রবিবার, অক্টোবর ২০

ট্রিসটান ডা কুনহা, পৃথিবীর প্রত্যন্ত দ্বীপ, যেখানে বাস করে আধুনিক মানুষ

রূপাঞ্জন গোস্বামী

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে দূরত্ব ২৪৩২ কিমি, সেন্ট হেলেনা থেকে দূরত্ব ২১৬১ কিমি ও ফকল্যান্ড দীপপুঞ্জ থেকে ৩৪৮৬ কিমি। হ্যাঁ, পৃথিবী স্থলভাগ থেকে এতটাই দূরে আছে ছোট্ট এক মানববসতি ট্রিসটান ডা কুনহা। পৃথিবীর সবচেয়ে দূর্গম টুরিস্ট স্পট। এখানে পৌঁছনো যতটা কঠিন, টিকে থাকাও ঠিক ততটাই কঠিন। অথচ প্রকৃতি তার সেরা সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে এখানে।

দক্ষিণ অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের এই ব্রিটিশ কলোনিতে পৌঁছতে গেলে, কেপটাউন থেকে মোটরবোটে লাগে সাতদিন । উত্তাল ও বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে আসতে হবে এই দ্বীপে, কারণ এখানে কোনও বিমানবন্দর বা সমুদ্রবন্দর নেই।

এই দ্বীপে পাবেন না অনান্য পর্যটন কেন্দ্রের পরিষেবা। দ্বীপে একটিও রেস্টুরেন্ট নেই। হোটেল নেই। ক্রেডিট কার্ড চলে না। দোকান নেই, বাজার নেই। আছে কয়েকটা মাত্র হোম-স্টে। একটা কফি-শপ।

ট্রিসটান ডা কুনহা

দ্বীপের ভূগোল

অনেকগুলি দ্বীপের সমষ্টি এই ট্রিসস্টান ডা কুনহা। প্রধান ও সবচেয়ে বড় দ্বীপ ট্রিসটান (৯৮ বর্গ কিলোমিটার)। এখানেই একমাত্র মানুষের বসতি আছে। দ্বীপমালায় আছে গঘ আইল্যান্ড (Gough Island Wildlife Reserve) , নাইটিঙ্গেল আইল্যান্ড, মিডল আইল্যন্ড, স্টোল্টেনহফ আইল্যান্ড

ট্রিসটান ডা কুনহা দ্বীপটির মাঝখানে আছে পিরামিড আকৃতির এক বিশাল আগ্নেয়গিরি। নাম কুইন মেরি পিক (৫৭৬৫ ফুট)। রাজা পঞ্চম জর্জের  স্ত্রীর নামে শৃঙ্গটির নাম দেওয়া হয়। আগ্নেয়গিরিটি এখন শান্ত, তবে জেগে উঠতে পারে যেকোনও সময়ে।

সমুদ্র এখানে উত্তাল। সাঁতারের জন্য একেবারেই সুবিধাজনক নয়। তার ওপর মাসে ১৭ থেকে ২৬ দিনই প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়। শীতকাল এখানে ভয়াবহ। বরফের চাদরে মুড়ে থাকে দ্বীপটি। তাই অনেকের মতে পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের পক্ষে কঠিনতম দ্বীপের নাম ট্রিসস্টান ডা কুনহা

শীতে ট্রিসটান দা কুনহা

 দ্বীপের ইতিহাস

 ১৫০৬ সালে দ্বীপটিকে প্রথম আবিষ্কার করেন পর্তুগিজ অনুসন্ধানকারী ট্রিস্টাও ডা কুনহা। কিন্তু সমুদ্রের ভয়াবহ ঢেউয়ের কারণে দ্বীপে নামতে না পারলেও তাঁর নামেই রাখেন দ্বীপের নাম ট্রিসস্টান ডা কুনহা

 ১৫২০ সালে জলের সন্ধানে দ্বীপের অদূরে এসে দাঁড়ায় পর্তুগিজ জাহাজ লা র‍্যাফায়েল।  জাহাজের ক্যাপ্টেন রুই পেরেরাই প্রথম মানুষ যিনি এই দ্বীপে পা রাখেন।

 ১৬৫৬ সালে দ্বীপের ম্যাপ তৈরি করে  ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ।
● ১৭৬৭ সালে  দ্বীপে পূর্ণাঙ্গ জরিপ চালায় ফরাসিরা।
  ১৭৯৩ সালে প্রথম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালান বিখ্যাত ফরাসি প্রকৃতিবিদ অবার্ট ডু পেটিট

