যে বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছিলেন জীবনদায়ী অ্যাসপিরিন, তিনিই বানিয়েছিলেন মারণ ড্রাগ হেরোইন!

মানুষের শারীরিক যন্ত্রণা কমাতেই 'অ্যাসপিরিন' আর 'হেরোইন' আবিস্কার করেছিলেন এই বিজ্ঞানী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    জার্মান শিল্পপতি পরিবারে ১৮৬৮ সালের জন্ম নিয়েছিলেন ফেলিক্স হফম্যান। তাঁর বাবা ব্যবসায়িক ভাবে রসায়নশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাড়িতে বাবার ল্যাবরেটরি ছিল। দিনের শেষে হফম্যানের বাবা ল্যাবরেটরিতে ঢুকে, নানান রায়াসনিক পদার্থের মধ্যে মিশ্রণ ঘটিয়ে কত কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। ছোট্ট ফেলিক্স তাঁর বাবাকে মন দিয়ে দেখত। ছোট থেকেই নতুন কিছু আবিষ্কারের ইচ্ছা ছিল ফেলিক্সের। ঠিক তার বাবারই মতো।

    একটু বড় হওয়ার পর, বিভিন্ন রাসায়নিকের মধ্যে মিশ্রণ ঘটিয়ে বাবাকে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করতেন ফেলিক্স। মিউনিখ ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে ফেলেছিলেন ফেলিক্স হফম্যান। পৈত্রিক ব্যবসা ছিল, তবুও জার্মানির বিভিন্ন ফার্মাসিতে কেমিস্টের কাজ শুরু করেছিলেন। ফেলিক্সকে পেয়ে বসেছিল ওষুধ আবিষ্কারের নেশা। ফেলিক্স সব সময় ভাবতেন, এমন কিছু করে যেতে হবে যাতে মানুষ তাঁকে মৃত্যুর পরও মনে রাখে।

    বিজ্ঞানী ফেলিক্স হফম্যান

    কেমিস্ট্রি ও ফার্মাকোলজিতে ফেলিক্স হফম্যানের ছিল অবিশ্বাস্য দখল। প্রতিভাবান ফেলিক্স, একদিন প্রফেসর অ্যাডলফ ভন বায়ারের চোখে পড়ে গিয়েছিলেন। এই অ্যাডলফ ভন বায়ার পরবর্তীকালে (১৯০৫ সালে) কেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। প্রফেসর বায়ার হফম্যানকে বলেছিলেন বিখ্যাত রঙ প্রস্তুতকারক সংস্থা বায়ার-এ যোগদান করতে। সেটি ছিল প্রফেসর বায়ারের নিজের কোম্পানি।

    ১৮৯৪ সালে হফম্যান বায়ার কোম্পানির ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চ ডিপার্টমেন্টে-এ যোগদান করেছিলেন। হফম্যান ছিলেন একজন উচ্চমানের গবেষক, যিনি প্রাকৃতিক উপাদান থেকে নতুন রাসায়নিক পদার্থ সৃষ্টি করতেন। যেগুলি বায়ারের কোম্পানির ওষুধে ব্যবহৃত হত।

    নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী ডঃ অ্যাডলফ ভন বায়ার।
    আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন জীবনদায়ী অ্যাসপিরিন

    হফম্যানের বাবার তখন বয়েস হয়ে গিয়েছিল। মারাত্মক আর্থ্রাইটিস তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল। হাঁটা চলা প্রায় বন্ধ। যন্ত্রণায় সর্বক্ষণ কাতরাতেন। সেই যুগে পেনকিলার জাতীয় ওষুধ তেমন ছিল না। থাকলেও তার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়ঙ্কর। সারাদিনের কাজের মধ্যেও হফম্যানের মাথায় সব সময় একটা চিন্তা ঘুরত। তাঁর বাবার যন্ত্রণা উপশমের জন্য একটা ওষুধ আবিস্কার করতেই হবে।

