হিমালয়প্রেমী নিকোলাস রোয়েরিক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান পাল

    এক বিশ্ব পথিকের পর্যটন থামিয়েছিল হিমালয় এবং তিনি আমৃত্যু থেকে গেলেন হিমালয়ের কোলে। তিনি কিন্তু পর্বতারোহী নন। তিনি চিত্রকর, দার্শনিক ও লেখক। তিনি নিকোলাস রোয়েরিক এবং তাঁরই মতন সমগুণসম্পন্ন তাঁর স্ত্রী হেলেনা রোয়েরিক হিমালয়কে কেন্দ্র করেই অতিবাহিত করেছেন তাঁদের সিংহভাগ জীবন। রুশ চিত্রকর নিকোলাস কনস্টান্টিনিওভিচ রোয়েরিকের জন্ম ৯ অক্টোবর এবং তাঁর এই জন্মদিনে রং–তুলির অনুষঙ্গের বাইরে গিয়ে স্মরণ করা যাক এক হিমালয়প্রেমীকে।

    রবীন্দ্রনাথ, রাশিয়া ও রোয়েরিক দম্পতি

    রোয়েরিক দম্পতি ছিলেন বুদ্ধ, স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি তীব্র অনুরাগী। ১৯২০ সালের জুন মাসে লন্ডনে রবীন্দ্রনাথকে নিকোলাস তাঁর আঁকা একটি ছবি উপহার দিয়ে কবিকে পড়ে শোনান কবির লেখা একটি কবিতার রুশ ভাষার অনুবাদ– ‘ওগো মা, রাজার দুলাল…।’ দুই বিশ্বজনীনের এবং দুই হিমালয়প্রেমীর সেদিন খুব হৃদ্যতা জমে উঠল। সেদিন হিমালয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনও কথা হয়েছিল কিনা জানা যায়নি কিন্তু এক রাশিয়ান দম্পতির সঙ্গে ভারতীয় কবির সখ্যতা সেদিন স্থাপিত হল ইংল্যান্ডের মাটিতে। স্বদেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে রোয়েরিক দম্পতি তখন ইংল্যান্ডে। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি এক তীব্র অনুরাগ জন্মায় তাঁদের মধ্যে। এই অনুরাগই পরবর্তী সময়ে তাঁদের হিমালয়মুখী করবে।

    রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপের বহু আগেই অবশ্য নিকোলাসের আধ্যাত্মিক খোঁজ তাঁকে আকৃষ্ট করে বিভিন্ন দেশের ধর্মের প্রতি। ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী সৃষ্টিশীল নিকোলাস প্রচলিত ধর্মমতকে অস্বীকার না করেও নিজের মুক্তচিন্তায় ১৯২০ সালেই মাস্টার মোরিয়ার দর্শনের ওপর ভিত্তি করে শুরু করেন ‘অগ্নিযোগ’। এই অগ্নিযোগই তাঁকে নিয়ে আসবে ভারতে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, ‘অগ্নিযোগ’ ব্যাপারটা কী? সর্বধর্মের মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে চলায় বিশ্বাসী নিকোলাসের অগ্নিযোগের ভিত ছিল সব ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে একই সত্যকে খোঁজা।

    অনেকান্তবাদের সহিষ্ণুতা বৃহত্তর কোনও সৃষ্টিতে, যেমন পর্বতে (পড়ুন হিমালয়) খুঁজতেন নিকোলাস। বোধহয় এরকম চিন্তার কারণ ইতিহাসের সেই বিশেষ কাল। সালটা ১৯২০, অর্থাৎ সেই সময় হিটলারের আগ্রাসন নীতি পটভূমি তৈরি করছে আর একটা বিশ্বযুদ্ধের। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বলশেভিকরা রাশিয়া থেকে তাড়িয়েছেন শান্তিপ্রিয় ও সহিষ্ণু রোয়েরিকদের।

