শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

দিল্লির গ্রাম অথবা গ্রামীণ দিল্লি      

 অমিতাভ রায়       

দিল্লি। দেশের রাজধানী। প্রায় পনেরোশো বর্গকিলোমিটার আয়তনের নগর-রাজ্য। প্রায় দু’ কোটি মানুষের বসবাস। দিল্লি থেকে নির্বাচিত হন লোকসভার সাতজন সদস্য। দিল্লি বিধানসভার ষাটজন বিধায়ক নির্বাচন করেন দেশের রাজ্যসভার তিনজন সাংসদ। আর জনজীবনের প্রতিদিনের পরিষেবার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে তিনটি পুরসভা।

এছাড়াও দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র পরিচালনার জন্য দিল্লির প্রায় মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত একচল্লিশ বর্গকিলোমিটার আয়তনের অভিজাত এলাকার দেখভাল করে নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল। ফৌজি এলাকার দপ্তর-আবাসন-সড়ক থেকে শুরু করে যাবতীয় পরিষেবার প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলায় দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড।

সবমিলিয়ে সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক রীতিনীতির কঠোর নিয়মের নিগড়ে দিল্লি একশো শতাংশ নগর। তবুও এই শহরে সাড়ে তিনশোরও বেশি জনপদ, রীতিমতো সরকারি নথি অনুসারে পঞ্জিভুক্ত হয়ে গ্রাম হিসেবে আজও বর্তমান। দিল্লি সরকারের আরবান শেল্টার ইমপ্রুভমেন্ট বোর্ড স্বীকৃত পৌনে সাতশো ঝুপড়ি-ঝুগগি তো ভিন্ন বিষয়। আর দিল্লির একান্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য লাল ডোরা এলাকাও নয়, নগর-রাজ্যের এগারোটি জেলায় ছড়িয়ে আছে এইসব গ্রাম।

হাউজ খাস    

নগর-রাজ্য দিল্লির গ্রামগুলো কিন্তু আক্ষরিক অর্থে রাজধানীর বাইরে অবস্থিত নয়। অতি সমৃদ্ধ এলাকার পাশেই গ্রামের অবস্থান অন্য কোনও শহরে দুর্লভ। গ্রেটার কৈলাশ, ইস্ট অফ কৈলাশ আর কৈলাশ কলোনির মতো এলাকা যেখানে বিত্তবানদের বসবাস তাদের প্রতিবেশী জমরুদপুর গাঁও। চিরাগ দিল্লি, মসজিদ মঠ বা শাহপুর জাট-এর মতো পরিচিত সুসজ্জিত মহল্লাও কিন্তু সরকারের নথিতে গ্রাম। এমনকি অভিজাত হাউজ খাস এলাকাও সরকারি দলিলে গ্রাম হিসেবে স্বীকৃত। এইরকম আরও অনেক উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে দিল্লিতে গ্রাম আর শহর মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

সাবেক মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন অফ দিল্লি সংক্ষেপে এমসিডি যা এখন তিনভাগে বিভক্ত হয়ে উত্তর, দক্ষিণ এবং পূর্ব মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন নামে পরিচিত, পুরো নগর-রাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করে বলে অভিজাত আর আটপৌরে এলাকার মধ্যে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বন্টনের বিষয়ে তারতম্য করা কঠিন। তবে নগর প্রশাসনের পরিষেবা প্রদানের প্রসঙ্গে দুটি মত আছে। সাধারণভাবে সমৃদ্ধ বলে পরিচিত এলাকায় যেসব গ্রামীণ মহল্লা রয়েছে তাদের ওপর প্রশাসনের একটু বাড়তি নজর রাখতে হয়। ঝকঝকে পাড়ার পাশে নিষ্প্রভ গ্রাম মোটেই মানানসই নয়। অন্য মতে যেসব ওয়ার্ডে গ্রামের সংখ্যা বেশি এবং তুলনামূলকভাবে নিম্নবিত্ত মানুষের আধিক্য সেইসব এলাকার জন্য বাজেট বরাদ্দ কম। কাগজেকলমে মাঝেমধ্যে এইসব মতামত নিয়ে মাতামাতি হলেও বাসিন্দাদের মধ্যে কোনও তাপ উত্তাপ নেই। দিনের শেষে বাড়িতে বসে ডাল-রুটি খাওয়া যাবে কিনা তাই নিয়ে চিন্তা করতে করতে যে তাদের দিন কাটে।