দ্বীপটি খুঁজে পান ভূপর্যটক ট্রিস্টাও ডা কুনহা

শুরু হয় দ্বীপ দখলের লড়াই

১৭৭৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, পূর্ব আফ্রিকা ও ভারতে যাওয়ার পথে  ইম্পিরিয়াল এশিয়াটিক কোম্পানির দুই জাহাজ এই দ্বীপে ব্রিটিশ পতাকা উড়িয়ে দেয়। ট্রিসটান ডা কুনহার নাম পালটে নতুন নাম হয়  Isles de Brabant

১৮১০ সালের ডিসেম্বরে পর্তুগিজ, ফরাসি, ইংরেজদের সঙ্গে দ্বীপ দখলের লড়াইয়ে নামে আমেরিকাও। তিন পরিচারককে নিয়ে পাকাপাকি ভাবে এই দ্বীপে বাস করতে আসেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের বাসিন্দা জোনাথন ল্যাম্বার্ট।

দ্বীপে এসেই এই দ্বীপমালাকে তাঁর সম্পত্তি বলে ঘোষণা করেন ল্যাম্বার্ট। নাম দেন  Islands of Refreshment। কিন্তু দু”বছরের মধ্যে তিনজনই মারা যান। একজন কোনওমতে বেঁচে থাকেন চাষ করে।

১৮১৬ সালের ১৪ আগষ্ট, ব্রিটিশরা সুরক্ষার জন্য দ্বীপটিকে দক্ষিণ আফ্রিকার  Cape Colony হিসেবে ঘোষণা করে। যাতে আবার কেউ দাবি করে না বসে। এবং নেপোলিয়ন সেন্ট হেলেনার নির্বাসন থেকে পালিয়ে ওখানে ঘাঁটি গেড়ে না বসেন। এরপর ব্রিটিশ নৌসেনার দখলে থাকে দ্বীপটি।

  দ্বীপে লোক বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে

১৮২৫ সালে ২৪ জন পুরুষ ও তিনজন নারী দ্বীপটিতে বাস করতেন বলে জানা যায় ।
১৮৭৫ সালে দ্বীপে বাস করতেন পনেরোটি পরিবারের ৮৬ জন নরনারী ও শিশু।

১৯০৭ সালে , দ্বীপের চরম আবহাওয়ার কথা বিচার করে ব্রিটিশ সরকার দ্বীপ খালি করার নির্দেশ দেয়। দ্বীপের বাসিন্দারা সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা দ্বীপ ছেড়ে যাবেন না। সমস্ত সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় রাজপরিবার। সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন দ্বীপবাসীরা।

১৯০৯ সাল থেকে দ্বীপে জাহাজ যাওয়া বন্ধ রাখে ব্রিটিশরা। কিন্তু  ১৯৩৬ সালে জান যায় দ্বীপে আছেন ১৬৭ মানুষ  ১৬৫ টি গবাদি পশু ও ৪২ ঘোড়া। রাজপরিবারের হুমকির ফলে জনসংখ্যা না কমে বেড়ে গেছে।

১৯১০ সালে তোলা ছবিতে দ্বীপবাসীরা

 আতঙ্কের দ্বীপ ট্রিসটান ডা কুনহা

●  ১৯৬১ সালের ১০ অক্টোবর, জেগে ওঠে কুইন মেরি আগ্নেয়গিরি। শুরু হয় অগ্ন্যুৎপাত। ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে ধস নামে দ্বীপে। দ্বীপবাসীরা বোটে চড়ে কেপটাউন হয়ে ইংল্যান্ড চলে যান। কিন্তু ইংল্যান্ডের কর্মব্যস্ত জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে মাত্র দু’বছরের মধ্যেই ফিরে আসেন দ্বীপে।