    কার্যকারণ তত্ত্বে বিশ্বাসী আধ্যাত্মিক নিকোলাস কি তখন হিমালয়ে খুঁজতে চেয়েছেন শান্তিপূর্ণ আশ্রয়? সেই খোঁজই প্রতিফলিত হয়েছে তার পরবর্তী সৃষ্টি (লেখায় বা চিত্রে), ভ্রমণে এবং যাপনে। খুঁজতে চেয়েছেন ‘সামবালা’ নামে হিমালয়ের কোণে অবস্থিত শান্তিময় স্থানটি যার উল্লেখ আছে হিন্দু বৌদ্ধ ও তিব্বতী ধর্মীয় শাস্ত্রে। ‘সামবালা’ শব্দটির সংস্কৃত অর্থ শান্ত বা শান্তির জায়গা। আর হিন্দুধর্ম অনুযায়ী এই সামবালাতেই জন্ম নেবেন কল্কি অবতার।

    মনে হতেই পারে, নেহাৎ এক চিত্রকরের ১৪৮ বছরের জন্মদিনের লেখা বলে রোয়েরিক সম্পর্কে অহেতুক প্রশংসা করা হচ্ছে। কিন্তু যে মানুষ সত্যি সত্যিই আপাদমস্তক দার্শনিক তাঁর হিমালয় প্রেম নিয়ে লিখতে গেলে বার বার বলতেই হবে তাঁর বহুব্যাপ্ত পড়াশোনার কথা। এখানে আরও বলে রাখা ভালো, যে কোনও শিল্পীকে তাঁর শিল্পের নিরিখে দেখতে চাওয়াটাই শ্রেয়। আর রোয়েরিকের ক্ষেত্রে হিমালয়ই হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্প।

    নিকোলাস ‘সামবালা’র কথা পড়েন প্রাচীন তিব্বতী পুঁথিতে, যেখানে স্থানটি মানসিক শান্তি প্রাপ্তির উপায় অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই মানসিক শান্তি প্রাপ্তির জন্যই আর এক চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যান গঘও প্রচুর পুরনো বই পড়াশোনা করতেন। ভিনসেন্টও বেরিয়ে যেতেন ঘর ছেড়ে শান্তির সন্ধানে, নিকোলাসও বের হলেন, তবে দেশ ছেড়ে এবং সপরিবারে। উদ্দেশ্য ভারত।

    উত্তরবঙ্গ ও সিকিমে নিকোলাস

    সালটা ১৯২৩ এর ডিসেম্বর মাস। রোয়েরিক পরিবার সামবালা রাজত্ব খুঁজতে উপস্থিত হলেন দার্জিলং। দার্জিলিং থেকে নির্দেশহীন ভাঙাচোরা পাথুরে পথে তিব্বত পর্যন্ত রোয়েরিক প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার ঘোরেন। সেই কল্পিত মরমিয়া সামবালার সন্ধান তাঁরা পেয়েছিলেন কিনা তা রোয়েরিক দম্পতি স্পষ্ট করে কোথাও জানাননি। কিন্তু সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন এই দুই দার্শনিক পথিকের সন্ধানে নতুন করে আবিস্কৃত হয়েছিল সিকিম, কালিম্পং ও দার্জিলিং–এর সৌন্দর্য।

    ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের যোগ এবং বিয়োগের যে কথা বলে বৌদ্ধধর্ম, সেই ধর্মের দ্বারা স্বপ্নাবিষ্টের মতো অর্থহীন শূন্যতা নিয়ে নিকোলাস রোয়েরিক দেখলেন পেলিং–এর কাছে তাশিডিং গুম্ফা। সময়টা ১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারি। এই গুম্ফাতেই রোয়েরিকরা অংশ নিলেন বুমচু উৎসবে। এই গুম্ফায় এখনও যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ। এই সময় তাঁকে মুগ্ধ করেছিল হিমালয়ের অপার্থিব সৌন্দর্য, তার নান্দনিক পরিবেশ, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের জীবনযাত্রা।

    এই অভিযানের প্রাক্কালে গগনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ ও তাঁর শিষ্যদের নব্যধারার ভারতীয় চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন নিকোলাস। এবার অভিযান শেষে তিনি দেখলেন সিকিমের স্থানীয় চিত্রকলা। পরিণাম? দার্জিলিঙে এসে শুরু হল তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘ব্যানার্স অফ দ্য ইস্ট’ নামের পাঁচশো’র বেশি ছবি যা হিমালয়কে উপজীব্য করে আঁকা।