জমরুদপুর

হাতেগোনা গুটিকয় বাদ দিলে অন্যান্য গ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত। কে-কবে-কেন দিল্লি এসেছেন অথবা তাঁর পূর্বসূরী এসেছিলেন তার হদিশ পাওয়া মুশকিল। তবে কথায় কথায় সকলেই জানাবেন তাঁদের একটা গাঁও আছে। সেই গাঁও কোথায় বা সেখানে কীভাবে যেতে হয় তার খবর অনেকেরই হয়তো অজানা। আবার অনেকেই আছেন যাঁরা নিজের নিজের উৎসবের সময় আর ভোটের মরশুমে বাক্স-প্যাটরা গুছিয়ে সপরিবারে ও সদলবলে ট্রেনে চড়েন। ফলে এই গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছে মিশ্র সমাজ-সংস্কৃতি। পেশাগত জীবনে কে কোন কাজে যুক্ত, ব্যক্তি জীবনে কে কোন ধর্মের অনুসারী, কার কী খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি বিষয়ে এইসব গ্রামের বাসিন্দারা আদৌ চিন্তিত নন। ফলে শিকড় ভিন্ন হলেও এই গ্রামগুলোয় বিরাজ করে দিল্লির শহুরে জীবন। কোনওক্রমে দিল্লির ঠিকানা বজায় রেখে কোনওরকমে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য এইসব শহুরে গ্রামে বসবাস। আরও একটি বিষয় খেয়াল করলেই নজরে আসে।    দীর্ঘদিন, হয়তো একাধিক প্রজন্ম একটানা শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় শিকড়ভূমে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছেটাই বোধ হয় চলে যায়। ব্যতিক্রমী গ্রামগুলোর চরিত্র, যা সংখ্যায় খুবই কম কিন্তু একেবারেই

কারালা                      চিত্রগ্রাহক: দেবেনদার কুমার চিকারা

অন্যরকম। এখানকার বাসিন্দারা কতযুগ এবং কত প্রজন্ম ধরে এই গ্রামগুলোতে বসবাস করে চলেছেন তার কোনও হিসেব নিকেশ নেই। দিল্লির বেশিরভাগ গ্রামের বাসিন্দাদের মতো এঁদের কোনও তথাকথিত গাঁও নেই। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িতে বসবাস। প্রয়োজনে বাড়ির পরিসর বেড়েছে। আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে বাড়ির চেহারায় লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রায় সব বাড়িতেই রয়েছে গোরু বা মহিষ। আর আশপাশের এলাকায় রয়েছে অল্পবিস্তর চাষের জমি। অনেক বাড়ির আঙিনায় হয় মরশুমি শাক-সবজির চাষ। ফলে আর্থিক অনটন কম। তার উপরে গড়ে প্রায় প্রতি পরিবারের এক বা দুজন সদস্য হয় ফৌজি বা দিল্লি পুলিশের কর্মী। অন্ততপক্ষে দিল্লি পরিবহণ নিগম বা ডিটিসি কিংবা ডিডিএ অর্থাৎ দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কোনও না কোনও পদে কর্মরত। পরিবারের অন্তত একজনের গলায় অশোকস্তম্ভ ছাপ মারা একটা পরিচয়পত্র না ঝুললে সমাজে যে মান রাখাই দায়। এইরকম একটি গ্রামের নাম কারালা। ঘটনাচক্রে এটাই নাকি দিল্লির সবচেয়ে বড় গ্রাম। অবশ্যই জনসংখ্যার নিরিখে। জনসংখ্যা পঁয়ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। উত্তর দিল্লি নগর নিগমের ঊনত্রিশ নম্বর ওয়ার্ড। ডাকঘরের নিরিখে : দিল্লি একাশি।