১৯৬১ সালে জেগে উঠেছিল আগ্নেয়গিরি

● ২০০১ সালের  ২৩ মে, দ্বীপের ইতিহাসের ভয়াবহ সাইক্লোনটি আসে। গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৯০ কিমি। অনেক বাড়ি বিদ্ধস্ত হয়। প্রচুর গবাদি পশু মারা যায়। ব্রিটিশ সরকার ত্রাণ পাঠায়।
২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, আগুনে পুড়ে যায় দ্বীপের চারটে জেনারেটর ও  মাছ ক্যানবন্দি করার একমাত্র কারখানাটি।
২০১১ সালের ১৬ মার্চ , অলিভা নাইটিঙ্গেল নামে এক জাহাজ দ্বীপের কাছে কয়েক শো টন তেল সমুদ্রে ফেলে দেয়।  rockhopper পেঙ্গুইনদের জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা। পেঙ্গুইনদের প্রাণে বাঁচাতে নেমে পড়েন দ্বীপবাসীরা।

 আজকের ট্রিসটান ডা কুনহা

ট্রিসটান দ্বীপের উত্তর দিকে আছে দ্বীপের একমাত্র গ্রাম। ১৮৮৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার দ্বিতীয় পুত্র  ডিউক অফ এডিনবার্গ প্রিন্স আলফ্রেড ট্রিসটান দ্বীপে আসেন। তাঁরই সম্মানার্থে  গ্রামটির নাম রাখা হয়  Edinburgh of the Seven Seas

দ্বীপের একমাত্র গ্রাম Edinburgh of the Seven Seas

২০১৮ সালের জনগণনায় জানা গেছে, ৭০টি পরিবারের ২৬৯ জন মানুষ এখন এই গ্রামে বাস করেন। সবাই ব্রিটিশ নাগরিক। এবং প্রায় সবাই কৃষক। কৃষি ছাড়াও দ্বীপের বাসিন্দারা দ্বীপে আসা পর্যটকদের কাছে বিভিন্ন হস্তশিল্প, সুভেনির বিক্রি করে আয় করেন।

দ্বীপের বর্তমান বাসিন্দাদের একাংশ

১১ কিমি লম্বা এই দ্বীপে আছে একটি  মাত্র রাস্তা। ঝোড়ো সামুদ্রিক বাতাসের ঝাপট খাওয়া রাস্তা। সেই রাস্তায় চলে একটি মাত্র ১৮ সিটের বাস। বুক চিরে যাওয়া রাস্তাটির দুই ধারে বাংলো টাইপের কটেজ। চারদিকে, ভুট্টা, আলুর ক্ষেত। গরু বাছুর চড়ে বেড়ায়।

ট্রিসটান ডা কুনহার একমাত্র রাস্তা

ডিজেল জেনারেটর দিয়ে দ্বীপে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। দ্বীপে আছে একটি মাত্র মুদিখানার দোকান। কয়েক মাস আগে অর্ডার দিলে তবে জিনিস পাবেন। কেননা অর্ডার দেওয়ার পর তবেই সেটা জানানো হবে মাছ ধরার বোটকে। বোট গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে খবর দেবে। অন্য বোট জিনিসপত্র দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে যাবে। বেশিরভাগ সময়েই সমুদ্র উত্তাল থাকায় ডেলিভারি পিছিয়েও যেতে পারে।

দ্বীপে আছে একটি ছোট্ট হাসপাতাল। আছেন একজন ডাক্তারও। কিন্তু রোগ জটিল হলে যেতে হয় সাউথ আফ্রিকা বা ইংল্যান্ডে। দ্বীপটিতে আছে একটা স্কুলও। এই সেন্ট মেরি স্কুলটি খোলা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে।

নেই অনেক কিছুই, আছে উষ্ণ আমন্ত্রণ

২০০১ সাল থেকে বিবিসি এই গ্রামে কয়েকটি রেডিও ও টিভি চ্যানেল লাইভ দেখা ও শোনার সুবিধা দেয়। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ পোস্টাল কোড পায় ট্রিসটান ডা কুনহা। সেটি হল TDCU 1ZZ। দ্বীপে আসে ইন্টারনেটও। এতে অনলাইন কেনা কাটায় সুবিধা হয়। কিন্তু জিনিসপত্র আসে মাছ ধরার বোটে সেই একমাস পর।

এতো বাধা বিপত্তির সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে বলেই হয়ত রহস্যময় কুয়াশা ঢাকা ট্রিসটান ডা কুনহা পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রহস্যময় টুরিস্ট ডেস্টিনেশন। যেখানে মানুষজনের মধ্যে দুশ্চিন্তার লেশ মাত্র নেই। জীবন যেখানে শান্তির।

Comments are closed.