রহস্যময় এই ব্রিজ থেকে কেন ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে শয়ে শয়ে কুকুর!

ব্রিজটির কাছে এলেই কিরকম যেন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যায় পোষ্য কুকুরেরা। চেনে বাঁধা না থাকলে, তারা উল্কাগতিতে ব্রিজটির দিকে ছুটে যায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    স্কটল্যান্ডের ডাম্বারটন শহরতলির ঘন সবুজে মোড়া বুকে লুকিয়ে আছে ওভারটন এস্টেট। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। টানা কয়েকদিন বৃষ্টির পর সেদিন একটু রোদ উঠেছিল। ওভারটন এস্টেটকে ঘিরে থাকা গা ছমছমে ঘন জঙ্গলের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে চকচকে রাস্তা। সেই রাস্তায় প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন লোটি ম্যাকিনন। সঙ্গে ছিল তাঁর দুই পোষ্য ডোবারম্যান কলি আর বনি। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা এসে গিয়েছিলেন ওভারটন ব্রিজটির কাছে। ব্রিজটির কাছে পৌঁছাতেই লোটির পোষ্য দুটি কেমন যেন অসংলগ্ন ও অস্বাভাবিক ব্যবহার শুরু করেছিল।

    বনি নামের কুকুরটি একদম পাথরের মূর্তির মত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল। যেন এক অপদেবতা বনির ঘাড়ে চেপেছিল। বনির মধ্যে অদ্ভুত একটা খুনে মেজাজ দেখতে পেয়েছিলেন লোটি। যা আগে কোনওদিন বনির মধ্যে দেখেননি। তীব্রগতিতে দৌড়ে ব্রিজের পাঁচিলের ওপর থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বনি। কিন্তু বনির ভাগ্য ভাল ছিল, তাই বেঁচে গিয়েছিল। যদিও বনির পিছনের পা ভেঙে গিয়েছিল।

    কিন্তু সব কুকুর বনির মত ভাগ্যবান ছিল না

    ডেভিড আর লুই ম্যাকফিল তাঁদের ল্যাব্রাডর সোফিকে নিয়ে ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে একই রাস্তায় হাঁটছিলেন। ওভারটন ব্রিজের কাছে আসতেই, সোফি দৌড়ে ব্রিজের পাঁচিলে উঠে পড়েছিল। ডেভিডরা চিৎকার করে ওঠার আগেই, ব্রিজ থেকে নীচে ঝাঁপ দিয়েছিল দিয়েছিল সোফি। আছড়ে পড়েছিল ব্রিজের নীচের পাথুরে জমিতে। কয়েক মুহূর্তে সব শেষ। সোফির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল ব্রিজের নীচের জঙ্গল থেকে। স্থানীয় গবেষকরা জানিয়েছেন, ১৯৬০ সাল থেকে কমপক্ষে ৫০০ টি কুকুর ওভারটন ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক কুকুরের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। তাই স্থানীয়রা ব্রিজটির নাম দিয়েছে ‘ডগি সুইসাইড ব্রিজ’।

    ওভারটন ব্রিজ।
    রহস্যময় ওভারটন ব্রিজ

    স্কটল্যান্ডের ওয়েস্ট ডাম্বারটনশায়ারের অদূরে অবস্থিত ঘন জঙ্গলে ঘেরা ওভারটন এস্টেট। ১৮৫৯ সালে জেমস হোয়াইট নামে এক ব্যারিস্টার এস্টেটটি কেনেন। এস্টেটটি কেনার তিন বছর পর, জেমস হোয়াইট ওভারটন এস্টেটে বানিয়েছিলেন রাজকীয় এক প্রাসাদ। নাম দিয়েছিলেন ওভারটন হাউস। ১৮৮৪ সালে জেমস হোয়াইট প্রয়াত হয়েছিলেন।

    বাবার মৃত্যুর পর ছেলে জন হোয়াইট, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার হেনরি মিলারকে বানিয়েছিলেন ওভারটন ব্রিজ। অগভীর খাদের ওপারে থাকা গারশেক এলাকার সঙ্গে ওভারটন এস্টেটের সংযোগ ঘটিয়েছিল এই ব্রিজ। ওভারটন ব্রিজ তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল ১৮৯৫ সালে। স্থাপত্য ও অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশের কারণে প্রাতঃভ্রমণকারী ও কুকুরের মালিকদের জন্য দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ব্রিজটি।

    ব্রিজটির কাছে এলেই আত্মহত্যার চেষ্টা করে কুকুরেরা

    প্রাতঃভ্রমণে আসা শয়ে শয়ে মানুষ জানিয়েছিলেন, ওভারটন ব্রিজটির কাছে এলেই কিরকম যেন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যায় পোষ্য কুকুরেরা। চেনে বাঁধা না থাকলে, তারা উল্কাগতিতে ব্রিজটির দিকে ছুটে যায়। ব্রিজটির পাঁচিল টপকে লাফিয়ে পড়ে পঞ্চাশ ফুট নীচে। আত্মহত্যা করার জন্য। চেনে বাঁধা থাকলেও, আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্রিজ থেকে নীচে লাফিয়ে পড়ার। বহু প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছিলেন, আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া কুকুরগুলি বেঁচে গিয়ে, আবার ব্রিজের ওপর উঠে এসে দ্বিতীয়বার লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে।

    ব্রিজের ওঠার আগেই সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে কুকুরের মালিকদের।

