময়ে দ্য ভিঞ্চির কাছ থেকে মোনালিসা ছবিটি কিনে নিয়েছিলেন। রেখেছিলেন তাঁর ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদে। এরপর নেপোলিয়ন মোনালিসাকে নিয়ে গিয়েছিলেন টুইলিরাইসে, নিজের প্রাসাদের শয়নকক্ষে রেখেছিলেন। নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর ছবিটি ল্যুভর মিউজিয়ামকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। ছবিটি পরিণত হয়েছিল ফ্রান্সের জাতীয় সম্পত্তিতে।

    মোনালিসা

    শুধু জনপ্রিয়তার দিক থেকেই নয়, অর্থমূল্যের দিক থেকেও মোনালিসা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী শিল্পকর্ম। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, ১৯০৬ সালে ছবিটির দাম ছিল ১৬২ কোটি ৯৫ লাখ ২৮ হাজার ৬২ ডলার। মোনালিসার দাম প্রতি মিনিটে বাড়ে কয়েক হাজার ডলার। ভাবা যায় না, এ হেন ছবি অনাদরে পড়ে ছিল ল্যুভরের মত বিশ্বখ্যাত মিউজিয়ামে।

    চুরি যাওয়ার বেশ কিছু মাস আগের কথা। মিউজিয়ামের ঢিলেঢালা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করার জন্য, এক ফরাসি সাংবাদিক ল্যুভর মিউজিয়ামের মমির ঢাকনার মধ্যে সারারাত লুকিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন,কীভাবে অতি সহজেই যে কোনও ক্যানভাস খুলে নেওয়া যায়। তারপরেও সাবধান হননি ল্যুভর মিউজিয়াম কতৃপক্ষ।

    প্যারিস জার্নালের অফিসে নিজেই এসেছিলেন এক শিল্পচোর

    দিনের পর দিন চলে যাচ্ছিল। চুরির কোনও সূত্র মিলছিল না। ফরাসি গোয়েন্দারা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। মোনালিসা চুরি যাওয়ার ৮ দিন পর, ২৯ আগস্ট ,’প্যারিস জার্নাল’ পত্রিকার অফিসে এসেছিলেন এক যুবক। তাঁর নাম জোসেফ গেরি পিয়েরেট। পিয়েরেট নিজেই স্বীকার জানিয়েছিলেন, ল্যুভর মিউজিয়াম থেকে আইবেরিয়ান আর্ট ওয়ার্ক চুরি করা তাঁর নেশা। প্রমাণ হিসেবে যিশুর জন্মেরও আগে তৈরি একটা ছোট মূর্তি সাংবাদিকদের দেখিয়েছিলেন পিয়েরেট। যেটিকে পরে ল্যুভর মিউজিয়ামের কিউরেটর চিনতে পেরেছিলেন।

    ‘প্যারিস জার্নাল’ পত্রিকার সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, পিয়েরেট নিজে মোনালিসা চুরি করেছেন কিনা। কিন্তু পিয়েরেট জানিয়েছিলেন, তিনি চুরি করেননি। তবে পিয়ারেট জানিয়েছিলেন, ল্যুভর থেকে চুরি করা কিছু মূর্তি, তিনি প্যারিসের এক বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর কাছে বিক্রি করেছিলেন। সেই চিত্রশিল্পীর আইবেরিয়ান আর্ট ওয়ার্ক সংগ্রহের নেশা ছিল।সেই বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর নাম গোপন করে প্যারিস জার্নালে ছাপা হয়েছিল, পিয়েরেটের এই স্বীকারোক্তি। ফরাসী পুলিশের সন্দেহ গিয়েছিল কবি অ্যাপোলিনেয়ারের দিকে। কারণ শিল্পচোর জোসেফ গেরি পিয়েরেট ছিলেন এই অ্যাপোলিনেয়ারের প্রাক্তন সেক্রেটারি। আর কবি অ্যাপোলিনেয়ার ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন ,বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো।