জৌন্তি                               চিত্রগ্রাহক: দেবেনদার কুমার চিকারা

এখনকার দিল্লির জীবনরেখা বলে পরিচিত মেট্রো-র লাল লাইন ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলে প্রান্তিক স্টেশন রিঠালা। রিঠালা থেকে কারালা মাত্র দশ কিলোমিটার। রিঠালা থেকে ডিটিসি বা দিল্লি ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের অন্তত ন’-দশটি রুটের বাসের যে কোনও একটিতে চড়লে নিশ্চিত নিরাপত্তায় কারালা পৌঁছে যাওয়া যায়। এছাড়া রয়েছে অটো, ই-রিকশা ইত্যাদি।

বাহ্যিকভাবে কারালা গ্রাম হলেও এখানে রয়েছে একটি ফুটবল খেলার মাঠ। মাঠ ঘিরে গড়ে উঠেছে স্টেডিয়াম। এমন গ্রাম আর কোথায় আছে? কারালা গ্রামের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে শহীদ ভগৎ সিং পার্ক। পাশেই বাজার পান্না। এখানে আছে সংস্কৃত কলেজ আর সংস্কৃত পাঠশালা। কারালা গ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য হল একটি বিশাল জলাধার। রীতিমতো কলকাতার টালা ট্যাঙ্কের ছোট সংস্করণ। বেশিরভাগ বাড়িই একতলা। তিনদিকে ঘর। ঘরের লাগোয়া টানা বারান্দা পেরোলেই বাড়ির মাঝখানে উঠোন। উঠোনের অন্য প্রান্তে রান্নাঘর, স্নানাগার, শৌচাগার ইত্যাদি। ছাদে ওঠার সিঁড়িও আছে। দিল্লি জল বোর্ডের জল নিয়মিত আসে। এরপরও বাড়ির সামনের রাস্তায় অনেকসময়ই কাপড় শুকোয় বা দড়ির খাটিয়া পাতা থাকে। শিবমন্দির, কৃষ্ণমন্দির, মসজিদের এখানে সহাবস্থান। কোনও বিবাদ নেই। এককথায় কারালা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম।

লাডপুর                     চিত্রগ্রাহক: দেবেনদার কুমার চিকারা             

শহরের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কারালা গ্রামে বিরাজ করে উত্তর ভারতের চিরায়ত গ্রামীণ জীবন। ভোরবেলা থেকে ক্ষেত-জমির কাজকর্ম সেরে তাড়াহুড়ো করে মাথায় দু’ বালতি জল ঢেলে গরম গরম রুটি-সবজি চিবিয়ে বাইক ছুটিয়ে কর্মস্থলের দিকে রওনা দেয় বাড়ির পুরুষ সদস্যরা। তবে বেরোনোর আগে কাঁধের বা পিঠের ঝোলায় কাগজে প্যাঁচানো চার-পাঁচটা রুটির মোড়ক ভরে নিতে ভুল হয় না। মধ্যাহ্নভোজ করতে হবে তো। কাজের জায়গার আশপাশের কোনও ধাবা থেকে এক বাটি ডাল বা সবজি কিনে নিলেই নিশ্চিত উদরপূর্তি। গ্রামের মহিলারা অবিশ্যি বাসেই স্বচ্ছন্দে যাতায়াতে অভ্যস্ত। বিশেষ করে মেট্রোর ভাড়া যেভাবে বেড়ে চলেছে তার থেকে ডিটিসি-র টিকিট অনেক সস্তা। ডিটিসি বাসে মেয়েদের আর টিকিট কাটতে হচ্ছে না বলে মহিলাদের বাস-প্রীতি নাকি অনেক বেড়ে গেছে।  স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও সাতসকালে বেরিয়ে যায়। তাদেরও ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে যাবে। আর রইল যারা আপন ঘরে, তাদের জন্য রইল পড়ে দীর্ঘ শান্ত দিন। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, এই নিয়মই ভরসা।        বাড়িতে থাকা মহিলারা আস্তে-ধীরে শুরু করেন তাঁদের গার্হস্থ্য নিত্যকর্ম। বয়স্করা বাড়ির চবুতরা অথবা বাড়ির সামনের রাস্তায় খাটিয়া পেতে সমবয়সীদের সঙ্গে শুরু করেন বিশ্ৰম্ভালাপ। গরমের দিনে রাস্তার ধারের কোনও গাছের তলায় খাটিয়া টেনে ছায়ায় ছায়ায় চলতে থাকে নানানরকমের গালগল্প। হুঁকো-বিড়ি-সিগারেট সবই হাতের কাছে মজুত থাকে। মাঝেমধ্যে বাড়ির ভেতর থেকে চলে আসে গরম চা অথবা শরবত। মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন হওয়া পর্যন্ত চলে এই আড্ডার আসর। বিকেলে বা সন্ধ্যায় বাজার পান্না এলাকায় পায়চারি করে কেউ হয়তো মন্দিরে গেলেন অন্য কেউ মসজিদের দিকে রওনা দিলেন।

