‘কী হলে কী হত না’ – একটি কাল্পনিক সম্ভাবনা নিয়ে দু–চার কথা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: জগন্ময় মিত্র, রবীন মজুমদার, সুধীরলাল চক্রবর্তী, সত্য চৌধুরী, বেচু দত্তের ঘেরাটোপ থেকে বাংলা গানের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বয়ান রচনা করেছিলেন একমাত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এ কথাটা বলা শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের হুজুগেও বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। গত শতাব্দীর চারের দশকের শেষের দিকে বাংলা গানের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে ফেলেছেন সলিল চৌধুরী। লিখে ফেলেছেন ‘গাঁয়ের বধূ’, সুরারোপ শেষ। ১৯৪৯ সনে এইচএমভি থেকে ৭৮ আরপিএম–এর রেকর্ড প্রকাশিত হল যার দু’দিকেই বাংলার মন্বন্তরের দু্ঃসহ বর্ণনা। ‘কাহানি মে ছোটাসা ট্যুইস্ট’ এখানেই এমনকী ‘কী হলে কী হত না’র অমীমাংসিত বিতর্কের ক্ষেত্রটিও।

    হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গানটি না গাইলে কী হত আপাতত সেই বিতর্ক এড়িয়ে আমরা পরের গানে যাই। শুধু এটুকু স্মরণযোগ্য ১৯৩৭ থেকে (যদিও হেমন্ত রেডিওতে গাইছেন ১৯৩৫ সাল থেকে) প্রতিবছর প্রকাশিত এইচএমভি রেকর্ডে শিল্পীর গান লিখেছেন অজয় ভটাচার্য, অমিয় বাগচি, সুবোধ পুরকায়স্থ, প্রণব রায়, শৈলেন রায়ের মতো গীতিকাররা এবং সে কথায় প্রথমদিকে সুর দিয়েছেন শিল্পীর ‘মেন্টর’ শৈলেশ দত্তগুপ্ত ও তারপর কমল দাসগুপ্ত, অনুপম ঘটক, সুধীরলাল চক্রবর্তী এবং শিল্পী নিজেও। কিন্তু তেমন আর হল কই?

    হল আবার ১৯৫০ সালে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘অবাক পৃথিবী’ কবিতায় সুর দিলেন সলিল চৌধুরী এবং গাইলেন প্রায় বিকল্পহীন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই একই ডিস্কের উল্টোদিকে ছিল ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে’। ‘কী হলে কী হত না’ এই জটিলতায় প্রবেশ করার কোনও প্রয়োজন নেই, শুধু মনে রাখা দরকার দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র তিন বছর এবং পুরনো এবং নতুন ব্যবস্থার সন্ধিক্ষণে সে এক বড় অস্থির সময়। দেবদাসীয় প্রেমের মধ্যে সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত জীবনের অনেক বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে গানের কথায় একটু বিপন্নতার ব্যাখান, সুরের ভিন্ন ধরনকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন, মনে হচ্ছে এ যেন খুব চেনা বাতাসের কথা। ১৯৫০ সালে গাঁয়ের বধূর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘অনুরূপা রায়’–এর সুর করেন অনুপম ঘটক এবং কণ্ঠ দেন সেই ‘বিকল্পহীন’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। যদিও হালফিলের বাক্য অনুযায়ী গানটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে।

    ১৯৫১ সালে ‘রানার’। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় আবার সলিল–হেমন্ত’র যুগলবন্দি। ‘যুগলবন্দি’ শব্দটা প্রয়োগের সুবিধে হল যে ‘কী হলে কী হত না’র মতো উত্তরহীন বিতর্কটিকে নিরাপদে এড়ানো যায়। এই একই বছরে অবশ্য হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে ‘ধান কাটার গান’, ‘নৌকা বওয়ার গান’ প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু সেই গানের জনপ্রিয়তা প্রায় তিরিশ বছর পর সাধারণ মানুষের কাছে প্রবল হয়েছিল রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতায় বামফ্রন্ট আসার পর।

    ১৯৫২ তে সত্যেন দত্ত’র কবিতা পাল্কির গান। আমরা ইতিমধ্যে ‘যুগলবন্দি’ শব্দটি পেয়ে গেছি। ফলে আপাতত শান্তিকল্যাণ। ১৯৫৩ সালে পরেশ ধরের ‘ফুলের মতো ফুটলো ভোর’ আর ‘শান্ত নদীটির পটে আঁকা ছবিটি’ কী ‘যুগলবন্দি’ শব্দটাকে সামান্য প্রশ্নের মুখে ফেলল? আপাতত আমল দেওয়ার দরকার নেই কারণ ১৯৫৫ সালে ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ এবং ‘পথে এবার নামো সাথী’। ফিরে আসতেই হবে অপ্রতিরোধ্য ‘যুগলবন্দি’তে। কিন্তু…