    তখনকার কালিম্পং শহরের বিখ্যাত ‘হিমালয়ান’ হোটেলের বারান্দায় বসে নয়নভরে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি এঁকেছিলেন নিকোলাস। তাঁর আঁকা প্রতিটি ছবিতেই ছিল হিমালয়ের পরিবেশে লুকিয়ে থাকা আধ্যাত্মিক খোঁজের সংকেত। পাহাড় পরিবৃত কালিম্পং শহরের তিব্বতীয় জীবন প্রভাবিত করেছিল স্বামী–স্ত্রী দুজনকেই। সেই কারণেই জীবনের অন্তিম পর্বে কালিম্পঙের বিশাল ক্যাম্পাসের বাগানের মাঝে স্কটিশ স্থপতি ওরলিং–এর তৈরি ‘ক্রুকেটে হাউস’–এ সাত বছর কাটিয়ে গেলেন। নিকোলাসের অন্তিম জীবনের কথায় পরে যাওয়া যাবে। আগে তাঁদের সামবালা অনুসন্ধানের অভিযান শেষ করা যাক। এই পরিক্রমা দার্জিলিং থেকে শুরু করে শেষ হয় দার্জিলিঙে এসেই।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকার বিপ্রতীপ রাজনৈতিক আবহে বলশেভিক আন্দোলন বিরোধী রুশ নিকোলাস একজন শিল্পী, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী এবং নৃতাত্বিক হিসেবে দার্জিলিঙে এসে এক শান্তিকামী সাধকরূপে পূর্ণতা পান। শুরু হয়ে যায় তাঁর সমগ্র বিশ্বের শিল্পীদের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনের, কলার আদানপ্রদানের জন্য যোগাযোগ। যেমন, নিউইয়র্কে তাঁর নামাঙ্কিত মিউজিয়ামের ভারতীয় শিল্পকলার একমাত্র উপদেষ্টা হিসেবে পেতে দার্জিলিং থেকেই চিঠি লেখেন অসিত কুমার হালদারকে। নিকোলাস তাঁকে লিখেছেন ‘অদেখা বন্ধু’ বলে।

    রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপের বহু আগেই নিকোলাসের তীব্র ইচ্ছে ছিল ভারত তথা হিমালয় দর্শনের। সেই ইচ্ছাপূরণের সঙ্গে তিনি পেলেন সিকিম, কালিম্পং এবং দার্জিলিঙের মধ্যে কল্পিত ‘সামবালা’র স্বাদ। সেই সামবালা অভিযানের পর বহু স্থানে আরও ঘুরে পথিকদ্বয় তাঁদের ঘর খুঁজে পান কুলুর ‘নগ্গর’ নামে একটি স্থানে।

    জীবনানন্দের ‘পৃথিবীতে নেই কোনও বিশুদ্ধ চাকুরী’র মতোই কোনও এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে একসময় তিনি ঘর ছেড়েছিলেন, আর এভাবেই মানবিকতার ধর্মে বিশ্বাসী নিকোলাস হয়ে উঠলেন বিশ্বজনীন। এবং হিমালয়ের যে দৃ্শ্য তিনি ফুটিয়ে তোলেন একের পর এক ছবিতে তার সঙ্গে আজকের হিমালয়ের কোনও তফাৎ ধরা পড়ে না। তবে হিমালয়ের সান্নিধ্যে দাঁড়ালে কোনও নিকোলাসপ্রেমীর মনে না এসে পারে না, মৃত্যুর আগে নগ্গরে থাকা হিমালয় সান্নিধ্যে নিকোলাসের দিনগুলির কথা, যখন চিত্রশিল্পীর সত্তা ছাড়িয়ে নিকোলাস হয়ে উঠেছিলেন মানবসত্যের সন্ধানে ব্রতী এক দার্শনিক।