    কবি অ্যাপোলিনেয়ার।
    পুলিশের সন্দেহ গিয়েছিল পাবলো পিকাসোর দিকেও

    কারণ পিয়েরেট তার স্বীকারোক্তিতে বলেছিলেন, পিকাসো তাঁর প্যারিসের অ্যাপার্টমেন্টের আলমারির মধ্যে চুরি করা আইবেরিয় স্ট্যাচু রাখতেন। পরে প্রমাণিত হয়েছিল ঘটনাটি সত্যি। যদিও পিকাসো এবং অ্যাপোলিনেয়ার পুলিশকে বলেছিলেন, তাঁরা জানতেন না স্ট্যাচুগুলি কোথা থেকে আনা হয়েছিল।

    কিন্তু পুলিশের খানাতল্লাসিতে পিকাসোর বাড়ি থেকে মেলা স্ট্যাচু্গুলির নীচে লেখা ছিলো PROPERTY OF THE MUSÉE DU LOUVRE। এর অর্থ পিকাসো এবং অ্যাপোলিনেয়ার , দুজনেই জানতেন স্ট্যাচুগুলির মালিক ল্যুভর মিউজিয়াম। কিন্তু পুলিশ পড়েছিল সমস্যায়, পিকাসো বা অ্যপোলিনেয়ার সরাসরি মোনালিসা চুরিতে যুক্ত নন। তল্লাসি চালিয়ে কবি অ্যাপলিনেয়ারের ঘর থেকে কিছুই তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু দুজনকে নির্দোষও বলতে পারছিল না পুলিশ।

    সন্দেহের জালে পাবলো পিকাসো।
     শুরু হয়েছিল প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা

    ৫ সেপ্টেম্বরের,১৯১১। ঘড়ির কাঁটা তখন মধ্যরাত ছুঁয়েছে। প্রমাণ লোপাটের জন্য এইটাই সঠিক সময়। তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে জেনে পিকাসো ও অ্যাপোলিনেয়ারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁদের কাছে থাকা আরও কিছু চোরাই স্ট্যাচু প্যারিস জার্নালকে ফেরত দিয়ে দেবেন। সেই মতো, আইবেরিয় স্ট্যাচুগুলি পুরোনো একটি সুটকেসে ভরে নিয়ে পিকাসো এবং অ্যাপোলিনেয়ার, পিকাসোর স্টুডিও থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

    গাড়িতে করে চোরাই মাল নিয়ে যাওয়া উপায় ছিল না, রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ গাড়ি থামিয়ে তল্লাসী করছিল। তার চেয়ে পায়ে হাঁটা অনেক নিরাপদ। প্যারিসের মন্টমার্তে এলাকার পাহাড়ি ঢাল দিয়ে রাতের আঁধারে হাঁটতে শুরু করেছিলেন দু’জনে। ‘সেইন’ নদীর ধারে তখন গ্যাসের বাতি জ্বলছিল। নদীপথই ভরসা। নৌকায় নদী পেরিয়ে প্যারিস জার্নালকে পিকাসো ফেরত দিয়েছিলেন আইবেরিয় স্ট্যাচুগুলি।

    তবুও কাঠগোড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল পিকাসো ও  অ্যাপলিনেয়ারকে

    কারণ কবি অ্যাপলিনেয়ার বন্ধু পিকাসোকে গোপনে বলেছিলেন, তাঁর কাছে মোনালিসার ছবিটি রয়েছে এবং তিনি  সেটি বিক্রি করবেন। পিকাসো ছবিটি কিনে নিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল, পিকাসোর কেনা মোনালিসার ছবিটি ছিল নকল। পুলিশ তাঁদের মোনালিসা চুরির দায় থেকে মুক্তি দিলেও, চোরাই মূর্তি কেনার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