    কিন্তু ১৯৫৬ সালে বাংলা গানের মঞ্চে প্রবেশ করলেন সুরকার নচিকেতা ঘোষ। শুরু হল এক ত্রয়ীর যাত্রা। গান লিখবেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুর দেবেন নচিকেতা ঘোষ এবং গাইবেন শ্রোতাদের শ্রবণঅভ্যাস বদলে দেওয়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায় যিনি আনুনাসিক কণ্ঠ থেকে বাংলা গানকে পৌঁছে দিয়েছেন ব্যারিটোনের আঙিনায়। ‘অসমাপ্ত’ ছবির ‘কান্দো কেনে মন রে’ দিয়ে শুরু করেই পরের বছর ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’। তারপর? সে তো ইতিহাস! ‘মৌ বনে আজ মৌ জমেছে’ (বন্ধু, ১৯৫৮), ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’, ‘সূর্য ডোবার পালা’, ‘ভাঙরে ভাঙ ভাঙরে পাথর ভাঙ’ (ইন্দ্রানী, ১৯৫৮), ‘কোন পাখি ধরা দিতে চায়’ (১৯৬৩), ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে বললাম’, ‘যদি জানতে চাও’ (১৯৭৩)।

    কিন্তু সমস্যা হল ছোটখাটো সাধারণ বিষয়বস্তু বেশ একটা ছকে বা সারণীতে বেঁধে ফেলা যায়। যখনই মাপটা একটু অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে অন্তত আমাদের চেনাশোনা মাপের বাইরে চলে যায় তখনই দিশেহারা লাগতে থাকে। এই মুহূর্তে স্মৃতিতে হানা দিচ্ছে ‘ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না’ (কথা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), ‘অলির কথা শুনে’ (কথা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), ‘আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি’ (কথা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), ‘তারপর? তার আর পর নেই’, ‘তুমি এলে, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’ (কথা মুকুল দত্ত, সুর নচিকেতা ঘোষ), ‘সবাই চলে গেছে’, ‘এমন একটা ঝড় উঠুক’ (কথা ও সুর অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়), ‘বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা’, ‘কী দেখি পাই না ভাবে গো’ (কথা প্রিয়ব্রত, সুর রতু মুখোপাধ্যায়), বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও (কথা মুকুল দত্ত, সুর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)…। তার মধ্যেই হয়ে গেল সলিল–হেমন্ত’র ধুন্ধুমার ‘পথ হারাবো বলেই এবার’, ‘দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক’, ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’, ‘শোনো কোনও একদিন’, ‘ঠিকানা’ (কবিতা: সুকান্ত ভট্টাচার্য)।

    ‘কী হলে কী হত না’ এই তর্কটার আর কোনও মূল্য নেই এই মুহূর্তে। একটা ছোট্ট গল্প বলে আপাতত এই প্রসঙ্গের ইতি টানা যাক। গত শতকের আটের দশকের শুরুতে সদ্য কৈশোর পেরনো এক তরুণ প্রথম প্রেমের আতিশয্যে উদ্বেল হয়ে নীলচে খামে প্রথম যে চিঠিটা অনেক কসরৎ করে কাঙ্ক্ষিত কিশোরীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল তার মধ্যে ছিল শুধু একটি গান, ‘অনেক অরণ্য পার হয়ে, অনেক দুঃখ সয়ে সয়ে, অনেক আলোর দেখা পেলাম, যখন তোমার কাছে এলাম’। জীবনের বিপর্যস্ত অধ্যায় পার করা দূরে থাক সেই অপরিণত বয়সে বিরূপতাকে তেমন ভাবে দেখাই হয়নি তখনও পর্যন্ত। কিন্তু প্রথম প্রেমে পড়ার ‘অপ্রকৃতিস্থ’ অবস্থায় আর অন্য কিছু লেখার কথা ছেলেটির মনে আসার সুযোগ পায়নি। আশ্রয় নিতে হয়েছিল ১০ বছর আগে প্রকাশিত একটি গানের কাছে। চিঠিটি পেয়ে শিহরিত কিশোরীর কানেও যথারীতি ভেসে এসেছিল অনুরোধের আসরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভরাট গলায় সেই অসামান্য সুরের আবেশ। উত্তরে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে সে শুধু লিখেছিল, ‘তারপর?’

    আজ সেই তরুণ আর তার সেই কিশোরী প্রেমিকা অধুনা স্ত্রী দু’জনেই প্রৌঢ় হয়েছেন। আজও অবসরে কোনও বিনিদ্র রাতে তাঁরা একসঙ্গে নয়, একাকীই শোনেন ‘এই রাত তোমার আমার’।  তাঁদের সন্তান–সন্ততিরা জানে না, তাদের পরিবারটিকে শুধু কণ্ঠ দিয়ে যিনি নির্মাণ করেছেন তিনি শারীরিক ভাবে না থাকলেও শতায়ু হয়েছেন।

    হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আজ শততম বর্ষে পদার্পণ করলেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More