    অবশেষে…

    হিমালয়ের কোলে অবস্থিত অখ্যাত মংপু যেমন বিখ্যাত হয়েছিল বিশ্বজনীন রবীন্দ্রনাথের পদস্পর্শে তেমনি হিমালয়ের আর এক ছোট স্থান বিশ্বজনীন দুই প্রতিভার আজীবনের ঘর হয়ে বিখ্যাত হয়ে থাকল। নিবেদিতার মতন নিকোলাস ও হেলেনা এই দুই বিদেশিও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হিমালয়ের কোলে। নগ্গরে তাঁদের বসতবাড়ি খুঁজে পেতে একটু সমস্যাই হয় তবে জাদুঘর বললে সকলেই দেখিয়ে দেয় দু’তলার ছোট্ট সুন্দর বাড়িটি যা ওঁদের স্মৃতি ও কীর্তি ধরে রেখেছে।

    সামবালা অভিযানে পাওয়া বহু বস্তু এবং দর্শন নিয়ে গবেষণার জন্য নিকোলাস নগ্গরে তৈরি করেন ‘উরুষবতী’ নামে একটি সংস্থা। উরুষবতী শব্দের অর্থ ভোরের সূর্যতারা। ভোর থেকেই শুরু হত তাঁদের কাজ। আর সন্ধ্যাবেলা, আকাশে যখন তারারা জেগে উঠত, হিমালয়ের শীতল হৈমন্তিক হাওয়ায় দুই সুন্দর, উজ্জ্বল যোগী বসতেন ধ্যানে। চমৎকার এই বাড়িটি এখনও বেশ সুস্থ এবং বাড়ির অন্যদিকে চোখ ফেরালে এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যায় হিমালয়। ১৯২৮ থেকে ১৯৪৭ নিকোলাস নগ্গরের এই বাড়িটিতে হিমালয়ের সঙ্গে তাঁর আত্মসচেতনায় দিন কাটিয়েছেন।

    বাড়িটি যেন রোয়েরিকের মতন মহামানবকে ধারণ করার অস্পষ্ট এক অহঙ্কার এখনও ধারণ করে আছে কারণ এই বাড়ির পাশেই চিরনিদ্রায় সমাধিতে শায়িত আছেন নিকোলাস রোয়েরিক।

    নগ্গর থেকে এবার চোখ ফেরানো যাক কালিম্পং শহরে, যেখানে ৭৬ বছর বয়েসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হেলেনা।

    ভিতর থেকে কোনও একটা আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজেই ভারতপ্রেমী এই দার্শনিককে আবার নিয়ে এসেছিল কালিম্পঙের ক্রুকেটে হাউসে, যেখানে আজও আছে তাঁদের দুজনের জীবনদর্শনের প্রতীকী বস্তু। ক্রকেটে হাউস বর্তমানে ইটালিয়ান অগ্নিযোগ সংস্থার তত্ত্বাবধানে। সবুজ পরিবেশের মধ্যে বাহুল্য বর্জিত রুশ দার্শনিকের অতি সাধারণ ভাবে জীবনযাপন ও ধ্যানের নিদর্শন এই বাড়িটি।  বোধহয় সেই কারণেই বাড়ির সর্বত্র নিকোলাসের আঁকা হিমালয়ের ছবি ছাড়াও রয়েছে ধ্যানস্থ বুদ্ধের মূর্তি।

    কালিম্পং শহরের বিজন কোণে দূরপীন পাহাড়ে অবস্থিত বাড়িটিতে এখনও বহু দর্শক আসেন বলে জানালেন উরুস্পলভ রাভ যিনি বাড়িটির দায়িত্বে আছেন। কিন্তু তবুও ‘ভিজিটারস বুক’–এ নাম দেখলে নজরে পড়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে ইওরোপিয়ানদের সংখ্যা বেশি। অথচ হেলেনা এই বাড়িতে থাকাকালীন জাতিধর্ম নির্বিশেষে লোক এসেছেন আর রোয়েরিক দম্পতির মনে হয়েছিল কালিম্পং এক বিশ্বজনীন শহরের মতন এক করে নেবে তিব্বতী, গোর্খা বাঙালি, নেপালি এবং অবশ্যই রুশদেরও।

    লেখায় ব্যবহৃত সব চিত্রের শিল্পী নিকোলাস রোয়েরিক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More