    ১৮৩০ সালে বিজ্ঞানীরা উইলো গাছের ছাল থেকে খুঁজে পেয়েছিলেন, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড নামে একটি যন্ত্রণানাশক রাসায়নিক পদার্থ। কিন্তু যন্ত্রণা কমাতে গিয়ে রোগীরা স্যালিসাইলিক অ্যাসিড নিয়মিত খেলে পাকস্থলীতে ভীষণ যন্ত্রণা হত। পাতলা পায়খানা হত। হফম্যান বুঝেছিলেন স্যালিসাইলিক অ্যাসিড তাঁর বাবার পক্ষে নিরাপদ নয়। তাই স্যালিসাইলিক অ্যাসিডের ‘পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া’ দূর করার জন্য দিন রাত এক করে ফেলেছিলেন হফম্যান।

    স্যালিসাইলিক অ্যাসিডকে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ামুক্ত করার একটি উপায়ও বের করে ফেলেছিলেন হফম্যান। এর জন্য তিনি ব্যবহার করেছিলেন অ্যাসিটিক অ্যাসিড। যেটিকে আমরা ভিনিগার নামে চিনি। ১৮৯৭ সালের আগস্ট মাসে, চিকিৎসার পক্ষে নিরাপদ স্যালিসাইলিক অ্যাসিড আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন হফম্যান। নতুন ওষুধটির নাম দিয়েছিলেন ‘অ্যাসিটাইল স্যালিসাইলিক অ্যাসিড’।

    বায়ারের ফার্মাসিউটিকাল ল্যাবরেটারির প্রধান হেনরিক ড্রেসার সেই সময় জ্বর ও গায়ের ব্যাথা নিয়ে ভীষণ ভুগছিলেন। ট্রায়াল দিতে হফম্যানের আবিষ্কার করা নতুন রাসায়নিকটি নিজের শরীরেই প্রবেশ করিয়েছিলেন হেনরিক ড্রেসার। ব্যথা ও জ্বর খুব দ্রুত কমে গিয়েছিল পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়াই। হফম্যানের আবিষ্কার করা ‘অ্যাসিটাইল স্যালিসাইলিক অ্যাসিড’ ওষুধের বাজারে এসে ঝড় তুলেছিল ‘অ্যাসপিরিন’ নাম নিয়ে।

    বায়ার কোম্পানির অ্যাসপিরিন।

    হফম্যানের আবিষ্কার করা ‘অ্যাসপিরিন’ খেয়ে হফম্যানের বাবার যন্ত্রণার উপশম হয়েছিল। অ্যাসপিরিনের সাফল্য, হফম্যানকে বায়ারের ফার্মাসিউটিকাল ডিভিশনের হেড করে দিয়েছিল।  ১৮৯৯ সাল থেকে, বায়ার কোম্পানি পাউডার হিসেবে বোতলে ভরে বিক্রি করা শুরু করেছিল অ্যাসপিরিনকে। ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছিল বায়ার কোম্পানির নাম। বিশ্ববিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল ‘অ্যাসপিরিন’। বিজ্ঞানী হফম্যান ‘অ্যাসপিরিন’ শব্দটির ‘A’ নিয়েছিলেন ‘acetyl’ থেকে এবং ‘spirin’ নিয়েছিলেন ‘Spirea’ নামের আরেকটি গাছ থেকে। যে গাছটি ছিল স্যালিসাইলিক অ্যাসিডের আরেকটি উৎস।

    সেই হফম্যানই আবিষ্কার করেছিলেন মারণ ড্রাগ হেরোইন

    হফম্যানের বন্ধু হেনরিক ড্রেসার কোডেইন (codeine) আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। এই কোডেইন হল আফিম থেকে পাওয়া মরফিন-এর (morphine) একটি রুপ। কোডেইন-এর মধ্যেও যন্ত্রণানাশক ক্ষমতা ছিল। ড্রেসার চেয়েছিলেন, শ্বাসকার্যের ওপর কোডেইন কী প্রভাব ফেলে তা জানতে। তাঁর মনে হয়েছিল শ্বাসকষ্ট ও সর্দিকাশির রোগীদের সাহায্য করতে পারে মরফিন ও কোডেইন। ড্রেসার ‘অ্যাসপিরিন’ তৈরির টেকনোলজি মরফিনের ওপর প্রয়োগ করতে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর বন্ধু হফম্যানকে।