    অ্যাপোলিনেয়ার আদালতে স্বীকার করেছিলেন, তিনিই পিয়েরেটের কাছ থেকে চোরাই মূর্তিগুলি কিনেছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি আর পিকাসো, দুজনে মিলে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেছিলেন। পিকাসো আদালতের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছিলেন, তিনি কবি অ্যাপলিনেয়ারকে চেনেন না। বিচারের নামে সেদিন প্রহসন হয়েছিল। বিচারক হেনরি ড্রায়ক্স মামলা খারিজ করে দিয়েছিলেন। স্ট্যাচু চুরির দায় থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন পিকাসো এবং অ্যাপোলিনেয়ার।

    ইতালিতে পাওয়া গিয়েছিল আসল মোনালিসাকে।
    খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল আসল মোনালিসা

    মোনালিসা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে, একথা যখন সবাই প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন। তখনই পাওয়া গিয়েছিল মোনালিসার সন্ধান। ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসে, ইতালির আর্ট ডিলার আলফ্রোডা গেরি গোপন সূত্রে মোনালিসা কেনার একটি প্রস্তাব পেয়েছিলেন। তিনি তাঁর বন্ধু, ইতালির ‘উফিজি’ গ্যালারির কিউরেটর জিওভানি পোগিকে কথাটা জানিয়েছিলেন। তাঁরা যোগাযোগ করেছিলেন প্যারিসের সেই সোর্সের সঙ্গে। সোর্স ছিলেন ইতালির লোক। নাম ভিনসেনজো পেরুগিয়া। তিনি নিজেও  ছিলেন একজন নামী চিত্রশিল্পী।

    আলফ্রোডা গেরি ও জিওভানি পোগিকে তাঁর বাড়িতে ডেকে খাটের নিচ থেকে মোনালিসার আসল ছবিটি বের করে দেখিয়েছিলেন ভিনসেনজো। জানিয়েছিলেন, ৫ লাখ লিরা পেলে মোনালিসাকে বিক্রি করে দেবেন। ভিনসেনজোর কাছে আসল মোনালিসাকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়াম কতৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছিলেন আর্ট ডিলার গেরি।

    মোনালিসা চুরি করেছিলেন এই ভিনসেনজো পেরুগিয়া।

    আসল মোনালিসা সমেত ধরা পড়ে গিয়েছিলেন ভিনসেনজো। জানা গিয়েছিল, ল্যুভর মিউজিয়ামেরই কর্মচারী ছিলেন চোর ভিনসেনজো। ১৯১১ সালের ২০ শে আগস্ট, কাজের শেষে, তিনি মিউজিয়ামের ভেতর ঝাড়ু রাখার আলমারিতে লুকিয়ে পড়েছিলেন। ২১ আগস্ট ভোরবেলা মোনালিসাকে তাঁর কোটের নীচে লুকিয়ে মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।

    আদালতে ভিনসেনজো জানিয়েছিলেন, যেহেতু ভিঞ্চি ইতালির নাগরিক ছিলেন, তাই মোনালিসা ইতালির সম্পত্তি, ফ্রান্সের নয়। ভিনসেনজোর স্বপ্ন ছিল ইতালির সম্পত্তিকে ইতালিতে পাঠানো। তাই তিনি মোনালিসাকে চুরি করেছিলেন। ইতালির আদালতে ভিনসেনজোর মামলা চলতে থাকে। বিচারে এক বছরের জেল হয় ভিনসেনজোর। ইতালির উফিজি গ্যালারিতে দুই সপ্তাহ প্রদর্শিত হওয়ার পর, ১৯১৩ সালেই ফ্রান্সকে ইতালি ফিরিয়ে দিয়েছিল মোনালিসা। ইতালিতে ‘জাতীয় বীর’ হয়ে গিয়েছিলন মোনালিসা চুরির আসল নায়ক ভিনসেনজো পেরুগিয়া। 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More