আঁধার ঘনিয়ে আসার আগে-পরে শুরু হয় ঘরে ফেরার পালা। ঘরে ঘরে টিভির সামনে সকলেই হাজির। অল্পবয়সিরা হয়তো গুলতানি করতে বাজার পান্নার দিকে রওনা দিল। কারও পথ হয়তো বেঁকে গেল দারুর ঠেকে।

পাঞ্জাব খোর                        চিত্রগ্রাহক: দেবেনদার কুমার চিকারা  

আধুনিকতার আকর্ষণে এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার জন্য ইদানিং অনেক বাড়িই দোতলা হয়েছে। বেশ কিছু তিনতলা বাড়িও নজরে আসে। চূড়ান্ত বিচারে এখানে বিরাজ করে উত্তর ভারতের ধারাবাহিক পরম্পরা মেনে চলা সাদামাটা জীবনযাপন প্রক্রিয়া।                         কারালা ছাড়িয়ে আরও পশ্চিমে এগোলে প্রথমেই আসবে কান্ঝাওয়ালা। এই গ্রামের চরিত্র এককথায় অনবদ্য। উত্তর-পশ্চিম দিল্লি জেলার অন্যতম মহকুমা সদর কান্ঝাওয়ালা গ্রামেই অবস্থিত। আশপাশের আঠারোটি গ্রামের জমি-বাড়ির কেনা-বেচা হোক বা জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন করার জন্য মহকুমা সদর কান্ঝাওয়ালায় হাজির হতেই হবে। মাত্র হাজার দশেক জনসংখ্যার এই গ্রামে রয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, মহকুমা বিচারকের আদালত এবং অবশ্যই জমি-বাড়ি কেনা-বেচার দপ্তর বা রাজস্ব আদালত। দেশের অন্য কোথাও কোনও গ্রামে মহকুমা সদরের অস্তিত্ব আছে কি?

কান্ঝাওয়ালা থেকেই স্থানীয় ভাষা হঠাৎ করেই হিন্দির বদলে হরিয়ানভি হয়ে ওঠে। হরিয়ানা অবিশ্যি খুব বেশি দূরে নয়। কান্ঝাওয়ালা পেরিয়ে একে একে লাডপুর, জৌন্তি, টটেসর, পাঞ্জাব খোর গ্রাম ছাড়িয়ে আরও একটু পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলেই এসে যাবে ঔচন্দি গ্রাম। আর গ্রামের শেষেই শুরু হয়েছে অন্য রাজ্য হরিয়ানা। তবে বাস্তবে কান্ঝাওয়ালা থেকেই শুরু হয়েছে জাটভূমি।

সবমিলিয়ে একেবারে অন্যরকমের শহুরে গ্রাম যা নগর নিগমের পরিষেবার আওতাধীন, তার পরিচয় পেতে হলে কারালা থেকে শুরু করে কান্ঝাওয়ালা হয়ে একে একে লাডপুর, জৌন্তি, টটেসর, পাঞ্জাব খোর ছাড়িয়ে ঔচন্দি সীমান্ত পর্যন্ত পরিক্রমা করতেই হবে। অন্যথায় বাদ পড়ে যাবে চেনা-জানা শহুরে দিল্লির অন্দরে প্রকাশ্যে লুকিয়ে থাকা অন্য অভিজ্ঞতা।

লেখক ভারত সরকার ও আফগানিস্তান সরকারের প্রাক্তন পরিকল্পনা উপদেষ্টা

পড়ুন ‘দ্য ওয়াল’ পুজো ম্যাগাজিন ২০১৯–এ প্রকাশিত গল্প

প্রতিফলন

Comments are closed.