    হফম্যান বন্ধুর কথা রেখেছিলেন। নিজস্ব পদ্ধতিতে মরফিনের সঙ্গে ‘অ্যাসিটাইল’ যৌগের সংশ্লেষ ঘটিয়েছিলেন। তৈরি হয়েছিল ‘অ্যাসিটোমরফিন’ নামে এক রাসায়নিক পদার্থ। যে রাসায়নিকটি আজ দুনিয়া কাঁপানো মারণ ড্রাগ ‘হেরোইন’ নামে কুখ্যাত।  কিন্তু সরকারের কাছ থেকে হেরোইনের পেটেন্ট পায়নি বায়ার কোম্পানি। কারণ হেরোইন ব্যবহারকারীর হেরোইনের ওপর প্রচন্ড আসক্তি জন্মে যায়। তাছাড়া ১৮৭৪ সালে, ইংল্যান্ডের কেমিষ্ট অলডার রাই্ট, মরফিনের সঙ্গে ‘অ্যাসেটিক অ্যানহাইড্রাস’ মিশিয়ে হেরোইনের একদম কাছাকাছি একটি রাসায়নিক যৌগ আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু তখন যৌগটির নাম হেরোইন ছিল না। রাসায়নিক গঠনেও সামান্য পার্থক্য ছিল।

    বায়ার কোম্পানির বিজ্ঞাপনে হেরোইন।

    অ্যাসিটোমরফিন আবিষ্কার ও তার হেরোইন নামটির পিছনে ছিলেন ফেলিক্স হফম্যান। কিন্তু হফম্যান  মারণাস্ত্র তৈরি করতে চাননি। ওষুধ হিসেবেই হেরোইন আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু তিনি বা বায়ার কোম্পানি হেরোইনের মারণ ক্ষমতা আঁচ করতে পারেননি। তাই বায়ার কোম্পানি হেরোইনকে বোতলজাত করে সর্দি-কাশির ওষুধ হিসেবে যথেচ্ছভাবে বিক্রি করতে শুরু করেছিল।

    এছাড়াও, প্রসববেদনা কমানোর ওষুধ হিসেবে, যুদ্ধে গুরুতর আহত সৈন্যদের যন্ত্রণা কমানোর ওষুধ হিসেবে, মানসিক রোগীদের চেতনানাশক হিসেবেও হেরোইনকে তখন বাজারে বিক্রি করা হত। শুনলে অবাক হবেন, শিশুদের সর্দি-কাশিতেও হেরোইন ব্যবহার করা হত।

    বর্তমান যুগের হেরোইন ও অ্যাসপিরিন
    অ্যাসপিরিন আজ জীবন বাঁচায়, হেরোইন জীবন কেড়ে নেয়

    আবিষ্কারের ১২৬ বছর পরেও যন্ত্রণা উপশমে, জ্বর কমাতে, হৃদপিণ্ড ঘটিত সমস্যায় হফম্যানের আবিষ্কার করা ‘অ্যাসপিরিন’ এখনও রমরমিয়ে চলছে। অ্যাসপিরিন শরীরে রক্তজমাট বাঁধার সম্ভাবনা দূর করে। ধমনী অবরুদ্ধ হয়ে প্রাণহানি থেকে রোগীকে রক্ষা করে। এ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে এই অ্যাসপিরিন। আজও বাঁচিয়ে চলেছে।

    অন্যদিকে হেরোইনের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে মহামারীর আকার ধারণ করেছে।  প্রতিবছর গোটা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ লোক মারা যান অতিরিক্ত মাত্রায় হেরোইন সেবনের জন্য।  ফেলিক্স হফম্যান কিন্তু মানুষের শারীরিক যন্ত্রণা কমাতেই ‘অ্যাসপিরিন’ আর ‘হেরোইন’ আবিস্কার করেছিলেন। আমরা হেরোইনকে নেশার কাজে লাগিয়েছি,। এর জন্য দায়ী আমরাই, ফেলিক্স হফম্যানের নন। তাই, বিশ্ববন্দিত ওষুধ ‘অ্যাসপিরিন’ ও বিশ্বনিন্দিত ওষুধ ‘হেরোইন’-এর জনক ফেলিক্স হফম্যান, তাঁর মৃত্যুর পরেও অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেনও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More