    স্কটল্যান্ডের ডাম্বারটনের বাসিন্দারা এমনিতেই কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন। কুকুরদের গণহারে আত্মহত্যা, তাঁদের কুসংস্কারের পালে যুগ যুগ ধরে হাওয়া দিয়ে আসছে। ডাম্বারটনের বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন, অপদেবতার হাতছানিতেই আত্মহত্যা করে কুকুরেরা। তাঁরা বিশ্বাস করেন ওভারটন এস্টেটে ভূত আছে। ওভারটন প্যালেসের কোনও এক মালিকের বিধবা স্ত্রী নাকি ভূত হয়ে আজও ওভারটনে ঘুরে বেড়ান। কুকুরদের আত্মহত্যার জন্য দায়ী সেই মহিলার প্রেতাত্মা। অনেকেই নাকি তাঁকে দেখেছেন। ব্রিজে, জঙ্গলে, প্যালেসের জানলায়, ছাদে, বাগানে এখনও তাঁকে দেখা যায়। তাঁর অতৃপ্ত আত্মার পৈশাচিক রক্ততৃষ্ণাই কুকুরদের আত্মহত্যার জন্য দায়ী।

    সত্যিই আত্মহত্যা, নাকি অন্যকিছু!

    প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা, কুকুরদের এই আত্মহত্যার প্রবণতা, ডাম্বারটনের বাসিন্দাদের আতঙ্কের মধ্যে রেখেছিল। ‘প্রিভেনশন ফর ক্রুয়েলটি টু অ্যানিম্যালস’ নামে স্কটল্যান্ডের এক সংস্থা, রহস্যভেদের উদ্দেশ্যে ওভারটনে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। কিন্তু কুকুরদের গণহারে আত্মহত্যার কোনও বিশ্বাসযোগ্য কারণ খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা।এর পর ওভারটন ব্রিজে গিয়েছিলেন বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক ও পশু-বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের গবেষণা থেকে রহস্যজনক ঘটনাটির দুটি ব্যাখ্যা উঠে এসেছিল।

    ওভারটন ব্রিজের একাংশ, পিছনে ওভারটাউন প্যালেস।

    প্রথম ব্যাখ্যা– কুকুরদের ঘ্রাণশক্তি মানুষের থেকে প্রায় এক লক্ষ গুণ বেশি। কিন্তু দৃষ্টি শক্তি ততটা প্রখর নয়। এই দলের গবেষক ও পশু-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুকুরেরা ওভারটন ব্রিজের কাছে এসে, ব্রিজের নীচের খাদে থাকা কোনও স্তন্যপায়ীর গায়ের তীব্র গন্ধে আকৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সে গন্ধ মানুষের নাকে ধরা পড়ছে না। স্তন্যপায়ীর গায়ের তীব্র গন্ধ, কুকুরের জিনে থাকা শিকারী প্রবৃত্তিকে মুহূর্তের মধ্যে জাগিয়ে তুলছে। তাই তারা শিকারের লোভে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ব্রিজের পাঁচিল টপকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অজানা গন্ধের উৎস সন্ধানে।

    দ্বিতীয় ব্যাখ্যা– কুকুরদের সারাদিনই কিছু না কিছু শুঁকতে দেখা যায়। জীববিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, অনেক সময় নিজের গন্ধকে আড়াল করতে, অন্য গন্ধ শোঁকে কুকুরেরা। কুকুরেরা এটা করে শিকার ও আত্মরক্ষার জন্য। যেভাবে নিজেদের গন্ধ লুকিয়ে রাখার জন্য, নেকড়েরা মৃত পশুর দেহের অবশিষ্ট অংশের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।

    এই দলের গবেষকেরা বলছেন, ওভারটন ব্রিজের ঝিম মারা পরিবেশে ভয় পেয়ে, আত্মরক্ষার জন্য কুকুরেরা নিজেদের গায়ে অন্য কোনও গন্ধ মাখতে চাইছে। যে গন্ধ উঠে আসছে ব্রিজের নীচে থাকা খাদ থেকে। সেই গন্ধের কাছে যাওয়ার জন্যই কুকুরেরা ব্রিজ থেকে নীচে লাফিয়ে পড়ছে। অনেক নীচে থাকা পাথুরে মাটিতে পড়ার জন্য কুকুরেরা মারা যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষ এই ঘটনাকে কুকুরদের আত্মহত্যা বলে ভাবছেন।

    কী বলছেন বিখ্যাত পশু-ব্যবহার বিশেষজ্ঞ ডঃ ডেভিড স্যান্ড!

    ডাম্বারটন কাউন্সিলের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনিও তদন্ত করেছিলেন। তিনি গণহারে কুকুরদের মৃত্যুর পিছনে তাদের জৈবিক প্রবৃত্তি, দেহের উচ্চতা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন কুকুরদের পৃথিবী আমাদের চেয়ে আলাদা। একই জায়গাকে কুকুর ও মানুষ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে ও বিচার করে।

    ডঃ স্যান্ডের মতে ওভারটন ব্রিজের নিচু পাঁচিলের ওপারে যে গভীর একটি খাদ আছে, সেটা স্থানীয় মানুষেরা দেখতে পেলেও, উচ্চতা কম হওয়ার জন্য কুকুররা দেখতে পায় না। ফলে ব্রিজের তলায় অজানা জন্তুর গন্ধ পেয়ে শিকারী প্রবৃত্তির বশে কুকুরেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে পাঁচিল টপকে এবং খাদে পড়ে মারা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, কুকুরেরা ওভারটন ব্রিজ থেকেই লাফিয়ে পড়ে মারা যায় কেন! তাও আবার শয়ে শয়ে কুকুর। একই রকম পরিবেশ ও একই স্থাপত্যের ব্রিজ স্কটল্যান্ডের অনেক জায়গায় আছে। সেখানে কেন কুকুরেরা আত্মহত্যা করে না! প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যায়নি এখনও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More